বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : ইঁদুর ধরার ছলাকলা : ওয়াসি আহমেদ

সামান্য ইঁদুর নিয়ে এত কিছু! প্রথমে জিংক ফসফাইডের টোপ, তারপর আঠা, শেষমেশ চিকন লোহার জালি-জালি ফাঁদ। ইঁদুর পাত্তা দিচ্ছে না। গোড়াতে মইন তেমন গরজ করেনি। বাড়ি-ঘরে ইঁদুর, তেলাপোকা, পিঁপড়া কোন কালে না ছিল! ইদানীং পেস্ট কন্ট্রলের লোকজন নাগরিক মানুষজনকে বোঝাতে পেরেছে―আগে ছিল বলে আজও থাকবে এ কী কথা! কিন্তু ইঁদুর তো পেস্ট না, কীট-পতঙ্গ না, রীতিমতো হাত-পা-লেজধারী জানোয়ার। তার ওপর রয়েছে মুখভরতি নিশপিশপ্রবণ করাততুল্য দাঁত।

খোলা জায়গা বলতে বাড়িতে এক ফালি বারান্দা। দোতলায় বলে বারান্দা না, ব্যালকনি বলাই মানায়। ব্যালকনির মাঝখানে খানিকটা জায়গা খোলামেলা হলেও দেয়াল ঘেঁষে রাজ্যের হাবিজাবি। গোটাকয় ঢাউস কার্টন―কবে বাড়ি বদলানোর সময় কাজে লাগে কে জানে, জুতার খালি বাক্স―কী মতলবে বোঝা কঠিন, ছোট-বড় কয়েকটা তেলের জেরিকেন―ফুটো না হলে কাজে লাগতে পারে,   বেতের লন্ড্রি বাস্কেট―খুবই কাজের, ঢাকনাহীন চার-পাঁচটা গোল-গোল মাঝারি আকারের রঙের কৌটা-কাম-টবে পাতাবাহার, নয়নতারা ছাড়াও একটা মাধবীলতার চারা এত ডগোমগো, পারে তো লকলকিয়ে রেলিঙ টপকে গোটা বারান্দার গ্রিল-ট্রিল সবুজ লতা-পাতায় ছেয়ে ফেলে। আরও আছে―হাতলওয়ালা পুরোনো আমলের দশাসই কাঠের চেয়ার, বেতের মোড়া, ঘাড়ভাঙা একটা টেবিলফ্যান, রাজশাহী থেকে কবে কার পাঠানো আমের গোটাকয়েক ডাঙর ঝুড়ি, আম সাবাড় করার পর খালি ঝুড়ি নিঃস্ব স্মৃতি হিসেবেই টিকে আছে। এসবের ফিরিস্তি কোনও কাজের না। আসল জিনিস যা ব্যালকনিকে জাতে উঠিয়েছে সেটা মাসদুয়েক আগে কেনা ঝা-চকচকে এলজি ওয়াশিং মেশিন। বাড়ির সবচেয়ে দামি জিনিসটা বারান্দায়, মইনের বউ শাহানা পারলে বসার ঘরে ঢোকাত। ইঁদুর যে একসময় একে নিশানা করবে জানতে কিছুটা সময় লেগেছিল।

শুরুটা করেছিল অন্যান্য জিনিস দিয়ে। হাবিজাবি জিনিস হলেও দাঁতের ধার পরখ করতে বা কেটে তছনছ করে নিজের কেরামতি জাহির করতে অসুবিধা কোথায়! এক সকালে শাহানা ও তার কাজের মেয়ে নার্গিসের চোখ কপালে উঠল জুতার বাক্স ও কার্টনের দফারফা দেখে। ইঁদুর সন্দেহ নেই। বাচ্চা বিয়োবে বলে কার্টনে বাসা বেঁধেছে ? কিন্তু এল কোথা থেকে ? ঘরের ভিতরে কোনও আলামত নেই। নিশ্চয়ই দেওয়াল বেয়ে ওঠে, বা হতে পারে বাইরের ঘোড়ানিম গাছের যে ডালটা আকাশ বরাবর মাথা তুলতে গিয়েও কী আহ্লাদে ঘাড় বাঁকিয়ে দোতলার কার্নিশে কপাল ঠেকিয়েছে, সেটা বেয়ে ব্যালকনিতে নামে। সে যা-ই হোক, শাহানা ও নার্গিস একমত―বাইরে থেকে ঢোকে, আর তা রাতে।

কার্টন বা জুতার বাক্সর পর পুরু প্লাস্টিকের জেরিকেন, কড়ুই কাঠের গাবদা চেয়ারের পায়ায় অচিরেই ইঁদুরের দাঁতের কারসাজির দেখা মিলল। জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে ইঁদুরের বাসা বাধার লক্ষণ পাওয়া না গেলেও শাহানা বা নার্গিস দুইজনই নিশ্চিত মাত্র কয়েক দিনে যখন এতদূর, হারামিটা বিরাট ক্ষতি না করে ছাড়বে না। বিরাট ক্ষতিটা কী এ নিয়ে মাথায় ঝটপট কোনও ধারণা না এলেও শাহানার তো বটেই, নার্গিসেরও মনে হলো যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। এ পর্যায়ে যখন মইনকে এর মধ্যে টানা হলো, সঙ্গে মইন ও শাহানার দুই ছেলেমেয়ে―তেরো বছরের পলাশ ও দশ বছরের জুঁই, তখন সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় বাড়িতে যাকে বলে সাজ-সাজ রব। শুরুতে জিংক ফসফাইডের বিষ। সুদৃশ্য প্যাকেটে পাওয়া যায়, প্যাকেটের গায়ে কুচকুচে নেংটি ইঁদুরের ছবি না থাকলে নুডল্স বা ইনস্ট্যান্ট সুপের প্যাকেট বলে যে কেউ ভুল করবে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির প্রডাক্ট, সম্ভবত সেজন্যই প্যাকেটের গায়ে বিষের বদলে বেইট লেখা―রেট কিলিং বেইট। হ্যাঁ, বেইট কথাটা মানানসই। ইঁদুরের মতো ত্যাঁদড়  জানোয়ারকে টোপ দিয়েই লোভে ফেলতে হবে।

কাজ হলো না। তিন-চার রাত গমের দানায় মেশানো জিংক ফসফাইডের টোপ ছড়িয়ে ভোরের অপেক্ষায় থাকাই সার হলো। ইঁদুর টোপের লোভে পড়েনি, যেন জানে লোভে পাপ, পাপে…। নিশ্চয়ই  ছোটবেলা থেকে বড়দের বা জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মুখে টোপের লোভে না পড়ার সাবধানবাণী শুনে এসেছে। কথাটা বলল নার্গিস, আরও বলল, ইন্দুর তো খালি এট্টুন ইন্দুর না, হেরা মাইনষ্যের তনে বেশি বুদ্দি রাখে। বলে এও জানাল ইঁদুর মানুষের আক্কেল-বুদ্ধি নিয়ে মশকরা পর্যন্ত করে, মুখে যে তার কিচ কিচ আওয়াজ তা মানুষকে বোকা বানানোর ফুর্তিতে। মইন শুনে হাসল, একটা সামান্য ইঁদুরের উৎপাতে চটপট এমন প্রায়-দার্শনিক মতামতে সে কী করতে পারে! তবে ইঁদুর যে বিষাক্ত গমের দানায় মুখ দেয়নি, কারণ তারা মানুষকে বোকা বানিয়ে মজা পায়―নার্গিসের এ মতামতে পলাশ ইঁদুর নিধনে উঠেপড়ে লাগল। টোপে কাজ হচ্ছে না দেখে সে গলির মোড়ের দোকান থেকে নিয়ে এল আঠা। ঝকমকে বড় টিউবের এ আঠা আবার বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা―আট্রারেট, ননপয়জোনাস মাউজ এন্ড রেট কিলিং গ্লু, মেইড ইন ইতালি। এ টিউবেও যদি কালচে রঙের নেংটি ইঁদুরের ছবি না থাকত, উন্নতমানের টুথপেস্ট ভেবে ব্রাশে চেপে মুখে চালান করা অস্বাভাবিক হতো না। পছন্দসই আঠা পেয়ে পলাশ যারপরনাই উত্তেজিত। উত্তেজনাবশে রাস্তায় শোনা ফেরিওয়ালাদের গলা নকল করে ছড়া কাটতেও লেগে গেল―ইন্দুর তোমার রক্ষা নাই, ধরা পড়লে জামিন নাই।

এর মধ্যে বড় ঘটনাটা ঘটে গেল। এ নিশ্চয় সেই বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়ে। কাগজের কার্টন, জুতার বাক্স, জেরিকেনের দফারফা করে কোন সুযোগে যে ইঁদুর ওয়াশিং মেশিনের পেছনের ফাঁক-ফোকরে পথ করে ভিতরের ড্রামের পুরু রবার কোটিং, ড্রেইন হোস, কন্ট্রোল প্যানেলের তার, পাইপ কেটেকুটে শাহানার এত সাধের মেশিনের বারোটা বাজিয়ে বসে আছে তা আবিষ্কার করে শাহানা তো শাহানা, অফিসে বসে মইনও দুঃসংবাদ পেয়ে থম ধরে বসে থাকল। বউয়ের অনেক দিনের সাধ মেটাতে ঈদ-বোনাসের পুরোটাই ঝেড়ে দিতে হয়েছিল।

পলাশ মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার উপায় নেই জেনে মায়ের প্রতি সহমর্মী হতে অল্প কথায় নিজের মনোভাব প্রকাশ করল―দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা। এত বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর ইঁদুরটাকে পাকড়াও করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তিল তিল করে মেরে ফেললেও মজা পাওয়ার ঘটনা ঘটবে কি না কে বলবে; তবে  প্রতিহিংসা মেটানোর একটা অনুভূতি নিশ্চয় জুটবে―যদিও তেমন ঘটনা না-ঘটা পর্যন্ত ঠিক আঁচ করা কঠিন। তবু পলাশের দাঁড়াও, দেখাচ্ছি একটা পাকা সংকল্পের মতো শোনাল। ছেলের কথা শাহানা শুনল কি না কে জানে। কেটে তছনছ প্লাস্টিকের, রবারের টুকরাগুলোর দিকে তাকিয়ে কী করবে ভেবে না-পেয়ে অনেকটা বেলা পর্যন্ত ব্যালকনির মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে থাকল।

সদ্য কেনা মেইড ইন ইটালি আঠাকে কীভাবে কাজে লাগাবে এ নিয়ে পলাশ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করল। মেঝেতে আঠা না-ঢেলে হাতখানেক লম্বা তক্তার গায়ে দেদার আঠা ছড়িয়ে সন্ধ্যার পরপরই সে তক্তাটাকে ব্যালকনির মেঝেতে পাতল। সেই সাথে অন্য যে কাজটা করল―রান্নাঘর থেকে নার্গিসের সহায়তায় শুঁটকির টাইট বোয়ম খুলে একটা বড় লইট্যা শুঁটকি কাঁচি দিয়ে তিন-চার টুকরো করে আঠা মাখান তক্তা থেকে খানিকটা তফাতে ছড়িয়ে রাখল। পরপরই ফ্রিজে খুঁজেপেতে এক টুকরা পনির পেয়ে সেটাকেও ভেঙে শুঁটকির ওপরে ছড়িয়ে দিল। শুঁটকি ও পনিরের যৌথ গন্ধ-সুবাস ইঁদুরকে টানবে, আর  সে-পর্যন্ত যেতে তক্তা তাকে মাড়াতেই হবে।

নার্গিসের কথার মিল পাওয়া গেল―ইঁদুর মানুষকে নিয়ে মশকরা করে। পরদিন দেখা গেল শুঁটকি ও পনিরের নাম-নিশানা নাই, আঠামাখান তক্তা যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে। তক্তা পাড়ি না-দিয়ে গেল কী করে ? পলাশ হতাশ হয়ে কী করবে বুঝতে না-পেরে বন্ধুদের সঙ্গে ফের শলা-পরামর্শে মেতে উঠল। এদিকে জুঁই একটা তথ্য দিল, বলল, এটা নিশ্চয় মাউজ না, রেট। আদুরে মিকি মাউজ তো না-ই, টম অ্যান্ড জেরির জেরিও না। নার্গিসকে বুঝিয়ে বলতে সে সায় দিল, নেংটি-ফেংটি না, গেছো ইঁদুর, শরীর-গতরে ছোটখাটো বেড়ালের কাছাকাছি, বেড়াল যেমন নেংটি ইঁদুর ধরে রয়েসয়ে থাবার পর থাবায় কাহিল করে মারে, এরাও তাই করে। সেজন্য আঠা-ফাটায় কাজ হবে না, আঠা যদি গায়ে লাগেও, একটা মাস্তান গেছো ইঁদুরের পক্ষে আঠাসহ হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে কেটে পড়া কঠিন কিছু না। আর গেছোটা তো আঠার ধারেকাছেই আসেনি, সে অন্য পথে পনির ও শুঁটকির কাছে ভিড়েছে, তারপর খাওয়ার আগে পরীক্ষা করেছে বিষ-টিষ রয়েছে কি না। কীভাবে পরীক্ষা চালিয়েছে―এত দূর নার্গিস যায়নি, সে তো আগেই সাফ জানিয়েছে মানুষের চেয়ে ইঁদুর বেশি বুদ্ধি রাখে, সুতরাং পরীক্ষার কায়দা-কানুন সে জানবে কী করে! জুঁই আরও নতুন নতুন তথ্য জোগাল। তার ধারণা এটা সেই হ্যামেলিনের ইঁদুর বাহিনীর বংশধর, এর জন্য চাই একজন বংশীবাদক―পাইড পাইপার। তার বন্ধু বর্ণা শুনে হেসে বলেছে, ধুর, এটা যখন মোটাসোটা প্লাস্টিকের পাইপ, কাঠের চেয়ার পর্যন্ত কেটে ফেলে, মানে খেয়ে ফেলে, আমার ধারণা এটা ব্রাজিলিয়ান কাপিবারা জাতের বা একই বংশের মনস্টার রেট। বর্ণা জুঁইয়ের বন্ধু হলেও দুই ক্লাস ওপরে পড়ে। সে-সুবাদে সে অজানা অনেক তথ্য দিল―পৃথিবীতে সব মিলিয়ে ষাট জাতের ইঁদুর রয়েছে। এমন ইঁদুরও রয়েছে যারা ঘুমন্ত মানুষের কান, নাক, চোখ খেয়ে ফেলে, এমনকী দলবেঁধে আক্রমণ করে জ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলার ঘটনাও নাকি রয়েছে। কাপিবারাকে ইঁদুর বলা উচিত না, দেখতে একটা ব্যারেলের মতো, লম্বায় দুই থেকে আড়াই ফুট, ছোট লেজ আর দাঁত …। বর্ণা দাঁতের বর্ণনায় গেল না, কারণ যে-বইতে সে এ ইঁদুরের পরিচয় পেয়েছে সেখানে দাঁত-মুখের যে ছবি রয়েছে সেটা সত্যি বিদঘুটে ও ভয়ঙ্কর। ইঁদুরবিষয়ক জ্ঞান ঝেড়ে সে কিছুটা অভয় দিল, তোদেরটা কাপিবারা না-ও হতে পারে, তবে এটা যে বড় আর এগ্রেসিভ তাতে সন্দেহ নেই।

তক্তায় আঠা মাখিয়ে ইঁদুরের মশকরার কারণ হওয়ার পর পলাশের জন্য আরও বাকি ছিল। সেটা যেমন করুণ, তেমনই নির্মম। সকালে ইঁদুরটা আঠা বাঁচিয়ে চেটেপুটে শুঁটকি ও পনির খেয়ে গেছে দেখে পরের পরিকল্পনা ঠিক করার আগে সে আঠামাখান তক্তাটা ব্যালকনির এক পাশের দেয়ালে ডিটারজেন্ট, ব্লিচ, উজালা, ফেব্রিক সফ্টনার রাখার কাঠের তাকে উঠিয়ে রেখেছিল। এমনিতে ব্যালকনিতে পাখি-টাখি আসে না, আশপাশ ঘিরে ওড়াউড়ি করলে বা ঘোড়ানিম গাছে কদাচিৎ বসলেও ভিতরে ঢোকে না। এবার ঢুকল, তাও তক্তার আঠায় আত্মহত্যা করতে। আত্মহত্যা ছাড়া কী! আঠায় বসার কোনও কারণ ছিল না। টুনটুনি জাতের চনমনে হলুদ রঙের দুটো পাখিকে আঠায় উপুড় হয়ে কাতরাতে দেখে পলাশ এক ছুটে ওদের আঠা থেকে ছাড়াতে গিয়ে বিপদে পড়ল। টেনে ওঠাতে যাবে, দেখল পাখি দুটোর চামড়া ছিলে যাচ্ছে, জোরে টান দিতে একটার গোটা পা-ই ছিঁড়ে আঠায় গেঁথে রইল। শাহানা অবস্থা দেখে আহা রে বলে এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, ওদের আর কষ্ট দিস না, ছুরি দিয়ে গলা কেটে ফেল, মরার কষ্ট থেকে বাঁচবে। মায়ের কথায় থতমত খেলেও পলাশের মনে হলো এ ছাড়া পথ নেই। কাজটা সে করল বটে, তবে সারা দিন মন খারাপ করে ঝিম ধরে বসে থাকল। এর মধ্যে একটু পরপর টের পেল রাগে মাথাটা ঝাঁঝাঁ করছে। এত সুন্দর এক জোড়া পাখি হারামি ইঁদুরের কারণে মরল, তাও তারই হাতে, গলায় ছুরির পোচ নিয়ে!

শাহানাকে মইন কী বলে! সে মেকানিক ডাকল। বয়স্ক মেকানিক ইন্নালিল্লাহ বলে রবার ও প্লাস্টিকের ছত্রখান টুকরাগুলো দেখে জানাল এমন কারবার জীবনে দেখেনি। ইঁদুর না-হয়ে অন্য কিছু হলে হতে পারে। মেরামতি বাবদ সে বারো হাজার চাইল। পুরো ড্রামটাই বরবাদ করে ফেলেছে, কন্ট্রোল প্যানেলের কিছু আস্তো রাখেনি, তামার তার-টার পর্যন্ত চিবিয়ে ভেঙেছে। না, ইঁদুর কী করে হয়! লোকটা যতই ইঁদুর নিয়ে তার সন্দেহের কথা বলল, মইন ভেতরে ভেতরে রেগে গেল। ইঁদুর না তো এই ব্যালকনিতে ভালুক আসবে, না জিন-ভূত! দশ হাজারে রফা হলো। লোকটা অবশ্য একটা বুদ্ধি দিল, বলল, একটা চারকোনা লোহার খাঁচায় মেশিনটা বসালে আগামীতে বিপদ থেকে একে রক্ষা করা যাবে। কথাটা উদ্ভট শোনালেও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। মইন চুপ করে শুনল।

আঠাপর্বের ট্রাজেডির পর পলাশ নিয়ে এসেছে বেশ বড় আকারের ফাঁদ। মোটা তারের জালি-জালি চৌকো বাক্স, ভেতরে বড়শির মতো আংটায় শুঁটকি হোক, পনির হোক আলতো করে গেঁথে সামনের ডালাটা টেনে ওপরে জালির ছাদে আটকাতে হবে। আংটায় সামান্য টান পড়ামাত্র ডালাটা ঝপাং করে  পড়ে ফাঁদের মুখ আটকে দেবে।

পলাশের হাত থেকে নিয়ে জিনিসটা মইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। আদ্যিকালের ফাঁদ, দুনিয়ায় এত উন্নতি হলো, ইঁদুর-ধরা ফাঁদ নিয়ে কারও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। এদিকে মেকানিক লোকটা যে সন্দেহ করেছে কাজটা ইঁদুরের নাও হতে পারে, এ চিন্তাটা না চাইতেই তার মাথায় উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলে সে ভীষণ চমকাল। আসলে বাড়িতে ইঁদুর নিয়ে এত কিছু ঘটছে, কিন্তু কিছু করা যাচ্ছে না, এটাই যে মাথাকে নানা দিকে ঘোরাচ্ছে মইন বুঝতে পেরেও যেন একটা ধাঁধায় খাবি খাচ্ছে। মাথাকে সাফ করতে সে যখন পলাশের মতো ইঁদুরটাকে ধরার বা মারার চিন্তায় মন দিল, তার মনে হলো একটা ধেড়ে গুঁফো ইঁদুরকে পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। রাতে শুতে গিয়ে ঘুম ভেঙে বারকয়েক সে ব্যালকনিতে উঁকি দিতে লাগল। আবার বিছানায় গিয়ে এপাশ ওপাশ করে ঘুমের কসরতের মধ্যে ইঁদুরটাকেই পেল, আর যা না বললেই নয়, ইঁদুরটা যেন গায়ে-গতরে বড় থেকে বড় হচ্ছে। বীভৎস চোখ-মুখ, তীক্ষè ফলার মতো দাঁতে দাঁত ঘষার কট কট আওয়াজের সঙ্গে রোমশ চোয়ালের ওঠা-নামাও যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।

এদিকে এক রাতে পলাশের ফাঁদের ঝপাং আওয়াজে শুধু পলাশ না, বাড়ির সবাই হুড়মুড় করে ব্যালকনিতে গিয়ে যা দেখল তা মশকরা ছাড়া কী। একটা দুই-আড়াই ইঞ্চির নেংটি ইঁদুর। নেংটিটা ভয়ে জালির ভেতরে পাগলের মতো ছুটোছুটি করছে। জুঁই বলল, মিকি। পলাশ হতাশ মুখে এর ওর দিকে তাকিয়ে বলল, একটা টিকটিকি। জুঁই আবার বলল, মিকি।

সকালে যা কেউ আশা করেনি তাই দেখা গেল। নেংটিটা পেট চিতিয়ে মরে পড়ে আছে। হতে পারে ভয়ে, বা বারবার তারের জালিতে ঠোকর খেয়ে জখম হয়ে। রাতে যেমন মনে হয়েছিল তেমনই―লেজ বাদে শরীর বলতে দুই-আড়াই, বড়জোর তিন ইঞ্চির মতো হবে। পলাশ একটা কাঠি দিয়ে উল্টেপাল্টে নেড়ে বলল, একে ওটাই পাঠিয়েছে।

মানে ? জুঁই বলল।

পলাশ জবাব দেয়ার দরকার মনে করল না, যদিও একটু পরে বলল, আসলটা।

কথার মাথামুণ্ডু ধরতে না পেরে জুঁই কিছু বলল না, তবে নার্গিস বলল, ভাইজানরে কেমন ঠকান ঠকাইল! নিজে না আইসা পিচ্চিটারে পাঠাইল!

পলাশ বা নার্গিস মাথামুণ্ডুহীন যা-ই বলুক, আসলটা যে আসে না এ খবর তারা কোথায় পেল ? ঠিকই আসে আর প্রমাণও রেখে যায়। ব্যালকনির কাঠের দরজায় খুবলান দাগগুলো নতুন, আর সেসব দেখে যে-কারও মনে হবে আঁচড়-ফাঁচড় না, ধারালো নরুন দিয়ে কুঁদে কুঁদে বসান। খুঁটিয়ে দেখলে সেরকমই মনে হবে। কিন্তু নরুন আসবে কোথা থেকে! নখ। এরকম নরুন-নখ দিয়ে চাইলে দরজায় মনমতো ফুটো করে ফেলাও অসম্ভব না। করবে না কে বলবে! তারপর ?

সমস্যা আগে পুরোটাই ছিল পলাশের, সেই সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জও। সেই যে সে বলেছিল, দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা। মজার নাম-গন্ধ দূরের, সে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ বাদ দিয়ে চুপচাপ বসে বসে ভাবতে লাগল।

 এদিকে মইনের মাথাটা পুরোপুরি ইঁদুরের দখলে। সে ইঁদুরটাকেই দেখে চলে। যখন তখন জানোয়ারটা মাথায় হানা দেয়। দাঁতসর্বস্ব রোমশ মুখ, লাল চোখ বসানো কালচে চালতার মতো এবড়োখেবড়ো মুণ্ডুটা হঠাৎ হঠাৎ দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় না। মইনের মনে হয় তার মাথাতেই রয়েছে, এমনও মনে হয় আয়নায় দাঁড়ালে নিজের মুখের বদলে বদমাশটার মুখই দেখবে।

 মেজাজ খারাপ করে সে ভেবে পায় না একটা ইঁদুরের কী ক্ষমতা তাকে এভাবে নাজেহাল করছে! না হয় সে অতি চালাক―আঠায় পা দেবে না, বিষটোপে মুখ ছোঁয়াবে না, ফাঁদের ধারে-কাছেও ভিড়বে না, তাই বলে মইন বা তার পরিবারের কেউ তার কোনও হদিস পাবে না, ধ্বংসের চিহ্নই শুধু দেখবে!

আবার অন্য ঝামেলাও মইনকে ভোগায়। সত্যি ইঁদুর ? মেকানিক লোকটা হয়তো তেমন কিছু না ভেবেই কথাটা বলেছিল। বলা অস্বাভাবিক ছিল না―যদিও সেসময় মইনের রাগ হয়েছিল তার কথায়। এবার নিজেকে সে কী বলে!

ইঁদুর বলে যে কদাকার, হিংস্র মুখটাকে সে দেখে, সেটার আদল-নকশা আবার এক রকম থাকে না, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। অচেনা বিদঘুটে মুখটা তখনই হা মেলে বড় থেকে বড় হতে থাকে। একসময় যখন মিলিয়ে যায়, তার অস্থির অস্থির লাগে। বাথরুমের আয়নায় চোখ বুজে মুখে পানি ছিটায়, তাকাতে ভয়―কী দেখতে কী দেখবে!

এদিকে পলাশের ফাঁদের ডালা রোজ রাতে ঝপাং শব্দে বন্ধ হচ্ছে। প্রতি রাতে একটা নেংটি ইঁদুর আটকা পড়ে তারের জালিতে গুঁতো খেয়ে খেয়ে পেট চিতিয়ে মরছে। মরা নেংটি নিয়ে পলাশ বা জুঁই বা নার্গিস কথা বলে না। তারপরও রোজ রাতে রুটিনমাফিক ফাঁদটা পাতা হয়। ঝপাং আওয়াজে কারও ঘুম ভাঙে না। সকালে বন্ধ-ডালার ভিতর পেট চিতিয়ে …

 যে-ভোগান্তি মইনকে ভোগাচ্ছিল তা শাহানাকে পেয়ে বসবে মইন কল্পনাও করেনি। এক রাতে ঘুমের ঘোরে শাহানাকে হাঁসফাঁস করতে দেখে সে তাকে ঠেলে তুলল। চোখ খুলেই শাহানা বলল, না, ইঁদুর না। বলেই আতঙ্কিত গলায় বলল পানি খাবে। সে জেগে না ঘুমিয়ে ঠিক বোঝা গেল না। উঠে গিয়ে পানি নিয়ে ফিরে এসে মইন দেখল সে আবার ঘুমে ঢলে পড়েছে। শাহানার কাছে জানতে চাইতে পারত, কী তবে ?

 জবাব না-পেলেও শাহানার মতো ঘুমঘোরে না, মইন জেগে জেগে শাহানার কথায় সমর্থন জোগাতে শাহানার কথাটাই জোরে জোরে আওড়াল। একবার, দুইবার আওড়াল। তখনই ব্যালকনিতে ঝপাং।

ফাঁদ পাতা ব্যালকনিতে প্রতিরাতে একটা নেংটির ধরা পড়া ও মরা ছাড়া উপায় কী!

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares