বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : জোনাইজ্ঞাতির কুটুম্বপুরুষ : শিমুল মাহমুদ

অতঃপর রাত্রিসমাপ্ত-প্রহরে বৃষ্টি নামলো। সেই বৃষ্টিতে উঠে দাঁড়াল চার্বাক। পরদিন ভ্রমণরত ওরা মুখোমুখি হলো নামগোত্রবিহীন কোনও এক স্রোতচিকচিক জলপ্রবাহের। হয়তো-বা স্রোতমাতার নাম হতে পারে ঘ¹ট। তবে তাই হোক, ঘ¹টস্রোতে দেহ ভাসালো ওরা। অতঃপর ভেসে যেতে থাকলে নদীতীরে দেখা দিল তীরদেশ-পরম্পরায় কদলি-বৃক্ষের জঙ্গল। অনায়াস সন্তরণে কদলিবৃক্ষ সন্নিকটে সমাগত ওরা, সুখ এবং বৃহস্পতি।

কিছুটা অনুসন্ধানের পর ওরা দু’জন পেয়ে গেল ত্রিভুজাকৃতির ধারালো পাথর। আর তখন ওরা ক্রমাগত পাথরের ঘর্ষণে কেটে নিল তিনখানা কদলিবৃক্ষ। এর পর সরু বংশদণ্ড কর্তনপূর্বক কদলিবৃক্ষের ত্রিদেহ গ্রন্থনে তৈরি করল নৌযান। এক্ষণে কদলিবৃক্ষকৃত জলবাহনের উপর উপবিষ্ট সুখচার্বাক। জলবাহনের সংক্ষিপ্ত লম্বাটে দেহের উপর সখাবৃহস্পতি, তদসঙ্গে ত্রিকাধি পক্ব কদলি। ওরা ভেসে চলেছে পশ্চিমে, মগ্নপ্রাণ জলস্রোত অনুসরণ করে। দীর্ঘ বংশদণ্ড সহযোগে জলযানের গতিপথ নির্দেশপূর্বক সুখচার্বাক হাসিয়া হাসিয়া কথা বলিতেছিল নিজের সঙ্গে, হাসিয়া হাসিয়া সুবচন প্রকাশ করিতেছিল সখা বৃহস্পতির উদ্দেশে, জলস্রোত ডাকছে সখা জলদেহে দেখো, জলস্রোতে নামো সখা জলস্রোতে ভাসো, বনকুক্কুট ডাকছে দূরে বনময়ূর নাচে, বনহস্তি নৃত্য করে হস্তিশিশু ডাকে, মায়াবাঘ ডাকছে আমায় সিংহিভগ্নী হাসে, আকাশপন্থে হস্তি ওড়ে হস্তি ভাসে মেঘে, মেঘ ডাকছে মেঘ ডাকছে, ডাকছে শস্যবীজ। আর তখন বান্দর বৃহস্পতির কণ্ঠে অব্যক্ত, নৃত্য-বাদ্য মদ্য-সংগীত প্রেমভোগ্য মাংস, পঞ্চসত্যে পঞ্চনদ পঞ্চরসে মার্গ।

জলযানের দক্ষিণ পার্শ্বের ভয়ানক আকৃতির একখানা মাতাকুম্ভির পুত্রকন্যাসমেত জলযান সংলগ্ন ভাসছিল। উহাদিগের জলজ মুখগহ্বর থেকে ভেসে আসছিল জলদন্ত বিকশিত সংগীত। আর তখন সেই খ্রিস্টপূর্বাব্দ জলস্রোতে বস্তুপণ্ডিতদ্বয়ের বামপাশর্^-আশ্রিত জলস্রোতে সঞ্চরণশীল একঝাঁক স্বর্ণমৎস্য গতিময়, একঝাঁক রৌপ্যমৎস্য গতিশীল, একঝাঁক তাম্রমৎস্য ধাবমান। সেই ঝাঁকবাঁধা ধাবমান গতিপ্রবণ মৎস্যকুল থেকে উদ্গীত হচ্ছিল অন্তরিক্ষ অভিমুখে সঞ্চারণশীল সংগীত। তখন প্রদোষলগ্ন সত্ত্বেও সেই খ্রিস্টপূর্বাব্দের স্বর্ণোজ্জ্বল প্রদোষলগ্নে তাদের জলযানের পশ্চাতে উড়ে চলছিল ঝাঁকবাঁধা পক্ষীকুল। সবুজবরণ হলুদবরণ রক্তবরণ মেঘবরণ দুধবরণ পক্ষীকুলের বহুবর্ণিল ঠোঁট থেকে ধ্বনিত হচ্ছিল নিরবচ্ছিন্ন চিরায়ত পার্থিব সংগীত, অঙ্কুরোদ্গম-আক্রান্ত সেই চিরায়ত জন্ম-উদ্দীপক সংগীত ক্রমাগত জীবজৈবজগৎ অভিমুখে রক্তচঞ্চল, গতিশীল, বায়ুতাড়িত, অন্ধকারতাড়িত, সদাজাগ্রত।

অতঃপর গণনাবিহীন চন্দ্রপক্ষ বিরামহীন সূর্যপক্ষ অন্তর কোনও একদিন, যেন-বা বর্ষণঋতু সমাপ্তকাল নিকটবর্তী। এতদঞ্চলে বৎসরভর কমবেশি বর্ষণ পরিলক্ষিত হলেও সম্ভবত খরাকালের সূর্যপ্রখর জীবনস্বার্থ সমাগত। জীবনস্বার্থের চাঞ্চল্যে যেন-বা সুখচার্বাক নির্ঝরশব্দে সচকিত। অনিবার্য জৈবজীব তাড়না-আক্রান্ত সুখ নির্ঝর শব্দরাশি অনুসন্ধানে দক্ষিণ বরাবর বাঁক নিতেই দেখতে পেল পাহাড়ি কচ্ছপ-পরিবার; একেক জনের পশ্চাতে আরেকজন নাতিদীর্ঘ বন্ধন-পরম্পরা পথ অনুসরণপূর্বক কচ্ছপকুল ধীর অতিধীর ন-অতি গতিরহস্য সৃজনপূর্বক হেঁটে চলেছে। যেন-বা চলার পথে ধ্যানমগ্ন জীবজৈব তাড়না-আক্রান্ত উদাস অথচ জল-অভিমুখে সদাচঞ্চল। আর তখন সুখচার্বাক দেখতে পেল মাতৃকা-কচ্ছপটিকে, সর্বসম্মুখে ক্রম-অগ্রসরমান ধীরগতি-আন্দোলিত। যেন-বা গতির মধ্যেই বিশ্রামরত, যেন-বা নির্মোহ বসুন্ধরা অভিমুখে নতজানু।

কচ্ছপ-পরিবার জল অভিমুখে চলেছে। সুখচার্বাক কচ্ছপ-পরিবারের পিছু পিছু প্রশান্ত চোখে হাঁটতে থাকে। চার্বাক যুবাকে পেয়ে কচ্ছপ-পরিবার আপ্লুত, মোটেও হতবাক অথবা বিব্রত নয়। বরং জীবকুলে তখন প্রেম ও সৌহার্দ, যদিও জন্ম মাত্রই জীবকুল জেনে গেছে জীবাতবে ন মৃত্যবে, বাঁচার জন্যই জীবন, মৃত্যু নিমিত্তে নয়, অনুসন্ধান কর বেঁচে থাকার উপায়, গ্রহণ কর জল ও বায়ু। গ্রহণ কর স্নেহ, শর্করা, চর্বি, শ্বেতসার জীবজৈবপ্রেম আর রক্তমাংস; এবংবিধ গ্রহণ নিমিত্তে রক্তপাত; রক্তপাতে জান্তব চিরায়ত আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা; আকাক্সক্ষা থেকে গতি; গতি থেকে বেঁচে থাকা; আর বাঁচতে হলে পেতে হবে গতি। সুখচার্বাক কচ্ছপ-পরিবারের মন্থর গতির ভিতর দেখতে পেল প্রেম ও প্রণয়, ক্ষুধা ও তৃপ্তি। আর তখন কচ্ছপ পরিবারের সর্ব পশ্চাতে ধীরগতি প্রাপ্ত চার পায়ে হাঁটতে থাকা পাহাড়ি কচ্ছপশিশু অভিমুখে সুখচার্বাকের দক্ষিণহস্ত ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। সুখচার্বাক সহসা হাতে তুলে নেয় কচ্ছপশিশু। নিজ স্কন্ধে উপবিষ্ট সখাবৃহস্পতির হস্তে কচ্ছপপুত্রকে গচ্ছিত রেখে কচ্ছপ পরিবারের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে সুখ। পক্ষান্তরে সুখচার্বাক তখন জীবন নিমিত্তে, সুখ নিমিত্তে হরণকৃত কচ্ছপপুত্রের এইমাত্র শূন্য হয়ে যাওয়া মৃত্তিকা পৃষ্ঠের স্থান পরম্পরা দখলপূর্বক কচ্ছপমাতার দৃশ্যমান দেহ অনুসরণ করছিল।

অবশেষে সুখচার্বাক কচ্ছপ-পরিবার সমভিব্যাহারে সরোবর নিকটবর্তী হলে দেখতে পেল নদীপ্রান্তে ত্রিভঙ্গ যোনি-আকৃতি, কোনওটি বা পঞ্চভঙ্গিমাবিশিষ্ট চিতাকৃতি, কোনওটি সরীসৃপ অথবা মসৃণ স্তনভারসদৃশ, এহেন বিচিত্রাকৃতির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথরদেহের উপর নদীজলে পদযুগল ডুবিয়ে অধিষ্ঠিত রহস্যসঞ্চারি মানবীসকল। যে সকল ন-অতিবৃহৎ শিলাখণ্ড রহস্যাবৃত মানবীসকলের পশ্চাদদেশ ধারণ করে রেখেছে ওগুলো হলুদাভ ধূসরবর্ণসমেত রক্তরঙহেতু যেন-বা সার্বিক দৃশ্যপট থেকে ভেসে আসছে রক্তচঞ্চল জীবনাকাক্সক্ষা, জান্তব ও সুঘ্রাণ-ব্যাকুল।

রমণী সকলের কেশরাশি রক্তবর্ণিল পক্ষীপালক সহযোগে চঞ্চল, অনিয়ন্ত্রিত বায়ু-আলিঙ্গনে ব্যাকুল; স্তনভার স্বপ্ননীল ময়ূরপেখম সহযোগে স্থির অথচ জান্তব ও বৃন্তজাগ্রত। জীবন-ইশারা-আক্রান্ত নাভীগহ্বর-প্রান্তে সবুজ কটিবাস, কার্পাসবস্ত্র নির্মিত মেখলাপট্ট রমণীয় হাঁটুর উপরিভাগ অবধি জড়িয়ে রেখেছে; পদযুগলে থমকে আছে গতি; ইশারামাত্র গতিপ্রাপ্ত পদযুগল মহাকাল-পরিভ্রমণে জাগ্রত। কটিবাস মেখলাপ্রান্তের ঠিক নীচে হাঁটুর উপরিভাগ মহামাতৃকার ভগাঙ্কুর আকৃতির শ্বেতধূর খাঁজকাটা কৃষ্ণাভা মিশ্রিত বহুবর্ণিল কড়িগুচ্ছ সহযোগে আবৃত। পায়ের পাতা জলে নিমজ্জিত থাকলেও স্বচ্ছ জলের প্রতিবিম্বে ভেসে উঠেছে পায়ের পাতায় পেঁচিয়ে থাকা তাম্রধাতুনির্মিত লতাসদৃশ মাদুলি। মাদুলিসদৃশ তাগা দুই বাহুর দীপ্ততায় স্পর্শকাতর। গলার কণ্ঠিতে বাঁধা দগ্ধমৃত্তিকার তাবিজ। তাবিজগাত্রে প্রস্ফূটিত মহামাতৃকার যন্ত্রঘট, অর্থাৎ যোনিচিহ্ন-আশ্রিত সপ্তপদ্মপাপড়ি। উর্বরতার জাদুস্পর্শে সিন্ধুরমণী সকলের গলকণ্ঠদেশ জীবনসঞ্চারি মহামায়ায় সপ্রতিভ।

যে নয়নাভিরাম বৃহৎ পাথরখণ্ডসমূহ মানবীসকলের পশ্চাদদেশ গ্রহণ করে রেখেছে উহা রক্তবর্ণতুল্য, ডালিম্বফলতুল্য তীব্র অথচ সন্তানাকাক্সক্ষাতুল্য যোনি-সুঘ্রাণ-আক্রান্ত। রমণীয় কণ্ঠ থেকে ভেসে আসছে জীবজৈবাশ্রিত আকাক্সক্ষাব্যাকুল ধ্বনিজাদু, জলসিঞ্চনে স্ফূর্ত, পক্ষীডানামর্মরে আকুল অথচ রিক্ত; বনাঞ্চলব্যাপী রহস্যসঞ্চারি জাদুধ্বনি সুখ-প্রাপ্তির নিমিত্তে সম্মোহিত করে রেখেছে জগতের সকল প্রাণীকে। আর যখন সহসা সুখচার্বাক সেই জাদু-আশ্রিত কণ্ঠধ্বনি বরাবর মোহগ্রস্ত তখন সুখচার্বাকের পদযুগল ক্রমশ নদীনিকটবর্তী; যদিও উহা ঠিক নদী নয় বরং সপ্তসিন্ধু-অবশেষ পাথরনিমগ্ন প্রস্রবণ, যে প্রস্রবণ হয়তো-বা ওই জলনিমগ্নপ্রাণ কণ্ঠসুর ব্যাকুল সিন্ধুরমণীর জন্যই সিন্ধু অববাহিকা অতিক্রমপূর্বক পাহাড়ি ভূভাগের সমতল-নৈঃশব্দ্যে স্বয়ং উপস্থিত হয়েছে নির্জনে একাকী শুধুই বা সিন্ধুরমণীর স্নান-উদ্দীপনা নিমিত্তে।

সুখচার্বাক নিঃশব্দে সিন্ধুরমণীর নিকটবর্তী একখানা হলুদাভ মসৃণ পাথরখণ্ডের উপরিভাগে, যে পাথরখণ্ডের উপর সিন্ধুরমণীকুল নিরবচ্ছিন্ন কালব্যাপী গাত্রবস্ত্রাদি ধৌত করে আসছে, সেই বহু ঘর্ষণজাত পাথরখণ্ডের উপর উপবেশনপূর্বক সুখচার্বাক রমণীকুল অভিমুখে কৌতূহলদীপ্ত। সুখচার্বাক স্কন্ধে পণ্ডিত বৃহস্পতি; তখনও বৃহস্পতির হস্তে গচ্ছিত রয়েছে কচ্ছপশিশু। কিয়ৎকাল পর রমণীসকলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ গলদেশের অধিকারিণী রমণীকণ্ঠ থেকে শোনা গেল, তুমি কে গা পুরুষ ?

কণ্ঠধ্বনি শ্রবণে সহসা সুখচার্বাক অনুধাবন করল রক্তবর্ণিল পাথরে উপবিষ্ট রমণীকে ঘিরে অপরাপর রমণী তিনজনের তিন জোড়া চক্ষু চার্বাক অভিমুখে কৌতূহলদীপ্ত। রমণীসকল ঊর্ধ্ববস্ত্রবিহীন চর্বিবিহীন একহারা চঞ্চল, নিম্নাঙ্গ সংক্ষিপ্ত ও সিক্ত কটিবাস দ্বারা আবৃত। সুখচার্বাক সপ্রতিভ হলেও যেন-বা স্বপ্নকথনে উচ্চারণ করল, আমি সুখ। স্বগতোক্তি উচ্চারণে বিশ্রামক্লান্ত কণ্ঠধ্বনি-বিহ্বল সুখ বলে চলেছে, আমি পরিব্রাজক সুখচার্বাক, গান্ধার অঞ্চলের জগৎখ্যাত পাঠশালা তক্ষশিলা-পলাতক কথিত শ্রমণ, নিরাসক্ত শ্রমণজীবন পরিত্যাগপূর্বক এক্ষণে জীবনরস সন্ধানে, জীবনতৃপ্তি সন্ধানে ভ্রমণরত, বলতে পার আমি জীবনরহস্য-কাক্সিক্ষত সময়-পরিব্রাজক, ভদ্রে আমাকে জানাও, ভ্রমণরত আমি এক্ষণে কোন্ উপত্যকায় উপবিষ্ট আছি ?

রমণী সচকিত, প্রশংসার চক্ষু দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে সুখচার্বাকের লম্বাটে কৌতূহলী অথচ প্রশান্তদীপ্ত মুখমণ্ডল অভিমুখে। অতঃপর নিজদেহের ক্ষীণ কোমরের দিকে তাকিয়ে, নিজ-অঙ্গের দীর্ঘ পদযুগল পানে চোখ রেখে, পরক্ষণেই সপ্রতিভ দীপ্তিমুখর কণ্ঠে চার্বাক পুরুষের চক্ষুপানে দৃষ্টি নিক্ষেপপূর্বক, দক্ষিণ স্কন্ধে উপবিষ্ট ধ্যানমগ্ন বানর বৃহস্পতির দিকে দৃষ্টি অর্পণপূর্বক দীর্ঘ গ্রীবাবিশিষ্টা রমণী উচ্চারণ করল, ভিনদেশি, তাহলে তুমিই চার্বাক ? যৎকিঞ্চিৎ চার্বাক-তর্ককথা শুনেছি বটে, তোমার পরিচয় তাহলে সুখ, জীবনরস আশ্রিত সুখ, তা বেশ আমাদের এই ভূমে জীবন আছে, জীবনের রস আছে, মা-মাতা-মহামাতা প্রদেয় মৃত্তিকাশ্রিত গম আছে, যব আছে, তিল-তিসি-ভুট্টা আছে, আছে আনারস-বন, শস্যের প্রাচুর্য আছে, ফলদ বৃক্ষের জঙ্গল আছে, আছে লাঙ্গল-বৃষ-মহিষ, আছে দুগ্ধ, আছে সোমরস; শুনেছি এই সিন্ধু অববাহিকায় একদা সহস্র বৎসর পূর্বে মহামাতা ঊষা-আশ্রিত নগর ছিল, মাতামহী সিন্ধুমাতা রাকার মুখ থেকে অদ্যাবধি শুনে আসছি সেই নগরকথা, যদিও বুঝি না আমরা নগর দেখতে কেমন, কেমন ছিল সেই মৃত নগরের মানুষসকল।

পর মুহূর্তেই রমণীর কৃষ্ণপ্রভা ললাট উঁচু নাসিকা যেন-বা রক্তাভ চঞ্চল, চক্ষুদ্বয় কিছুটা স্ফীত; আর তখন আস্থাশীল ঠোঁটের দীপ্তিতে আবারও প্রকাশ পেল, বুঝতে পারি না নগর অথবা মৃত নগরের গল্প, তবে সম্যক বুঝে থাকি নাগর কথার অর্থ, ভদ্রে পণ্ডিত নাগরবচন থেকেই তো জীবনরস ?

অতঃপর রমণীসকল তীব্র জীবনপ্রদায়ী কণ্ঠে অন্তরিক্ষ চঞ্চল করে দিয়ে হেসে উঠল সুখচার্বাক সচকিত। সুখচার্বাক নিজ স্কন্ধে উপবিষ্ট বৃহস্পতির হস্ত থেকে কচ্ছপ শিশুটিকে হাতের তালুর ওপর বসিয়ে নিল। ক্রমশ সেই চার্বাকহস্ত অগ্রসর হলো প্রগলভা আমোদিত রমণীসকল অভিমুখে, দেহসম্পদ-সম্ভ্রান্ত নারীবৃন্দ গ্রহণ কর নৈবেদ্য, কচ্ছপশিশু, শান্তি আর সৌন্দর্যের আধার, ধীর এবং বিশ্রামপ্রাপ্ত, সদা জীবনরস-জাগ্রত।

সিন্ধুরমণীগণ এক্ষণে সচকিত। অতঃপর রক্তবর্ণিল বৃহৎ পাথরখণ্ডে উপবিষ্টা দীর্ঘ গলদেশ বিহ্বল দীর্ঘাঙ্গিনীর হাস্যোজ্জ্বল চক্ষুদ্বয়ে কৌতূহল যেন-বা আকাক্সক্ষাতাড়িত ব্যাকুলতা; কটাক্ষ প্রযত্নে সিন্ধুরমণী উচ্চারণ করল, ভিনদেশি অচেনা যুবা যথাসম্ভব কচ্ছপশিশু উপহারের তাৎপর্য অবগত না হয়েই তুমি অপরিচিতা রমণী বরাবর কচ্ছপ প্রদান করছ।

আর তখন মুখনিঃসৃত মৌবচন হরণপূর্বক সুখ উচ্চারণ করল, জানা নাই কচ্ছপপ্রদান-তাৎপর্য, হয়তো-বা তোমাদের গাঁয়েই লুকিয়ে রয়েছে কচ্ছপনৈবেদ্যের ভিন্ন কোনও অর্থ, যদিও আমার নিকট কচ্ছপ উপহারের অর্থ প্রজ্ঞা-অর্পণ; অর্থাৎ আমি আমার দর্শন, আমার বস্তুজ্ঞান ও প্রত্যক্ষ প্রমাণসমূহ সত্যানুসন্ধান লক্ষ্যে তোমাহস্তে অর্পণ করলাম। এই অপর্ণের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে প্রেম, প্রজ্ঞা আর জীবনরস, বেঁচে থাকার পবিত্রতম ঈক্ষণ।

সিন্ধুরমণী হতচকিত, কিছুটা নির্বাক ও ধ্যানমগ্ন। কিয়ৎকাল পর অতীতাশ্রিত কণ্ঠে বলে যেতে থাকল, বানররাজ স্কন্ধে আগত চার্বাক যুবক তুই পণ্ডিতজন, জীবন-অভিজ্ঞান সঞ্চারিত গতিশীল, প্রজ্ঞাশ্রিত যুবক জানি না তোর কর্তৃক অর্পণকৃত এহেন ঐশ^র্যের যথাযোগ্য ক্ষেত্র আমি কি না; তথাপি চার্বাক যুবক সুখ নিমিত্তে, যদিও তুই নিজেই সুখ, তোর মহিমান্বিত নামের একাংশ সুখ, ওহে ভিনদেশি সুখ তোকে আমাদের চাষানুকূল গাঁয়ে অভিনন্দন।

কিয়ৎকাল নীরব থেকে রমণী আবারও বলে যেতে থাকল, ঘৃতগন্ধা নামাঙ্কিত আমি, অপরাপর সখিত্রয় পিপুল লতিকা, দুগ্ধ লতিকা, এই দুইজন জোনাইজ্ঞাতি অর্থাৎ মোদীয়জ্ঞাতি; আর এই যে আমার দক্ষিণে দাঁড়িয়ে স্তনভার-উদ্যত ভিনগাঁ নিবাসি কাঁকড়া ব্রাহুই, কাঁকড়া-সদৃশ ওর গাঁয়ের নাম কাঁকড়বিছা, জ্ঞাতি ব্রাহুই; কাঁকড়াবিছার রমণীদের পৃথক কোনও নাম থাকে না, প্রত্যেককেই কাঁকড়া ব্রাহুই নামে ডাকা হয়, আর আলাদা করে চিনে নেওয়ার জন্য সবারই রয়েছে একেকটি গাছগাছড়ার নামাঙ্কিত নাম, যেটা ওরা নিজেরা ছাড়া আর কেউ জানে না, আমিও জানি না, তুইও জানতে পারবি না কোনওদিন; তবে জেনে রাখা কর্তব্য ওদের জ্ঞাতিমা মাতামহী কাঁকড়ামাঞি; মাতামহী মানে মায়ের মা নয় বরং আমাদের জোনাইজ্ঞাতির মতোই হতে পারে সেই মায়েরও মা বয়োজেষ্ঠাতমা বেঁচে থাকবেন যিনি তিনিই জ্ঞাতিপ্রধান। মৃত্যু-উত্তর আর সকলের মতো জ্ঞাতিপ্রধান জ্ঞাতিমাঞিকে জ্ঞাতি দেখভাল নিমিত্তে গৃহনিবাস পশ্চাতে মৃত্তিকাগর্তে হাঁটুভাঁজকৃত গর্ভকালীন সন্তানতুল্য ত্রিমৃত্তিকাপাত্র, কামপটাশ্রিত যন্ত্রঘট আর একখানা পুংমৃত্তিকাদণ্ড সমেত বসিয়ে রাখা হয়। যন্ত্র মানে সপ্তসিন্ধু আশ্রিত সপ্তপদ্মদল সদৃশ স্ত্রীজননাঙ্গ, আর ঘট অর্থ উর্বরাশক্তির সমাহার, হতে পারে তা বরাহ, ধানদূর্বা-তিল-তিসি, গো-সম্পদ, ফল-ফুল-নদী-জল, দুগ্ধরস-জীবন।

অতঃপর সিন্ধুরমণী একমুঠি জল পরিমাণ সময় দম নিয়ে তাকিয়ে রইল চার্বাক পুরুষের দিকে। পুরুষচোখে কৌতূহল-উদ্দীপনা অবলোকনপূর্বক আবারও বাকস্রোতে যেন-বা অন্তরিক্ষ-আশ্রিত বায়ুস্রোতে ধূম্্রজাদু বুনন করতে থাকল, প্রত্যেক জ্ঞাতিমাঞির রয়েছে একটি করে প্রপ্রাচীন কামপাত্র, পোড়ামাটির তৈরি এই কামাধার কে কখন বানিয়েছিল আমরা কেউ জানি না, নদীসংলগ্ন বেলাভূমি খুঁড়ে খুঁড়ে হয়তো কখনও এক আধখানা ভাঙা কামপট পাওয়া যেতে পারে, আর যদি অভাঙা নিঁখুত মৃত্তিকাপাত্র পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে আমাদের এবারকার জ্ঞাতিমাঞি অধিক জ্ঞানদায়িনী অধিক প্রজ্ঞাদায়িনী অধিক শক্তিদায়িনী সহস্রাধিক শিশুরমণীদায়িনী, আর স্ত্রীশিশুর মানে হলো, ঐশ^র্য চাষাবাস, বৃষগাভি, ফুলফল-ফসল, দুগ্ধরস-জীবন। ক্রমশ সবকিছুই বুঝতে পারবি পুরুষ, আপাতত জেনে রাখ পণ্ডিত যুবক জ্যোৎস্না-সদৃশ আমাদের গ্রামের নাম জোনাইগ্রাম; জ্ঞাতিতে জোনাই; জ্ঞাতিমা মাতামহী জোনাইমাঞি; এক্ষণে তুই সুখচার্বাক উপবিষ্ট আছিস ইরাবতী সঙ্গমে খেজুর বন-আশ্রিত মৎস্যশিকারি, গোশাল, আজীবক, ভিক্ষু-আশ্রিত, কারুশিল্পী-আশ্রিত, তন্তুবায়-আশ্রিত, গোচারণভূমি প্রসারিত সিন্ধুজোনাই ভূমিতে।

জোনাই-রমণীকে চুপ থাকতে দেখে, রমণীর চোখে প্রশ্নবোধক কাতরতা দেখতে পেয়ে এক অঞ্জলি জল পরিমাণ সময় চুপ থেকে সুখচার্বাক স্বভাবজাত কর্কশকণ্ঠে উচ্চারণ করল, জোনাইজ্ঞাতির রমণীসকল, আমার স্কন্ধে উপবিষ্ট বানরপুত্র প্রভু নহে কদাচিৎ, মোদীয় কোন স্বামীপ্রভু জানা নাই, বানর পণ্ডিতকে আমি বৃহস্পতি পরিচয়ে প্রেম করি, পণ্ডিত বৃহস্পতি স্বপ্নে শ্লোক প্রদায়ক সখা বটে; এক্ষণে জানাতে ইচ্ছুক, সুখচার্বাক পরিচয় নামে আমাকে প্রেম করে থাকে আরও এক সখা, নাম তার সখা পারাবত। পারাবত গুহানিবাস আমাদের আশ্রয়, বহুকাল হলো রাক্ষস মাতা মৃত্তিকা ঘটকির মৃত্যু হয়েছে অগ্নি-উৎসব রাত্রিতে সার্ধ্বশত ঝুড়ি-আশ্রিত বটবৃক্ষতলে। শুনেছি একদা ঋষি কচ্ছপ মুনির কলস-আধার থেকে জন্ম হয়েছে আমার; যদিও এহেন শ্লোকে বিশ^াস নাই, বিশ^াস নাই শাস্ত্রে অথবা অলৌকিক জাদুতে, যদিও এহেন কাহিনি থেকেই কচ্ছপের প্রতি আগ্রহ অধিক, প্রজ্ঞাপ্রতীক হিসেবে কচ্ছপকেই জানি, জন্মপ্রতীক সেও তো কচ্ছপ, কচ্ছপের মাংসে তেজ পাই, কচ্ছপমাংসে বিদ্যা পাই, লাভ করি আয়ু-অধিক প্রেম।

এহেন জাদুবচনতুল্য বাকশ্রবণে চমকে ওঠে ঘৃতগন্ধা, সচকিত কণ্ঠে বলতে থাকে, হতে পারে কচ্ছপ থেকেই প্রেম, প্রজ্ঞা ও প্রণয়। তোদের প্রথানুসারে হতে পারে কচ্ছপ-প্রণয়। তাই বলে এই কথা কী বলছিস পণ্ডিত পুরুষ, জাদুবিহীন জীবন কীভাবে সম্ভব ? জাদুবিহীন কীভাবে ফসল পাবি ? পাবি কন্যাপুত্র বংশপরম্পরা জীবন ? হয়তো তাও হতে পারে, হতে পারে যথার্থ তোর জ্ঞান, পবিত্র তুই, তোকে থেকে জোনাইগ্রাম শিখিবে তর্ক, বুঝবে বিদ্যা, তাহলে পুরুষ তুই চল মোদীয় গাঁয়ে; তুই চল জোনাইমাঞির নিকট, জ্ঞাতিমাঞির কামপট থেকে চুষে নিবি দুগ্ধরস-আয়ু, জোনাইজ্ঞাতি ধন্য হবে বরণ করে তোকে; আর শুনে রাখ পুরুষ, কখনও যদি কচ্ছপবিদ্যা হয়ে ওঠে কার্যকারণবিহীন, আর যদি কখনও চার্বাকবিদ্যা তোর মিথ্যে হয়ে যায়, তাহলে সবকিছু বাদ দিয়ে মেনে নিবি তুই আমাদের জাদুমুখী জোনাইজীবন।

লক্ষ সহস্র কনুই দীর্ঘ আকাশ ঝাঁপিয়ে নামা গাববৃক্ষাদির নিচে ঘনসবুজ সবজি বাগানের প্রান্তদেশে সহস্র-সহস্র বংশদণ্ড সমান্তরালে তৈরি নিবাস-আশ্রয়ের ডিম্বাকৃতির পাটাতনসমূহ দগ্ধমৃত্তিকা দ্বারা, প্রপ্রাচীন ইষ্টক-ফলক দ্বারা প্রস্ফুটিত, পরিষ্কার। প্রতিটি ইস্টক ফলকের উপরিতলে রয়েছে লিঙ্গ-নকশা, যোনি-নকশা, কচ্ছপ-নকশা, বানর-নকশা, মনুষ্য-নকশা, রমণীয় স্তনভার-নকশা, লাঙ্গল-নকশা, পক্ষী-নকশা, চক্ষু-নকশা, হস্তি-নকশা, তিরধনুক-নকশা, বর্শা-নকশা আর রয়েছে চন্দ্র সূর্য ফুল পাখি লতা পাতার বিচিত্র রকম খাঁজকাটা তীব্র কখনও বা ক্ষয়াটে ধারালো অথচ উজ্জ্বল গভীর তামারঙ পোড়ামাটির খয়েরি-কালো নকশা। জোনাইগাঁয়ের জ্ঞাতিবংশের মতো ইরাবতী বিধৌত অত্র অঞ্চলের সকলের বিশ^াস এই ইষ্টক-ফলকসমূহ নদীমাতা ইরাবতীর উপহার, মনুষ্য সন্তানদের উদ্দেশে মৃত্তিকা-মাতার নৈবেদ্য। কেউ কখনও এইগুলো তৈরি করেনি। উচ্চ, দীর্ঘউচ্চ, নাতিউচ্চ টিলাপাহাড়, কখনও বা ক্রম-সমতল বেলাভূমি প্রান্তে মৃত্তিকাবক্ষ উলঙ্গ করার পর অথবা শীতঘন ঋতুতে যখন নদীমাতা ইরাবতীর গোপন বক্ষ ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকে তখন ওরা নানাকৃতির শিলাপাথরের সঙ্গে পেয়ে আসছে এহেন প্রপ্রাচীন ইস্টক-ফলক।

এক্ষণে সুখচার্বাক দণ্ডায়মান জোনাইগ্রাম ভিটায়। সুখচার্বাক লক্ষ করল মাতানদী ইরাবতীর ভগ্নি রাবি কর্তৃক উপহারকৃত গৃহ-আচ্ছাদনের রাভিপত্রগুলো যদিও আদিতে ছিল অন্ধকারঘন সবুজ বর্ণের তথাপি এক্ষণে জোনাইগাঁয়ের কারুশিল্পীদের কারুকাজে শুষ্কধূসর তৈলচকচকে বিচিত্র ডোরাকাটা গভীর বহুবর্ণোজ্জ্বল। গাবকষ, নীলপত্র কখনও বা স্কন্ধ-কচুপত্র সহযোগে কোথাও বা ফিকে চকচকে কোথাও বা উজ্জ্বল চকচকে কোথাও বা খয়েরি-ধূসর অথবা ফিকে নীলের পাশের্^ হলুদাভ রেখাসংযুক্ত রক্তলাল আভা।

আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে সুবৃহৎ উঠানের তিন দিকে তিনখানা গৃহনিবাস। অতঃপর এহেন ত্রিমুখি গৃহনিবাস অতিক্রমপূর্বক পশ্চাৎ অংশে রয়েছে শস্যাদি বাছাই ও সংগ্রহের নিমিত্তে অপেক্ষাকৃত বৃহদায়তন ভূমি-আশ্রিত ঘাসগুল্মবিহীন পাথরতুল্য খরমৃত্তিকাশ্রিত আঙিনা; দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে অনেকটাই সমান, সম্ভবত শতোর্ধ্ব কনুই। শস্যখোলার প্রান্তদেশাশ্রিত ত্রিকনুই উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত রয়েছে সুবিস্তৃত পাটাতনসমৃদ্ধ শস্যগোলা। শস্যভাণ্ডারগুলোর প্রতিটি পাটাতন তালবৃক্ষের কাণ্ডপরম্পরায় প্রস্তুত। বৃক্ষকাণ্ডগুলোর প্রতিটির উভয়পাশর্^ ত্রিঅঙ্গুলি গভীরতায় চেঁছে ফেলে দিয়ে সমতল করে নেওয়া হয়েছে। অতঃপর প্রতিটির সমতল পৃষ্ঠগুলোকে পরস্পরের গায়ে সেঁটে দিয়ে উপরে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে শুকনো রাভিপত্র। পঞ্চবিংশ ব্যাসাশ্রিত পাটাতনের বৃত্তাকার দেয়াল সপ্তকনুই উচ্চতাবিশিষ্ট সুপারি বৃক্ষসদৃশ গয়াবৃক্ষের কাণ্ড দ্বারা নির্মিত। গয়াকাণ্ডসমূহের উভয় পাশর্^ চেছে নিয়ে পরস্পরকে পরস্পরের সঙ্গে সন্নিকট-দৃঢ়তায় বৃত্তাকারে সারিবদ্ধ করা হয়েছে। ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নিবাসগৃহের মতোই তালপত্র ও রাভিপত্রের পারস্পরিক বন্ধন। শস্যভাণ্ডারকে হতে হবে সপ্তসিন্ধুর মতোই সপ্তকনুই উচ্চতাবিশিষ্ট। কুলপরম্পরায় সপ্ত সংখ্যাটি দিয়ে জোনাইজ্ঞাতি সপ্তপদ্মযন্ত্র প্রকাশ করে আসছে; পক্ষান্তরে এটি মাতৃ জননাঙ্গের প্রতীক যা কি না উর্বরা-উদ্দীপক, মাতৃকেন্দ্রিক ঐশ^র্য-প্রকাশক। পুরুষসিন্ধু সপ্ত ভ্রাতাও সপ্তপদ্ম আশ্রিত বটে।

অতঃপর গোলাঘরের পেছনে বিস্তীর্ণ এলাকা ধরে ফলদ-ঔষধি বাগান। বিরামহীন সেই ফলদ বৃক্ষের এখানে ওখানে ইতস্তত গড়ে উঠেছে ছড়ানো ছিটানো নানাকৃতির আবাসগৃহ। প্রতিটি আবাসগৃহের অনতি দূরে রয়েছে গৃহপালিত জীব-জানোয়ারের জন্য দীর্ঘ নাতিদীর্ঘ চাতাল। চাতালগুলোর কোনওটি বা শে^তশূকরের খোয়াড়, কোনওটি ধূসর অন্ধকার বর্ণের শূকর পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট। অধিক দূরে ঝাঁকবাঁধা মুরগির সাথে অভিজাত চেহারা নিয়ে বনমোরগ হাঁটছে। দক্ষিণ চাতালে ভেরা পরিবার। তদপশ্চাতে বেড়াবিহীন ছাউনি আচ্ছাদিত খোয়াড়, প্রতিটি খোয়াড়ের খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সুপারিবৃক্ষতুল্য গয়াবৃক্ষের কাণ্ড। একটিতে ছোট বড়ো মিলিয়ে সাতটি গাধা, দাঁড়িয়ে থেকে বিশ্রামরত। আরেকটি নিকটবর্তী চাতালে নানাকৃতির শে^ত-অন্ধকার বর্ণমিশ্রিত গোজাতি; অপেক্ষাকৃত বৃহদাকার ধূসর-কালো ষাঁড় ঝুলে পড়া গলকম্বলসমেত নাসিকা কুঞ্চিত করে দক্ষিণবায়ু থেকে গন্ধ শুকে শুকে জলবায়ু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বৃহত্তর পঞ্চদশ চাতালের নিচে মহিষ পরিবার। অতঃপর জোনাইভিটা থেকে বেশ খানিকটা দূরে দেখা যাচ্ছে নীরবে নিশ্চিন্তে উত্তর প্রান্ত বরাবর হেঁটে যাচ্ছে তিনটি গ্রীবাদীর্ঘ বৃক্ষউচ্চতা আশ্রিত উট।

তখন শরৎসূর্য উষ্ণ-উজ্জ্বল ত্রিঅঞ্জলি জল পরিমাণ পূর্বমুখী। ঘৃতগন্ধা, পিপুল লতিকা, দুগ্ধ লতিকা আর কাঁকড়া ব্রাহুই ঘিরে রেখেছে তেলচর্বিবিহীন দীর্ঘকায় কর্কশমুখো সুখচার্বাক আর তার প্রিয়সখা পণ্ডিত বানর বৃহস্পতিকে। জোনাইগাঁয়ের জোনাইভিটায় ঝাঁকবাঁধা জোনাই রমণীকুলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মাতামহি জোনাইমাঞি। শতোর্ধ্ব বৎসরের জোনাইমাঞি কেন্দ্রিক জোনাইজ্ঞাতিগণ সংখ্যায় সার্ধ্বশতাধিক। সকলে মিলে একটি মাত্র পরিবার। সকলের জন্য একই শস্যভাণ্ডার, একই খোয়াড়, একই চাতাল, একই বৃক্ষ, একই জল, একই দুগ্ধ, একই নদী মাতা-ইরাবতী, একই মাঠপ্রান্তর শস্যভূমি, একই আকাশ, আর ভিন্ন ভিন্ন গর্ভে জন্ম হওয়া সত্ত্বেও জোনাইনারী-পুরুষ জন্ম পরম্পরায় মনে করে আসছে সকলের জন্য একই মাতা জোনাইমাঞি। জোনাইমাঞিকে ঘিরে শতোর্ধ্ব রমণী, যেন-বা শতোর্ধ্ব মাতার যোগফলে আবর্তিত জোনাইমাঞি। অর্ধ্বশতনিম্ন পুরুষ; বালকত্ব অতিক্রম মাত্র প্রত্যেকে নিজ গর্ভজাত নারী ব্যতীত জোনাইজ্ঞাতির যে কোনও রমণীর সঙ্গে জোনাইমাঞির ইশারায় কন্যাসন্তান লাভের নিমিত্তে বংশ পরম্পরায় মিলিত হয়ে আসছে। জোনাইজ্ঞাতির পুত্রসন্তানেরা নিজ জ্ঞাতির বাইরে অন্য কোনও জ্ঞাতিরমণীর সঙ্গে মিলিত হতে পারে না; মিলিত হলে জ্ঞাতি দুর্বল হয়ে যাবে, জ্ঞাতি শুকিয়ে যাবে, জ্ঞাতি পুরুষশূন্য হয়ে বীজশূন্য হবে। মাতামহী জোনাইমাঞি জ্যোৎস্নারাত্রিতে জ্ঞাতিপুত্রদের মনে করিয়ে দেয় জ্ঞাতি পরম্পরায় প্রাপ্ত জ্ঞাতিবচন, এক ষাঁড় শত গাভী, এক বেছনে বংশবৃদ্ধি, এক পুরুষ শত নারী জাত-জমি জন্ম সিদ্ধি।

নিজ জ্ঞাতির বাইরে জোনাইনারী মিলিত না হলেও বংশবৃদ্ধির নিমিত্তে, চাষানুকূলদক্ষ রমণীসংখ্যা বৃদ্ধির নিমিত্তে জোনাইমাঞির অনুমতিক্রমে তারা অপর জ্ঞাতিপুরুষ বরণ করতে অভ্যস্ত। বরণকৃত ভিন্ন-জ্ঞাতিপুরুষ অথবা নিজ-জ্ঞাতিপুরুষের সঙ্গে মিলিত হবার আগে ভরাট জ্যোস্নামায়া রাত্রিতে জাদুযন্ত্রঘট সাজিয়ে নৈবেদ্য জানায় জোনাইগাঁয়ের রমণীরা। জ্যোৎস্না থেকেই তো জোনাই। আর সেই জন্যই জ্যোস্নারাত্রি ওদের নিকট চিরায়ত রহস্যে টইটম্বুর, ভরাট ও উর্বর। পঞ্চ অঞ্জলি পরিমাণ জললগ্নে জ্যোৎস্নারাত্রির গোপন সেই নৈবেদ্য রহস্যগভীর, প্রার্থনাবিহীন, দেবতাবিহীন, শাস্ত্রবিহীন, মন্ত্রবিহীন। অথচ প্রগাঢ় সেই নৈবেদ্য আকাক্সক্ষা-ব্যাকুল, কন্যাসন্তানের জন্য আকাক্সক্ষা, উর্বরার জন্য আকাক্সক্ষা, শস্য উৎপাদনের জন্য আকাক্সক্ষা। ঝাঁক বেঁধে নারীকুল শস্যপ্রান্তরে ফসল আহরণে যাবে, সেই আহরণ-আকাক্সক্ষার নিমিত্তে যে নাতিদীর্ঘ চাষাবাদের জন্য ধীরগামী ধৈর্য, সেই ধীরপ্রবাহ ধৈর্যের জন্য আকাক্সক্ষা। ফসল পরিপক্ব হবার আগ পর্যন্ত যে বিরামহীন কর্মচঞ্চল অপেক্ষা, সেই কর্মচঞ্চল অপেক্ষার তীব্রতা অনুভবের নিমিত্তে আকাক্সক্ষা।

জোনাইমাঞির সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুখচার্বাক। সুখের দক্ষিণ থাই ঘেঁষে শে^ত-খয়েরি রঙের একখানা জান্তব জীবনচঞ্চল উটপক্ষী কৌতূহলী যেন-বা মনুষ্যকুলের মৌবচনে শিহরিত। চার্বাকস্কন্ধে উপবিষ্ট বৃহস্পতি ধ্যানমগ্ন চোখে তাকিয়ে রয়েছে সেই অভিজাত গ্রীবাচঞ্চল উটপক্ষীর দিকে। এক্ষণে কাঁকড়া ব্রাহুই কিছুটা নিচু হয়ে উটপক্ষীর সপ্তপদ্মতুল্য ঝুটির ওপর চুমু খাবার পর জোনাইমাঞির নিকট নিজগাঁয়ে ফিরে যাবার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করলে মাতামহী বিচিত্র ভঙ্গিমায় চোখে চোখে কথা বলতে থাকে। কাঁকড়া ব্রাহুই জোনাইমাঞির বাম স্কন্ধের ওপর তামাটে পুরুষ্ট ঠোঁটের চুম্বন রেখে উত্তরপথ অভিমুখে রওনা হলো।

সার্ধ্বশতাধিক বলিরেখায় সজ্জিত জোনাইমাঞি। শুভ্র কুঞ্চিত অনতিদীর্ঘ কেশসম্ভার সপ্তবেণিতে বিভক্ত। প্রতিটি বেণির প্রান্তদেশে তিন টুকরো ঝিনুকখোল আটকিয়ে দেয়া হয়েছে। গলকণ্ঠ থেকে ধাপে ধাপে ক্রমশ নিচের দিকে উলঙ্গ দেহচামড়ার ওপর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে গিট্টুলতিকার সুত্রসহযোগে বুননকৃত বহুবর্ণিল পাথরটুকরো। পাথরটুকরোর ফাঁকে ফাঁকে বিচিত্র বর্ণের শুকনো কচ্ছপখোল; প্রায় কোমর অবধি ভারী অলঙ্কারগুলোর প্রান্তদেশে গৃহপালিত জীব-জানোয়ারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হাড়হাড্ডি নির্দিষ্ট দূরত্বে ঝুলছে। একেকটি হাড়হাড্ডি একেক বর্ণের সূক্ষ্ম কারুকাজে চলমান জীবন প্রক্রিয়াজাত তাৎপর্য প্রকাশজ্ঞাপক, কোনওটি দিয়ে বোঝাচ্ছে চন্দ্রঘন মায়া, কোনওটি দিয়ে সূর্যের উষ্ণতা, কোনওটি দিয়ে শস্যের প্রাচুর্য, কোনওটি বা বর্ষণের প্রতীক, কোনওটি বা শিকারির রক্তপাতে তীব্র।

শতোর্ধ্ব বৎসরের প্রাচীন জোনাইমাঞির গলকণ্ঠ থেকে ঝুলছে আরো দুইখানা তাবিজ; একখানা পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি শিশ্ন-প্রকাশ জ্ঞাপক; আরেকখানা হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি যোনিচিহ্ন প্রকাশ জ্ঞাপক ত্রিকোণাকৃতি খাঁজকাটা পদ্মপাপড়িতুল্য। যোনি টুকরোর প্রান্তদেশ সপ্তপদ্মপাপড়িহেতু প্রসারিত রক্তবর্ণিল তীব্র ও চক্ষু-উদ্দীপক। বংশকর্ত্রী মাতামহী জোনাইমাঞির চক্ষুদ্বয় ভরাট গোলাকৃতি, চকচকে, প্রশান্তি ও নৈবেদ্য আশ্রিত। উপরন্তু জোনাইমাঞির চক্ষুদ্বয় আস্থাশীল, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং অভিজ্ঞান-দীপ্তি চিহ্নিত। তামাটে উঁচু নাসিকা যেন-বা পাথরের তৈরি; সেই পাথর-নাসিকার মধ্যবৃন্ত থেকে ঝুলে নেমেছে একখানা বৃত্তাকার তাম্রধাতু। ভ্রুদ্বয় ভরাট ও বক্র, কপালে ত্রিবলিরেখা, নিচের ঠোঁট ভরাট ও তামাটে, উপরের ঠোঁট রক্তবর্ণিল, কর্ণলতিকা দৃঢ় টানটান। এহেন জোনাইমাঞির কর্ণলতিকার প্রান্তদেশে ঝুলে রয়েছে শুভ্র বিরল মাদি ঘোড়ার শে^তকেশর দিয়ে তৈরি নাতিদীর্ঘ জমজমাট অলঙ্কার বিশেষ; যার জন্য জোনাইমাঞির সঙ্গে আলাপকালে বার বার তার উজ্জ্বল কর্ণলতিকার দিকে দৃষ্টি ছুটে যেতে চায়।

জোনাইমাঞির ডান হাতে ধৃত মৃত্তিকাপাত্র থেকে উষ্ণ ঘৃতগন্ধ প্রকাশক দুগ্ধ প্রাকৃত চেতনাকে যেন-বা সচকিত করতে ক্রমশ সঞ্চরণশীল। জোনাইমাঞি দুহাত সহযোগে সুখচার্বাকের মুখ বরাবর লম্বাকৃতির দুগ্ধপাত্র, যে পাত্রের দগ্ধমৃত্তিকা অনন্ত ব্যবহৃত, প্রাচীনতাগুণে চর্বি-চকচকে, যেন-বা সৌহার্দগুণে আভিজাত্য আশ্রিত ঐশ^র্যের প্রতীক প্রকাশ জ্ঞাপক। এহেন টেরাকোটার ঠোঁটচুম্বনে সুখচার্বাক লম্বা সময় নিয়ে চুষে নিতে থাকলো দুগ্ধরস। সুখচার্বাক চুষে নিচ্ছে জীবনরস, যে জীবনরস সংগ্রহ করা হয়েছে জোনাই পরিবারের গাভীমহিষ থেকে; আর সেই সংগ্রহকৃত শুভ্রদুগ্ধ রসের ভিতর জোনাইমাঞি প্রত্যেক প্রত্যুষে মিশিয়ে দিয়ে আসছে জোনাই পরিবারের একেক জন সন্তানবতী দুগ্ধবতী রমণীর স্তনদুগ্ধের নির্যাস। কেননা জোনাই পরিবারের রমণী মাত্রই মাতৃতুল্য গৃহকর্ত্রী, যাদের স্তনবৃত্তে ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে জোনাই পরিবার। দুগ্ধ-অমৃত ধারণ নিমিত্তে এই সেই পাত্র, যার নাম কামপাত্র, যা কোনও জোনাইসন্তান কর্তৃক নির্মিত নয়, নিরবধিকাল ধরে প্রত্যেক জোনাইমাঞি এই কামপটহ পেয়ে আসছে সিন্ধুমৃত্তিকার বক্ষগহ্বর থেকে, পঞ্চনদীর বক্ষপ্রান্তর থেকে, মাতানদী ইরাবতীর জরায়ু থেকে।

দুগ্ধপান শেষ হলো। জোনাইমাঞি কামপাত্রের শেষাংশ থেকে মাখনসদৃশ দুগ্ধরস ডান হাতের আঙুলে নিয়ে সুখচার্বাকের কটিদেশ আচ্ছাদিত কার্পাস বস্ত্রের উপরি ভাগে নাভিমূলের নিচে স্থির রেখে থমথমে ভাব গাম্ভীর্য চোখে স্থির। অতঃপর মাতানদী ইরাবতী প্রদত্ত কামপাত্র থেকে এইমাত্র সংগৃহীত জমাটঘন দুগ্ধরস সুখচার্বাকের নাভিমূল বরাবর আঙুল সহযোগে ক্রমাগত প্রবেশ করিয়ে দিতে দিতে জোনাইমাঞি বলতে শুরু করল, জগজ্জয়ী জেগে থাকুক শিশ্নে বীজে কামে রসে দুগ্ধে শস্যদানা মাংস ও ফলবৃক্ষে, কর্ষণ করো ভূমি, চাষ করো ফসল, জন্ম নিক ফসলপুত্র, জন্ম নিক মানবকন্যা,  বাসযোগ্য বসুধা, দূরে থাক রোগ শোক তাপ মৃত্যু জরা, দূরে থাক দাবানল ক্ষোভ ভয় প্রেত।

হরপ্পা-সিন্ধু সভ্যতায় পূজাচার নাই, মন্ত্র নাই, শাস্ত্র নাই। প্রয়োজন মতো বাস্তবতা-আশ্রিত চাহিদা অনুসারে ওরা জ্ঞাতি-বাসনা প্রকাশ করে থাকে নিজেদের ইচ্ছাধীন সুবচন উচ্চারণে। ধর্ম বলতে তখন প্রকৃতির উদ্দেশে বিস্ময় প্রকাশ অথবা প্রকৃতির ঐশ^র্য অথবা প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে পক্ষান্তরে প্রকৃতির প্রতি নতজানু ভয় ভালোবাসা সহযোগে প্রকৃতির আশ্রয়ে টিকে থাকার সদম্ভ লড়াই। পক্ষান্তরে প্রকৃতিপূজা, তখন তারা বুঝে গেছে বস্তু-বাস্তবে প্রকৃতিই প্রকৃত মাতা। সুখচার্বাকের সময়-আবর্তন শেষ না হতেই বৈদিক আর্যদের দখলবাদী চেতনায় অনার্য পরিবার পৌত্তলিকতার আগ্রাসনে, পৌত্তলিকতার আচারে বহুঈশ^রমুখী। সমান্তরালে সেমেটিক জাতিধর্মের ক্রমশ উদ্ভাবনায় একেশ^রবাদের উত্থান। তখনো সুখচার্বাক ঈশ^রবিহীন, শাস্ত্রবিহীন, দেবদেবিবিহীন, পয়গম্বর ভগবানবিহীন; তখনও তার নিকট বস্তুযুক্তির আশ্রয়ে বসুন্ধরা চলমান, মহাজাগতিক প্রকৃতির অনিবার্য শৃঙ্খলা চলমান। তখনও জোনাইমাঞির কণ্ঠে উচ্চারিত ইচ্ছাধীন প্রকৃতি-আরাধনা ওদের টিকে থাকার সাহস জোগায়, স্বপ্ন দেখায়, মনুষ্যযোগ্যতার বিরামহীন আকাক্সক্ষা বুনন করতে শেখায়। শেখায় যূথবদ্ধ থাকতে।

জোনাইদের কোনও দেবদেবী নাই। ঈশ^রে বিশ^াস না থাকায় জোনাইদের প্রার্থনা কোনও প্রভুর উদ্দেশে নয়। বরং নিজেদের সামর্থ্যরে প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্বগতকথন। যেন-বা নিজেদের স্বপ্ন, নিজেদের ইচ্ছার প্রকাশ। এই প্রকাশকৌশলের অভিজ্ঞানে ক্রমশ ওরা বুঝে যায় প্রকৃত প্রস্তাবে নারী জননাঙ্গের ভেতরই রয়েছে বংশবিস্তারের যাবতীয় রহস্য, উৎপাদন-রহস্য। বুঝতে পারে জীবজগতে নারীপুরুষের জননাঙ্গ এক দুর্নিবার জাদুরহস্য দিয়ে আবৃত। সুতরাং অনুসন্ধান কর ওইখানে ওই নারীদেহের ভেতর টিকে থাকার বংশবিস্তার-ঐশ^র্যের জাদু-কর্মক্রিয়া। মৃত্তিকাকর্ষণে অনুসরণ কর নারী-জননাঙ্গ, অনুসন্ধান কর সৃষ্টিরহস্যের উর্বরাজাদু, আর জীবজগৎকে নকল করে বীজ হিসেবে ব্যবহার করো পুংলিঙ্গ। সুতরাং বংশ পরম্পরায় নিরবধিকাল অভিষিক্ত করো সুখচার্বাকতুল্য পুরুষবীজ। আর তখন জোনাইমাঞির সঙ্গে সঙ্গে জোনাই রমণীগণের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, কর্ষণ করো ভূমি, চাষ করো ফসল, জন্ম নিক ফসলপুত্র, জন্ম নিক মানবকন্যা, লালন করো বাসযোগ্য বসুধা, দূরে থাক রোগ শোক তাপ মৃত্যু জরা, দূরে থাক দাবানল ক্ষোভ ভয় প্রেত।

মাতৃতান্ত্রিক উৎপাদন বাস্তবতায় স্ত্রীলিঙ্গ উর্বরতার ক্ষেত্র-প্রতীক। যদিও এই প্রতীক ভারতবর্ষের বহুবিচিত্র জাতির ধারণকৃত সংস্কৃতির অনিবার্য আবর্তনে ক্রমশ শক্তিপূজা আশ্রিত শিবলিঙ্গকেন্দ্রিক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। তারপরও মাতৃতান্ত্রিক সিন্ধু উপত্যকাশ্রিত মানবগোষ্ঠী তখনও কর্মমুখর, জীবনের আশ্রয়ে বেঁচে থাকার তাৎপর্যে আস্থাশীল। সম্পদ-নির্ভর পুঁজি কৃষি-আশ্রিত সমাজে তখনও দানা বেঁধে না-উঠলেও বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি হয়েছিল নগর এবং নগরকেন্দ্রিক আশাবাদী সভ্যতা। সেই আশাবাদী নগরসভ্যতার সাক্ষী হতে পারেনি জোনাইজ্ঞাতি; কেননা জোনাইগাঁয়ের জোনাইমাঞি কেন্দ্রিক জোনাইজ্ঞাতি সিন্ধু-হরপ্পাশ্রিত নগরসভ্যতা বিলুপ্তির পর, হয়তো-বা সপ্তলক্ষ সূর্যদিবস অতিক্রমণ শেষে বিবর্তন-প্রক্রিয়ার আশ্রয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে স্থিত। সপ্ত অর্থ মাতৃপদ্মপ্রতীক। একদা এই মাতৃপদ্ম প্রতীকের উপর দাঁড়িয়ে সুখচার্বাক নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছিল তক্ষশিলা আশ্রিত বিদ্যার সমান্তরালে নিজ অভিজ্ঞান-নির্ভর চার্বাকযুক্তির প্রেক্ষিত। তখন সুখচার্বাকের আবর্তনকাল, তখন আলেকজান্ডারের পারস্য-আরব-ভারত অভিমুখী অভিযানসমূহ বিস্তীর্ণ অনার্য মানবকুলকে বিচিত্র অভিজ্ঞান-সংকটের মুখোমুখিতে এনে দাঁড় করিয়ে দিলে শাস্ত্র-আশ্রিত বৈদিক আর্যগণ ক্রমশ ধর্ম-আগ্রাসী, ভূমি-আগ্রাসী, ভাষা-আগ্রাসী, সংস্কৃতি-আগ্রাসী। সেই তখন আগ্রাসন কালের জাঁতাকলে হোঁচট খেতে খেতে সুখচার্বাক প্রাকৃত জীবনের তাৎপর্য অনুসন্ধানে বিস্তীর্ণ ভূগোল পরিক্রমায় ক্রমশ মানব-পরিবারের চৈতন্যে বেঁচে থাকার যৌক্তিকতা অনুসন্ধান করে চলেছে। এক্ষণে গোষ্ঠী জীবনের গতিচাঞ্চল্যে সুখচার্বাককে বরণ করে নিল জোনাইমাঞি নিয়ন্ত্রিত জোনাইজ্ঞাতি।

জোনাই রমণীবৃন্দ সুখচার্বাককে কুটুম্বনিবাস অভিমুখে নিয়ে গেল। কুটুম্বনিবাসের দক্ষিণে খননকৃত সুপেয় জলকূপের চারদিক বৃত্তাকারে মসৃণ পাথর দিয়ে আবৃত। জলচকচকে পাথরের উপরগাত্রে চিত্রলিপি ঘিরে জোনাইলিপির বিচিত্র নকশা খোদাইকৃত। সুখচার্বাক তাকিয়ে রয়েছে নকশার দিকে। সুখের কৌতূহল উদ্দীপক চোখের দিকে তাকিয়ে ঘৃতগন্ধাকে বলতে শোনা গেল, ওইগুলা জোনাইলিপি, জোনাইকুটুম্ব তুই বুঝবি না এক্ষণে, যদি চাস তো আমাদের বিদ্যালিপি শিখিয়ে দিব তোকে, আমি পড়ছি তুই শুনে নে, ওইখানে ওই পিঠমসৃণ চৌকো পাথরে উৎকীর্ণ রয়েছে, জলসিঞ্চনে দেহবৃদ্ধি, জলসিঞ্চনে প্রেম, জলসিঞ্চনে ফসলবৃদ্ধি, জলসিঞ্চনে কাম। এরপর দক্ষিণ বৃত্তের পঞ্চধার আকৃতির আরেকটি পাথরের সমতলে খোদাইকৃত লিপিচিহ্নের দিকে আঙুল নির্দেশপূর্বক পাঠ করল, কর্মকাম কামকর্ম, কামকর্ম ধর্ম, জলজীবন জলগ্রহণ, জলসিঞ্চন বর্ম।

জল-উত্তোলন নিমিত্তে বৃষচামড়া দিয়ে প্রস্তুতকৃত মশকাকৃতির থলের দুই ঠোঁটে ডাউয়া লতিকার সুদীর্ঘ রশি বাঁধা রয়েছে। গ্রীবাসৌন্দর্যধারিনী ঘৃতগন্ধা সেই রশি হাতে চর্মথলিকা নামিয়ে দিচ্ছে কূপে। অতঃপর তাকিয়ে থাকল কূপমধ্যে জলের দিকে। এক্ষণে কূপ থেকে উত্তোলন করতে শুরু করেছে জল। ঘৃতগন্ধার মুখমণ্ডলে জল-উত্তোলনজনিত শিহরণ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সৌন্দর্যের তাপ, দেহসঞ্চালনজনিত শারীরবৃত্তীয় ঘ্রাণ; রমণীগন্ধ। দুই হাতের বাজুদেশে পেশিসৌন্দর্যজনিত গতিচ্ছটা থেকে পিছলে নামছে বাতাস; কটিবাস থেকে পিছলে নামছে উত্তেজনা। আর যখন সেই উত্তেজনা থেকে চর্মথলিকার ভিতর ভরাট জলের ছলাৎ উদ্ভাবনা, তখন সুখচার্বাকের সহসা মনে হলো মাতানদী ইরাবতীর ছলাত নিমন্ত্রণ; নদী নারী বায়ু চিরকাল শিহরণদায়িনী, দম ও আয়ুদায়িনী।

জীবাত্মায় বিশ^াস নাই চার্বাকের অথচ আজ কেন যেন মনে হচ্ছে ওই নারীদেহে নিশ্চয় ভর করেছে অপার্থিব কোনও শক্তি। সহসা সুখচার্বাকের মনে হলো মাতামৃত্তিকার আত্মা, এই যে জলতাড়িত বায়ু, এই বায়ুচাঞ্চল্যে ভর করে ওদেরকে ঘিরে, ওদের দেহে, ওদের ত্বকে, ওদের চোখে, ওদের ঠোঁটে, ওদের প্রক্ষালিত হস্তপদ স্পর্শের অনুভবে ঘুরে ঘুরে ফিরে ফিরে নেচে নেচে চুম্বনে চুম্বনে ছড়িয়ে দিচ্ছে অশরীরী জীবন। তাহলে বেঁচে থাকাও অশরীরী বটে। গ্রীবাসৌন্দর্যধারিণী ঘৃতগন্ধা চর্মথলিকা নামিয়ে কূপ থেকে জল উত্তোলনপূর্বক সুখচার্বাক এবং পণ্ডিত বৃহস্পতির হস্তপদমুখ ধৌত করিয়ে আলো-হাওয়া প্রসারিত কুটুম্বনিবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে গেল। তখন সুখচার্বাকের পাশাপাশি পণ্ডিত বৃহস্পতিও মনে মনে ভাবছিল, দীর্ঘ পরিভ্রমণ শেষে শরীরেরও প্রয়োজন ছিল এমনতর জলসিঞ্চন, রমণীয় চাঞ্চল্য, স্নায়ুজাগরণ।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares