বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : কবে হবে সজল বরষা : আহমাদ মোস্তফা কামাল

চৈত্রের নিদাঘ দুপুর। নিদাঘ শব্দটির মানে কী, কে জানে! কোথাও পড়েছিলেন শব্দটা, আজকে মনে পড়ল রেজা সাহেবের। মনে হলো, শব্দের অর্থ না জেনেও এর মর্ম উপলব্ধি করা যায় কখনও-কখনও। যেমন এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, একেই বলে নিদাঘ দুপুর। কোথাও একটু ছায়া নেই, মায়া তো নেই-ই। প্রখর রোদে আর তীব্র গরমে  হাঁসফাঁস করছে মানুষ। অবশ্য রাস্তায় লোকজনও বেশি নেই। খুব প্রয়োজন ছাড়া এই আবহাওয়ায় কে-ইবা বেরোবে ?

তাকেও প্রয়োজনেই বেরোতে হয়েছে। বছরখানেক আগে চাকরিটা গেছে, এখন পর্যন্ত পাওনা বুঝে পাননি। প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুয়িটি, তিন মাসের বেতনÑকিছুই না। এই এক বছরে বারবার এসেছেন তিনি তার পুরোনো কর্মস্থলে, কাজ হয়নি, খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে। অথচ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পঁচিশটি বছর এই প্রতিষ্ঠানে গাধার খাটনি খেটেছেন তিনি। যখন ঢুকেছিলেন তখন ছিল তার পূর্ণ যৌবন আর যখন বের করে দেওয়া হলো তখন শরীর-মন দুই-ই নুইয়ে পড়তে শুরু করেছে। কিছু না বলে-কয়ে তাকে বিদায় করতে একটুও বিবেকে বাঁধেনি কর্তৃপক্ষের। বিবেক শব্দটি মনে আসতে একটু হাসিও পেলো তারÑওটা থাকলে কি আর ওভাবে পুরোনো কর্মচারীদের ছাঁটাই করে কোনও প্রতিষ্ঠান ? তাদের যুক্তিটাও অদ্ভুতÑলোকবল নাকি বেশি হয়ে গেছে, কোম্পানির লস হচ্ছে ইত্যাদি। তাই যদি হবে, তাহলে এত নতুন কর্মচারী-কর্মকর্তা নিচ্ছ কেন তোমরা ? এক সহকর্মী বলেছিল, প্রশাসন নাকি ফ্রেশ ব্লাড চায়; পুরোনোদের দিয়ে আর চলছে না। কর্পোরেট কৌশল! একজন পুরোনো কর্মচারী/কর্মকর্তার বেতনে যদি দুজন নতুন কর্মী পাওয়া যায়, রাখবে না কেন ? মানবতার কোনও জায়গাই নেই এখানে। আছে পরিষ্কার হিসাব-নিকাশ। ঠিক আছে, চাকরি থেকে বিদায় করেছ, মেনে নিলাম। কিন্তু আমাদের পাওনাগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছ না কেন ? চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের এতদিন ঘোরায় কেউ ?

আজকেও তাকে দেখে মুখ মলিন হয়ে গিয়েছিল অ্যাকাউন্টসের মালেক সাহেবের। হেসে বসতে বলেছিলেন ঠিকই, চা-শিঙাড়া আনার জন্যও বলেছিলেন পিওনকে, তারপর করুণ স্বরে বলেছিলেন, এখনও হয়নি রেজা ভাই।

কেন হচ্ছে না বলেন তো ? আর কতদিন ঘুরব ?

তা তো জানি না। ম্যানেজমেন্ট চাচ্ছে না বলেই হচ্ছে না।

কিন্তু চাচ্ছে না কেন ? যাদের বিদায় করা হলো তাদের পাওনাটা দেবে না ?

সবই তো জানেন। আপনি আর আমি তো প্রায় একই সময়ে এখানে জয়েন করেছিলাম। আমি যা জানি, আপনিও তা জানেন। চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে এ বিষয়টা উপস্থাপন করলেই নাকি তিনি রেগে যান। বলেন, এত অস্থির হচ্ছেন কেন ? সময় হলে সব ক্লিয়ার করে দেয়া হবে।

সময় কবে হবে ?

কেউ জানে না রেজা ভাই।

হ্যাঁ, কেউ জানে নাÑকখন কী হবে, কেন হবে। পুরোনোদের চাকরি থাকবে না, এরকম আশঙ্কা করছিল প্রায় সবাই, এই চেয়ারম্যান আসার পর থেকেই। কারণ দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিন পর তিনি একদিন পুরোনো কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ডেকেছিলেন এক মিটিংয়ে। যাদের চাকরির বয়স বিশ বছর বা তারচেয়ে বেশি, তারাই ছিল আমন্ত্রিত। ভালো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। দরাজ গলায় তিনি বলেছিলেন, আজকে আপনাদের কথা শোনার জন্য বসেছি। আপনারা মন খুলে বলেন। যে-কথা কোনও দিন বলেননি, তাও বলেন। কোনও পরামর্শ থাকলে বলেন, কোনও সমস্যা থাকলে বলেন, কোনও দাবি-দাওয়া থাকলে তাও বলেন।

নতুন চেয়ারম্যানের এমন দরাজ দিলের পরিচয় পেয়ে সবাই ভীষণ খুশি হয়েছিল। সত্যিই মন খুলে বলেছিল সবাই, যার যা কিছু বলার ছিল। তিনিও ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে শুনেছিলেন সব। তারপর সবার কথা শেষ হলে তিনি বলেছিলেন, আপনাদের কথা শুনে ভালো লাগল। আপনারা যে এই প্রতিষ্ঠানকে প্রাণ থেকে ভালোবাসেন, খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝলাম না। আপনারা সবাই বিশ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে এখানে আছেন। কেন আছেন বলেন তো ?

এই প্রশ্নের উত্তর কারও মুখে জোগায়নি। কিংবা সবাই এমন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, কী বলবে বুঝতে পারছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তিনি যখন কারও উত্তর পেলেন না, তখন নিজেই আবার বললেনÑআপনারা এই প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসেন তা তো বুঝেছি। ভালো কিছু করার জন্যই রয়ে গেছেন, এই তো ?

সবাই মাথা নেড়ে সায় দিল।

কিন্তু নিজের ভালো কিসে হয় তা বোঝেননি!

সবাই আবার অবাক এবং নীরব।

তিনি অবশ্য কারও কথা শুনতেও চাইলেন না নতুন করে, নিজেই বললেনÑপ্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের উন্নতির প্রধান উপায় হলো চাকরি বদল করা। যখন এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে যাবেন তখন প্রমোশনও পাবেন, বেতনও বাড়বে। এক প্রতিষ্ঠানে থাকলে কিন্তু ততটা হয় না। আপনারা কেউ এই সাধারণ ব্যাপারটা বোঝেননি। তবে সময় এখনও চলে যায়নি। আপনাদের উচিত ভালো কোনও অপরচুনিটি পেলে অন্য কোথাও চলে যাওয়া।

হাসিমুখে এই ভয়ংকর কথাগুলো বলে তিনি সবাইকে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সুস্বাদু সব খাবার, সুঘ্রাণে ভরে আছে খাবার ঘর, কিন্তু সবার কাছে যেন বিষবৎ মনে হলো সেসব।

তখন থেকেই পুরোনোরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল, যেকোনও সময় তাদের বিদায়-ঘণ্টা বেজে যাবে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তা ঘটল না, তবে পরিবর্তন আসতে লাগল অন্যভাবে। প্রত্যেক বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে লোক এনে। একাউন্টস, হিউম্যাস রিসোর্স, ফ্যাসিলিটিজ, প্ল্যানিং এন্ড ডেভলপমেন্ট, পারচেজ এন্ড প্রোকিউরমেন্ট, পাবলিক রিলেশন ইত্যাদিÑসব বিভাগেই নতুন পরিচালক। এবং যা হয় সাধারণত, নতুন কেউ এলে তিনি প্রথমত নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, তিনি যে খুবই দক্ষ একজন প্রশাসক সেটা দেখাতে চান, এবং প্রচুর উদ্ভট সিদ্ধান্ত নেন। অজ্ঞাত কারণে ম্যানেজমেন্টও সেসব সিদ্ধান্তে সায় দেন। সিদ্ধান্তগুলো প্রতিষ্ঠানের নীতি-আদর্শ-চর্চা-সংস্কৃতির সঙ্গে যায় কি না, নাকি সাংঘর্ষিক, সেটা বিবেচনায় আনাই হয় না। ফলে এইসব সিদ্ধান্তে পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাভিশ^াস ওঠে, খারাপ লাগলেও মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। না-করে উপায় কী ? এই বাজারে চাকরি হারালে বাঁচার উপায় আছে ?

কিন্তু চুপ থেকেও চাকরি বাঁচান গেল না। বিভিন্ন সময়ে অনেক লোককেই ছাঁটাই করা হয়েছে, তাকেও করা হলো। রেজা সাহেবের মনে পড়ল, এই প্রতিষ্ঠানে তিনি এর আগে ছ’জন চেয়াম্যানের অধীনে কাজ করেছেন। একটা ট্রাস্ট এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে এবং নিয়ম অনুযায়ী চার বছর পর পর চেয়ারম্যান পরিবর্তিত হন। রেজা সাহেব যখন যোগ দিয়েছিলেন এখানে, তখনকার চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যানের একেবারে বিপরীত। বলতেন, ‘আপনরা যতদিন এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে ভাবতে না পারবেন, ততদিন আমরা এগোতে পারব না। একে বলে ঔনারশিপ। আপনারা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসলে প্রতিষ্ঠানও আপনাদের ভালোবাসবে।’ তখন প্রতিষ্ঠান ছোট ছিল, একটা পারিবারিক আবহ ছিল, কর্মীরা সত্যিই নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করে উজাড় করে দিয়েছেন নিজেদের মেধা ও শ্রম। এখন এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সেই বন্ধনটি নেই, পারিবারিক আবহটিও নেই। এখন চেয়ারম্যান সাহেব অনায়াসে বলতে পারেন, আপনারা চলে যান। না গেলে তাড়িয়েও দিতে পারেন। এবং তাড়ানোর পর পাওনা টাকাপয়সা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসিও করতে পারেন। একটা ব্যাপার রেজা সাহেব খেয়াল করেছেনÑসেই প্রথম চেয়ারম্যান থেকে এই ষষ্ঠ চেয়ারম্যান, ক্রমাগত খারাপ মানুষের হাতেই গেছে প্রতিষ্ঠানটি। আগেরজন খারাপ লোক ছিলেন, পরেরজন পাল্লা দিয়ে আরও বেশি খারাপ হয়েছেন। বিপরীত দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেননি কেউ। 

হঠাৎ চাকরি হারিয়ে মহাসাগরে পড়েছিলেন রেজা সাহেব। অল্পবিস্তর যা হাতে ছিল তা দু’মাসের মধ্যে শেষ। যে বেতন পেতেন, সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হতো, জমানোর কোনও উপায়ই ছিল না। তারপর থেকে বাবলুর মা কীভাবে সংসার চালিয়ে নিচ্ছে, তিনি জানেনও না। তিনটে ছেলেমেয়ে, বুড়ো মা আর তারা দুজনÑখরচ তো কম নয়! অপরিসীম ধৈর্য ওই মহিলার, নইলে এতদিনে মরে পড়ে থাকতে হতো। পাওনা টাকাগুলো পেলে অন্তত কিছুদিন ভালোমন্দ খাওয়া যেত। তারপর কী হতো তিনি জানেন না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে লাভ নেই, ভেবে কিছু হয়ও না। অনেক ভেবেছেন একসময়, কোনওটিই কাজে লাগেনি। লাইনমতো চলেনি কিছুই। আশ্চর্য সব বিপর্যয় এসে দাঁড়িয়েছে পথের মধ্যে, সামাল দিতে-না-দিতে আরেকটা। আপাতত শেষ বিপর্যয় এই চাকরি হারান।

হাত একদম খালি। আজকেও কোনও উপায় হলো না। একবার ভেবেছিলেন মালেক সাহেবের কাছে কিছু টাকা ধার চাইবেন, লজ্জায় বলতে পারেননি। কবে পাওনা বুঝে পাবেন তার তো ঠিক নেই, তাহলে বলবেন কীভাবে যে, অমুক দিন শোধ করে দেবো ? আর যদি বলেনও এবং শোধ যদি না করতে পারেন, তাহলে ফের গিয়ে দাঁড়াবেন কীভাবে তার সামনে ? কিন্তু বাসায়ই বা ফিরবেন কীভাবে, খালি হাতে ? আসার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় দেয়ার সময় বাবলুর মা’র চোখ ছলছল করে উঠেছিল, বলেছিলÑ‘যদি টাকা পাও তাহলে বাজার নিয়ে এসো।’ এটুকুই। এই মেয়েটা সারাজীবনেও কোনও অভিযোগ করল না। সুখে তো রাখতে পারেননি তিনি, অভাব-অনটন লেগেই ছিল। তবে ভালো বেসেছেন মন থেকেই, হয়তো সেটা সে টের পায়, হয়তো সেজন্যই কিছু বলতে পারে না বা বলে না। অবশ্য অফিস থেকে বেরোবার জন্য তিনি যখন উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তখন মালেক সাহেব কিছু একটা গুঁজে দিয়েছিলেন তার হাতে, বলেছিলেন, ‘এটা রাখুন রেজা ভাই। পরে ফেরত দেবেন।’ তিনি কিছু বলেননি। মালেক সাহেবও এমন কোনও সচ্ছল মানুষ নন, কিন্তু পুরোনো সহকর্মীদের মধ্যে এই পারস্পরিক সহমর্মিতা সবসময়ই ছিল। একে-অপরের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। বাইরে বেরিয়ে রেজা সাহেব দেখলেন, পাঁচশ টাকার দুটো নোট। প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই, কিন্তু এই মুহূর্তে এটুকুই অসামান্য। অল্প করে হলেও কিছু বাজার নিয়ে তো ফিরতে পারবেন! বাবলুর মায়ের সেই ছলছল চোখের ভাষা যে তিনি বোঝেননি, তা তো নয়। ঘরে যে কিছুই নেই, সে-ই কথাটি মুখ ফুটে বলতে পারেনি বলেই চোখে জল এসেছিল তার, তিনি বুঝেছেন তা। থাকবেই বা কীভাবে ? তিনি তো এক পয়সাও দিতে পারেন না। সংসার খরচের যে টাকা তিনি দিতেন বাবলুর মা’র কাছে, সেখানে থেকে নিশ্চয়ই কিছু-না-কিছু বাঁচিয়ে জমিয়েছিল বহু বছর ধরে, সেটাই খরচ করেছে এ কয়েক মাস। কিংবা এমনও হতে পারে, ছেলে-মেয়েরা টিউশনি করে বা অন্য কোনও কাজ করে যা পায় তার কিছুটা মাকেও দেয়। ওদের পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি। একজন পড়ছে কলেজে আর দুজন বিশ^বিদ্যালয়ে। ওদের হাতখরচও দিতে পারছেন না তিনি অনেকদিন ধরে। কিন্তু ওরা তো চালিয়ে নিচ্ছে। নিশ্চয়ই কোনও-না-কোনও আয়ের উপায় বের করেছে, যেমন তিনি করেছিলেন তার ছাত্র-জীবনে, বাবা মারা যাওয়ার পর। বাবাদের জন্য মৃত্যু আর বেকারত্ব একই ব্যাপার, তিনি তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন এই এক বছরে। যদি মারা যেতেন তিনি, তাহলে অন্তত খাওয়ার মুখ একটা কমত!   

এসব কথা তিনি কাউকে বলতে চান না। খুব একঘেঁয়ে, খুব চেনা, বহু ব্যবহারে জীর্ণ গল্প এগুলো। বাংলাদেশের লেখকেরা এগুলো লিখতে লিখতে পাঠকদের ত্যক্ত-বিরক্ত করে ফেলেছেন। এখন কেউ যদি সত্যিই তার বাস্তব জীবনের গল্প বলতে চায়, মানুষ ভাবে, গালগল্প হচ্ছে। কোনও উপন্যাস থেকে হয়তো মেরে দিয়ে নিজের গল্প বলে চালাচ্ছে লোকটা। পাঠকরা যেমন আর পড়তে চায় না, তেমনই কেউ শুনতেও চায় না এসব। মানুষের হাতে টাকা এসেছে, চারদিকে কেবল টাকার গল্প। মানুষ তাই সাফল্যের গল্প শুনতে চায়। সেক্স, থ্রিলার আর মোটিভেশনাল স্পিকারের রমরমা বাজার এখন। এগুলো তার খবর রাখার কথা নয়। কিন্তু অদ্ভুত স্বভাবের কারণে রাখেন। বই পড়ার নেশা ছিল খুব, যতদিন বাবা বেঁচে ছিলেন, অর্থাৎ তার কলেজ পাশ করার বছর পর্যন্ত। বাবা খুব পছন্দ করতেন ছেলের এই স্বভাব, ইচ্ছেমতো বই কিনে দিতেন, ছেলেও অবশ্য বই ছাড়া আর কিছু চাইত না কখনও। বইয়ের একটা বড়সড় সংগ্রহ সেজন্যই গড়ে উঠেছিল বাসায়। আহা, তার ছেলেমেয়েরাও বইয়ের পোকা হয়েছে, কিন্তু তিনি ওদের ইচ্ছেমতো বই কিনে দিতে পারেননি কখনও, সাধ্যে কুলায়নি। তবু ওরা কোত্থেকে যেন বই জোগাড় করে নিয়ে আসে, তিনিও ভাগ বসান তাতে। পড়ার তৃষ্ণাটা তাই মিটেই যায় কোনও-না-কোনওভাবে।

বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর সঙ্গত কারণেই নানা ধরনের খরচ কমাতে  হয়েছিল, তার মধ্যে তার বই কেনার খরচও। তিনি ছিলেন বড় ছেলে, তিনটে ছোট ভাইবোন ছিল তার, মা ছিল, দাদি ছিল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল। অল্প বয়সেই সংসারের ভার এসে পড়েছিল তার কাঁধে। অবশ্য বাবা অল্পবিস্তর কিছু রেখে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আড়াই কাঠা জমির ওপর টিনশেড দালানটা। বাড়িভাড়া দিতে হতো না তাদের। কতকিছু যে করেছেন রেজা সাহেব সেইসময়, তবু অভাব লেগেই ছিল। তবে তখন অভাব আসলে সব পরিবারেই ছিল। একজন আরেকজনের দুঃখ বুঝত। দুঃখ ভাগ করে নেয়ার মানুষও ছিল আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে। এখন তো আর তা নেই, কেউ কারও দুঃখের কথা শুনতে চায় না। কলেজ-পাস করার পর বন্ধুরা সব বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেল, তার হওয়া হলো না। ভর্তি হতে হলো নাইট কলেজে। সারাদিন এটা-ওটা কাজ, আর রাতের বেলা কলেজের ক্লাস। সেই নাইট কলেজ ব্যাপারটাও উঠে গেছে দেশ থেকে। হয়তো তখনকার মতো সমস্যা আর নেই এখন। টেনেটুনে ডিগ্রি পাস করলেন তিনি, তারপর ভর্তি হলেন মাস্টার্স প্রিলিমিনারিতে। এই ব্যবস্থাও এখন উঠে গেছে। পুরোনো কোনও ব্যাপারই নেই দেশে। সব নতুন। কোম্পানিই বা পুরোনো কালের লোকজন রাখবে কেন ?

হাঁটতে হাঁটতে তার হঠাৎ চোখে পড়ল একটা সাইনবোর্ডÑহকারমুক্ত ফুটপাত! ও, এই তাহলে লোকজন না থাকার কারণ! হকার থাকলে লোকজন আসবেই, এখন সব ফকফকা। অফিস থেকে বেরিয়ে গুলশানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার চোখে পড়েছিল আরেকটি সাইনবোর্ড। ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা। ভালোই। শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করা হচ্ছে, রিকশামুক্ত করা হচ্ছে, বস্তিমুক্ত করা হচ্ছে, হকারমুক্ত করা হচ্ছে। এরপর আসবে গরিবমুক্ত করার কর্মসূচি। এই শহরে থাকবে শুধু বড়লোকেরা।

অফিস থেকে বেরিয়ে তিনি হাঁটতে শুরু করেছিলেন। গুলশানে কেবল চক্রাকারে বাস চলে। আগে যেমন কমলাপুর থেকে গুলশান পর্যন্ত ছয় নম্বর বাস চলত এখন আর তেমন কোনও বাস নেই এই এলাকায়। ভিআইপি এলাকা, রিকশাও চলে না। চাকরি যখন ছিল তখন স্টাফ বাসে যাওয়া-আসা করতেন, এখন তো আর সে সৌভাগ্য হবে না, হাঁটা ছাড়া ভিন্ন কোনও উপায় নেই।  হাঁটতে হাঁটতে হাতিরঝিলের ভেতর দিয়ে রামপুরা হয়ে এখন তিনি মালিবাগে। যেতে হবে মুগদা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ঘামে ভিজে একাকার তার শার্ট-প্যান্ট, তবু পানি কেনার চেষ্টা করলেন না। বাসার কাছে গিয়ে বাজার করবেন, তার আগ পর্যন্ত এক টাকাও খরচ করবেন না বলে তিনি পণ করেছেন। মালিবাগ মোড় পেরিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে শাহজানপুর মোড়ের ঠিক আগে আগে তিনি হঠাৎ দেখলেন এক অন্ধ লোক গাইছেÑ     

কবে হবে সজল বরষা

আমি চেয়ে আছি সেই ভরসায়

আমার এ আধলা দশা মিটবে কতদিন পরে

এবার যদি না পাই চরণ

আবার কি পড়ি ফেরে

আমায় রাখিলেন সাঁই কূপজল করে আন্ধলা পুকুরে

তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। লালনের গান। অন্ধ ফকির। প্রায়-শূন্য শহুরে ফুটপাত। চৈত্রের দগ্ধ দুপুর। গা পোড়ানো রোদ। সব মিলিয়ে যেন এক পরাবাস্তব জগৎ। এই নির্মম শহরে সহসা এমন দৃশ্যের দেখা মেলে না। গানের কথাগুলো ভাববাদী। তিনি কখনওই ভাববাদী ছিলেন না, কঠোর বাস্তবের কশাঘাতের ভেতর দিয়ে জীবন পার করে এসেছেন; তবু শুনতে শুনতে তার চোখ ভিজে উঠল। মনে হলো, এই চৈত্রের দুপুরে সজল বরষার জন্য যে আকুতি শোনা যাচ্ছে, তার জীবনও আসলে ওরকমই। বরাবরই তার আধলা দশা ছিল, আন্ধলা পুকুরেই তার জীবন কেটে গেছে, সজল বরষার জন্য তারও আকুল অপেক্ষা ছিল।

মনে পড়ল, সেই কলেজ-পড়ুয়া বয়সে মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। নায়ক ছিল ডাকাত। কিন্তু কী কারণে যেন তার বোধোদয় ঘটে। নিজের আস্তানা থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় সে, দেখে এক অন্ধ ফকির দোতারা বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে চলেছে, সঙ্গে ছোট্ট একটি মেয়ে হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কণ্ঠ মেলাচ্ছে গানের সঙ্গে।  সেই গানের কয়েকটা লাইন ছিল এরকমÑ

যতই হোস না পাপী-তাপী ওরে মনভোলা

করুণার দ্বার যে তাহার সবসময় খোলা

সেই পথে যেতে মিছে মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চল

তখন বোঝার বয়স ছিল না, এই এতদিন পর এসে মনে হলো, ওই পথে যেতে হলে মিছে মায়ার বাঁধন খুলেই যেতে হয়, যেমন এই ফকির ছিঁড়েছেন। যেন কোনও দায় নেই তাঁর, কোনও পিছুটান নেই, এমনকি এই বিরূপ আবহাওয়ায়ও তার কোনও কষ্টবোধ নেই। কী করে জয় করেন এঁরা, জীবনের এইসব মোহ, উৎসব, কলরব ? তিনি তো পারেননি। অবশ্য তিনি ওরকম কিছু চানওনি। কে-যে কোথায় জীবনের মোক্ষ খুঁজে পায় তার তো ঠিক নেই। তিনি পেয়েছিলেন পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে, আপনজনদের হাসিমুখ দেখার মধ্যে। খুব বেশি আনন্দের উপলক্ষ্য তিনি তৈরি করতে পারেননি বটে, কিন্তু আন্তরিকতা কিংবা চেষ্টার অন্ত ছিল না।

শাহজানপুর মোড় থেকে বামে বাঁক নিতে চেয়েছিলেন রেজা সাহেব, কিন্তু ফকিরটা সোজা কমলাপুরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে গেয়েই চলেছে আর তীব্র এক টান অনুভব করছেন তিনি নিজের ভেতরে, লোকটার পিছু ছাড়তে পারছেন না। অবশ্য কমলাপুর থেকেও মুগদা যাওয়া যাবে, খুব বেশি ঘুরপথ হবে না। কিন্তু তিনি যে কেন ফকিরের পিছু পিছু হাঁটছিলেন তাও বুঝতে পারছিলেন না। চৈত্রের তীব্র রোদে পুড়ে যাওয়া, ধুলোবালিতে আচ্ছন্ন রুক্ষ শহরের মানুষগুলোও কেমন যেন রুক্ষ-রুদ্র-কঠিন। কোথাও কোমলতা নেই, মায়া-মমতা নেই। দম বন্ধ হয়ে আসে। নিজের শহরে নিজেকে  বহিরাগত আর পরবাসী মনে হয়। কোটি মানুষের এই শহরে মনের মতো মানুষের দেখা পাওয়া যেন অসম্ভব প্রায়। কিন্তু কোনও একদিন হয়তো তেমন একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কোমল-স্নিগ্ধ-মায়াময়। তার সঙ্গে পথ চলতে চলতে মনে হয়, পৃথিবীটা ভারি সুন্দর, জীবনটা কী আনন্দময়! আর সেদিন চৈত্রের খরতপ্ত রুদ্র দুপুরেও শহরে হেমন্তের শিশির-সিক্ত স্নিগ্ধ সকাল নেমে আসে। এই ফকিরকেও তেমনই একজন মনে হচ্ছে তার।

ফকির গেয়ে চলেছেনÑ  

নদীর জল কূপজল হয়

বিল কিংবা বাওরে রয়

সাধ্য কি সে গঙ্গাতে যায়

গঙ্গা না এলে পরে, দয়াল গঙ্গা না এলে পরে

আহা! তার এই কূপজলের জীবনে কি কখনও গঙ্গা এগিয়ে আসবে ? তাই কি কখনও হয়!

বাসায় ফিরতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফকির আরেকটা গান ধরেছেনÑপার করো দয়াল আমায় কেশে ধরে, পড়েছি এবার আমি ঘোর সাগরে, পড়েছি ঘোর সাগরে …

অপূর্ব এক সুরের ঝর্ণাধারা যেন স্নান করিয়ে দিচ্ছে তাকে, গভীর এক প্রশান্তি নেমে এসেছে বুকের ভেতরে, এমনকি জলের তেষ্টাটাও আর অনুভব করছেন না, বাসায় ফিরতে হবেÑমাঝে-মাঝে এই কথা মনে পড়ছে বটে, কিন্তু তিনি হেঁটে চলেছেন ফকিরের পেছনে পেছনে; কোথায়, কতদূরে যাবেন, জানেন না।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares