ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

ষষ্ঠ পর্ব

শীতে জবুথবু সকাল। পৌষের শেষ নাকি মাঘের শুরু ঠিক মনে নেই। ১৯৬২ সাল। গাছপালা আর গৃহস্থবাড়ির ঘরের চালে, উঠান পালানে গাঢ় সাদা কুয়াশার চাদর। রোদ উঠলে বেলা হবে। রোদ উঠলেই ধীরে ধীরে কাটবে কুয়াশা। উষ্ণতার লোভে শীতকাতর মানুষ সেই রোদে গিয়ে দাঁড়াবে। পুরুষমানুষের গায়ে চাদর, মহিলারা শাড়িটাকে চাদরের মতো করে জড়াবেন গলার কাছে। চুলায় সকালবেলার রান্না শুরু হলে উত্তাপের আশায় চুলার ধারে গিয়েও বসবে কেউ কেউ। উঠান পালানের মাটি শিশিরে ভিজে আছে। শিশিরকে আমরা বলি ‘ওস’। চক মাঠের ঘাসে আর শস্য চারায় এমনভাবে পড়েছে ‘ওস’ যেন রাতভর বৃষ্টিতে ভিজেছে ঘাস লতাগুল্ম আর শস্যচারা।

এই ‘ওস’ ভেঙে আব্বার সঙ্গে গিয়েছিলাম কাজির পাগলা হাইস্কুলে। আব্বা ক্লাস টুতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ওয়ানে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার নেই। একবারেই ক্লাস টু। কাজির পাগলা হাইস্কুলের পুরো নাম ‘কাজির পাগলা এ, টি ইনস্টিটিউশন’। এলাকার জমিদার ছিলেন অভয় তালুকদার মহাশয়। তাঁর নামে স্কুল। ‘কাজির পাগলা অভয় তালুকদার ইনস্টিটিউশন’। সংক্ষেপে এ, টি। শীতের সকালে কিংবা খরালিকালে একা একা তালুকদার বাড়ির ওপর দিয়ে স্কুলে যাই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমিনুল মামাদের বাড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে নামি পুবদিকটায়। হাজামবাড়ি ছাড়িয়ে আরও পুবে আমিনমুন্সির বাড়ি। সেই বাড়ি ছাড়িয়ে ফসলের মাঠ। কোথাও কোথাও বাঁজা জমি। তালুকদার বাড়িতে ওঠার মুখে পুব পাশটায় ভেঙে পড়েছে পুরোনো দালান। আর পশ্চিম পাশটার একতলা দালানে থাকে পুষ্প ঠাকরন। পুষ্প ঠাকরনের ছেলের কথা লিখেছিলাম নূরজাহান উপন্যাসে। রস চুরি করতে গিয়ে খেজুরকাঁটা বিঁধেছিল পায়ে। এই কাঁটার সঙ্গে আছে গ্রাম্য কুসংস্কার। মানুষের শরীরে ঢুকলে রক্তনালি ধরে সারা শরীরে চলাচল করে খেজুরকাঁটা। শরীরের কোনও এক অংশ পচিয়ে গলিয়ে সেই জায়গা দিয়ে বেরোবার চেষ্টা করে। এই কুসংস্কারের শিকার হয়েছিল পুষ্প ঠাকরনের ছেলে। বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল। নাকি জাদু বাস্তবতা!

তালুকদারবাড়ি ছাড়িয়ে পুবদিকে খালপাড় ধরে সোজা রাস্তা গিয়েছে কাজির পাগলা বাজার পর্যন্ত। জমজমাট বাজারটির পেছনে স্কুল। স্কুলের সঙ্গে বিশাল মাঠ।

তালুকদার বাড়ির পাশে খাল। মাওয়ার ওদিক থেকে এসে কাজির পাগলা পাশে রেখে এঁকেবেঁকে চলে গেছে গোয়ালীমান্দ্রার দিকে। গোয়ালীমান্দ্রা শ্রীনগরের খালে গিয়ে পড়েছে।

তালুকদার বাড়ির উত্তরে তাঁতিদের গ্রাম। ‘সীতারামপুর’। সীতারামপুরের মুখে খালের ধারে এলাকার একমাত্র টংঘরের মুদিদোকানটি। থ্রি বা ফোরে পড়বার সময় ঢাকা থেকে খোকনমামা মিন্টুমামা, অনুমামাও বোধহয় ছিলেন, আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। বুজি হচ্ছেন তাঁদের একমাত্র ফুফু। মা আব্বা সবাই বাড়িতে। ফাল্গুন চৈত্র মাস। বাড়িতে বেশ একটা হই চই আনন্দ উৎসব। খোকনমামা মিন্টুমামা আর আজাদ ও আমি চারজন মিলে দুপুরে গেলাম সীতারামপুরের দোকানটিতে। খোকনমামা চারটা সিজার সিগ্রেট কিনলেন। পকেটে করে ম্যাচ নিয়ে এসেছিলেন বাড়ি থেকে। পাটক্ষেতে ঢুকে আমাদের সবাইকে একটা করে সিগ্রেট দিলেন। আমি সবার ছোট। আমার সিগ্রেটটা ধরিয়ে দিলেন। দুতিন টানের পর কাশতে কাশতে আমার ফিট হওয়ার দশা।

সেই প্রথম সিগ্রেট খাওয়া।

তালুকদার বাড়ি ছাড়িয়ে পুবদিকে হাঁটতে থাকলে হাতের ডানদিকে জলধর ডাক্তারের বাড়ি। জলধর নামকরা ডাক্তার। উমাচরণ ছিলেন তাঁর আত্মীয় এবং কম্পাউন্ডার। দশাসই মোটা কালো রঙের মানুষ। বাড়ির সঙ্গে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে পিতলের কলসি ভরে জল নিতেন। লোকে যেভাবে বদনায় পানি ভরে গোসল করে তিনি কলসিতে জল ভরে সেইভাবে চান করতেন। কাজির পাগলা বাজারে জলধরের ডিসপেনসারি। সেখানেও দেখেছি জলধরের নিত্যসঙ্গী উমাচরণ। আমার প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন এ এইসব মানুষের কথা লিখেছি। উমাচরণকে নিয়ে গল্প লিখেছি ‘দেশভাগের পর’। সেই গল্প রমাপদ চৌধুরী সম্পাদিত গল্পগ্রন্থে আছে। বইয়ের প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স। ‘দেশভাগের পর’ নামে গল্পের বইও আছে আমার। দেশভাগের সময় আর তার আগে পরের সময় নিয়ে বিক্রমপুর অঞ্চলের হিন্দুসম্প্রদায়ের অসহায়ত্বের চিত্র আছে এগারোটি গল্পে। প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স।

জলধর ডাক্তারের কথা আছে পর উপন্যাসে। বাড়িতে দোতলা দালান ছিল তাঁর। সেই বাড়ি ছাড়িয়ে পুবদিকে এগোলে খালের উত্তরপাড়ে করিম ডাক্তারদের বাড়ি। অবস্থাপন্ন বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। টিনের সুন্দর সুন্দর ঘর বাড়িভর্তি। খালের ধারে বাঁধানো ঘাটলা। ঘাটলায় ইংরেজিতে লেখা ‘ক্যানেল ভিউ’। এই বাড়ি ছাড়িয়ে আরও পুবে এগোলে হাতের ডানদিকে সফদর স্যারের বাড়ি। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আর ভালোবাসত সফদর স্যারের বাড়ির পশ্চিম দিককার শরিকের ছেলে হীরু। হীরু আমার সঙ্গে পড়ত। দেখতে ভারি সুন্দর। পরে আমিনুল মামার বোন হামিদার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মেয়ের পিতা হতে পারেনি হীরু। তবে আট ছেলের পিতা হয়েছিল। ঢাকায় থেকে নানা রকমের ব্যবসা করেছে। তেমন সুবিধা কখনও করতে পারেনি। মাঝে মাঝে আমাদের মুরগিটোলার বাসায় আসত। মুরগিটোলা জায়গাটা গেণ্ডারিয়ায়। প্রায় বস্তি এলাকা। আমার মায়ানগর উপন্যাসের পটভূমি।

অল্প বয়সেই মারা গিয়েছে হীরু।

আমিনুল মামারা দুই ভাইবোন। আমিনুল আর হামিদা। তাঁদের বাবা অর্থাৎ আমার মায়ের একটু দূরসম্পর্কের চাচার নাম মন্তাজউদ্দিন। একসময় জাহাজে কাজ করতেন। আমার ছেলেবেলায় গ্রামে থেকে গেরস্থি করতেন। ভাঙাচোরা শরীরের কালোপানা মানুষটির অভাব কখনও পিছু ছাড়েনি। নানি ছিলেন টকটকে ফর্সা সুন্দরী মহিলা। খুবই মুখরা। ঝগড়াঝাঁটির ওস্তাদ ছিলেন। তাঁর মতো সৌন্দর্য পেয়েছিল হামিদা। ভারি অহঙ্কারী ছিল সে। তাঁর বয়সি বা তারচেয়ে বড় ছেলেমেয়েদের কাউকে পাত্তা দিত না। বাড়িভর্তি আমগাছ। আম পাকার দিনে ওই বাড়ির দিকে যাওয়াই যেত না। শুধু একবার হামিদা খালা আমাকে তিনটা না চারটা পাকা আম খাইয়েছিল। তাও লুকিয়ে লুকিয়ে। আমি তারচেয়ে বছর দুয়েকের বড়। একবার আমাদের সাবেক শরাফতগঞ্জ লেনের বাসায় নানির সঙ্গে হামিদা খালা এসে কয়েকদিন ছিল। সে লেখাপড়া তেমন শেখেনি। অন্যদিকে আমিনুল মামা লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু আমাদের বাড়ির মেজো নানা ছোট নানার পরিবার আমিনুল মামাদের দুচোখে দেখতে পারত না। শুধু আমার বুজি মা আর আম্মা ওদেরকে ভালো জানত। আমিনুল মামাদের বাড়িতে একটাই ভাঙাচোরা ঘর। এজন্য তিনি রাতেরবেলা আমাদের ঘরে এসে থাকতেন। কুপির আলোয় অনেক রাত পর্যন্ত জেগে পড়তেন। বর্ষাকালে আমাদের বাড়ির সবাই কোষা নাও নিয়ে স্কুলে যায়। এত কাছের আত্মীয় হওয়ার পরও আমিনুল মামাকে নেয় না। ননিমামা হামিদমামা, রবমামা মোতালেবমামা কেউ সহ্য করতে পারে না আমিনুল মামাকে। আমিনুল মামা একটা তালের ডোঙা বেয়ে একা একা কাজির পাগলা স্কুলে যান। মাঝে মাঝে গরুকে খাবার দেওয়ার যে বিশাল গামলা থাকে সেই কালো গামলা পানিতে ভাসিয়ে বইঠা বেয়ে বেয়ে যান। পুরোনো বই জোগাড় করে পড়েন। ছাত্র হিসেবে তুখোড়। ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হন। হয়ত এই কারণেই আমাদের বাড়ির ছেলেরা তাঁকে হিংসা করত। হিংসা করে কী আর কাউকে ঠেকিয়ে রাখা যায় ? আমাদের মুরগিটোলা বাসায় এসে থাকতেন আমিনুল মামা। জগন্নাথ কলেজে আইএ ভর্তি হয়েছেন। পাকিস্তান এয়ারফোর্সে চান্স পেলেন। চলে গেলেন করাচিতে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আটকা পড়লেন সেখানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক দেড়বছর পর ফিরে এলেন। গ্র্যাজুয়েশন করলেন। চাকরি নিলেন পুলিশে। স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসপি হয়েছিলেন। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে সপরিবারে চলে গেলেন আমেরিকায়।

নূরজাহান উপন্যাসে আজিজ গাঁওয়ালের বাড়ি আমিনুল মামাদের বাড়ি। এই বাড়ির উত্তরের ভিটিতে জীর্ণ কুঁড়েঘরে থাকত পাইন্নার মা। তার ছেলে আজিজই আমার মিলুকর্তা নামটা দিয়েছিল। আব্বা তাকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিতে ভূঁইমালির চাকরি দিয়েছিলেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক হচ্ছে তার চাকরির জায়গা। ভিক্টোরিয়া পার্ক পরে হয়ে যায় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। জিন্দাবাহারের যে বাসায় আমরা থাকতাম সেই বাসায়ই একটা ছাপরাঘরে মাকে নিয়ে থাকত সে। বাড়িটায় একটাই পুবমুখী একতলা দালান। চওড়া বারান্দা আর বিশাল বিশাল দুটো রুম। এক রুমে আমরা থাকি, অন্য রুমে তিন ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে থাকেন তালেব আলি। তিনি পুলিশের কনেস্টবল। আমরা তাঁকে ডাকতাম ‘পুলিশকাকা’। জিন্দাবাহার উপন্যাসে এই বাড়ির কথা বিস্তারিত আছে।

ক্লাস থ্রিতে উঠে প্রথম গল্পের বই পড়া। আব্বা কিনে দিয়েছিলেন সিন্দাবাদের সাত অভিযান। তারপরের বইটা এনেছিলাম মনীন্দ্র ঠাকুরের কাছ থেকে। ভূতের মুখে রাম নাম। এই দুটো বই পড়ে পড়ার নেশা হয়ে গেল। বাড়ি এলেই আব্বা আমার জন্য বই নিয়ে আসেন। দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের ঠাকু’মার ঝুলি, ছোটদের আরব্যরজনী। নানা রকমের রূপকথার বই, জীবজন্তুর গল্প, পরির গল্প। আমি উন্মাদের মতো পড়তে থাকি। একটা গল্পের কথা মনে আছে। ‘বনের গল্প’। বনে মিলেমিশে বাস করত অনেক জীবজন্তু। কারও সঙ্গে কারও শত্রুতা নেই। যে যার মতো আছে। হঠাৎ বনে এসে উপস্থিত হলো এক সিংহ। রোজই কোনও না কোনও প্রাণী শিকার করে খেতে লাগল। ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি হলো বনের জীবজন্তুর মধ্যে। এক শিয়াল তখন সিংহকে বন থেকে তাড়াবার দায়িত্ব নিল। মানুষের মতো কোর্ট প্যান্ট টাই, চোখে চশমা, মাথায় হেট, হাতে ঘড়ি, পায়ে জুতো পরে একদিন সিংহের আস্তানায় গেল। গিয়ে বলল, ‘এই বনে নাকি একটা সিংহ এসে জুটেছে ? আমার প্রজাদের ধরে ধরে খাচ্ছে ? কোথায় সেই নচ্ছার ? তুই চিনিস তাকে ? ডেকে নিয়ে আয়। ওকে আমি এখন চিবিয়ে খাব।’ শুনে সিংহ এত ভয় পেল, আচমকা দৌড় দিয়ে বন থেকে পালাল।

আব্বা আমাকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। বোধহয় ফোর ফাইভে পড়ি। মেদিনীমণ্ডল থেকে হেঁটে গেছি শ্রীনগর। শ্রীনগর ঘাট থেকে নৌকায় করে যেতে হবে আলমপুর। খরালিকালে খালের পানি কমে যায়। লঞ্চ শ্রীনগর পর্যন্ত আসতে পারে না। শ্রীনগর ঘাট থেকে ছইঅলা নৌকায় আট দশজন যাত্রী যায় আলমপুর ঘাটে। চারআনা ছয়আনা বা আটআনা মাথাপিছু। আব্বা আমাকে নিয়ে তেমন কেরায়া নৌকায় উঠেছেন। আমার হাতে একটা গল্পের বই। নৌকায় উঠেই বইটা নিঃশব্দে পড়তে শুরু করেছি। এক ভদ্রলোক বসেছেন আব্বার পাশে। হঠাৎ তিনি বললেন, এই খোকা, জোরে জোরে পড়ো তো। শুনি গল্পটা। সঙ্গে সঙ্গে পড়তে শুরু করলাম। গরগর করে পড়ে যাচ্ছি, পড়ে যাচ্ছি। নৌকার সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। গল্প শেষ হওয়ার পর এমন প্রশংসা শুরু হলো আমার, অতি প্রশংসায় যে মানুষ ম্লান হয়ে যায়, সেই প্রথম তা টের পেলাম। লাজুক মুখে আব্বার দিকে তাকিয়েছি। দেখি আব্বার মুখে পুত্রগৌরবের হাসি।

আরেকটা গল্পের কথা মনে পড়ছে। ওই বয়সেই পড়েছিলাম, নাকি বুজির মুখে শুনেছিলাম, ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে গল্পটা মনে আছে। এ এক শুভ কাজের গল্প। অতি সাধারণ একজন মানুষের গল্প। মানুষটির বয়স হয়েছে। ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদি দিয়ে একদম ঝাড়া হাত-পা। স্ত্রী মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। সংসারের কোথাও তাঁর আর কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তারপরও তিনি কাজ করেন। যেটুকু রোজগার করেন সেই টাকা থেকে যতটা সম্ভব জমিয়ে রাখেন। ভদ্রলোক হজে যাবেন। হজে যাওয়ার খরচের টাকা জমাচ্ছিলেন। একটা সময়ে বেশ টাকা জমল তাঁর হাতে। সিদ্ধান্ত নিলেন এ বছর হজে যাবেন। হজের আর কয়েক মাস বাকি। এ সময় একরাতে এক ঘটনা ঘটল। ভদ্রলোক ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে হঠাৎই তাঁর ঘুম ভাঙল। সাধারণত এ রকম সময়ে তাঁর ঘুম ভাঙে না। ঘুম ভাঙে ফজরের আজানের শব্দে। কিন্তু আজ ভেঙেছে মধ্যরাতে। কী কারণ ? ঘুম ভাঙার পর পরই কারণটা তিনি টের পেলেন। মাথার কাছে জানালা খোলা। খোলা জানালা দিয়ে রাতের হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে অদ্ভুত স্বাদের এক গন্ধ। এমন গন্ধ জীবনে কখনও পাননি তিনি। এই গন্ধেই কি তাঁর ঘুম ভেঙেছে ? গন্ধটা আসছে কোত্থেকে ?

ভদ্রলোক বিছানায় উঠে বসলেন। হাওয়ার সঙ্গে আবার এল সেই গন্ধ। তিনি বুঝলেন তাঁর বাড়ির কাছের রাস্তার ওদিক থেকে আসছে। অতি সুস্বাদু কোনও খাবারের গন্ধ যেন। জীবনে এমন সুস্বাদু খাবারের গন্ধ তিনি কখনও পাননি ? কী খাবার ? কোথায় রান্না হচ্ছে ? গন্ধের উৎস খুঁজতে ভদ্রলোক বাড়ি থেকে বেরোলেন। রাস্তার কাছে এসে দেখেন এক হতদরিদ্র মহিলা তিন চারটা ইটের উপর একটা হাঁড়ি বসিয়ে তার তলায় আগুন জ্বালিয়েছেন। হাঁড়িতে মাংস রান্না হচ্ছে। গন্ধটা আসছে সেই হাঁড়ি থেকে। মহিলার গা ঘেঁষে বসে আছে ছোট্ট এক শিশু। তার গায়ে জামা কাপড় নেই। হাড় জিরজিরে শরীরে ঘুমে ঢলে ঢলে পড়ে যাচ্ছে। তারপরও চোখ খোলা রাখার চেষ্টা করছে আর করুণ গলায় বলছে, তোমার রান্না শেষ হচ্ছে না কেন মা ? আমি আর পারছি না। ক্ষুধার কষ্টে মরে যাচ্ছি। মা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এই তো হয়ে এল বাবা। আর একটু অপেক্ষা করো। ভদ্রলোক দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখতে লাগলেন। একসময় শিশুটি আর চোখ খোলা রাখতে পারল না। মায়ের কোলের কাছে মুখ রেখে, ক্ষুধার কষ্ট নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। মায়ের তখন গাল বেয়ে নেমেছে কান্না। ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন। আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম, আপনি শিশুটিকে শুধুই প্রবোধ দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু রান্না কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। কী এমন খাবার রান্না করছেন যা শেষই হচ্ছে না ? যে খাবারের সুস্বাদু গন্ধে রাতের বাতাস ভারী হয়ে গেছে!

মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বাবা, আমি মরা গরুর মাংস রান্না করছি। চারদিন ধরে না খেয়ে আছি। কোথাও একমুঠো খাবার পাইনি। আজ বিকেলে দেখি মাঠের ধারে একটা মরা গরু পড়ে আছে। গরুর মাংস খুবলে খুবলে খাচ্ছে শকুনে। শকুন তাড়িয়ে মরা গরুর কিছুটা মাংস এনেছি। সেই মাংসই সিদ্ধ করছি। কোনও মসলা নেই, শুধুই পানিতে সিদ্ধ। কিন্তু মাংস কিছুতেই সিদ্ধ হচ্ছে না। ছেলেকে এই জিনিস কী করে খাওয়াই! এজন্যই তাকে প্রবোধ দিয়ে রাখছিলাম।

ভদ্রলোক কোনও কথা বললেন না। বাড়ি ফিরে এলেন। হজে যাওয়ার জন্য যে টাকা জমিয়ে ছিলেন সেই টাকাগুলো নিয়ে মহিলার কাছে এলেন। পুরো টাকা তাঁর হাতে দিয়ে বললেন, এই টাকা দিয়ে আপনি আপনার ছেলেকে নিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করুন। আমি হজে যাওয়ার জন্য টাকাটা জমিয়েছিলাম। এ বছর হজে যাওয়া হলো না। অসুবিধা নেই, আমি আবার কাজ করবো, আবার টাকা জমাবো। আল্লাহপাক যেবছর তওফিক দেবেন সে বছরই হজে যাব।

ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে এলেন। পরদিন থেকে আবার নব উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। কয়েক মাস পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানরা মক্কায় গিয়ে পবিত্র হজ পালন করলেন। কিছুদিন পর সেই ভদ্রলোককে আল্লাহপাক স্বপ্ন দেখালেন, তুমি নিয়ত করার পরও হজে যেতে পারোনি, তারপরও তোমার হজ আমি কবুল করেছি। কারণ তুমি আমার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবদের দুজনকে বাঁচার পথ করে দিয়েছ।

সেই বয়সে এই গল্পের তাৎপর্য বুঝিনি। আজ বুঝি। শুভ কাজের এ এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করাই মানুষের ধর্ম। শুভ কাজে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের ধর্ম। এই জীবনে গল্পটা আমি ভুলিনি।

গল্প গল্প আর গল্প। জীবনজুড়ে কত গল্প, কত ঘটনা, কত কাহিনি আর কত কত বই। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় হামিদমামা একদিন বললেন, ওই মিলু, তরে সব সময় গল্পের বই পড়তে দেখি। শরৎচন্দ্রের রামের সুমতি বইটা পড়ছ না কেন ? তগো ঘরেই তো আছে ?

তাই তো! বুজির আলমারিতে কয়েকটা বই তো আছে। বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া বইগুলো শীতকালে রোদে দিতেন বুজি। সেই বইয়ের গন্ধ সব সময়ই নাকে লেগে থাকে। কেন বইগুলো আমি পড়িনি! অন্য কত বই পড়লাম। ওই বইগুলো কেন পড়ছি না!

বুজিকে বলে রামের সুমতি বইটা বের করলাম। এক দুপুরেই পড়ে শেষ করে ফেললাম। কী অদ্ভুত গল্প! কত আনন্দ বেদনা আর মায়া মেশান। তারপর বড়দিদি বইটাও পড়ে ফেললাম। অরক্ষণীয়া পড়লাম। রামের সুমতির মতো অতটা আকর্ষণবোধ করলাম না। বই দুটোর অনেক কিছু বুঝতেও পারলাম না। বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তর বইটা পড়ার খুবই চেষ্টা করলাম। দাঁতভাঙা কঠিন ভাষা। পড়তেই পারলাম না। আব্বা বাড়ি আসার সময় নিয়ে এলেন বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম। এই বইও পড়ার চেষ্টা করলাম। এগোতেই পারি না। বুজি বললেন, ওইগুলো বড়দের বই। এখন পইড়া বুঝবা না মিয়াভাই। বড় হইয়া পইড়ো।

মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধুও পড়ার চেষ্টা করলাম। বুজির কথায় কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে রেখে দিলাম। বড় হয়ে পড়ব। ক্লাস সেভেন এইটে পড়ার সময় থেকে শরৎচন্দ্র যেখানে যা পাই পড়ি। পাঠ্যবইতে পড়লাম তাঁর ‘মহেশ’ গল্পটি। গফুর ও তার গরুটি নিয়ে ভারি চমৎকার মায়াবী গল্প। পড়লাম শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের তিনটি টুকরো। ‘ইন্দ্রনাথ’, ‘নূতনদা’, ‘সমুদ্রে সাইক্লোন’। কুকুরের তাড়া খাওয়া শেষ করে নূতনদা বললেন, ‘আমার একপাটি পামসু!’ তারপর পড়লাম দেবদাস। এই বই পড়ি আর কাঁদি। কয়েকদিন আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। তারপর আবার পড়ি। আবার কাঁদি। দেবদাস পার্বতীর কষ্ট নিতেই পারি না। ভারত বাংলাদেশ মিলিয়ে আট ন’বার সিনেমা হয়েছে দেবদাস। দীলিপকুমার সুচিত্রা সেনের দেবদাস দেখে ঘুম হারাম হয়ে গেল। শাহরুখ খান, ঐশ্বর্য রাই, মাধুরী দীক্ষিতের হাল আমলের দেবদাস দেখেও চোখে পানি আসে। একশ বছর ধরে সমান জনপ্রিয় একটি উপন্যাস। কী করে সম্ভব ? কতটা জাদু লেখকের কলমে থাকলে একশ বছর ধরে মানুষকে কাঁদানো এমন উপন্যাস লেখা যায়!

দেবদাস উপন্যাসটির একশ বছর হওয়ার পর দেশ পত্রিকা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে একটি লেখা লেখালো। শীর্ষেন্দু তাঁর জাদুকরি ভাষা, রসবোধ আর তীক্ষè মেধা মিলিয়ে মিশিয়ে লেখাটা লিখলেন। শুরু করলেন উপন্যাসটিতে কী কী খুঁত আছে, তাঁর বিবেচনায় দুর্বলতাগুলো কী রকম, সেইসব নিয়ে। শরৎচন্দ্র এবং দেবদাসকে কাটাছেঁড়া করলেন ইচ্ছেমতো। এই লেখা পড়তে গিয়ে শিহরিত হচ্ছিলাম। শীর্ষেন্দুদা এইভাবে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন দেবদাসকে, যে উপন্যাস একশ বছর ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে! বাংলাভাষার এমন পাঠক নেই, যে দেবদাস পড়েনি। যে দেবদাসের জন্য দু’ফোটা চোখের জল ফেলেনি। শীর্ষেন্দুদা নিজেও তো তাঁর যৌবন বয়সে দেবদাস পড়ে কেঁদেছেন। তাহলে এইভাবে ঔপন্যাসিক এবং উপন্যাসটিকে কেন প্রায় বাতিলের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ?

না, আমার ধারণা ভুল ছিল। সত্তরভাগ লেখা শেষ হওয়ার পর বাকি তিরিশ ভাগে শীর্ষেন্দুদা বুঝিয়ে দিলেন কেন এই উপন্যাসটির কদর একশ বছরেও তিল পরিমাণ কমেনি। কেন বাঙালি পাঠক এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষায় অনূদিত দেবদাস ভারতবর্ষের আবেগপ্রবণ মানুষের হৃদয় জয় করে আছে। কোন যোগ্যতায় শরৎচন্দ্র তাঁর নিজের কম আদরের এই উপন্যাসটিকে মানুষের মনে গেঁথে দিয়েছেন! কেন ভারতবর্ষের সিনেমা নির্মাতারা বারবারই এই উপন্যাস নিয়ে সিনেমা তৈরি করেন, এবং প্রতিবারই সিনেমা সুপার ডুপার হিট। দেবদাস-এর মূল শক্তিটা কোথায় ? কোন মন্ত্রে এই উপন্যাস কাল থেকে কালে চলে যাচ্ছে! অতিক্রম করছে বছরের পর বছর। শীর্ষেন্দুদা লিখলেন, শরৎচন্দ্রের গল্প বলে যাওয়ার অসামান্য দক্ষতার কথা, চরিত্র চিত্রনের দক্ষতার কথা, পাঠক কাঁদাবার দক্ষতার কথা। অতি বড়মাপের শিল্পীর পক্ষেই এই রকম উপন্যাস লেখা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত শরৎচন্দ্রকে তিনি মহান ঔপন্যাসিকের মর্যাদা দিলেন। এক বড় লেখক মূল্যায়ন করলেন আরেক মহান লেখকের।

প্রতিবছর ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ হয় বাংলা একাডেমিতে। আয়োজক কাজী আনিস আহমেদ। তিনি নিজে দুর্দান্ত লেখক। ইংরেজি ভাষায় গল্প উপন্যাস লিখে বিশ্বের উদীয়মান লেখকদের কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। একবার নোবেলজয়ী ভি এস নাইপল এসেছিলেন। এসেছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও। নাইপলের কয়েকটি বইয়ের কথা আমার মনে আছে। জার্মানিতে থাকতে বইগুলো পড়েছিলাম। এ হাউস ফর মিস্টার বিসওয়াস, দ্যা মিমিকম্যান, এ ব্যান্ড ইন দ্যা রিভার। কয়েকটি গল্পও পড়েছিলাম বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু ঢাকায় আসার পরেও তাঁর কাছাকাছি যাওয়া হলো না। তিনি অসুস্থ ছিলেন। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন। চারপাশ ঘিরে থাকে দেহরক্ষীরা। তবে দূর থেকে তাঁকে দেখে খুব ভালো লাগল। প্রতিভাধর মানুষের মুখ থেকে অদ্ভুত এক আলো ঠিকরে বেরোয়। নাইপলের মুখের সেই আলোটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম। তাতেই মন ভরে আছে।

তবে এই অনুষ্ঠানেই শীর্ষেন্দুদাকে খুব কাছে পেয়েছিলাম। একবার লিট ফেস্টের শেষ দিনের আকর্ষণ ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বাংলা একাডেমির ‘আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ’ হলে তাঁকে নিয়ে প্রায় দুঘণ্টার অনুষ্ঠান করতে হলো আমাকে। হলভর্তি মানুষ। দরজার কাছে মানুষের জটলা। একটুও ফাঁকা জায়গা নেই কোথাও। শীর্ষেন্দুদাকে মঞ্চে নিয়ে এলাম। আমার দায়িত্ব তাঁকে উপস্থাপন করা। অনেকগুলো ভাগে ভাগ করলাম শীর্ষেন্দুদাকে। ভূত ও বিজ্ঞান মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি যে অদ্ভুতুড়ে এক জগৎ তৈরি করেছেন তাঁর ছোটদের লেখায় এই নিয়ে শুরু হলো কথোপকথন। তারপর বড়দের লেখা গল্প উপন্যাস ইত্যাদি ইত্যাদি। একপর্যায়ে শরৎচন্দ্র ও তাঁর দেবদাস উপন্যাসটি নিয়ে কথা তুললাম। দেশ পত্রিকার সেই প্রসঙ্গ ধরে সেদিনও তিনি অতি মনোরম ভঙ্গিতে শরৎচন্দ্রের কথা বলে গেলেন। তাঁর লেখা যেমন দুরন্ত ও আকর্ষণীয়, বাচনভঙ্গিও তেমন। মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন হাজার দেড় হাজার মানুষকে। শরৎচন্দ্র নিয়ে তাঁর শেষ কথা ছিল, তিনি মহান ঔপন্যাসিক।

লেখালেখির জগতে এসে অনেক সাহিত্যের পণ্ডিতের মুখে শরৎচন্দ্রের নিন্দামন্দ শুনেছি। তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি এবং বিস্মিত হয়েছি। শুধু দেবদাস দিয়ে শরৎচন্দ্রকে বিচার করা যাবে না। তাঁর পথের দাবি, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, শ্রীকান্ত’ এইসব উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী ও অমূল্য সম্পদ। স্কুল জীবনেই শরৎচন্দ্র্রের প্রায় সব লেখা পড়ে ফেলেছিলাম। ষাটের দশকের কথা। সত্তর সালে ক্লাস টেনে পড়ি। একাত্তর সালে এসএসসির ক্যান্ডিডেট। মুক্তিযুদ্ধের কাল। ঢাকা আর বিক্রমপুরে দিন কেটেছে। গেণ্ডারিয়ার সাবেক শরাফতগঞ্জ লেনে বাসা। দুতিন মিনিটের পথ দীননাথ সেন রোডের ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’। বইয়ের ভাণ্ডার। সেখান থেকে বই আনি আর পড়ি। বঙ্কিমচন্দ্রও পড়লাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কপালকুণ্ডলা, দূর্গেশনন্দিনী, দেবী চৌধুরাণী, রজনী, আনন্দমঠ, বিষবৃক্ষ ইত্যাদি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিয়মিত সাহিত্যের কলাম লিখতেন দেশ পত্রিকাতে। লিখতেন ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামে। ’৭২ সালে প্রকাশিত হলো হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে। সেই বইয়ের প্রশংসা করে দেশ পত্রিকায় লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামেই লিখেছিলেন। কয়েক বছর পরে এই কলামেই বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। তুমুল শোরগোল শুরু হয় সেই লেখা নিয়ে। আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ পছন্দ করলেন না তাঁর লেখা। মাঝপথে লেখা বন্ধ হয়ে যায়। সুনীলদা পরিকল্পনা করলেন বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে দীর্ঘ লেখা লিখবেন। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ লেখাটি হলো না। লেখকদের যা হয় আর কি! অনেক পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। তবে তাঁর ভাবনাগুলো সুনীলদা সংক্ষেপে লিখলেন। তখন কৃত্তিবাস পত্রিকার কাল। লিখলেন কৃত্তিবাস-এ। একবার ট্রেনে করে বার্নপুর যাচ্ছিলেন সুনীলদা। বই ছাড়া তাঁর এক মুহূর্তও চলে না। যেখানে যান সঙ্গে বই থাকবেই। চটুল বই বা ক্ল্যাসিক বলে কথা নেই। সব রকমের বইই তিনি পড়েন। কলকাতা ছাড়ার আগে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। তাঁর হাতে একখণ্ড বঙ্কিম গ্রন্থাবলি। বন্ধুর কাছ থেকে সেই বই নিয়ে রওনা দিলেন বার্নপুর। পথে নতুন করে পড়তে লাগলেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। পড়ে তিনি কী রকম একটা অসহায়ত্বের মধ্যে পড়লেন। মাসখানেকের মধ্যে বঙ্কিমের চৌদ্দটি উপন্যাসই পড়ে শেষ করলেন। পড়ে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। লিখলেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো এত খারাপ ? একি সত্যিই বিশ্বাস করা যায় ? … ঔপন্যাসিক হিসেবে বিচার করতে গেলে, বঙ্কিমকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির লেখক ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না’। … ‘তাঁর সবকটি উপন্যাস পড়ে আমার এই গভীর দুঃখের উপলব্ধি হলো যে, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর একটি উপন্যাসেও আমাকে তৃপ্ত করতে পারলেন না। তাঁর প্রত্যেকটি কাহিনি কৃত্রিম এবং উদ্ভট―যেন মানসচোক্ষে তিনি হিন্দি সিনেমা নামক একটা জিনিসের কথা জানতে পেরে তারই কাহিনি বানিয়ে গেছেন’।

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে বা বাঙালি যাঁকে সাহিত্য সম্রাট আখ্যা দিয়েছেন সেই লেখককে নিয়ে এরকম মন্তব্য করতে বুকের পাটা লাগে। বঙ্কিম ভক্ত বা অনুসারীরা যে সুনীলদাকে খুন করে ফেলেনি এই যথেষ্ট। এক জায়গায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের কোনও কোনও বক্তব্য ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ও বলেছেন। পরে সুনীলদা বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ক তাঁর সবকটি লেখা একত্র করে রচনাটির নাম দিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। ‘পঞ্চাশ বছর’ নামে তাঁর একটি বই আছে। বইটি প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘সাহিত্যম্’। এই বই তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। এ আমার এক বিরল সৌভাগ্য। পঞ্চাশ বছর বইটিতে বঙ্কিমচন্দ্র প্রবন্ধটি আছে। ধানসিঁড়ি নদীর সন্ধানে ভ্রমণ কাহিনিটি এই গ্রন্থের সর্বশেষ লেখা। সেই ভ্রমণে আমি সুনীলদার সঙ্গী ছিলাম। আমার কথা ভ্রমণ কাহিনিতে আছে।

তবে সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। লিখেছেন, বঙ্গদর্শন এর মতন একটি পত্রিকা প্রকাশ করে বঙ্কিম সমগ্র বাঙালি জাতিকে কৃতজ্ঞ করে গেছেন। লেখক এবং সম্পাদকের তুলনা চলে না, কিন্তু লেখক বঙ্কিম মনুষ্যজাতির যত না মঙ্গল সাধন করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি করেছেন সম্পাদক হিসেবে’। তিনি লেখাটি শেষ করলেন এইভাবে, ‘বাংলা সাহিত্য যতকাল বেঁচে থাকবে, ততদিন বঙ্কিম এর পিতৃপুরুষ বলে গণ্য হবেন। কিন্তু আমরা দেবী চৌধুরাণীর ব্রজেশ্বরের মতন, তার পিতার অন্যায় বা অসঙ্গত কথাগুলোও বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে পারব না। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, এই মহৎ লেখকটি ছিলেন প্রাচীনপন্থি ও বিপরীতমুখী। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, আমাদের বাংলা সাহিত্যে প্রথম যুগেই এমন একজন শক্তিমান ভাষাশিল্পীর আবির্ভাব হয়েছিল’। 

রবীন্দ্রনাথের ছড়া কবিতা গল্প পড়ছিলাম টু থ্রিতে পড়বার সময় থেকে। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’, ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’। প্রথম গল্প পড়লাম ‘বলাই’। বলাই ছেলেটি শিমুল চারা এনে লাগিয়েছিল বাড়িতে। গাছের সঙ্গে একটি শিশুর সম্পর্কের গল্প। পড়লাম সেই অবিস্মরণীয় গল্প ‘ছুটি’। ফটিকের কথা এই জীবনে ভোলা সম্ভব না। তারপর পড়লাম ‘পোস্টমাস্টার’। রতনের জন্য বুক হু হু করল অনেকদিন। যতবার এই গল্প পড়েছি ততবারই একরকম অনুভূতি। মন কেমন করে!

ঢাকার জিন্দাবাহারে আমাদের বাসা। ’৬৩ সালের শেষ দিক পর্যন্ত এই বাসাটাতে ছিলাম। মেদিনীমণ্ডল আর জিন্দাবাহার মিলিয়ে জীবন। মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে আব্বা সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন। বাসার কাছে ‘লায়ন’ সিনেমা হল। সেই হলে দেখা হলো ‘নৌকাডুবি’ ছবিটি। পরে জানলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সিনেমা। বহু পরে, ক্লাস এইট নাইনে পড়বার সময় নৌকাডুবি উপন্যাসটি পড়লাম। সাহিত্যের বোদ্ধারা বলেন, নৌকাডুবি রবীন্দ্রনাথের দুর্বল রচনা। তার পরও এই উপন্যাসের আঙ্গিকে উপন্যাস লিখলেন বাংলাভাষার অতি উচ্চমানের ঔপন্যাসিক অমিয়ভূষণ মজুমদার। উপন্যাসের নাম বিলাস বিনয় বন্দনা। বইয়ের শুরুতে লিখে দিলেন ‘নৌকাডুবির আঙ্গিকে এক আধুনিক উপন্যাস’।

তারপর জীবনজুড়ে তো শুধুই রবীন্দ্রনাথ। প্রতিদিনকার জীবনে, শ্বাস প্রশ্বাসে, স্বপ্নে জাগরণে, প্রেমে অপ্রেমে। এক অসুস্থ কিশোরীকে নিয়ে গল্প লিখলাম ‘রাত বারোটা’। রবীন্দ্রনাথ এসে সেই মেয়েকে সুস্থ করে দিয়ে গেলেন।

নজরুলও পড়া হলো পাঠ্যবইতে। ‘কাঁঠবেড়ালি, কাঁঠবেড়ালি, পেয়ারা তুমি খাও’। ‘ভোর হল দোর খোল’। আরেকটু উপরের ক্লাসে পড়লাম, ‘গাহি সাম্যের গান’। ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু’ ইত্যাদি। পড়ি আর কিশোর শরীরের রক্ত টগবগ করে ফোটে। বিদ্রোহী কবির ‘পদ্মগোখড়ো’ গল্পটি পাঠ্য ছিল। পড়লাম সেই গল্প। সেই সময় একটি তর্ক প্রায়ই শুনতাম। কে বড় কবি, রবীন্দ্রনাথ না নজরুল ? এখন ভাবি কোন মূর্খরা এই তর্কটা করতেন! কিশোর বয়স পেরিয়ে আসবার বহু বহু বছর পরে নজরুলজয়ন্তীতে অনুষ্ঠান হচ্ছে একটি টিভি চ্যানেলে। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক আমি। নজরুলসঙ্গীত পরিবেশন করবার জন্য শিল্পীরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মঞ্চে। কথা বলতে বলতে এক ফাঁকে আমি নজরুলের জায়গায় ভুল করে রবীন্দ্রনাথ বলে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে দু’তিন শিল্পী মারমুখো ভঙ্গিতে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি আমার ভুল সংশোধন করে হাসিমুখে সেই শিল্পীদের দিকে তাকালাম। খুবই বিনীতভাবে বললাম, না হয় নজরুলের জায়গায় রবীন্দ্রনাথ বলেই ফেলেছি, তাতে কী হয়েছে ? দুজনেই তো আমাদের মাথার ওপর আছেন।

আমি আর আমার বন্ধু মিজানুর রহমান কামাল একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। কাজী নজরুল ইসলামকে, বাংলার বিদ্রোহী কবিকে গেণ্ডারিয়ার ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’এ নিয়ে এসেছিলাম। ’৭৩ সালের কথা। বিদ্রোহী কবিকে জাতীয় কবির সম্মানে বসিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন ’৭২ সালে। ধানমন্ডিতে বাসভবন দেওয়া হয়েছে তাঁর পরিবারকে। ভক্তরা সারাদিন ঘিরে রাখে তাঁকে। আমি আর কামাল জগন্নাথ কলেজে পড়ি। খুব ইচ্ছা কবিকে গেণ্ডারিয়ায় নিয়ে আসি। তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করি ‘সীমান্ত গ্রন্থগার’ এর ছোট্ট মাঠে। এলাকার মানুষ দুচোখ ভরে দেখুক তাদের কবিকে। কিন্তু কাজটি খুবই কঠিন। কে আমাদের কথা শুনবে ? কবি পরিবারের কার সহযোগিতায় কবিকে আমরা গেণ্ডারিয়ায় নিয়ে আসতে পারব ? ধানমন্ডির বাসভবনে গিয়ে ঘুর ঘুর করলাম দু’তিন দিন। কেউ পাত্তা দেয় না। একদিন কবির নাতনি খিলখিল কাজী আমাকে লক্ষ্য করল, কাছে এসে জানতে চাইল, কী চাই ? খুবই লাজুক এবং বিনীত ভঙ্গিতে মনের কথাটি বললাম। বোধহয় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয়েছিল খিলখিলের। সে রাজি হলো এবং দায়িত্ব নিল। বলল, তোমাদের কিছুই করতে হবে না। আমিই গাড়ি করে দাদুকে নিয়ে আসব। তোমরা দুজন আমার সঙ্গে থাকবে। আনন্দ উত্তেজনায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। খিলখিলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখে পানি আসছিল। যেদিন কবি আসবেন, সেদিন ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’ এর কর্তা ব্যক্তিদের ধরে আমরা একটা স্টেজ করলাম গ্রন্থাগারের মাঠে। সেখানেও নানা রকমের ঝামেলা। কেউ আমাদের বিশ্বাসই করছে না। কবি অসুস্থ এ কথা সবাই জানে। কী করে তিনি আসবেন ? আমরা সদ্য কৈশোরে পেরোনো দুটো ছেলে। আমাদের পক্ষে কী করে সম্ভব অসুস্থ বিদ্রোহী কবিকে গেণ্ডারিয়ায় নিয়ে আসা ? নানা রকমভাবে তাঁদের বোঝালাম। কেউ বিশ্বাস করলেন, কেউ করলেন না। তার পরও সামান্য আয়োজনটুকু করতে পারলাম। বিকেলের মুখে মুখে কবিকে নিয়ে এলাম ধানমন্ডি থেকে। সঙ্গে খিলখিল আছে। কবির পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। মাথায় সামান্য কিছু চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। ধরে ধরে তাঁকে মঞ্চে নিয়ে বসালাম। তিনি স্থির হয়ে বসে রইলেন। পাশে খিলখিল। গেণ্ডারিয়ার মানুষ ভেঙে পড়েছে  সীমান্ত গ্রন্থাগারের ওইটুকু মাঠে। ঘণ্টাখানেক তাঁকে আমরা রাখতে পারলাম। সেই একটি ঘণ্টা আমার জীবনের অবিস্মরণীয় সময়। এই হাত দিয়ে আমি কবিকে ছুঁতে পেরেছিলাম, তাঁর পাশে বসতে পেরেছিলাম। এই অনুভূতির কোনও তুলনা হয় না।

যৌবনে বিদ্রোহী কবিকে তাঁর ফরিদপুরের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাভাষার আরেক বড় কবি। তিনি পরিচিত পল্লীকবি হিসেবে। কবি জসীমউদ্দীন। পাঠ্যবইতে জসীমউদ্দীনের ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই’, ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়’ অথবা ‘কবর’ কবিতাটি আমরা সবাই পড়েছি। বিদ্রোহী কবিকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা চমৎকার করে লিখেছিলেন জসীমউদ্দীন। বোধহয় আমাদের পাঠ্য বইতে ছিল লেখাটি। খেয়া পারাপারের সময় নজরুল মুখে মুখে কয়েক লাইন কবিতাও রচনা করেছিলেন। সেই কবিতার একটা লাইন আমার মনে আছে, ‘নদীতীরে ডিঙ্গিতরী পথিক ধরা ফাঁদ’।

সেই যে বিদ্রোহী কবিকে গেণ্ডারিয়ায় আনার ব্যাপারে খিলখিল আমাকে সহযোগিতা করেছিল তারপর তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। ক্ষীণ একটা যোগাযোগ সব সময়ই ছিল। একটা সময়ে যোগাযোগ একটু বেড়েও ছিল। আমার গেণ্ডারিয়ার বাসায় এক কোরবানি ঈদে গরুর বিশাল রান পাঠিয়েছিল খিলখিল।

জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ঢাকা আর মেদিনীমণ্ডল আসা যাওয়া করে। কিছুদিন ঢাকায় কিছুদিন মেদিনীমণ্ডলে থাকতে হয়েছে। জিন্দাবাহার পর্ব শেষ হয়েছিল ’৬৪ সালে। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। জিন্দাবাহারের শেষ একদেড়টি বছর ভয়াবহ কষ্টে কেটেছে আমাদের। প্রথমবারের মতো চাকরি হারালেন আব্বা। অভাব অনটনে কী যে দুঃসহসময়। খেয়ে না খেয়ে থাকা। জিন্দাবাহার উপন্যাসে সবই লিখেছি। মেদিনীমণ্ডল থেকে ঢাকায় পাকাপাকিভাবে চলে এলাম ’৬৬ সালে। আব্বা চাকরি ফিরে পেয়েছেন। ’৬৪ সালের শেষ দিকেই গেণ্ডারিয়াতে বাসা নিয়েছেন। ধূপখোলা মাঠের পশ্চিম পাশে গলির ভেতর। এলাকার নামকরা সর্দার জামাল মিয়ার বাড়ি। বাড়িটি বস্তির চেয়ে সামান্য উন্নত। চারপাশে সার ধরা ঘর। ইটের দেয়াল, টিনের চালা। এক টুকরো বারান্দা আছে। মা সেখানে এসেই উঠেছিলেন। মায়ানগর উপন্যাসে এই বাড়ির কথা আছে।

’৬৬ সালে আব্বা আমাকে আর দাদাকে গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। দাদা ক্লাস এইট আমি ক্লাস সিক্স। স্কুল ছুটির পর বিশাল ধূপখোলা মাঠে খেলাধুলা করে এলাকার ছেলেরা। আমিও খেলতে যাই কিন্তু খেলাধুলায় একদমই সুবিধা করতে পারি না। ফুটবল খেলতে গিয়ে শুধু দৌড়াদৌড়ি করি। এক দেড়ঘণ্টায় বল পা দিয়ে একবারও ছুঁতে পারি না। আমার আগেই পায়ে করে নিয়ে যায় কেউ। সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে এমন উজবুকের মতো হুমড়ি খেলাম কয়েকবার! এই জীবনে সাইকেল চালানোটা আর শিখাই হলো না। শুনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার একদিন হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি সত্যিই অপদার্থ’। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার কণ্ঠস্বর নামে পত্রিকা বের করতেন। স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর পরের কথা। আমার গল্প ইতিউতি ছাপা হয়। কণ্ঠস্বর খুবই সম্মানীয় পত্রিকা। চিটাগংয়ের তরুণ লেখক ও চিত্রশিল্পী সৈয়দ ইকবালের গল্প ছাপা হলো কণ্ঠস্বর এ। গল্পের নাম ‘ফিরে আসা’। দেখে মহাউৎসাহে আমিও একটি গল্প পাঠালাম। আমার গল্প ছাপা হলো না। মাস ছয়েকের মধ্যে সৈয়দ ইকবালের আরেকটি গল্প ছাপা হয়ে গেল। ‘সুরুজ মিয়ার চাবি’। দেখে আমি আবার গল্প পাঠালাম। ছাপা হলো না। হলো না তো হলোই না। আশায় আশায় থেকে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেলাম। আর লেখা পাঠালাম না কণ্ঠস্বর পত্রিকায়। পত্রিকাটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর স্যার প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। কেন্দ্র যখন ইন্দিরা রোড থেকে বাংলামটরের ওখানকার গলিতে চলে এল, যুক্ত হলাম এই কার্যক্রমের সঙ্গে। কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই। বই পড়ার প্রতিযোগিতার মঞ্চে কথা বলি। সারাটা দিন কাটাই স্যারের সঙ্গে। ওরকম এক অনুষ্ঠান শেষ করে সন্ধ্যার পর আড্ডা দিতে বসেছি রমনার বটমূলে। কণ্ঠস্বর এ গল্প ছাপা না হওয়ার বেদনাটি বললাম স্যারকে। ছড়াকার আমীরুল ইসলাম, আহমাদ মাযহার আরও অনেকে ছিলেন। আমার গল্প ছাপা না হওয়ার বেদনার কথা শুনে স্যার তাঁর অসামান্য রসিকতা মাখিয়ে বললেন, ‘ও, তুমি তাহলে একজন ব্যর্থ লেখক ?’

এই ব্যর্থ লেখকের বইপড়া শুরু হয়েছিল মেদিনীমণ্ডল থেকে। ঢাকায় আসার পর খেলাধুলায় ব্যর্থ হয়ে প্রথম কিছুদিন মাঠের ধারে বসে খেলা দেখতাম। অর্থাৎ খেলোয়াড় থেকে দর্শক বনে যাওয়া। কয়েকদিন বসে থাকার পর দেখি আর ভালো লাগে না। এক বিকেলে গিয়ে ঢুকলাম ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’ এ। শুরু হলো বইপড়া। নেশা আগেই ছিল। সেই নেশা এমনভাবে চেপে বসল, স্কুল ছুটি হওয়ার পর পাগলের মতো ছুটে আসি বাসায়। বইপত্র রেখে কোনও রকমে চারটি খেয়ে ছুটে যাই সীমান্ত গ্রন্থাগারে। পড়তে পড়তে বিকেল কেটে যায়। সন্ধ্যার আলো জ্বলে ওঠে চারদিকে।

বীণাখালাদের বাড়িতে গল্পের বইপড়ার চল আছে। বাড়ির প্রত্যেকেই কমবেশি বই পড়ে। মিনুখালা অনুমামা খোকনমামা মিন্টুমামা আর বীণাখালা তো আছেই। ওদের মুখে বিভিন্ন লেখকের কথা শুনি, বইয়ের কথা শুনি। সব বই আছে সীমান্ত গ্রন্থাগারে। নীহাররঞ্জন গুপ্তের বই পড়তে শুরু করলাম। গোয়েন্দা কাহিনি ‘কালো ভ্রমর’ পড়লাম। দুইখণ্ডের বই। পড়ে মুগ্ধ। গোয়েন্দার নাম ‘কীরিটী রায়’। তারপর নীহাররঞ্জনের যত বই আছে সীমান্ত গ্রন্থাগারে, একে একে সব পড়ে ফেললাম। শুধু গোয়েন্দা কাহিনিই তিনি লিখতেন না। কিছু মানবিক কাহিনি, প্রেমের কাহিনি, ঐতিহাসিক কাহিনিও লিখতেন। মাধুবী ভিলা, লালভুলু, উল্কা এ রকম নাম বইগুলোর। একটা বইয়ের নাম খুব ভালো লাগল। ‘বকুল গন্ধে বন্যা এল’। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া। নীহাররঞ্জন গুপ্ত পেশায় ছিলেন ডাক্তার। শুনেছি এই লেখকের কাছে প্রকাশকরা পাণ্ডুলিপি চাইতে এলে সোনার একটি মোহর নিয়ে আসতেন। মোহর হাতে দিয়ে পাণ্ডুলিপি চাইতে হতো। তাঁর একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়েছিলাম অস্তি ভাগীরথী তীরে। সেই স্কুল জীবনে পড়া উপন্যাসটি মনে রয়ে গিয়েছিল। লেখালেখি করতে এসে শুনলাম, নীহাররঞ্জন গুপ্ত কোনও লেখকই না। কথাটা শুনে একটু ভাবলাম। তারপর মনে হলো আমাদের কিশোর এবং যৌবন বয়সের অনেকটা দখল করে থাকা এই লেখকের তাহলে যোগ্যতাটা কী ছিল ? কলকাতার মিত্র ও ঘোষ নীহাররঞ্জন গুপ্তের রচনাবলি প্রকাশ করেছে। অস্তি ভাগীরথী তীরে বইটা খুঁজে পেতে পড়লাম। পড়ে মনে হলো এই লেখাটির কিঞ্চিত সাহিত্যমূল্য বোধহয় আছে। নামটাও সুন্দর। নীহাররঞ্জন গুপ্তের বহু কাহিনি নিয়ে সিনেমা হয়েছে। একটি কাহিনির কথা মনে পড়ে। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন আর ছবি বিশ্বাস অভিনয় করেছিলেন। সিনেমার নাম ‘সবার উপরে’। ছবি বিশ্বাসের বিখ্যাত সংলাপ ছিল এই সিনেমায়, ‘ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটি বছর।’

কত লেখক সেই জীবনে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পরে দিনে দিনে লক্ষ্য করেছি সেই লেখকেরা হারিয়ে গেছেন। তাঁদের নাম একালের পাঠকরা সেভাবে আর মনে রাখেনি। বিমল মিত্রের খুব নামডাক ছিল তখন। তাঁর উপন্যাস পড়লাম স্ত্রী। অনেক পরে সিনেমাটাও দেখেছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত একটি গান ছিল এই সিনেমায়, ‘খিড়কী থেকে সিংহ দুয়ার এই তোমাদের পৃথিবী/এর বাইরে জগৎ আছে তোমরা জানো না।’ পড়লাম বিমল মিত্রের দুইখণ্ডে ঢাউস বই কড়ি দিয়ে কিনলাম। এই বইটি সম্পর্কে অনেকে ঠাট্টা করে বলতেন ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম, দড়ি দিয়ে বাঁধলাম।’ মিনুখালা বীণাখালা এই বই পড়ে এত মুগ্ধ হলেন, মিনুখালার প্রথম ছেলের নাম বীণাখালা রাখলেন ‘দীপু’। দীপু ছিল ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ এর নায়কের ডাকনাম। পুরোনাম দীপঙ্কর।

আমাদের দীপু ছিল রসে টইটম্বুর আর আনন্দ উচ্ছলতায় প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা একজন মানুষ। পড়তে গিয়েছিল আমেরিকায়। আমার ছোটভাই খোকনও সেই সময় আমেরিকাতে। দুজনের একজনও পড়াশোনা শেষ করেনি। কয়েক বছর পর ফিরে এসেছিল দীপু। খোকন ফিরে এসেছিল চৌদ্দ বছর কাটিয়ে। বাংলাদেশেই বিয়ে করেছিল। বউও গিয়েছিল আমেরিকায়। ওদের প্রথম মেয়েটি একটু বড় হওয়ার পর তাকে নিয়ে দেশে ফিরে আসে।

দীপুর বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। লৌহজং এলাকা থেকে দুবার এমপি ইলেকশন করেছেন। একবারও পাস করতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর দীপু রাজনীতিতে এল। ঢাকা ৬ আসন থেকে আওয়ামী লীগের এমপি হলো। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট পরে বক্তৃতা দেয়। ঠা ঠা করে প্রাণখোলা হাসি হাসে। মতিঝিলের অফিসে বসে। বাবার জাহাজের ব্যবসা দেখে আর রাজনীতি করে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। মিনিটে মিনিটে সিগ্রেট ধরাচ্ছে। দুধচিনি দেওয়া চা খাচ্ছে। ভারী খাবার মিষ্টি ডায়াবেটিকদের যা কিছু নিষিদ্ধ সবই চালাচ্ছে অকাতরে। পঞ্চাশ একান্ন বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে দীপু একরাতে মারা গেল। তখন দ্বিতীয়বার এমপি ইলেকশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। দীপুর রসবোধের একটা ঘটনা বলি। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছে। এমপিদের সঙ্গে সবসময়ই কিছু লোকজন থাকে। দীপুর সঙ্গেও ছিল। তবে দীপু সেদিন জিন্সের প্যান্ট আর পলো শার্ট পরে খুবই ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে গেছে। তার পাশে লম্বা চওড়া সুদর্শন বেশ হোমরাচোমরা টাইপের এক যুবক। যুবকটির হাঁটাচলায় নেতা নেতা ভাব। বিয়ের অনুষ্ঠানের এক লোক ছুটে এসে খুবই বিনীত ভঙ্গিতে সেই যুবককে সালাম দিল। ভেবেছে সে-ই এমপি। দীপুকে পাত্তা দিল না। খাবার টেবিলে বসে লোকটিকে ডাকল দীপু। নরম নিরীহ গলায় বলল, ভাই শোনেন। লোকটি এসে সামনে দাঁড়াল, বলেন। দীপু সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, আপনি যাকে সালাম দিলেন ও তো এমপি না। এমপি হলাম আমি। ও হলো আমার চামচা। তারপর চামচাকে ডাকল দীপু। এই, ভাইকে বল তুই আমার চামচা। যুবক মাথা নাড়ল। সেই লোককে বলল, জি, আমি ভাইয়ের চামচা। দীপু লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, এবার সালামটা আমারে দেন। সেই লোক বিনীতভাবে সালাম দিল। দীপু বলল, ওয়ালাইকুমসালাম।

দস্যু মোহন আর দস্যু বাহারাম পড়ছিলাম ফাঁকে ফাঁকে। আর পড়ছিলাম সামাজিক উপন্যাস হিসেবে পরিচিত এক ধরনের উপন্যাস। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের সাপমোচন পড়লাম। মুগ্ধ হয়ে গেলাম পড়ে। অনেক পরে সুচিত্রা উত্তমের সিনেমাও দেখেছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানগুলো কানে লেগে আছে। ‘শোনো বন্ধু শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’। অথবা ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’। জ্যোর্তিময় রায় নামে এক লেখকের উপন্যাস পড়লাম। উদয়ের পথে। অবধূতের বই মরুতীর্থ হিংলাজ। পরে সিনেমাটাও দেখেছি। হেমন্তের গান ছিল ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’। যাযাবরের দুটো বই তখন খুব জনপ্রিয়। দৃষ্টিপাত ও জনান্তিক। দুটোই পড়লাম। আমার তেমন ভালো লাগল না। লক্ষ্য করলাম গোয়েন্দা গল্প কিংবা খুব প্যাঁচানো লেখা আমার ধাঁতে সয় না। ভালো লাগে প্রেমের উপন্যাস কিংবা মানবিক সম্পর্কের গল্প। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তখন খুব জনপ্রিয়। বলাকা মন, সাতপাঁকে বাঁধা এই লেখককে ব্যাপক জনপ্রিয় করেছে। তাঁর প্রথম গল্প দীপ জ্বেলে যাই সিনেমা হয়েছিল। সুচিত্রা সেনের বিখ্যাত সিনেমা। পাগলা গারদের গল্প। সুচিত্রা ছিলেন নার্স। নিজেই পরে পাগল হয়ে যান। খুবই হৃদয়ছোঁয়া কাহিনি। ‘এই রাত তোমার আমার’ গানটি এই সিনেমার বিশেষ আকর্ষণ। হেমন্তের বহু স্মরণীয় গানের একটি এই গান। ‘সাতপাঁকে বাঁধা’য় অভিনয় করেছিল সৌমিত্র আর সুচিত্রা সেন। শক্তিপদ রাজগুরু নামে একজন লেখক ছিলেন। তাঁর উপন্যাস পড়লাম মেঘে ঢাকা তারা। আর নকল মানুষ। এই লেখককে বিখ্যাত করে রেখেছেন অসামান্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। মেঘে ঢাকা তারা চিত্রায়িত করেছিলেন তিনি। ঋত্বিক ঘটক নিজেও গল্প লিখেছেন বেশ কিছু। দীলিপকুমার ও বৈজয়ন্তীমালার বিখ্যাত সিনেমা ‘মধুমতি’। এই সিনেমার কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সলিল চৌধুরী।

গান বই আর সিনেমা একসঙ্গে আকর্ষণ করেছিল আমাকে। গান শুনে সেই গান শেখার চেষ্টা করেছি। বইপড়ে গল্পটা মনে রেখেছি। আর সিনেমায় তো গান গল্প অভিনয় সব একসঙ্গে। মাসের বেতন পেয়ে আব্বা নাইট শোতে সিনেমা দেখতে নিয়ে গেছেন সদরঘাটের ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে। সিনেমার নাম ‘পৃথিবী আমারে চায়’। উত্তমকুমার আর মালা সিনহা অভিনীত। আব্বা ছোট চাকরি করেন। ফার্স্ট ক্লাস কিংবা ডিসিতে আমরা সিনেমা দেখতে পারি না। দেখি মিডিল ক্লাসে। সিনেমার একপর্যায়ে মালা সিনহা গান গাইছেন, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে, চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে’। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম গান। গীতা দত্তের সুললিত কণ্ঠের মায়ায় স্তব্ধ হয়ে আছে হল। কিন্তু যখন উত্তমকুমার গাইতে লাগলেন, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’। তখন ওইটুকু আমি আর উত্তেজনা ধরে রাখতে পারলাম না। শ্যামল মিত্রের এই গান আগেও শুনেছি। সব ভুলে গলা ছেড়ে গাইতে লাগলাম, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে’। শুনে আব্বা আর মা আমাকে থামাবার আগেই পিছনের রো থেকে ঢাকাইয়া এক রসিক লোক বলল, ‘আবে ওই পিচ্চি, থাম। বাইত গিয়া গানা গাইচ’। আর তার মতো রসিকজনের হাসি। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলাম, লজ্জাও পেলাম।

তখনকার দিনে যে কোনও নতুন সিনেমা এলে সিনেমার গানগুলো নিয়ে চটি বই বেরোত। প্রচ্ছদ নেই। দাম দুআনা। সিনেমায় সাত আটটা করে গান থাকত। সেই গানগুলো কবিতার আঙ্গিকে ছাপা। গান প্রেমিক মানুষেরা বই কিনে গান মুখস্থ করত। ফজলকাকার ছিল এই অভ্যাস। যে কোনও নতুন বাংলা সিনেমা এলে প্রথম শোতেই সিনেমাটা তিনি দেখে ফেলতেন। দুআনা দিয়ে গানের বই কিনে আনতেন। গান মুখস্থ করতেন। জিন্দাবাহারের ছাদের শ্যাওলাপড়া স্যাঁতসেঁতে সিঁড়িতে বসে কাকার সঙ্গে আমিও গান মুখস্থ করতাম। এসব ’৬৫ সালের আগের কথা। ’৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত আর পাকিস্তানের এক হাস্যকর যুদ্ধ হয়েছিল। হাস্যকর বা কৌতুককর। সেই মহাকৌতুকের ফলে ভারতীয় সিনেমা পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। হিন্দি বাংলা কোনও সিনেমা আর আসত না। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু সিনেমা নিয়মিত চলত হলগুলোতে। নীলু, মোহাম্মদ আলি, জেবা, ওয়াহিদ মুরাদ, সুধীর, দীবা, শামীমআরা। পশ্চিম পাকিস্তানের এইসব অভিনেতা অভিনেত্রীর উর্দু সিনেমা আমরা দেখতাম। নূরজাহান, মেহেদী হাসান, নাহিদ নিয়াজী, মাসুদ রানা এঁদের গানগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। ওয়াহিদ মুরাদের চুলের বিশেষ স্টাইল ছিল। সেই স্টাইলে চুল আঁচড়াত অনেক তরুণ। মোহাম্মদ আলির বাচনভঙ্গি ছিল বিষণ্ন ধরনের। আর তুখোড় ফাইট করতেন সুধীর। এই নায়কটি দেখতে ছিল কুস্তিগিরদের মতো। ‘রঙ্গিলা’ নামে একজন কমেডিয়ান ছিল। খুবই জনপ্রিয়। নীলু ছিল দুঃসাহসী নায়িকা। পোশাক আশাক মিলিয়ে ভয়াবহ যৌন আবেদনময়ী। ‘খাইবার মেইল’ নামে তাঁর একটা সিনেমা ছিল। সেই আমলে সিনেমার পোস্টারটি ছাপা হয়েছিল ভয়ংকর ডিজাইনে। কালো স্কিনটাইট পোশাক পরে দুপা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে নীলু। আর তাঁর দুপায়ের মাঝখান দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রেন। বীভৎস।

পূর্ব পাকিস্তানের রহমান আর শবনম উর্দু সিনেমাও করতেন। শবনম তো এখনও পাকিস্তানে জনপ্রিয়। রহমান আর দীবার একটি সিনেমার কথা মনে আছে। মনে থাকার বিশেষ কারণ ছিল। সিনেমার নাম ‘মিলন’।

পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা সিনেমাও তখন বেশ জনপ্রিয়। জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, সালাউদ্দিন এ রকম পরিচালকরা সাহিত্য-নির্ভর সুন্দর সুন্দর ছবি করছিলেন। দিনে দিনে আমাদের সিনেমা থেকে সাহিত্যটা সরে গেল।

মেদিনীমণ্ডলের জীবনে আর জিন্দাবাহারের জীবনে অল্পবিস্তর যেটুক পড়েছি বই, ব্যাপক পড়াটা শুরু হয়েছিল গেন্ডারিয়ায় এসে। ’৬৬ সালের পর থেকে। ‘জরাসন্ধ’ নামের এক লেখকের বই পড়লাম। জেল জীবন এবং কয়েদিদের নিয়ে লিখতেন তিনি। খুবই হৃদয়ছোঁয়া আবেগময় লেখা। ভদ্রলোক জেলার ছিলেন। এজন্য ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস লৌহকপাট দুই খণ্ডে। আন্দামানের পটভূমিতে উপন্যাস লিখেছিলেন পাড়ি। ‘পাড়ি’ সিনেমাটাও আমি দেখেছি। হিন্দিভাষী নায়ক ধর্মেন্দ্রর বাংলা সিনেমা। ধর্মেন্দ্র দেখতে খুবই সুপুুরুষ ছিলেন। এই সিনেমার নায়িকার কথা মনে নেই। জনপদ বধূ নামে উপন্যাস পড়লাম। লেখক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেবাদাসীদের নিয়ে লেখা অদ্ভুত ধরনের প্রেমের উপন্যাস। এই লেখক সমুদ্র ও নাবিক জীবন নিয়ে কিছু লেখা লিখেছেন। বোধহয় জাহাজে চাকরি করতেন। তবে সমুদ্র ও নাবিক জীবন নিয়ে বাংলাভাষায় সবচাইতে ভালো লেখা লিখেছেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। পূর্ববাংলার মানুষ ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের মুড়াপাড়া এলাকায় বাড়ি। মুড়াপাড়ার জমিদার পরিবার নিয়ে, ওই এলাকার হিন্দু মুসলমান সব শ্রেণির মানুষ নিয়ে অতীনের বিখ্যাত ট্রিলজি নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান বাংলা সাহিত্যের অমর কীর্তি। এই তিনটি উপন্যাস ছয় পর্বে বিভক্ত। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে প্রথম খণ্ড বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করা। উদ্বাস্তু জীবন থেকে জাহাজে চাকরি নিয়ে লেখক পৃথিবীর অনেকটা ঘুরে বেড়িয়েছেন। আর্জেন্টিনার এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমও হয়েছিল। তাঁর ‘সমুদ্র মানুষ’, ‘অলৌকিক জলযান’ ও সমুদ্র নিয়ে আরও অনেক লেখা আছে। বেশ অন্যরকম ভাষায় লেখেন। একসময় অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিলেন।

বনফুলের হাটে বাজারে উপন্যাসটি ষাটের দশকের খুব জনপ্রিয় ছিল। পড়লাম সেই উপন্যাস। বনফুল ডাক্তার ছিলেন। আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি দুইখণ্ডের স্থাবর ও জঙ্গম। বাংলা অনুগল্পের স্রষ্টা তিনি। রবীন্দ্রনাথের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রবীন্দ্রস্মৃতি নামে সত্তর আশি পৃষ্ঠার চমৎকার একটি স্মৃতিকথার বই আছে তাঁর। এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন। চমৎকার বক্তৃতা দিলেন। ডায়াস থেকে নেমে আসার পর মঞ্চের অন্য অতিথিরা বাহবা দিতে লাগল। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বলাই এর কথা বলছ তোমরা! আরে বলাই তো ওর কাজ।’ কী অসামান্য রসবোধ।

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, হরীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী এইসব লেখকের একটা দুটো বই পড়লাম। শৈলজানন্দের শহর থেকে দূরে উপন্যাসটা খুব ভালো লাগল। মনোজ বসুর পড়লাম বন কেটে বসত আর চোরদের নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস নিশি কুটুম্ব দুখণ্ড পড়ে খুব ভালো লাগল। মনোজ বসুর পাবলিশিং হাউস ছিল। ‘বেঙ্গল পাবলিশিং হাউস’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে বছর চীনে গিয়েছিলেন, সে বছর ভারত থেকে মনোজ বসুও গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আমার দেখা নয়াচীন বইতে মনোজ বসুর কথা আছে। গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ট্রিলজিটা স্কুলজীবনেই পড়ে ফেললাম। পৌষ ফাগুনের পালা, উপকণ্ঠে, কলকাতার কাছেই। সেই সময়ে এই ট্রিলজি ব্যাপক জনপ্রিয়। সুমথনাথ ঘোষ ও গজেন্দ্রকুমার মিত্র মিলে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মিত্র ও ঘোষ। আমার চারদিক নামের উপন্যাস সংকলন প্রকাশ করেছে মিত্র ও ঘোষ।

নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব উপন্যাসটি পড়লাম। বহু পরে অর্পণা সেন অভিনীত সিনেমাটিও দেখেছি। এই লেখকের সঙ্গে ছোট্ট একটা স্মৃতি আছে। কলকাতায় গেছি একবার। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে কিছুদিন আগে নূরজাহান প্রথম পর্ব ছাপা হয়েছে। বাদল বসু আনন্দ পাবলিশার্সের দায়িত্বে। গেছি দেখা করতে। বললেন, ‘কাল সকালে তুমি একটু কলেজস্ট্রিটে এসো। আমরা লেখক প্রকাশকরা একটা পদযাত্রা করবো, “বইয়ের জন্য হাঁটুন”। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে।’

পরদিন সকাল দশটার দিকে কলেজস্ট্রিটে গেছি। নিমাই ভট্টাচার্যও ছিলেন সেখানে। আগেভাগেই লেখকদের নেতৃত্বের জায়গাটা নিয়েছিলেন তিনি। আমি যাওয়ার পর নিমাই ভট্টাচার্যের ব্যাপারটা বাদলদা নাকচ করে দিলেন। বললেন, ‘পদযাত্রার নেতৃত্ব দেবেন মিলন’। নিমাই ভট্টাচার্য একটু অসহায়বোধ করলেন। এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমি খুবই বিব্রতবোধ করলাম।

সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় নামে একজন লেখকের হঠাৎ করে একটি উপন্যাস এল হাতে। নাম আঁধি। পড়ে ভালোই লাগল। এই লেখকের আর কোনও বই পড়া হয়নি। অনেক পরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী রমাদেবীর বই পড়লাম। স্বামীকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা কাছ থেকে দেখা। সেই বই পড়ে জানলাম, বিভূতিভূষণের ঘাটশিলার বাড়িতে বড়গাড়ি আর স্ত্রী কন্যা নিয়ে একবার বেড়াতে এসেছিলেন সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। সঙ্গে যে শিশুকন্যাটি ছিল পরবর্তীকালে সেই কন্যাটি হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর নাম সুচিত্রা মিত্র।

আশাপূর্ণা দেবীর দোলনা, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সজারুর কাঁটা, সমরেশ বসুর অয়নান্ত, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাচালির কিশোর সংস্করণ আম আঁটির ভেপু, আর চাঁদের পাহাড় পড়লাম। পরে বিভূতিভূষণের সব লেখাই পড়েছি। চাঁদের পাহাড়, আরণ্যক বহুবার পড়েছি। তিনি আমার অতিপ্রিয় লেখক।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই ষাটের দশকে খুবই জনপ্রিয় ছিল। সীমান্ত গ্রন্থাগারে তারাশঙ্করের বই ছিল অনেক। একে একে পড়তে লাগলাম রাইকমল, কবি, বিপাশা, চাপাডাঙ্গার বউ, সপ্তপদী। তারাশঙ্করের এইসব বইয়ের প্রতিটিই সিনেমা হচ্ছিল। রাইকমল বা কবি সম্ভবত একাধিকবার চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় হেমন্ত আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অতি জনপ্রিয় গান ছিল, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো’। অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার সুচিত্রা সেন। ‘রাইকমল’ সিনেমার জন্য তারাশঙ্কর গান লিখেছিলেন, ‘মধুর মধুর বংশি বাজে কোথা কোন কদমতলিতে’। গানটি গাইলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। অতি জনপ্রিয় গান।

এইসব লেখকের পাশাপাশি পড়ছিলাম শিশুসাহিত্য। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, শওকত ওসমানের ছোটদের লেখা। হাবীবুর রহমানের ছোটদের লেখা আর মোহাম্মদ নাসির আলীর লেখা। কবি আহসান হাবীবের কিশোর উপন্যাস পড়লাম রাণীখালের সাঁকো। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলেদের মহাভারত, আর ছেলেদের রামায়ণ বই দুটো হাতে নিয়ে মনে হয়েছিল এই বই বোধহয় মেয়েদের পড়া নিষেধ। পরে বুঝেছি ছেলেদের বলতে লেখক শিশুকিশোরদের বুঝিয়েছেন। বিদেশি লেখকদের অনুবাদের বইও অনেক ছিল সীমান্ত গ্রন্থাগারে। তবে সেসব তখনও তেমন পড়া হয়নি। কলেজে উঠে পড়তে শুরু করেছিলাম।

ঢাকায় চলে এসেছি ঠিকই, স্কুল আর গেন্ডারিয়ার বন্ধুবান্ধব আর সীমান্ত গ্রন্থাগারের বই, বাজারের পয়সা বাঁচিয়ে সিনেমা দেখা এই করে দিন কাটছিল। তার পরও কোনও কোনও বিকেলে মন খারাপ হয়ে যেত। শীতের বিষণ্ন সন্ধ্যায় কিংবা অবিরাম বৃষ্টির বর্ষাকালে, ফাল্গুন চৈত্রমাসে যখন ধূপখোলা মাঠের শিমুলগাছ আলোকিত করে ফুটত টকটকে লাল ফুল তখন আমার মন চলে যেত মেদিনীমণ্ডল গ্রামে।

হাজামবাড়িটা ছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা। দক্ষিণমুখী বাড়িটায় ঢোকার মুখে একটা বরই গাছ। ছোট্ট উঠোন পেরিয়ে বাঁশের বেড়ার বড়সড় করে একটা ঘর। টিনের চালা। পুবদিককার ছাঁইগাদার পাশে রান্নাচালা। একটা রোয়াইল গাছ। হলুদ সবুজ ছোট ছোট রোয়াইল ফল গাছটার প্রায় গোড়া থেকে ধরত। অতি টক ফল। ওই ফলই আমরা কামড়ে কামড়ে খেতাম। এই ফলটার প্রকৃতনাম সম্ভবত ‘অরবরই’। সমরেশ বসুর সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা উপন্যাসে রোয়াইল গাছের উল্লেখ পেয়েছিলাম। বিক্রমপুরের বিলডিহি গ্রামের পটভূমিতে দেশভাগের বেদনা নিয়ে লেখা।

হাজামবাড়ির কর্তার নাম সংসার আলী। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া মানুষ। বড়ঘরের ভিতর কিংবা উঠোনের কোণে বসে তামাক টানত আর খক খক করে কাশত। দলা দলা কফ ফেলত যেখানে সেখানে। কফের রং রোয়াইল ফলের মতো। পাঁচ ছেলে তার, আর চার মেয়ে। বড়মেয়ের বিয়ে হয়েছিল গোয়ালীমান্দ্রার ওই দিককার এক গ্রামে। সেই মেয়ে মাঝে মাঝে বাপের বাড়িতে নাইয়র আসত। মেজোমেয়ে অজুফা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। রবের মা। রবের বাবার নাম অখিলউদ্দিন। ভাঙাচোরা শরীরের অথর্ব ধরনের মানুষ। অজুফা যেমন স্বাস্থ্যবতী অখিলউদ্দিন ঠিক তার উল্টো। এই ধরনের পুরুষকে গ্রামের লোকে বলে ‘ম্যাড়া’। মিশমিশে কালো গায়ের রং। তার রং পেয়েছে বড়ছেলে রব। শরীর পেয়েছে অজুফার মতো। অজুফার ছিল দুই ছেলে এক মেয়ে। অল্পবয়সে কয়েকদিনের জ্বরে মারা গেল সে। অখিলউদ্দিনকে সবাই ডাকে ‘অখিলা’। সে আবার বিয়ে করল। লোকটা আবাল গরু আর পাঁঠা তোলাবার কাজ করত। এই ‘তোলানো’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে তরুণ পুরুষ গরু আর পাঁঠার অণ্ডকোষ ফেলে দেওয়া। অচ্ছুতদের কাজ। অখিলউদ্দিন, অজুফা আর রবের কথা লিখেছি অধিবাস উপন্যাসে। রব আমার চেয়ে বছর খানেকের বড়। সে আর তার বয়সি মামা হাফিজউদ্দিন ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। পরে মেদিনীমণ্ডল ছেড়ে রানাদিয়া গ্রামে চলে যায় রব। জীবিকা হিসেবে বেছে নেয় পদ্মায় মাছধরা। বয়াতি ধরনের মানুষ। নিজে গ্রাম্য গান করে। শীত বসন্তে দূর-দূরান্তের গানের আসরে চলে যায়। রাতভর গান শোনে, গান গায়। আমার বেশ কয়েকটি গল্পে রব বয়াতির কথা আছে। শ্রাবণ জ্যোৎস্নায় উপন্যাসে আছে।

সংসার আলী হাজামকে নিয়ে গল্প লিখেছি ‘হাজাম সোমসার আলীর পাঁচালী’। উপন্যাস লিখেছি কালাকাল। সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় লেখা উপন্যাস। কালাকাল মঞ্চনাটক করেছিল বরিশালের ‘শব্দাবলী’ থিয়েটার।

সংসার আলীর তৃতীয় মেয়ের নাম ‘তছিরন’। তার মাথায় ছিট ছিল। সবাই বলত ‘তছি পাগলনি’। নূরজাহান উপন্যাসে এই ‘তছি পাগলনি’ অনেকটা জায়গা দখল করে আছে। সবার ছোট মেয়েটির নাম ছিল ‘কুট্টি’। এই বাড়ির লোকদের মূলকাজ ছিল ‘খৎনা’ করান। শুধু ওই কাজ করে সংসার চলে না। গ্রামাঞ্চলে শীতকাল ছাড়া খৎনার কাজ সাধারণত থাকে না। তাও সেই কাজ আর কয়টা! তারা শীতকালে লেপতোশক বানাবার কাজ করত বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে। এদের আরেকটা পেশা ছিল গ্রামের উৎসব আনন্দে ঢোল ডগর, নানা রকমের বাদ্যযন্ত্র আর বাঁশি বাজানো। অর্থাৎ বাদ্যকরের কাজ।

সংসার আলীর বড়ছেলেটির নাম আবদুল। নরম নিরীহ মানুষ। মেজোছেলে আজিজ মালটানা জাহাজে খালাসির কাজ করত। মজিদ মানে মইজ্জাদা, মনীন্দ্র ঠাকুরের কাজের লোক। তারপর শফি আর হাফিজদ্দি। স্বামী নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকত অজুফা। আমাদের বাড়িতে ধানভানার কাজ করত। শফি, হাফিজদ্দি আর রব যখনই বুজি ডাকতেন, এসে বাড়ির কাজ করে দিয়ে যেত। সবই পেটেভাতে। অর্থাৎ নগদ টাকাপয়সা কিচ্ছু নেই। কাজ করলেই দুপুরের ভাত। কোনও কোনওদিন তিনবেলার ভাত।

অভাব হাজামবাড়িতে লেগেই থাকত। অনেকদিন দুপুরের ভাত রান্না হতো না। মিষ্টি আলু সিদ্ধ করে পেট ভরাত বাড়ির লোক। যখন তখন হাজামবাড়িতে যাই আমি। চৈত্র মাসের দুপুরের দিকে একদিন গিয়ে দেখি, রোয়াইলতলায় মাটির হাঁড়িতে মিষ্টি আলু সিদ্ধ হচ্ছে। মইজ্জাদার মাকে ডাকি আম্মা। ছোটখাটো রোগা পাতলা মানুষ। মুখটা সবসময় বিষণ্ন। চুলার পাড়ে উদাস হয়ে বসে আছেন। উঁকি দিয়ে সিদ্ধ আলুর হাঁড়িটা দেখলাম। একগাদা সাদা আলুর মাঝখানে লাল রংয়ের একটা আলু। কিছু না ভেবে বললাম, লাল আলুডা আমি খামু। মহিলা দুঃখী মুখে হাসলেন, ‘খাইয়ো বাজান’। সত্যি সত্যি লাল আলুটা তিনি আমাকে দিলেন।

এই বাড়িতে গান বাজনা হত কোনও কোনও রাতে। জাহাজের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে আজিজ। আমি ছুটে গেছি। আইজ্জাদা হাসি মুখে ঘর থেকে বিস্কুট এনে দিল আমাকে, ‘খা মিলু’। বাড়ি আসার সময় তখনকার দিনে কিছু না কিছু খাবার সবাই নিয়ে আসত। সচ্ছল দিনে দক্ষিণের ভিটিতে একটা পাটাতন ঘর তোলা হয়েছিল এই বাড়িতে। পশ্চিম দিকটার কুঁড়েঘরটায় বউ নিয়ে থাকত আবদুল। এই ঘরের উত্তরে অনেকখানি খোলা জায়গা। তারপর বিশাল একটা বরই গাছ। কী যে বরই ধরত গাছটায়! বাড়ির সামনের গাছটায়ও ধরত অনেক। বরইয়ের দিনে হাজামবাড়িতেই দুপুরবেলাটা কেটে যেত আমার। লাল হলুদ বরইয়ের ভারে গাছদুটো নুইয়ে পড়ত। তলার মাটিতে চাঙারি ভরা বরই শুকাতে দেওয়া হয়েছে। তার অদ্ভুত একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। বরইতলায় মাটির অদ্ভুত একটা ঢিবি। ঢিবির মাঝখানটায় গর্ত। লেপেপুছে ঝকঝকে তকতকে করে রাখা। হাজামবাড়ির লোকে বলত ওটা ‘মোকাম’। ‘মোকাম’ জিনিসটা কী এই জীবনে জানতে পারিনি। সন্ধ্যাবেলা মোকামে কোনও কোনওদিন মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, আগরবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। মোমের পোড়া সলতে আর পুড়ে শেষ হওয়া মোমের শেষ দিককার অংশ, আগরবাতির  ছাঁই আর কাঠি পড়ে থাকত মোকামে। ভারি রহস্যময় ছিল মোকামটি।

এক নির্জন দুপুরে গেছি হাজামবাড়িতে। গিয়ে হাফিজদ্দি বা রবকে পেলাম না। ফাল্গুন মাস। শীতের দিন চলে গেছে। বইছে বসন্তকালের হাওয়া। হাজামবাড়ির উত্তর দিকটা রহার ছাড়াবাড়ি। নানারকম গাছপালার সঙ্গে উত্তর পুবদিককার নামার দিকে বিশাল একটা গাবগাছ। গাবতলায় গুলি খেলতাম আমরা। পুবে পশ্চিমে পরিষ্কার আঙিনায় হাডুডু খেলা হতো বর্ষাকালে। ঘাসে ভরা ছোট্ট একটা মাঠ যেন ছাড়াবাড়ির আঙিনা। পশ্চিম দিকে আমাদের বড় পুকুর। পুকুরের দিকে ঝুঁকে আছে ছোটখাটো কিন্তু অনেক বয়স্ক একটা গয়াগাছ। কখনও কখনও দুপুরের দিকে সেই গয়াগাছতলায় একা একা গিয়ে দাঁড়াতাম। গভীর একাকিত্বে মনটা কেমন করত। পুকুরের কালো টলটলে জলে জট পাকিয়ে আছে কচুরি। কচুরির নীল বেগুনি আর সাদা ফুল ভারি সুন্দর। কচুরির তলা থেকে ধীরে বেরিয়ে আসে অতিকায় এক গজার মাছ। যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে মাছটি। তারপর নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে তলিয়ে যায়।

সেই দুপুরে ভারি মিহি আর সুন্দর স্বরে একটা পাখি ডাকছিল গাবের ঘন পাতার আড়ালে। অচিনপাখি। পাখির এরকম ডাক সেদিনকার আগে কোনওদিন শুনিনি। উদাস আনমনা ভঙ্গিতে গাবতলায় গিয়ে দাঁড়াই। পায়ের কাছে পড়ে আছে শক্ত মাটির ঢেলা। কিছু না ভেবে তুলে নিয়েছি। আন্দাজেই ছুড়েছি পাখির ডাকের দিকে। কত অলৌকিক ঘটনা যে এই পৃথিবীতে ঘটে! কত বিস্ময়কর ঘটনা যে ঘটে! ঢিল মারার সঙ্গে সঙ্গে পাখির ডাক থেমে গেল। মৃদু খসখসে শব্দে কী যেন পড়ল পায়ের কাছে। তাকিয়ে দেখি অপূর্ব সুন্দর এক পাখি। বুকটা থ্যাঁতলান। তার মানে কী ? আমার ওই আন্দাজে মারা ঢিল গিয়ে ছোট্ট পাখির বুকে লেগেছে! পাখিটা আমি হত্যা করেছি! আমি হত্যাকারী! দুহাতে প্রার্থনার ভঙ্গিতে পাখি তুললাম। পাখির প্রাণ অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। মৃত পাখি দুহাতের তালুতে। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে আছি পাখির দিকে। চোখের জল ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে পাখির গায়ে। সেই মৃত পাখি এখনও যেন কোনও কোনও নির্জন দুপুরে অচিনসুরে আমাকে ডাক দিয়ে যায়। কচুরি তলা থেকে গজার মাছটি বেরিয়েই যেন আমাকে ডাকে। বিলের বাড়ির শিমুল গাছটি ডাকে। মনীন্দ্র ঠাকুরের দক্ষিণ দিককার জানালায় ঝুঁকে ছিল আশ্চর্য রকমের এক গাছের চারা। সেই চারার সবুজপাতারা আমাকে ডাকে। শরৎকালে পদ্মার তীর আচ্ছন্ন হয়ে যেত কাশফুলে। কোনও কোনওদিন গেছি সেদিকটায়। মাথার ওপর স্বচ্ছ নীল আকাশ। পদ্মানদী বয়ে যায় আপন ছন্দে। কোথাকার কোন প্রান্ত থেকে আসে পাগল করা হাওয়া। সেই উতল হাওয়া এসে লাগে আমার জীবনতরণীতে। আলোছায়ার রহস্যময়তা থেকে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটি পরম মমতায় আমাকে ডাকে। মিলু, ও মিলু, মিলুকর্তা …।

[চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares