বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : নীল হাওয়ার সমুদ্রে : পারভেজ হোসেন

‘বিকেলেই আসো। কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায়।’ আর কিছু বলতে না দিয়ে ফোন রেখে দিল রত্না।

আমিও ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ বলে কমন রুমের কয়েন ফোন ছেড়ে হোস্টেলের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভার্সিটিতে হরতাল চলছে। তাই এসময় মাঠে বল খেলছে ছেলেরা। কলা ভবনে মিছিলের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। আজ আর ওদিকে গেলাম না। হঠাৎই মাথায় এল কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটা কেন ? সব কিছুতে এই এক আজব দিকদারি মেয়েটার! আকাশে মেঘ, ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধ হয়। হাওয়ার ধরনটা এখন তেমনই।

মহা ঝামেলায় পড়া গেল তো! এটা ভাদ্রের শেষ সপ্তাহ। অথচ আষাঢ়-শ্রাবণের মতো যখন-তখন ঝুম বৃষ্টি নামছে। আজও সম্ভাবনা আছে। ঘরে ছাতাও নেই। বৃষ্টি হলে শ্যামলী পর্যন্ত যাওয়া একটা ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এ নিয়ে অযথা ভাবতে চাইলাম না। নামলে নামুক, নিউমার্কেট থেকে মিনিবাসে উঠে শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে নেমে রিকশা নেব। অসুবিধা কি, ভিজেই যাব না হয়।

ব্যাপারটা হলোও তাই। শেখেরটেকে ওদের বাসার গেটে গিয়ে নামতে নামতেই শার্ট-প্যান্ট ভিজে গেল আমার। চার তলার ফ্লাটে উঠে কলিং বেল টিপতেই রত্না গেট খুলে দিল। একটা টাওয়েল এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘মুণ্ডুটা মুছে নাও। ঠাণ্ডা লাগবে। তোমার তো আবার ঠাণ্ডায় এলার্জি।’

ওয়াশরুমে ঢুকেই দেখি হ্যাঙ্গারে ওর লাল ব্রা ঝুলছে। মেয়েটার আক্কল নেই নাকি! এভাবে রাখে কেউ ? কিন্তু ভেতরে ভেতরে শিহরিত হলাম আমি। ইচ্ছে হলো ধরে দেখি কিন্তু ধরলাম না। ধুউর! আসলে বাইরের ঘরের ওয়াশরুমে না ঢুকে ওর বেডরুমেরটায় ঢোকা আমারই বোকামি। রত্নাও আবার এদিকটাই তো দেখিয়ে দিল। হয়তো বাইরেরটায় বুয়া ঢুকেছিল।

বেরিয়ে এসে সোফায় বসতে না বসতেই খালাম্মা এলেন। ‘তুমি তো ভিজে গেছ, বাবা।’ বলে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। সোফায় বসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্রামে গিয়েছিলে শুনলাম। কবে ফিরেছ ? তোমার মায়ের অবস্থা এখন কেমন ? দুলাভাই কি চিঠিপত্র কিছু দিয়েছেন ?’

খালাম্মার দুলাভাই মানে আমার বাবা। ছ’বছর হলো দুবাই থাকেন। তখন আমি নাইনে পড়ি। বাবা হুট করেই চলে গেলেন। সেই যে গেলেন আর ফিরলেন না। কখনও ফোনও করেন না। ওনার ফোন নম্বরও আমাদের কারও কাছে নেই। মাঝে মধ্যে চিঠি লেখেন। নিয়মিত টাকাও পাঠান কিন্তু বাড়িতে আসেন না। কেন আসেন না আমার জানা নেই। সম্ভবত কারও জানা নেই। জানলে একমাত্র মা-ই হয়তো জানেন। কিন্তু এ নিয়ে বরাবরই তিনি নীরব।

আমি যেবার ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হয়েছি রত্না তখন এইটে পড়ে। তাতে কি, বুদ্ধি-সুদ্ধি যা আছে তা নিয়ে ওই বয়সেই যথেষ্ট পেকে গিয়েছিল সে। ওর ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এইসব নিয়ে আলাপকালে ও একদিন বলে, ‘যা-ই বলো, এর মধ্যে ঝামেলা কিছু একটা আছেই। খালুর মতো মানুষের এমনটা তো করার কথা না। ঢাকায় থাকতে তো রোজ আমাদের বাসায় আসতেন। আমাকে আদর করতেন। আসার সময় কিছু না কিছু তাঁর হাতে থাকতই। অথচ বিদেশে যাবার পর একদিনও কোনও খোঁজ নেননি। একটা চিঠিও দেননি কোনওদিন। আশ্চর্য-না, বলো ?’

সেদিন ওর কথায় অজান্তেই আমার অন্তরটা দুফাঁক হয়ে গিয়েছিল। রত্নার বলা এই বাবাকে তো আমি চিনি না। ছেলেবেলায় কোনও দিনও তাঁর কোলে উঠেছি কি না আমার মনে নেই। তাঁর হাত ধরে কোথাও গেছি বা কোনও কিছুর জন্য বায়না ধরেছি আর উনি তা মিটিয়েছেন এমন কোনও স্মৃতিও নেই। রাশভারি গম্ভীর একটা মানুষকে কেবল ভয় পেয়ে বড় হয়েছি আমি। মাকে কখনও দেখিনি বাবার সঙ্গে বসে গল্প করতে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে। ঢাকায় চাকরি করতেন বলে বাড়িতে গেলে দাদা-দাদিও তাঁকে সমঝে চলতেন। মোদ্দাকথা বাবা ছিলেন আমাদের কাছে শহুরে চাকরিজীবী একজন দূরের মানুষ।

অন্য সময়ের মতো আজও খালাম্মাকে একটা একটা করে বাড়ির খবর সব খুলে বলি। শুধু বলি না যে, আম্মা তো একবারও আপনার কথা কিছু জিজ্ঞেস করেন না। পাঁচ বছর ধরে আমি ঢাকায় লেখাপড়া করছি। বাড়িতে যাচ্ছি, ফিরে আসছি। আমি এলে সব সময় আপনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু আম্মা ? তাঁর যে একজন বোন আছে এই পৃথিবীতে, একটা বোনঝি আছে, সেই মেয়েটার যে বাবা নেই, আত্মীয়-পরিজন যা আছে সব না-থাকার মতো। কারও সঙ্গেই খালাম্মার তেমন বনিবনা নেই। এই অবস্থায় তাঁরা কেমন আছে, কি করছে, কীভাবে চলছে তাঁদের―কই! একটিবারও কি কিছুই জানতে ইচ্ছে করে না তাঁর ? 

আমিও যে আম্মাকে বা খালাম্মাকে এ নিয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করি না, খালাম্মা তা ভালো করেই জানেন। আম্মাও জানেন।

অসুস্থ শরীর এবং শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে একটা নিরামিশ সংসার টেনে টেনে নীরবে মুখ গুঁজে চলা আম্মা অল্প বয়সেই বুড়ি হয়ে যাচ্ছেন। যে নারীর স্বামী থেকেও এরকম না থাকার মতো, একমাত্র ছেলেটাও কাছে নেই, তাঁর বুড়ি না হয়ে উপায় আছে ?

হয়তো উপায় আছে। হয়তো কেন, অবশ্যই উপায় আছে কিন্তু আমার আম্মা ঐ ধাঁচের নারী নন। নিতান্তই অবোলা। একপেশে। গোয়ালের গাইয়ের মতোন। ছা-পোষা মুরগির মতোন।

প্রথম প্রথম দেখা হলেই আমি এবং রত্না আমাদের এইসব অশান্তি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। মনে মনে আবোল-তাবোল কত কি যে ভাবতাম। মাঝে-মধ্যে কান্নাকাটিও করেছি। এখন আর করি না। কোনও তিক্ততা নিয়ে চটকাতে এখন আর ভালো লাগে না।

খালাম্মাকে সামলে রত্নাকে নিয়ে ওর ঘরের বারান্দায় চলে আসি আমি। পূর্বদিকের দেয়াল বেয়ে উঠে ঝোপ হয়ে গেছে বোগেনভেলিয়ার ডালগুলো। বৃষ্টিভেজা লতাগুলো ঝকঝকে সবুজ পাতা আর রঙিন ফুলে ভরে আছে। চারদিকে নতুন নতুন পাঁচতলা থেকে শুরু করে আটতলা পর্যন্ত দালানের জঙ্গল। তবুও ওর এই দক্ষিণমুখী বারান্দা কিন্তু আলো-হাওয়ায় একাকার। আমি ওই উঁচুতে দূরের ওই আকাশে একঝাঁক চিলের অনবরত চক্কর খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনের মধ্যে আনন্দ হয়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর রোদহীন নির্মল বাতাসে ডানা মেলে দিয়েছে চিলগুলো। ঢাকায় এই দৃশ্য বিরল। বিশেষ করে নতুন ঢাকায়। রত্না বোধ হয় খেয়াল করেনি। ও গম্ভীর হয়ে বলে, ‘তোমার টাইম সেন্সটা কিন্তু আমার দারুণ লাগে, শুভ ভাই। ঠিক পাঁচটায়ই এসেছ আজ।’

‘শুধু তোর জন্য। আর তুই পারসও বটে। অন্যত্র কিন্তু সময় নিয়া আমি তেমন একটা মাথা ঘামাই না।’ বলে আকাশ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে ওর মুখের দিকে ঘোরাই। রত্নাও তাকিয়ে আছে। আমাদের পরস্পরের চোখে চোখ পড়তেই ও বারান্দা থেকে বেরিয়ে যায়। খালাম্মা ডাকছেন ওকে।

আমার নানার দুটি মাত্র সন্তান। এই দুই মেয়ে। আম্মা কলেজে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। খালাম্মা মাস্টার্স করে চাকরি নিয়ে কলেজে ঢুকেছিলেন। তারপর বিয়ে করেছেন। খালু ছিলেন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির জি এম। আট বছর আগে আত্মহত্যা করেছেন।

রত্না তখন অনেক ছোট। খালাম্মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে একা একা লড়াই করতে করতে এদ্দুর এসেছেন। আব্বা তো তাঁর চাকরির শুরু থেকেই ঢাকায়। যদ্দুর শুনেছি, তখন এই পরিবারের অনেক দায়িত্বই ছিল আব্বার ওপর। তিনি দেশে থাকাকালে আমি বা আম্মা গ্রাম থেকে কোনওদিনও ঢাকায় আসিনি। খালু মারা যাবার বছর দুয়েক পর তো আব্বা হুট করে দুবাই চলে গেলেন। ম্যাট্রিক দিয়ে আমাকে আসতে হলো ঢাকায়।

রত্না আর আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দুই পরিবারের নানারকম বিপর্যয় আমাদের কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এভাবে বলাটা ঠিক হলো কি ?। আসলে আমরা দুজনই পরিষ্কার করে বুঝতে পারার মধ্যে ঢুকছিলাম মাত্র। আত্মীয়স্বজন আমাদের নিয়ে তখন কী কী যে ভাবত বা এখনও কী যে ভাবে জানি না। তবে ওর আর আমার এসবে অভ্যাস হয়ে গেছে। এ ধরনের বিষয়গুলো আর মাথায় নিই না আমরা।

দুটো প্লেটে করে মুড়িমাখা নিয়ে ঢুকল রত্না। বললাম, ‘এতদূর ডেকে এনে শুধু মুড়িমাখাই খাওয়াবি ?’

রত্না বেশ একটা ভাব নেয়, ‘চিন্তা করো না, রাতে খেয়ে যাবে। মা পোলাও রাঁধবেন বলেছেন।’

একটু অবাক হলেও মনের মধ্যে আনন্দ টের পাই। অনেক রাত পর্যন্ত ওর সঙ্গে থাকতে পারব। বলি, ‘পোলাও কেন রে ? কোনও …’ কথা শেষ করতে পারি না। রত্না ভেংচি দিয়ে বলে, ‘পোলাও রাঁধতে গেলেই কারণ লাগবে! তোমাদের মতো গাইয়া নাকি আমরা ?’

ঠাট্টার কথা তবু সন্দেহ জাগে এটা আসলেই ঠাট্টা কি না। মুড়ি খেতে খেতে আমি ওর দিকে দীর্ঘ নয়নে তাকাই। রত্না মরিচ খেতে পারে না। মাখান মুড়ি থেকে চামচ দিয়ে একটা একটা করে মরিচের টুকরা সরাচ্ছে ও। আঙুলের নখে চকচক করছে ট্রান্সপারেন্ট নেলপলিশ। ছড়িয়ে আছে শ্যাম্পু করা ঘন কালো চিকচিকে চুল। সেই চুলের ভেতর বাম কানের লম্বা দুলের পাথর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। নাকের রত্নফুল থেকেও। ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে আমার কিন্তু সব সময়ের মতো নিজেকে সংযত রাখি। একেকবার মনে হয় ও বুঝি বলছে, হ্যাঁ, ধরে দেখ। তুমি এমন কেন, শুভ ভাই ? একটা মেয়ে কি হ্যাংলার মতো সেঁধে বলবে, আমাকে ছুঁয়ে দেখ।

মেয়েদের চোখ নাকি এক লহমায় পুরুষের মনের ভাষা পড়ে নিতে পারে। সত্যি কি পারে ? তা হলে তো এতদিনে ও আমাকে মুখস্থ করে ফেলেছে আর সে কারণেই হয়তো যখন-তখন আমার ওপর যে কোনও রকম কর্তৃত্ব ফলায়। ফলাক না, ওর কর্তৃত্ব আমার ভালো লাগে। ওর দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকি। ওকে নিয়ে আমাদের বাড়ির পুকুরে হিজলভাসা রঙিন জলের ওপর দিয়ে, লেবু ফুলের গন্ধ গায়ে মেখে সবুজ ধান খেতের দিকে হেঁটে যাই। মুড়ি শেষ করে রত্না তার হাতের খালি প্লেটটা দিয়ে গুঁতো দিলে হাঁটা থামিয়ে হুঁশে আসি আমি। ততক্ষণে আমার হাতের খালি প্লেটটাও কেড়ে নিয়ে আবার বেরিয়ে যায় সে। 

খেয়ে-দেয়ে হলে ফিরে খুবই বিষণ্ন বোধ করছিলাম। হয়তো খুবই পাংশুটে দেখাচ্ছিল আমাকে। রুমমেট মোরশেদ বলে, খালার বাসাততে তো ত্যালে-ঝোলে খাইয়া আইলা মিয়া। কোথায় চাঙ্গা হইয়া থাকবা, তা না, ম্যাদা মাইরা আছ! তোমার একটা চিঠি আছে ড্রয়ারে, দ্যাখো।’

হ্যান্ডেল টেনে চিঠিটা হাতে না-নিয়ে ড্রয়ার ঠেলে দিলাম। এখন পড়তে ইচ্ছে করছে না। জানি আমার ক্লাসমেট আঁখির চিঠি। প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে তবু সপ্তাহে একখানা খাম আসে। কি আর লিখবে!  ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তো সেই একই কথা আঁখির। কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে আমার হয় না। আসে না। কি আর করতে পারি! নিশ্চিত সে আমার ভালো বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্বের দেয়ালটা ডিঙোতে চায় ও। ইনিয়ে বিনিয়ে সে কথাই লেখে রোজ। পারেও মেয়েটা।

সকালে চিঠিটা খুললাম। হাতের লেখা দেখেই বুঝেছি এটা রত্নার চিঠি নয়। আমার দাদু লিখেছেন। দ্রুত পড়ে চিঠি হাতে আবার শুয়ে পড়লাম। দাদু লিখেছেন, শিলা ফুপু আসবেন। হিসেব করে দেখলাম আজ থেকে সাতদিন পর। উনি এলে আমি যেন রামপুরায় তাঁর বাসায় গিয়ে দেখা করি। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে যাই। বাসার ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বরও লিখে দিয়েছেন।

আমার দুজন ফুপু। একজন ছিলেন গ্রামের গৃহিণী। অনেক বছর আগে ছেলে জন্মাতে গিয়ে মারা গেছেন। অন্যজন এই শিলা ফুপু আমার খালার বয়সি। লন্ডনে থাকেন। আট বছর পর দেশে ফিরছেন। খুবই মুখরা। আমার আম্মা তো তাঁকে জমের মতো ভয় পান। ফুপুর মুখে কিছুই আটকায় না।

ফুপু ঢাকায় এলে পরে অনেকক্ষণ ফোনে কথা হলো। খালাম্মার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানতে টাইলেন। খুবই ভালো ব্যবহার করলেন আমার সঙ্গে। অনার্স ফাইনালে উঠেছি শুনে খুশি হলেন। হুকুমের সুরেই বললেন, কালই যেন সময় নিয়ে তাঁর বাসায় যাই। 

আমাকে দেখে তো ফুপু অবাক। পায়ের ধুলো নিতে দিলেন না। টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আমার ছেলেটা দেখো কত্তো বড় হইছে। মাশাআল্লা, ব্যাটা হইয়া উঠছে এক্কেবারে।’

আমি জড়সড় হয়ে যাই। কি বলব ভেবে পাই না। নাস্তা খেয়ে ফুপুর ঘরের খাটে গিয়ে বসি। তাঁর ছেলে-মেয়ে তমাল, তানিয়া কেউই আসে নাই। ফুপাও না। ঢাকায় একটা জমি কিনবেন তাই ফুপু একাই এসেছেন।

খাটের পাখায় বালিশ রেখে হেলান দিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন ফুপু। অন্যদের দেখেছি দেশে ফিরে কিভাবে বিদেশের গল্পের ফুলঝুড়ি ছোটায়। কিন্তু আমার ফুপু তেমন নন। বিদেশের কোনও কথাই বললেন না।  ফেলে যাওয়া গ্রামের কথাই কেবল বলতে থাকলেন। আট বছরের জমান কথা শেষ হতে চায় না যেন তাঁর। জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের কয়টা গরু আছে এখন ? দাদাভাই কি সব জমি চাষে দেন, না-কি হাল-হালুটি গুটিয়ে ফেলেছেন ? দাদি কি সব কাজ করতে পারেন আগের মতোন ?

আমি অল্প কথায় ফুপুর আট বছরের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে চাই কিন্তু কথার মাঝখানে একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেন তিনি। বলেন, ‘হিজল গাছটা আছে না পুকুর পাড়ের, না-কি কাইট্টা ফালাইছ ? তোমাগো তো আবার কোনওকিছু কাটতে দেরি লাগে না। বাবারে, পৃথিবীর কত কিছুই তো দেখলাম কিন্তু জলের উপর ভেসে থাকা হিজল ফুলের আলপনা যে কি সুন্দর, তা কিন্তু কোথাও দেখি নাই।’

আমার সাধ্যমতো তাঁকে আশ্বস্ত করি। বলি, ‘গেলেই দেখবেন, সব কিছুই ঠিকঠাক মতো আছে, ফুপু।’

এই কথা বলে বোধ হয় পাপই করলাম। কোথা থেকে কোথায় চলে গেলেন ফুপু। অভিমানের সুরেই কণ্ঠস্বর ভারী করলেন। বললেন, ‘কই আর ঠিকঠাক মতো আছে, বলো। আমার দুইজন মাত্র ভাই। একজন তো গ্রামে পইড়া থাকল। আর তোমার আব্বা। তাঁর কথা আর কি বলমু। সব নষ্টের গোড়া হইল তোমার খালা। নাকের ডগায় চশমাখান পইড়া উনি হইলেন প্রফেসার! আমার ভাইয়ের মাথাটা মুচরাইয়া খাইল। লজ্জাও নাই। তোর সরল সিধা বইনটা যে ঐ ব্যাটার ঘর সামলাইতেছে, তার যে একটা পোলা আছে, একবার চিন্তাও করলি না ? আরে তোরও তো একটা মাইয়া আছে ঘরে। আহাম্মক আর কারে কয়!’

আমি যে সামনে বসে আছি, ফুপুর কি সে খেয়ালও নাই ? আর এসব কি বলছেন তিনি ? আমার মাথায় চক্কর দিতে থাকে। এক জীবনের যতটুকু দেখেছি, শুনেছি, অনুমান করেছি, অনুভব করেছি, কল্পনা করেছি সবকিছু যা ছিন্নভিন্ন হয়ে আড়ালে-আবডালে, অবহেলায়, গ্রাহ্যের বাইরে পড়ে ছিল এক লহমায় তা যেন জুড়ে জুড়ে একটা গল্প হয়ে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।

ফুপু কিন্তু থামছেন না। হয়তো মনে করছেন আমার অজানা কিছু নাই, বোধকরি তেমন ধারণা থেকেই একনাগাড়ে বলে যাচ্ছেন, ‘একজনরে আর কি দুষমু, আমার ভাইও তো ব্যাডা একখান। সুন্দর মুখের রোসনাই দেইখা কাণ্ডজ্ঞান হারাইল! ভোদাই কোনহানের। শোনো বাবা, মাশাআল্লা বড়ো হইছ এখন তোমার অনেক দায়িত্ব। আব্বায় টাকা-পঁয়সা পাঠায় তো। না পঠাইলেই কি, দাদার তো আর কম নাই। তুমি আমাদের একমাত্র ছেলে।’

ফুপুর কোনও কথা আর কান দিয়ে ভেতরে যায় না। চিন্তা এলোমেলো হয়ে পড়ে আমার। কোনও মতে জোড়াতালি দিয়ে বলি, ‘আজ যাই ফুপু, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

উনি তাড়াতাড়ি একটা শার্ট, একটা টি শার্ট, একটা সিকো ঘড়ি আমার হাতে দিয়ে বললেন,‘আন্দাজের উপর কিনছিলাম, মাপে হবে কি না কে জানে।’ তারপর পার্স খুলে এক হাজার টাকা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। বললেন, ‘যখন খুশি চলে আসবা ফুপুর বাসায়। আগামী সপ্তাহে গ্রামে যাব, ঠিকাছে ?’

আমি মাথা দুলিয়ে নীরবে বিদায় হই। কিন্তু হোস্টেলে যেতে আর মন চায় না। রত্নার কথা মনে হচ্ছে, আচ্ছা ও কি জানে কিছু ? আমাদের জানাটা আসলে কোনও জানাই নয়! একবার ভাবি ফুপুকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। আবার ভাবি, কি জিজ্ঞেস করব ? এই করতে করতে কখন যে রামপুরা থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাংলামোটরে চলে এসেছি! এত কোলাহল, এত ব্যস্ততা, মানুষের এই দিকভ্রান্ত ছোটাছুটি নিতে পারছি না কিছুতেই।

একবার ভাবলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে গিয়ে ঢুকি। সাঈদ স্যারের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এখানকার আইকনিক স্লোগানমানুষ তার আশার সমান বড়। নিজেকে প্রশ্ন করি, আশা কী ? উত্তর পাই না। এই যে উত্তর পাই না, তাহলে আমি কি এতটুকুই ? স্বাধীন দেশে যে রকম করে সেনা শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠছি তাতে এর চেয়ে আর কি-ই বা চাইতে পারি ? মনে মনে বলি, স্যার আপনার সব আশার গুড়ে কিন্তু বালি।

কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির সদস্য আমি। প্রায়ই আসি। পাঠচক্রের আলোচনার পরে নাড়ু, মুড়ি, ছোলার সঙ্গে চা খেতে খেতে সবাই মিলে সাহিত্যের রাজা উজির মারি। রত্নাকে কতবার বলেছি কিন্তু যাব যাব করেও ওর আসা হয়নি একদিনও। বই পড়তে তো ওর ভালো লাগে তারপরও কেন যে আসে না, জানি না।

রাস্তা পার হয়ে গলিটার মুখে গিয়ে থমকে দাঁড়াই, না এখন যাব না। তাহলে কি বাস ধরে শ্যামলি যাব ? রত্নাকে খুব অনুভব করতে থাকি। ভেতরে ভেতরে এতটাই অস্থির হয়ে পড়ি যে কোনও সিদ্ধান্তই নিতে পারি না। বুঝলাম, পরিবারের কিছু নাজুক বিষয়ে যে অভ্যস্ত হয়ে গেছি এবং ওসব আর মাথায় নেই না বলে মনে মনে যা ভেবে এসেছি এতদিন তা আসলে ভুল। বাস্তবতা এমনই, না চাইলেও নিজের অজান্তেই সব কিছু মগজ ফুঁড়ে ঢুকে পড়ে। এ এক ঐতিহাসিক পরম্পরা। কে নয় এই জালে বাঁধা! যত দূরেই যান না কেন, যত নিভৃতেই থাকুন আব্বাও কি এর বাইরে যেতে পেরেছেন ? আরও দূরে, আট বছরের দূরত্বে থেকেও ফুপু যেমন পারেননি।

আমি এ রাস্তা হয়ে সে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আনমনে ধানমন্ডির এগার নম্বর রোডের আটচল্লিশ নম্বর বাড়ির গেটে এসে বেল বাজাই। ল্যাম্পপোস্টের বিজলি বাতিটা ফিউজ হয়ে আছে। চারপাশটা ছায়াছায়া, অন্ধকার। গেটের সামনে তীব্র আলোর একটা বাল্ব জ্বলছে শুধু। দারোয়ান গেট খুলে দিলে আমি ভেতরে যাই। নয়ন আমাকে দেখে হতভম্ব, ‘দোস্ত, তুই ? আয় আয়, ভেতরে আয়।’

আমি কাচুমাচু হয়ে ভেতরে ঢুকি। ওদের বিশাল ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাড়ির একেবারে কোনায় নয়নের ঘর। সে ঘরে একসেট ছোফা, খাট, আলমারি, পড়ার টেবিল, শেলফ. টেলিভিশন, ভিসিয়ারসহ কি নেই! আমি সোফায় বসে পানি চাইলাম। একটা মেয়েকে ডেকে পানির কথা বলে আমাকে জিজ্ঞেস করে নয়ন, ‘তোকে এমন লাগছে কেন রে ? শরীর খারাপ ? নকি অন্য কিছু।’

নরম গদিতে গা এলিয়ে দিয়ে বলি, ‘না রে, কিছু না ? হেঁটে এলাম তো তাই।’

‘ভালোই করছিস এসে। আজ থেকে যাবি। কাল একসঙ্গে যাব ভার্সিটিতে। রাতে হিন্দি ছবি দেখব।’

আমি হ্যাঁ, না কিছু বলি না। এ বাড়িতে বছর খানিক আগেও একবার এসেছি কিন্তু তখন এত চাকচিক্য ছিল না। মনে হচ্ছে রাতারাতি দেদার টাকা কামাচ্ছেন ওর বাবা। এক সময়ের প্রফেসর, তারপর একটা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন তিনি। জেনারেল এরশাদের আমলে এসে গার্মেন্টস ব্যবসায় নেমে একেবারে বদলে গেছেন। গোটাচারেক মাত্র ফ্যাক্টরি আছে বাংলাদেশে, তার একটা ওনার।

নয়ন আমাকে রেখে কোথায় যেন গেল। কয়েকটা বিয়ারের কৌটা নিয়ে ফিরে এসে বলে, ‘রাতে খাবি তো, মাকে তোর কথা বলে এলাম।’

আমি বিস্মিত হয়ে বলি, ‘কোথায় পেলি এগুলো ?’

ও ততোধিক বিস্মিত হয়ে বলে, ‘কেন, আব্বার ফ্রিজে! তুই চাইলে হুইস্কিও দিতে পারি।’

ভিসিআর-এ ইয়েস চোপড়ার ‘সিলসিলা’ দেখতে দেখতে দুটোর বেশি খেতে পারলাম না আমি। ছবি শেষ হলে নয়ন বলল, ‘ব্লু ফ্লিল্ম দেখবি ? খুব ভালো ছবি আছে।’

‘সিলসিলা’ ছবির ত্রিভুজ প্রেমের এই পরিণতি দেখার পর সত্যি ওসবের আর ইচ্ছা জাগল না। খাবার দিয়ে গেলে খেয়ে আবোলতাবোল বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে নয়ন নাক ডাকতে শুরু করল। কিন্তু আমার ঘুম আসছিল না কিছুতেই। এখন আমি কি করব ? সারারাত অবোধ অন্ধকারে, ঘুমে না জাগরণে জানি না একটা অবলম্বন হাতরাতে থাকি আমি।

ভোরে নয়নকে জাগিয়ে দিয়ে বলি, ‘আমি চললাম দোস্ত। মোরশেদকে বলবি আজ ভার্সিটি যাব না।’ ঘুমের মধ্যেই ও হু হু করতে থাকল।

কলিং বেল টিপতেই রত্না গেট খুলে হা হয়ে থাকে, ‘তুমি এত সকালে ? এরকম ভূতের মতোন লাগছে কেন তোমাকে ? কি হয়েছে, শুভ ভাই ?’

আমি কি বলব বুঝতে না পেরে ওকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকি। বলি, ‘খালাম্মা কই ?’

‘মা তো কলেজে। আটটায় বার হইছেন। কি একটা মিটিং আছে আজ।’

‘তোর বারান্দায় আয়।’

‘আমার কলেজ আছে না! একটু পরেই তো বের হবো।’

‘আজ যাবি না, আয় এদিকে।’

ওর ঘর পার হয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়াই। বুয়াকে চা বানাতে বলে আমার পেছনে পেছনেই আসে রত্না। সকাল বেলার রোদ এসে পড়েছে বোগেনভেলিয়ার ঝাড়ে। ওর দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারি মনের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ নিয়েই আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে। কিছু বলতে না দিয়ে ওর ডান হাতটা চেপে ধরে সরাসরি বলি, ‘তোকে ভালোবাসি।’

আমার কথায় ওর কোনও প্রক্ষোভ হয় না। কোনও ভাবান্তরও দেখায় না। কেবল এমন এক দৃষ্টি নিয়ে তাকায় যেন বায়োনিক চোখ আমার হাড়-মজ্জা, শিরা-উপশিরায় পরিসন্ধান চালিয়ে একটা রিপোর্ট দেবে রত্না।

এটা যেন ওর কাছে নতুন কোনও কথাই না, সেরকম ভাব নিয়ে বলে, ‘এটুকু বলতে এত দিন লাগল তোমার!’

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares