নাসির আহমেদ : তাঁর কবিতায় মৃত্যুচিন্তা : সুমন সরদার

জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

নাসির আহমেদ সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি। সমাজ, রাষ্ট্র, দর্শন, প্রেম-বিরহ, আশা-আকাক্সক্ষা, বৃক্ষ, স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি এমন কোনও বিষয় নেই যা তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়ে ওঠেনি। কবি নাসির আহমেদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আকুলতা শুভ্রতার জন্যে (১৯৮৫) থেকে আমি স্বপ্ন তুমি রাত্রি (১৯৯১) পর্যন্ত চারটি কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য প্রেম ও উজ্জ্বল দিনের আকুতি। বৃক্ষমঙ্গল (১৯৯৬) কাব্যগ্রন্থে এসে পূর্ববৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। বিষয়, ভাব ও নির্মিতিতে এক লক্ষণীয় বাঁক নিয়েছে তাঁর কবিতা। আর অষ্টম কাব্যগ্রন্থ বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে (২০০০)-এ এসে নাসির আহমেদ অন্য এক কবি-ব্যক্তিত্ব। এখানে এসে এমন এক বাঁক নিয়েছে তাঁর কবিতা যে, তরুণতম কবির শিল্পভাবনার সঙ্গে যুগপৎ তিনি অবস্থান করছেন। এ কার্যকরী পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে তাঁর স্বভাবজাত কবিত্বশক্তির কারণে। প্রধানত তিন পর্বের প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থগুলোতেই তিনি খেলেছেন নানা ভাব-বিষয়ের খেলা। পরের পর্ব পূর্বের চেয়ে পূর্ণতা পেয়েছে এমন সরলীকরণের কোনও সুযোগ নেই। এ পর্ব বিভাজন তাঁর কাব্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। কি শিল্পভাবনায়, কি বিষয়ে, ছন্দে, চিত্রকল্পে কিংবা নির্মিতির কারিশমায় তিনি ব্যাপক পাঠক ও সমালোচকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন।

কাব্যালোচনার জন্যে কেউ কবিতার নির্মাণশৈলীর চমৎকারিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান। আবার কেউ কবিতার আত্মা অনুসন্ধানে মনোযোগ দিতে চান। কেউবা মনে করেন, কবির দেশ, সময়, সমাজব্যবস্থা, কবির বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রতিভার মাত্রা প্রভৃতি অনুসন্ধানের মাধ্যমে কবিতার সমগ্র তাৎপর্য উদ্ধার সম্ভব। কবি নাসির আহমেদের কবিতা আলোচনা করতে এর যে কোনও মত গ্রহণ করলেই তাঁর কবিতার নিগূঢ় প্রদেশে অবগাহন করা যায়। কেননা তিনি কবিতা নির্মাণে আজীবন সহজাত। সহজাত ভঙ্গিতেই রচিত তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় ছন্দ, চিত্রকল্প, বাক্-ভঙ্গি এবং বিন্যাসের কারুকাজ। সহজাত গুণটির সঙ্গে শিল্পভাবনার পরিপক্বতা তাঁর কবিতায় যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। বাংলা কবিতা এক জায়গায় থেমে নেই। সময়ের সঙ্গে, যুগের সঙ্গে কবিতার বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। কবি নাসির আহমেদ এ দু স্তরেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন সফলভাবে।

              নাসির আহমেদের কবিতার মূল সুর প্রেম। কবিতায় প্রেম-অনুষঙ্গের প্রতি তাঁর যে তন্ময়তা তা সাধারণ পাঠকের অনিবিড় পাঠেই ধরা পড়ে। কিন্তু নাসির আহমেদ-এর সমগ্র কবিতা পাঠে এমত সাদামাটা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ডি এইচ লরেন্সের সমগ্র রচনার শেকড়েই যৌন-মিলনের প্রসঙ্গ ঘুরে-ফিরে এসেছে। কিন্তু লরেন্সের রচনায় যৌনতার সহজাত পথের আড়ালে কিংবা তলদেশে পৌঁছুলে আর এক ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যঘেরা জগৎ দেখতে পাওয়া যায়। এর আলোতে অবগাহন করে দিকভ্রান্ত জীবন পায় সত্যের ভিত্তি। নাসির আহমেদের কবিতায় ডি এইচ লরেন্সের রচনাশৈলী অনুপস্থিত থাকলেও গভীরতার নিñিদ্র আলয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যতা উপস্থিত। তিনি প্রেমের কবিতার আড়ালেও রেখে যান ইহ ও পারলৌকিক যুগল সুর-মূর্ছনা।

              প্রেমার্ত কবি নাসির আহমেদ নারীর প্রয়োজনকে কাব্যভাবনায় নিয়ে এসেছেন সুন্দরভাবে। চাদরের প্রতীকে নারী বা প্রেমিকা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা এ রকম :

‘তবু যেন গ্রীষ্ম নয়, বর্ষা বা শরৎ নয়, বসন্তও নয়

আমার অস্তিত্বে এই চরাচর শুধু সেই শীতার্ত প্রান্তর

ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মতো অপ্রাপ্তির দুঃসহ বরফ

আদিগন্ত জমে ওঠে নিত্য যার বুকে

আর সেই সহ্যাতীত শীতে

একান্ত চাদর ছাড়া বিকল্প পোশাক নেই কোনও।’

(শীতার্ত চরাচরে / আকুলতা শুভ্রতার জন্যে)

কাব্যচর্চার প্রথমভাগে রচিত এই কবিতার বিষয়বস্তুতে তিনি অনড় থেকেও বাঁক নিয়েছে তাঁর কবিতা। চাদরের বিকল্প কোনও পোশাক তাঁর ছিল না। এই চাদরের বিকল্প এখনও তাঁর নেই। আর এ সময়ের চাদর হলো তাঁর কাব্যে নিত্যনতুন বিষয়ে সৌন্দর্যভাবনা।

              কবি নাসির আহমেদের প্রেমিকসত্তার আকুলতা শুধু নারী ও ভালোবাসার প্রতি নয়। তাঁর ভালোবাসা উথলে উঠে আলিঙ্গন করে নন্দতত্ত্বের চিরকালীন মেঠোপথ। নিষ্ঠুরতা তিনি পছন্দ করেন না, পছন্দ করেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এ থেকে তাঁর ত্যাগী মনোভাবের বৈশিষ্ট্যও প্রকাশিত হয় :

‘গোলাপ ছিঁড়ে নেওয়া নিষ্ঠুরতা নেই

                                                          আমার এই হাতে

              তবে কি শূন্যতা হৃদয়ে এতকাল ? রিক্ত থাকে টব

                                                          এমন দিনে রাতে ?

ফুটলে ফুল কিছু তোমরা ছিঁড়ে নিও।

                             আমি তো মুগ্ধতা দু’চোখে মেখে শুধু

                                                          তৃপ্ত চিরদিন দৃশ্যে, গন্ধেই

              যেমন কবি তার কাব্য-লক্ষ্মীকে সাজিয়ে মুগ্ধ সে

                             স্বপ্ন-গহনায়; প্রণয়ী আমরণ শব্দে-ছন্দেই।’

                             (ফোটাতে দাও ফুল / আকুলতা শুভ্রতার জন্যে)

              পূর্বেই বলা হয়েছে, বৃক্ষমঙ্গল গ্রন্থে এসে তাঁর কবিতা নতুন কাব্যভাবনায় উপনীত হয়েছে। বহুপথ হেঁটে তিনি ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বৃক্ষছায়ায়, সমর্পণ করেছেন চিরসবুজ প্রকৃতির কাছে। এ সমর্পণ বৃক্ষসৌন্দর্যতত্ত্বের পত্তন ঘটিয়েছে :

‘বহুদূর থেকে আজ এসেছি এখানে এই জোনাক বাগানে

                             দীর্ঘ ধু ধু পথে সুরকি-কাঁকরে

                             বিক্ষত পায়ের চিহ্নে পথের দূরত্ব লেখা আছে

                             …  …  …  …  …  …  …  …  …  …  …

                             ঠোঁটের উষ্ণতা দাও, ক্লোরোফিলে সিক্ত করো

                             চুম্বনবঞ্চিত দাহঅনল পিপাসা

                             দীর্ঘ অনিদ্রার জন্যে লতাগুল্মে পাতা ও পল্লবে

                             নিবিড় রাত্রির শয্যা বিছাও এবার।’

                                                          (বৃক্ষমঙ্গল : ১ / বৃক্ষমঙ্গল)

এই ‘দীর্ঘ অনিদ্রার জন্যে’ ‘নিবিড় রাত্রির শয্যা বিছাও এবার’-এর অভ্যন্তরে মৃত্যু কিংবা আত্মবিচ্ছিন্নতার সুর ঝংকৃত।

              বাংলাকাব্যের আদিপর্বের চর্যাপদেও সমাজবিন্যাসের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট বাঙালি জীবনের আত্মবিচ্ছিন্নতাবোধের উচ্চসুর ধ্বনিত হয়েছে। পরবর্তী বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, মনসামঙ্গল কাব্য প্রভৃতিতে ধর্ম ও রাজনীতির প্রভাবে সমাজজীবনের বিভিন্ন সার্থক বিষয়ের পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবোধের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে। এভাবে মাইকেল-এর রচনা পর্যন্ত ব্যাপ্তি লাভ করেছে বিচ্ছিন্নতাবোধের অনল। আধুনিক অথচ ত্রিশপূর্ব কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিচ্ছিন্নতাবোধ কিংবা মৃত্যুচিন্তাকে নতুন মাত্রা দান করেছেন। তবে এও সত্য যে, উপর্যুপরি যুদ্ধ-বিগ্রহে পরাজয়ের ফলে হিন্দুমানসে নিষ্ক্রিয় অবসাদ এবং বাউলতত্ত্বের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা মৃত্যুচিন্তা যে রূপ পরিগ্রহ করে তাতে রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন ঋদ্ধ।

              রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনা আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ। তাঁর মতে, ব্রহ্মাত্মার অংশই হলো মানবাত্মা। দেহবেষ্টিত আত্মা ইহত্যাগের পর তা সীমাহীন এক পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়। এক কথায় সীমা ও অসীমের সংযোগ সাঁকো হিসেবে মৃত্যু অনিবার্য। ‘জীবন যাহারে বলে মরণ তাহারি নাম, মরণ তো নহে তোর পর/ আয় তারে আলিঙ্গন কর। আয় তার হাতখানি ধর।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই কাব্যাংশের মাধ্যমে মরণভীতিকে জীবনের সঙ্গে লীন করেছেন। মৃত্যুকে জীবন ও মহাজীবনের বিকল্পহীন পথের মর্যাদা দিয়েছেন। জন্ম ও মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ সমান ভালোবাসা দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, জন্ম এবং মৃত্যু একে অপরের পরিপূরক। কবি নাসির আহমেদও রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধির রশ্মির আগুনে পুড়েছেন কখনও কখনও। যেমন :

              ‘আমার জন্ম এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে

              রূপান্তর ; এক নাম থেকে শত নামে।

              আমি সেই অবিনাশী অদৃশ্য বাতাস

              জন্ম-পুনর্জন্ম নিয়ে চলেছি অনন্ত-অসীমে,

              আমার মৃত্যু নেইজন্ম নেইযেন চির বহমান সমুদ্রের ঢেউ!’

              (অবিনাশী জীবনের গান/বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে)

              আগেই বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবোধের সিঁড়ি বেয়ে মৃত্যুচেতনাকে উপলব্ধির বিষয়টি পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা আংশিক তাড়িত। এই বোধ গড়ে ওঠে প্রভাব ও অন্তর্গত ক্ষরণ এবং এগুলোর শিল্পসম্মত গ্রহণ ক্ষমতার মাধ্যমে। কবি নাসির আহমেদ দু দফা দৈহিক ক্ষরণের দিগন্ত ছুঁয়েছেন। তবু তিনি প্রখ্যাত জীবনবাদী রুশ ঔপন্যাসিক ও কবি আলেক্সান্দর পুশকিন-এর মতো মৃত্যুকে গ্রহণ করেননি। পুশকিনের দীর্ঘ কবিতা ‘ব্রোঞ্জ-অশ্বারোহী : সেল্ট পিটার্সবার্গের কাহিনির শেষ কয়েক চরণ এ রকম, ‘… আর দেখা গেল, সেই কুটির যেখানে ছিল পড়ে/ বন্যা-ক্ষতচিহ্নে ভরা নষ্ট ভ্রষ্ট দেহ নিয়ে তার/ মরে আছে তারই পাশে হতভাগ্য পাগল আমার;/ (আত্মা তার শান্তি পাক!) সেখানেই শুল সে কবরে।’ (অনুবাদ : মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়)। প্রতীয়মান হচ্ছে মৃত্যুপূর্ব জীবনই তাঁর কাছে মূল্যবান। মৃত্যুতে সব শেষ; বা মৃত্যুপরবর্তী জীবন রঙিন আরশিতে অনুপস্থিত। পুশকিন শৈশবে অবহেলিত ও ডানপিটে এবং যৌবনে উচ্ছৃঙ্খল জীবনপ্রবাহে গা ভাসালেও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের জয়গান গেয়েছিলেন। তিনি খেলাচ্ছলে ডুয়েলের মরণফাঁদে পা দিয়ে আত্মহনন করেছিলেন। মৃত্যু তাঁর কাছে কোনও গুরুত্ব বহন করেনি বলেই মৃত্যুর পূর্বক্ষণে বলেছিলেন ‘বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই আর, মৃত্যু আমার অনিবার্য।’ কবি নাসির আহমেদ-এর মৃত্যুপূর্ব উপলব্ধি ভিন্ন। মৃত্যুর সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে তিনি কোনওভাবেই বিলীন করে দিতে চান না। যেমন :

                             ‘ও প্রিয় শহর! আমি যাই।

                             আমার প্রস্থানে কেন তোর অলিতে গলিতে

                             লতিয়ে উঠছে আজ এত দীর্ঘশ্বাস ?

                             আমি যাই কে বলেছে!যাচ্ছে তো ফটিক

                             নিঃসঙ্গ নগর ছেড়ে ছুটছে মায়ের দিকে

                             ছুটছে গাঁয়ের দিকে

                             মাতৃনিসর্গের শূন্যতার দুঃখ থেকে বহুদূরে।’

                                           (যাবার আগে/ঝরাপাতার নৃত্যকলা)        

নাসির আহমেদ-এর মৃত্যুচেতনায় অবিনশ্বরতার ধ্বনি শিল্পবিচারে উত্তীর্ণ। তিনি যাচ্ছেন না, যাচ্ছে তাঁর ফটিকরূপী আত্মা। আর তিনি আত্মাকে ‘মাতৃনিসর্গের শূন্যতার দুঃখ থেকে বহুদূরে’ পাঠিয়ে দিয়ে কর্মযজ্ঞে নশ্বরতা চান। এই উপলব্ধি তাঁকে অন্যদের থেকে করেছে পৃথক। অন্যত্র বলেছেন :

                             ‘নক্ষত্রের মৃত্যু নেই! অনন্ত অসীম সৌরলোকে

                             তাঁরা শুধু এক কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষে যায়।

                             মানুষেরও মৃত্যু নেইযাঁরা মৃত্যুভয় মুছে ফেলে

                             জীবনের মৃত্যুঞ্জয়ী ছবি এঁকে যায়

                             দৃশ্যত : চোখের আড়াল হয়ে তাঁরা

                             চিরকাল বেঁচে থাকে মানব মিছিলে।’

                                           (মা বলতেন/আমি স্বপ্ন তুমি রাত্রি)

              রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে নাসির আহমেদ-এর চিন্তার তেমন কোনও ফারাক না-থাকলেও মৃত্যুপরবর্তী অনুভূতি প্রকাশে তাঁদের পার্থক্য লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুচেতনাকে আধ্যাত্মিকতার অনুভূতিতে শায়িত করেছেন। কিন্তু নাসির আহমেদ-এর মৃত্যুচেতনা জীবনঘনিষ্ঠ। ইহলৌকিক রসে সিক্ত করেছেন তিনি মৃত্যুচেতনার স্তরকে।

              সমাজ-সংসার ভোগের বিভিন্ন স্তরে কখনও কখনও কবি নাসির আহমেদ সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। তিনি বলেন :

                             ‘শুধু আমিই শীতার্ত এক বিবর্ণ হলুদ ঝরাপাতা

                             ঝরে যাই যেন তীব্র অদৃশ্য তুষার ঝড়ে।’

                                           (বৃক্ষমঙ্গল : ১৯/বৃক্ষমঙ্গল)

              কিংবা

                             ‘তাই ফিরে যাচ্ছি এই কবিতাবিমুখ নগর থেকে দূরেবহু কবিতার দিকে!

ফিরে যাচ্ছি এই সৌন্দর্যের ফাঁদগোরস্তান ছেড়ে!’

(ফিরে যাচ্ছি গোরস্তান ছেড়ে/বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে)

              এবং

              ‘রক্তে নেচে উঠেছে স্বপ্নের নদী, মিটেছে অপূর্ণ সব সাধ

                             চৈত্রের মৃত্তিকা ফেটে উঠেছে আষাঢ়ে ঢেউ তীব্র কলরোল

                             মৃত্যুদণ্ড মেনে নিই, সাজাও ফাঁসির ফাঁসকল!’

                                           (মৃত্যুদণ্ড/বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে)

              কবি নাসির  আহমেদ-এর মৃত্যুবিষয়ক কাব্য পাঠান্তে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তিনি তাঁর মস্তিষ্ক নিঃসৃত মৃত্যুচিন্তা অত্যন্ত সচেতনভাবে কাব্য-শরীরে স্থাপন করেন। কখনও কখনও তিনি মৃত্যুর কাছে নিজেকে শর্তহীন সমর্পণ করেছেন। মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট থেকে যে বিচ্ছিন্নতাবোধের উৎপত্তিসেই আগুনেও তিনি কম জ্বলেননি। যেমন :

                             ‘রাত্রির শয্যায় কারও বাহুডোরে থেকেও যে কী করে মানুষ

                             এমন নিঃসঙ্গ হয়! হতে পারে জনারণ্যে মরুপথচারী

                             জেনেছি সে অসম্ভব সত্যকেও আজ।’

                                           (দুরারোগ্য/তোমাকেই আশালতা)

              কবি নাসির আহমেদ অনেক কবিতায় মৃত্যুর কথা বিভিন্নভাবে বলেছেন। কিন্তু শতাব্দীর শুরুতে কবি নাসির আহমেদের মৃত্যুচিন্তায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। দৈহিক ক্ষরণের অনুভূতি দিয়ে তিনি মৃত্যুকে অনিবার্য হিসেবে দেখলেও ইহলোকের অভিজ্ঞতায় অনাকাক্সিক্ষত পীড়াদায়ক অনুভব ছুড়ে মেরেছেন পারলৌকিক জীবনবোধের দরজায়। বিশেষ করে গোপন তোমার সঙ্গে ও নিজের সঙ্গে নিজের কথা কাব্যগ্রন্থ দুটিতে এসব অনুভূতির সঙ্গে মৃত্যুকে আলিঙ্গন না-করার অদৃশ্য ও অস্ফুট ইচ্ছাই প্রকাশ করেছেন তিনি :

‘ও আমার পরম অচিন! তোমার উদ্বিগ্ন মুখ কুশল বারতা ঢেলে দিয়ে

                             প্রতিদিন জন্ম দেয় পুনর্বার সূর্যোদয়ের প্রতিশ্রুতি।

                                           পুনর্জন্ম পায় বনভূমি

                                           পুনর্জন্ম পেয়ে বেঁচে উঠি।’

                                           (তুমি হে সূর্যের দীপ্তি/ গোপন তোমার সঙ্গে)

তিনি মৃত্যুকে প্রত্যাখ্যান করেছেন আবার অন্যভাবে গ্রহণও করেছেন। মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতর হয়ে এর জন্যে কাউকে দায়ী করেছেন অকপটে। নাসির আহমেদ-এর বিভিন্ন বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কবিতায় প্রেমের সুমিষ্ট ফলের বীজ ছড়িয়ে দুঃখবোধ কিংবা মৃত্যুকে নানা রঙে সাজিয়েছেন। অনেক কবিতায় মৃত্যুপূর্ব ও মৃত্যুপরবর্তী বন্দনাতে ব্যাপ্ত থেকেও এক অপূর্ণতা তাঁর নিজের কাছেই ধরা পড়েছে। ঝরাপাতার নৃত্যকলা কাব্যগ্রন্থের ‘অকথিত’ কবিতায় আধ্যাত্মিক রসে স্নাত হয়ে কবি নাসির আহমেদ লালন শাহ্কে প্রশ্ন করেছেন :

                             ‘হায়রে লালন ভাঙলি না এই ভেদ

                             বুকের মাঝে কে আসে যায় ?’

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares