বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : অগ্নিগিরির অশ্রুমতি : ইমতিয়ার শামীম

এই ১২ কি ১৩ বছর বয়সে এসেও আমি ঠিক বুঝতে পারি না, আমার বাবার সঙ্গে আনন্দীর বাবার অত খায়-খাতির হয় কী করে! আমার বাবা হলো বন্দুক রিপেয়ারিং শপের মালিক, আবার জমিদারও নাকি ছিল, সে আমার জন্মের আগ দিয়ে; ওদিকে আনন্দীর বাবা কি না ব্যবসা করে ঘড়ির। তাহলে বন্দুক আর ঘড়ি মেলে কী করে! আবার আমার বাবার নাকে যদি গরুর মাংসের সামান্য একটু গন্ধও যায়, তা হলে সে যে বমি করে ফেলবে, তা কি আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে ? ওদিকে আনন্দীর বাবা,―কী বলব, এত ঝানু গরুর মাংসখোর যে, চোখমুখ থ’ মেরে যায় তার খাওয়া দেখলে। এই তো গেল কোরবানির ঈদের দিন সন্ধ্যায়ও তিন কে.জি. মাংসের তরকারি এক বসাতেই পেটের মধ্যে চালান করে দিয়ে আনন্দীদের বেদম লজ্জায় ফেলে দিয়েছে সে। যার সঙ্গে দেখা হয় সে-ই এখন বলে আনন্দীদের, ‘তোমার বাবা এত গরুর মাংস খেতে পারে ? কোনও সমস্যা হয় না ?’ আবার, এই ৫০ বছর বয়সেও আনন্দীর বাবা তার গালে নিয়মিত ক্ষুর চালায়, এমনকি গোঁফটাও রাখে না; অথচ কী আশ্চর্য, মুসলমান না হয়েও আমার বাবা নিয়মিত গোঁফ ছাঁটে আর পুরোটা গালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাজ্যের দাঁড়িতে কোনও দিনও কোনও ক্ষুরের ছোঁয়া পড়ে না। এত সব অমিল, কিন্তু তারপরও এত মিল হয় কেমনে ? কেন তারা রোববার এলেই সাতসকালে একসঙ্গে উঠে বন্দুক নিয়ে ছোটে পদ্মার এই চর ওই চরের দিকে ?

এত চেষ্টা করি, তারপরও বুঝতে পারি না এই মিলমিশের কারণ। উল্টো প্রতিদিনই খোঁচা খাই আনন্দীর কাছে, ‘তোর আর বোঝা হয়েছে রে নীলা―যার হয় না নয়ে, তার হয় না নব্বইয়ে …’ কী অপমানজনক কথা! ৯০ বছর বয়স হলেও নাকি আমি এসবের কিছু বুঝতে পারব না! তা আমি না-হয় একটু বোকাসোকাই―মা’র কথা কি আর মিথ্যা হতে পারে! তাই বলে আনন্দীও সেই একই কথা বলবে ? তা বলুক গে, বুঝি বা না বুঝি, আমার তো ভালোই লাগে আমার আর আনন্দীর বাবার এরকম মিলমিশে। প্রতিদিন না-হলেও শনিবার দিন সন্ধ্যাবেলা কাকা অবশ্যই আসবে আমাদের বাড়িতে, বসে পড়বে বারান্দার কাঠের হেলনা চেয়ারটাতে, আর বাবাও এসে বসবে মুখোমুখি আরেকটা কাঠের চেয়ারে। তখন বাড়ির ভেতর থেকে মাটন চপ ভাজার আওয়াজ ভেসে আসবে আর তার খানিকক্ষণ বাদে বাবা কাকার সঙ্গে এমনভাবে ‘উহ’ ‘আহ্’ করতে করতে সেসব চপ খাবে যে, মনেই হবে না গরুর মাংস বলে একটা কিছু আছে―যা কাকুর আরও অনেক প্রিয়।

আমি নিজেও দেয়ালে হেলান দিয়ে তখন একটা চপ চেটেপুটে খেতে থাকি আর খাওয়া দেখি। খেতে খেতেই কী সুন্দর করে কথাবার্তা বলে দুইজন! বাবা বলে কাকুকে, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ তো হিন্দিতেও হচ্ছে মশাই।

তাই ? কে―এবার দেবযানী, পান্নাবাঈ হবে কে ?

কে আবার ? আমাদের ওই রমাই হবে। কিন্তু নায়ক করছে ধর্মেন্দ্র আর অশোককে।

আহা, দিলীপ আর বিকাশকে রাখছে না ? ডাবিং করলেই পারত।

কী বলেন আপনি ? হিন্দি সিনেমায় বলিউডের নায়ক নেবে না ? সিনেমা চলতে হবে না ? আচ্ছা, আপনি তো খোঁজখবর রাখেন―ও বাংলার সিনেমা-টিনেমা হলে আর চলবেই না ?

কী করে বলি, বলেন ? এইসব বলতে পারবে ফখরুল প্রফেসর। অবশ্য আইয়ুব খানের মক্কর প্রফেসরদেরও বোঝার সাধ্য নাই। কখন যে কী করে। বুঝলাম, যুদ্ধ হয়েছে, সম্পর্ক খারাপ। তো হিলি-দর্শনা বন্ধ রাখবি রাখ―কিন্তু বই-সিনেমাও বন্ধ করে রাখবি ?

এইভাবে কাকা আর বাবা খালি চপ খায় আর গল্প করে। কাকু অবশ্য মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গেও গল্প করে, আবার মাঝে-মধ্যে ঘড়ির ক্যাটালগ নিয়ে আসে। বড় হয়ে আমি সুইজারল্যান্ডের একটা ঘড়ি কিনব, ঠিক করে রেখেছি।

মাঝে-মধ্যে কাকু আনন্দীকেও সঙ্গে নিয়ে আসে। সেদিন আমার আরও ভালো লাগে। ও-ও, ভালো কথা মনে পড়েছে, আনন্দীর নাম কিন্তু এই কিছুদিন আগেও মেহবুবা ছিল। কিন্তু ওই যে স্কুলে আমাদের জন্যে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ না কী একটা পাঠ্যবই করল ক্লাস নাইনে, সেইটার পরই এই ঘটনাটা ঘটল। একদিন বিকেল হওয়ার আগেই দেখি, কাকু এসে আমাদের বাসায় হাজির। দুপুরের রোদ একটু হেলে পড়লেও তখনও তা যেন পটপট করে ফুটছে। কখনও চিৎ হয়ে, কখনও-বা উপুড় হয়ে শুয়ে মেঝের মধ্যে জমা যত ঠাণ্ডা শুষে নেওয়ার চেষ্টা করছি আমি। কিন্তু পৃথিবীটা যেন আজ টগবগ করে ফুটছে। পদ্মা নদীর জল নিশ্চয়ই থমকে আছে আর রাজ্যের রোদ সেই নদীতে ডুব দিয়ে মিইয়ে পড়া দূরে থাক, বরং আরও তেজি হয়ে পাড়ে উঠে ডিগবাজি খাচ্ছে। এই রোদে নতুন লাগান হলুদ জবাগাছটার কথা চিন্তা করে বারবার অস্থির হয়ে পড়ছিলাম আমি। খুব বড়সড় না-হোক, একেবারে ছোটও নয় আমাদের বাড়িটা। বাবা তো মুখ খুলে কিছু বলে না, কিন্তু আমার দিদা আবার কোনও কিছু বলার সুযোগ একটুও হাতছাড়া করে না। মেয়েকে যে কত ভালো জায়গায় বিয়ে দিয়েছিল, সেটা লোকজনকে জানাতে হবে না ? পুরোনো লোকজন আর কয়জনই বা আছে! আর যুগও তো নাকি এমন যুগ এখন যে, কেউ কারও বংশের সুনাম তুলে ধরে না। অতএব দিদা যেভাবেই হোক না কেন, গরুকে নদীর পানিতে নামিয়ে নদীর আত্মকথা বলতে শুরু করে। এমনকি আমারও চুন থেকে পান খসলেই বলতে থাকে, কোন বংশের মেয়ে তুই, সে কথা ভুলে যাস কেন ? তোর বাবা আনন্দ গোপাল চৌবেÑতোর ঠাকুরদাদা শ্রী শ্রী শ্রীযুক্ত শীল জমিদার প্রসন্ন নাথ চৌবে। তোর পূর্বপুরুষরা ছিল ইংরেজদের দুই চোখের মণি। লক্ষেèৗয়ের মানুষ তোরা, উচ্চবর্গীয়, শিক্ষিত, খাঁটি ব্রাহ্মণ …

দিদা, ইংরেজদের দুই চোখের মণি হওয়া তো খুব খারাপ ব্যাপার―

থাম তুই, যা বুঝিস না, তাই নিয়ে ফটরফটর … ওই সুমনটা তোদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।

সুমন মানে আনন্দীর বড় ভাই, মাঝে-মধ্যেই আমাদের কাছে গল্প করে, কী করে পৃথিবীতে মানুষ এল, কী করে এ দেশে ইংরেজরা এল, কী করে আবার ধাওয়া খেয়ে কেটে পড়ল―এইসব এত সুন্দর করে বলে, কী আর বলব! কিন্তু দিদা তাকে সহ্য করতে পারে না, অতএব এই সুযোগে সুমন ভাইয়েরও একটু নিন্দা করে আবারও আগের প্রসঙ্গে ফিরে যায়, এই ইংরেজরা কি আর পরেরগুলোর মতো ইতর ইংরেজ ছিল নাকি ? কত বুঝিয়ে কত অনুরোধ করে প্রাণনাথ চৌবেকে ইংরেজরা এইখানে পাঠিয়েছিল জানিস ? ব্যাটারা ঠিকই বুঝেছিল, প্রাণনাথ চৌবের মতো মানুষ ছাড়া এই মুলুক থেকে এক কানাকড়ি খাজনাও তুলতে পারবে না।

আমি পুরোনো দালানের ছাদের দিকে তাকাই, বড় বড় জানালাগুলোর দিকে তাকাই। কে জানে কবে এই দালান বানান হয়েছিল। প্রাণনাথ চৌবে যখন লক্ষেèৗ থেকে এসে তিনগাছা গ্রামে ঠাঁই নিয়েছিলেন, তখন কি আর জানতেন মাত্র এক প্রজন্ম বাদেই তার উত্তরসূরিদের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে! গরুর গাড়ি, ঘোড়াগাড়ি কিংবা নৌকা, যেটাতেই হোক না কেন প্রাণনাথ কিংবা তার ছেলে প্রসন্ননাথ ওই তিনগাছা, টিকিরি, দাপুনিয়া, হেমায়েতপুর, মাধবপুর, তারপর আরও দূরের ওই পশ্চিমের রূপপুর, পাকশী, সাঁড়া, ঈশ্বরদির গ্রামেগঞ্জে আর এই পদ্মা, ইছামতিতে ঘুরতে ঘুরতে নিশ্চয়ই কোনওদিনই চিন্তা করেননি, একদিন ভারতবর্ষ বলে কোনও কিছুই থাকবে না, একদিন জমিদারি বলেও কিছুই থাকবে না।

নতুন হলুদ জবাগাছটা তখন স্বপ্নের ঘোরে একটু একটু করে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে কেবল; কিন্তু এরই মধ্যে আনন্দীর বাবার ফিফটি-হোন্ডার আওয়াজ শুনে সোজা হয়ে বসেছিলাম। আনন্দীর বাবা―নাম তার কোবাদ আলী শেখ; বাবা বলে, যে কোনও নতুন নাম শুনলেই তার অর্থ জেনে নিতে। কিন্তু এখনও এই নামের অর্থ জানা হলো না। আশ্চর্য, আজ কাকু এত সকাল-সকাল এল, ঘটনাটা কী! এই গরমের মধ্যে যাবে পাখি শিকারে ? পাগল নাকি!

কাকু এল, কিন্তু মনে হলো একটা চড়ুই পাখি ওড়াউড়ি করছে, অস্থির, ভারি অস্থির, ‘দাদা, তাড়াতাড়ি মেয়েদের একটা দেশি নাম ঠিক করে দিন তো―তাড়াতাড়ি―’

‘কেন, কী হয়েছে ?’

‘ও আপনি পরে শুনবেন―আগে একটা বাংলা নাম দিয়ে নিন তো―’

‘বাবা ভালো করে দরজাটা খুলে দিতে দিতে বলেছিল, তা না হয় দিচ্ছি। কিন্তু ঘরের মধ্যে আসেন, গরমে তো সিদ্ধ হয়ে যাবেন।’

‘আহা, আপনি কি বলতে চান, ঘরের মধ্যে ঠাণ্ডা হাওয়া ম-ম করছে ?’

বাবা হেসে ফেলেন কোবাদ চাচার কথা শুনে।

‘বলেন, বলেন, তাড়াতাড়ি নাম বলেন―’ বলতে বলতে ঘরের মধ্যে ঢুকেছিল কোবাদ কাকু। বাবা তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘ধরেন―আনন্দী। আনন্দী―ভারি সুন্দর নাম। আমার যদি আরেকটা মেয়ে হতো, তা হলে এই নামটাই―’

বলতে বলতে বাবা আমাকে দেখেছিল আর কথা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা বোধহয় কোবাদ চাচা খেয়ালই করেনি। মাথা দোলাতে দোলাতে সে বলেছিল, ‘আনন্দী … আনন্দী …। বাহ্, ভারি সুন্দর নাম। এ নামের মানে ?’

‘মানে ধরেন―যে আনন্দময়, যে আনন্দ দেয়; এই শব্দের আরও মানে আছে―স্বাভাবিক, আধুনিক, সক্রিয় …’

‘বাহ্, তা হলে এটাই সই। আজ থেকে মেহবুবা নাম বাদ।’

‘মানে ? মেহবুবার নাম পাল্টে রাখবেন ? কেন ? মেহবুবার অর্থও তো সুন্দর―বাদ দেবেন কেন ?’

‘বাদ দেব না মানে ? ব্যাটা পাকিস্তানিরা সব কৃষ্টি-কালচারের কথা বলে―নে, তোদের কৃষ্টি-কালচারই শিখাই আগে। উর্দু-আরবি সব বাদ।’

‘আপনি তো আচ্ছা মানুষ! মেহবুবাও তো এখন আমাদের দেশি শব্দই হয়ে গেছে মশাই।’

‘শোনেন বিলু বাবু, আমি আপনার মতো এত কিছু বুঝি না। আমি এইটুকু বুঝি, আরবি-উর্দু নাম না-হলে ওদের পিত্তি জ্বলে আর বাংলা-সংস্কৃতি-হিন্দি কিছু হলেই ওদের আঁতে ঘা লাগে। অতএব মেহবুবা বলেন আর নওশীন বলেন, সব কিছুই বাদ।’

বলেই কাকু বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যার পর খেতে বসে বাবা আমাদের জানাল, আজকে নাকি ছাত্রদের সঙ্গে অভিভাবকেরাও ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ বই পুড়িয়ে দিয়েছে স্কুলের মাঠে। কোবাদ চাচাও ছিল সেখানে। বই পোড়াতে পোড়াতে সে ঘোষণা করেছে, আজ থেকে সে তার মেয়ের নাম পাল্টে আনন্দী রাখল।

দুই

সেই থেকে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ইংরেজি, হিন্দি-উর্দু-আরবী কত কিছুর নাম যে পাল্টে গেল শহরটাতে। আর আমার বান্ধবী মেহবুবাও হয়ে গেল আনন্দী। মাত্র কয়মাস আগের ঘটনা, কিন্তু আমাদেরও আর মনে হয় না যে, কখনও ওর নাম মেহবুবা ছিল। কিন্তু ঘটনাটায় বাবার বোধহয় একটু বিপদই হয়ে যায়। একদিন রাতে বাবা ফিরে আসে অনেক পাখি নিয়ে। চর শানিকদুয়ার, চর কোষাখালি থেকে শুরু করে বসলার চর, ঢালার চর সবখানে পাখি আসতে শুরু করেছেÑহরিয়াল, ঘুঘু, হাঁস, কত রকমের অগণিত সব পাখি। আর এই ছোট্ট শহরে কয়জনই বা শিকার করতে জানে, কয়জনেরই বা বন্দুক-এয়ারগান আছে! অবশ্য তারপরও গুনতে গেলে কমপক্ষে ২০-৩০ জনের তো নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু বন্দুক থাকলেই কি আর কেউ পাখি শিকার করতে পারে ? শুধু আমাদের এই কালাচাঁদপাড়া কেন, জিলাপাড়া, রাধানগর, শালগাড়িয়া, হেমায়েতপুর থেকে শুরু করে পাবনার কোনওখানেই বাবা আর কোবাদ কাকুর মতো পাখিশিকারি নেই। তবে সেদিন তাদের সঙ্গে আরও নাকি জুটেছিল ক্যাপ্টেন জায়েদি। বাবা এই কথা বলতেই মায়ের গায়ে যেন কারেন্টের শক লাগে। আমার সামনে তারা আর কিছুই বলে না। কিন্তু আমি তো জানি, ক্যাপ্টেন জায়েদিকে শুধু মা কেনÑকালাচাঁদপাড়ার কেউই আর ভালো চোখে দেখে না। বছরসাতেক আগে নাকি পাবনায় চাকরি করতে এসেছিল এই পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন। গার্লস হাইস্কুল পরিদর্শন করতে গিয়ে তার চোখ পড়ে যায় আমাদের পাড়ার ক্লাস টেনের ছাত্রী আয়েশা আপার দিকে। আমার কাছে কেউ কি এইসব বলতে চায় নাকি ? কিন্তু আমি ঠিকই জানি, উকিল সাহেবের মেয়েকে জোর করে বিয়ে করেছে ক্যাপ্টেন জায়েদি। আমাদের ক্লাসের সবাইও জানে এই ঘটনা। জানে যে, ক্যাপ্টেন জায়েদি এসেছে পাঞ্জাব থেকে, সঙ্গে তার বউও ছিল, কিন্তু বিয়ে করার কয়েকদিন আগে তাকে সে নাকি আবার পাঞ্জাবে পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্যাপ্টেন জায়েদি কাজ করে গোয়েন্দা বিভাগে; গোয়েন্দা কী তা অবশ্য ভালো করে জানি না আমি; তবে এইটুকু জানি, এরা নাকি লোকজনের পিছে ফেউয়ের মতো লেগে থাকে। তা ফেউয়ের মতোই হোক আর জিগার আঠার মতোই হোক, মোদ্দা কথা, ক্যাপ্টেন জায়েদি সেদিন সারাদিন বাবা আর কাকুর সঙ্গে সেঁটেছিল। বলেছিল, সে-ও পাখি শিকার করবে তাদের সঙ্গে মিলে; কিন্তু হাতে একটা বন্দুক নিয়ে বেরুলে কী হবে, লোকটা গুলি করে পশ্চিম দিকে তো যায় পুবের দিকে। অবশ্য বাবার মতে, পাখি শিকার করতে পারুক বা না পারুক, অস্ত্র চালাতে লোকটা ঠিকই পারে, তবে আজ এরকম করল কেন, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। লোকটা নাকি হাসতে হাসতে একফাঁকে বলেছে বাবাকে, ‘বিলু বাবু, কোবাদ সাহেবের মেয়ের নাম পাল্টাতে গিয়ে আপনি তো দেখছি পাবনার সব কিছুর নামই লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছেন!’

বাবাকে দেখলে কিছু মনে হয় না, কিন্তু আমি ঠিকই বুঝি, ঘটনাটা নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেছে বাবা। অবশ্য মাঝখানে বোধহয় অনেকদিন সে ভুলেই গিয়েছিল ঘটনাটা। কিন্তু এখন সারা শহরে আর্মি গিজগিজ করছে, সময় নেই অসময় নেই, ফুটফাট গুলির আওয়াজ হচ্ছে, আমরা এক চকির তলা থেকে আরেক চকির তলায় লুকাচ্ছি, পায়খানা থেকে দৌড়ে গিয়ে পালাচ্ছি রান্নাঘরে, রান্নাঘর থেকে দৌড় দিয়ে গিয়ে লুকাচ্ছি গোসলখানাতে। কখনও লুকাচ্ছি বাড়ির পেছনের মাঠাইলের ঢালু বরাবর গজিয়ে ওঠা ছোটখাটো জঙ্গলের ভেতর, কখনও বা গিয়ে থাকছি লিচু বাগানে। বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি, এইটা কোনও পলানটুক খেলা নয় যে, খুব যত্ন করে সন্তর্পণে খানিকক্ষণ লুকিয়ে থাকব, কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই আবার উসখুস করতে থাকব কীভাবে আমাকে খোঁজা হচ্ছে তা জানবার জন্যে। তারপর ধরা পড়ে গেলেই হেসে উঠব খিলখিলিয়ে কিংবা আবারও গাছগাছালির ঝোপঝাড়ের গভীরে নিজেকে লুকিয়ে ডেকে উঠব, ‘টু-উ-উ-উ’ বলে। এই কথা শহরের সবাই জানে, বাবা আর কোবাদ চাচা নিজেরাই গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তাদের দোনলা বন্দুকগুলো তুলে দিয়েছিল। কেবল ওই বাণী সিনেমা হলের মালিক ইউনুস বিহারিই দেয়নি তার বন্দুকটা। বন্দুকসমেত কী করে যে সে সুরুৎ করে পালিয়ে গিয়েছিল, সে কথা কেউই জানে না।

তবে এখন ইউনুস বিহারি ফের ফিরে এসেছে। ফিরে এসে উল্টো খুঁজে বেড়াচ্ছে কোবাদ চাচাকে, খুঁজে ফিরছে আমার বাবাকে। কেউ আমার কাছে এইসব কথা বলেনি, কিন্তু আমি ঠিকই লুকিয়ে লুকিয়ে শুনে ফেলেছি। লক্ষ্মী পিসিকে সেদিন রাতে মলের ড্রামের মধ্যে বসিয়ে শহরের বাইরে রেখে এসেছে হরিতোষ সুইপার, এ কথাও আমি খুব ভালো করেই জানি। মলের ড্রামের মধ্যে করে পালিয়েছে আমাদের টিপটাপ লক্ষ্মী পিসি! এ মা … কী ঘেন্নার ব্যাপার! এদিকে পরশু আমার মাসিক শুরু হওয়ার পর থেকে মা-দিদারা কানাকানি করছে, আমাকেও নাকি ওইভাবে গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দেয়া ভালো। কী ভয়ানক কথা! কেন, কী এমন পাপ করেছি আমি যে ওইভাবে পালিয়ে যাব শহর থেকে ?

কিন্তু মা-দিদা বলে, দিনকে দিন বিপদ নাকি বেড়েই চলেছে। বলে, বাবাটা ভীষণ বোকা, পোলাপান দুই-দশটা বন্দুক নিয়ে শহরজুড়ে যতই ঘোরাফেরা করুক না কেন, খানসেনারা যে একদিন কামান-বন্দুক নিয়ে চলে আসবে এটা তো তার অনেক আগেই বোঝার কথা; কিন্তু বুঝতেই পারেনি অথবা বুঝেও বোকার মতো না বোঝার ভান করে আছে। কোবাদ কাকু মুসলমান মানুষ, সে পর্যন্ত শহর থেকে উধাও হয়ে গেছে আনন্দীদের নিয়ে, আর বাবার কত সাহস, শহর ছাড়েনি। অবশ্য এটা ঠিক, কোবাদ কাকুর না পালিয়ে উপায় ছিল না। সুমন ভাই তো সেই ডাববাগানের যুদ্ধ থেকে শুরু করে সব কিছুতেই আগে-আগে ছিল, ইউনুস ব্যাপারিরাও তা ভালোভাবেই জানে। তাহলে না-পালিয়ে উপায় আছে তার! আর সত্যি কথা বলতে গেলে, তখন কি আসলেই বোঝার উপায় ছিল? ছাত্ররা টগবগ করে ফুটছে, ডিসি-এসডিও’রাও নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের এইদিকে, থানার সামনে বিশাল কড়ুই গাছটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পতপত করে উড়ছে জয় বাংলার পতাকা। তখন প্রতিদিনই এমন কিছু ঘটছে, যাতে প্রচণ্ড উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে সারা শহর এবং হঠাৎ করেই দূর থেকে ভেসে আসছে গুলির আওয়াজ। তা গুলির আওয়াজ যতই শোনা যাক না কেন, মা দৈনিক নিশ্চিন্তেই সন্ধ্যাবেলায় শঙ্খ বাজিয়ে নিশ্চিন্তে উলুধ্বনি দিত, ধুতিটাও শুকানোর জন্যে নিশ্চিন্তে উঠোনে বাঁধা রশিটায় টাঙিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন পাশার চাল উল্টে গেল। শহরটা ভরে গেল পাকিস্তানি আর্মি দিয়ে। তা তাদের যে একটু মনোযোগ দিয়ে দেখব, সে উপায়ও নেই; মা আমাকে কী যে দৌড়ের ওপর রেখেছে! তবে ভাবতে আমার মজাই লাগে, এই একরত্তি শহর―তাও বাবাকে ওরা খুঁজেই পাচ্ছে না; ওদিকে বাবা নাকি পালিয়ে আছে একেবারে বাণী সিনেমা হলটার মধ্যেই। ইউনুস বিহারির সঙ্গে কোনও খায়খাতির না থাকুক, হলের দারোয়ানগুলোর সঙ্গে নাকি বাবার খুবই খাতির। তারাই লুকিয়ে রেখেছে বাবাকে।

ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হতে লাগল। অথবা স্বাভাবিক হোক বা না হোক, স্বাভাবিকের মতো বানিয়ে তোলা হলো। কিন্তু আমাদের মতো হিন্দুদের স্বাভাবিকই কী আর অস্বাভাবিকই কী―প্রথম থেকেই একেবারে গনগনে আগুনের মধ্যে আছি আমরা। ক্যাপ্টেন জায়েদি প্রতিদিনই আসছে আমাদের পাড়াতে, আসছে আমাদের সাহস দিতে। এই ক্যাপ্টেন নাকি প্রমোশনও পেয়েছিল, একের পর এক প্রমোশন পেয়ে অবসরেও গেছে; কিন্তু লোকজন তারপরও তাকে ক্যাপ্টেনই বলে। আর লোকটারও মনে হয়, ক্যাপ্টেন সাহেব ডাকটাই ভালো জমে। একদল লোক সঙ্গে করে একটা হ্যান্ড মাইক হাতে প্রতিদিনই আসেন তিনি, বলতে থাকেন, ‘হিন্দু ভাই-বোনরা, আপনারা একদম ভয় পাবেন না; আপনারা হলেন আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের পবিত্র আমানত। যে দুষ্কৃতিকারীদের জন্যে দেশের আজ এমন অবস্থা, তাদের সঙ্গে আপনারা কোনও সম্পর্কই রাখবেন না। ভুল করে আপনারা কে কী করেছেন, সেজন্যে কিছু চিন্তা করবেন না, এই ভুলের জন্যে আপনাদের কোনও কিছু করা হবে না। কাউকেই কোনও কিছু করা হবে না। আমাদের শুধু একটাই অনুরোধ―আপনারা আবারও স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন শুরু করুন। যখন খুশি হাট-বাজার করুন, সিনেমা হল অচিরেই চালু হবে, হলে গিয়ে সিনেমা দেখুন, মসজিদ-মন্দিরে যান, ঘুড়ি ওড়ান―কোন দুশ্চিন্তা করবেন না।’

তবু কেন কী জানি, রাস্তাঘাটে বেরুতে আর ভালো লাগে না। অবশ্য ঝড়-বাদলার দিন এখন―সেটাও একটা কারণ। এ বছর বজ্রপাত কি আগের বারের চেয়ে একটু বেশি হচ্ছে ? নাকি আমাদের কানেই বজ্রপাতের আওয়াজ একটু বেশি হয়ে বাজছে! কে জানে কোনটা সঠিক! তবে বাবা আবার বাড়িতে ফিরে এসেছে―এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর। অবশ্য বাবা ফিরলেও কোবাদ চাচাদের কেউই আর ফিরে আসেনি। ফিরে আসেনি ওপাড়ার আরও অনেকেই। এমনকি জিলাপাড়ার কয়েক ঘর হিন্দুও নাকি এখনও কোনখানে ডুব মেরে আছে―একটু সুবিধা পেলেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে চলে যাওয়ার আশা। কোনও কোনওদিন দুঃস্বপ্ন যেন ধেয়ে আছে। যেমন, সেদিন―খবর আসে, শালগাড়িয়ার অনেককেই নাকি জোর করে মুসলমান বানান হয়েছে। আবার আরেকদিন শুনি, বড়াল নদীতে এক নৌকাভর্তি মানুষজনকে নাকি হিন্দু বলে মেশিনগান চালিয়ে মেরে ফেলেছে পাকিস্তানিরা। মানুষ তো মানুষই, তার হিন্দুই কী, আর মুসলমানই বা কী ? এই নিয়ে আমার তেমন কোনও চিন্তাই নেই; কিন্তু তারপরও কেন যেন বুক ভারি ধড়ফড় করে ওঠে!

তিন.

আমাদের বুক ভারী হয়ে থাকে; কিন্তু শহরে সব কিছুই মনে হয় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, মানুষজন রাস্তায় নামছে, বিহারি লোকটা বাণী সিনেমা হল চালাতে চাইছে, আইসক্রিম ফ্যাক্টরির লোকজন কাজ করার জন্য কারিগর খুঁজছে, সুইপাররা এখন নিয়মিতই ময়লা-আবর্জনা নিয়ে যাচ্ছে, টমটম গাড়িও চলছে জোরে, স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হয়েছে, আর বাবাও ইদানীং বাড়ির বারান্দাতেই বসে বসে দুধ চা পান করছে; তারপরও দিনের কোনও না কোনও সময় আর্মির টহলগাড়ি দেখতে না দেখতেই আমাদের কেন যেন মনে পড়ে যাচ্ছে, আসলে পরিস্থিতি একটুও স্বাভাবিক নেই। আনন্দীর বাবাকে কোথাও দেখা না গেলে কী হবে, ক্যাপ্টেন জায়েদি এখন বলতে গেলে দৈনিকই আসেন। চা-পান করতে করতে গল্প করেন। মাটন চপ খেতে খেতে তিনি বলেন, ‘খুবই সুস্বাদু জিনিস বিলু বাবু, খুবই সুস্বাদু। আপনি আসলেই ভোজনরসিক। কিন্তু আপনি কি কখনও বিফ চাপ খেয়েছেন ? কিংবা বিফ কাবাব ?’

বাবা দম নেয় একটু। যেন অনুমান করার চেষ্টা করে, আসলে ঠিক কোন উত্তরটা শুনতে পারলে খুশি হবে ক্যাপ্টেন জায়েদি। চপের গায়ে আবারও একটা কামড় বসাতে বসাতে লোকটা বলে, ‘আপনি ভোজনরসিক মানুষ। আপনার কিন্তু খেয়ে দেখা উচিত। ভোজনরসিকদের জন্যে কিন্তু সবই জায়েজ। আরে, আমি তো এখন শুধু ওই শুয়োরের মাংস খেতেই মাঝেমধ্যে চলনবিলে যাই। আপনার কি মনে হয়, এই বাংলায় সত্যিই কোনও মুসলমান আছে ? একদল নমঃশূদ্র ফুল শার্টটাকে হাফ শার্ট বানিয়ে মুসলমান সেজেছে, আর এই  শালাদের সত্যিকারের মুসলমান বানাতে এসে আমরাই একটু-আধটু অমুসলিম হয়ে পড়ছি। কড়া―কড়া কিছু করতে হবে বিলু বাবু। নইলে এই ধর্মটাকে আর রক্ষা করা যাবে না।

বলেই অস্থির একটা কিছুর মতো লোকটা উঠে পড়ে। ঘরের বারান্দা থেকে সিঁড়ি না ভেঙেই দরজার সামনের রাস্তায় নামতে গিয়ে হোঁচট খায় কিছু একটার সঙ্গে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই ‘তুলসী গাছ ? অ্যা ? অজুটাই নষ্ট হয়ে গেল!’ বলে রাস্তার দুই ধারে সার করে লাগান ছোট ছোট তুলশী গাছগুলোয় বুটজুতোর লাথি দিতে দিতে সড়কে গিয়ে ওঠে।

আজ হঠাৎ ক্যাপ্টেনের এমন মতিগতি! একটা লোক দৈনিক আসে, হাসিতামাশা করে, এরিনমোরের সুগন্ধী সিগারেট বানিয়ে খায়, আজ হঠাৎ সে এমন করে উঠল, ঘটনাটা কি! বাবা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। আমার দিকে মাঝে-মধ্যেই তাকায় কেমন করে। আমি বুঝি, বয়স মাত্র ১২ কি ১৩ হলেও বুঝি চিন্তাটা আসলে আমাকে নিয়ে― নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা বাবা তো মনে হয় আমাদের ভাইবোনদের জন্মের পর থেকেই বাদ দিয়ে দিয়েছে। সব বাবাই কি এরকম ? নিজেকে নিয়ে চিন্তাহীন, অথচ নিজের কাছেই অপরাধী―সন্তানের জন্যে পৃথিবীটাকে ঠিক মনমতো করা গেল না বলে ?

ঘটনাটা জানা গেল পরদিন। সুইপার সাতসকালে টানা পায়খানা থেকে মল নিতে এসে ফিসফিসিয়ে জানিয়ে গেল, বাজারের কাছেই দক্ষিণের নারকেল বাগানের পূর্বদিকের খোলা জায়গাটায়, যেখানে শহরের পানি সাপ্লাইয়ের ওভার হেড ট্যাঙ্কটাও আছে, সেখানে রাজাকারদের ক্যাম্প বসানো হয়েছে। হেড ট্যাঙ্কটার নিচে পাতা হয়েছে চার দিকে চারটা মেশিনগান। রাজাকাররা তো আর অত কিছু চালাতে পারে না। তাই সেখানে পাকিস্তানি সেনারাও বসছে। আজকালের মধ্যেই সেই রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাবে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে। দেখবে, কোন কোন হিন্দু এখনও মুসলমান হয়নি। একদিন সময় দেওয়া হবে তাদের ধর্ম পালটাতে। দিলালপুরের মওলানা সাহেব পুরো ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত এইসব কাজে―খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটে যাচ্ছেন, তওবা করিয়ে কলেমা পড়িয়ে মুসলমান বানাচ্ছেন হিন্দু নারী-পুরুষ সবাইকে। যত্ন করে জানিয়ে দিচ্ছেন মুসলমান হলে কী করে চলতে হবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কী করে পড়তে হবে। আর সুন্নতে খৎনাও করিয়ে দিচ্ছেন যত্ন করে।

বাবা যদিও বলেছিল, ওইসব উড়ো কথায় কোনও কানটান না দিতে, তারপরও দেখি নিজেই কেমন হন্যে হয়ে খোঁজ নিচ্ছে এখানে-ওখানে। কিন্তু কিছুতেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না, সত্যিই কী ঘটতে চলেছে। এই পাবনা শহর থেকে এখন কারও পক্ষে বেরিয়ে ইন্ডিয়ার দিকে পা বাড়ান একেবারেই অসম্ভব। একদিকে কুষ্টিয়া, আরেকদিকে সিরাজগঞ্জ―তার মানে একদিকে কুমীর আর অন্যদিকে বাঘ। মা প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড জোরে শঙ্খধ্বনি তোলার ভঙ্গি করে, কপালে সিঁদুর দেয়, কিন্তু তারপরই ফের ধুয়ে ফেলে ভালো করে। মা আর দিদা ফিসফিস করে, পরিস্থিতি কিন্তু খুবই সাংঘাতিক, কুষ্টিয়ার কোনখানে নাকি বিদেশি সব সাংবাদিকদের নিয়ে গিয়েছিল, তারা সারা দুনিয়াটাকে জানিয়ে দিয়েছে, মুক্তিরা সরকার গঠন করেছে। ওদিকে সিরাজগঞ্জের ব্রহ্মগাছায় নাকি মুক্তিরা হামলা করেছিল পাকিস্তানিদের ওপরে। কাউকে অবশ্য মারতে পারেনি, কিন্তু পেট খারাপ হয়ে গেছে পাকিস্তানি আর রাজাকারদের। সব কয়টা ছুটির দরখাস্ত নিয়ে ঘুরছে। ঘরের এক কোণে বসে বসে সেলাই শিখতে শিখতে ভাবি, কী দিন এল! কোথায় এই বিকেল বেলা বাড়ির সামনের খোলা জায়গাটায় এক্কাদোক্কা খেলব, অথচ কি না বসে থাকতে হচ্ছে এই ঘরের কোণে।

তবে বাবা এখানে-ওখানে তল্লাশি করেও যার কারণ বুঝতে পারছিল না, সেই কারণ ঘরে বসেই মিলল সেইদিন বিকেলে। ক্যাপ্টেন জায়েদি এল খুশবু ছড়িয়ে। এ কথা সে কথার পর পাইপে আগুন দিতে দিতে বলল, ‘বিলুবাবু, অন্য কেউ এসে কীভাবে কী বলবে, আপনার খারাপ লাগবে, আবার দুর্ব্যবহারও করতে পারে―তার চেয়ে কথাটা আপনাকে আমিই বলি। আমরা তো আপনাদের আর প্রটেকশন দিতে পারছি না। আপনাদের পাড়া-প্রতিবেশী রাজাকাররাই বলছে, আপনাদের শহরের মধ্যে রাখার মানে ভারতীয় স্পাই আর মুক্তিযোদ্ধাদের ছোটখাটো আখড়া রেখে দেয়া। বলছে, ভারতের দালাল না কেবল হিন্দু নকশালরা, ভরসা করা যায় কেবল তাদের। আমি অবশ্য এইসব বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমার বিশ্বাসে কী আসে যায় বলেন ? এই যে ধরেন, আমি বিয়ে করলাম―কেউ তো বিশ্বাসই করতে চায় নাই, আমি বিয়ে করব। শেষ পর্যন্ত পয়লা বিবিকে তালাকও দিতে হলো। উকিল সাহেবের এই মেয়েকে যে বিয়ে করলাম, আমি তো বুঝি, সেটা আসলে একটা হিন্দু মেয়েকেই বিয়ে করা; এখানকার মেয়েরা হলো নামে মুসলমান; প্রতিবার প্রস্রাবের পর পানি খরচ করে, এর কোনও দরকার আছে বলেন ? একটা ঝামা না হয় একদলা মাটি ছুঁইয়ে নিলেই হয়! যাকগে, কী আর বলব! এখন, আপনি যে সত্যিই এ দেশটাকে ভালোবাসেন, এর প্রমাণ কীভাবে দেবেন বলেন ? আপনাকে যে আমি সন্দেহের বাইরে রাখব আর নিরাপত্তা দেব, কীভাবে দেব বলেন ? আপনারা যদি মুসলমানই না হন, আপনাদের আমরা কী করে নিরাপত্তা দিতে পারব বলেন ?’

চার.

বাবা বোধহয় সব কিছু আরও আগেই ভেবে রেখেছিল। আর আমি অনেকবার খেয়ালও করেছি আড়াল থেকে, একটা ছোট মোহাম্মদী পঞ্জিকা কিনেছে বাবা, লুকিয়ে রাখে সেটা, লুকিয়ে লুকিয়ে বার বার পড়ে, মুসলমানদের সুরা দোয়া অনেক কিছু লেখা আছে তার ভেতরে―বলা কি যায়, রাস্তাঘাটে কখন কী পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, বাবা বোধহয় সেজন্যেই লুকিয়ে লুকিয়ে মুখস্থ করত চার কলেমা, সুরা ফাতেহা, সুরা এখলাস কিংবা আয়াতুল কুরসী।

রাতের খাওয়ার পর আমাদের সবাইকে নিয়ে ভেতরের ঘরে বসল বাবা। আমরা মানে তো মাত্র চারজন―আমি, মা, দিদা আর কাজের মেয়ে ললিতা। রাতের বেলা ইলেকট্রিক বাতি জ্বালাতে বলতে গেলে আমরা ভুলেই গেছি তখন। তবে ঘরের কোণে সব সময়েই টিমটিমিয়ে একটা কেরোসিন বাতি জ্বলে গাছার ওপর। সেই কেরোসিনের আলোয় বাবা আমাদের সামনে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, ‘শোনো, সবই তো বোঝো; কালকে আমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাব।’

ওই প্রায়ান্ধকার ঘরের মধ্যেও দিদার গাল দিয়ে তখন তীব্র সূর্যালোক ছড়িয়ে দরদরিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল।

বাবা কথা বাড়াল না, আমরাও কোনও কিছুই বললাম না। আর বলার মতো কি-ইবা আছে! আমার বয়স এখন ১২ কি ১৩, আর এটা তো সবাই জানে, মেয়েদের বয়স যত কমই হোক না কেন, সব কিছু বেশ বেশি করেই বুঝতে পারে। তাদের যে বোঝার মতো ক্ষমতা থাকে, সেরকম নয়; আসলে চারপাশের মানুষের কথাবার্তা, আচার-আচরণই তাদের অনেক কিছু বোঝার উপযোগী করে তোলে। এই আমার কথাই যদি ধরি, আত্মীয়স্বজনেরা আমাকে ট্যাটনা বলে; কিন্তু আমার ট্যাটনা না হয়ে উপায় আছে ? হোলির দিনে এর-ওর শরীরে এদিক-সেদিক হাত পড়ে যায়, সেটা আমরা সবাই জানি; কিন্তু সেই হাত যদি এক সেকেন্ডের জায়গায় এক মিনিট সেঁটে থাকতে চায়, তা হলে কোনও কিছু না-বোঝার পরও মেয়েরা কিছু একটা বুঝতে শিখে যায়। যেমন আমিও জানি, পাকিস্তানিরা আসার আগে থেকেই জানি, সুযোগ পেলে হয়তো সব পুরুষই একেকটা পাকিস্তানি সৈনিক, তা দেশটা স্বাধীন হোক বা না হোক। তা যাকগে, এইসব ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরদের কথাÑপরদিন সকালে উঠেই আমরা আমাদের ধর্মকে ফেলে দেওয়ার আয়োজন করতে থাকি, ধর্মের একেকটি চিহ্ন ঘরের এককোণে জড়ো করতে শুরু করি, জড়ো করি, কেননা সব চিহ্ন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে আমাদের, পুড়িয়ে ফেলতে হবে ঠাকুরঘরের সবকিছু, এমনকি বিন্দু বিন্দু ধুলিকণাও; পুড়িয়ে ফেলতে হবে ব্রাহ্মণের ধুতি-পৈতা, মঙ্গলসূত্র, সিঁদুরের কৌটা, সিঁদুর, শাখা-পলা, শঙ্খ, ঠাকুরের মূর্তি, দেব-দেবীদের ছবি, চন্দনকাঠের টুকরো―এরকম সব কিছু; সব কিছু জড়ো করতে থাকি, আর দেখতে থাকি, পুরো বাড়িটা অচেনা হয়ে পড়ার পরও স্তব্ধ বাতাসের মতো জড়িয়ে আছে আমাদের প্রত্যেককে।

বেলা একটু চড়তেই ক্যাপ্টেন জায়েদি আসেন দিলালপুরের মাওলানা আর জিলাপাড়ার সর্দারদের সানাইয়ের দলটিকে নিয়ে। কারা যেন বাড়ির বাইরে শামিয়ানা টাঙিয়ে দেয়―তারপর দেখি, কী এলাহি কাণ্ড―কেবল আমার বাবাই না, পাবনার সব হিন্দুই মনে হয় আছে সেখানে। তাদের সঙ্গে এসেছে বাড়িঘরের নারী-শিশুরাও। তা আসবে না কেন, পুরুষেরা সবাই মুসলমান হয়ে যাবে আর নারীরা হিন্দুই থাকবে, সেটা হয় নাকি? জলচৌকি, নাকি পানিচৌকির ওপর একটা জায়নামাজ বিছিয়ে দিলালপুরের মাওলানা উচ্চস্বরে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করে। তার তালবেলেমরাও বাগানের ঘাসের ওপর মাদুর বিছিয়ে বসে রেহালের ওপর কোরআন শরীফ রেখে পড়তে থাকে সুর করে। তখন শেষবর্ষা অথবা প্রথম শরতের রোদ আকাশে ঢেউ তুলতে থাকে এবং খানিকপরেই যেন ভাদ্রের তালপাকা গরম এসে বাড়ির একেবারে ভেতরের কক্ষে জড়ো হয়ে থাকা আমাদের সবাইকে অস্থির করে তুলতে থাকে। কে নেই এইখানে ? তাকিয়ে তাকিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করি আমি, ওই তো দেখা যাচ্ছে ইঁদারাপট্টিতে যার সবচেয়ে বড় দোকান, সেই ফণী দত্ত কাকার মা আর বৌমণিদের, ওই তো মণি দত্ত কাকার মেয়ে, ওই তো হরেন সাহার বউ … মনে করতে করতে আমি খেই হারিয়ে ফেলি। তখন বাইরে থেকে হঠাৎ আমরা শোরগোলের আওয়াজ পেয়ে ভয়ে গুটিশুটি মেরে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ি; অনেক সাহস নিয়ে মা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন দেখে, তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমাখা মুখে কিন্তু বড় নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলে, ‘খালি খালি ভয় পাও তোমরা! তেমন কিছু না-ধুতি-টুতি আর পৈতা-টৈতাগুলো পোড়ানো হচ্ছে …’

শুনে আমারও ভারি স্বস্তি লাগে। কিন্তু তখনই কার যেন আর্তচিৎকার ভেসে আসে আর আমার সাহসী মা আবারও জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে বিষয়টাকে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কেবল এইটুকু বোঝা যায় যে, মওলানা সাহেব কিছু একটা বলছেন আর আমার বাবাসহ বিভিন্নজনও সে কথাই বলছে। তারও খানিকক্ষণ পরে, দুপুরের দিকে ক্যাপ্টেন জায়েদ বাবাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসে; আমি দেখি, বাবা লুঙ্গি উঁচিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছে আর ক্যাপ্টেন তাকে বলছে, ‘এ তেমন কিছু না আমিনুল সাহেব, সাতদিন পর হাজামের ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলবেন, কুসুম গরম পানি দিয়ে ক্ষতস্থানটা ধুয়ে ফেলবেন … তারপর বললই তো মাওলানা সাহেব―কয়েকদিন নারকেলের তেল মেশান বরিক পাউডার আর নারকেলের তেল দিলেই হবে। সঙ্গে যদি একটু ন্যাপথলিন গুঁড়ো দিতে পারেন, তাহলে তো খুবই ভালো হয়―’

এরপর বাড়ির ভেতরের দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন বলতে থাকে, ‘কোথায় ভাবিসাহেবা, আপনারাও কলেমা পড়ে নেন, নাকি ? লাভ তো আপনাদেরই বেশি―আগের ধর্মে আপনারা তো বাপ-স্বামী কারও সম্পদেই কোনও ভাগ পেতেন না। এখন থেকে তো আপনারাও অনেক কিছুর মালিক …

এইভাবে আমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাই। ক্যাপ্টেন চলে গেলে, মাওলানা ও তার তালবেলেম আর এলাকার গণ্যমান্য সব মুসলমানরা চলে গেলে, বাবা আমাদের বলে, খৎনার সময় ফণি দত্ত নাকি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কাপড় পুড়িয়ে যখন ছাই বানাচ্ছিল মাওলানা সাহেব, তখন থেকেই সে নাকি অস্থির হতে শুরু করেছিল, আর চিৎকার করে চোখ বুজে ফেলেছিল ছুরিটা দেখেই। তবে বাবা কোনও ভয় পায়নি। যাওয়ার আগে সেজন্যে বাবার পিঠ চাপড়েও তো দিয়ে গেল ক্যাপ্টেন। আর বলে গেল, সাতদিন পর ব্যাণ্ডেজ খোলার পর গরুর মাংস দিয়ে পোলাও-খিঁচুড়ি কিছু একটা খেয়ে নিলেই পুরোপুরি মুসলমান হয়ে যাব আমরা। না, আমাদের কিছুই করতে হবে না। ক্যাপ্টেন জায়েদি আর মওলানাই বাবুর্চি থেকে শুরু করে সব কিছুর জোগাড়যন্ত্র করবেন, আমরা শুধু ধৈর্য ধরে সেই মাংস খাব আরকি।

এইভাবে আমার বাবা, বিলু বাবু নামে সবার কাছে পরিচিত আমার বাবা আমিনুল ইসলাম চৌবে হয়ে যায়, ফণী দত্ত কাকা ফজলুল হক হয়ে যায়, শ্রী শিবাজী মোহন চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম হয়ে যায়, হরেন সাহা আবদুর রশিদ হয়ে যায়, মণি দত্ত লতিফুল হক হয়ে যায়, আমি নিজে হয়ে যাই মোছাম্মাৎ মোমেনা খাতুন, আমার আরতি মা হয়ে যায় মোছাম্মাৎ লতিফা খাতুন, দিদা হয়ে যায় মোছাম্মাৎ ওজিফা খাতুন … এইভাবে আমরা একজনের পর আরেকজন অন্য কিছু হয়ে যেতে থাকি, হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিদিনই ভুল হয়, মাথা-গলা-বুকে ওড়নাটা ভালো করে পেঁচিয়ে রাখতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়, সুরা মুখস্থ করতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়, নামাজে দাঁড়াতে ভুল হয়ে যায়, বাবা বাইরে গিয়েও ফের ফিরে এসে টুপি নিয়ে মাথা ঢাকে, মা হঠাৎ করেই মনের ভুলে সিঁদুর দিয়ে তা ধুয়ে ফেলার জন্যে ফের স্নানঘরে ঢুকে পড়ে, শঙ্খ হাতে নিতে গিয়ে তার মনে পড়ে ওহ্ হো, এখন তো আর শঙ্খ বাজানোর দরকার নেই, সকালবেলা ফুল তুলবার জন্যে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই আমার মনে পড়ে যায়, এইভাবে বাইরে যাওয়া মোটেও তো ঠিক নয় …

বাবা একদিন খাতা-কলম নিয়ে আমার সঙ্গে বসে ভুল আর শুদ্ধ বানানগুলোর তালিকা করে, তারপর তালিকাটা ঘরের মধ্যে দরজার সঙ্গে টাঙিয়ে দেয়। আমরা বার বার পড়তে পড়তে মোটামুটি মুখস্থ করে ফেলি, স্নান আর বলা যাবে না, বলতে হবে গোসল; জল আর বলা যাবে না, বলতে হবে পানি; মাংস আর বলা যাবে না, বলতে হবে গোশত, দাদা-দিদি বলা যাবে না, বাবা বলেও বাবাকে ডাকা যাবে না … এইভাবে আমাদের চর্চিত শব্দগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়তে থাকে, শুদ্ধ শব্দগুলো ভুল হয়ে যেতে থাকে, পরিত্যক্ত শব্দগুলো চর্চিত হতে শুরু করে, ভুল শব্দগুলো শুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে; আমরা বাবা আর মেয়ে নিঃশব্দে কাগজের ওপর জমে ওঠা শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চিন্তা করি, শব্দের খেলার সঙ্গে কী অদ্ভুতভাবে আমাদের জীবন-মরণের খেলাও জড়িয়ে পড়েছে!

পাঁচ.

তারপর ধুলাউড়ী গ্রামটা সেই যে এক ভয়ঙ্কর রাতের অন্ধকারে রক্তউড়ী হয়ে গেল, মুক্তিযোদ্ধা আর গ্রামবাসীদের পাকিস্তানি আর রাজাকার-শান্তিবাহিনী মিলে কচুকাটা করল―আর সেই ভয়ানক ঘটনার খবর পেতেও কি না এই পাবনা টাউনের লোকজনের আরও চারদিন লেগে গেল―আর এসবেরও সাত-আটদিন পর, কী আশ্চর্য, হঠাৎ করেই শহরটায় পাকিস্তানি সৈন্য বেড়ে যেতে লাগল। পাকিস্তানি সৈন্য যত বাড়ে, আমরা ততই শিউরে উঠি, এই কালাচাঁদপাড়ায় দূরের জোড়বাংলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার  আর মনেই পড়ে না, আমরা হিন্দু নাকি মুসলমান; তবে যেটাই হোক না কেন, আমরা কেবলই ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে থাকি। ওরই মধ্যে কখন কে যে আবার সাহস করে লুকিয়ে লুকিয়ে রেডিও শুনে ফেলে, সে কথাও তো বলা কঠিন; তাই আরও সাত-আটদিন পরে রেডিও শুনতে শুনতে বাবা হাপুস হুপুস করে কাঁদতে থাকে। কিন্তু না আমি, না মা, না দিদা―কেউই প্রশ্ন করার সাহস পাই না যে, কেন সে এমন করে কেঁদে চলেছে। তবে কাঁদতে কাঁদতে বাবা নিজে থেকেই বলে, দেশটা নাকি স্বাধীন হয়ে গেছে। তারপরও বাইরে বেরুনোর সাহস পাই না আমরা। রাস্তায় পাকিস্তানিদের অবশ্য খুব কমই দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মাঝে-মধ্যে যা দেখা যাচ্ছে, তা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, রাজ্যের পাকিস্তানি সৈন্য এসে জড়ো হয়েছে শহরটাতে। মাঝেমধ্যেই গুলির আওয়াজে সব কিছু কেঁপে কেঁপে উঠছে। মুক্তিরা নাকি শহরটাকে ঘিরে ফেলেছে―তা জেনে চিৎকার করে হাসতে হাসতে কাঁদতে কাঁদতে বাইরে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছে জাগে; ইচ্ছে করে তালপুকুরে ঝাঁপ দিয়ে নেমে পড়তে। আর এইসব ইচ্ছে নিয়ে রেডিওর সামনে বসে থাকি সবাই গোলগাল চাঁদ হয়ে।

যেদিন মুক্তিবাহিনী শহরে এল, বাবা সত্যিই আমাকে তালপুকুরে নিয়ে গেল। কিন্তু এ কি অবস্থা তালপুকুরের ? তালপুকুরের জল নাকি পানি একেবারে লাল টকটকে হয়ে আছে! আনন্দে মত্ত মুক্তিরা আকাশে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ছে, এই শীতের দিনেও আকাশ থেকে কেন যেন একপশলা বৃষ্টি নেমে এলো হঠাৎ করে, বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের চোখ দিয়ে নেমে আসা অশ্রু মিশে গেল, চেনা-অচেনা মানুষের কোনও ব্যবধান নেই আজ, একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে জানিয়ে যাচ্ছে, আছেÑসেও বেঁচে আছে, সেও খুশি তার বেঁচে থাকায়।

কী যে আনন্দের বন্যা বইছে! এই বন্যা কি আর শেষ হবে না? কষ্ট করে গরু খেয়ে খেয়ে মুসলমানিত্বের প্রমাণ দিতে দিতে কী ভয়ঙ্কর ক্লান্তি আর অবসাদ চেপে বসেছে, হঠাৎ করে তা যেন নাগরদোলা হয়ে দুলতে লাগল আমার দু’চোখজুড়ে। অনেক রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল নিয়ে এল―তাদের সঙ্গে ফণী কাকাও আছে। তারা এ খবরও নিয়ে এসেছে, কোবাদ চাচারা কেউ বেঁচে নেই, পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময়েই তাদের ধরে ফেলেছিল পাকিস্তানিরা। আনন্দী … আনন্দীও নেই ? তাহলে তো আমিও আর নেই! হলুদ জবার ফুল আমি কার চুলে গুঁজে দেব ? কিন্তু ফণী কাকা আনন্দে টগবগ করে ফুটছে, ‘শোন বিলু, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, আমরা কিন্তু এখন আবার সেই সনাতন ধর্মের মানুষ হয়ে গেছি, বুঝেছ তো ? তবে আমি কিন্তু ওইসব প্রায়শ্চিত্তÑফায়শ্চিত্তের মধ্যে নেই। কেন রে বাবা, আমি কি ইচ্ছে করে মুসলমান হয়েছিলাম নাকি যে আমাকে আবার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ?’

বাবার মুখটা কেমন শক্ত হয়ে ওঠে। তারপরেই মৃদু হাসি ফুটে ওঠে মুখে, বলে, ‘সে আপনার ইচ্ছে―’

‘মানে ? তোর অভিপ্রায় কী ? প্রায়শ্চিত্ত করা ?’

‘না দাদা―আমি প্রায়শ্চিত্ত করব না আর তোমাদের ওই সনাতন ধর্মেও ফিরে যাব না।’

‘মানে ?’―ক্রুদ্ধ অন্ধকার থই থই করতে থাকে ফণী কাকার চোখেমুখে।

‘হ্যাঁ দাদা, যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন আমি মুসলমানের এই বেশ ধরেই থাকব। মানুষের যেন আমাকে দেখেই মনে হয়, কত অন্যায় সহ্য করতে হয়েছে এই স্বাধীনতাটা পেতে; কত রক্ত দিতে হয়েছে, কত ধর্ম দিতে হয়েছে, কত শরীর দিতে হয়েছে … আর বলা কি যায়, আরও কত কিছুই হয়তো দিতে হবে …।’

তা কথাটা যে বাবা খারাপ বলেনি, সেটা টের পেলাম আরও কয়দিন পরে। স্কুল খুলবে-খুলবে করছে তখন; খোঁজখবর নিতে এসেছি স্কুলে। গেট পেরিয়ে কেবল ভেতরে ঢুকব, বাইরে দোকানের সামনের জটলার মধ্যে থেকে কাকে যেন উচ্চস্বরে বলতে শুনলাম, ‘দি নিউ হাতাকাটা শার্ট …’ সঙ্গে সঙ্গে হাসির বন্যা বয়ে গেল সেখানে। হাসির বন্যা এসে ধাক্কা দিতে লাগল এই কানে ওই কানে। তবে বলেছি না, মেয়েরা তো একটু তাড়াতাড়িই সব কিছু বুঝতে পারে, মানে বুঝতে বাধ্য হয়; আমিও ভালো করেই বুঝি ফুলশার্ট কী, হাতাকাটা শার্ট কী, আর দি নিউ হাতাকাটা শার্টই বা কী। কিন্তু কিছু না বলে উদ্গত কান্নাটা ভেতরের দিকে ঠেলে দিতে দিতে আমি সামনের দিকে হাঁটতে থাকি, নিজেই নিজেকে বলি, যস্মিন দেশে যদাচার … মুসলমানের দেশ এটা, এ দেশে থাকতে হলে তো তোমাকে এদের সঙ্গেই থাকতে হবে বাবা। মুসলমান যে কী আর হিন্দুই বা কী, বুঝি বা না বুঝি, খৎনা তো হয়ে গেছে, আর ঘা-ও শুকিয়ে যাবে, একটু সময় লাগবে, এই আরকি…

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares