ধারাবাহিক উপন্যাস : ফসলের ডাক : মঈন শেখ

শেষ পর্ব

[মঈন শেখ। জন্ম : ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহির তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোট কাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার।

মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে কুসুমকথা বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে। ‘ফসলের ডাক’ মঈন শেখের দ্বিতীয় উপন্যাস। কুসুমকথা আপাদমস্তক নিটল প্রেমের উপন্যাস। ‘ফসলের ডাক’ও তাই। তবে এই প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা প্রেম। এ প্রেম ধানের প্রেম, ফসলের প্রেম। ফসল ফলানোর কষ্ট এবং আনন্দ যাদের বুঝবার কথা তারা বুঝতে না পারলেও ফসল কিন্তু তা ঠিকই বুঝতে পারে। কৃষকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং তা ক্রমে ক্রমে পুঞ্জিভূত হওয়া ও তার বিস্ফোরণই এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।]

॥ পাঁচ ॥

চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গেছে তারা। বিএফআর গ্রুপ অন্তত সেটাই ভাবল। ভাবার যথেষ্ট কারণও আছে। চারদিকে একটা বাতাস বইতে শুরু করেছে। সরকার পক্ষের অনেক এমপি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নে যেন সুর বদলিয়ে কথা বলছে। কায়দা করে উত্তর দেয়। কেউ কেউ খোলামেলাই বলে বসে,Ñএই দাবি ন্যায্য দাবি। আমরাও চাই, কৃষক ফসল ফলাক আনন্দের সঙ্গে। আমরা চেষ্টা করছি একটা পথ খুঁজে পেতে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই হয়ত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। কৃষিমন্ত্রীও এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদেরও এক কথা, এ সময় ঢিলা দিলে চলবে না। আন্দোলনকে প্রখর থেকে প্রখরতর করতে হবে।

দু’জনে বসে আছে পলাশ গাছের নিচে। মিনহাজ আর সেঁজুতি। তখনও গাছের ফুলগুলো জেঁকে বসেনি। তাদের আসর বন্দনা চলছে বলা চলে। তবে বন্দনা দেখে বোঝা যায়, আর ক’দিন পরেই তারা গাছের ডালে ডালে আগুন ধরাবে। আজ গুরুত্বপূর্ণ এক মিটিং আছে। তাদের এযাবৎকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘরোয়া মিটিং। বিভিন্ন গ্রাম থেকেও আসবে বেশকিছু চাষা। যারা এই দলের অর্থনৈতিক ও মানসিক সাপোর্ট দিয়ে আসছে জোরেশোরে। মিটিং হবে পদ্মার ধারে এক কফিবারে। মিনহাজ ও সেঁজুতি বসে আছে নদীর ধারেই; সভাস্থল থেকে খানিক দূরে। একটু আগে এসে বসে আছে। অনেকদিন যেন বসা হয়নি তাদের। আজ বসেছে।Ñ‘আমরা দিন দিন কেমন যেন রসহীন হয়ে যাচ্ছি, তাই না ?’ সেঁজুতির এমন একটা প্রশ্নে কিছুটা অবাক হলো মিনহাজ। চমকেও উঠেছে। অন্য একটা বিশেষ ভাবনার মধ্যে ছিল। ভাবনা থেকে ফিরে তাকাল সেঁজুর দিকে।Ñ‘হঠাৎ এ কথা বলছ কেন ? আর আমরা রসহীনই বা হবো কেন ?’

‘না, এমনিতেই মনে হলো কথাটা। তাছাড়া এই আন্দোলন ছাড়া আমাদের মাঝে অন্যকিছু নেই। শুধু আন্দোলন আর আন্দোলন।’

শব্দহীন হাসল মিনু।Ñ‘আসলে আমাদের এই আন্দোলনের মধ্যে, আন্দোলনকারীদের মধ্যেও এক রস-প্রবাহ ঠিকই আছে। তুমি তা দেখতে ব্যর্থ।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি তো রসের সাগর। সব রস তোমার মধ্যেই। সেখানে সাঁতরিয়ে মরে সবাই। আর আমি হলাম আলেয়া; মরুর বালি।’

‘তুমি এভাবে রেগে যাচ্ছ কেন ? আমি কি কোনও অপরাধ করেছি ?’

‘না না, তুমি কোনও অপরাধ করতেই পার না। আসলে আমি বলছি কী আর উনি বুঝছেন কী ?’

‘তাহলে কী বলছ তুমি ? খোলাসা করে না বললে বুঝব কী করে।’

‘আমি বলছি তোমার আর আমার কথা।’

‘ও সেই কথা।’ হো হো করে হেসে উঠল মিনু।Ñ‘শোন আমাদের মাঝে এখনও রসের প্রবাহ চলছে। তা হলো বীর রস। শৃঙ্গার, হাস্য, শান্ত বা ভয়ানক রসের কোনও স্থান বর্তমানে দেখছি না। তবে তুমি চাইলে …।’ সেঁজু আর বলতে দিল না। তার ডানহাতে মিনুর বাম হাত চেপে ধরল। মুখ লাল হয়ে উঠল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললÑ‘একটা কবিতা শোনাবে ? অনেকদিন শুনিনি।’ মিনহাজের কোথায় যেন খোঁচা লাগল। ঠিকই তো অনেকদিন সেঁজুকে কবিতা শোনানা হয়নি। অথচ তার প্রতিটি কবিতার প্রথম শ্রোতা হলো সেঁজু। সে ছাড়পত্র দিলে তবেই কোনও না কোনও পত্রিকায় পাঠায়। যদিও কয়েকমাস ধরে কোনও কবিতা পত্রিকায় পাঠানো হয়নি। তবে লিখেছে বেশ কয়েকটি। যার একটি শোনাতে চাইলো। আসলে তারও ইচ্ছা করছিল একটা কবিতা শোনাতে।Ñ‘শোন তাহলে।’ মিনু পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। শোনাবে বলেই যেন নিয়ে এসেছে কবিতাটা।

‘চাই নাকো জিওলের ঝোল, তোমার হাসিই পথ্য।

সিথানে বস, উন্মুক্ত কর রসালো পক্ব আনার

আমি তো কাহিল কিছু লোভ হতেই পারে খানার

মিছে বলছি না একরত্তি। না, বলছি না অকথ্য।

…।’

সনেটটা টানা পড়ে শেষ করল। শেষ লাইন পড়ল সেঁজুর মুখের দিকে তাকিয়ে। তাকিয়ে আছে সেঁজুও। মাথার ওপর পলাশের এলোমেলো পাতার ছায়া। খানিক দূরে নাম না জানা গাছের ফাঁকে কোকিল ডেকে মরে।  বিরহ, মিলন, যে সুরই হোক; কোকিলের ডাক যেন তাদের কানে পৌঁছালো না। ব্যর্থ কোকিল তবুও প্রাণাতিপাত করে চলে যুগলকে ব্যাকুল করতে। যুগল এখন মোহাবিষ্ট কবিতার মোহে। হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠল সেঁজু। জড়িয়ে ধরতে গেল মিনুকে। কী মনে হয়ে ফিরে এল। তবে মিনুর হাত চেপে ধরে  কতকটা চিল্লিয়ে বললÑ‘কী শোনালে গুরু। আল মাহমুদ বা সৈয়দ শামসুল হক বেঁচে থাকলে তোমাকে গুরু না শিষ্য, কী যে বলতেন বুঝতে পারছি না। তুমি দেহকাব্যের সফল কারিগর একদিন যে হবে, এ ভব্যিষদ্বাণী আমি করতেই পারি। দেহ মন্দিরের তুমি যোগ্য পুরোহিত।’

‘তোমার একটা সমস্যা কি জানো ? বলতে লাগলে মুখে লাগাম থাকে না।’

‘থুক্কু দিলাম। আচ্ছা গুরু এটা কি তোমারÑ‘চুম্বন ঘ্রাণে আসুক মৌমাছি’ সিরিজের কবিতা ?’

‘হ্যাঁ’

‘ঐ সিরিজে মোট কতটা কবিতা আছে ?’

‘পঞ্চাশের কাছাকাছি’

‘সবই সনেট ?’

‘না তা নয়। তবে বেশির ভাগ সনেট।’

‘তোমাকে কিন্তু একটা অপবাদ নিতে হবে। নাক উঁচুরা বলবে, তুমি ব্যাকডেটেড।’

‘ছন্দ না-বুঝুয়া যারা তাদের জন্য কিছু একটা তো বলতে হবে। এখন বাদ দাও ওসব কথা। মিটিং-এ চল। সবাই চলে এসেছে বোধ হয়।’ দু’জনে হাঁটতে লাগল। পদ্মায় পানি না থাকলেও ধারে লোক সমাগম আছে যথেষ্ট। ছোট বড় বৃদ্ধ; কমতি নেই। সিটি কর্পোরেশন থেকে মাঝে মাঝে বসবার সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে খুনসুটি করছে কপোত-কপোতি। যাদের লজ্জা পাবার তারা পাক, চোখ ঢেকে থাক, আমার যা করবার তা করব; এমনই ভাব তাদের মধ্যে। আগের দিনের খেতুরধামের বা পৌষ পার্বণের লম্বা মেলার মতো। তোমার প্রকৃতির ডাক এসেছে, চলে যাও কিছুটা ফাঁকে। বসে যাও হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। সারা দুনিয়া দেখুক তোমাকে, তোমার তো মাথা গোঁজা। নদীর ধারে আসা যে সমস্ত যুগলের ফিজিক্স কেমিস্ট্রি বেশ বাড়ন্ত, তারা ধার লাগোয়া সরু নদীটা নৌকায় পার হয়ে মধ্যে জেগে ওঠা চরে চলে যায়। কাশবনের ঝুপড়ি তাদের স্বাগত জানায়। পরিবেশ মন্দ নয়। এক এক চর এক এক গ্রুপের দখলে। কোনও বড় দলের লেজুর হলেই হলো। দখলে আছে কোনও না কোনও পক্ষের। তারা বসেই নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিয়েছে। পাণ্ডা পোষার জোগানি এতে কম আসে না। এভাবেই চলে চরগুলো। চর ব্যবসা। তাদের কাছে এন্ট্রি নিয়ে একবার ঢুকলেই হলো। নিশ্চিন্তে প্রেম কর, প্রেমের আবাদ কর। পুরো প্রটেকশন আছে।

অল্প টাকাতে নৌকাও ভাড়া পাওয় যায়। কলের নৌকা। তাতে চড়ে অনেকেই ঘুরছে। সেদিকে তাকিয়ে সেঁজু বললÑ‘আগামী সপ্তাহে আমরা কিন্তু নৌকাতে ঘুরব। দুই ঘণ্টার জন্য ভাড়া করব।’

‘পুরো বেলার জন্যই না হয় নিব। সামনের প্রোগ্রামটা সাকসেস হতে দাও।’

‘নিশ্চয় হবে’ বড় আত্মবিশ্বাস সেঁজুর মনে। কিছুক্ষণ চুপ থাকল দু’জন। দু’জনেই ভাবছে কিছু। মিনু আছে আগে। হাঁটতে হাঁটতে পেছন থেকেই সেঁজু বললÑ‘আচ্ছা, ফারুককে তোমার কেমন মনে হয় ?’

‘তোমাকে ঠিক এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম। তার কথা বলার আর্ট মানুষকে মুগ্ধ করে। এ তার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি অল্প দিন হলো আমাদের সঙ্গে সশরীরে যোগ দিয়েছেন, অথচ সবাই তার প্রতিটি কাজে মুগ্ধ। সবাই যেন শিষ্য হয়ে গেছে তার। তাকে অনেক সিনেমা বা উপন্যাসের নায়কের সঙ্গে মিলানো যায়।’

‘ঠিক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো। কোনও খাদে নিয়ে ফেলবে না তো ?’

‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না। তাকে পেয়ে আমরা বরং আরও চাঙ্গা হয়েছি। সমরেশ বসুর বিটি রোডের ধারে উপন্যাস তোমার তো পড়া আছে। তাকে জুটমিলের বস্তিতে হঠাৎ আসা সেই হিরো ফোরটুয়েন্টি গোবিন্দের মতো লাগছে।’

‘ঠিক বলেছ। তবে মাদারি খেলোয়াড় কিন্তু আমাদের দলে নেই।’ মিনুর দিকে তাকিয়ে শুকনো একটা হাসি দিল সেঁজু। এ বিষয়ে আর আগানোর সুযোগ ছিল না। তারা সভাস্থলের কাছাকাছি। সবাই যেন তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সকলের তাকানো তেমনটাই ইঙ্গিত দিল। কফিবারের কাছাকাছি যেতেই, বলতে গেলে সবাইকে বসিয়ে রেখে ফারুক আহমেদ নিজেই বেরিয়ে এল তাদের এগিয়ে নিতে। মিনুর কাছে আদিখ্যেতা মনে হলেও হাত বাড়িয়ে দিল ফারুকের দিকে।

॥ ছয় ॥

ফারুক আহমেদ। বিএফআর গ্রুপের সঙ্গে প্রায় শুরু থেকেই আছে। বিভিন্ন কমেন্টস, পোস্ট ও লেখাতে সে বেশ আলোচিত নাম। তবে মাসখানেক হলো সশরীরে যোগ দিয়েছে এদের সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছে। কিছু একটা করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই তার যোগ দেওয়া বাংলাদেশ কৃষক আন্দোলন দলে। তার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। তবে কাজ-কামের গতি আর বিচক্ষণতা দেখে মানুষ বলবে, এ ছেলে নির্ঘাত দক্ষিণবঙ্গের। তার কথা বলার ধরন আর মানুষের মন জয় করার ক্ষমতা অসাধারণ। সারা দেশ এক নামে তাসু, মিনহাজকে চিনে এলেও, এখন ফারুককেও চেনে। কেউ কেউ বলে, একজন যোগ্য নেতা হবার সকল উপকরণই নাকি তার আছে।

প্রতিদিনই কোনও না কোনও পরিবর্তন আসছে মানুষের মধ্যে। চিন্তায় কাজে। পাড়ায় মহল্লায়, গ্রামে শহরে। আড্ডায় আলোচনায় উদাহরণে। আবার যে যেভাবে পারছে, এগিয়ে আসছে এই আন্দোলনের কাছে। অর্থ দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, শক্তি দিয়ে, সাহস দিয়ে।

সভাস্থলে প্রায় শতাধিক লোক। উত্তরবঙ্গের প্রতি জেলা থেকেই আছে দু’চারজন করে। রাজশাহির ধারে-কাছের জেলা থেকে বেশি। কফিবারে হলঘরের যে ক’টি চেয়ার রয়েছে তা পূর্ণ। কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। স্টেজে যে’কটা চেয়ার রয়েছে, তার দু’টো ফাঁকা। সে দু’টোতেই বসল দু’জন। মিনহাজ আর সেঁজুতি।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছে মহব্বত মিলন। কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে শুরু হলো মূলপর্ব। সমবেত দেশগান গাইল সুইটি, মিরান শাহ, মিনতি মাহাতো আর হেদায়েত পাঠান। এরা সবাই ভাষা বিভাগের  ছাত্র।

‘কৃষি মোদের প্রাণ ওরে কৃষি মোদের প্রাণ

 ক্ষেত ফসলের আবির মেখে গাই যে তারই গান ॥

খাদ্য জোগায় যাদের মুখে তারাই মারে ল্যাঙ

আমরা তো ভাই খেতের জলে ডুইবা থাকা ব্যাঙÑ

                       ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ॥

সর্দি কাশি নেই তো মোদের, আসুক যত বান …।

দলীয় চাষাড়ে গানে পুরো পরিবেশেই পরিবর্তন এল। একটা গমগমে ভাব ফুটে উঠল পুরো হলঘরে। উদ্বোধনী বক্তব্যে নাম এল সেঁজুতির। তার দায়িত্ব অবশ্য ক’দিন আগে যে স্মারকলিপি ডিসির কাছে দেওয়া হয়েছে, তার দফাগুলো এক এক করে পড়ে শোনানো। সেই সঙ্গে দফাগুলো সম্পর্কে দুই-এক মিনিট করে ব্যাখ্যা। এর পরে প্রতি জেলা থেকে আগত একজন করে প্রতিনিধি বক্তব্য দিলেন। মানুষ অবাক হয় সাধারণ কৃষকের সুন্দর করে কথা বলা দেখে। জড়তা থাকলেও ফাঁক নেই। সরলতা থাকলেও ধূর্ততা নেই। কথা অল্পই, চাহিদা একটাই। ন্যায্যমূল।

এবার ডাক এল ফারুক আহমেদের। উঠল ফারুক। হাততালি দিল সবাই।Ñ‘বন্ধুগণ। সবাইকে আমার ফসলি সালাম। আমাদের, কৃষকের অভিবাদনের ভাষা এখন একটাইÑফসলি অভিবাদন, কৃষকীয় অভিবাদন আর চাষামু অভিবাদন। বন্ধুগণÑএক সময় কেউ খারাপ আচরণ করলে তাকে বলা হতো চাষার আচরণ। অর্থাৎ যত খারাপ আচরণ তা শুধু চাষারাই করতে জানে। আর যত ভদ্র আচরণ তা তোলা থাকে শিক্ষিত সমাজের জন্য, ওপর তলার মানুষের জন্য। বন্ধুগণÑএ ক্ষেত্রে মানুষের ভাষা বর্তমানে বদলে গেছে। এখন মানুষ উল্টো কথা বলে।’ আস্তে আস্তে আরও মানুষ প্রবেশ করছে হলঘরে। এদের অনেকেই দূর থেকে এসেছে। লুঙ্গি পরা কৃষক। কারও লুঙ্গি পরার সৌন্দর্য দেখে অনুমান করা যায়, এরা অন্যকিছু পরেও আসতে পারত। কিন্তু তাদের কৃষকসত্তাকে জানান দেবার জন্যই বুঝি এই লুঙ্গিবেশবাস। কেউ কেউ নিজ আসন থেকে উঠে গিয়ে তাদের বসার সুযোগ করে দিচ্ছে।Ñ‘বন্ধুগণ। আবার শুরু করল ফারুক।Ñ‘আপনারা এরমধ্যেই হয়তো জেনে গেছেন, আজকে কেন এই বিশেষ সভা ডাকা হয়েছে। আগামী শুক্রবার অর্থাৎ আজ থেকে ছয় দিন পর এক মানববন্ধন করা হবে। আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি ঐদিন নির্দিষ্ট এক সময় পনের মিনিটের জন্য শহরমুখী জেলা পরিষদের রাস্তার দু’পাশে দাঁড়াব। তবে এতে যেন পথচারীর কোনও বিঘ্ন না-ঘটে। দেখবেন সরকারদলীয় অনেক সাধারণ মানুষ আমাদের সারিতে দাঁড়াবেন। দেশজুড়েই এটা ঘটবে। এই সপ্তাহ ধরে প্রচারণায় কোনও ঘাটতি রাখব না। আমাদের গ্রুপ-ওয়ালে এই সভা এখন লাইভ দেখানো হচ্ছে। আমরা যে যার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব সবার কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য।’ এই কথা বলবার মাঝেই একজন হাত উঁচাল। আরিফ মোল্লা। ঘাবড়ে গেল কেউ কেউ। না জানি কী বলে মোল্লা। কেউ আবার বিরক্ত হলো; মোল্লা কথাটা পরে বললেও পারতেন। থামল ফারুক। মোল্লা উঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে দাঁড় করালেন তার সঙ্গে আসা সত্তর পার করা এক বৃদ্ধকে। একটা গুঞ্জন শুরু হলো পুরো হলঘরে। মিনহাজ উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে থামতে বলল। মিনহাজ আরিফ মোল্লাকে বললÑ‘দাদু কী বলতে চান বলুন। বন্ধুগণ দাদু এসেছেন গ্রাম থেকে। অনেক কষ্ট করে। উনার কথাটা আগে শোনা হোক। বলুন দাদু। স্টেজে এসে বলুন।’ মোল্লা স্টেজে গেলেন না। সেখান থেকেই হাত উঁচিয়ে লম্বা একটা সালাম দিয়ে শুরু করলেনÑ‘বন্ধুগণ, দুঃখিত মাঝপথে বাগড়া দেবার জন্য। উপায় ছিল না। আমাদের আবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে। রাত হলে ফিরতে মুস্কিল হবে। আমি আজকে আসতে চাইনি। বলতে পারেন আমার সঙ্গের এই রায়হান-উর-রহমান ওরফে বাবু সরকার আমাকে ধরে আনলেন।’ সঙ্গে দাঁড়ানো লোকটির ডানহাত তুলে ধরলেন মোল্লা।Ñ‘বাবু সরকার আপনাদেরকে দু’টি কথা বলতে চান। দয়া করে শুনুন।’ অনেক ঝরঝরে কথা বললেন আরিফ মোল্লা। কথায় কোনও আঞ্চলিকতা নেই। এটা মোল্লা পারেন। বাবু সরকার উচ্চস্বরে একটা সালাম দিলেন। এতে তার পান খাওয়া মরচে ধরা দাঁত আর জিহ্বা স্পষ্ট হলো। তবে মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠা আনন্দরেখাগুলো প্রমাণ দেয়, তিনি এখানে আসতে পেরে কতটা খুশি।Ñ‘বন্ধুগণ।’ বাবু সরকারও একই সম্বোধন করে শুরু করলেন।Ñ‘আপনাদের এখানে আসতে পেরে আমি বেজায় খুশি। আমরা খুব শীঘ্রই আলোর মুখ যে দেখব, এটা নিশ্চিত। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার আপনাদের সঙ্গে আছে। মানে আমাদের সঙ্গে আছে। আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আছেন আমাদের সঙ্গে। নইলে আমরা এতদূর আসলাম কী করে ?’ এটুকু বলতেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। বাবু সরকার। প্রথমে যারা বিরক্ত হয়েছিল, তারা হাঁ করে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধের একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো। তবে পানি না-খেয়েই আবার শুরু করলেন।Ñ‘বন্ধুগণ, আমি আর বিরক্তি ঘটাব না। আমি এসেছি আপনাদের কাতারে দাঁড়াতে। কিঞ্চিৎ অংশীদারিত্ব নিতে। আমি সামান্য কিছু টাকা এনেছি। দশ হাজার টাকা আপনাদের ফান্ডে দিয়ে শরিক হতে চাই।’ পকেট থেকে পাঁচশ টাকার ছোট বান্ডিল বের করলেন।Ñ‘ভাইরে আরও দেবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বোরার ধান নিয়ে নাকানি-চুবানি খাচ্ছি। আমার একটা কোরবানির খাসি ছিল। সেটাই বিক্রি করেছি কাল। সেই টাকার কিছুটা রেখে বাকিটা আনলাম। আমার আল্লার কাছে মাফ চেয়েছি এর জন্যে। বোরার আবাদ উঠলে আবার একটা খাসি কিনব কোরবানির জন্য। এই বিশাল মঙ্গলযজ্ঞে থাকবার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাই না। আগামী শুক্রবারের কর্মসূচি সবাই মিলে সার্থক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। পুরো উপস্থিতি একযোগে তাকিয়ে আছে বাবু সরকারের দিকে। তার কথাবলার ধরনে এতক্ষণে সবাই বুঝে গেছে, এ মানুষ মোটেও আলাভোলা বা গেঁয়ো নয়; বেশ গোছাল। এ বিষয়ে আর কথা না-বাড়িয়ে মিরান শাহকে ইশারা করল মিনহাজ। মিরান গিয়ে বাবু সরকারের হাত থেকে টাকাটা নিয়ে এল। ফারুক আর কথা বাড়ালো না। অল্প কিছু বলেই থামল। তবে যা বলল, তা আগামী শুক্রবারের কর্মসূচি নিয়ে। বাকিটুকু বলবার দায়িত্ব মিনহাজের কাঁধে তুলে দিয়ে বসল ফারুক। সবাই ‘জয় কৃষকের জয়’ ধ্বনির সঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল।

মিনহাজ ওঠার আগে আরও একটা গান হলো। তাদের নিজস্ব গান। কৃষি সুর, মাঠের গান।

ধান ফলাও ধানিয়া বন্ধু

ধানের পাও না দাম

তবু কেন জমির আলে

ঝরাও গায়ের ঘাম ॥ …

গান শেষে পরিবেশ আরও শানিত আর চঞ্চল হয়ে উঠল। গান শেষ হতেই ঘোষক মিনহাজের নাম ঘোষণা করল। মিনহাজ সালাম, আদাব আর শুভেচ্ছা বিনিময় করে বক্তব্য শুরু করল।Ñ‘বন্ধুগণ। পূর্ববর্তী বক্তা অনেক মূল্যবান কথা বলে গেছেন। আমি আর ওদিকে যাব না। তবে আমাদের লক্ষ্য এখন একটাই। আগামী শুক্রবারের কর্মসূচি সফল করা। সকল বিশ^বিদ্যালয়, কলেজ, রুয়েট, মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় বা কলেজের বন্ধুদের  আমরা অনুরোধ করব, সম্ভব হলে এই ক’দিন নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে থাকতে। এলাকার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে। যাদের যাওয়া একান্তই সম্ভব হবে না, তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের মূল গেটের সামনে অর্থাৎ রাস্তার ধারে দশজন হলেও ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে যাব। বন্ধুগণ, এতে কারও যদি ভালো পরামর্শ থাকে আমরা সাদরে তা গ্রহণ করব। মনে রাখবেন আমাদের পাশে এখন সবাই। শক্তি দিয়ে, সাহস দিয়ে, অর্থ দিয়ে যে যার মতো সাহায্য করছেন। আজকের বাবু সরকার তার প্রমাণ। হাজারও বাবু সরকার আজ আমাদের পাশে। আজ যেন সবার প্রাণে এসেছে প্রাণের জোয়ার। শোষণের খরায় পুড়তে বসা মানুষগুলো হঠাৎ জেগে উঠেছে। নিজের অধিকারকে নিজের, নিজের সম্মানকে নিজের, নিজের পায়ের নিচের মাটিকে নিজের বলতে শিখেছে। তারা এমন একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করছিল; তাকিয়ে ছিল কবে আসবে সেই দিন। ১৯৭১ নিজ চোখে দেখিনি। দাদা ও আব্বার মুখে শুনেছি সেই আগুন ঝরা দিনের কথা। সেদিন সাধারণ মানুষ কতভাবেই না মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। চিড়া-মুড়ি, জায়গা, বুদ্ধি ইত্যাদি দিয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান করতে চেয়েছিলেন। সেদিনের আন্দোলন ছিল ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতার। আমাদের আন্দোলনও স্বাধীনতার। আমাদের আন্দোলন কৃষি স্বাধীনতার, ফসলি স্বাধীনতার। সেই মহান ’৭১-এর মতোই যেন উন্মত্ত কৃষি-জনতা হুমড়ি খেয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন আমাদের পাশে। যে যার সাধ্যমতো সাহায্য করছেন আমাদের। মুরগি বেচে, ডিম বেচে এমনকি কোরবানির খাসি বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দিচ্ছেন আমাদের হাতে। কারণ একটাই, বাংলার ৮০ ভাগ মানুষ তাদের হতাশার আকাশে আশার সূর্য দেখতে পেয়েছেন। আপনাদের বিশ^াস করতে কষ্ট হবে, কিন্তু এটাই সত্য যে, আমাদের বর্তমান তহবিলে এখনও জমা আছে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। এ টাকা কোনও শিল্পপতি বা রাজনীতিকের দেয়া নয়। সব টাকা এই খেটে খাওয়া মানুষ সাধারণ কৃষকের টাকা। তারা তাদের এই দানকে ইবাদতে পরিণত করেছেন। এই নিঃস্বার্থ দান কখনও ব্যর্থ হতে পারে না।’ এতক্ষণ উপস্থিত জনতার দম বন্ধ করে যেন কথাগুলো শুনছিল। তারা যেন ভুলে গিয়েছিল হাততালি দিতে। মিনহাজও ভুলে গিয়েছিল থামবার কথা। সবাই যখন হাত-তালির সাথে বললÑজয় কৃষকের জয়। তখন থামল মিনহাজ। কপালে নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সামনের টিস্যুবক্স থেকে একটা বের করে সেটাই মুছে নিল।Ñ‘বন্ধুগণ। আপনারা হয়ত খেয়াল করেছেন, এখন অনেক নেতা, অনেক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক আমাদের সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ জার্সি বদল করে ছুটে আসছে আমাদের হয়ে খেলার জন্য। আর একটা মজার ব্যাপার হলো, আমাদের বিএফআর গ্রুপের মতো আরও অনেক গ্রুপ আমাদের সাধুবাদ জানিয়ে তাদের মতো করে লিখছে। এদের মধ্যে ‘উই আর পজিটিভ’ গ্রুপ অন্যতম। হয়ত আর বেশিদিন নয়, আমাদের বিজয়-সূর্য মধ্য গগনে এসে আলো ছড়াবে। তাসু মাস্টার জেলে। তিনি সেখান থেকেই আমাদের ছায়াসঙ্গী হয়ে আছেন। আমরা চেষ্টাও করিনি তাকে বের করবার জন্য। অবিশ্যি এটা তারই ইচ্ছা। তবে তিনি ভালো আছেন সেখানে। সেখানে জেলার সাহেবও নাকি দুইদিন তার সঙ্গে দেখা করে গেছেন। ডেপুটি জেলার প্রতি সপ্তাহে একবার করে তার কাছে যান। খোঁজ-খবর নেন। বন্ধুগণ, একটা মজার খবর হলোÑতাসু মাস্টার জেলের মধ্যে বসে একটা উপন্যাস লিখছেন। যেটা তার জীবন আর কৃষকের জীবন নিয়ে। আমাদের এই জেগে ওঠা নিয়ে। আপনারা হয়ত জানেন না, তিনি কতটা পড়াশোনা করা মানুষ। এবার তার উপন্যাসের মাধ্যমে সারা দেশ জানবে, তার সৃজনী সত্তার কথা। তাসু মাস্টার বলেছেনÑ‘আমি জেলের মধ্যে সূর্য দেখতে পাই না, কিন্তু যেদিন বের হবো, সেদিন ঠিকই দেখব আমাদের বিজয় সূর্যকে।’ হ্যাঁ তাসু মাস্টার ঠিকই বলেছেন। তাছাড়া আমরা কোনও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছি না। আমাদের আন্দোলনে কোনও জ¦ালাও পোড়াও নেই। জান-মালের ক্ষতি নেই। সরকারপক্ষও বিরোধী দলকে বলছে, আমাদের কাছে শিক্ষা নিতে। সেদিক থেকে আমরা সফল। বন্ধুগণ, আপনারা আগামী এক সপ্তাহ কেউ এক ছটাক ধানও বিক্রির জন্য হাটে বা কোনও আড়তে নিয়ে যাবেন না। জানি কষ্ট হবে, তবুও নিয়ে যাবেন না। এটাও আমাদের প্রতিবাদের একটা চূড়ান্ত ধাপ। আমি ধন্যবাদ দিই সাংবাদিক ভাইদের। তারা আমাদের পাশে সব সময় আছেন বলেই আজ আমরা এমন পর্যায়ে এসেছি। আশা করি সামনের দিনগুলোতেও আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। বিশেষ করে আগামী শুক্রবারের মানববন্ধনে আপনাদের বিশেষ সহযোগিতা চাই। আর দুই-একদিনের মধ্যেই প্রেস কনফারেন্স করে জানাব আমাদের সামনের কার্যক্রম সম্পর্কে। বন্ধুগণ, আপনারা যেভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, এভাবে যদি চিরদিন আমরা একে অপরের পাশে থাকি, তবে দেখবেন আমাদের দেশ সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা একদিন ঠিকই হবে। আর সেদিনই সার্থক হবে আমাদের স্বাধীনতা, আমদের লাল-সবুজের পতাকা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। সার্থক হবে বীর শহিদদের রক্তদান।’ আরও কিছুক্ষণ বলল মিনহাজ। আজ যেন তাকে মন-প্রাণ উজার করে তার বলার ইচ্ছাটা পেয়ে বসেছে। শ্রোতাও যেন শোনার জন্যই আজ এসেছে। একযোগে গিলছে। বলে চলে মিনহাজ। কোনও ঐতিহাসিক মঞ্চে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে চলে। বলাতে নেই ছন্দপতন; শোনাতে নেই শ্রোতার বিরক্তি। সাবার চোখ, মন, মগজ, মিনহাজের দিকে। আলোচনা চলল আরও আধাঘণ্টা। শেষে আগামী ক’দিনের এজেন্ডাগুলো পড়ে শোনাল মহব্বত মিলন। আলোচনা হলো লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, প্রেস ব্রিফিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কীভাবে সরব থাকা যাবে; বিভিন্ন বিষয়ে। কিছু মতামত নেওয়া হলো সাধারণ কৃষকের কাছ থেকেও। দায়িত্ব বণ্টন হলো নতুন করে। হাজার জনতা নেই ঠিকই, তবে মিটিং শেষ হলো কোটি জনতার মনের ইচ্ছার প্রকাশ দিয়ে। শুধু এই ছোট হলঘর নয়, এ মিটিং দেখল আর শুনল পুরো দেশ। অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি প্রচার হচ্ছে এই সভা। স্টলে, অফিসে, ক্যাম্পাসে, জমির আ’লে, সবখানে সবাই হুমড়ি খেয়ে আছে মোবাইলের ছোট পর্দায়। এবার সমস্ত দেশের কাঁপন যেন একসাথে এসে পড়ল এই হলঘরে। পুরো ভবন আর পদ্মার পাড় কেঁপে উঠল একটা স্লোগানেÑজয় কৃষকের জয়।

॥ সাত ॥

আজ শুক্রবার। পুরো জাতি মুখিয়ে আছে বিকাল তিনটার দিকে। কেউ দেখার জন্য, কেউ লাইনে দাঁড়াবার জন্য। কেউ ছবি তুলবার জন্য, কেউ তা প্রচার করবার জন্য। আবার কেউ ছবির মধ্যেকার মানুষ হবার জন্য। কেউ ভালো হবে না দেখবার জন্য, কেউ ভালো হবে দেখবার জন্য। কেউ হাসার জন্য, কেউ ভাবার জন্য। তাকিয়ে আছে সবাই। তাকিয়ে আছে বিকাল তিনটার দিকে। তিন থেকে তিনটা পনের মিনিট সবাই দাঁড়াবে রাস্তার দু’ধারে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে সবাই। পক্ষের কি বিপক্ষের; সবাই। গত সপ্তাহজুড়ে সবখানে খবর ছিল একটাই; কৃষকের মানববন্ধনের কথা। সমস্ত মিডিয়াজুড়ে হইচই এটা নিয়ে। হইচই রাজনীতির পাড়াতেও। সরকার পক্ষও যেন উপভোগ করছে বিষয়টি। যারা ত্যাদড়, তারা সমালোচনা করলেও তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। তবে তাকিয়ে আছে তারাও। ছোট ছোট বাম দলগুলো ক’দিন আগ থেকেই ছোটখাটো সভা করতে শুরু করেছে কৃষকের পক্ষে। আজও সকালে করেছে একটা। দেশবাসীকে তারা অনুরোধ করেছে, কৃষকের মানববন্ধনে যোগ দেবার জন্য। তাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে টেনে তুলে মিডিয়াগুলো। প্রধান বিরোধী দল শুরু থেকেই এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম। বিএফআর গ্রুপের সাড়া না-পাবার জন্যে তারা প্রকাশ্যে পাশে থাকতে পারেনি। অবিশ্যি পরে তারাও চায়নি। তারা চায়নি এমন একটা সুসংহত আন্দোলন তাদের কারণে মাটি হোক। তবে বৃহস্পতিবার রাতে তারা একটা কাণ্ড করে বসল। এক প্রেস ব্রিফিং দিয়ে বসল। ব্রিফিং-এ বললÑ‘এই আন্দোলনের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে। দেশের সকল মানুষকে এই আন্দোলনে শরিক হবার জন্য অনুরোধ করছি। আগামীকালের মানববন্ধনে সবাই রাস্তায় নেমে আসুন।’ তারা এটাও বলতে ভুলল নাÑ‘তবে হ্যাঁ, মনে রাখবেন এটা আর পাঁচটা আন্দোলনের থেকে আলাদা। কোনও হট্টগোল যেন না বাধে। জনদুর্ভোগ যেন না হয়। মোটকথা, এই আন্দোলনকে সফল করতেই হবে। মনে রাখবেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’

এর পরদিন সকালেই অর্থাৎ শুক্রবার সকালে খুব দ্রুত এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বসল বিএফআর গ্রুপও। সেই সম্মেলনে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো; বলল মিনহাজইÑ‘বন্ধুগণ, আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমাদের এই আন্দোলন বা আজকের এই মানববন্ধন কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। আমাদের এই আন্দোলন কৃষকের আন্দোলন, সাধারণ মানুষের আন্দোলন, দেশের আশিভাগ মানুষের আন্দোলন। আশা করি আজকের এই মানববন্ধন সফল ও সার্থক হবে। সবাই অংশগ্রহণ করব সেই উদ্দেশ্যেই। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে আর স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটায়, তবে আমরা নিজেরাই তাদের ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিব। আমাদের মানববন্ধন হবে রাস্তার দুইধার দিয়ে। কোনওভাবেই যান চলাচলের অসুবিধা যেন না হয়। তবেই দেখবেন, আমাদের এই ১৫ মিনিটের মানববন্ধন হবে হাজার বছরের আন্দোলনের সারাংশ।’ বিএফআর গ্রুপের এই সম্মেলনকে সরকার যেন নীরব এক ধন্যবাদ দিল। বিরোধী পক্ষ কিছুটা আহত হলেও বিপরীতে গেল না।

তিনটা বাজতে এখনও দেরি। তবে মানুষের উপস্থিত হতে দেরি হয়নি। অনেকে জুম্মার নামাজ আদায় করেই দাঁড়িয়ে গেছে রাস্তার ধারে। শহরমুখী, উপজেলামুখী বিশেষ করে জেলা পরিষদের মূল রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে গেছে মানুষ। পরে জায়গা না পায় এমন একটা তাড়া সবার মধ্যে। কেউ লাঙল কাঁধে, কেউ মই, কেউ বা কোদাল কাস্তে। কৃষি উপকরণ যে যার মতো কাঁধে বা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। যাদের কাছে এগুলো নেই, তাদের হাতে ফেস্টুন কিংবা পোস্টার। আর অল্প কিছু বাদে বাদে পাঁচ বাই তিন ফিট ব্যানার। যার প্রতিটিতে আছে একটি করে দফা। নিচে এক কোণে কোনও না কোনও ফসলের ছবি। ধান, আলু, গম, পাট ইত্যাদি। ব্যানারের মাঝ বরাবর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, জসীম উদ্দীন থেকে শুরু করে অনেক কবি বা গীতিকারের কবিতা বা গানের দু’টি করে লাইন। যে লাইনগুলো আবাদ-ফসল বা কৃষকের জন্য রচিত। কেউ হাতমাইকে গান গায়; কৃষি সংগীত বা চাষাড়ে সংগীত। জেলা সদরের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের সামনেও চলছে মানববন্ধন। কোথাও বেশি কোথাও কম। দশজন বিশজন হলেও দাঁড়িয়ে গেছে ব্যানার হাতে নিয়ে। কণ্ঠে গান। যেগুলো অনবরত চলছিল ফেসবুকে, ইউটিউবে বা বিএফআর গ্রুপের নিজস্ব দেয়ালে। সংখ্যায় অল্প হলেও তা মাতিয়ে তোলে মিডিয়া। মাতিয়ে তোলে দেশ।

উত্তরের জেলাগুলোর কয়েক উপজেলায় ঘটেছে আর এক তাজ্জব কাণ্ড। মানববন্ধনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। রাজশাহির গোদাগাড়ি, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের কাহারোলসহ আরও কয়েকটি উপজেলাতে সাঁওতাল আর রাজবংশি নারী-পুরুষ হুমড়ি খেয়েছে। তাদের কাছে বিএফআর গ্রুপের কেউ যায়নি। কোনও এক অদৃশ্য টানে এসেছে তারা। কেউ কেউ অনুমান করল, বাম দলগুলো তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে আজকে লাইনে দাঁড়াতে। অনেকে ভাবল অনেক কিছুই। তবে অবাক হয়েছে সাধারণ মানুষ। তাদের সাজগোঁজ, আনন্দ আর আগ্রহ দেখে। মাথায় হরেক ফুল। লাল সাদা, হলুদ; বাহারি সব রং। পরনে রঙিন শাড়ি। বেশিরভাগ লাল পেড়ে; মেঝে হলুদ। বিবাহিত-অবিবাহিত সবার পরনে শাড়ি। কারও কোমরে চওড়া বিছা। পায়ে রূপার নূপুর। তাদের দাঁড়ানোর ঢঙ দেখে মনে হবে কোনও ঝুমুর নাচের প্রতিযোগিতায় নামবে এখনই। পুরুষেরা এসেছে একই সাজে। কারও কাঁধে মাদলও ঝুলছে। কেন বা কী কারণে তারা দাঁড়িয়ে, তার সঠিক উত্তর বুঝি তারা দিতে পারবে না। কে তাদের দাঁড়াতে বলেছে, সেটিও হয়ত বলবে না। তবে একটা সহজ উত্তর তারা দিতে পারবে ঠিকই। তারা আজ দাঁড়িয়েছে অধিকার আদায়ের লাইনে। নিজের অধিকার কখনও ষোলোআনা আদায় করতে পেরেছে কি-না, সে উত্তর তারা জানে না। তবে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে থাকতে হবে, সেটা তারা জানে। তা নিজের হোক আর অন্যের। নিজে থেকে সে এগিয়ে আসুক আর কেউ আসুক। বুঝেই হোক আর না-বুঝেই হোক; সটান দাঁড়িয়ে যাবে মিছিলের সামনে।

বিকাল তিনটা। এখন বলা চলে পুরো জাতি দাঁড়িয়ে পড়েছে মানববন্ধনে। কেউ দেখতে, কেউ দেখাতে। যারা দাঁড়ায়নি তারা উঁকি দিয়ে আছে টিভির পর্দায়, মোবাইল ফোনের পর্দায়। কেউ তামাশা দেখা করে দেখছে, কেউ সিরিয়াসভাবে দেখছে। দেখছে সবাই। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে লাইভ চলছে। বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বিশ^কাপ ফাইনাল চললেও বুঝি দেখাতে ঘাটতি থাকত। গ্রামের ইব্রা ফকিরের নব্বই পার করা বউ জরিনা অন্তত টিভিতে হুমড়ি খেত না। ফোকলা গালে পান গুঁজে বসে থাকত না টিভির পর্দার সামনে। আজ বসে আছে। সেও একজোড়া ডিম বেচে চাঁদা দিয়েছিল। যদিও লাইনে না দাঁড়াতে পারার আফসোস আছে জরিনার কোঁছাতে।

আজ তবে আলো আসতে ভুল করেনি। সে সেজেছে মনমতো। গোলাপি ব্লাউজের ওপর লালপেড়ে শাড়ি। শাড়ির মেঝেতে হাতে তোলা কাজ। বোঝাই যায়, এটা তার বিশেষ শাড়ি। বিশেষ দিনে পরবার শাড়ি। সে জোর করেই যেন একটা ব্যানারের মধ্যিখানে এসে দাঁড়িয়েছে; কাউকে সরিয়ে দিয়ে। মিনহাজ তার সামনে দিয়ে যাবার সময় হাসল। কথা বলল না। হাসল আলোও। আজ লজ্জা পেল না। উল্টো দিকের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ মোল্লা। সে আলোর দিকে তাকিয়ে বললÑ‘আলো তোকে কিন্তু সুন্দর লাগছে।’

‘শালা বুইড়ার তো লজর খারাপ। আগে জানলে কালো টিপ দিয়া আসতুন।’ আলো কথাটা বলে ব্লাউজের সামনের অংশ দ্রুত কৃত্রিম আলগা করে থুতু ছিঁটাবার ঢঙ করল। আলোর কথা আর থুতু ছিটাবার ঢঙে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেল মোল্লা। তবু আগের কথাকে ফিরিয়ে দেওয়া করে স্বাভাবিক হয়ে বললÑ‘তা আমরা এসেছি আমাদের জ্বালায়, তুই এলি কোন জ্বালায় ?’

‘হামার জ্বালা যে আরও বেশি গো। ও তুমি বুইঝব্যা না বুইড়া।’

‘তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ফসলের দাম বাড়লে তুর কী লাভ লো ছুঁড়ি ?’

‘লাভ তো হামারই। ফসলের দাম যতই বাড়বে ততই লাভ। ক্ষ্যাতালেরা খুশি থাকলেই তো আলোর ঘরে আলো জ্বলবে। না হোলে তুমার গুড্ডি হামার আকাশোত উড়বে ক্যান ?’ মোল্লা কথা খুঁজে পেল না। পাশ থেকে উপেন হাসি আটকিয়ে বললÑ‘দাদা থামো তো, তুমি অর সাথে পারেন ? ছুঁড়ি তো বিলকুমারীর বিল। তামান গাঙের মাছ ঐ বিলে ঘাপটি মারে।’

‘শোন ছুঁড়া, বেশি টরর টরর করিস না। তুইরে এই আন্দোলনে হামিও কিন্তুক দুইশ ট্যাকা দিইজি।’ আলো বাহাদুরি দেখিয়ে ডান কাঁধ একটু ওপরে তুলে বলল।

‘হাই হাই, করিজু কী! তুর ট্যাকার ক্যানে হামারে আন্দোলন কিনারে আইসা ডুবে নাকি, সেডাই ভাবোজি। তুই মরতে ট্যাকা দিতে গেলু ক্যান ?’

‘দ্যাক উপেন হামার মুখ খুলিস না। তুই কুন সাত ধোয়া ত্যাঁতলের আঁঠি, শুনি ? আজক্যা এই দিন বুইল্যা তুই বাঁইচা গেলু। না হলে তারিখ ধইর‌্যা ধইর‌্যা বুলতুন।’ আলো ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখ ঘুরালো।

‘এই, তোরা থামবি।’ একটা ধমক দিল মোল্লা। তবে মনে মনে হাসছে সেও; উপেনের কাবু হওয়া দেখে। উপেনকেও এবার থামতে হলো। ছুঁড়ির মুখে কোনও কথাই আটকায় না। শেষে মুখ লুকাতে পালাতে না হয়। আলোও আর কথা বাড়াতে পারল না। যাত্রীবাহী একটা বাস উপেনের পক্ষ নিয়ে ছুটে এল। যাত্রীরা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে তাদেরকে সমর্থন জানায়। ‘জয় কৃষকের জয়’ স্লোগান দিয়ে বাসটি চলে গেল শহরের দিকে।

সাংবাদিকরা যে যার মতো ব্যাখ্যা করছে পুরো ঘটনা। কোনও কিছুই যেন যথেষ্ট হচ্ছে না তাদের বিশ্লেষণে। প্রথমে দেওয়া বিশেষণকে হার মানায় পরেরটা। বিশ^বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের সামনে যে মানববন্ধন, সেখানে ঘুরেফিরে চলে সাংবাদিকের ক্যামেরা। মানুষ কম হলেও তাদের হইচইয়ে কমতি নেই। তাদের গান, তাদের ব্যানার, তাদের স্লোগান, ভারী আর ভারী। শহর থেকে বাহিরের রাস্তার সারিতে উপচেপড়া ভিড় থাকলেও কোনও হট্টগোল নেই। মাঝে মধ্যে একটা স্লোগান ফুঁসে ওঠা সমুদ্রের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়েÑ‘জয় কৃষকের জয়’।

দশ বছরের বালক থেকে সত্তর পার করা বৃদ্ধ। বাদ যায়নি কেউ। রাস্তা দিয়ে চলমান গাড়ির চালক, গাড়ির যাত্রী হাত নেড়ে সমর্থন জানায়। হাত নাড়ে মানববন্ধনে থাকা মানুষ। আবার কোনও পথচারীও ফুস করে দাঁড়িয়ে পড়ে কোনও না কোনও ব্যানারের পাশে। লোভ সামলাতে পারে না, আজকের দিনের সহযাত্রী হওয়া থেকে। ইচ্ছে হয় ক্যামেরার সামনে পড়তে। কপাল ভালো হলে টিভিতে বা পত্রিকাতে তাকে দেখা যেতে পারে। সরব রয়েছে প্রতিটি মাইক। কোনওটাতে গান, কোনওটাতে বক্তৃতা। বক্তা এক এক করে বলে চলে কৃষকের এতদিনের সব না-বলা কথা। যেন এ কথাগুলো আগে থেকেই রেকর্ড করা ছিল। এখন বাজায় শুধু। কিন্তু না, কেউ না কেউ এখনই বলছে জীবন্ত কথা। বলছে ধান, আলু, গমের কথা। বলছে পটোল, পাট, বেগুন, টমেটোর কথা। বলছে দামের কথা, অধিকারের কথা, সম্মানের কথা। বলছে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি নিয়ে কীভাবে সরকারি গুদাম ভরানো যায়, তার কথা। তারা যেন আগামী সংসদ অধিবেশনের বক্তাদের কথা বলা সহজ করে দিতে ব্যস্ত। তারা এক এক করে বলে চলে তাদের দফাগুলো। অন্য মাইকে চলছে গান। দেশগান, চাষাড়ে গান। মাঝে মাঝে স্লোগানÑজয় কৃষকের জয়।

কোনও বিশৃঙ্খলা নেই, হট্টগোল নেই। আছে উচ্ছ্বাস আছে আনন্দ। সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ; সব একসঙ্গে। এ যেন এক জাতীয় আনন্দযোগ। ঈদ, দুর্গাপূজা এমন কি জাতীয় নির্বাচনকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে আজকের পনেরো মিনিট। সরকারপক্ষ, সরকারদলীয় এমপি, মন্ত্রী এমন কি প্রধানমন্ত্রীও যেন তাকিয়ে ছিল এমন একটি দিনের জন্য। তাকিয়ে ছিল এমন একটি মোক্ষম সময়ের দিকে; যা সাহায্য করবে এক আইন তৈরিতে, বাধাদানকারীদের কাঁধে বন্দুক রেখে করা যাবে আইন। যে জোগানদাতারা এতদিন বাধা দিয়ে এসেছিল, তাদের অন্তত বলতে পারবে ‘আমরা নিরুপায় এই জনস্রোতে’।

খ্যাতনামা কৃষি গবেষক ও জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর  পুরোধা শাইখ সিরাজ নেই কিন্তু তার দলের সবাই আছে আজকের কৃষিবন্ধনে। আছে ‘কৃষি দিবানিশি’, ‘শ্যামল বাংলা’, ‘সবুজ বাংলা’ সহ সকল কৃষি অনুষ্ঠানের হোতারা। কেউ ভালোবেসে, কেউ ব্যবসা সফল প্যাকেজ বানাতে। তবে এসেছে সবাই। টিভির ক্যামেরায় সংবাদকর্মী সকল জেলাকে ধরে ধরে দেখায়। জেলার ইতিহাসের সঙ্গে মেলায় বর্তমানের ইতিহাস। কম জানারাও ভান করে বেশি জানার। তারা যে যার মতো বিশ্লেষণ করে চলে পনেরো মিনিট। নাচোলের মানববন্ধনকে ব্যাখ্যা করছে ভিন্নভাবে। সাঁওতাল রমণীর লাইনে গিয়ে প্রত্যেককে বলে ফেলে নাচোলের রানি। বলে ইলামিত্রের যোগ্য উত্তরসূরি। না-বুঝেই গুলিয়ে ফেলে তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে এদের। দিনাজপুরের কাহারোলের তেভাগা চত্বরের মানববন্ধনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেউ আবার পাণ্ডিত্য ফলাতে চায় তার সর্বোচ্চ দিয়ে। তারা তেভাগাকে মেলায় বর্তমানের সঙ্গে। তারা গুলিয়ে ফেলে কাহারোলের তেভাগা চত্বরের সঙ্গে দক্ষিণ দিনাজপুরের খাপুরের তেভাগা চত্বরকে। সেখানে রাজবংশী পুরুষ আর মহিলাদের সাজ আর দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দেখে মনে হয়, এই বুঝি ‘হুদুমা’ নৃত্যে মাতোয়ারা হবে। যদিও তারা দিগম্বর ছিল না। সামনে কলাগাছ নেই, লাঙল জোয়াল নেই, প্রকৃতির কাছে বৃষ্টি আদায়ের উন্মাদনা নেই। তবে উচ্ছ্বাস আর আগ্রহে কমতি নেই। বৃষ্টির জন্য না হোক, অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনকে যেন ঐ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় তারা।

পনেরো মিনিট পার হলো। কিন্তু যোগ হলো পনেরো ঘণ্টা, পনেরো দিন, পনেরো মাস, পনেরো বছর। হয়তো পনেরো শতাব্দী বা শতাব্দীর পর শতাব্দী যোগ হবে এর সঙ্গে। এই মানববন্ধন স্থায়ী হয়ে গেল মানুষের মনে। কায়া নেই, ছায়া আছে। পা নেই, পদচিহ্ন আছে। পথিক হাঁটতে গিয়েও রাস্তার দু’ধারে তাকায়। ভাবে এখানে হাজারও মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার দু’ধারে। মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল কিংবা আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। এই শিহরণে রোমাঞ্চিত হয় পথিক। শুক্রবারের পনেরো মিনিট খবরের কাগজকে বর্ণিল করল কয়েকদিন ধরে। সাক্ষাৎকার ছাপা হচ্ছে গ্রামের বড় বা মধ্যবিত্ত কৃষকের, মিনহাজের, ফারুকের। আর রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে বিবৃতি দেওয়া শুরু করেছে, যেন এই পনেরো মিনিটকে পনেরো যুগের কিনারে নিয়ে যাবে। তারা এও ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী সংসদ অধিবেশনের মূল আলোচনাই হবে শুক্রবারের পনেরো মিনিট। তাদের দফা, তাদের আন্দোলন।

॥ আট ॥

আজ বের হবেন তাসু। তাসু মাস্টার। জামিন হয়েছে বৃহস্পতিবার। কাগজপাতি প্রস্তুত করতে দেরি হওয়াতে সেদিন আর হয়নি। আজ হবে। হাজতবাস থেকে বের হলেও দেশজুড়ে জানাজানি দেখে মনে হচ্ছে কোনও এক যুদ্ধজয় শেষে দেশে ফিরছেন সেনাপতি। বরণডালা সাজিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই। গত বুধবারেও এমন একটা হইচই পড়েছিল দেশজুড়ে। মিষ্টি বিলি করেছিল অনেকে। বড় গেরস্থ, মাঝারি গেরস্থ এমন কি ক্ষেতমজুরও বাদ পড়েনি মিষ্টি খাওয়া ও খাওয়ানো থেকে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কান ছিল সবার। এমন একটা ঘোষণা যে আসবে, তা কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জরিত হচ্ছিল। সরকারদলীয় নেতা-নেত্রীর কথাতে, টকশো-নেতার বিশ্লেষণে, সাধারণ চিন্তকের কথাতে ঘুরে ফিরে ঐ বিষয়গুলোই ছিল। সবকিছুই সত্য হলো প্রধানমন্ত্রীর কথাতে। চলতি সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী লম্বা উত্তর দিয়েছেন। বলা চলে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন আন্দোলনকারীদের কাজে। কৃষকের পক্ষ থেকে দেওয়া স্মারকলিপির অধিকাংশই মেনে নিয়েছেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার জন্য কমিটিও গঠন করা হবে শীঘ্রই। আগামী বোর মৌসুম থেকেই যেন তা কার্যকর করা যায় সে চেষ্টাও থাকবে। আরও অনেক কথাই বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। যার প্রতিটিই কৃষকের পক্ষের কথা। বক্তব্য চলে সংসদে, টিভিতে। হাততালি পড়ে প্রতিটি ঘরে। ঘর থেকে বাহিরে, বাহির থেকে রাস্তায়, রাস্তা থেকে জমির আলে। আনন্দ সবখানে। মিষ্টি কেনাতে মিষ্টি খাওয়াতে। ঝুরি, খাজা, নিমকি, সন্দেস বা গোল্লা; যেটাই হোক না কেন, মিষ্টি হলেই হলো। ডায়াবেটিসের রোগী চোখে দেখা হলেও খেয়েছে। আফসোস করেছে মিষ্টিওয়ালা। তাল বুঝতে পারেনি। অল্পতেই দোকান শূন্য হয়েছে। পরীক্ষার রেজাল্ট হলে না-হয় বোঝা যায়, অমুক তারিখে এসএসসি বা এইচএসসি’র রেজাল্ট হবে। মিষ্টি বানাতে আর তাতে ফাঁকি দিতে খামতি রাখে না। দিনগুলো মনে রাখে ময়রারা। পরীক্ষার ফলের মতো আজ প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে এমন একটা কৃষি-ফল বের হবে, ময়রারা বুঝতে পারেনি। গালি দেয় তাদেরকে, জেনেও যারা ময়রাকে ইঙ্গিতটা দেয়নি।

তাসু মাস্টার বের হচ্ছেন। হাজারও মানুষ রাজশাহি কারাগারের মূল গেটের বাহিরে। কারও হাতে মালা, কারও হাতে ফুল। কেউ গাদাফুল ঝরিয়ে ব্যাগ ভরে নিয়ে আছে; তাসুর ওপর ফেলবে বলে। কারাগার চত্বরে আজ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। তবে উপস্থিত জনতাকে কেউ কিছু বলছে না। যেন তারাও আছে একই কাজে। জেলখানার বাহির গেটের সঙ্গে লাগোয়া চওড়া রাস্তা। পুব-পশ্চিম। পূর্বদিক শহরের দিকে আর পশ্চিম দিক কোর্টের দিকে। রাস্তার ওপারে সরকারি কলেজ। কলেজ বিল্ডিং-এর ছাদে ছাত্র-ছাত্রী উপচে পড়ছে। হয়ত শিক্ষকও আছে। সবার চোখ তাসুর দিকে, তাসুকে নিতে আসা জনতার দিকে। কলেজের পূবের বাড়িগুলোর ছাদেও মানুষ। দেখা যাক আর না যাক; সবাই তাকিয়ে আছে জেলখানার সামনের ফাঁকাটার দিকে।

তাসু বের হচ্ছেন কারাগারের বাহির গেট দিয়ে। দূর থেকে দেখতে পেল সবাই। সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল পুরো চত্বর।Ñজয় কৃষকের জয়। তাসু সোজা ছুটে এলেন জনতার দিকে। জনতা ছুটে গেল তাসুর দিকে। পুষ্পবৃষ্টি হলো খানিকক্ষণ। এরপর এক এক করে মালা উঠতে লাগল তাসুর গলে। তবে তাসুও উল্টো কাজ করলেন। তার গলার প্রতিটি মালা এক এক করে খুলে পরিয়ে দিতে থাকেন অন্যের গলে। আরিফ মোল্লা, মিনহাজ, সেঁজুতি, ফারুক, উপেন, রেজা, বাবু সরকার, কেউ বাদ গেল না তাসুর মালা থেকে। তার মালা বদলের ভাষাটা এমনÑএ মাল্য যতটা আমার, তার অধিক তোমাদের। তাসুর গলায় পাওয়া শত মালা উল্টো পেল উপস্থিতির শতজন। সংবাদকর্মীরাও বাদ গেল না মালা প্রাপ্তি থেকে। সারা দেশের মানুষ সরাসরি দেখছে এগুলো। টিভিতে, মোবাইলে। তাসুর মুখে ভাষা নেই। যা ভাষা, তা চোখের। ভাষাগুচ্ছ ঝুর ঝুর করে ঝরছে চোখের কোণা দিয়ে।

সবাই খেয়াল করল তাসুর হাতে একটা মোটা খাতা। শুকনো বাঁশপাতা রঙের মলাট। এতক্ষণ হইহুল্লোড়ে খেয়াল না করলেও এখন করল। অনেকেই ভাবল, এটা তাসু মাস্টারের জেল জীবনের উপাখ্যান। যা জেলের ভেতরে এতদিন ধরে লিখেছেন। আবার খটকা লাগে জানা মানুষের মনে। এটা তো সঙ্গে নিয়ে বের হবার কথা নয় ? সেনসর পেতে সময় লাগে। কিন্তু মিনহাজ আর ফারুক জানে, তাসু তার লিখিত খাতা সঙ্গে নিয়েই বের হবেন। ডেপুটি জেলারকে সপ্তাহ আগেই খাতাটা দিয়েছেন; আর অনুরোধ করেছেন সেনসর করে দেবার জন্য। যেন বের হবার দিনই তা হাতে নিয়ে বের হতে পারেন। জেলার কথা রেখেছেন। জেলার কথা রাখবেন, তা আগে থেকেই জানা। জেলার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন মাস্টারের। মাস্টারকে দু’টো কলমও গিফ্্ট করেছিলেন।

তাসুর হঠাৎ কী যেন মনে হলো। দ্রুত উপরের দিকে তাকালেন। তাকানোর ঢঙে দেরিতে মনে হবার আক্ষেপ ছিল। তার সঙ্গে তাকালো সবাই। তাসু কী দেখছেন তারা তা জনে না। তবে তারা দেখল জেলখানার বাবলা বনের পাতিকাকগুলো স্বভাবের শব্দ করে দলবেধে দূরে কোথাও যেন রওনা দিয়েছে। আবার দূর থেকে এক ঝাঁক সাদা বক মুখখোলা মালা হয়ে এদিকে কোথাও আসছে। শত শত ফড়িং উইয়ের ঢিবি থেকে বের হওয়া উড়ন্ত উই পোকার মতো জেলখানার সামনের ফাঁকা চত্বরে তাল-মাতাল উড়ছে। তারা এখন উপস্থিত জনতার মাথার ওপর। তাদের ওড়াউড়ি দেখে মনে হবে এখনই তুমুল বৃষ্টি আসবে। যদিও আকাশের আয়োজনে তা ছিল না। আকাশে যা আছে তা সৌন্দর্যের মেঘ। তাসুর চোখ সূর্যের দিকে। খাড়া দুপুরের সূর্য যদিও দাপট দেখাতে ব্যস্ত। তবু সেদিকেই তাকিয়ে আছেন মাস্টার। সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দেয় তার অপলক চোখ। কতদিন দ্যাখেননি এই সূর্যটাকে। মনে হলো সেদিনের সূর্যটাকে; যেদিন পুলিশ তাকে ধরে আনে। সূর্য তখনও ডোবেনি। ডুবতে বসেছে। গোধূলির সূর্য। ঐ সূর্যটার দিকে সেদিনও অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন মাস্টার। আজও দেখছেন। আজকের চাহনি আলাদা। সেই গোধূলির সূর্যটাই আজ মাথার ওপর। তাসুর মনে হলো, এ এক নতুন পৃথিবীর সূর্য। স্বমহিমায় আলোকিত করে আছে সব। একবার চিৎকার দিতে ইচ্ছা করল মাস্টারের। আবার হাসতেও ইচ্ছা করল চিৎকার দিয়ে। তবে কোনওটাই করলেন না। লোকজন উল্টো ভাবতে পারে। কাছের দু’একজনের ফিসফাস কানে আসতেই মাস্টার মাথাটা নামালেন। সবার চোখ তার দিকে, তার খাতার দিকে। সবার জিজ্ঞাসা আর চোখের ভাষা মাস্টার পড়ে ফেললেন। কেউ ফিসফাস করে কেউ হালকা শব্দ করে জানতে চায়, হাতে ওটা কী। খাতা কেন ? কীসের হিসাব আছে। নতুন কোনও দফা নাকি ? ইত্যাদি। মাস্টার আর দেরি করলেন না। খাতাটা বুক বরাবর নিয়ে প্রথম মলাট সামনের দিকে করলেন। খাতার মলাটে বড় বড় অক্ষরে ভরাট কালিতে লেখা ‘ফসলের ডাক’। নামটা দেখা মাত্রই পাশ থেকে ফারুক হঠাৎ চিল্লিয়ে উঠলÑজয় কৃষকের জয়। বুঝে আর না-বুঝেই হোক, সবাই একই সুরে বলে উঠলÑজয় কৃষকের জয়। যদিও তখন কারাগারের মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসছে জোহরের আজান। সেদিকে খেয়াল নেই কারও। সবার চোখ খাতার মলাটের দিকে। যে ক’জন বুঝল খাতার মানে, খাতার মলাটের ওপর লেখাটার মানে; তাদের মাথা চলে গেল প্রেস পর্যন্ত। কেউ আরও একধাপ এগিয়ে আগামী বইমেলা পর্যন্ত। কারাগারের সামনের রাস্তা তখন দু’দিক থেকেই এক কিলোমিটারের অধিকজুড়ে জ্যাম। কতগুলো ট্রাফিক পুলিশ আর মেট্রো পুলিশ তা ফাঁকা করতে ব্যস্ত।

তাসু বাহির রাস্তায় এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তার ডান হাত মিনহাজের আর বাম হাত ফারুকের কাঁধে। আরও একবার চারদিকে দেখতে ইচ্ছা করল তার। দেখলেন। সামনে দেখলেন বাড়ির ছাদ, কলেজের ছাদ। চোখ ঝাপসা হয়ে এল আবার। তার মনে হলো ছাদগুলো অনেক উঁচু। আর ছাদের মানুষ, ছাদের ছাত্ররা আরও উঁচু। উচ্চতা এগিয়ে চলে আকাশের পানে। তাসু আবারও তাকাল আকাশের দিকে। সূর্যের দিকে। সূর্য স্বমহিমায় গনগনে। সূর্যকে সাক্ষী রেখে মনে মনে বললেনÑতার বন্দিত্ব এই জাগরণকে আটকাতে পারেনি। জাগরিত হয়েছে আরও হাজারগুণ। তোড়ের মুখে এ বাঁধ না পড়লে চারদিক ভাসতো কী করে ? বাঁধ দেবার আর জায়গা রইল না। রইল কী ?

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares