বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : নীল : ফয়জুল ইসলাম

সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণত মানুষজন যেসব রোগের চিকিৎসা নিতে আসে মোটামুটিভাবে সেগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে ফেলা যায় : জ্বরজারি, কাশি, আন্ত্রিক পীড়া, মাথাব্যথা, নিউমোনিয়া, অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রপ্রদাহ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত, চুলকানি ইত্যাদি। এসব সাধারণ রোগে আক্রান্ত কোনও রোগীর ইতিহাস চটজলদি কীভাবে নিয়ে ফেলা যাবে, টিপে দেখতে হবে তার কোন নাড়িটা, তাকে কোন্ কোন্ ডায়াগনস্টিক টেস্ট করিয়ে নিয়ে আসতে বলতে হবে অথবা দু’মিনিটের ভেতরে রোগীর জন্য ব্যবস্থাপত্র লিখতে হবে কীভাবে―ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করার সময়েই এসব শেখা হয়ে গিয়েছিল আতাহার আলির। ফুলগাজী উপজেলার হেলথ কমপ্লেক্সে নবীন মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেয়ার পরে সেই অভিজ্ঞতাটা ভালোই কাজে দিচ্ছে বলতে হবে―আউটডোরের রোগীদের জন্য ঝড়ের বেগে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিতে তাকে কোনও বেগ পেতে হচ্ছে না। এগুলো তো চেনা পাতা―এমন একটা আত্মপ্রত্যয় থেকে এক জন রোগী সামলানোর জন্য সে গড়ে ব্যয় করছে মিনিট দুয়েক মাত্র। এভাবে প্রতি দিন সকাল আটটা থেকে দুপুর আড়াইটার ভেতরে সে দেখে ফেলতে পারছে গোটা ষাটেক রোগী, বিকেলবেলায় ফুলগাজী বাজারে একটা চেম্বারেও সে সময় দিচ্ছে অনেক ক্ষণ। এমন এক দিনে ফুলগাজী হেলথ কমপ্লেক্সে এসেছিল মলিন নীল শাড়ি পরা, কুঁজো হয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধা।  

হেলথ কমপ্লেক্সের বারান্দাটায় থিক থিক করছিল অপেক্ষারত রোগী। আউটডোরের একটা রুমে বসে গরমে ঘামতে ঘামতে ঝড়ের গতিতে রোগী দেখছিল আতাহার। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত জনৈক রোগীর জন্য ব্যবস্থাপত্র লেখা হয়ে গেলে তার সামনের চেয়ারে এসে বসে কিছুটা কুঁজো সেই বৃদ্ধা, তার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মধ্যবয়সী একজন পুরুষ। আউটডোরের টিকিটে চোখ ফেলে আতাহার দেখতে পায়, বিরাশি বছর বয়স্ক এই নারীর নাম জরিমন বেগম, তার বাড়ি দরবারপুর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামে। টিকিট থেকে মুখ তুলে আতাহার দেখতে পায়, নিথর দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে জরিমন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আতাহার জানে, এমন নিস্পৃহ কোনও রোগী কখনওই ঠিকঠাক মতো রোগের ইতিহাস দেয় না। কাজেই রোগীর পাশে দাঁড়ান মধ্যপঞ্চাশের পুরুষকেই সে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী সমস্যা ইনার ?’

‘হেতি খায় নো। হুগায় যাইচ্ছে। আঁরা তো চিন্তায় মইরতেছি!’ উত্তর দেয় মধ্যপঞ্চাশের পুরুষ। পরে জানা যায়, মধ্যপঞ্চাশের এই পুরুষের নাম তোজাম্মেল হোসেন, সম্পর্কে সে জরিমনের ছেলে। ক্ষেতখোলা করেই সে জীবন চালায়। তোজাম্মেল হয়তো আরও কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু সেদিকে কোনও মনোযোগ দেবে না বলে আতাহার দ্রুত তার পিওনকে বলে জরিমনের উচ্চতা এবং ওজনটা মেপে দেখতে।

রুমের কোনায় রাখা ওজন মাপার মেশিনে জরিমনকে দাঁড় করিয়ে দেয় তোজাম্মেল। আতাহারকে পিওন জানায়, জরিমনের উচ্চতা পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি, ওজন বিয়াল্লিশ কেজি। আতাহার বুঝতে পারে, উচ্চতার বিচারে জরিমনের ওজন এমন কিছু কম নয়। বিরাশি বছর বয়স্ক একজন সুস্থ-সবল নারীর আদর্শ ওজন চুয়াল্লিশ থেকে ষাট কেজির ভেতরে থাকার কথা। জরিমনের ওজন সেই আদর্শ মাপের চাইতে খানিকটা কম। রোগীর ডান হাতের কব্জির নিচের নাড়িতে আঙুল দাবিয়ে ধরে বোঝা যায়, তার শরীরের রক্তপ্রবাহ খুব একটা জোরদার নয়। তার চোখের পাতার নিচের অংশে কিছুটা রক্ত-স্বল্পতার চিহ্নও রয়েছে। কাজেই জরিমনের রোগ সম্পর্কে আতাহার টিকিটের বাম পাশে লিখে ফেলে―ক্ষুধামন্দা ও রক্তস্বল্পতা। এ ধরনের রোগীর বেলাতে চিকিৎসাটা এমন হবে : মাল্টিভিটামিন চলবে টানা তিরিশ দিন, প্রচুর পরিমাণে কচুর শাক খেতে হবে তাকে আর তিরিশ দিন পরে হেলথ কমপ্লেক্সে আসতে হবে ফলোআপের জন্য। এই ধারার চিকিৎসাতে যদি তার খাওয়াদাওয়ার রুচি ফিরে না আসে তবে পয়লা ফলোআপের পরে তার ব্লাড এবং ইউরিনের রুটিন টেস্ট এবং কালচার করিয়ে ফলাফল দেখে নেয়া যাবে।

আউটডোর-টিকিটে পরামর্শগুলো লেখার আগে জরিমনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তোজাম্মেলকে জিজ্ঞাসা করে আতাহার, ‘পুরোনো কাগজপত্তর কিছু কি সাথে আছে ?’

আতাহারের দিকে তোজাম্মেল বাড়িয়ে দেয় প্লাস্টিকের একটা ফোল্ডার। ফোল্ডারটার ভেতরে অনেকগুলো জারজীর্ণ কাগজ ভরা ছিল। দেখা গেল, সেগুলোর বেশির ভাগই রোগীর ইতিহাস সম্পর্কে কোনও কথা বলছে না। কাগজের গাদার ভেতর থেকে কাজের বলতে শেষপর্যন্ত পাঁচটা কাগজ আবিষ্কার করে আতাহার―এই হেলথ কমপ্লেক্সের তিনটা ব্যবস্থাপত্র এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের দু’টো ডিসচার্জ সার্টিফিকেট। মানসিক হাসপাতালের ডিসচার্জ সার্টিফিকেট দু’টো থেকে রোগীর ইতিহাস সম্পর্কে একটা সারাংশ তৈরি করে নেয়া যায় : আবাসিক রোগী হিসেবে ভর্তি হয়ে সেখানে দো’তরফে থেকেছিল জরিমন―প্রথমে ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে সেখানে চিকিৎসা নেয়, অনেক দিন পরে আবারও সে সেখানে ভর্তি হয় ১৯৯৮ সালে এবং এক বছর পরেই সে রিলিজও পেয়ে যায়। প্রথমবারের ডিসচার্জ সার্টিফিকেটে জরিমনের রোগ নির্ণয় করা হয়েছে ‘বিষণ্নতা’ হিসেবে। দ্বিতীয় ডিসচার্জ সার্টিফিকেটে ডায়াগনোসিসের ঘরে লেখা আছে ‘দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা’। দেখা যাচ্ছে, ওষুধ হিসেবে দু’বারই তাকে দেয়া হয়েছিল উঁচু মাত্রার ঘুমের ওষুধ আর অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ। দু’বারই তাকে ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপিও দেয়া হয়েছিল। পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে ফেরার পরে ২০০৫, ২০০৮ এবং ২০১১ সালে ঐ একই ধারায় ওষুধপত্তর চালু রেখেছিল ফুলগাজী হেলথ কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসাররা। এছাড়া ফেনী সদর হাসপাতালে গিয়ে কাউন্সেলিংয়ের সুবিধে গ্রহণ করার ব্যাপারেও পরামর্শ দিতে তারা ভোলেনি। অর্থাৎ জরিমনের ব্যাপারটা নিছক ক্ষুধামন্দা নয়!

আতাহার তোজাম্মেলকে জিজ্ঞাসা করে, জরিমনকে আদৌ কাউন্সেলিংয়ের জন্য ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না। তোজাম্মেলের  এলোমেলো উত্তর থেকে বোঝা গেল, পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে দ্বিতীয় দফায় ফেরার পরে জরিমন আর কিছুতেই কাউন্সেলিংয়ে বসতে চায়নি।

কাগজগুলো থেকে চোখ তুলে তোজাম্মেলকে আতাহার বলে, জরিমন কেন ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া করছে না সেটার ব্যাপারে এবার কিছুটা ধারণা মিলল। কোনও মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ থাকলে তার ক্ষিধেটিধে না পাওয়ারই কথা! আর তা’ছাড়া জরিমনের বয়সও তো কম হয়নি! আশি উত্তীর্ণ বয়সে পৌঁছানোর পরে কোনও মানুষ খাওয়াদাওয়ার রুচি হারাতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক।

একটু থেমে তোজাম্মেল আতাহারকে বলে, ‘স্যার! তা বাদে কই, আঁর মা তো গায়েবী আওয়াজ হুনে, গায়েবী লোকজনের লগে হেতি কথাবার্তাও কয়! কী আর কইতাম! আবার হেতি চেতিও যায় সময় সময়! আন্নে একখান বালা ওষুধ লিখি দেন! চায়ি চায়ি আর দেহন যাইচ্ছে না!’

‘ডাক্তারদের কথা না শুনলে তো ভেজাল হবেই! এবার বলেন, কবে থেকে আপনার মা’র এসব সমস্যা শুরু হলো ?’

‘দ্যাশ স্বাধীন হওনের ফর দি।’

আতাহার আর তোজাম্মেলের ভেতরে যখন এসব বাক্যালাপ চলছে তখনও জরিমনের কোনও ভাবান্তর নেই―মাথা নিচু করে রেখে ডান হাতের মধ্যমার নখ দিয়ে সে একই হাতের বুড়ো আঙুলের নখের ধারের ভঙ্গুর চামড়া খুঁটিয়েই চলেছে।

তোজাম্মেলকে চেয়ারে বসতে বলে আতাহার। চেয়ারে বসে তোজাম্মেল আতাহারকে জানায়, ১৯৭১ সালে ফেনীতে সংগঠিত বেলুনিয়ার যুদ্ধে শহিদ হয় তার বড় ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন। মোয়াজ্জেমের বয়স তখন আঠার। সে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত ফেনী সরকারি কলেজে। পঁচিশে মার্চ থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১০ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন যখন বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তখন কোম্পানিটার সাথে যোগ দেয় ফেনী-এলাকার জনা ষাটেক গণযোদ্ধা। গণযোদ্ধাদের সেই দলে ভিড়ে যায় তরুণ মোয়াজ্জেম। পরে পাকসেনাদের দখল থেকে পরশুরাম থানার চিথলিয়া ইউনিয়ন মুক্ত করতে গিয়ে সে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে নিহত হয়। চিথলিয়া পুনর্দখলের রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধ চলেছিল ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত।

তোজাম্মেলদের জগৎপুর গ্রামের ইয়াসিন পাটোয়ারিও একজন গণযোদ্ধা হিসেবে চিথলিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সেসব গল্প ইয়াসিনের কাছ থেকেই পরে শুনেছিল তোজাম্মেল : ১০ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন বেগমগঞ্জ থেকে রিট্রিট করে ফেনীর বান্দুয়াতে তাদের নতুন ডিফেন্স গড়ে তোলে। তখন ব্যাটালিয়নটার সাথে রয়ে যাওয়া গণযোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে ত্রিপুরার মেলাঘরে চলে যায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য। সেখানে, ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে, আটাশ দিন ধরে গেরিলাযুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তাদেরকে। তত দিনে বান্দুয়া থেকে পশ্চাদপসরণ করে উত্তরের মুন্সিরহাটে নয়া ডিফেন্স গেড়েছে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের ব্যাটালিয়নটা। মেলাঘরের প্রশিক্ষণ শেষে গণযোদ্ধাদের তিরিশ জনের একটা প্লাটুন মুক্তিফৌজের মুন্সিরহাটের ডিফেন্সে যুক্ত হয়। সেই প্লাটুনের সদস্য ছিল মোয়াজ্জেম এবং ইয়াসিন দু’জনেই। ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অপারেশন চালান ছাড়াও সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছে এই গণযোদ্ধারা। পরে, ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বরে, চিথলিয়া রেল স্টেশনে যে ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ সংগঠিত হয় সেই যুদ্ধে প্রাণ হারায় মোয়াজ্জেমসহ মোট পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা।

মোয়াজ্জেমের শহিদ হওয়ার খবরটা নভেম্বরের শেষদিকেই মানুষের মুখে মুখে জগতপুরে ছড়িয়ে গিয়েছিল। চিথলিয়া থেকে জগৎপুর তো আর দূরে নয়! কিন্তু মোয়াজ্জেমকে কোথায় দাফন করা হয়েছিল তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল না তখন। দেশ স্বাধীন হলে ইয়াসিনের সূত্রে জানা গেছে, চিথলিয়া রেল স্টেশনের চত্বরেই কবর রচিত হয়েছে মোয়াজ্জেমের। সেটা একটা গণকবর।

তোজাম্মেলের দেয়া তথ্য থেকে আতাহারের ধারণা হয়, পাকবাহিনীর হাতে নিজের সন্তান খুন হয়ে যাওয়ার কারণে তখনই প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিল তাদের মা জরিমন। সেই আঘাতই নিশ্চয় বিপর্যস্ত করে তুলেছিল তাকে! ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে তাই অসাড় হয়ে পড়তে থাকে জরিমন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় থেকেই আতাহার জানে, ভয়ানক কোনও মানসিক আঘাত মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে কালে কালে বহুবিধ বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার প্রেক্ষিতে তার মানসিক বিশৃঙ্খলা দীর্ঘমেয়াদিও হতে পারে। সে এটাও জানে, এমন মানসিক বিশৃঙ্খলার নিদান দিতে পারাটা সহজ কোনও কাজ নয়। মনোরোগবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানীরা নাচার হয়ে পড়ে এখানটাতেই। তা না-হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এই পঞ্চাশ বছর পরেও জরিমন তীব্র বিষণ্নতায় ভুগবে কেন ? পাবনা মানসিক হাসপাতালের দু’টো ডিসচার্জ সার্টিফিকেটে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস দেয়া না-থাকলেও একথা মানতেই হবে, সেখানকার ডাক্তারেরা রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণের সময় নিঃসন্দেহে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের সবটাই বিবেচনা করেছিলেন। তারপরেও কেন জরিমন সুস্থ হয়ে ওঠেনি ? 

এই প্রশ্নটাই তখন মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল আতাহারের। কিন্তু সে লাগসই কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। এমন ধাঁধা লেগে যাওয়ার পেছনে কারণও আছে―মেডিসিন বা সার্জারির তুলনায় মনোরোগ সম্পর্কে মেডিকেল কলেজে তাদেরকে পড়ানো হয়েছিল সামান্যই। তা’ছাড়া ইন্টার্ন হিসেবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাতেকলমে এক বছর কাজ করার সময় সাইকায়াট্রি ওয়ার্ডে তাদের প্রশিক্ষণের মেয়াদও খুব একটা বেশি ছিল না―মাত্র চার সপ্তাহ। কাজেই এটাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভাব বলেই মেনে নিতে হয়! সে কারণে আপাতত জরিমনের আউটডোর-টিকিটে প্রথাগত ব্যবস্থাটাই লিখে দেয় আতাহার―যেহেতু গেল বছর দশেক ধরে বিষণ্নতা কাটানোর কোনও ওষুধ খায়নি জরিমন কাজেই তার বেলাতে, চিকিৎসার প্রথম পর্যায়ে, হালকা মাত্রার একটা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ একনাগাড়ে চলবে তিরিশ দিন। নতুন জেনারেশনের এই অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ খেলে রোগীর মানসিক বিপর্যয় কমে আসতে থাকবে, সে উচ্ছল হয়ে উঠবে। স্বল্প মাত্রার যে ঘুমের ওষুধ দেয়া হচ্ছে সেটাও চলবে তিরিশ দিন। নতুন জেনারেশনের ঘুমের ওষুধ এটা। তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে জরিমনের ভেতরে ঘুম ঘুম ভাবের কোনও রেশ থাকবে না। সেই সাথে মাল্টি ভিটামিনও যোগ হবে, আর দু’বেলা চলবে প্রচুর পরিমাণে কচুশাক। কচুশাক খেতে বলা হচ্ছে এই কারণে যে এতে প্রচুর আয়রন সঞ্চিত থাকে যা কি না জরিমনের রক্তস্বল্পতা কমিয়ে দেবে বলে আশা করা যায়।

তোজাম্মেলকে ব্যবস্থাপত্র বুঝিয়ে দেয়ার পরে আতাহার তাকে বার বার বলে দেয়, ঠিক তিরিশ দিন পরে যেন ফলোআপ ভিজিটে আসে তারা। তখন অবস্থা বুঝে এদিক-ওদিক করে নেয়া হবে ওষুধের ডোজ, প্রয়োজন পড়লে নতুন কোনও ওষুধের ব্যবস্থাও করা যাবে। তা’ছাড়া সেই সময়টাতে জরিমনের কাউন্সেলিংয়ের জন্য পরিকল্পনাটাও সেরে ফেলতে চায় আতাহার। এ কথা তোজাম্মেলকে মানতেই হবে, পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে শেষবার ফিরে আসার পরে গেল বছর দশেক ধরে জরিমনকে কাউন্সেলিং করেনি কেউই। ঠিক হয়নি কাজটা। ফুলগাজী উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের কোনও পদ এখন পর্যন্ত সৃজিত হয়নি বলে জরিমনকে ফেনী সদর হাসপাতালেই রেফার করতে চায় আতাহার। মোদ্দা কথা হলো, ওষুধপত্তর চললেও কাউন্সেলিং ছাড়া জরিমনের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এই সাবধানবাণীর প্রেক্ষিতে তোজাম্মেল করাল করে, তার মা’কে নিয়ে আজ থেকে ঠিক তিরিশ দিন বাদে আউটডোরে এসে সে আতাহারের সাথে দেখা করে যাবে।

              এভাবে সেদিন জরিমনের কেইস নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছিল আতাহার। আউটডোরে তার রুমের বাইরে ততক্ষণে দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল রোগীদের ভিড়। পরবর্তী সিরিয়ালের রোগীদেরকে সময় দিতে দিতে তার মাথায় কেবল ঘুরছিল সন্তানহারা এক মা’র নিথর মুখমণ্ডলের ছবি।  

ঢাকার শের-ই-বাংলা নগরে যে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট রয়েছে সেখানকার একজন মেডিকেল অফিসারকে ফোন করে আতাহার। তার নাম আবু শিহাব। শিহাব আর সে একদা ঢাকা মেডিকেল কলেজে সহপাঠী ছিল। ফুলগাজীর জগৎপুর গ্রামের সন্তানহারা জরিমনের গল্প শুনে শিহাব মন্তব্য করে, অনেকের বেলাতেই সহজে গভীর কোনও ট্রমার মীমাংসা হয় না। আর তাই দীর্ঘদিন ধরেই তাদেরকে মেডিকেশন এবং কাউন্সেলিংয়ের ভেতরে রাখতে হয়। জরিমন এমন ধরনের মানসিক রোগীর একটা ধ্রুপদী উদাহরণ বলেই মনে হচ্ছে। কাজেই তিরিশ দিনের জন্য জরিমনকে স্বল্প মাত্রার অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ খেতে বলে ভালো করেছে আতাহার। তার সাথে তো ঘুমের ওষুধ থাকলই! এই ব্যবস্থাপনায় যদি কাজ না হয় তবে পরবর্তী পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ড্রাগ ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। আতাহারের চিকিৎসার ধারার সাথে আরেক জায়গাতেও ঐক্যমত্য হয় শিহাব―ড্রাগের পাশাপাশি নতুন করে শুরু করতে হবে কাউন্সেলিং পর্ব।

              আতাহার ভাবে, শিহাব এবং তার লাইন অফ ট্রিটমেন্ট তো নতুন কিছু নয়! ফিফ্থ ইয়ারে সাইকিয়াট্রি কোর্সে তারা যেসব টেক্সট বুক পড়েছিল সেগুলোতে ট্রমার ক্ষেত্রে এমন ধারার চিকিৎসার কথাই লেখা ছিল। কাজেই শিহাবকে আতাহার প্রশ্ন করে, টেক্সট বুকের ধারার মেডিকেশন আর কাউন্সেলিংই যদি সব হবে তবে এই পঞ্চাশ বছরেও জরিমন ভাল হলো না কেন ? এ ব্যাপারে শিহাবের অভিমত : জরিমনকে ডাক্তাররা যেসব ওষুধ খেতে দিয়েছিল তা হয়ত সে খায়নি ঠিকঠাকমতো। এটাও লক্ষ্য করে দেখা যাচ্ছে, মানসিক হাসপাতাল থেকে দ্বিতীয় দফায় ফেরার পরে তাকে আর কেউই কাউন্সেলিংও করেনি! তা’হলে কীভাবে সুস্থ হয়ে উঠবে জরিমন ? এখন পর্যন্ত মেডিকেশন আর কাউন্সেলিং ছাড়া ট্রমার বেলাতে তো আর কোনও চিকিৎসার বিধান নেই!

শিহাবের এই যুক্তিকে মেনে নেয় আতাহার। তবে তার মনের ভেতরে বার বার খোঁচাতে থাকে একই প্রশ্ন : শিহাব আর তার লাইন অফ ট্রিটমেন্টে কোনও কিছু মিসিং হয়ে যাচ্ছে না তো ? এমন একটা প্রশ্নের ভেতরে পড়ে গিয়ে ভয়ানক অস্বস্তিতে খাবি থেতে থাকে আতাহার। কাজেই সন্তানহারা এক জননীর মানসিক বিপর্যস্ততার প্রকৃতি বোঝার জন্য সে সারা রাত ধরে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে। সে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যও পেয়ে যায়।

হোমারের ‘ইলিয়াদা’-য় আছে, লিদিয়ার রাজকন্যা নভির সাত পুত্রকে হত্যা করেছিল দেববংশের কন্যা লেতোর পুত্র আপোলো। একই ঘটনায় লেতোর কন্যা আর্তেমিসের হাতে খুন হয় নভির সাত কন্যা। নভি তার চৌদ্দ সন্তানের প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল হন্তারক আর্তেমিস আর আপোলোর কাছে। কিন্তু একজন মা’র আর্জি পায়ে দলে ফেলা হয়েছিল সেদিন। তারপরের গল্পটা এমন: অপাপবিদ্ধ সন্তানরা খুন হয়ে যাওয়াতে শোকে নভি উন্মাদ হয়ে যায়। থিবস্ থেকে ইজিয়ান সাগরের পূর্ব উপকূলে মাউন্ট সিপিলুসে নিজের পিতা-মাতার আশ্রয়ে চলে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে হয় তার কাছে। মাউন্ট সিপিলুসে ফিরে যাওয়ার পরেও নিজেকে প্রবোধ দিতে ব্যর্থ হয়েছিল সে। শেষপর্যন্ত সে দেবতাদেরকে অনুরোধ করেছিল, নিজের সন্তান খুন হয়ে যাওয়ার তীব্র যে ব্যথা সে বয়ে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে তা যেন তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়। নভির এই প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিল দেবরাজ জিউস। জিউস তখন তাকে একটা পাথরে রূপান্তরিত করে দেয়। জড় পাথর তো আর কাঁদে না! কিন্তু দেখা গেল, সেই পাথরের চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছে! 

আতাহার ভাবে, সন্তানহারা কোনও মা শোকের ঘোরে নিশ্চয় নভির মতো করেই প্রস্তুরীভূত হয়ে যায়, যেমনটা হয়েছিল লন্ডনের এলিজাবেথ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের ফ্রন্টে জার্মান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে কমব্যাটের সময় মৃত্যুবরণ করে এলিজাবেথের দুই ছেলে। শোকসন্তপ্ত মা তখন স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পর থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত একটা মানসিক হাসপাতাল (তখনকার সিটি অব লন্ডন মেন্টাল হসপিটাল)-এ তাকে অ্যাসাইলামে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালটা পড়েছে কেন্টের অন্তর্গত ডার্টফোর্ডে। মেডিকেশন ছাড়াও চিকিৎসা হিসেবে মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক শক আর কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তার জন্য। কিন্তু এক যুগ মতো অ্যাসাইলামে থাকার পরেও শোকগ্রস্ত এলিজাবেথ আর স্বাভাবিক হতে পারেনি। ডাক্তাররা তাকে কখনও ‘বিষণ্ন’, আবার কখনও ‘ভীষণ আবেগপ্রবণ’ মানুষ হিসেবেই তাদের কাগজপত্রে চিহ্নিত করে গেছে।

এলিজাবেথের দুরারোগ্য মানসিক বিপর্যয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জনৈক প্রাবন্ধিক বলছে: প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে সুস্থির হওয়ার আগপর্যন্ত মানুষকে শোকের বিভিন্ন পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যেতেই হয়: পয়লাতে মানুষ আপনজনের মৃত্যুকে অস্বীকার করে; তারপর ঘটনাটার কারণে সে ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়, ক্রোধান্বিত হয় এবং ঘটনাটা কেন ঘটল, তা না ঘটলে কী হতো ইত্যাদি নানা প্রশ্ন দেখা দেয় তার মনে; কোনও সদুত্তর না-পেলে সে বিষণ্ন এবং হতোদ্যম হয়ে যায়; বিষণ্নতার পর্যায়টা যদি সে কোনও মতে উতরিয়েই যায় তবে শেষপর্যন্ত সে নিজের মনে নতুন একটা অনুধাবন তৈরি করে নিতে পারে। এই আর্টিকেলটার যুক্তি অনুযায়ী এলিজাবেথ দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতার পর্যায়েই আটকে ছিল, সন্তান হারানোর ক্ষতিকে সে আর অনুমোদনও দিতে পারেনি। তাই আতাহারের ধারণা হয়, এমনটাই হয়তো ঘটেছে জরিমনের বেলাতেও। 

প্রাবন্ধিক এটাও জানাচ্ছেন, ব্যক্তির শোকসন্তাপের মীমাংসার জন্য যুগ-যুগ ধরে মানুষ বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান তৈরি করে নিয়েছে। দেশে দেশে এসব সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর চেহারা মোটামুটিভাবে একই রকমের : প্রিয়জনদের মৃত্যুর পরে ব্যক্তিমানুষ জনসমক্ষে কাঁদে, আহাজারি করে। এভাবে সে তার নিজস্ব শোক প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়। তারপর প্রিয়জনকে শেষবিদায় দেয়ার জন্য আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে সে প্রিয়জনের লাশকে ধরে আদর করে, লাশের বরফ-শীতল কপালে চুমু খায়, সবার সাথে কবরের শূন্যতায় ছুড়ে দেয় দু’-এক মুঠো মাটি, ভরাট কবরের মাটির ওপরে গজিয়ে ওঠা ঘাসে মমতায় হাত বুলায়, কাঁদে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বা হাঁটু মুড়ে বসে, আত্মীয়-পরিজনের সাথে মিলে পাঠ করে দোয়াদরুদ, আয়োজন করে মিলাদ-মাহফিল, কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের। এতে করে দু’টো সুবিধে হয়―সামজিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতে হয় বলে কাছের মানুষজনদের মাঝে নিজের শোকসন্তাপ ছড়িয়ে দেয়াটা ব্যক্তির পক্ষে সহজই হয়; দ্বিতীয়ত, মানুষের জন্মের মতো করেই মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এসব আচার-অনুষ্ঠান সমাজের অনুমোদন পাইয়ে দিতে সাহায্য করে থাকে তাকে। শেষপর্যন্ত মানুষ প্রিয়জন বিয়োগের পরে একটা সান্ত্বনা খুঁজে পায়; নিজের সম্পর্কে তার নতুন একটা অনুধাবন ঘটে; সমাজে তার নতুন একটা পরিচয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়, যেমন কারও বেলায় নতুন রূপায়ন ঘটে যায় ‘শহিদ-জননী’ হিসেবে। এভাবে মনকে মানিয়ে নিয়ে নিজের শোককে সে অনুমোদন করে ফেলতে পারে, ফিরে আসতে পারে তার হারিয়ে ফেলা স্বাচ্ছন্দ্য, স্থৈর্য।

আর্টিকেলটা বলছে, সমাজে যখন শান্তি বিরাজ করে তখন শোকসন্তাপের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে বাধা থাকে না কোনও। সমস্যাটা দেখা দেয় দেশ যখন যুদ্ধাবস্থায় থাকে। তখন কি কামান বা ট্যাঙ্ক অথবা মেশিনগানের সামনে দিয়ে অবাধে হেঁটে যাবে মুর্দাকে কবর দেয়া জন্য ? প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল সেই সময়টায় ফ্রান্সে গিয়ে মৃত দুই সন্তানকে সৎকার করতে পারেনি লন্ডনের এলিজাবেথ, আর তাই তার নিজের শোক মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে, মানুষের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে ব্যর্থই হয়েছিল সে। এমন অনিচ্ছাকৃত অবদমনের কারণেই এলিজাবেথের মাথার ভেতরটা পুরোই এলোমেলো হয়ে যায়, ডার্টফোর্ডের মানসিক হাসপাতালে অ্যাসাইলামে থাকার পরেও সে আর সুস্থির হতে পারেনি। দীর্ঘ দিন ধরে প্রথাগত চিকিৎসায় কোনও অগ্রগতি হচ্ছিল না বলে অগত্যা তাকে মানসিক হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেয়া হয়েছিল একসময়। একই ভাবে দেখা যাচ্ছে, মোয়াজ্জেমের লাশ দেখতে শত্রুর মেশিনগান পার হয়ে চিথলিয়ায় যেতে পারেনি সন্ত্রস্ত জরিমন বা লাশ ধরে একটু মাতমও করতে পারেনি সে, শেষ গোসলের পরে লোবান আর কর্পূরের বিষণ্ন আবহে তার সন্তানকে চিরবিদায় জানানোর জন্য সে কোনও সুযোগও পায়নি, সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে একটু দোয়াখায়ের করাটাও সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। তাই আতাহারের মনে হয়, জরিমনের মতো অবদমিত মা’রা যে নিমিষেই পুত্রহত্যাজনিত শোক সামলে ফেলতে পারবে সেটা ভাবাটা কোনও কাজের কথা হতে পারে না। 

ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া আর্টিকেলগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, সন্তানহারা জননী এলিজাবেথের শোকের সামাজিকীকরণের ব্যাপারটা আসলে আমলেই নেয়নি ডার্টফোর্ডের অ্যাসাইলামের ডাক্তাররা, এমনকি সেই দেশের প্রশাসনের চালকেরা পর্যন্ত। তাই এলিজাবেথের পক্ষে তার ব্যক্তিগত শোকসন্তাপের কোনও মীমাংসা করে ফেলাটা আর সম্ভব হয়নি। তবে এদিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে সাধুবাদ দিতেই হবে। ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গাতে জার্মান সৈন্যদের সাথে কমব্যাটে নিহত মার্কিন সৈন্যদের মা এবং বিধবাদের ব্যক্তিগত শোক প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার দিকে তারা নজর দিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার এগারো বছর পরে হলেও, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের ভেতরে, প্রায় সাড়ে ছ’হাজার জন হতভাগ্য মা এবং বিধবাদেরকে বিভিন্ন ব্যাচে রাষ্ট্রীয় খরচে ফ্রান্সে পাঠিয়েছিল তখনকার মার্কিন প্রশাসন। প্যারিসসহ ফ্রান্সের ছোট ছোট শহরে মার্কিন সৈন্যদের যেসব সমাধি ছড়িয়ে আছে সেগুলোতে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এসব হতভাগ্য নারীদেরকে। দল বেঁধে সমাধিগুলোতে গিয়ে তারা তাদের যার যার পুত্র বা স্বামীদের সমাধিতে দাঁড়িয়ে ফুল দিয়েছিল, কেঁদেছিল, হাঁটু মুড়ে বসে সমাধির গায়ে আঙুলও বুলিয়ে দিয়েছিল তারা। শুধু তাইই নয়, প্যারিসের আখ দ্যু ত্রিওফে অজানা মার্কিন সৈন্যদের সমাধিতে তারা ফুল দিতে গিয়েছিল সবাই মিলে। বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাইল সমুদ্রপথ জাহাজে পাড়ি দিয়ে নিজেদের সন্তান-স্বামীর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে একটু ব্যক্তিগত শোক প্রকাশ করতে পেরে এসব দুর্ভাগা নারী খুবই খুশি হয়েছিল। পরে মিশিগানের মিসেস বাকলে নামের একজন মা মার্কিন সরকারের কাছে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল এভাবে: প্যারিসে গিয়ে তার নিহত ছেলের অন্তিমশয়ান থেকে ফিরে এসে তার মনে হয়েছে, সে নিজে এবার কিছুটা হলেও শান্তি পেল! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে প্রায় এক যুগ ধরে সে বয়ে বেড়াচ্ছিল পুত্রশোক। প্রশাসনের কল্যাণে তার ছেলের সমাধিতে দাঁড়িয়ে তার সেই পুত্রশোকের একটা মীমাংসা করা গেল। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোল্ডস্টার মাদার্স এন্ড উইডোজ’ গ্রোগ্রামের নারীদের এসব প্রতিক্রিয়া খুব সরল একটা উপসংহারের দিকে নিয়ে যায় আতাহারকে : মিশিগানের মিসেস বাকলের মতো করে ফুলগাজীর জরিমনেরও হয়তো তার মৃত পুত্র মোয়াজ্জেমের কবরের সামনে একটু দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশের আকাক্সক্ষা থাকতে পারে! হয়তো সে-ও মোয়াজ্জেমের কবরের সামনে আত্মীয়-পরিজনের সাথে দাঁড়িয়ে বুক ফাটিয়ে কাঁদতে চায়! হয়তোবা সুযোগের অভাবে জনসমক্ষে সে তার ব্যক্তিগত শোক প্রকাশ করে হালকা হতে পারছে না!

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অফিসার আবু শিহাবকে লন্ডনের এলিজাবেথ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিহত সৈন্যদের মা-বউদের গল্প শোনায় আতাহার। ‘আরে! এ খবরগুলোতো জানি না!’―এমন ধারার বিস্ময় প্রকাশের পর শিহাব বলে, ট্রমার সমাধান বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে আসলে সে খুব একটা জানে না! শিহাব তাই সাইফুল ইসলাম নামে তাদের ইনস্টিটিউটের এক জন সাইকোলজিস্টের ফোন নাম্বার দেয় আতাহারকে। সে জানায়, বয়সে তরুণ হলেও সাইকোলজিস্ট হিসেবে সাইফুল দুর্দান্ত। এর ভেতরেই সে দু’জন জটিল মানসিক রোগীকে ভালো করে তুলেছে। জরিমনকে সুস্থ করে তোলার ব্যাপারে তার সাথে পরামর্শ করে দেখতে পারে আতাহার। 

জরিমনের মানসিক রোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরে সাইফুলকে আতাহার তার এক্সপেরিমেন্টের আইডিয়াটা জানায়―চিথলিয়ার যুদ্ধে নিহত মোয়াজ্জেমের মা’কে তার সন্তানের কবরের সামনে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলে কি ক্ষতি আছে কোনও ? তা’তে করে হয়তোবা একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার মা’র শোকের সমাধান হতে পেতে পারে! মেডিকেশন আর কাউন্সেলিংয়ের প্রথাগত চিকিৎসা তো চলবেই! সব শুনে সাইফুল মন্তব্য করে, রোগীকে কাউন্সিলিং করার সময় তারা যে এমন ব্যতিক্রমী পরামর্শ দেয় না তা নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সাধারণত, রোগীর পরিবারের মানুষজন রোগীর এসব সঙ্কট ভালোমতো বুঝতে পারে না অথবা বুঝতেও চায় না। তারা তো রোগীকে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট কিম্বা ঘুমের ওষুধটাই খাওয়ায় না নিয়ম করে, নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা! তো তাদেরকে দিয়ে রোগীর চিকিৎসার জন্য কোনও এক্সপেরিমেন্ট করানও সহজ কোনও কাজ হবে কি ? কাজেই জরিমনের পরিবারের মানুষজনদের ওপরে নির্ভর না করে মোয়াজ্জেমের কবরে জরিমনকে যেন আতাহার নিজ দায়িত্বেই নিয়ে যায়। আতাহার ভাবে, সেটাই ভালো।

তোজাম্মেলের কাছ থেকে আতাহার জেনেছে, চিথলিয়ার মূল যুদ্ধটা রেল স্টেশন এলাকাকে কেন্দ্র করেই সংঘঠিত হয়েছিল। সেখানেই একটা গণকবরে ১০ নভেম্বর ১৯৭১-এ মুক্তিফৌজ এবং গণযোদ্ধাদের পাঁচজন শহিদ সদস্যের লাশ দাফন করা হয়। চিথলিয়া রেল স্টেশনের দক্ষিণে পাকসেনাদের অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে তখনও অবিশ্রান্ত গুলি আর মর্টার চার্জ চলছে। জানপ্রাণ দিয়ে রেল স্টেশনের অবস্থান ধরে রাখতে চেষ্টা করছে মুক্তিযোদ্ধারা। কাজেই শহিদদের লাশ নিয়ে তারা আর বেলুনিয়াতে তাদের মূল ঘাঁটিতে ফিরে যাওয়ার সময় পায়নি। মুশকিল হলো যে তোজাম্মেল নিজে গণকবরটাতে তার ভাই মোয়াজ্জেমের শয়ানের সঠিক অবস্থানটা জানে না। এ নিয়ে কখনও কাউকে, এমনকি ইয়াসিনকেও, সে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। তার মনে হয়েছে, গণকবরে কার লাশ কোথায় গিয়ে পড়ল তা জেনে আর কী লাভটা হবে! এ প্রসঙ্গে আতাহারকে সাইফুল বলে, গণকবরের ঠিক কোথায় শুয়ে আছে মোয়াজ্জেম তা ঠিকঠাকভাবে নির্ধারণ করতে না পারা গেলেও বড় কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। গণকবরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই হয়তোবা শোকপ্রকাশের ক্ষেত্রে জরিমনের একই অনুভূতি হবে। তবুও আতাহার সাইফুলকে বলে, পয়লাতে সে জানতে চেষ্টা করবে, গণকবরের ঠিক কোন জায়গাটায় মোয়াজ্জেমকে গোর দেয়া হয়েছিল। সেই নির্দিষ্টতা হয়ত নিজের ভেতরে জমাট বেঁধে থাকা শোক প্রকাশ করে ফেলতে জরিমনকে আরও শক্ত করে গুঁতো দিতে পারবে। শহিদ মোয়াজ্জেমের সহযোদ্ধা ইয়াসিনকে তাই সে খুঁজে বের করতে চায়। ব্যাপারটা ইয়াসিনই সবচাইতে ভালো জানে।

পরদিন আতাহার জগৎপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালায়। সে খবর নিয়ে জানতে পারে, তবিবর নামে আউটডোরে একজন পিওন আছে। জগতপুরেই তার শ্বশুরবাড়ি। বসন্তপুর গ্রামের তবিবর তাই প্রায়শই জগতপুরে কাজে বা বেড়াতে যায়। তাই তবিবরকে আতাহার অনুরোধ করে ইয়াসিনের পাত্তা লাগানোর জন্য। জগতপুরে ক’টা ফোন করে দিনে দিনেই ইয়াসিনের মোবাইল ফোনের নম্বর বের করে ফেলে তবিবর। আতাহার ফোন করে যখন ইয়াসিনের সাথে দেখা করতে চায় তখন ভয়ানক অস্বস্তিতেই পড়ে যায় ইয়াসিন। উসখুস করতে করতে সে সাক্ষাতের হেতুটা জানতে চায়। আতাহার তাকে আস্বস্ত করে বলে, এটা জটিল কোনও ব্যাপার নয়―ইয়াসিনের কাছ থেকে সে চিথলিয়ার যুদ্ধের গল্প শুনতে চায় আরকি! যদি সম্ভব হয়, ইয়াসিন যেন সামনের শুক্রবার সকালে ফুলগাজী সদরে চলে আসে। তখন আতাহারের সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে যায় ইয়াসিন।

আতাহারের বাসায় বসে চা খেতে খেতে মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন জানায়, বেলুনিয়া বালজের পুরো এলাকাটাই ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছিল। সম্মুখযুদ্ধ, রেইড আর অ্যামবুশের দিনগুলোর আতঙ্ক, পরাজয়ের গ্লানি এবং বিজয়ের আনন্দ এখনও ভুলতে পারে না সে। যুদ্ধে নিহত সহযোদ্ধাদের কথাও খুব মনে পড়ে তার! ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটা কোম্পানির নিয়মিত মুক্তিফৌজ আর গণযোদ্ধা মিলিয়ে বেলুনিয়ার যুদ্ধে শহিদ হয়েছিল ১৪০ জন মতো এবং আহত হয়েছিল প্রায় ২০০ জন।

আতাহার ইয়াসিনকে জিজ্ঞাসা করে, ‘সেই শহিদদের ভেতরে আপনাদের গ্রামের মোয়াজ্জেমও ছিল। তাইই না ?’ 

মাথা নেড়ে সায় দেয় ইয়াসিন। 

চিথলিয়ায় রেল স্টেশন-এলাকায় যে গণকবরটাতে মোয়াজ্জেমসহ পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গোর দেয়া হয়েছিল সে কবরটা আতাহার এক বার নিজের চোখে দেখে আসতে চায়; শ্রদ্ধা জানাতে চায় শহিদদের প্রতি। ইয়াসিন তাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে কি না! এ প্রস্তাবে বিস্মিতই হয় ইয়াসিন; সে বলে, ‘আঁই তো ভাইবতেই পাইরতেছি না যে এই ২০২১ সালে কেউ মুক্তিযোদ্ধাগো কব্বর খুঁইজব! আঁই অবশ্যই আন্নেরে লয়া যাইতাম ফারি!’

সেই মতো আতাহার এবং ইয়াসিন এক ছুটির দিনে ফুলগাজী রেল স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে চেপে চিথলিয়া গিয়েছিল। স্টেশনটায় নেমে একটা দোকানে বসে চা খেতে খেতে চিথলিয়াযুদ্ধের গল্পটা আতাহারকে বলেছিল ইয়াসিন : ১৯৭১ সালের ৫ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ। ৫ নভেম্বর রাতে ভারত থেকে পরশুরাম-চিথলিয়ার পশ্চিম-সীমান্ত দিয়ে ঢুকে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের আলফা কোম্পানি ধানিকুণ্ডা-চিথলিয়ায় অবস্থান নিয়েছিল। গণযোদ্ধা হিসেবে আলফা কোম্পানিতে যুক্ত ছিল মোয়াজ্জেম এবং ইয়াসিন দু’জনেই। আলফা কোম্পানির অবস্থানের উত্তরে অর্থাৎ পরশুরামের দিকে এবং চিথলিয়া রেল স্টেশনের দক্ষিণে আগে থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৫ বালুচ রেজিমেন্টের দু’টো শক্ত ডিফেন্স ছিল। সেই দু’টো ডিফেন্সের মাঝে অবস্থান নিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল তারা। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল সেই রাতে। তার ভেতরেই তারা ধানিকুণ্ডা-চিথলিয়ায় ট্রেঞ্চ খুঁড়ে পজিশন নিয়েছিল।

সম্মুখযুদ্ধটা শুরু হয় ৬ নভেম্বর সকালে। চিথলিয়া রেল স্টেশনের উত্তরে তৈরি করা ট্রেঞ্চ আর ফক্সহোলে চুপিসারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তারা দেখতে পায়, চিথলিয়া রেল স্টেশনের দক্ষিণে পাকবাহিনীর ডিফেন্সের অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে একটা রেলওয়ে ট্রলি এগিয়ে আসছে রেল স্টেশন বরাবর। রেল স্টেশনে আসতেই ট্রলিটা মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশের ভেতরে পড়ে যায়। জনৈক হাবিলদার উত্তেজিত হয়ে ট্রেঞ্চ থেকে ট্রলি লক্ষ্য করে মেশিনগান চালিয়ে দেয়। তবে পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম―রেল স্টেশন পার হয়ে ট্রলিটা নির্বিঘ্নে উত্তরে চলে যাবে, পরে যে বড় দলটা আসবে সেটাকে অ্যামবুশ করবে তারা। যাহোক, হাবিলদারের মেশিনগানের গুলিতে পাকবাহিনীর এক জন অফিসার এবং ৪ জন জওয়ান স্পটেই খতম হয়ে যায়। তখনই দক্ষিণের ডিফেন্স থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে চিথলিয়া রেল স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে ১৫ বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। সম্মুখযুদ্ধে বারোজন পাকসেনা নিহত হয়েছিল সেদিন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে, ৯ নভেম্বরে, পাকসেনাদের দু’টো স্যাবর জেট হামলা চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের ধানিকুণ্ডা-চিথলিয়া অবস্থানের ওপরে। বিমান থেকে দাগানো ক্লাস্টার বোম আর মেশিনগানের গুলিতে সেদিন মুক্তিফৌজের দু’জন সৈনিক শহিদ হয়, আহত হয় পাঁচজন। নিহত দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে স্টেশনের উত্তর পাশের পুকুরটার ধারে গোর দেয়া হয়। ঐদিনই ১০ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের আরও দু’টো কোম্পানির মুক্তিফৌজ আর গণযোদ্ধারা মিলে চিথলিয়ারে উত্তরে অবস্থান নিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপরে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। পরশুরামে মুহুরি নদীর পশ্চিম পাশের পাকঘাঁটি এবং বেলুনিয়া থানায় পাকসেনাদের আরেকটা ঘাঁটি দখল করেও নেয় তারা। চিথলিয়ার দক্ষিণের পাক ডিফেন্সে ১০ নভেম্বরে পেছন থেকে হামলা চালায় ইস্ট বেঙ্গল রেজেমেন্টের আরও দু’টো কোম্পানি। তারপর সারা চিথলিয়াজুড়ে মুক্তিফৌজের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ১৫ বালুচ রেজিমেন্টের বিভিন্ন কোম্পানির ভেতরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। চিথলিয়া রেল স্টেশনের দক্ষিণে পাকবাহিনীর অগ্রবর্তী অবস্থানের কাছাকাছি একটা জায়গাতে সেদিন সম্মুখযুদ্ধে নিহত হয় মোয়াজ্জেমসহ মোট পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা। পাকসেনাদের চাইনিজ রাইফেলের একটা গুলি গিয়ে লেগেছিল মোয়াজ্জেমের কপালে, কপাল দিয়ে ঢুকে খুলির পেছনে মস্ত বড় একটা গর্ত খুঁড়ে দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল গুলিটা। সেই পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাকে কবর দেয়া হয়েছিল চিথলিয়া রেল স্টেশনের শেডটার পাশে। গোলাগুলির ভেতরেই তড়িঘড়ি করে একটা গণকবর খোঁড়া হয়েছিল। শহিদদেরকে শেষগোসল দেয়াটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি, কাফনের কাপড়ও জোগাড় করা যায়নি তখন। ছেঁড়াখোড়া, রক্তাক্ত লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জিসহই পাঁচজন শহিদের লাশ সোজা গণকবরে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে, ১৪ নভেম্বরে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৫ বালুচ রেজিমেন্টের পরাজিত সৈন্যরা চিথলিয়া থেকে রিট্রিট করে দক্ষিণে মুন্সিরহাটে তাদের মূল ডিফেন্সে চলে যায়।

কথা বলতে বলতে রেল স্টেশনের চত্বর থেকে আতাহার এবং ইয়াসিন হেঁটে যায় স্টেশনের পশ্চিম দিকে। দেয়ালের সাথে লাগান পরিত্যক্ত শেডটার পাশে এবার গণকবরটা দেখতে পায় আতাহার। ইয়াসিন আতাহারকে জানায়, কবরটায় বাম দিক থেকে তিন নম্বর স্থানে শোয়ানো হয়েছিল মোয়াজ্জেমকে। কবরটার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় দু’টো মেহেগনি এবং কবরের বুকে ছেয়ে আছে ঘন ঝোপঝাড়, তার ভেতরে মাথা তুলে জেগে আছে একগাদা কালকাসুন্দা আর আকন্দ। ইয়াসিন জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক’জন অফিসার এসে কবরটার চারপাশে দেয়াল গেঁথে দিয়ে গিয়েছিল। কালে কালে দেয়ালটা ভেঙে পড়েছে চতুর্দিকেই। তবে কবরটার নিশানা পুরোপুরিভাবে মুছে যায়নি।

গণকবরের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু ক্ষণ দোয়াদরুদ পড়ার পরে মোনাজাত করে আতাহার এবং ইয়াসিন। তারপর তারা ফুলগাজীতে ফিরে যায়।

আউটডোরে প্রথম সাক্ষাতের দিনে তোজাম্মেলকে আতাহার বলেছিল, জরিমনের ওষুধ চলবে টানা তিরিশ দিন এবং তার পরপরই জরিমনকে ফলোআপ ভিজিটে নিয়ে আসতেই হবে। পঁয়ত্রিশ দিনেও যখন তারা এল না তখন আউটডোরের পিওন তবিবরকে জগৎপুর গ্রামে পাঠায় আতাহার। পর দিন সকালে তবিবর এসে আতাহারকে জানায়, আজ-কালের ভেতরেই তোজাম্মেলরা আসবে। কথামতো জরিমনকে সাথে নিয়ে সেদিন সকাল এগারটার দিকে হেলথ কমপ্লেক্সে হাজির হয় তোজাম্মেল। ওজন মাপার মেশিনে নিজেই জরিমনকে এগিয়ে নিয়ে যায় আতাহার; মেশিনে তাকে তুলেও দেয়। দেখা যায়, গেল এক মাসে জরিমনের ওজন বিয়াল্লিশ কেজি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে চল্লিশ কেজিতে। এর অর্থটা খুবই পরিষ্কার―তার ক্ষুধামন্দা যায়নি! আতাহার বুঝে নেয়, অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট আর মাল্টিভিটামিন কোনওটাই কাজে লাগেনি এখন পর্যন্ত। এটা তো মহাদুশ্চিন্তার কথা!

প্রশ্ন নিয়ে আতাহারের চোখে তাকায় টেবিলের অপর পাশে বসে থাকা তোজাম্মেল। তাকে কোনও উত্তর দেয় না আতাহার। তোজাম্মেলের পাশে জবুথবু হয়ে বসে থাকা বিষণ্ন জরিমনকে সে বরং জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনার বুকে অনেক ব্যথা করে তাই-ই না ?’

জরিমন তার মাথা নেড়ে সায় দেয়।

নির্বাক জরিমনকে কথা বলানোর জন্য এবার উদ্যোগ নেয় আতাহার। উদ্দেশ্যমূলকভাবে জরিমনকে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনার ছেলে দেশের মুক্তিসংগ্রামে যোগ দিয়ে শহিদ হয়েছে। নতুন একটা দেশ পাওয়ার জন্যই আপনাকে এই আত্মত্যাগ করতে হয়েছিল। এ নিয়ে নিশ্চয় গর্ব হয় আপনার ?’ 

প্রশ্নের পিঠে নিথর হয়েই বসে থাকে জরিমন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত একজন অস্ট্রেলিয়ান সৈনিকের মা এলেন ডারহামকে ঠিক এই প্রশ্নটাই করা হয়েছিল। দ্ব্যর্থহীনভাবে এলেন উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি কোনও ভিক্টোরিয়া ক্রস চাই না, আমি আমার মৃত সন্তানকে ফেরত চাই।’ আতাহার অপেক্ষা করছিল, এমন কোনও পরিষ্কার উত্তর দেয় কি না জরিমন।

একটু পরেই জরিমন মুখ খোলে। ব্যথিত চোখে তাকিয়ে শহিদ-জননী আতাহারকে বলে, ‘গর্ব হইব না কীয়ের লাই ? তয় আঁই তো গর্ব করতাম ছাই নাই! আন্নে আঁর পুতেরে ফেরত লই আসেন বাজান!’ এই বলতে বলতে অশ্রুতে টলমল করে ওঠে জরিমনের দু’চোখ। ফের সে বলে, ‘আঁর কফালে গুলি কইরত হারামজাদারা! হেইডাই বালা আছিল!’

এবার জরিমনের চোখ থেকে নিঃশব্দে ক’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সে জোরে কামড়ে ধরে রাখে তার নিচের ঠোঁট।

জরিমনের সোজাসাপটা উত্তরে চমকে যায় আতাহার। সে ভাবতে থাকে, সব শহিদের মায়ের অনুধাবন তবে একই রকমের হয়!

আতাহার স্থির করে, জরিমনকে সে আরেকটু দূরে নিয়ে যাবে। জরিমন তার প্রথম প্রশ্ন শুনে ব্যথিত হয়েছে জেনেও তাই দ্বিতীয় প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ে আতাহার। তার টেবিলের ওপারে অধোবদনে বসে থাকা জরিমনকে সে এমনটা বলে : এটা মানতেই হবে, পাঞ্জাবি, পাঠান, সিন্ধি, বালুচ―পাকিস্তানের এসব জাতিগোষ্ঠীর ক্ষমতালিপ্সার কদর্য রাজনীতিই বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর মাত্রার হত্যাযজ্ঞের কারণ। এরা সবাই মিলে ১৯৭১ সালে নৃশংসভাবে খুন করেছে জরিমনের সন্তান মোয়াজ্জেমসহ হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে। পাকিস্তানিদের চাইনিজ রাইফেলের একটা গুলি মুহূর্তের ভেতরে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মোয়াজ্জেমের। তার কপাল ফুটো করে খুলির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল বুলেটটা। খুলি উড়ে যায়নি। তখন শারীরিকভাবে কতটাই না কষ্ট পেয়েছিল জরিমনের রক্তের প্রতিভূ! মোয়াজ্জেমের সহযোদ্ধা ইয়াসিন আতাহারকে জানিয়েছে, মাটির ওপরে যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছিল মোয়াজ্জেমের নিথর দেহটা সেখানে জমাট বেঁধেছিল রক্তের নহর। কবরে যখন লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা মোয়াজ্জেমের লাশ নামান হচ্ছিল তখনও তার কপাল আর মাথার পেছনের ক্ষতস্থান চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত নেমে ভেসে যাচ্ছিল তার ভুরু, চোখ, গণ্ড, নাক, গাল, গলা, ঘাড়, পিঠ; আরও লাল হয়ে উঠছিল তার ছেঁড়াখোঁড়া, ময়লা স্যান্ডো গেঞ্জি এবং চেক চেক লুঙ্গিটা। এই দৃশ্য কি সহ্য করা যায় ? আর দেখেন, আপনার আদরের ধনের লাশটা ধরে আপনি একটু কাঁদতেও পারলেন না; তাকে শেষবিদায়ও জানাতে পারলেন না আপনি! এই ব্যাপারটা কি মর্মান্তিক নয়, অন্যায় নয় ?

আতাহার যখন এসব বলছিল তখন আবেগে থরথর করে কাঁপছিল জরিমন। তার মুখের রেখাগুলো দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, অশ্রু সংবরণের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। পরক্ষণেই তার তীব্র আবেগ তাকে সশব্দ কান্নায় ভেঙে চুরমার করে দেয়।

জনসমক্ষে মা’কে কাঁদতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় তোজাম্মেল। সাথে সাথেই ক্রন্দনরত মা’কে থামাতে উদ্যত হয় সে। চোখের ইশারায় তাকে থামায় আতাহার।

মিনিট দুয়েক পরে জরিমন যখন নিজেকে খানিকটা গুছিয়ে ফেলে তখন আতাহার তাকে সরাসরি প্রস্তাব দেয়, ‘চিথলিয়ার রেল স্টেশনে আপনার ছেলের কবর আছে, জানেন তো! কবরটা আমি দেখে এসেছি। আপনি সেখানে যাবেন আমার সঙ্গে ? কেউই তো আপনাকে সেখানে নিয়ে গেল না! ছেলেকে শেষবিদায়টা জানালেন আরকি! আপনার এই কাজটা তো বাকিই রয়ে গেল! তাই-ই না ?’

জরিমনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য তার দিকে গভীর মনোযোগেই তাকিয়ে থাকে আতাহার। মাথা হেঁট করে বসে থাকা জরিমন অস্পষ্ট স্বরে বলে: আইচ্ছা!

তোজাম্মেলের সাথে চিথলিয়া যাওয়ার দিনক্ষণ স্থির করে ফেলে আতাহার―আসছে শুক্রবার বিকেলে যেন তোজাম্মেল জরিমনকে নিয়ে রেল স্টেশনে যায়। তোজাম্মেলের ফতুয়ার বুক পকেটে পাঁচশ টাকার একটা নোট ভরে দিয়ে আতাহার বলে, ‘এই নেন! এইটা আপনাদের ট্রেন ভাড়া। আর শোনেন, ওষুধ যা দিয়েছিলাম তা আরও এক মাস চলবে কিন্তু!’

শুক্রবার বিকেলে চিথলিয়া রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে জরিমনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল স্টেশন মাস্টার, ইয়াসিন পাটোয়ারিসহ ২ নম্বর সেক্টরের প্রাক্তন তিন জন গেরিলাযোদ্ধা এবং আতাহার স্বয়ং। পাঁচটার দিকে ট্রেন থেকে নামে জরিমন আর তোজাম্মেল। জরিমনকে স্টেশন মাস্টার সসম্মানে অভ্যর্থনা জানায়। আতাহার লক্ষ করে দেখতে পায়, ভাদ্রমাসের গরমে ভীষণ ঘামছে জরিমন। তার মুখমণ্ডলের বলিরেখাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঘাম জমে আছে। বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে যাওয়ার কারণে হাঁটতে কষ্টই হচ্ছে তার! তোজাম্মেলের হাত ধরে, পেয়ারার ডালের লাঠি ঠুকে ঠুকে স্টেশন মাস্টারের অফিসঘরের দিকে কদম ফেলছে সে। অফিসঘরে ঢুকে সে চুপ করে বসেছিল। স্টেশন মাস্টারের শত অনুরোধেও চা-নাশতা কিছুই খেল না সে; কেবল টেনে নিল পানির গ্লাসটা। 

আতাহার আর ইয়াসিন নিজেদের কাজ এগিয়েই রেখেছিল―সকালে চিথলিয়ায় গিয়ে তারা গণকবরটার ওপরে জন্মানো ঝোপঝাড় সব পরিষ্কার করেছে কাটারি চালিয়ে, কবরটার চার কোনায় তারা পুঁতে দিয়েছে বাঁশের খুঁটি। কোথাও থেকে রঙ জ্বলে যাওয়া একটা জাতীয় পতাকা জোগাড় করে রেখেছিল স্টেশন মাস্টার। বাঁশের একটা খুঁটির সাথে পতাকাটাকে বেধে গণকবরটার এক পাশের মাটিতে বসিয়ে দিয়েছে প্রাক্তন গেরিলাযোদ্ধারা।   

স্টেশন-চত্বর থেকে পশ্চিমের শেডের দিকে জরিমনকে নিয়ে রওনা দেয় স্টেশনমাস্টার। তোজাম্মেলের হাত ধরে, লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এলোমেলো পদক্ষেপ সেদিকে এগিয়ে যায় জরিমন। গণকবরটার সামনে পৌঁছে গিয়ে সে এক গজ মতো দূরত্বে দাঁড়িয়ে কবরটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে; কিছু বলে না। ইয়াসিন তাকে গণকবরটায় মোয়াজ্জেমের লাশের অবস্থানটা দেখিয়ে দেয়। তারপর জরিমনের পাশে দাঁড়িয়ে ফৌজি কায়দায় কবরে শায়িত শহিদদের উদ্দেশে লম্বা স্যালুট মারে ইয়াসিনের নেতৃত্বে ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলাযোদ্ধারা। শহিদদেরকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়ে গেলে স্টেশনমাস্টার সবাইকে সুরা ফাতেহা এবং দরূদ শরিফ পাঠ করতে বলে। বিড় বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকে উপস্থিত সবাই, জরিমন নিজেও। কিছু পরে মোনাজাত ধরে স্টেশনমাস্টার। 

মোনাজাত শেষ হয়ে গেলে কবরের কোলের কাছে এগিয়ে যায় নির্বাক জরিমন। কবরের সামনের মাটিতে ঘাসের ওপরে ঝপ করে সে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ কবরটার দিকে তাকিয়ে থাকার পরে একটু ঝুঁকে কবরটার জমিনে সে বুলিয়ে দিতে থাকে তার ডান হাতের আঙুলগুলো। কবর স্পর্শ করতে করতে এক সময় আকাশ-পাতাল বিদীর্ণ করে কেঁদে ওঠে জরিমন। সে তার বুকের ওপরে নিজের দু’হাতের পাঞ্জা আছড়ে ফেলতে ফেলতে বিলাপ করতে থাকে, ‘হায় আল্লাহ! আঁর পুতেরে তুমি কীয়ের লাই তুলি লই গেলা! আঁই অহন কীয়া কইরতাম!’

জরিমনকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাখে তার ছোট ছেলে তোজাম্মেল। চীৎকার করে কাঁদছে সে নিজেও।

গণকবরটা ঘিরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনমাস্টার, চার জন মুক্তিযোদ্ধা আর আতাহার। অবোধ অশ্রুতে টলোমলো করছে তাদের সবার চোখ।

পেছনে ভিড় জমিয়েছে ফেনী-পরশুরাম রুটের ক’জন যাত্রী।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares