বিশ্বসাহিত্য : বরেণ্য সাহিত্যিকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : দ্য আর্ট অফ ফিকশন : কেনজাবুরো ওয়ে

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : সারাহ ফে

অনুবাদ : শামীম মনোয়ার

[কেনজাবুরো ওয়ে কয়েকটি বিষয়কে জীবনে গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলেন এবং সেগুলোতেই তাঁর জীবন উৎসর্গ করে গেছেন- হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা, ওকিনাওয়ার জনগণের লড়াই, প্রতিবন্ধীদের চ্যালেঞ্জ, পাণ্ডিত্যময় জীবনের শৃঙ্খলা। আবার নিজেকে যে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করেছেন এমনও নয়। যদিও তিনি ছিলেন জাপানের একজন নিবেদিত সমাজকর্মী ও দেশের প্রসিদ্ধ লেখক হিসেবে খ্যাতিমান, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সুরসিক।

অভাবনীয় বিনয়ী এবং কোমল হৃদয়যুক্ত। স্পোর্টস শার্ট পরেন, সহজেই হাসেন। (হেনরি কিসিঞ্জার একবার তাঁর হাসিকে ‘শয়তানী হাসি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কারণ ওয়ে সর্বদা হেনরি কিসিঞ্জারদের বিরুদ্ধাচারণ করেছেন)।

ওয়ের বাড়ি, যেখানে, জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি শোবার ঘরের চেয়ারে কাটিয়েছেন, পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা, বই আর জাজ এবং ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের সিডিগুলোর আধিক্য। যেন আরামদায়ক এবং নজিরবিহীন একটি জগতে বসবাস।

স্ত্রী ইউকারির নকশাকৃত পাশ্চাত্য ধাঁচের বাড়িটি টোকিওর একই শহরতলিতে যেখানে আকিরা কুরোসাওয়া এবং তোশিরো মিফুনে একসময় বসবাস করতেন।

বড় রাস্তা থেকে চলে আসা একটি গলি, পাশে লিলি ফুলের বিশাল বাগান, ম্যাপাল গাছ এবং শতাধিক জাতের গোলাপে আচ্ছাদিত বসতবাড়ি। যেখানে কনিষ্ঠ পুত্র এবং কন্যা নিজেদের মতো বড় হচ্ছে আর ওয়ে ও ইউকারির সঙ্গে থাকছে চুয়াল্লিশ বছর বয়স্ক মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে হিকারি।

‘একজন লেখকের জীবন হচ্ছে একজন ভাঁড়ের জীবন’, ওয়ে বলেছিলেন। ‘এমন একজন ভাঁড় যিনি দুঃখের কথা বলেন।’ তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাসের অন্তর্গত প্রসঙ্গ যা তার দুটো উপন্যাসের ভাবধারা থেকেই এসেছে-A Personal Matter (১৯৬৪)- যেখানে একজন পিতা তার প্রতিবন্ধী সন্তানের সঙ্গে তার জীবন যাপনের কথা; আর অন্যটি The Silent Cry (১৯৬৭)-যেখানে বিবৃত হয়েছে যুদ্ধপরবর্তী জাপানের গ্রাম্যজীবন এবং আধুনিক সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব।

প্রথম ক্যাটাগরির উপন্যাস এবং গল্প যেগুলোর মধ্যে রয়েছে অমযবিব Aghwee the Sky Monster (১৯৬৪), Teach Us to Outgrow Our Madness (১৯৬৯), The Pinch Runner Memorandum (১৯৭৬), Rouse Up, O Young Men of the New Age! (১৯৮৬) এবং A Quiet Life (১৯৯০)। এগুলোতে হিকারির জন্মের সঙ্গে ওহয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নিহিত (কথক একজন সাধারণত লেখক, যার ছেলের নাম মরি, আইয়োর বা হিকারি) তবে গল্পকথকেরা প্রায়শই ওয়ে ও তাঁর স্ত্রীর নেওয়া সিদ্ধান্তের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন রকম সিদ্ধান্ত নেন)। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে The Silent Cry-এর পাশাপাশি রয়েছে Prize Stock (১৯৫৮), Nip the Buds, Shoot the Kids (১৯৫৮), and Somersault (১৯৯৯)। এই রচনাগুলোর মূলভাব ওয়ে তাঁর মা এবং দিদিমার কাছ থেকে শোনা লোককাহিনি এবং পৌরাণিক কাহিনিগুলো থেকে নিয়েছিলেন। এগুলোতে এমন সাধারণ বৈশিষ্ট্যযুক্ত গল্পকথক, যারা বাধ্য হন আত্ম-প্রতারণার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন একটি সম্প্রদায়ের ভিতর বসবাস করতে।

ওয়ের জন্ম ১৯৩৫ সালে। শিকোকু দ্বীপের একটি ছোট্ট গ্রামে। যেখানে বড় হয়েছেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে সম্রাট একজন ঈশ্বর। তিনি বলেছিলেন, তিনি প্রায়শই কল্পনা করতেন সম্রাট একটি সাদা পাখি এবং তিনি এটা আবিষ্কার করে আহত হয়েছিলেন যে, যখন ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধে সম্রাট রেডিওতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। তিনি বুঝতে পারলেন সম্রাট একজন সত্যিকারের মানুষ এবং একজন সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠেই ঘোষণাটি দিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে ওয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করেছিলেন, তবে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানজনক শৈল্পিক পুরস্কার the Order of Culture প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ পুরস্কারটি জাপান সম্রাটকে পূজনীয়তার অতীত গাঁথার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এই সিদ্ধান্ত তাঁকে তুমুলভাবে জাতীয় বিতর্কের পাত্র হিসেবে চিত্রিত করে এবং এমন একটি অবস্থান যা তিনি বারংবার লেখকজীবনের ধারাবাহিকতায় দখল করে রেখেছেন।

প্রথম দিকের উপন্যাস Seventeen (১৯৬১)। যেটা ১৯৬০ সালে একজন সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতাকে ডানপন্থি একজন ছাত্র কর্তৃক হত্যার ওপর ভিত্তি করে রচিত, যে পরে আত্মহত্যা করে। ওয়ে উভয় গ্রুপ থেকেই হুমকির মুখোমুখি হয়েছিলেন। ডানপন্থি উগ্রপন্থিরা মনে করত উপন্যাসটি রাজতান্ত্রিক সরকারের উত্তরাধিকারতন্ত্রকে অবজ্ঞা করেছে এবং বামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরাও এর সমালোচনা করেছিল কারণ তারা মনে করত এটি সন্ত্রাসবাদীকে সমর্থন করেছে। তিনি তখন থেকেই রাজনৈতিক পাদপ্রদীপে আসেন এবং তার কার্যক্রমকে তাঁর সাহিত্যসাধনার অঙ্গাঙ্গি হিসাবেই বিবেচনা করতেন।

২০০২ সালে চারদিনের শিডিউলে আমি (সাক্ষাৎকার গ্রহীতা সারাহ ফে) যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম তখন তিনি বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমরা কিছুটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারি কি না, যাতে তিনি সংশ্লিষ্ট একটি নাগরিক গোষ্ঠীর আয়োজকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন।

বিয়ের তিন বছর পর ১৯৬৩ সালে যখন হিকারির জন্ম হয়, ইতোমধ্যে তাঁর দুটি উপন্যাস এবং বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য গল্প প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাস দু’টি Lavish Are the Dead (১৯৫৭) এবং Prize Stock যা আকুতাগাওয়া পুরস্কার লাভ করে। সমালোচকেরা তখন তাঁকে ইউকিও মিশিমার পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ লেখক হিসেবে প্রশংসা করে। কিন্তু সমালোচক তাকাশি তাচিবানা বলেছিলেন যে ‘হিকারি ছাড়া ওয়ে-সাহিত্য থাকত না।’ ব্রেইন হার্নিয়া নিয়ে হিকারির জন্ম হয়। দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের পর চিকিৎসকেরা ওয়েকে বলেছিল হিকারি মারাত্মকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাবে। ওয়ে জানতেন তার সন্তান সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেÑএমনকি এমন প্রতিবন্ধী শিশুকে জনসমক্ষে নিয়ে যাওয়াও লজ্জাজনক বলে বিবেচিত হবে, তবে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী তাদের নতুন জীবনকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

হিকারি নামের অর্থ ‘আলো’। ছোটবেলায়, হিকারি খুব কমই কথা বলত এবং পরিবারের লোকজন তার সঙ্গে  কথোপকথনের চেষ্টা করত তখন সে ঠিকঠাক বুঝতে পারত না। ওয়ে প্রায়শই তাকে শান্ত করতে এবং ঘুমাতে সাহায্য করার জন্য রেকর্ডকৃত পাখির শব্দ, মোজার্ট এবং শোপিন বাজিয়ে শুনাতেন। যখন হিকারির বয়স ছয় তখন সে একটি সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পেরেছিল।

পারিবারিক অবকাশ যাপনে ওয়ের, সঙ্গে হাঁটার সময় হিকারি একটি পাখির কান্না শুনল এবং ঠিক ঠিক বলে দিল, ‘এটি একটি ডাহুক’। শীঘ্রই সে শাস্ত্রীয় সংগীতে সাড়া দিচ্ছিল, এবং যখন সে যথেষ্ট বড় হলো, ওয়ে তাঁকে পিয়ানো শেখানোয় নাম লেখালেন। আজ, হিকারি জাপানের অন্যতম বিখ্যাত সুরকার। সে কখনও শুনেছে, এমন যে কোনও সংগীত চিনতে বা স্মরণ করতে এবং তার প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। সে মোজার্টের সুর শনাক্ত করা এবং এটি বাজাতে সঠিক কোশেল সংখ্যা মেলাতে পারে। তাঁর প্রথম মিউজিক সিডি Music of Hikari Oe, ক্লাসিক্যাল বিভাগে বিক্রয়ের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। সে বেশিরভাগ সময় বসার ঘরে বাবা ওয়ের সঙ্গে কাটায়। বাবা লেখেন, পড়েন; পুত্র মিউজিক শোনে এবং সুর রচনা করে।

আমাদের আলাপচারিতায় ওয়ে জাপানি ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলছিলেন এবং কখনও কখনও সাবলীল ফরাসি ভাষায়। তবে সাক্ষাৎকার দিতে তিনি একজন দোভাষীকে অনুরোধ করেছিলেন। আমি শিওন কনোর কাছে ঋণী। যিনি অসাধারণ ধৈর্য্য এবং নির্ভুলতার সঙ্গে কাজটি করে দিয়েছিলেন। ভাষা এবং বিশেষত লিখিত শব্দের প্রতি ওয়ের যে একাগ্রতা ও নিষ্ঠা রয়েছে তা তাঁর জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত। একপর্যায়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে নিয়ে লেখা একটি জীবনী-গ্রন্থের কথা তিনি উল্লেখ করেন। যখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, জীবনের কোনও মুহূর্তকে মনে ফিরিয়ে আনতে সমস্যা হচ্ছে কি না ? অবাক হয়ে তিনি বললেন : ‘না’। ‘এটি আমার নিজেকে নিয়ে নিজের একটি গবেষণা। কেনজাবুরো ওয়েকে কেনজাবুরো ওয়ে-এর সন্ধান করা দরকার। আমি এই বইয়ের মাধ্যমে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছি।’]

সারাহ ফে : ক্যারিয়ারের প্রথমদিকে, আপনি অনেক লোকেরই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। আপনি কি একজন ভালো সাক্ষাৎগ্রহীতা ?

কেনজাবুরো ওয়ে : না, না, একজন দক্ষ সাক্ষাৎকারগ্রহীতা এমন কিছু বের করে আনেন, যে-বিষয়ে সাক্ষাৎকর্তা আগে কখনও বলেননি। আমি মনে করি না যে আমার ভিতরে এমন কোনও ক্ষমতা রয়েছে, কারণ আমি কখনও কারও কাছ থেকে নতুন কিছু বের করতে সক্ষম হইনি।

১৯৬০ সালে আমি চেয়ারম্যান মাও-এর সঙ্গে দেখা করার জন্য বেছে নেওয়া, পাঁচজন জাপানি লেখকের একটি দলের একজন ছিলাম। আমরা ‘যুক্তরাষ্ট্র-জাপান নিরাপত্তা চুক্তি’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ছিলাম। পাঁচজনের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোট। আমাদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ দিতে অনেক দেরি করেছিলেন। রাত তখন প্রায় একটা যখন তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমাদেরকে একটি অন্ধকার বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। বাগানটি এত অন্ধকার ছিল যে আমাদের পাশেই ছিল একটি জুঁই ফুলগাছ যা আমরা দেখতে পাইনি। আমরা শুধু গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমাদের মধ্যে একজন কৌতুক করে বলেছিল, আমরা যদি জুঁই ফুলের ঘ্রাণ অনুসরণ করি তবে আমরা হয়তো মাওয়ের কাছে পৌঁছে যাব।

তিনি একজন চিত্তাকর্ষক মানুষ-গড়পড়তা এশিয়ানদের চাইতে অস্বাভাবিক বিশালদেহী একজন মানুষ। তাঁকে আমাদের কোনও প্রশ্ন জিজ্ঞাসার অনুমতি ছিল না এবং তিনি সরাসরি আমাদের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের মাধ্যমে কথা বলছিলেন। পুরোটা সময় তিনি তাঁর বই থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন। প্রতিটি শব্দ থেকে শব্দ। এটা খুব বিরক্তিকর ছিল। তাঁর কাছে প্রচুর সিগারেটের কৌটো ছিল এবং প্রচণ্ড ধূমপান করছিলেন। চৌ এন লাই কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে চেয়ারম্যান মাওয়ের কাছ থেকে ‘খুব মজারভাবে’ সিগারেটের কৌটোগুলো দূরে সরিয়ে রাখছিলেন, কিন্তু মাও হাত বাড়িয়ে সেগুলো আবার কাছে টেনে নিচ্ছিলেন।

পরের বছর আমি সার্ত্রের সাক্ষাৎকার নিই। এটা ছিল আমার প্যারিসে প্রথম ভ্রমণ। আমি Saint Germain des Prés-এর ছোট্ট একটি কক্ষ নিয়েছিলাম এবং বাইরে প্রথম যে আওয়াজটি আমি শুনতে পেয়েছিলাম তা ছিল বিক্ষোভকারীদের চিৎকার। তারা বলছিল ‘Paix en Algérie!!’ আলজেরিয়ার শান্তি। সার্ত্রে আমার জীবনের একজন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। মাওয়ের মতো তিনিও মূলত যে লেখাগুলো ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছেন সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করছিলেন। যেমন- Existentialism Is Humanism Ges Situations এবং ঝরঃঁধঃরড়হং থেকে উদ্ধৃতি করছিলেন। সুতরাং আমি তাঁর বলা কথা থেকে নোট নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কেবল বইয়ের শিরোনাম লিখে রাখলাম। এর সঙ্গে তিনি অবশ্যিÑজনগণকে পারমাণবিক যুদ্ধের বিরোধিতা করা উচিত এ রকম বলছিলেন। কিন্তু তিনি পারমাণবিক অস্ত্রধারী চীনকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। আমি যে-কারও পারমাণবিক অস্ত্র মজুতের তীব্র বিরোধিতা করি। কিন্তু আমি এই বিষয়টিতে সার্ত্রেকে একাত্ম করতে পারিনি। তিনি শুধু বার বার বলছিলেন- Next question।

সারাহ ফে : আপনি তো জাপান টেলিভিশনের জন্য কুর্ট ভনেগাট এর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

ওয়ে : হ্যাঁ, তিনি যখন ১৯৮৪ সালে PEN conference এ যোগ দিতে জাপানে এসেছিলেন। তবে সেটি আমার কাছে সাক্ষাৎকার গ্রহণের চাইতেও বেশি কিছু ছিল- আলাপচারিতায় দুজন লেখক। ভনেগাট একজন সিরিয়াস ধরনের চিন্তাবিদ। যিনি ‘ভনেগুটিয় রসিকতায়’ তার গভীর ধ্যানধারণাগুলোকে প্রকাশ করছিলেন। আমি তাঁর কাছ থেকে এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনও কিছু বের করতে পারিনি।

লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সুচিন্তিত মতামত পাওয়ার ক্ষেত্রে আমার অনেক সাফল্য রয়েছে। নোয়াম চমস্কি আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি কিশোর বালক তখন এক গ্রীষ্মকালীন শিবিরে একটি ঘোষণা এল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক-বোমা ফেলেছে এবং মিত্র বাহিনী বিজয় লাভ করবে। সেটা উদযাপন করতে সেখানকার লোকজন বনফায়ার আয়োজন করছিল। চমস্কি তখন সেখান থেকে বনের গভীরে দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং সন্ধ্যাবধি সেখানেই একাকী বসে থাকে। আমি সবসময় চমস্কিকে শ্রদ্ধা করি এবং তিনি আমাকে এ কথা বলার পর আমি তাঁকে আরও বেশি শ্রদ্ধা করি।

সারাহ ফে : তরুণ বয়সে আপনি নিজেকে একজন নৈরাজ্যবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আপনি কি এখনও নিজেকে সে রকমই একজন হিসেবে বিবেচনা করেন ?

ওয়ে : নীতিগতভাবে, আমি একজন নৈরাজ্যবাদী। কুর্ট ভনেগাট একবার বলেছিলেন, তিনি একজন অজ্ঞেয়বাদী কিন্তু তিনি যিশু খ্রিস্টকে সম্মান করেন। আমি একজন নৈরাজ্যবাদী, যে গণতন্ত্রকে ভালোবাসে।

সারাহ ফে : আপনার রাজনৈতিক সক্রিয়তা কি কখনও আপনাকে সমস্যায় ফেলেছে ?

ওয়ে : ‘ওকিনাওয়া নোটস’-এর জন্য আমার বিরুদ্ধে এখন মানহানি মামলা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হলো আণবিক বোমার ব্যবহার এবং ১৯৪৫ এর ওকিনাওয়া গণআত্মহুতি। আমি আণবিক বোমার ব্যবহার নিয়ে ‘Hiroshima Notes’ লিখেছিলাম এবং পরবর্তী ওকিনাওয়ার গণআত্মাহুতি নিয়ে ‘Okinawa Notes’ লিখেছিলাম। ওকিনাওয়া যুদ্ধের সময়, জাপানি সামরিক বাহিনী ওকিনাওয়া থেকে দূরে দু’টি ছোট্ট দ্বীপের মানুষকে আত্মহত্যা করার নির্দেশ দেয়। তারা তাদের বলেছিল, আমেরিকানরা এতটাই নিষ্ঠুর যে তারা মহিলাদেরকে ধর্ষণ করবে এবং পুরুষদের হত্যা করবে। তার চাইতে আমেরিকানরা পৌঁছানোর আগেই তাদের নিজেদেরকে নিজেরাই হত্যা করা ভালো। প্রতিটি পরিবারকে দুটো করে গ্রেনেড দেওয়া হয়েছিল। যেদিন আমেরিকানরা অবতরণ করে, সেদিন পাঁচ শতাধিক লোক নিজেরাই নিজেদেরকে হত্যা করে। দাদা পুত্রকে হত্যা করে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করে।

আমি দেখিয়েছি এই মৃত্যুর জন্য দ্বীপে অবস্থানরত প্রতিরক্ষা বাহিনীর নেতাই দায়ী। ‘Okinawa Notes’ প্রায় চল্লিশ বছর আগে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বছর দশেক আগে একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ইতিহাস পাঠ্যবই পরিমার্জনের, যাতে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জাপান কর্তৃক এশিয়ায় যে নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছিল তা মুছে ফেলা যায়। যেমন নানজিং গণহত্যা এবং ওকিনাওয়ার গণআত্মাহুতি। ওকিনাওয়ায় জাপানি যুদ্ধাপরাধ নিয়ে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে, তবে আমিই অল্প কয়েকজন লেখকের মধ্যে একজন, যার বই এখনও মুদ্রিত হচ্ছে। রক্ষণশীল দলটি একটি টার্গেট চেয়েছিল, এবং আমি সেই টার্গেটে পরিণত হয়েছি। সত্তরের দশকে যখন বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার তুলনায় বর্তমানে আমার বিরুদ্ধে ডানপন্থি আক্রমণ অনেক বেশি জাতীয়তাবাদী মনে হচ্ছে, যা সম্রাট-উপাসনা পুনরুত্থানের একটি অংশ। তাদের দাবি দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা সম্রাটের প্রতি ভক্তির নিদর্শনে দেশপ্রেমের এক সুন্দর শুদ্ধ অনুভূতির মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

সারাহ ফে : আপনি কি মনে করেন ১৯৪৪ এ ‘অর্ডার অফ কালচার’ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করা সম্রাট পূজার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিবাদ ছিল ?

ওয়ে : এটা কোথায় আমার শত্রু আছে এবং শব্দের মৌলিক অর্থেই যারা শত্রুÑতারা জাপানি সমাজ এবং সংস্কৃতির মধ্যে কী রূপ নিয়েছে, সে-সম্পর্কে আমার সচেতনতা সৃষ্টিতে বেশ ফলপ্রসূ হয়েছিল। অন্যান্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের দ্বারা ভবিষ্যতে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রটাও ছিল। কিন্তু এটি কার্যকর হয়নি।

সারাহ ফে : আপনি প্রায় একই সময়ে ‘Hiroshima Notes’ এবং আপনার উপন্যাস A Personal Matter প্রকাশ করেছিলেন। কোনটি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ?

ওয়ে : আমি মনে করি ‘Hiroshima Notes’ A Personal Matter এর চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কাজে করছে। নামেই বোঝা যায় A Personal Matter যা শুধু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু-যদিও তা ফিকশন। Hiroshima Notes এবং A Personal Matter লেখা ছিল আমার ক্যারিয়ারের শুরুর বিন্দু। লোকে বলে আমি একই বিষয় নিয়ে বার বার লিখে চলেছি- ছেলে হিকারি এবং হিরোশিমা। আমি একজন বিরক্তিকর ব্যক্তি। আমি প্রচুর সাহিত্য পড়ি, আমি অনেক কিছু নিয়েই ভাবি, তবে এসবের সবকিছুর মূলে থাকে আমার সন্তান হিকারি ও হিরোশিমা।

হিরোশিমা প্রসঙ্গে, আমি নিজেই জেনেছি, ১৯৪৫ এ শিকোকুতে ছোটবেলায় এর সম্পর্কে সব কিছু শুনে এবং এরপর আবার আণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার মাধ্যমে।

সারাহ ফে : আপনি কি আপনার উপন্যাসগুলোতে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা বলার চেষ্টা করছেন ?

ওয়ে : উপন্যাসে আমি বক্তৃতা দেওয়া বা পাঠ শেখানোর চেষ্টা করি না। তবে গণতন্ত্র নিয়ে আমার প্রবন্ধগুলোতে আমি নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি একজন ডেমোক্র্যাট হিসেবে লিখি। আমার লেখায় আমি অতীতকে বোঝার চেষ্টা করেছি : যুদ্ধ, গণতন্ত্র। পারমাণবিক অস্ত্রের ইস্যুটি আমার কাছে সব সময়ের একটি মৌলিক প্রশ্ন। স্পষ্টতই বলা যায়, পারমাণবিক বিরোধী আমাদের কার্যক্রম বর্তমানে বিদ্যমান সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করে। কিন্তু এর সামান্যতমও পরিবর্তন হয়নি-এবং আমি সেই আন্দোলনে একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে এর কোনও ফলাফল দেখি না। এটি অন্য কথায়, একটি আশাহীন আন্দোলন।

আমার ধারণাগুলো ষাটের দশক পর্যন্ত কোনও পরিবর্তন হয়নি। আমার পিতৃপ্রজন্ম আমাকে গণতন্ত্রের পক্ষে একজন নির্বোধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। আবার আমার সমসাময়িকেরা আমার নিষ্ক্রিয়তা এবং গণতন্ত্র সম্পর্কে আত্মতুষ্টি নিয়ে আমার সমালোচনা করত। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র বা উত্তরোত্তর সময়কাল সম্পর্কে সত্যই জানে না-যুদ্ধের পঁচিশ বছর পরেও। তাদের অবস্থাটা সেই রকম, টি এস এলিয়ট যেমন বলেছেন, ‘আমাকে বুড়োদের জ্ঞানের কথা শুনতে বলবেন না।’ এলিয়ট একজন শান্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু আমি নই-বা কমপক্ষে আমি এ রকম হবো আশা করি না।

সারাহ ফে : আপনার লেখার কারুকাজ সম্পর্কে কিছু বলবেন ?

ওয়ে : আমি সেই জাতীয় লেখক যে বার বার লিখে। আমি সবকিছু সঠিকভাবে করতে চাই। আপনি যদি আমার কোনও পাণ্ডুলিপি দেখেন তবে দেখতে পাবেন আমি অনেকবার পরিবর্তন করেছি। সুতরাং আমার সাহিত্যেকর্মের প্রধান একটি পদ্ধতি হলো ‘repetition with difference’। আমি যখন একটা নতুন লেখা শুরু করি তখন আমি ইতোমধ্যে লিখে ফেলেছি এমন অনুভূতি নিয়ে শুরু করি-আমি একই প্রতিপক্ষকে সামনে রেখে আরও একবার লড়াই করার চেষ্টা করি। তার ফলস্বরূপ একটি খসড়া করে ফেলি এবং এটিকে আরও বিশদভাবে বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই এবং এটি করার ফলে পুরোনো লেখার চিহ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি আমার সাহিত্যকর্মকে পুনরাবৃত্তির ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে তৈরি চেষ্টা করি।

আমি প্রায়ই বলতাম যে, লেখার এই সম্প্রসারণ, উন্নতি সাধন, একজন ঔপন্যাসিকের শেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এডওয়ার্ড সাইদ Musical Elaborations নামে একটি খুব ভালো বই লিখেছেন, যেখানে তিনি বাখ, বিথোভেন এবং ব্রাহ্মসের মতো দুর্দান্ত সুরকারদের সংগীতে বিস্তারের সঙ্গে এটাকে তুলনা করেছেন। সংযুক্তির মাধ্যমে এই সুরকাররা সংগীতের নতুন পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করেছেন।

সারাহ ফে : আপনি কীভাবে জানবেন যখন আপনি খুব বেশি সম্প্রসারিত করেছেন ?

ওয়ে : এটি একটি সমস্যা। আমি বিস্তৃত করতে থাকি এবং করতে থাকি এবং বছর বছর আমার পাঠক কমতে থাকে। আমার স্টাইলটি খুব কঠিন, খুব প্যাঁচানো এবং জটিল হয়ে উঠেছে। এটা আমার কাজের উন্নতি এবং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু পনেরো বছর আগে আমার মতো একজন ঔপন্যাসিকের জন্য ‘Elaboration’ সঠিক পদ্ধতি কি না তা নিয়ে গভীর সন্দেহের মুখোমুখি হয়েছিলাম।

মৌলিকভাবে একজন ভালো লেখকের লেখার স্টাইলের একটি নিজস্ব চেতনা রয়েছে। একটি প্রাকৃতিক, একটি গভীর সুর, এবং সেই সুরটি পাণ্ডুলিপির প্রথম খসড়া থেকেই উপস্থিত থাকে। যখন তিনি প্রাথমিক পাণ্ডুলিপিটির বিস্তার করতে থাকেন, তখন এটি সেই প্রাকৃতিক, গভীর কণ্ঠকে শক্তিশালী ও সরল করে চলে। ১৯৯৬-৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে পড়ানোর সময়, আমি মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিনের মূল পাণ্ডুলিপিটির একটি অনুলিপি দেখতে পেয়েছিলাম। আমি এক শ পৃষ্ঠা পড়লাম এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম প্রথম থেকেই টোয়েনের একটি স্টাইল ছিল। এমনকি যখন তিনি ভাঙা ইংরেজি লিখেছেন, তখনও এটির মধ্যে এক ধরনের মিউজিক আছে। যা এটাকে ধীরে ধীরে পরিস্ফুটন করেছে। সম্প্রসারণের এই পদ্ধতিটি স্বাভাবিকভাবেই একজন ভালো লেখকের কাছে চলে আসে। একজন ভালো লেখক সাধারণত তাঁর সুর নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না, তবে আমি সর্বদা আমারটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করতাম।

সারাহ ফে : কেন আপনি আপনার সুরটাকে ধ্বংস করতে চান ?

ওয়ে : আমি জাপানি ভাষায় নতুন একটি ‘লিটারেরি স্টাইল’ তৈরি করতে চেয়েছিলাম। আধুনিক জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস যেটা এক শ’ বিশ বছর আগে শুরু হয়েছিল, এর স্টাইলটি সম্প্রসারণের দিকে ঝোঁকেনি। আপনি যদি জাপানি লেখকদের যেমন তানিজাকি এবং কাওয়াবাতার দিকে নজর দেন তবে দেখবেন তাঁরা ক্লাসিক্যাল জাপানি সাহিত্যকে অনুসরণ করেছেন। তাদের স্টাইল ছিল জাপানি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ থেকে ধার করা, যেমন সংক্ষিপ্ত শ্লোকÑটানকা এবং হাইকুর ঐতিহ্যকে সামনে রেখে জাপানি গদ্যের নির্মাণ। আমি এই ট্র্যাডিশনকে শ্রদ্ধা করি, তবে আমি আলাদা কিছু লিখতে চেয়েছিলাম।

আমার বয়স যখন বাইশ, আমি আমার প্রথম উপন্যাসটি লিখলাম এবং তখন আমি ফরাসি সাহিত্যের ছাত্র। যদিও আমি জাপানি ভাষায় লিখছিলাম, কিন্তু আমি ফরাসি এবং ইংরেজি উপন্যাস, কবিতা যেমন-গ্যাসকার, সার্ত্রে, অডেন এবং এলিয়ট সম্পর্কে প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলাম। আমি ক্রমাগত জাপানি সাহিত্যেকে ফরাসি এবং ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করছিলাম। আমি আটঘণ্টা ফরাসি বা ইংরেজি পড়তাম এবং তারপর জাপানি ভাষায় দুই ঘণ্টা লিখতাম। আমি ভাবতাম, একজন ফরাসি লেখক কীভাবে এটিকে প্রকাশ করবেন ? একজন ইংরেজি ভাষার লেখক কীভাবে এটিকে প্রকাশ করবেন ? বিদেশি ভাষায় পড়া এবং তারপর জাপানি ভাষায় লেখার মাধ্যমে আমি একটি সেতু তৈরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এর ফলে আমার লেখাটি আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠল।

ষাট বছর বয়সে আমি ভাবতে শুরু করলাম- আমার পদ্ধতিটি ভুল হতে পারে, যেভাবে আমি ইমেজটি তৈরি করছি তাতে আমার ভুল হতে পারে। আমি কাগজে কোনও খালি জায়গা না থাকা পর্যন্ত বিশদভাবে বর্ণনা করি। তবে এখন দ্বিতীয় ধাপে রয়েছি : আমি যা লিখেছি তার একটি খুব সাধারণ, স্পষ্ট সংস্করণ আবার লিখি। আমি উভয় স্টাইলে লিখতে পারে এমন লেখকদের সম্মান করি- যেমন সেলিন (Louis-Ferdinand Céline), তাঁর যেমন একটি জটিল স্টাইল এবং একটি সরল স্টাইল রয়েছে।

আমি আমার ‘pseudo-couples’ ত্রয়ী : Changeling, The Child of the Sorrowful Countenance, Ges Goodbye, My Book, -এ এই নতুন স্টাইলটির অন্বেষণ করেছি। আমি একই স্বচ্ছ রীতিতে Rouse Up O Young Men of the New Age অমব! লিখেছি। তবে এটি অনেক অনেক পুরোনো ছোট গল্পগুলোর একটি সংগ্রহ। বইটিতে আমি আমার সত্যিকারের সুরটি শুনতে চেয়েছিলাম। তবে সমালোচকেরা এখনও আমার কঠিন বাক্য এবং জটিল কাঠামোর জন্য আমাকে আক্রমণ করেন।

সারাহ ফে : এটাকে pseudo-couple ত্রয়ী বলা হয় কেন ?

ওয়ে : একজন স্বামী ও তার স্ত্রী সত্যিকারের দম্পতি। কিন্তু আমি ছদ্ম-দম্পতিদের চিত্রিত করি। এমনকি আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে, আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাস Nip the Buds, Shoot the Kids-এ গল্পকথক এবং তার ছোট ভাই ছিলেন ছদ্ম-দম্পতি। আমার প্রায় সমস্ত রচনায় আমি অনুভব করি যে আমি এই প্রচলিত জুটিগুলোর বন্ধন এবং বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সেই চরিত্রগুলোকে ধারণ করতে পেরেছি।

সারাহ ফে : আপনার কয়েকটি উপন্যাসে, আপনি একটি ‘ইনটেকচুয়াল প্রজেক্ট’ অবলম্বন করেছেন-যেমন এমন একজন কবিকে নিয়ে পটভূমি তৈরি করেন যার লেখা আপনি মনোমুগ্ধকরভাবে পড়েন এবং তার বইয়ের সঙ্গে একীভূত হন। ‘In Rouse Up O Young Men of the New Age!’-এ (William) Blake, Somersault-এ (ওয়েলসের কবি) R.S. Thomas এবং An Echo of Heaven-এ (কোরিয়ার কবি) কিম চি-হা। এটা কী উদ্দেশ্য বহন করে ?

ওয়ে : আমার উপন্যাসগুলোতে থাকা আইডিয়াগুলো আমি সেই সময়ে পড়েছি এমন কবি ও দার্শনিকদের ধারণার সঙ্গে মিশে গেছে। এই পদ্ধতিটি আমাকে যে লেখকদেরকে আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি তাদের সম্পর্কে লোকদেরকে জানাতেও সক্ষম করেছে।

আমার বয়স যখন কুড়ি তখন আমার এক শিক্ষক কাজুও ওয়াতানাবে আমাকে বলেছিলেন, আমি যেহেতু একজন শিক্ষক অথবা সাহিত্যের অধ্যাপক হতে যাব না, তাই আমার নিজের জন্যই আমার নিজের পড়াশোনা করতে হবে। আমার দুটি চক্র রয়েছে : একটি পাঁচ বছরের চক্র, যা নির্দিষ্ট লেখক বা চিন্তাবিদকে কেন্দ্র করে; এবং অন্যটি নির্দিষ্ট থিমের ওপর তিন বছরের চক্র। আমি পঁচিশ বছর বয়স থেকেই এটি করে চলেছি। আমি তিন বছরের চক্রটিতে এক ডজনেরও বেশি সময় কাটিয়েছি। আমি যখন একটি থিমের ওপর কাজ করি, আমি প্রায়শই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই বিষয়ে পড়ি। আমি সেই লেখকের লেখা সমস্ত কিছুই এবং সেই লেখকের কাজের উপরে দেওয়া সমস্ত স্কলারশিপ বিষয়েও পড়েছি।

আমি যদি অন্য ভাষায় কিছু পড়ি, ধরুন এলিয়টের ‘Four Quartets’, আমি প্রথম তিন মাস একটি অনুচ্ছেদ ধরুন ‘East Coker’-এর মতো একটি অনুচ্ছেদ তিন মাস ধরে বার বার ইংরেজিতে পড়েছি যতক্ষণ না আমি এটিকে মুখস্থ করে ফেলেছি। তারপর আমি জাপানি ভাষায় একটি ভালো অনুবাদ খুঁজে বের করেছি এবং সেটাও মুখস্থ করে ফেলেছি। তারপর আমি দুটো ভাষার মধ্যে যাওয়া আসা করিÑইংরেজিতে মূল এবং জাপানি অনুবাদÑযতক্ষণ না আমি অনুভব করি যে ইংরেজি পাঠ, জাপানি পাঠ এবং আমার নিজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়েছে। এবং সেখান থেকে আমার ভিতরে এলিওটের উত্থান।

সারাহ ফে : এটা একটা আকর্ষণীয় ব্যাপার যে, আপনার পাঠচক্রের মধ্যে একাডেমিক স্কলারশিপ এবং সাহিত্যতত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমেরিকাতে, সাহিত্য সমালোচনা এবং সৃজনশীল লেখা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একচেটিয়া একটা অপরটার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

ওয়ে : আমি স্কলারদেরকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করি। যদিও তারা একটি সংকীর্ণ জায়গায় লড়াই করে, তারা নির্দিষ্ট লেখকদের লেখা পাঠ করার জন্য সত্যই সৃজনশীল উপায়গুলো খুঁজে বের করেন। একজন ঔপন্যাসিক যিনি বিস্তৃতভাবে চিন্তা করেন, এমন অন্তর্দৃষ্টি তাকে কোনও লেখকের কাজ বোঝার উত্তম উপায় বাতলে দেয় ।

আমি যখন ব্লেক বা ইয়েটস বা দান্তের ওপর স্কলারশিপ নিয়ে পড়েছি, তখন আমি সমস্ত কিছু পড়েছি এবং স্কলারদের মধ্যে পুঞ্জীভূত পার্থক্যগুলোর প্রতি মনোযোগ দিয়েছি। যেখানে আমি বেশি শিখতে পেরেছি। কয়েক বছর পর পর নতুন একজন স্কলার দান্তের ওপর একটি করে নতুন বই বের করেন এবং প্রতিটি স্কলারের নিজস্ব পদ্ধতি থাকে। আমি প্রতিটি স্কলারকে অনুসরণ করি এবং এক বছর ধরে সেভাবেই অধ্যয়ন করি। তারপর আমি অন্য এক স্কলারকে অনুসরণ করি প্রায় এক বছর, এবং আরও অনেক কিছু।

সারাহ ফে : আপনি কীভাবে ঠিক করেন কার উপরে পড়াশোনা করবেন ?

ওয়ে : মাঝে মাঝে আমি যা পড়ছি তা স্বাভাবিক নিয়মেই পড়ছি। উদাহরণস্বরূপ, ব্লেক আমাকে ইয়েটস-এ নিয়ে গেছে, যা আমাকে আবার দান্তে-তে নিয়ে গেছে। অনেক সময় এটি পুরোপুরি কাকতালীয় ঘটনার মতো। আমি একবার যুক্তরাজ্যে প্রচারমূলক সফরে ছিলাম, আমি ওয়েলসে থামলাম। সেখানে তিন দিন ছিলাম এবং পড়ার জন্য বই খুঁজতে লাগলাম। আমি একটি স্থানীয় বইয়ের দোকানে গিয়ে সেখানে কর্মরত এক ব্যক্তিকে ইংরেজিতে কিছু বই সুপারিশ করতে বললাম। তিনি ওই অঞ্চলের একজন কবির কবিতা সংগ্রহ করার পরামর্শ দিলেন, কিন্তু তিনি আমাকে এও বলে সতর্ক করলেন যে, বইটি খুব ভালো বিক্রি হচ্ছে না। কবি ছিলেন আর. এস. থমাস। আমি দোকানদারের কাছে থাকা থমাসের যা যা আছে সবগুলো কিনলাম। আমি যখন বইগুলো পড়ছিলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম তিনিই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি, যার লেখা আমি আমার সেই সময়ে পড়তে পারি। আমি অনুভব করলাম ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল রয়েছে, যদিও তারা দেখতে খুব আলাদা। উভয়ই ধর্মনিরপেক্ষ এবং রহস্যবাদিতার দ্বারপ্রান্ত সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। এবং তারপর থেকে আমি নিজে, থমাস এবং বেঞ্জামিনের মধ্যে ত্রিভুজাকার সম্পর্কের মধ্যে আছিÑভাবতে শুরু করি।

সারাহ ফে : তাহলে মনে হচ্ছে ভ্রমণ করার সময় আপনি বেশিরভাগ সময়ই আপনার হোটেল রুমে পড়ে সময় কাটান।

ওয়ে : হ্যাঁ এটা ঠিক। আমি কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখি। ভালো খাবারে আমার আগ্রহ নেই। আমি পান করতে পছন্দ করি তবে আমি বারে যেতে পছন্দ করি না কারণ আমি মারামারিতে জড়িয়ে পড়ি।

সারাহ ফে : কী নিয়ে আপনি মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন ?

ওয়ে : অন্তত জাপানে, যখনই আমি সম্রাট-পূজার দিকে ঝোঁকওয়ালা বুদ্ধিজীবীর মুখোমুখি হই আমি রেগে যাই। ওই ব্যক্তির প্রতি আমার আচরণ অনিবার্যভাবে তাকে বিরক্ত করে, তারপর লড়াই শুরু হয়। অবশ্যই, মারামারিগুলো তখনই ঘটে যখন আমি খুব বেশি পরিমাণে পান করে থাকি।

সারাহ ফে : আপনি কি জাপানের বাইরে ভ্রমণ উপভোগ করেন ?

ওয়ে : লেখাটি যেখানে লেখা হয়েছে সেখানে গিয়ে সেই লেখাটি পড়ার মতো ভালো অভিজ্ঞতা আর হয় না। সেন্ট পিটার্সবার্গে দস্তয়েভস্কি পড়া। ডাবলিনে বেকেট এবং জয়েস পড়া। বিশেষ করে ‘The Unnamable’ ডাবলিনে পড়তে হবে। অবশ্যই, বেকেট লিখেছিলেন বিদেশে, আয়ারল্যান্ডের বাইরে। আমি আজকাল যখনই ভ্রমণ করি, বেকেট ত্রয়ী সঙ্গে নিয়ে যাই যেটা শেষ হয় ‘The Unnameable’ দিয়ে। আমি এতে কখনও ক্লান্ত হই না।

সারাহ ফে : আপনি এখন কী পড়ছেন ?

ওয়ে : এই মুহূর্তে আমি ইয়েটসের শেষের দিকের কবিতাগুলো পড়ছি, যা ১৯২৯ এবং ১৯৩৯-এর মধ্যে রচিত হয়েছিল। ইয়েটস তিয়াত্তর বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। আমার বয়স এখন বাহাত্তর। সেই বয়সে তিনি কেমন ছিলেন তা সন্ধান করার চেষ্টা করছি। তার লেখা আমার একটি প্রিয় কবিতা আছে যা তিনি লিখেছিলেন একাত্তর বছর বয়সে ‘An Acre of Grass’। আমি বার বার পড়ি এবং এটা থেকে বিস্তার করার চেষ্টা করি। আমার পরবর্তী উপন্যাসটি একদল বৃদ্ধ পাগল মানুষ নিয়ে। যাদের মধ্যে থাকবে ঔপন্যাসিক এবং রাজনীতিবিদ যাদের চিন্তা-ভাবনায় পাগলামি থাকে।

ইয়েটস-এর একটি লাইন রয়েছে যা আমাকে আলোড়িত করে : ‘My temptation is quiet’। আমার জীবনে খুব বেশি বুনো প্রলোভন নেই, তবে ইয়েটস যেটাকে ‘একজন বৃদ্ধের উন্মাদনা’ বলেছেন তা আমার আছে। ইয়েটস এমন একজন ছিলেন না যিনি অদ্ভুত কোনও কিছু করেছেন, তবু জীবনের শেষের দিকে তিনি নীৎসে পুনরায় পড়া শুরু করেছিলেন। নিৎসে প্লেটোকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, প্রাচীন গ্রিসের যা কিছু আকর্ষণীয় তা পাগলামি অথবা উন্মাদনা থেকে এসেছে।

সুতরাং আগামীকাল আমি একজন ‘বৃদ্ধ লোকের উন্মাদনা’ এই ধারণাটি সম্পর্কে আরও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে নীৎসে পড়ার জন্য দু’ঘণ্টা সময় ব্যয় করব, এবং ইয়েটসের কথা ভাবতে ভাবতে আমি নীৎসে পড়ব।

সারাহ ফে : আপনার বর্ণনা ভঙ্গিটি এমন যেন বিশ্বকে আপনি কোনও লেখকের ত্রিশিরা কাচের মধ্য দিয়ে দেখছেন। আপনার পাঠকেরা কি আপনার মাধ্যমে বিশ্বকে দেখে থাকেন ?

ওয়ে : আমি যখন ইয়েটস বা অডেন বা আর এস থমাস সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত তখন আমি তাঁদের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দেখি, তবে আমি বিশ্বাস করি না যে আপনি কোনও ঔপন্যাসিকের ত্রিশিরা কাচের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে দেখতে পারবেন। একজন ঔপন্যাসিক সাধারণ। এটি আরও ধর্মনিরপেক্ষ অস্তিত্ব। ধর্মনিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। উইলিয়াম ব্লেক এবং ইয়েটসÑতারা অসাধারণ।

সারাহ ফে : আপনি কি হারুকি মুরাকামি এবং বানানা ইয়োশিমোতোর মতো লেখকদের আপনার প্রতিযোগী মনে করেন ?

ওয়ে : মুরাকামি স্বচ্ছ, সহজ জাপানি রীতিতে লেখেন। তাঁর লেখা বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়। বিশেষ করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং চীনে ব্যাপকভাবে তাঁর লেখা পড়া হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অঙ্গনে এমন একটি অবস্থান তৈরি করেছেন যা ইয়ুকিও মিশিমা এবং আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটা অবশ্যই জাপানি সাহিত্যের জন্য প্রথমবারের মতো ঘটেছে। আমার লেখাও পড়া হয়, তবে পিছনে ফিরে যদি দেখি তবে আমি নিশ্চিত নই যে আমি একটি দৃঢ় পাঠক শ্রেণি তৈরি করতে পেরেছি, এমনকি জাপানেও না। এটা কোনও প্রতিযোগিতা নয়, তবে আমিও আমার লেখাগুলো ইংরাজি, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায় অনূদিত হোক তা চাই এবং সেসব দেশে পাঠক সৃষ্টি করতে চাই। যদিও আমি অবশ্য সার্বজনীন পাঠক শ্রেণির জন্য লেখার চেষ্টা করি না, তবে আমি লোকদের কাছে আমার লেখা পৌঁছাতে চাই। সাহিত্য এবং আমার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে লোকদের বলতে চাই যা আমার মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যে আমি সারাজীবন সাহিত্য পড়েছি বলে নিজেকে মনে করি, যে-সব লেখকদের আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি আমি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আশা রাখি। আমার প্রথম পছন্দটি হলো এডওয়ার্ড সাইদ, বিশেষত তাঁর শেষের দিকের বইগুলোর জন্য। আমি সাঈদ সম্পর্কে ভাবছি। তাঁর ধারণাগুলো আমার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। সেগুলো আমাকে জাপানি ভাষায় নতুন এক্সপ্রেশন তৈরি করতে, জাপানি ভাষায় নতুন চিন্তাভাবনা তৈরি করতে সহায়তা করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও তাঁকে পছন্দ করি।

সারাহ ফে : মিশিমার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ?

ওয়ে : সে আমাকে ঘৃণা করত। যখন আমি Seventeen প্রকাশ করি তখন মিশিমা আমাকে একটি চিঠি লিখেছিল যে সে এটি খুব পছন্দ করেছে। যেহেতু এই গল্পটি একটি তরুণ ডানপন্থি ছাত্রের জীবনকে ঘিরে, মিশিমা সম্ভবত ভেবেছিল আমি শিন্তোবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং সম্রাট-উপাসনার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। আমি কখনওই সন্ত্রাসবাদের প্রশংসা করার ইচ্ছা করি না। আমি একটি যুবকের আচরণ বোঝার চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম যে সন্ত্রাসবাদী দলে যোগদানের জন্য বাড়ি এবং সমাজ থেকে পালিয়ে যায়। আমি এখনও এটি সম্পর্কে চিন্তা করছি।

তবে আরেকটি চিঠি যেটি তাঁর Collected Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে জানা যায় মিশিমা লিখেছে আমি তাঁকে অবাক করেছি কারণ আমি খুব জঘন্য। সাধারণত, কেউ এ ধরনের অবমাননাকর চিঠি প্রকাশ করে না। উদাহরণস্বরূপ, নাবোকভের চিঠিগুলো যা সরাসরি অবমাননাকর, ওই চিঠিগুলো উভয়পক্ষের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। তবে মিশিমা প্রকাশকদের ঈশ্বর ছিলেন এবং তিনি যা চাইতেন তা প্রকাশের অনুমতি পেতেন।

সারাহ ফে : এটা কি সত্য যে আপনি একবার মিশিমার স্ত্রীকে কোনও এক পার্টিতে ‘cunt’ বলে ডেকেছিলেন ?

ওয়ে : এটা মনগড়া উক্তি। জন ন্যাথান (আমার) ‘Teach Us to Outgrow Our Madness’-এর ভূমিকাতে এটি লিখেছে (Johnn Nathan জাপানি থেকে ইংরেজির অনুবাদক)। সে একজন তরুণ, বিতর্কিত লেখক হিসেবে আমার একটি চিত্র তৈরি করতে চেয়েছিল। মিশিমার সঙ্গে আমার দু’বার প্রকাশনা উৎসবের পার্টিতে দেখা হয়েছিল, সেখানে অ্যালকহল পরিবেশনের পরিচারিকা ছিল এবং কোনও লেখক কখনও তার স্ত্রীকে এমন পার্টিতে নিয়ে যেতেন না। মিশিমা সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় লেখক। জন নাথানের মতে, আমি শব্দটি নরম্যান মেলারের কাছ থেকে শিখেছি। তবে আমি এই শব্দটি ইতোমধ্যে জানতাম। আমি আমেরিকান জিআই-এর আশেপাশে বড় হয়েছি এবং এটি এমন একটি শব্দ ছিল যা তারা জাপানি মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করত। গর্বিত একজন মানুষ হিসাবে আমি কখনও এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করি না। তদুপরি আমি যদি কাউকে ঘৃণা করি তবে আমি তার স্ত্রীর সাথে কখনও বিরূপ আচরণ করব না। আমি সরাসরি সেই ব্যক্তিটিকে এটি বলতে পারি। আমি জন ন্যাথানকে এর জন্য ক্ষমা করিনি, যদিও আমি তাঁর এই বইটির অনুবাদ পছন্দ করি।

সারাহ ফে : ন্যাথান আপনার বেশ কয়েকটি বই অনুবাদ করেছেন। লেখকের স্টাইল কি অনুবাদ করা যায় ?

ওয়ে : আমি এখন পর্যন্ত প্রতিটি অনুবাদ পছন্দ করেছি। প্রতিটি অনুবাদকের আলাদা একটা সুর থাকে, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে তাঁরা আমার লেখাগুলো খুব ভালো করে পড়েছেন। আমি ন্যাথানের অনুবাদ পছন্দ করি তবে আমার রচনার ফরাসি অনুবাদগুলো সেরা।

সারাহ ফে : পাঠক হিসাবে আপনি এই ভাষাগুলো কতটা ভালো বুঝতে পারেন ?

ওয়ে : আমি একজন ভিনদেশি হিসেবে ফরাসি ও ইংরেজি পড়ি। ইতালীয় ভাষায় পড়তে আমার অনেক সময় লাগে, তবে আমি যখন এটি পড়ি তখন মনে হয় আমি লেখার মধ্যে যে ধ্বনি বা সুর সেটিকে বুঝতে পারছি। আমি যখন ইতালি সফর করি, তখন আমি একটি রেডিও সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম এবং সাক্ষাৎগ্রহীতা আমাকে দান্তে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি দান্তের ডিভাইন কমেডি এখনও বিশ্বকে বাঁচাতে পারে। সাক্ষাৎগ্রহীতা দাবি করেছিলেন যে, জাপানিরা কখনও দান্তের ভাষার সুরটা ধরতে পারে না। আমি বলেছিলাম, না, পুরোপুরি নয়, তবে আমি দান্তের স্বরধ্বনির কিছু দিক বুঝতে পারি। সাক্ষাৎগ্রহীতার মন খারাপ হয়ে গেল এবং বললেন যে না এটি সম্ভব না। তিনি আমাকে দান্তে আবৃত্তি করতে বললেন। আমি Purgatorio এর শুরু থেকে পনেরোটি লাইন আবৃত্তি করলাম। তিনি রেকর্ডিং বন্ধ করে বললেন, এটি ইতালীয় নয়, কিন্তু আমার ধারণা আপনি বিশ্বাস করেন যে এটি ইতালীয়।

সারাহ ফে : অনেক লেখক নির্জনে লেখালেখি করায় অভ্যস্ত, তবে আপনার বইয়ের কথক-যারা লেখক- বসার ঘরে সোফায় শুয়ে বসে পড়েন, লেখেন। আপনি কি আপনার পরিবারের মধ্যে থেকেই লেখালেখি করেন ?

ওয়ে : লেখার জন্য আমাকে একাকী হওয়ার দরকার হয় না। যখন উপন্যাস লিখি বা পড়ি তখন আমার নিজেকে আলাদা করা বা পরিবার থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন অনুভব করি না। সাধারণত আমি আমার বসার ঘরেই লেখালেখি করি, হিকারি গান শোনে। আমি হিকারি ও আমার স্ত্রীর উপস্থিতিতেই লেখালেখি করতে পারি কারণ আমি বহুবার সংশোধন করি। উপন্যাস সর্বদাই অসম্পূর্ণ এবং আমি জানি আমি এটি পুরোপুরি সংশোধন করব। আমি যখন প্রথম খসড়াটি লিখি তখন আমার নিজের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই লেখা আসে, জবরদস্তি দ্বারা লিখতে হয় না। আমি যখন সংশোধন করি, আমি ইতোমধ্যে লেখার সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করেছি, তাই আমাকে একা থাকতে হয় না।

আমার দ্বিতীয়তলায় একটি স্টাডি রুম আছে, কিন্তু আমি সেখানে খুব কমই লেখালেখি করি। আমি সেখানে লিখি যখন একটি উপন্যাস লেখার কাজটি শেষ করছি যখন সংশোধনে মনোসংযোগ করা প্রয়োজনÑযা অন্যের কাছে উপদ্রব হতে পারে।

সারাহ ফে : একটি প্রবন্ধে আপনি লিখেছিলেন কেবল তিন প্রকারের লোকের সঙ্গে কথা বলা আকর্ষণীয় : যে ব্যক্তি অনেক কিছু সম্পর্কে দুর্দান্ত জ্ঞান রাখেন, এমন ব্যক্তি যিনি কোনও নতুন জায়গা থেকে এসেছেন এবং এমন কোনও ব্যক্তি যিনি জীবনে অদ্ভুত বা ভীতিজনক কোনও অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। আপনি কোনটি ?

ওয়ে : আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু-অসামান্য সমালোচক-একবার বলেছিল আমার সঙ্গে নাকি কথা বলা যায় না। সে বলেছিল, ওয়ে কারুর কথা মন দিয়ে শোনে না, কেবল তাঁর মাথায় যা আছে তাই বলে। আমি মনে করি না যে, আমি কারও কথা শুনতে আগ্রহী নই। আমি অনেক দুর্দান্ত জিনিস দেখিনি। আমি অনেক নতুন জায়গায় যাইনি। আমার অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়নি। তবে আমি অনেক ছোট ছোট বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমি সেসব অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখি এবং সেগুলো সংশোধন করি এবং রিভিশনের পর রিভিশন দিয়ে সেগুলো থেকে পুনরায় অভিজ্ঞতা লাভ করি।

সারাহ ফে : আপনার বেশিরভাগ উপন্যাস আপনার ব্যক্তিজীবনের ওপর ভিত্তি করে। আপনি কি আপনার উপন্যাসগুলো জাপানি আই-নভেল (I-novel) ঐতিহ্যের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন ?

ওয়ে : I-novel ঐতিহ্যে কিছু দুর্দান্ত কাজ রয়েছে। Homei Iwano নামের একজন লেখক উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লিখতেন, তিনি আমার প্রিয় লেখকদের একজন। তিনি একটি বাক্য ব্যবহার করেছিলেন-‘ hopeless brute courage’। কিন্তু ও-হড়াবষ বলতে এমন উপন্যাস যেখানে লেখকের দৈনন্দিন জীবনের কোনও অস্বাভাবিক বা বিশেষ ঘটনা-সুনামি, ভূমিকম্প, মায়ের মৃত্যু, স্বামীর মৃত্যুর দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়-তখন কী ঘটে তার ওপর ভিত্তি করে। এ ধরনের উপন্যাসে কখনও সমাজে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় না। আমার লেখা আমার ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে শুরু হয় কিন্তু আমি সামাজিক সমস্যাগুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করি।

ডিকেন্স এবং বালজাক বিশ্ব সম্পর্কে লিখেছেন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে। তাঁরা উদার মনমানসিকতায় লিখেছেন। আমি যেহেতু নিজেকে দিয়েই বিশ্ব সম্পর্কে লিখি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো একটি গল্প কীভাবে বর্ণনা করা যাবে, কীভাবে একটি সুর খুঁজে পাওয়া যায়। তারপর চরিত্র আসে।

সারাহ ফে : আপনার সমস্ত উপন্যাসেই কি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে ?

ওয়ে : আমি কীভাবে নির্দিষ্ট একটি চরিত্র তৈরি করব সে সম্পর্কে পূর্ব নির্ধারিত ধারণা নিয়ে কোনও উপন্যাস লেখা শুরু করি না। আমার কাছে এটা হচ্ছে কীভাবে কোনও চরিত্রকে সম্প্রসারণ ঘটাব। বার বার পরিমার্জনা এবং প্রসারণের প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে নতুন চরিত্র এবং পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়। এটি বাস্তব জীবন থেকে একেবারে আলাদা। এভাবেই চরিত্রগুলো বিকশিত হয় এবং গল্পটি নিজেই বেড়ে ওঠে।

তারপরও আমার সমস্ত উপন্যাস কোনও না কোনওভাবে আমার নিজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, আমি একজন যুবক হিসেবে কী ভেবেছি, একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ হিসেবে যার একটি প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে এবং একজন বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে। আমি নাম-পুরুষের বিপরীতে উত্তম পুরুষে শৈলীটি তৈরি করেছি। এটা একটা সমস্যা সত্যিই একজন ভালো ঔপন্যাসিক নাম-পুরুষে লিখতে অবশ্যই সক্ষম, তবে আমি নাম পুরুষে কখনও ভালো লিখতে পারিনি। সেই অর্থে আমি একজন অপেশাদার ঔপন্যাসিক। যদিও আমি অতীতে নাম-পুরুষে লিখেছি, চরিত্রটি সবসময় কোনও না কোনওভাবে আমাকেই মেলে ধরেছে। কারণটি হলো চরিত্রটির মাধ্যমে আমি আমার অন্তরাত্মার বাস্তবতাকেই চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি।

উদাহরণস্বরূপ, ‘Aghwee the Sky Monster’-তে (আকাশের দানব আগুই) হিকারি জন্মগ্রহণ করার সময় আমি যে অবস্থায় ছিলাম তার মতো একজনের সম্পর্কে লিখেছিলাম কিন্তু যিনি আমার থেকে আলাদা সিদ্ধান্ত নেন। আগুইয়ের বাবা তার বিকৃত শিশুকে বাঁচতে সাহায্য করেন না। A Personal Matter-এ, প্রধান চরিত্র – PwiÎ – Bird, যে সন্তানের সঙ্গে থাকাটাকেই বেছে নেন। এগুলো প্রায় একই সময়ে লেখা হয়েছিল। আগুইয়ের বাবা এবং বার্ড উভয়ের ক্রিয়া সম্পর্কে লিখে আমি বার্ডের মতো আমার জীবন চালিয়েছি। আমি সচেতনভাবে এটা করিনি, পরে বুঝতে পারলাম সেটাই আমি করেছি।

সারাহ ফে : হিকারি প্রায়শই আপনার উপন্যাসগুলোর একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়।

ওয়ে : আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে চল্লিশ বছর ধরে বেঁচে আছি। তার সম্পর্কে লেখা আমার সাহিত্যিক অভিব্যক্তির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে কীভাবে সে নিজেকে উপলব্ধি করে এবং কতটা কঠিন তা বোঝাতে আমি তাকে নিয়ে লিখেছি। যখন সে খুব ছোট, সে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে-তার মানবিক আচরণÑসঙ্গীতের মাধ্যমে সে প্রকাশ করতে শুরু করে। এক সময় সে তার কিছু ধারণা যেমন দুঃখের ‍অনুভূতি তা সে মিউজিকের মাধ্যমে প্রকাশ করে। সে আত্ম-উপলব্ধি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছিল। সেই পথেই সে চলতে থাকে।

সারাহ ফে : আপনি একবার বলেছিলেন সে আক্ষরিকভাবে যা বোঝায় আপনি তা লিখেন, কিন্তু আপনি সেটা অন্য ধাঁচে প্রকাশ করেন।

ওয়ে : হিকারি যে শব্দগুলো বলত আমি সেগুলো ঠিক সেভাবেই অনুলিপি করতাম। আমি যা যুক্ত করি তা হলো প্রসঙ্গ এবং পরিস্থিতি এবং অন্যরা কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানায়। এই প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে হিকারির শব্দগুলো আরও বোধগম্য হয়। আমি তার কথাগুলো বোঝার জন্য কখনওই তাকে পুনরায় আদেশ করি না।

সারাহ ফে : আপনার উপন্যাসগুলোতে হিকারি সম্পর্কে আপনি অনেক বেশি লিখেছেন সে সম্পর্কে আপনার অন্য সন্তানেরা কীভাবে ?

ওয়ে : আমি আমার আরেকটি ছেলে ও-চান এবং মেয়ে নাতসুমিকো সম্পর্কেও লিখেছি। হিকারি সম্পর্কে আমি যা লিখি তা কেবল নাতসুমিকোই পড়ে। সে ব্যাপারে আমাকে খুব যত্নবান হতে হয় অন্যথায় সে আমাকে বলবে যে, হিকারি তো এমন বলে না।

সারাহ ফে : আপনি কেন তাদের নাম বিশেষ করে হিকারির আসল নাম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ?

ওয়ে : প্রথমদিকে, আমি তার নাম ব্যবহার করিনি। আমি আমার উপন্যাসগুলোতে তাকে ইয়োর (Eeyore) নামে লিখতাম, কিন্তু বাস্তব জীবনে আমি তাকে পূহ (Winne-the-Pooh)  বলে ডাকি।

সারাহ ফে : কেন ?

ওয়ে : Winnie-the-Pooh’র কারণেই আমার স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ে হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে Winnie-the-Pooh এর অনুবাদ প্রকাশ করেছিল Iwanami Shoten, একজন বিশাল মাপের প্রকাশক। মাত্র কয়েক হাজার কপি। হাইস্কুলে আমার সাথে আমার স্ত্রীর ভাই জুজো ইতামি পড়ত। তার সঙ্গে আমার সখ্য ছিল। একবার তার মা আমাকে ‘The House at Pooh Corner’-এর একটি কপি খুঁজে আনতে বলেছিলেন। তিনি যুদ্ধের সময় এটি পড়েছিলেন কিন্তু তা হারিয়ে ফেলেছেন। আমি তখন টোকিওর পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ছিলাম এবং Winnie-the-Pooh এবং The House at Pooh Corner বই দুটো পেয়ে যাই। আমি একটি কপি ওনার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসি, এবং ওনার মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি তাকে চিঠিপত্র লিখতাম। এভাবেই শুরু হয়েছিল।

আমি আসলে পুহ কে একটি চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করিনি। ইয়োর আমার কাছে আরও অনেক বেশি কিছু।

সারাহ ফে : আপনি যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন আপনার পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাল ?

ওয়ে : আমার সম্পর্কে আমার পরিবারের মূল্যায়নের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আমি তখন পড়ছিলাম। হিকারি মিউজিক শুনছিল। আমার অন্য ছেলে, যে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির ছাত্র এবং আমার মেয়ে, সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, তারা তখন ডাইনিং টেবিলে। তারা আমার নোবেল জয়ের ব্যাপারে কোনও দিন আশা করেনি। রাত পৌনে নয়টার দিকে একটি ফোন কল এল। হিকারি ফোনটি ধরল, ফোনের উত্তর দেওয়া তার অন্যতম শখ। হ্যালো, কেমন আছেন ? পুরোপুরি ফরাসি, জার্মান, রাশিয়ান, চীনা এবং কোরিয়ান ভাষায়। সে ফোনটির উত্তর দিয়ে ইংরেজিতে বলল, নো, এবং আবার, নো। এরপর হিকারি ফোনটি আমাকে দিল। যিনি ফোনটি করেছেন তিনি হলেন সুইডিশ একাডেমি নোবেল কমিটির একজন সদস্য। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি কেনজাবুরো ? আমি তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম হিকারি কি আমার পক্ষে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমি তাকে বললাম, আমি দুঃখিত। আমি তাকে জানিয়ে দিলাম আমি এটা গ্রহণ করতে সম্মতি জ্ঞাপন করছি। আমি ফোনটি নিচে রাখলাম, চেয়ারে ফিরে এলাম, বসলাম এবং আমার পরিবারের সবাইকে জানালাম, আমি এটা জিতেছি। আমার স্ত্রী বললেন, ঠিক তো ?

সারাহ ফে : তিনি কি শুধু এটাই বললেন ?

ওয়ে : হ্যাঁ, এবং আমার দুই সন্তান তারা কিছুই বলল না। তারা চুপচাপ তাদের ঘরে চলে গেল। হিকারি গান শুনতে থাকল। আমি তার সঙ্গে নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে আর কখনও কথা বলিনি।

সারাহ ফে : আপনি কি তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে হতাশ হলেন ?

ওয়ে : আমি আবার পড়ায় ফিরে গেলাম, কিন্তু ভাবলাম অন্য সব পরিবারেও কি এরকমই প্রতিক্রিয়া হবে। তারপরে ফোনটি আবার বাজতে লাগল। পাঁচ ঘণ্টা একটানা। আমি যাদের চিনতাম। আমি যাদের চিনি না এমন লোকেরাও। আমার বাচ্চারা চাইছিল যেন সাংবাদিকেরা চলে যায়। আমি তাদের প্রাইভেসির জন্য একটা পর্দা টেনে দিলাম।

সারাহ ফে : এই পুরস্কার জয়ের বিষয়টির কোনও খারাপ দিক কী ছিল ?

ওয়ে : এটি জয়ের বিষয়ে বিশেষভাবে নেতিবাচক কিছু ছিল নাÑআবার জয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ইতিবাচকও কিছু ছিল না। নোবেল জেতার পর, সাংবাদিকেরা আমার বাড়ির বাইরে প্রায় তিন বছর ধরে জড়ো হতো। জাপানি সংবাদমাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির প্রতিযোগিতাটাকে বেশি মূল্যায়িত করার প্রবণতা রয়েছে। এমনকি, যারা আমার সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করেননি বা যারা আমার রাজনীতির বিরোধিতা করতেন তারাও আমাকে যখন পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছিল তখন থেকেই আমার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন।

নোবেল পুরস্কার একজন লেখকের সাহিত্যকর্মের কাছে প্রায় অর্থহীন, তবে এটা একজনের সামাজিক স্ট্যাটাসের প্রোফাইলকে উচ্চকিত করে। কেউ এমন এক ধরনের অর্থ উপার্জন করে যা আরও বিস্তৃত পরিসরে ব্যবহার করতে পারে। তবে লেখকের জন্য কিছুরই পরিবর্তন হয় না। আমার নিজ সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামতের কোনও পরিবর্তন হয়নি। অল্প কিছুসংখ্যক লেখকই আছেন যারা নোবেল পুরস্কার জয়ের পরে আরও ভালো লেখা লিখতে সচেষ্ট হন। টমাস মান একজন। ফকনারও।

সারাহ ফে : হিকারির যখন জন্ম হয়, আপনি ইতোমধ্যে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক। আপনি এবং আপনার স্ত্রীকে গ্ল্যামারাস দম্পতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আপনি কি কখনও চিন্তা করেছিলেন যে, হিকারির জন্ম আপনার জীবন থেকে আপনার ক্যারিয়ারটিকে ছিনিয়ে নেবে ?

ওয়ে : আমার বয়স তখন আটাশ। এর পাঁচ বছর পর আমি জাপানের সম্মানজনক আকুতাগাওয়া পুরস্কার অর্জন করি। তবে আমি প্রতিবন্ধী বাচ্চার পিতা হওয়ার ব্যাপারে ভয় পাইনি এবং লজ্জাও পাইনি। আমার উপন্যাস অ্যা পার্সোনাল ম্যাটারে বার্ড চরিত্রটি প্রতিবন্ধী শিশুর সঙ্গে সে বেঁচে থাকতে অস্বস্তিতে ছিলÑযা প্লট লাইনের জন্য প্রয়োজনীয়Ñতবে আমি এ সম্পর্কে কোনও উদ্বেগ অনুভব করিনি। আমি আমার ভাগ্যকে বেছে নিয়েছি, যেমন হাকলবেরি ফিন।

সারাহ ফে : হিকারির জন্মের ঠিক পরে আপনি নিশ্চিত ছিলেন না যে সে বেঁচে থাকবে।

ওয়ে : ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন যে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। আমার মনে হয়েছিল সে শীঘ্রই মারা যাবে। হিকারির জন্মের কয়েক সপ্তাহ পর আমি হিরোশিমা ভ্রমণে গিয়েছি। আমি দেখতে পেলাম আণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ লণ্ঠনের গায়ে এমন একজনের নাম লিখে যে মারা গিয়েছে এবং তারপর তারা এটি নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তারা দেখত প্রদীপটি ভাসতে ভাসেত নদীর ওপারে চলে গেছে। তারা মনে করত মৃতের আত্মা অন্ধকারে চলে গেছে। আমি এতে অংশ নিয়েছিলাম। আমি হিকারির নাম একটি লণ্ঠনের গায়ে লিখেছিলাম কারণ সে তাদের মতোই একজন, আমি ভেবেছিলাম সে খুব শীঘ্রই মারা যাবে। তখন আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছা ছিল না।

পরে আমি আমার এক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘটনাটি বলি, তার কন্যা হিরোশিমায় বোমা হামলার সময় মারা গিয়েছিল। তিনি বললেন, আপনার মতো মানুষের এমন সংবেদনশীল কিছু করা উচিত হয়নি। আপনার লেখা চালিয়ে যেতে হবে। এরপর, আমি সম্মত হলাম যে আমি যা করেছি তা খুব খারাপ সংবেদনশীলতা থেকে করেছি। পরে আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছি।

সারাহ ফে : সংবেদনশীলতা বলতে কী বোঝাচ্ছেন ?

ওয়ে : এর সেরা সংজ্ঞাটি ফ্ল্যানারি ও’কনর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, সংবেদনশীলতা এমন একটি মনোভাব যা কখনও বাস্তবতার মুখোমুখি হয় না। প্রতিবন্ধীদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করার জন্য, তিনি বলেছিলেন, এমন মনোভাবটা তাদেরকে আড়াল করে রাখার মতোই। তিনি এই ধরনের ক্ষতিকারক সেন্টিমেন্টালিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি প্রতিবন্ধীদের নির্মূল করার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

সারাহ ফে : আপনার Rouse Up উপন্যাসের একটি পর্ব রয়েছে যেখানে একজন ডানপন্থি শিক্ষার্থী গল্পকথকের প্রতিবন্ধী পুত্রকে অপহরণ করে এবং পরে তাকে রেল স্টেশনে ফেলে রেখে চলে যায়। এ রকম কিছু কি সত্যি কখনও ঘটেছিল ?

ওয়ে : সেই সময়ে তরুণ শিক্ষার্থীরা তাদের দুর্দশার কথা না-লিখে নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানের কথাই শুধু ভাবছে, এ রকম মনে করে আমার সমালোচনা করেছিল। তারা বলেছিল যে আমি আমার নিজের সন্তানের প্রতি খুব আগ্রহী, সমাজ সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহী নই। তারা আমার সন্তানকে অপহরণ করার হুমকি দিয়েছিল, অবশ্য তারা কখনও তা করেনি। এই উপন্যাসটির ওই পর্বটি এক অর্থে সত্য : একবার, হিকারি টোকিও স্টেশনে হারিয়ে গিয়েছিল এবং আমি তাকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে সন্ধান করেছিলাম।

সারাহ ফে : যৌনতা সম্পর্কে হিকারির ধারণা কী, তা নিয়ে লেখা কি মুশকিল ? Rouse Up O Young Men of the New Age! এবং A Quiet Life এ গল্পকথক তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিজের যৌন আবিষ্টতা বা চিন্তাভাবনার কথা বলতে অসুবিধা বোধ করতেন।

ওয়ে : যা কিছু হোক হিকারির যৌন আগ্রহ নেই। টিভিতে যখন আংশিক নগ্ন মহিলাও দেখে তখন সে চোখ বন্ধ করে। টিভিতে একজন টাকওয়ালা পিয়ানোবাদক একদিন পিয়ানো বাজাচ্ছিলেন। হিকারির কাছে হয়ত নগ্নতা এবং টাকের মধ্যে কিছু একটা সংযোগ আছে মনে হতোÑতাই সে তার পিয়ানো বাদন দেখত না। যৌনতা সম্পর্কে এটিই তার একমাত্র প্রতিক্রিয়া। আপনি হয়ত বলতে পারেন যে সে এই ব্যাপারটির প্রতি সংবেদনশীল। তবে বেশিরভাগ লোকেরা যা ভাবে, তা থেকে তার ভাবনা আলাদা। (হিকারিকেÑসেই টাকওয়ালা পিয়ানো বাদকের কথা মনে আছে তোমার ?)

সারাহ ফে : -ক্রিস্টফ এসেনবাচ

ওয়ে : একজন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক এবং কন্ডাক্টর। তাঁর অ্যালবাম-কভারে তার ঘন কালো চুলের ছবি রয়েছে। সম্প্রতি তিনি জাপান সফর করেছিলেন। মনে হলো এখন তার সম্পূর্ণ টাক পড়ে গেছে। আমরা তাকে টিভিতে দেখলাম। হিকারি তার নগ্ন মাথার দিকে তাকালো না। আমাকে টিভি স্ক্রিনের উপরে ক্রিসটোফের সিডি কভারটিকে টেপ দিয়ে আটকে দিতে হয়েছিল যাতে হিকারি অনুষ্ঠানটি দেখে।

সারাহ ফে : কেন আপনি আপনার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হিসেবে হিকারিকে অন্তর্ভুক্ত করা বন্ধ করে দিলেন ?

ওয়ে : প্রায় দশ বছর আগে আমি হিকারি সম্পর্কে সহজভাবে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু সে সব সময় আমার লেখায় হাজির হয়। সে হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছোটখাটো চরিত্র। হিকারি যেমন সর্বদা আমার জীবনের একটি অংশ, তেমনি আমি চাই প্রতিবন্ধী মানুষেরাও সবসময় আমার কথাসাহিত্যে উপস্থিত থাক। কিন্তু উপন্যাস হলো একটি এক্সপেরিমেন্ট এর জায়গাÑযেহেতু দস্তয়েভস্কি রাসকোলনিকভের চরিত্রটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। ঔপন্যাসিক বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে খেলছেনÑএসব পরিস্থিতিতে চরিত্রগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে ? আমি আর হিকারিকে দিয়ে তা করি না। যেহেতু আমি তার সঙ্গেই থাকি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে সে আমার জীবনের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে, গবেষণার পাত্র হিসেবে নয়। সে আমার বাস্তবতার একটি অংশ। আমি সবসময় ভাবি যে সে কীভাবে এই সত্যাটি গ্রহণ করবে যে আমি বৃদ্ধ হচ্ছি।

প্রায় পাঁচ বা ছ’বছর আগে, আমি অবসাদগ্রস্ততায় পতিত হই। প্রতি দুই বা তিন বছর পর পর এটাতে ভুগিÑ এর কারণ সাধারণত আমি পারমাণবিক অস্ত্র বা ওকিনাওয়া বা আমার প্রজন্মের কারও মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন হই বা যদি মনে হয় যে আমার উপন্যাসগুলোর আর প্রয়োজন নেই। আমি প্রতিদিন একই সিডি শুনতে শুনতে এটি কাটিয়ে উঠি। গত বছর, আমি আমার এই অভিজ্ঞতাটিকে উপন্যাসে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। আমি স্মরণ করি বিথোভেনের পিয়ানো ৩২নং সোনাটা। কিন্তু কে এটি বাজিয়েছে আমি তা মনে করতে পারছি না। আমাদের অনেক সিডি রয়েছে। আমি যখন হিকারিকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি কোন্ শিল্পীর বাজানো শুনছি, তখন সে মনে করিয়ে দেয় : ফ্রেডরিখ গুলদা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ১৯৬৭ ? হিকারি বলল, ’৫৮।

আমি মনে করি, আমার জীবনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পড়ার জন্য নিবেদিত, এক তৃতীয়াংশ উপন্যাস রচনায়, এবং তৃতীয়াংশ হিকারির সঙ্গে জীবনযাপনে।

সারাহ ফে : আপনার লেখার সময়সূচি কি ধরনের ?

ওয়ে : যখন আমি উপন্যাস লেখা শুরু করি, এটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি প্রতিদিনই লিখি। সাধারণত আমি সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠি এবং প্রায় এগারটা পর্যন্ত লিখি। আমি প্রাতঃরাশ খাই না। আমি শুধু এক গ্লাস জল পান করি। আমি মনে করি এটি লেখার জন্য সঠিক।

সারাহ ফে : আপনি কি লেখালেখিকে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে তুলনা করেন ?

‍ওয়ে : ফরাসি ভাষায় লেখার কাজটিকে বেদনাদায়ক বলা হয়। দুর্দান্ত প্রচেষ্টা এবং সংগ্রাম। এবং বেদনাসহ সেই প্রচেষ্টাটির ফলাফল। প্রাউস্ট যেমন বলেছেন তাঁর লেখালেখির বেদনাদায়ক প্রচেষ্টার ফসল Remembrance of Things Past । তবে আমার ধারণা এমন নয়। আমি মনে করি লেখার প্রথম খসড়াটি একটি খুব উপভোগ্য প্রক্রিয়া, কিন্তু আমি এটি পুরোপুরি সংশোধন করি। এটাতে শ্রম লাগে, কিন্তু কাজ শেষ করাও উপভোগযোগ্য।

সারাহ ফে : আপনি বলেছিলেন যে আপনার উপন্যাসগুলো হলো আপনি যেই বনভূমিময় গ্রামটিতে বেড়ে উঠেছেন সেখানে ফিরে যাওয়ার একটি উপায়।

ওয়ে : দু’টো ওভারল্যাপ করা-আমার কাল্পনিক বন এবং আমার বাল্যকালীন গ্রাম। আমি আমার শৈশব নিয়ে অনেকবার লিখেছি। বাস্তব এবং কল্পনা সব মিলেমিশে।

এক সময় বন জঙ্গলে আমি গাছের স্কেচ আঁকতাম এবং তাদের নাম জানার চেষ্টা করতাম। একবার আমার ভীষণ ঠাণ্ডা লাগল, আমি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লাম। মনে হলো না যে আমি আর বেশিদিন বাঁচব। আমি কি মরে যাব ? মাকে জিজ্ঞাসা করলাম। আমার মা আমাকে বলল, তুমি যদি মারা যাও, আমি তোমাকে আবার জন্ম দেব। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সে কি একজন আলাদা শিশু হবে না ? তিনি বললেন, তুমি যে বইগুলো পড়েছ এবং যা কিছু তুমি জানো তার সবকিছুই আমি সেই শিশুকে শিখিয়ে দেব।

সারাহ ফে : আপনার বাবার সম্পর্কে কিছু বলুন।

ওয়ে : তাঁর সম্পর্কে আমার খুব অল্পই মনে আছে। তিনি একা একা ভাবতেনÑবিচ্ছিন্নতায়। তিনি রহস্যময় ছিলেন। তিনি কখনও আমাদের সঙ্গে বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। টেক্সটাইল নিয়ে কাজ করতেন এবং পড়তেন। তিনি কখনও গ্রামবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন না।

আমরা শিকোকু পাহাড়ে থাকতাম। প্রতিবেশি গ্রাম, একদিনের হাঁটা পথ। আমি শুনেছি আমার বাবা এমন এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতেন, যিনি চীনা সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ, তিনি পাহাড়ের অপর পারে বাস করতেন। আমার মা বলেছিলেন, আমার বাবা প্রতি বছর দু’বার তাঁকে দেখতে যেতেন।

সারাহ ফে : আপনার মা এবং দাদিমা আপনাদের গ্রামে কি কোনও শিন্তো মন্দিরে যেতেন ?

ওয়ে : মন্দিরটি, একটি তাওবাদী মন্দিরÑএটা অনেক পুরোনো লোকসাংস্কৃতিক। শিন্তোর চেয়ে পৃথিবীতে আরও অনেক আগে এসেছে। অন্যদিকে আমার বাবা একজন খাঁটি শিন্তো চিন্তাবিদ ছিলেন। জাপান শিন্তো জাতি হিসেবে বিবেচিত, তবে এটি এখনও সম্রাটের সঙ্গে আবদ্ধ। আমার বয়স যখন ছয় বছর তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করি। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় তখন আমার বয়স দশ বছর। ওই বছরগুলোতে আমার খুব জাতীয়তাবাদী শিক্ষা হয়। শিন্তোবাদের সঙ্গে জড়িত জাতীয়তাবাদ। সম্রাটের উপাসনা এবং সামরিকতন্ত্রের সঙ্গে যোগসূত্র। আমাদের শেখানো হয়েছিল সম্রাট একজন ঈশ্বর এবং সম্রাটের জন্য আমাদের জীবন দেওয়া উচিত। আমরা সেটা বিশ্বাস করেছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়া অবধি।

এখনও, জাপানি সংস্কৃতির গোড়ায় রয়েছে শিন্তো। শিন্তো একটি সাধারণ বিশ্বাস যা প্রতিদিনের সঙ্গে আবদ্ধ। এখানে কোনও প্রশ্ন নেই, কোনও ধর্মতত্ত্ব নেই। যারা এ থেকে সরে যেতে চান তারা বৌদ্ধধর্ম বা খ্রিস্টধর্মের অনুসরণ করেন। বা তারা বুদ্ধিজীবীদের মতো স্বাধীন চিন্তাভাবনার অনুসন্ধান করেন। আমিও এমন একজন। আমি স্বাধীন চিন্তাভাবনার অনুসরণ করি, ধর্মের বাইরে কোনও কিছু।

সারাহ ফে : এটা কি সত্য যে আপনার ঘুমের সমস্যা আছে ?

ওয়ে : আমার সবসময় ঘুমের সমস্যা হয়েছে। আমি যখন কলেজ ছাত্র তখন উপন্যাস লিখতে শুরু করি এই কারণে। দু’বছর আমি ঘুমের ঔষধের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। তবে আমি এটা থেকে নিজেকে সারিয়ে তুলি নিজেই চিকিৎসা করে। আমি প্রতি রাতে নাইটক্যাপ ব্যবহার করি। আমি রান্নাঘরে যাই এবং প্রায় চারপেগ হুইস্কি পান করি-কখনও কখনও এর দ্বিগুণ-এবং বিয়ারের দুই থেকে চার ক্যান। হুইস্কি শেষ করি এবং বিয়ার শেষ করি, তারপরে আমি খুব সহজে ঘুমাতে পারি। এখন সমস্যা হলো আমি যে পরিমাণ পড়তাম তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

সারাহ ফে : Rouse Up –এর কথক বলেছে, আমাদের জীবন আমাদের মৃত্যুর আগের অর্ধেক দিনের আনন্দদায়ক প্রস্তুতি মাত্র। আপনার জীবনের ঠিক শেষ অর্ধেক দিনটি কেমন হবে ?

ওয়ে : আমার ঠিক শেষ অর্ধেক দিনটি কী হবে তা আমি জানি না। তবে আমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সচেতন থাকতে চাই। আমি বিগত সত্তর-প্লাস বছরগুলোতে অনেক কিছুরই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমি কয়েকটি কবিতা স্মরণে রাখতে চাই। যেমন এখন ‘East Coker’।

সারাহ ফে : এখন শুধু এই একটাই স্মরণে এল ?

ওয়ে : আপাতত।

সারাহ ফে : আপনি যখন জীবনের পিছন দিকে তাকান, তখন আপনি কি মনে করেন আপনি সঠিক পথটি বেছে নিয়েছিলেন ?

ওয়ে : আমি বাড়িতেই আমার জীবন কাটালাম, আমার স্ত্রী যা রান্না করেন তা খেয়ে, গান শুনে এবং হিকারির সঙ্গে থেকে। আমি মনে করি আমি একটি ভালো ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছি-একটি আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার। আমি এ কথা জেনেই প্রতিদিন সকালে জেগে উঠি যে আমার পড়ার মতো বই ফুরিয়ে যাবে না। এটাই আমার জীবন।

আমি একটি লেখা শেষ করার পর মারা যেতে চাই-যখন আমি লেখার কাজটি শেষ করি কেবল তখন আমি পড়তে পারি। ১৯০৫ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি বছর ঔপন্যাসিক নাতসুম সোসেকি লিখেছিলেন। খুব ছোট ক্যারিয়ার। তাঁর সম্পর্কে বিখ্যাত গল্পটি হলো তিনি মারা যাওয়ার ঠিক আগে বলেছিলেন, আমি এখন মারা গেলে সমস্যা হবে। তিনি কখনও মারা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন না। জাপানে যদি কোনও লেখক একটি অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি ছেড়ে মারা যান তবে যে কেউ এটি প্রকাশ করে। আমি মারা যাওয়ার আগে আমার সমস্ত অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি এবং আমার সমস্ত নোটবুক পুড়িয়ে ফেলতে চাই। আমি যে বইগুলো আবার মুদ্রিত করতে চাই এবং যাবতীয় যা কিছু পুনরায় মুদ্রণ করতে চাই না তা নির্ধারিত করে রেখে যেতে চাই।

সারাহ ফে : অনেক লেখকই যা বলেন তা বোঝান না ?

ওয়ে : সত্যিকারে বিখ্যাত লেখকদের অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হতে পারে। তবে আমার ক্ষেত্রে, যা-ও প্রকাশিত হয়েছে তা সম্পূর্ণ না। আমার লেখার প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ড্রাফটের পরেও শেষ হয় না। এটাকে রিভিশনের পর রিভিশনের একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে যেতে হয়। সংশোধন না করা পর্ষন্ত সেগুলো আমার কাজ নয়।

সারাহ ফে : কোনটাকে আপনার সবচেয়ে সফল কাজ বলে মনে করেন ?

ওয়ে : The Silent Cry । এটা আমার যৌবন কালের লেখা। যদিও এর ত্রুটিগুলো প্রকট। তবে আমি মনে করি এটি সবচেয়ে সফল, ভুলভ্রান্তি সব কিছু মিলিয়ে।

সারাহ ফে : আপনার উপন্যাসগুলোর কথক অতীন্দ্রিয়তাকে আঁকড়ে ধরে, কিন্ত আবার মনে হয় তা থেকে সরেও আসে।

ওয়ে : অতীন্দ্রিয়তার ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা বরাবরই গৌণ। যারা আমাদের জানা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন তাদের মধ্যে দিয়ে আমি এটি অনুভব করি এবং বুঝতে পারি, যেমন-ইয়েটস এবং ব্লেক। শেষ পর্যন্ত আমি এই পৃথিবীতে যেখানে রয়েছি তার বাইরে আমি আলাদা মাত্রায় পৌঁছতে পারিনি, তবে আমি সাহিত্যের মাধ্যমে এটির স্বাদ নিতে পেরেছি এবং এটি আমার জন্য এই হয়ে ওঠার কারণ।

সারাহ ফে : আপনি কি মনে করেন, কোনও কিছুতে বিশ্বাস রাখা কোনও লেখকের জন্য বোঝাস্বরূপ ?

ওয়ে : জাপানি ভাষায় burden শব্দটি দ্বারা ‘ভারী’ কিছু বোঝায়। আমি মনে করি না যে ধর্ম, বিশ্বাস এগুলো ‘ভারী’ বোঝা। তবে আমি যে সকল লেখক এবং চিন্তাবিদদের সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করি তাঁরা বিশ্বাস সম্পর্কে, তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিকে আমার ভিতরে ভাগ করে দেন। আমি তাঁদের কাছ থেকে শেখার অভ্যাস তৈরি করেছি। অন্যান্য অনেক লেখক রয়েছেন যাঁদের আমি ঘনিষ্ঠ বোধ করি না, কারণ বিশ্বাস সম্পর্কে তাঁদের অনুভূতি এবং চিন্তাগুলোকে আমি ভাগ করে নিইনি। উদাহরণস্বরূপ, তলস্তয় এমন লেখক নন যাঁকে আমার কাছের মনে হয়।

আমার বিশ্বাস নেই এবং আমি ভাবি না ভবিষ্যতে আমার তা হবে, তবে আমি নাস্তিক নই। আমার বিশ্বাস একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মতো। আপনি এটিকে ‘নৈতিকতা’ বলতে পারেন। সারা জীবন আমি কিছু জ্ঞান অর্জন করেছি, তবে তা সর্বদা যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আমি যুক্তিযুক্ত ব্যক্তি এবং আমি কেবল নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই কাজ করি। আমার জীবনধারা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মতো এবং আমি মানুষ সম্পর্কে সেভাবেই শিখেছি। যদি এমন একটি অঞ্চল থাকে যার মধ্য দিয়ে চলার সময় আমি অতীন্দ্রিয়বাদের মুখোমুখি হয়েছি, তবে হিকারির সঙ্গে গত চল্লিশ বছরের আমার জীবন। হিকারির সঙ্গে আমার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এবং তাঁর সংগীত সম্পর্কে আমার বোঝার মাধ্যমে আমি অতীন্দ্রিয়তাকে ঝলকে দিয়েছি।

আমি প্রার্থনা করি না, তবে দু’টি জিনিস আছে যা আমি প্রতিদিন করি। প্রথমটি হলো চিন্তাবিদ এবং লেখকদের বই পড়া যা আমি বিশ্বাস করি-আমি প্রতি সকালে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পড়ি। দ্বিতীয়টি হিকারিকে নিয়ে। প্রতি রাতে, আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য হিকারিকে ঘুম থেকে জাগাই। বিছানায় সে নিজের ওপর কম্বল রাখতে পারে না, আমি তার ওপর কম্বল বিছিয়ে দিই। হিকারিকে বাথরুমে নিয়ে যাওয়া আমার কাছে একটা ধর্মীয় রীতির মতো এবং এটি আমার কাছে একটি ধর্মীয় সুর। তারপরে আমি একটি নাইটক্যাপ পরে বিছানায় যাই।

  লেখক : গল্পকার, অনুবাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares