বাংলাদেশের ১৫ নতুন গল্প : দিন বা রাত্রি : ধ্রুব এষ

মুস্তফা মেসেজ দিল, দাদা রে!

দাদা রিপ্লাই দিল, কী রে ?

জলময়ূরী নিয়া তিন-চার

লাইনের একখান কবিতা

লিখে সেন্ড কর।

দাদা স্বভাবকবি। মেসেজ মাত্র জলময়ূরী নিয়ে চার লাইনের একখান কবিতা লিখে সেন্ড করল।

জলের কন্যা জলময়ূরী

জলের ঘরে বাস,

জলে জলে জ্বলে পুড়ে

আমার সর্বনাশ।

দুইসেলেন্ট একখান কবিতা হয়েছে। একসেলেন্ট না। মুস্তফা দাঁত বের করে হাসল। নে, দুইটা টান দে রে দাদা। অ, তুই তো এখন ঢাকায়।

জানালা দিয়ে আকাশের ভাব চক্কর দেখল মুস্তফা। জিলকি দিল। ঠাটা পড়ল কোথাও। কেউ কি মরল ? ঠাটা পড়ে মানুষ খুব মরছে ইদানীং। কিছুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সতের জন মানুষ একসঙ্গে মরেছে। মুস্তফাকে বলেছে মাকু দাদা। মাকাল বলে সে মাকু। মাকু দাদা। মাকাল হলেও জ্ঞানী ব্যক্তি। খবরাখবর রাখে দেশ জাতির। পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন দেখে। বই পড়ে। মুস্তফার অত খবর রাখার টাইম নাই।

তারা কলিগ। মাকুদাদা এবং মুস্তফা। মেয়র অফিসে কাজ করে। মাকুদাদা পানি বিভাগে, মুস্তফা প্রকৌশল বিভাগে।

সন্ধ্যা এখনও হয়নি, হয়ে যাবে। ছুটির দিন, বৃষ্টির দিন। দুপুরে ভাত গরম করে খেয়ে কাঁথার তলে ঢুকে পড়েছিল মুস্তফা। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দের মতো ঘুমপাড়ানি গান আর হয় না। ঘুম ধরে গিয়েছিল তার। ঠাণ্ডা আরামের একটা ঘুম দিয়ে উঠেছে। জলময়ূরীর কবিতাটা এখন ফরোয়ার্ড করে দিল একটা নাম্বারে।

ভাস্করদা কল দিল।

‘এই তুই কই রে মস্তোক ?’

মুস্তফা বলল, ‘ভাস্কর বাবু ? ধান্দা কী বলো ?’

‘ধান্দা! শোন রে মস্তোক, এই ভাস্কর তোরে ফোন করে ধান্দায় ? এইটা কি কথা বললি তুই ? না না, এইটা কোন ধরনের কথা ? যা মনে হয় বলে দিবি, লাইন নাই, ঘাট নাই ?’

‘ঘাট ? লঞ্চঘাটের কথা বলতেছ বাবু ?’

‘না, শ্মশান ঘাটের কথা বলতেছি।’

ভাস্করদা লাইন কেটে দিল।

আবার দাঁত বের করে হাসল মুস্তফা। দোয়া দিল, ভাস্কর বাবু তুমি একশ ছয় বছর বাঁচো। বাধনপাড়ার এয়ারুদ্দিন উকিলের মা বিনত বিবি মঙ্গলবারে এন্তেকাল করেছেন। লোকাল পত্রিকায় শোক সংবাদ ছাপা হয়েছে, বিনত বিবি একশ পাঁচ বছর বয়সে মরেছেন।

বৃষ্টি কী বৃষ্টি।

‘অন্ধ বধূ’ ছবির গান মনে পড়ল মুস্তফার।

মরার বৃষ্টি আসিয়া

শরম নিল কাড়িয়া

এই পোড়া অঙ্গ লইয়া থাকি

কোথায় পলাইয়া….

বহু বছর আগের ছবি। শ্রেষ্ঠাংশে : ইলিয়াস কাঞ্চন-রোজিনা। পশ্চিম বাজারের নূরজাহান সিনেমায় দুই মাস ধরে চলেছিল। মুস্তফা আর অপ্পু তিনবার দেখেছে। অপ্পু এখন থাকে আমেরিকায়। নিউইয়র্কে। তাদের সময়ের রোমান্টিক নায়ক জাফর ইকবালের মতো দেখতে অপ্পু। বিয়ে করেছে, এখনও ছেলেপিলে হয়নি।

মুস্তফা-রেমির দুই ছেলে। চার বছর আগে চিরতরেই হয়তো মুস্তফাকে ছেড়ে চলে গেছে রেমি। ছেলে দুটাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। ভালো করেছে।

আশ্চর্য! কোথাও কি ‘মরার বৃষ্টি আসিয়া’ বাজছে ?

মুস্তফা কল দিল কাকে ?

কল যাচ্ছে।

কল রিসিভ হলো, ‘হ্যালো ?’

নারী কণ্ঠ।

মুস্তফা বই-পুস্তকের বাংলা ভাষায় বলল, ‘হ্যালো। স্লামালিকুম।’

‘হ্যাঁ। বলেন।’

‘আপনি কি জলময়ূরী বলছেন ?’

জলময়ূরী বলল, ‘জলময়ূরী! জলময়ূরী কে ? আপনি কে ভাই ?’

‘আপনি জলময়ূরী, আমি জলময়ূর। কেন আপনি কবিতা পড়েননি ?’

‘কবিতা! ইসকুল কলেজের পরে আমি আর কবিতা গল্প পড়ি নাই ভাই। আপনে আসলে কে বলেন তো ?’

‘বলেছি একবার। আমি জলময়ূর। আপনি কি কবিতাটা পড়ে দেখবেন, প্লিজ ?’

‘কবিতা ? কিসের ?’

‘মেসেজ ইনবক্সে দেখুন প্লিজ।’

‘মেসেজ ইনবক্সে ? কে পাঠাইছে ?’

‘আপনি প্লিজ কবিতাটা পড়ুন।’

বলে ফোনের লাইন কেটে দিল মুস্তফা। শুকনা ফুলের বিড়ি ধরাল আরেকটা। নেশা লাগিলো রে/বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিলো রে…। ফোন বাজল। আবার ভাস্করদা। মুস্তফা মোলায়েম হলো, ‘জি ভাস্করদা ?’

‘শোন রে মস্তোক, তোর বৌদি পাঁঠার ঝোল রানছে, এক বাটি তোরে দিয়া যাই ?’

‘আবার জিগাও। জলদি দিয়া যাও।’

রাতের বন্দোবস্ত হয়ে গেল তাহলে। পাঁঠার ঝোল। আহ! পূর্ণমাত্রায় আনন্দিত মুস্তফা দুই মিনিট পর আবার কল দিল জলময়ূরীর নাম্বারে, ‘জলময়ূরী, কবিতা পড়েছেন ?’

‘পড়ছি, ভাই। বুঝি নাই। কবিতা-টবিতা আমি বুঝি না। আপনি কে বলেন ? নাইলে রাখলাম−।’

‘রাখবেন না জলময়ূরী, প্লিজ। আমার আর একটা কথা শুনুন।’

‘বলেন−।’

‘আপনি সবসময় শাড়ি পরেন, সালোয়ার কামিজ পরেন না কেন ?’

‘কী ? এই আপনের একটা কথা! আপনে কে ? তুষার ?’

‘তুষার ? তুষার কে ?’

‘তবে কে ? মান্না ?’

‘তুষার, মান্না, এরা কারা ?’

‘এরা আমার বন্ধু।’

‘আপনার বন্ধু ? আমিও আপনার বন্ধু জলময়ূরী।’

‘দেখো…এই! আপনি কি আমার কাকাশ্বশুর ?’

‘কাকাশ্বশুর? আমি যতদূর জানি আপনার কোনও কাকাশ্বশুর নেই।’

‘আছে। আমার কাকাশ্বশুর অমিয় মাস্টার।’

‘অমিয় মাস্টার। এ আবার কে ?’

‘আপনে তো দেখি টাউনের কাউরেই চিনেন না।’

‘আমি শুধু জলময়ূরীকে চিনি।’

‘আমার নাম কি জলময়ূরী নি ?’

‘আমি ডাকি।’

‘অ-অ-অ, আচ্ছা। আপনে কী ? জলঘুঘু?’

‘জলময়ূর।’

‘ভাই আপনে কে বলেন তো? আপনেরে আমার নাম্বার দিছে কে ? শোনেন, আপনে কি আমার বাসা চিনেন ?’

‘এ আপনি কী বললেন জলময়ূরী, আপনার বাসা আমি চিনব না ?’

‘চিনেন যদি বাসায় আসেন। আপনেরে চা খাওয়াই−।’

‘বাসায় না, জলময়ূরী। শহরে নতুন একটা রেস্তোরাঁ হয়েছে হেঁসেল। গার্লস স্কুল রোডে। ব্ল্যাক কফি এরা চমৎকার বানায়। সন্ধ্যায় হেঁসেলে আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব।’

‘অপেক্ষা করবি ? তোর অপেক্ষার কপালে ঝাটা রে শালা!’

‘অ্যাঁ! জি! জলময়ূরী আপনি কী বলছেন এসব ?’

‘জলময়ূরী! শালার শালা, পাই তোরে। রঙ্গনের বাপের ফোনে নাম্বার নাই তোর ? তোর শুদ্ধ কথা শোনা মাত্রই সে বেতঝাড়ের দিকে গেছে−।’

হেসে ফেলল মুস্তফা, ‘মাফ করে দে রে দিদি।’

‘মাফ! তোরে ব্যাটা আমি কী করি দেখ! কত বড় বদমাইশ। আমারে বলে জলময়ূরী। রঙ্গনের বাপ বেত নিয়া আসুক−।’

‘ইয়া মাবুদ! ইসকুলের পরে আর কোনদিন বেতের বাড়ি খাই নাই রে দিদি। মাফ করে দে। এই দেখ, কান ধরলাম। এছাড়া আমার কী দোষ বল ? দাদা বলল তোরে এইসব বলতে−।’

‘তোর দাদারেও দ্যাখতেছি আমি। ঢাকায় বসে বসে এইসব করে সে!’

‘সে যে কী কী করে রে দিদি, তোরে আমি বলতে পারব না। হবিন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করে নিজেরে।’

‘হবিন্দ্রনাথ ঠাকুর আবার কে রে ?’

‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হবে হবে আর কী। হবিন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

‘এইটা তুই একটা খাঁটি কথা বলছিস রে ভাই। রঙ্গনের বাপের ফোনে ছবি দেখছি তার। চুল দাড়ি কাটে না, কী রূপ ধরছে!− আচ্ছা নে, রঙ্গনের বাপের সাথে কথা বল তুই−।’

‘না রে দিদি−।’

‘মুস্তফা!’

জলদগম্ভীর স্বর মাকুদাদার।

মুস্তফা বলল, ‘দাদা আদাব।’

‘আদাব। তুই কি কাল অফিসে আসবি নাকি আসবি না ?’

‘আসব রে দাদা। কেন ?’

‘না, আয়। তোরে একটু দেখি। রঙ্গনের মা বলল তুই জলমইয়ুর হইছিস।’

‘না রে দাদা! মাত্র আমি দিদিরে বলছি−।’

‘কী বলছিস আমার শোনার দরকার নাই। কাল অফিসে যা বলার বলবি। বেতঝাড়ে বেত পাইছি তিনটা। একটার নাম দিছি পাঞ্জাবি, একটার পিআই, একটার আবদুল খালেক টু। আচ্ছা তুই রাখ এখন।’

পাঞ্জাবি স্যার, পিআই স্যার, আবদুল খালেক টু স্যার। জুবিলি স্কুলে পড়েছে এমন চল্লিশোর্ধ্ব পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষ কম আছে টাউনে যারা এই তিন স্যারের হাতে বেতের বাড়ি খায় নাই। ‘বাবা গো! মা গো!’ ত্রাহি ডাক ছাড়ে নাই। ফাইভে থাকতে মধ্যবাজারের শ্রী মতিলাল বণিকের প্যান্টে পেশাব করে দেওয়ার রেকর্ড আছে। মতিলালের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মুতিলাল’। এই মুতিলাল! মুতিলাল রে!

কত কী মনে পড়ে বৃষ্টিতে।

আরেক গ্লাস চা বানাল মুস্তফা। মিস কল দিল। মুহূর্তে কল ব্যাক, ‘কী রে উলা ?’

উলা তারা বলে হুলো বেড়ালকে। হুলো থেকে হুলা থেকে ‘উলা।’ মুস্তফা বলল, ‘উলা বলিস না রে দাদা, কষ্ট পাই। এর থেকে শিয়াল বল। কথায় বলে শিয়াল পণ্ডিত। আর ডন যদি বলিস, তাইলে তো কথাই নাই। ডন মুস্তফা।’

‘ডন না,  মুস্তফা।’

‘ডিং! ডিং!’

‘মানে ?’

‘তোর উচ্চারণ খারাপ রে দাদা। ড- কে ‘ধ’ বলিস। ডিং ডিং-কে তুই ধিং ধিং বলবি। শোন আবার বলি। ডিং ডিং। বুঝলি কিছু ? আরে ডিং ডিং হলো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। ডন মুস্তফা বলার সাথে সাথে ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক বাজে ডিং ডিং।’

‘বুঝলাম। জলময়ূরীর কী ঘটনা বল।’

‘ইয়া মাবুদ! বলিস না রে দাদা, কবিতাটা সেন্ড করছিলাম জবারে।’

‘জবারে!’

‘হ্যাঁ।’

‘জবা! কেন ? জবা তোর জলময়ূরী ?’

‘তওবা! তওবা! না রে দাদা। জলময়ূরী পড়ে কলেজে। কাল তার জন্মদিন। আজ রাত বারোটায় তারে কবিতাটা সেন্ড করে শুভ জন্মদিন বলব। জবার নাম্বার আমার ফোনে ছিল না। মাকুদাদার কাছ থেকে নিছি।’

‘ম্যাক কী বলে ?’

‘ইয়া মাবুদ! খেপছে রে ভাই। আমারে বলছে কাল অফিসে দেখা হবে।’

‘অফিসে কি সে তোরে মারধর করবো নাকি ?’

‘আর বলিস না। পাইলেই গুমগুম করে কিল দেয় ব্যাটা! কোনও কোনওদিন আবার বলে কিল দিমু না, পান খাওয়া দুইটা।’

মাকালের বয়স হয় নাই।

ব্যাপার কী রে ? এতক্ষণ ধরে বৃষ্টি ঢাকার এলাকা বিশেষে হয় না। সাত-আট বছরের সাত-আট শ্রাবণের সব বৃষ্টি মনে হয় একসঙ্গে নেমেছে। জলাবদ্ধ হয়ে যাবে ঢাকা। হয়ে যাক। ভোগান্তি বাড়বে জনযাত্রীর। কী করার আছে ?

মাকুদাদা কল দিল। ধরতেই ফিসফিস করে বলল, ‘চুপ, চুপ করো, ধরসে।’

‘কী বলিস রে ?’

‘কিছু না। কিছু বলি না।’

‘ফিসফিস করে কী বললি ? চুপ করো ধরসে! জবারে বললি ? কেন ? তুই কী মনে করছিলি ? আমি কল ধরব না ?’

‘মনে করাটা স্বাভাবিক কি না ? বাবা মাথা স্ট্রং!’

‘কার মাথা স্ট্রং ? তোর না তোর বউয়ের ?’

‘নে জবার সাথে কথা বল তুই। ওগো, ধরো।’

জবা ফোন নিয়ে বলল, ‘তোর সাথে আর কথা বলব না রে ভাই।’

‘কেন রে ? কী হইছে ?’

‘এইসব কী। মুস্তফা শালা আমারে ফোন দিয়া বলে, পানকৌড়ি কেমন আছেন! শুদ্ধ ভাষায় বলে!’

‘পানকৌড়ি না, জলময়ূরী।’

‘এই তো। রঙ্গনের বাপরে তো আমি বলছি নাটের গুরু তোমার ঢাকার বন্ধু।’

‘ঢাকার বন্ধু ? কার ? আমি তো তোর বন্ধু।’

‘আমার বন্ধু হইলে এইরকম করিস!’

‘কী রকম করি ? মুস্তফারে আমি বলছি তোরে জলময়ূরী বলতে ?’

‘তবে ?’

‘আরে! তুই হলি জলখাসি। তোরে সে জলময়ূরী কেন বলবে ? সেন্স নাই গরুটার।’

‘যা ব্যাটা!’

জবা হেসে ফেলল।

মাকুদাদা ফোন নিল, ‘এই কী রে ?’

‘না রে। এই তো।’

‘এই তো ? ভালো।’

‘কী ভালো ? তুই ভালো-মন্দের কিছু বুঝিস ? মাকালের মাকাল।’

‘আমি তো মাকালই। তুই সব বুঝিস।’

‘আমি সব বুঝি বলি নাই। আমি যা বুঝি, মুস্তফা যা−।’

‘মুস্তফা! এর নাম নিস না−।’

‘কেন ? এ তোর কী ক্ষতি করছে ?’

‘আমার ক্ষতি করার ক্ষমতা তার আছে ? শালার ভাই শালা! আমার কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়া জবারে কল দিয়া সে আকথা-কুকথা বলে।’

‘শোন, তুই হলি পৃথিবীর এক নম্বর মাকাল। মাকুদাদা। মুস্তফা আকথা-কুকথা কিছু বলে নাই। জবারে জলময়ূরী বলছে−।’

‘জলমইয়ূরী। সে কী ? জলমইয়ূর ? শালা, মড়ার টিল্লার শিয়াল। কাল তারে পাই অফিসে, তার কী কৈফিয়ত শুনব।’

‘কৈফিয়ত কিসের রে ? তোর বউয়ের সাথে আমরা রং তামাশা করতে পারব না ?’

‘আর সবাই পারবে। মুস্তফা পারবে না।’

‘তোর অমিয় কাকা পারবে, মুস্তফা পারবে না ?’

‘না, পারবে না। আর মাস্টারের বাচ্চা মাস্টার আমার কোনকালের কাকা হয় রে ?’

‘সে বলে তুই তার ভাতিজা।’

‘বলুক, এই শালারে নিয়া এখন ভাবতেছি না−।’

‘ভাববি না কেন ? জবা তারে বলে কাকাশ্বশুর।’

‘সেটা জবার ব্যাপার। আমার ব্যাপার আমি বুঝব। কাল আগে শিয়ালটার হিসাবনিকাশ নিই−।’

‘কী হিসাবনিকাশ ? কী আশ্চর্য! তুই কি মুস্তফারে মারধর করবি ? মারধর করিস না। করোনা হইছে, বয়সও হইছে, মুস্তফার কিন্তু দেহে বল নাই। এইটা যে গীতবিতান-এর করোনা পর্বের গান তা তো জানিস, দেহে বল নাই চোখে ঘুম নাই?’

‘জানতাম না, জানলাম।’

‘জেনে রাখা ভালো। মুস্তফারে তাইলে আমি এনশিওর করতেছি তুই তারে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করবি না।’

‘আমি কথা দিতে পারি না।’

‘এই তোর কি তার ছিঁড়া নাকি ? কথা বুঝিস না ? মাকালের মাকাল! বললাম মুস্তফার দেহে বল নাই, চোখে ঘুম নাই। যদি তোর কিল খেয়ে সে মরে যায় ব্যাটা, তুই তো মার্ডার কেসে পড়বি!’

‘পড়ব। জেল খাটব।’

‘যাবজ্জীবন না, ফাঁসি হবে তোর।’

‘ফাঁসিতে ঝুলব।’

‘মুস্তফার জন্য ?’

‘না। তার মতো একটা শিয়ালের জন্য আমি কেন ফাঁসিতে ঝুলব ?’

‘তবে ?’

মুস্তফা কল দিল বারোটার কিছু আগে।

‘কী রে দাদা ?’

‘কী ?’

‘কল ধরিস না। আমি তো ভাবলাম তুই আর নাই।’

‘তুই আছিস ?’

কেউ আছে ?

কেউ কি ? মুস্তফা, দাদা, মাকুদাদা, জবা ?

ফয়সালা কে দেয় ?

৩০ জুলাই ২০২১ গেছে আজ।

১৩ শ্রাবণ ১৪২৮।

দেশে আজ রেকর্ডসংখ্যক ২৬৪ জন মানুষ মরেছে করোনায়।

করোনা। কোভিড-১৯।

কোভিড-১৯ না খবিস ১৯।

থাকা না থাকার সব হিসাব নিকাশ বরবাদ করে দিয়েছে মানুষের। আশ্চর্য রঙিন এক ভাইরাস।

৩১ জুলাই ২০২১। জিরো আওয়ার।

প্রকৃত জলময়ূরী এক বালিকাকে কবিতাটা সেন্ড করল মুস্তফা।

জলের কন্যা জলময়ূরী

জলের ঘরে বাস,

জলে জলে জ্বলে পুড়ে

আমার সর্বনাশ।

শুভ জন্মদিন, জলময়ূরী।

কী সর্বনাশ!

 লেখক : চিত্রশিল্পী ও কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares