সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী আব্দুলরাজাক গুর্না : শরণার্থীর উথাল-পাথাল জীবন : মোহীত উল আলম

বিশ্বসাহিত্য : নোবেলবিজয়ীর সাহিত্যকর্ম

গত বছর (২০২০) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া আমেরিকান কবি লুইস গ্লুক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করি যে, বিশ্বসাহিত্যের ক্রমবিকশিত আঙিনার তুলনায় আমার ব্যক্তিগত পড়াশোনা বেশ সীমিত। বলেছিলাম যে, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে পর্যন্ত আমি তাঁর নাম শুনিনি। এবারে সে বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। আগেরবার তো গ্লুকের ওপর জে.স্টোরসহ বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়াতে প্রচুর আর্টিকেল ছিল, যেগুলো থেকে রসদ সংগ্রহ করে শব্দঘর-এর জন্য লেখা তৈরি করতে পেরেছিলাম। এবার দেখলাম, সদ্য নোবেলপ্রাপ্ত সাহিত্যিক অধ্যাপক আব্দুলরাজাক গুর্নার (আব্দেল রাজাক বিন সালেম গুর্না) ওপর কোনও বিশেষ রচনা নেই। তবে তাঁর অনেকগুলো ভিডিও সাক্ষাৎকার পাচ্ছি, যেগুলোতে তিনি মোটামুটি তাঁর শরণার্থী জীবনের সংগ্রামের ওপর প্রচুর কথাবার্তা বলেছেন। সাথে একটি মাত্র পূর্ণাঙ্গ রচনা পেলাম রিসার্চগেইট থেকে, যেটির শিরোনাম বেশ তাত্ত্বিকধর্মী : ‘লোকেটিং আব্দুলরাজাক গুর্না : মার্জিনস, মেইনস্ট্রিমস, মোবিলিটিজ।’ অর্থাৎ, আব্দুলরাজাক গুর্নার অবস্থান নির্ণয় : সীমানা, মূলধারা, জঙ্গমতা। লেখিকার নাম স্যালি-অ্যান মারে, লেখাটি তিনি ছাপিয়েছেন ইংলিশ স্টাডিজ ইন আফ্রিকা শীর্ষক অনলাইন জার্নালের ৫৬ : ১ সংখ্যায়, ২০১৩ সালের ২২ মে। অর্থাৎ এ আলোচনায় গুর্না সম্পর্কে যাবতীয় মন্তব্য তাঁর আট বছর আগের সময়কাল পর্যন্ত রচিত সাহিত্যের ওপর। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার রসদ জোগাড় করতে না পারার সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই বর্তমান রচনাটি এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা চেষ্টা করেছিলাম তাঁর বহুল উল্লেখিত প্যারাডাইজ (১৯৯৪) উপন্যাসটি পিডিএফ ডাউনলোড করে পড়ার জন্য, কিন্তু সেটিতে সফল হইনি। পরে আমার এক প্রিয়ভাজন সহকর্মী ডাউনলোড করে দেয়, কিন্তু ততদিনে আমার এ লেখাটি সম্পন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া অবশ্য নোবেল কমিটির একটি ওয়েবসাইটে কিছুটা পূর্ণাঙ্গ আলোচনা আছে তাঁর ওপর। সেটির সাহায্যও নিয়েছি।

গুর্না ভারত মহাসাগরের পশ্চিম পাশে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের দেশ তাঞ্জানিয়ার কাছের একটি দ্বীপ জাঞ্জিবার (জানজিবারি)-এ জন্মগ্রহণ করেন ২০ ডিসেম্বের ১৯৪৮ সালে। জাঞ্জিবার দ্বীপটি বহু শতক ধরে একটি পর্যটক-প্রিয় দ্বীপ। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর নয়নাভিরাম কয়েকটি সমুদ্রসৈকতের মধ্যে জাঞ্জিবারের সৈকতগুলো অন্যতম। সে দ্বীপে ইয়েমেনি-আরব বংশোদ্ভূত একটি মুসলিম পরিবারে গুর্নার জন্ম। জাঞ্জিবার এখন তাঞ্জানিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সে হিসেবে গুর্না তাঞ্জানিয়ান। দ্বীপটি প্রথম দিকে আফ্রিকার একটি ব্যস্ত জনপদ ছিল, পরে আরব বণিকেরা এটা দখলে নেয়। এরপর এটা যথাক্রমে পর্তুগাল, ওমান, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডের উপনিবেশে পরিণত হয়। তবে দ্বীপটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক থেকে রক্তপাতহীনভাবে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬৩ সালে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট আবেইদ কারিমির সময় একটি বিপ্লব সংঘটিত হলে ওমান বংশোদ্ভূত সালতানাতের পতন হয়, এবং কারিমি একচ্ছত্র অত্যাচার চালান আরব বংশোদ্ভূত পরিবারগুলোর ওপর। ফলে ১৭ হাজার লোকের প্রাণ ক্ষয় হয়। বিপ্লবী পরিষদ বহু লোককে কারারুদ্ধ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ধসে পড়ে। এই চরম ক্ষণে গুর্না এবং তাঁর ভাই আহমেদ গুর্না ষাটের দশকের শেষের দিকে জাঞ্জিবার থেকে পালিয়ে প্রথমে নাইজেরিয়া ও পরে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। সে থেকে তিনি গ্রেট ব্রিটেনের অধিবাসী এবং লেখেন ইংরেজিতে, ফলে কিছুটা তিনি ব্রিটিশ লেখকও। অর্থাৎ মূলধারার লেখক। গুর্নার জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে তাই খানিকটা কৌতুক মিশ্রিত আছে। মারে তাঁর লেখার ১৪৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে কোনও একটি সংস্থা তাঁকে পরিচিত করিয়েছেন, ‘দ্য জাঞ্জিবারি অথর আবদ আল-গুর্না’ হিসেবে, আবার অন্য একটি সংস্থা বলছে, তিনি হচ্ছেন জাঞ্জিবারে জন্মগ্রহণকারী আরব বংশোদ্ভূত ইংল্যান্ডে বসবাসকারী একজন সন্তান। কোনও কোনও পাঠক তাঁকে ‘আ ব্রিটেন-বেইজড অথর’ও বলছেন। কিন্তু ও’ওকিম্বা নামক একজন সমালোচক তাঁকে বলছেন, ‘দ্য ডিস্টিঙ্গুইশড তাঞ্জানিয়ান ইংলিশ নভেলিস্ট’। এই মন্তব্য ২০১২ সালে করা। গুর্না নিজেই বলেছেন, আমি নিজেকে ব্রিটিশ মনে করি না। কিন্তু এ দেশে দীর্ঘদিন বাস করার ফলে আমি বুঝতে পারি এখানে কীভাবে বর্ণবাদটা কাজ করে। আমি কখনও ভুলে যাই না আমি দেখতে কী রকম ? বা অন্যরা আমাকে কীভাবে দেখে। বিজয় নায়ারকে ‘ইন কনভারসেশন উইথ আব্দুলরাজাক গুর্না’ প্রদত্ত ২০০৫-এর ১৫ মে ডেকান হেরাল্ড পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি এই স্বীকারোক্তি করেন। তা হলে দেখা যাচ্ছে, গুর্না শারীরিকভাবে ইংল্যান্ডে থাকলেও, এবং ক্যান্টারবেরিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে অবসরে গেলেও (সেখানে তিনি পোস্ট-কলোনিয়াল লিটেরেচার পড়াতেন: চিনুয়া এচিবি, আনগুজি ওয়া থিয়েঙ্গো, ওলে সোয়িঙ্কা প্রমুখ) এখনও তিনি জাঞ্জিবারকে বুকে ধারণ করে আছেন। সেজন্য, সাহিত্যবোদ্ধারা মনে করছেন, গুর্নার স্থানিক পরিচয় নির্ণয় করা জটিল।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার নিয়ে অসাম্যতার অভিযোগ বহু পুরোনো। প্রথম আপত্তিটা আসে যে এটি ইংল্যান্ড-আমেরিকা-ইউরোপকেন্দ্রিক পুরস্কার। তারপরের আপত্তিটা হলো যে, এটি কৃষ্ণকায় এবং বাদামিদের জন্য বিরল পুরস্কার, এবং তৃতীয় আপত্তিটা হলো যে এটি নারী লেখকদের উপেক্ষা করে থাকে। চতুর্থ একটি পর্যবেক্ষণ : সমালোচক বিয়ারক্রফট বললেন যে ইংরেজি ভাষায় লিখিত সাহিত্য, কিংবা যে সব ভাষা নোবেল কমিটির সদস্যগণ পড়তে পারেন সেসব ভাষায় লেখা না হলে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া কঠিন।

গুর্না হলেন আফ্রিকার ষষ্ঠ লেখক যিনি এ পুরস্কারটি পেলেন। এর আগে নাইজেরিয়ার ওলে সোয়িঙ্কা (১৯৮৬), মিসরের নগিব মাহফুজ (১৯৮৮), দক্ষিণ আফ্রিকার নাদিন গর্দিমার (১৯৯১) ও জি এম কাটসিয়া (২০০৩) এবং জি এম জি ক্লেজিও (মরিশাস, কিন্তু ফ্রান্সে জন্ম) (২০০৮)। এক অর্থে নোবেল কমিটি কর্তৃক আরবি এবং আফ্রিকান সাহিত্যের প্রতি পুনঃনজর দেয়ার উদাহরণ তৈরি হলো। অন্য অর্থে নগিব মাহফুজ এবং গুর্নার সাহিত্যে রচনাগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বেশ মিল পাওয়া যায়। তাঁদের গল্প বলার ধরন, আবহাওয়া ও প্রতিবেশ চিত্রণ এবং বিধৃত জীবনপ্রণালির মধ্যে বেশ সমানুগতা আছে। দু’জনের মধ্যে, যেমন সমালোচক সাদী আল-সালেহ বলছেন, এই প্রবণতা আছে যে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে রাজনৈতিক ঘটনাবলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত, কিংবা কীভাবে গরিবি জীবন মানুষের জীবনকে চালিত করে, কিংবা শারীরিক এবং মানসিক ব্যাধিসমূহ মানুষের জীবনকে কীভাবে নিত্যই অনিশ্চিত করে রাখে এইসব ব্যাপার চিত্রায়ণ করার সময় নিষ্কম্প দৃষ্টিভঙ্গি নগিব মাহফুজের যেমন আছে, তেমনি আছে গুর্নার। সাথে রয়েছে বৈশ্বিক চালচিত্রের প্রভাব। কিন্তু বিশ্বের সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো প্রায় সময় প্রান্তিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতি উদাসীন ও নিরপেক্ষ থাকে। ফলে যে বেদনার সৃষ্টি হয়, সেটিই বিধৃত হয় নগিব মাহফুজ কিংবা আব্দুলরাজাক গুর্নার সাহিত্যে, এবং এই ধারায় রচিত সাহিত্য নোবেল কমিটির মনোযোগ আকর্ষণ করছে দেখা যায়, ফলত লেখক হিসেবে তাঁরাই পুরস্কার পাচ্ছেন, যাঁরা অ-ইউরোপীয় এবং অ-আমেরিকান।

পুরস্কার পাবার ঘটনাটি একটি ভিডিও চিত্রে তিনি বলছেন এভাবে : ‘আমি বাসায় লাঞ্চের আগে এক কাপ কফি বানাচ্ছিলাম। তখন একটি অজানা নম্বর থেকে আমার টেলিফোনটি বেজে ওঠে। ও প্রান্ত থেকে কেউ একজন বলছিলেন, ‘আমি সুইডিশ একাডেমি থেকে বলছি, আপনি এ বছর সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।’ আমি ভাবলাম কেউ বুঝি মস্করা করছে। কিন্তু ভদ্রলোক আমাকে সময় নিয়ে বোঝালেন, এবং আমি বুঝলাম যে কথাটা সত্য। তিনি টেলিফোন রেখে দিলেন। এর মধ্যে অবশ্য প্রচার মাধ্যমে খবরটি বের হতে শুরু করে।’ তারপর বললেন, ‘আমি এ পুরস্কারটি পাওয়াতে বুঝতে পারছি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলাপ করার ‘সবুজ বাতি’ পাওয়া গেল।’ বললেন, ‘আমার জন্য সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো শরণার্থী সমস্যা। যখন বিভিন্নভাবে উপদ্রুত দেশগুলো থেকে শরণার্থীরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে আসে, তারা তো সঙ্গে করে মেধা, শ্রমশক্তি, কিছুটা পুঁজি নিয়ে আসে, একেবারে ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে তো আসে না। অথচ তাদেরকে কত অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অভিবাসন প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যে সময়ে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম, তখন অভিবাসন প্রক্রিয়া বেশ জটিল ছিল। এখন বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা ষাটের দশকের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে, কাজেই নিরাপদ দেশগুলোর দায়িত্ব রয়েছে আগের চেয়ে আরও বেশি শরণার্থী গ্রহণ করা।’ ২০১৬ সালের প্রদেয় একটি সাক্ষাৎকারে, তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি কি নিজেকে একজন উত্তর-ঔপনিবেশিক এবং বিশ্বসাহিত্যের লেখক হিসেবে পরিচয় করাতে চান কি-না, তিনি বলেন, আমি ঐ ধরনের একটা শব্দও ব্যবহার করব না, এবং লেখক হিসেবে আমি নিজেকে কোনও শ্রেণিভুক্ত করব না। গুর্না এই পুরস্কারের জন্য পাবেন দশ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, যা বাংলাদেশি টাকায় বর্তমানে হবে ৯ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। গুর্না তাঁর পুরস্কারটি আফ্রিকাকে নিবেদন করেছেন। বলেছেন, ‘সকল আফ্রিকান এবং পাঠককে আমি ধন্যবাদ জানাই।’ বলেছেন, ‘মানুষ মারা যাচ্ছে। পুরো পৃথিবীজুড়ে তারা যন্ত্রণায় আছে।  এ ব্যাপারে আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত, এবং এটি আলোচনায় আনা উচিত।’  

গুর্নার উপন্যাসগুলো পরিচিতি-সংকট, স্থানচ্যুতি, ঔপনিবেশিকতার শিকার এবং দাসপ্রথা নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোড়িত। তাই সুইডিশ একাডেমি তাঁদের শংসাপত্রে লিখলেন, ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে গুর্না অত্যন্ত জেদিভাবে লিখেছেন। এবং সে সাথে তাঁর রচনায় মিশে আছে তীব্র আবেগ। তাঁরা আরও বললেন, আব্দুলরাজাক গুর্নার অভিব্যক্তি হলো সত্য ঠিক যেরকম সেরকমভাবে তাকে নিবেদন করতে হবে, এবং গুরুতর ইস্যুকে সংক্ষিপ্তকরণের প্রতি তাঁর যে ঘৃণা, সেটি সত্যিই বিস্ময়কর। তাঁরা আরও বললেন, গুর্নার সৃষ্ট চরিত্রগুলো এমন সব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে জড়িত থাকতে দেখা যায়, যেখানে সর্বসময় তারা দেখতে পায় যে সাংস্কৃতিক সংকটের গভীরতম পর্যায়ে তারা আছে, এক দিকে দেশীয় সংস্কৃতি, অন্য দিকে মহাদেশীয় সংস্কৃতি, এক দিকে পুরোনো জীবনধারার টান, যেটি চরিত্রটি যাপন করে এসেছে, অন্য দিকে নতুন জীবনপ্রণালির হাতছানিÑএটিই মানবজীবনের একটি স্থায়ী দোলাচল, এবং গুর্না সেটি সৎভাবে এঁকেছেন, যদিও অনুকম্পাবিহীনভাবে নয়।

গুর্নার বয়স এখন ৭৩, এর মধ্যে বহু মননশীল রচনার পাশাপাশি রচনা করেছেন দশটি উপন্যাস। গুর্না লিখতে শুরু করেন একুশ বছর বয়স থেকে। তাঁকে আরব্য রজনী যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি করে শেক্সপিয়ারের রচনাবলি এবং ভি এস নইপালের উপন্যাস।

গুর্নার উপন্যাসগুলো মূলত শিকড় উৎপাটনপূর্বক একটি জীবনকে ফেলে এসে নতুন আরেকটি জীবনে প্রবেশ করার গল্প। পূর্ব আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, কিংবা আফ্রিকার এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর হওয়া, এবং এতদসংশ্লিষ্ট মানসিক জটাজালের বিস্তার, এগুলোই হচ্ছে তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু।

তাঁর উপন্যাসগুলোয় উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য পেয়েছে স্মৃতি। স্মৃতির ব্যাপারে তিনি মনে করেন যে, ছোটবেলার অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক পরিমণ্ডল লেখকের গভীর চেতনায় রেখাপাত করে এবং স্মৃতি তাই লেখনীর একটি শক্তিশালী উপায় হিসেবে কাজ করে। তাই তিনি শিকড়-উপড়ানো লোক হিসেবে তাঁর স্মৃতি এবং বেদনা পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। 

গুর্নার উপন্যাস অ্যাক্রস দ্য সি ইন্টারন্যাশন্যাল বুকার প্রাইজ পাবার পর প্রায় এক ডজন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছে। এটির মধ্যে আরব সাগর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে-যেমন ইয়েমেন, ওমান, তাঞ্জানিয়া, জাঞ্জিবার এবং সংলগ্ন এলাকাÑসভ্যতার ভেঙে পড়া চিত্র অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে বিধৃত হয়েছে। গুর্নার প্রকাশক জামান বাহা এল-দিন বলেন, গুর্না তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে কথন রীতিই বদলে দিয়েছেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, বর্ণনার জটিল ভঙ্গি গত তিন দশক ধরে পাঠকসমাজকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। কিন্তু তারপর এল-দিন একটা কথা যোগ করছেন, সেটি হলো যে গুর্নার খ্যাতির এত বিস্তৃতি কখনও হতো না যদি-না ব্রিটিশ ভূমিকা তাঁর লেখা প্রচারের ক্ষেত্রে এত ব্যাপক সাড়া না দিত, তাঁর লেখা বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের চেষ্টা না করত। কিন্তু এই সদর্থক ব্রিটিশ ভূমিকা সব আরব লেখকদের প্রতি সমানভাবে নিবেদিত হতে দেখা যায় না।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় যে গুর্না চিনুয়া এচিবির পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে ঔপনিবেশিকোত্তর ধারা অনুযায়ী সাহিত্য রচনা করেছেন, যেটার মূল থিম হলো থিংস ফল এপার্ট-এর ওকেনেকোর মতো প্রতিবাদ থাকবে ঔপনিবেশিকতার শক্তির বিরুদ্ধে কিন্তু অবশেষে যে বিকল্পটা আসে সেটি ঔপনিবেশিক সময়ের চেয়ে ইতরতর। কিন্তু ঠিক এই জায়গায় পোস্ট-কলোনিয়ালিস্টদের সাহিত্যের   চেয়ে গুর্নার সাহিত্য আলাদা হয়ে গেছে। কারণ তাঁর সাহিত্যে, যেমন প্যারাডাইজ উপন্যাসে, শেষ পর্যন্ত পোস্ট-কলোনিয়ালিস্ট থিমটা স্পষ্ট হয় না। তাই ১৯৯৪ সালে প্যারাডাইজ যখন ম্যান বুকার প্রাইজের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় আসে, তখন বুকার সদস্যরা লক্ষ্য করেন যে, গুর্নাকে ঠিক আফ্রিকান লেখক বলা যায় না। এবং বুকারের নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটেনে প্রকাশিত এমন লেখককেই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার বিধান, কিন্তু আবার দেখা যায় গুর্না একজন আউটসাইডার। তাঁকে হয় বলতে হয় কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ লেখক, কিংবা ব্রিটেনে বসবাসরত আফ্রিকান লেখক।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এ এস বায়াট কর্তৃক সম্পাদিত দ্য অক্সফোর্ড বুক অব ইংলিশ শর্ট স্টোরিজ গ্রন্থে শুধুমাত্র খাঁটি ইংরেজ বংশোদ্ভূত লেখকদের স্থান হয়, কিন্তু এর বিপরীতে ব্রুস কিং বললেন যে ইংল্যান্ডের সাহিত্য আন্তর্জাতিক হয়েছে কারণ আব্দুলরাজাক গুর্না, টিমোথি মো, রমেশ গুনেসেকারা, কাজুও ইশিগুরো এবং বেন ওক্রি প্রমুখ বিদেশি ইংল্যান্ডে বসেই সাহিত্য চর্চা করছেন ইংরেজিতে, যদিও তাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। তাঁরা ব্রিটিশ জাতীয়তাও গ্রহণ করেছেন। ব্রুসকে অনুসরণ করে ২০০৬ সালের মধ্যেই এ্যাকিসন এবং রস তাঁদের বিবেচনায় বিশজন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিকের মধ্যে আব্দুলরাজাক গুর্নাকে রাখলেন। পিটার অ্যাক্রয়েড থেকে জিনেট উইন্টারসন পর্যন্ত প্রমুখ ইংরেজ ঔপন্যাসিক এই তালিকায় আছেন। অবশ্য গুর্নাকে রাখা হয়েছে ‘পোস্টকলোনিয়াল অ্যান্ড আদার ইজমস’ ক্যাটেগরিতে। অন্যদিকে তাঁর উচ্চমানসম্পন্ন সাহিত্য-প্রবন্ধগুলোর জন্য জ্যাকুলিন বার্ডল্ফ-সহ অনেকে তাঁকে ঔপন্যাসিক হিসেবে বিবেচনা না করে প্রাবন্ধিক হিসেবে বিবেচনা করতে পছন্দ করেন।

স্থান ব্যাপারটা গুর্নার উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেন্ডা কুপার বলছেন যে অভিবাসী লেখক মাত্রই পরিব্রাজন এবং প্রযুক্তি দ্বারা স্পৃষ্ট। আমান্ডা সিল বলছেন, পরিভ্রমণ এবং স্থানচ্যুতির জগতে কেউ একজন স্থায়ী একটা স্থানিক পরিচিতি বহন করবে, সেটি গুর্নার সাহিত্যের ক্ষেত্রে অপ্রতুল পরিচিতি। সে জন্য মারের বক্তব্য হলো যে গুর্নার সকল লেখাই হচ্ছে প্রান্তিকতা এবং একে অপরের সঙ্গে পার্থক্যবাহিত সূচকসমূহের মধ্যে যে একাধারে দ্বন্দ্ব ও সমন্বয় সেটিই তাঁর উপন্যাসগুলোতে একটি মনোজগত তৈরি করে।

গুর্নার পরিচিতি নিয়ে মারের একটি অভিজ্ঞতা এখানে বর্ণনা করা যায়। ব্লুমসবারি পাবলিশার্স, যারা গুর্নার বর্তমান প্রকাশক তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে মারে স্ক্রলবারে গুর্নার নাম লিখলে একটা মজার জিনিস আবিষ্কার হয়। তিনি জানতে পারেন যে ওয়েবসাইটগুলোতে এখন গ্রন্থ বা বইকে বাণিজ্যিক ধারণায় প্রোডাক্ট বা পণ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাই একটি জায়গায় তিনি ক্লিক করলে সেখানে বলছে, ‘শো প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচার্ড বাই আব্দুলরাজাক গুর্না।’ অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে লেখক এবং কবি আর গ্রন্থ রচয়িতা নয়, বরঞ্চ পণ্যের প্রস্তুতকারক। এবং আরও মজার ব্যাপার হলো, গুর্নার প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ ইমেজের পাশাপাশি সুদৃশ্য ছবি দেখানো হচ্ছে জাঞ্জিবার দ্বীপমালাÑএর বালিয়াড়ি সৈকত, তালপাতার বেড়ার তৈরি কুটির, নকশা খোদাইকৃত ভারী কাঠের দরজা, একাকী সমুদ্রে নোঙর করা একটি একাকী  নৌকা। অর্থাৎ, প্রকাশকের ব্যবসায়িক বুদ্ধি বলছে যে হোক না গুর্না কেন্ট শহরে বসবাসরত অভিবাসী লেখক, কিন্তু তাঁর গোড়া যে জাঞ্জিবারের মতো নয়নাভিরাম দ্বীপ, যেখানে শুধু ‘দুধ আর মধু’ পাওয়া যায় সে তথ্য সরবরাহ করা হবে না কেন! তাই মারে গুর্নাকে লেখক হিসেবে চিহ্নিত করতে গিয়ে বলছেন, গুর্নাকে যদি ‘দ্বীপ লেখক’ বলা হয়, তা হলে তাঁর সাহিত্য বিচারিত হবে এই ভাবে যে তাঁর দ্বীপবাসের সংস্কৃতি কীভাবে ইংল্যান্ডের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে এবং ইংরেজির মতো সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন ভাষায় ব্যক্ত হতে পারল সেটি যাচাই করা। তিনি যখন তাঁর অভিজ্ঞতাসমূহ উপন্যাসের তাগিদে বর্ণনা করছেন, তখন সেখানে ব্যক্ত হয়ে উঠছে একটি অস্থির ভ্রমণচারী মনের অস্তিত্ব, একটি স্থানচ্যুতির আবশ্যকীয় বর্ণনা এবং সমন্বয় সাধন একদিকে, অন্যদিকে আপন বৈশিষ্ট্য চিহ্নিতকরণের প্রবণতা। তাঁর রচনাসমূহ যে সত্তাকে ধারণ করে তাঁকে একজন সমালোচক বর্ণনা করেছেন ‘ফিগারেটিভ একজাইল’ বা বিমূর্ত নির্বাসন হিসেবে। অর্থাৎ, তাঁর শারীরিক অবস্থান কোথায় তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর মানসিক অবস্থান কোথায়। যেমন, ওয়াসাফিরি জার্নালটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে, যেটির সোয়াহিলি ভাষায় অর্থ হচ্ছে ভ্রমণ। সেখানে একটি সংখ্যায় গুর্না বললেন, ইংলিশ (যদিও ইংল্যান্ড নয়) ধীরে ধীরে আমার কাছে বিরাট একটা আধার হিসেবে প্রমাণিত হলো, যেখানে আমি লেখা ও জ্ঞান পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য যেন অবাধ আতিথ্য পেলাম। ইংরেজি ভাষার আতিথ্য গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আব্দুলরাজাক গুর্নার নোবেলপ্রাপ্তিতে এ প্রশ্নটি করা যায়, গুর্না সোয়াহিলি ভাষায় লিখলে নোবেল পুরস্কার পেতেন কি-না!

এরপরও দেখা যায় সকল আন্তর্জাতিকতা সত্ত্বেও আব্দুলরাজাক গুর্নাকে জাঞ্জিবারের পরিকাঠামোর মধ্যে রেখে মূল্যায়ন করার প্রবণতা সমালোচকদের। যেন জাঞ্জিবারের ভিউ কার্ডের মতো গুর্নার আবেদন। যেমন তাঁর ছোট গল্প ‘দ্য উড অব দ্য মুন’ ছাপা হয় ট্রানজিশন সাময়িকীতে। গল্পটির সাথে সাথে প্যারাটেক্সট হিসেবে মুদ্রিত হয় জাঞ্জিবারের রাস্তাঘাটের সাদাকালো ছবি, সমুদ্রসৈকতের ছবি, যেগুলো আবার নেওয়া হয়েছে গাইড টু জাঞ্জিবার থেকে। অর্থাৎ গুর্নারের পরিচিতির সঙ্গে জাঞ্জিবারের প্রাকৃতিক আবহ লীন হয়ে আছে। ২০০৪ সালে লন্ডনস্থ রয়্যাল আফ্রিকান সোসাইটির একটি প্যানেল আলোচনায় সভাপতি ওয়ালডার কথার কথায় গুর্নাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর উপন্যাসগুলো তাঁর স্বদেশে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে কি না। ওয়ালডারের প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় গুর্না যে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ইংল্যান্ডে আছেন, এবং ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে চলেছেন, সেটির চেয়েও কার্যকর রয়েছে এই চিন্তা যে গুর্না তো আসলে ভিনদেশের লেখক। গুর্না নিজেও একাধিকবার বলেছেন, জাঞ্জিবার পেছনে ফেলে আসলেও, জাঞ্জিবারকে কখনও তিনি ত্যাগ করেননি। জাঞ্জিবার প্রতিদিনই থাকে তাঁর মনে। এবং বলছেন, আমি চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে ইংল্যান্ডে থাকলেও বুঝতে পারি না এখানে আমি আরামে আছি কি না। আমি এখানে স্বস্তিতে কাজ করতে পারি, বেশ সফলতাও এসেছে, কিন্তু কল্পনায় আমি অন্য কোথাও বাস করিÑআই লিভ সামহোয়ার এলস।

আবার নিজ অঞ্চলের মধ্যে গুর্না কিছুটা ব্রাত্য কিংবা অপরিচিত হয়ে আছেন। প্রাবন্ধিক খায়েঙ্গা ওওকিম্বা বলছেন, যখন সোয়াহিলি লেখকদের নাম করা হয়, যেমন সাইদ আহমেদ সাইদ, মোহাম্মদ সায়েদ আবদাল্লাহ্, শাবান রবার্টস এবং খেজিলাহাবি, সেখানে তাঞ্জানিয়ার লেখক আব্দুলরাজাক গুর্নার নাম উঠে আসে না। আবার এই অঞ্চলে (পূর্ব-আফ্রিকায়) যাঁরা ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক তাদের কাছেও গুর্নার নামটা অপরিচিত।

গুর্নার পরিচিতি-সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর এ যাবত প্রকাশিত দশটি উপন্যাসের সারাংশ উপস্থিত করে বুঝতে চাইব যে তাঁর পরিচিতি সংকট এবং শরণার্থী অবস্থান বস্তুত তাঁর সব উপন্যাসের মধ্যে মূল থিম হিসেবে কাজ করেছে। 

তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমোরি অব ডিপার্চার (১৯৮৭) আফ্রিকার একটি দেশের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কাহিনি নিয়ে। উপন্যাসের প্রতিভাবান নায়ক আফ্রিকার একটি ছোট উপকূলীয় গ্রাম ছেড়ে নাইরোবিতে অভিবাসী হলো। উঠল তার এক ধনাঢ্য চাচার বাসায়। কিন্তু সেখানে সে চরমভাবে অপমানিত হয়, এবং ফিরে আসে তার নিজের মদ্যপ বাবার কাছে, যখন তার এক বোন বেশ্যাগিরিতে যোগ দিতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত সে বিষাদময় জীবন এড়াতে পারে না।

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য পিলগ্রিমস ওয়ে (১৯৮৮)-তে চিত্রিত করছেন কীভাবে তাঞ্জানিয়া থেকে দাউদ নামক একজন মুসলিম ছাত্র একটি ছোট ইংলিশ শহরে বাস করতে এসে নিদারুণ বর্ণবাদের শিকার হয়। গুর্না অভিবাসিত জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। নিজের অতীত জীবনকে লুকিয়ে রাখতে চাইলেও দাউদ এক মহিলার প্রেমে পড়ে নিজের গল্প বলতে থাকে। সে মনে করতে পারে তাঞ্জানিয়ার বিভীষিকাময় দিনগুলো, যার ফলে বাধ্য হয়ে তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়। উপন্যাসটি শেষ হয় দাউদের ক্যান্টারবারি ক্যাথিড্রালে গিয়ে প্রার্থনা করার উল্লেখ করে। দাউদের তখন মনে হয় যেভাবে ক্রিশ্চিয়ান পূজারীরা পরিব্রাজনের মতো করে ক্যাথিড্রালে আসতেন, তদ্রƒপ হলো তার তাঞ্জানিয়া থেকে ইংল্যান্ডে আসার ভ্রমণটাও। এর আগে সে ঔপনিবেশিক দেশের সবকিছুকেই অহমিকার প্রকাশ ছাড়া কিছু মনে করেনি, কিন্তু এখন সে যেন নতুন সৌন্দর্য অবলোকন করল। উপন্যাসটি তাই এক আধুনিক জীবনের পরিব্রাজন হিসেবে প্রকাশ পায়, যেখানে সাহিত্য এবং ইতিহাস থেকে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক উল্লেখ উপন্যাসটিকে সমৃদ্ধ করেছে তো বটেই সাথে সাথে পরিচিতি সংকট, স্মৃতির ভূমিকা এবং সম্পর্কের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে।

শিকড়-উপড়ানো জীবনের কথা বিধৃত হয়েছে তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ডোটি-তে (১৯৯০)। এটি একটি চরম অন্তর্দৃষ্টি সমৃদ্ধ উপন্যাস, যেখানে আছে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর কথা যিনি ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ডে গমন করেন, এবং দেখেন যে সব জায়গায় একটাই আলোচনার বিষয়, বর্ণবাদ। বর্ণবাদিতার চরম দিনে, যখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিরূপ পরিবেশের মধ্যে জীবনযুদ্ধে রত আছে সেটিই এই উপন্যাসে বক্ষ্যমান। তার মা যেহেতু মায়ের অতীতকাল নিয়ে নীরব থাকে, মহিলার তাই নিজের শিকড় খুঁজে পেতেও কষ্ট হয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে জন্ম লাভ করে সেখানে বড় হয়েও সে নিজেকে শিকড়বিহীন মনে করতে থাকে। কিন্তু তার পাঠের জগতের ভেতর দিয়ে সে তার নিজস্ব স্পেস এবং আইডেনটিটি তৈরি করার প্রচেষ্টা নেয় : অর্থাৎ পাঠ বা পড়া তার নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করতে সাহায্য করে। সঙ্গে সঙ্গে নাম দেওয়া, নাম বদলানো ইত্যাকার অভিবাসন-সংক্রান্ত ঝামেলা গুর্না অত্যন্ত সহৃদয়তার সাথে কোনো রকম অতিশয়োক্তি না করে বর্ণনা করেন।

গুর্নার চতুর্থ উপন্যাস, প্যারাডাইজ (১৯৯৪), বলা হয়ে থাকে, লেখক হিসেবে তাঁর পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে। উপন্যাসটি ঐ বছরে বুকার প্রাইজ ফর ফিকশনের ক্ষুদ্র তালিকায় থাকে। পুরোটাই আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে রচিত। এই কাহিনিটির গোড়াপত্তন হয় ১৯৯০ সালে যখন গুর্না একটি গবেষণার কাজে পূর্ব-আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। এটিতে দেখা যায় প্রধান চরিত্র ইউসুফ তার গরিব পিতামাতার ঘর ছেড়ে ধনী চাচা আজিজের প্রাসাদে থাকতে আসে। কিন্তু ফাদার জোসেফের থেকে ঋণ নিয়ে আজিজ ধনী হয়। ইউসুফের ভ্রমণটার সঙ্গে কনরাডের উপন্যাসের হার্ট অব ডার্কনেস-এর মিল আছে। কিন্তু এটি বয়োপ্রাপ্তির গল্প এবং একটি ব্যর্থ পেমের গল্প। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পূর্ব আফ্রিকার রক্তক্ষয়ী ঔপনিবেশীকরণের প্রেক্ষাপটে কাহিনিটি বিরচিত। প্রাসঙ্গিকভাবে পবিত্র কোরআন শরিফ থেকে হযরত ইউসুফ (রা. )-এর গল্পটির উল্লেখ আছে। কিন্তু কোরআনের গল্পে যেমন আছে যে, নবী ইউসুফ তাঁর বিশ্বাসের জন্য শেষ পর্যন্ত পুরস্কৃত হোন, এখানে তার উল্টোটি ঘটে। ইউসুফ তার প্রেমিকা আমিনাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, এবং যে জার্মান বাহিনীকে সে ঘৃণা করত, সেখানে সে যোগ দিতে বাধ্য হয়। গুর্নার ধরনটিই এটি যে পাঠকের মন যে ধরনের সমাপ্তি আকাক্সক্ষা করছে, গুর্না প্রায় তা বিনষ্ট করে দেন। 

শরণার্থী সমস্যা নিয়ে গুর্নার সবচেয়ে জাগরূক উপন্যাস হচ্ছেÑএকটি নয়, দু’টিÑআর সে দু’টি হচ্ছে অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স (১৯৯৬) এবং বাই দ্য সি (২০০১)। দু’টো উপন্যাসই তাঁর জীবননির্ভর কাহিনি। একজন বেনামি বর্ণনাকারীর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, কীভাবে জাঞ্জিবারের সন্ত্রাসমুখর জীবন থেকে পালিয়ে গল্পের চরিত্র ব্রিটেনে একটি নতুন জীবন গড়ে তোলে। তার কল্পনায় সে তার স্ত্রী, বাবা মাকে বলার জন্য নিজের মাতৃভূমি নিয়ে নানা গল্প তৈরি করে। কিন্তু সব গল্পই নিষ্ঠুরভাবে অবাস্তব হয়ে দাঁড়ায় যখন সে দেশে ফিরে আসে। দু’টো উপন্যাসই প্রথম পুরুষে লেখা। দু’টোতেই দেখানো হয়েছে নীরবতাই হচ্ছে বর্ণবাদ এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিজেকে আড়ালে রাখার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রথম উপন্যাসটিতে আছে যে মূল চরিত্র তার অতীত গোপন রাখে তার ইংরেজ স্ত্রী ও মেয়ের কাছে। আবার তার জাঞ্জিবারের আত্মীয়-স্বজনও জানে না যে সে ইংল্যান্ডে নতুন সংসার পেতেছে এবং তার সতেরো বছর বয়সের এক মেয়ে আছে। বাই দ্য সি উপন্যাসে আরেক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। উপনাসটির প্রথম পর্বে দেখা যায় সালেহ হচ্ছে কথক। সে জাঞ্জিবার থেকে আগত একজন বৃদ্ধ মুসলমান। ইংল্যান্ডে এসে সে অভিবাসনের জন্য দরখাস্ত করবে। কিন্তু তার কাছে নকল ভিসা, যেটা তার একজন চরম শত্রুর নামে। ঘটনাক্রমে অভিবাসন সংক্রান্ত কাজে কর্তৃপক্ষ যাকে নিয়োগ দেয় সে মি. লতিফ মাহমুদ হচ্ছে ঐ শত্রুরই ছেলে। মি. লতিফ মাহমুদ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এবং কয়েক দশক ধরে ইংল্যান্ডে বাস করছে। লতিফের সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে সালেহর মধ্যে তার অতীতটা ফুঁসে উঠতে থাকে, অন্যদিকে লতিফ চায় পুরো অতীতটাই ভুলে যেতে। দু’জনের মধ্যে অতীতের প্রতি এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপন্যাসটিতে এক অদ্ভুত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, এবং একপর্যায়ে কাহিনির গতিপথ আর নির্দিষ্ট থাকে না, কথকদেরও নিজেদের ওপর আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

নোবেল কমিটি এটি লক্ষ্য করেছে যে গুর্নার-সৃষ্ট চরিত্রগুলো যেন একটি দোলাচলের মধ্যে থাকে। দ্বন্দ্বটি প্রধানত জাতীয় সংস্কৃতি ও মহাদেশীয় সংস্কৃতির মধ্যে। তাঁর সপ্তম উপন্যাস ডেজার্শন চিত্রায়িত করছে জীবনের এই দোটানা বিষয়টি, যেটি শেষ পর্যন্ত সমাধানযোগ্য নয়। এই উপন্যাসে একটি চূড়ান্ত বিষাদময় আবেগকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপন্যাসের নায়ক ইংরেজ সন্তান মার্টিন পিয়ার্সকে দিয়ে। উপনিবেশিত পূর্ব-আফ্রিকার সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলোর বর্ণনা এই উপন্যাসে করা হয়েছে নিপুণ হাতে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর পর্যায়ে কাহিনির প্রেক্ষাপট। পিয়ার্স পূর্ব-আফ্রিকার একটি শহরের রাস্তায় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলে একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী শহরের গলি-ঘুঁজির ভেতর দিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে গেলে পিয়ার্স আবিষ্কার করলেন যে এটি একটি আলাদা জগত, ভাষা ও ভিন্নতার দিক থেকে। কিন্তু পিয়ার্স আরবিতে কথা বলতে পারে, ফলে তার পক্ষে সম্ভব হয় ঐ পরিবারের মেয়ে রেহানার প্রেমে পড়ে যাওয়া। গুর্না পরিষ্কার জানেন যে, এটি পোকাহন্টাসের যুগ নয় যে একটি অম্ল-মধুর রোম্যান্টিক কাহিনি গজানো যাবে, আবার এটিও তিনি দেখান না যে মোম্বাসা শহরে রেহানা আর পিয়ার্সের প্রণয়ের কথা ফাঁস হয়ে গেলে অবধারিতভাবে বিচ্ছেদ নেমে আসে। এই ধরনের ফর্মুলা-টাইপের গল্পের ধারে কাছে তিনি গেলেন না। তার পরিবর্তে তিনি আঁকলেন পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে যে পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেলেও এই নিষিদ্ধ প্রেম জাগরূক থাকেÑযদিও সামাজিক বাধাগুলো পূর্বের মতোই অটুট থাকে। সম্ভবত, আর কোনো উপন্যাসে গুর্না নিজেকে লেখক হিসেবে এতটা প্রকাশ করেন না যতটা এখানে করেছেন। উপন্যাসটির প্রথম পর্বের শেষাংশে তিনি ‘ইন্টারাপশান’ নাম দিয়ে রেহানার নাতিকে কথক হিসেবে চরিত্রায়ন করেন। সে বলে যে তার অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে রেহানার জীবন বৃথা যায়নি, বরঞ্চ কেটেছে ভালোই। এটি প্রমাণ করে যে, কীভাবে একটি গল্পের ভেতরে অনেক গল্প থাকে এবং কীভাবে সেগুলো সবার জন্যে জীবনের গল্পে রূপ নেয়। উপন্যাসটি তলায় তলায় উজ্জীবিত হয়ে আছে জাঞ্জিবারে কাটানো গুর্নার কৈশোরোত্তীর্ণ জীবন, যেখানে বহু শতক ধরে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম পাশাপাশি ধরে থেকেছে এবং মাঝে মাঝে একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চেয়েছে। যদিও গুর্নার উপন্যাসগুলো অ্যাংলো-স্যাক্সন ধারা অনুযায়ী রচিত, কিন্তু আধুনিক শহরের প্রেক্ষাপটে  তাদের স্বাতন্ত্র্য নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। সংলাপ এবং শব্দচয়ন ঋদ্ধ হয়েছে কেন না গুর্নার লেখায় প্রচুর সোয়াহিলী, আরবি, হিন্দি আর জার্মান শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।   

২০১১ সালে প্রকাশিত দ্য লাস্ট গিফট তাঁর প্রথম দিককার লেখা পিলগ্রিমস ওয়ে-র মতো কাহিনি নিয়ে রচিত, তবে এর উপসংহারটি আরও তেতো। শরণার্থী আব্বাস অসুস্থ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবার আগে একটি টেপ রেকর্ডারে তার অভিবাসন-জীবনের নিষ্ঠুর ইতিহাস তুলে ধরেন তার পরিবারের কাছে, যেটা তাদের অজানা ছিল।

২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্রেভেল হার্ট উপন্যাসে প্রকাশ পায় একজন তরুণ যুবার অশুভ এবং অবোধ্য পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। গল্পের প্রথম পুরুষে ব্যক্ত কাহিনিটি পাঠক জানতে পারেন যে, সেলিম হঠাৎ করে তার পরিবারের একটি অত্যন্ত গোপন ব্যাপার জেনে যাওয়াতে অভিবাসন-জীবনের ধারা তার পুরোটাই বদলে যায়। উপন্যাসটির প্রথম বাক্যই পাঠককে হতচকিত করে ঘোষণা করে যে, ‘আমার বাবা আমাকে চায়নি।’ উপন্যাসটির শিরোনাম শেক্সপিয়ারের নাটক মেজার ফর মেজার থেকে উদ্ধৃত, যেখানে নাটকের প্রধান চরিত্র ডিউক জনৈক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে লক্ষ্য করে বলছেন যে, ‘আনফিট টু লিভ অর ডাই! ও গ্রেভেল হার্ট।’ বাঁচা-মরার এই দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনে যেন সেলিমের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।

গুর্নার অতি সাম্প্রতিক উপন্যাস আফটারলাইভস (২০২০) ঠিক প্যারাডাইজ যেখানে শেষ  হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়। এবং ঐ উপন্যাসের মতো এটারও প্রেক্ষাপট হলো বিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক সময়। জার্মানির পূর্ব ইউরোপ ঔপনিবেশিকতা শেষ হবার আগে আগে, অর্থাৎ ১৯১৯। হামজা, যাকে প্যারাডাইজ-এর ইউসুফের সমতুল্য ভাবা যায়, সেও ইউসুফের মতো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জার্মানির সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, আর যোগ দিয়েই সে যৌনতার শিকার হয় জনৈক জার্মান সেনা কর্মকর্তার। সে জার্মান সেনাদলের মধ্যে এক অভ্যন্তরীণ কলহে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, এবং হাসপাতালে নীত হয়। তারপর সে তার জন্মভূমি উপকূলবর্তী দেশে ফিরে গেলে না দেখতে পায় তার পরিবার, না তার বন্ধুদের। ইতিহাসের বিচিত্র গতিপথে কাহিনি বিধৃত হয় কয়েক প্রজন্ম ধরে, এবং নাজি জার্মানির পূর্ব আফ্রিকাকে পুনরায় উপনিবেশে পরিণত করার পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার সময় পর্যন্তÑঠিক যেমন ডেজারশান-এ দেখি। ঔপনিবেশিকতার ফলে উপনিবেশিতদের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি গুর্না এই উপন্যাসেও নিয়ে এসেছেন, যার ফলে হামজার ছেলে ইলিয়াস জার্মানির অধীনে বনে যায় এলিয়াস। শেষের অংশ একেবারে একটি ব্যতিক্রমী ভীতি জাগানো উপসংহার নিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু গুর্নার বক্তব্য সোজা সাপটা: ব্যক্তিমানুষ পরিস্থিতির কাছে অসহায় যদি একটি  প্রভাবশালী মতবাদÑএখানে যেটি হচ্ছে বর্ণবাদÑসেটি যদি জবরদস্তি বশ্যতা এবং নিপীড়ন আরোপ করে।

গুর্নার সত্যের প্রতি একনিষ্ঠতা, এবং সংক্ষিপ্তকরণের বিরোধিতাসহ তাঁর রচনার মধ্যে সার্বিকভাবে তাঁর এই আপোষহীনতা ফুটে ওঠে। আবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যক্তিমানুষের অসহায়ত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে চিত্রণ করেন। তাঁর রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি পরিচিত, প্রথাগত রচনাকে কখনও ঠাঁই দেননি। তাঁর লেখনীর মাধ্যমে পূর্ব-আফ্রিকার সমাজজীবন এমন নিখঁতভাবে অঙ্কিত হয় যে যা হয়তো পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের লোকদের অজানা থেকে যেত। গুর্নার বর্ণনায় সবকিছু সতত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে: স্মৃতি, নাম এবং পরিচিতি। এটি এ জন্য হচ্ছে যে তাঁর দর্শন-অভিবাসন জীবনের সংকটময় অস্তিত্বÑআসলে কখনও সমাপ্তির পথে এগোবে না। তাই তাঁর সব উপন্যাসে শরণার্থী জীবনের অস্থিরতা, নিত্য-নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া, ইত্যাকার বর্ণনা প্রাধান্য পায়Ñসেটি সে একুশ বছর বয়সে লেখার শুরুতে যেমন ছিল, পঞ্চাশ/বায়ান্ন বছর পরে রচিত আফটারলাইভস-ও তাই আছে।

লেখক : অনুবাদক ও কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares