বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প ; এই শহরে বিবি হাওয়া : মুম রহমান

: সরেন, সরেন, সাইড দেন।

: ধাক্কা দিচ্ছেন কেন ?

: পথ চলতে গেলে ওইরকম একটু লাগেই। তাছাড়া আপনি সাইড দিয়ে হাঁটেন।

: সাইডটা কোথায় ?

: এত কথার টাইম নাই আপা। কেন যে আপনেরা ঘর থাইকা বাইর হন!

বিবি হাওয়া তার হাতের কাচের বয়ামটা শক্ত করে ধরে রাখেন। এই বয়ামটা গোলাকার। তবে এরমধ্যে তিনটা ভাগ করা আছে। একভাগে আছে একটা মাছ। মাছটা পানিতে ভাসছে। পানিটা একদম নীল। পানির তো রঙ হয় না, কিন্তু এই বয়ামের পানিটা নীল রঙেরই। নিঁখুত নীল। এই মাছটার নাম কেউ আমরা জানি না। কারণ এই মাছটা এই পৃথিবীতে নতুন। এখনও এই মাছটার নাম দেয়া হয়নি। বিবি হাওয়া যদি নাম দিয়ে দেন তবে আমরা মাছটার নাম জানতে পারব। কিন্তু বিবি হাওয়া এই শহরে আসার পর থেকেই ব্যতিব্যস্ত। তিনি প্রাণপণে জাপটে ধরে রেখেছেন কাচের বয়ামটাকে। এ বয়াম সহজে ভাঙবে না। কিংবা ভাঙবেই না কখনও। অথচ এখানে আসার পর থেকে বিবি হাওয়া কেমন দিশেহারা। এই শহরে যেন সবকিছুই ভঙ্গুর। মাত্র চার ঘণ্টা হয়েছে তিনি এই শহরে এসেছেন। কিন্তু এরমধ্যে তিনটা দুর্ঘটনা, আটটা মারামারি, দশ-বারোটা ভাঙচুর দেখে ফেলেছেন। এই শহরের লোকেরা নির্বিকারভাবে একে অপরকে মারে, এর হাত ও ভেঙে দেয়, ওর গাড়ি সে ভেঙে দেয়। মারামারি, ভাঙচুর নেহাতই সাধারণ ব্যাপার এখানে। এই যেমন একটু আগের লোকটা সজোরে তাকে ধাক্কা দিয়ে তাকেই ধমক দিয়ে চলে গেল।

যা বলছিলাম, বিবি হাওয়ার হাতের কাচের বয়ামটা গোলাকার আর তার তিনটা ভাগ। একভাগে যেমন একটা নাম না-জানা মাছ আছে আরেকভাগে আছে নাম না-জানা একটা গাছ। একটু নীলচে মাটি, মাটির মধ্যে আবার সাদা দানার মতো কিছু দেখা যায়, সেই মাটিতেই গাছটা পোতা। নার্সারির প্লাস্টিক ব্যাগের ভেতরে গাছ যেমন শিকড়টা ব্যাগের ভেতরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, এই গাছটার শিকড়ও তেমন ছড়িয়ে আছে। কাচের বয়ামে থাকায় পরিষ্কার দেখা যায় শিকড়গুলো বেশ শক্ত-পোক্ত। গাছটা অনেকটা আফ্রিকান বাওবাব গাছের মতো। ছোট গাছ, কিন্তু কাণ্ডটা ইতোমধ্যে ফুলেফেঁপে উঠেছে। যেন সে তার শিকড়ে-কাণ্ডে অনেক পানি জমিয়ে রাখতে জানে। বয়ামের আরেকপাশে উড়ছে একটা পাখি। মৌটুসির মতো কিংবা টুনটুনির মতো কিংবা হামিংবার্ডের মতো ছোট্ট একটা পাখি। পাখিটার পালকে নীল, হলুদ, সবুজের কারুকাজ। লেজ আর মাথার দিকটা লাল। পাখিটা উড়ছে বয়ামের ভেতরেই একটা আকাশে, সে আকাশের মেঘগুলো আমাদের গ্রামের শরতের মেঘের মতো, সাদা আর ঘন। যেন দুধে তৈরি মেঘ। পাখিটা এই মেঘকে ঘিরে উড়ছে। মাছটার মতো এই পাখি আর গাছের নামও আমরা কেউ জানি না।

: আপনি একটা করে নাম দিয়ে দিন, এই পাখিটার, গাছটার, মাছটার।

: আপনি তো লেখক, আপনি নামকরণ করুন।

আমার বিশ^াস হয় না, বিবি হাওয়া আমার মতো তুচ্ছ লোককে এই গাছ, পাখি, মাছের নাম দিতে বলছেন। অবশ্য মাবুদের এই দুনিয়ায় অবিশ^াস্য বলে কিছু নেই। তিনি চাইলেই সব হয়। এই যে যেমন তিনি চেয়েছেন, বিবি হাওয়া এসে হাজির হয়েছেন। শুধু কি হাজির হয়েছেন এই শহরে, তিনি শহরে নেমেই আগে আমাকে খুঁজে বের করেছেন। বিবি হাওয়া আমাকে বললেন, শুনুন লেখক, আপনি আমার সঙ্গে থাকুন। আমার নাম বিবি হাওয়া।

: বিবি হাওয়া! সে কি করে হয়। সে তো সৃষ্টির প্রথম নারী। আমাদের জন্মের বহু আগে, আমাদের পিতা-মাতা, তাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, তাদেরও পিতা-মাতা এবং দাদা-দাদির জন্মের বহু শত সহস্র বছর আগে তিনি এসেছিলেন এই পৃথিবীতে। বাবা আদমকে সঙ্গে নিয়ে এই পৃথিবীতে তিনিই এসেছিলেন মর্তের প্রথম মানবী হিসেবে। আমরা তাদেরই সন্তান।

: আমাকে আরও একবার পাঠানো হয়েছে। এই মাছ, পাখি, গাছ, মেঘ, মাটি, জল দিয়ে।

: এমন কথা তো কিতাবে লেখা নাই! বিবি হাওয়া আবার কেন আসবেন পৃথিবীতে ?

: কিতাব যিনি লেখেন তিনি চাইলেই নতুন কথা লিখতে পারেন। যিনি সব সৃষ্টি করেন তিনি চাইলেই তার সৃষ্টি রক্ষা বা ধ্বংস করতে পারেন। এটুকু মানেন লেখক সাহেব ?

: জি¦, তা মানি। আমি বিশ^াসীদের দলের।

: আমি কোন দলের না। আমি সবার। এই শহরে যত দলাদলিই থাকুক আমি এসেছি সবার জন্য। বিশ^াসী, অবিশ^াসী সবার জন্য।

: আপনাকে স্বাগতম বিবি হাওয়া, আপনাকে অভিবাদন আদি মাতা। বলুন, আমি আপনার কি সাহায্য করতে পারি।

: এই যে কাচের বয়াম দেখছেন, এই যে মাছ-পাখি-গাছ দেখছেন এগুলো আমি এই শহরের জন্য এনেছি।

: কি নাম এদের ?

: কি আসে যায়! যে নামে খুশি ডাকবেন। আপনি বা আপনারা নাম ঠিক করে নেবেন। আমি আপনাদের জন্যই এগুলো নিয়ে এসেছি।

: মানুষ তো গাছ-পাখি-মাছ চায় না। মানুষ চায় টাকা, দালান-কোঠা, সোনা-হীরা, গাড়ি, বাড়ি, নারী, ব্যাংক ব্যালেন্স।

: সৃষ্টিকর্তা চান, এই শহরে আবার গাছ হোক, গাছে গাছে পাখি হোক, নদী হোক, নদীতে মাছ হোক। গাছের হাওয়া, পাখির গান, মাছের নৃত্যে ভরে উঠুক আকাশ-বাতাস-জল।

: আপনি জল বলছেন! আমরা কিন্তু পানি বলি।

: যার যা খুশি বলুক। এখন শুনুন লেখক সাহেব, আপনার কাজ হলো আমার সঙ্গে থাকবেন সারাদিন। আমি আজ সারাদিন আপনার শহরে থাকব। উপযুক্ত জায়গায় এই গাছ আর মাটি, মাছ আর জল, পাখি আর মেঘ ছেড়ে দেবো। তারপর তারা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়বে। বদলে যাবে ইট-কাঠ- লোহার শহর।

: বাহ্!

: শুধু বাহ বললে হবে না। আপনি লিপিবদ্ধ করে রাখবেন সব। মানুষ একদিন পড়বে আপনার কিতাব। মানুষ জানবে, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় কেমন করে এই শহরে আবারও গাছ-পাখি-মাছ আর জল-মাটি-মেঘ ফিরে এসেছিল।

: আমি ধন্য। এমন একটা মহান দায়িত্ব পেয়ে আমি ধন্য।

কিন্তু এই মহান দায়িত্ব পালন করা সহজ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। আমি আর বিবি হাওয়া ঘুরছি শহরের নানা-প্রান্তে। বিবি হাওয়ার কোনও জায়গাই পছন্দ হচ্ছে না। এখনও তার বয়ামে মাছ-পাখি-গাছ, মেঘ-মাটি-বাতাস আটকে আছে। তাদের কাউকেই মুক্ত করার মতো উপযুক্ত জায়গা তিনি পাচ্ছেন না।

: এই, এইখানে কি! আপনারা কানা নাকি? চোখে দেখেন না। বোর্ডে পরিষ্কার লেখা আছে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ।

: হ্যালো স্যার। আমরা জনসাধারণ নই, আমি একজন লেখক, মহান দায়িত্বপ্রাপ্ত লেখক আর ইনি বিবি হাওয়া।

: গুষ্টি কিলাই তোর হাওয়া-বাতাসের, বাইর হ এইখান থাইকা, তোর হাওয়া টাইট কইরা দিমু। যা, নইলে, সিধা চৌদ্দশিকে ভইরা রাখমু। পুলিশের ডাণ্ডার বাড়ি খাইলেই ঠাণ্ডা হয়া যাবি।

আমি আরও কিছু বোঝাতে চাচ্ছিলাম নিরাপত্তারক্ষীকে। কিন্তু বিবি হাওয়া আমাকে ইশারা করলেন। ইঙ্গিতে চুপ থাকতে বললেন।

অতএব আমরা ওখান থেকে চলে গেলাম। আবার হাঁটতে থাকলাম। আমার পা ব্যথা করছিল। ক্ষুধা লেগে গেছে, পিপাসায় জিভ-গলা শুকিয়ে আসছে। বিবি হাওয়ার নিশ্চয়ই এ সব কিছু হচ্ছে না। তিনি হাঁটছেন। ক্লান্তিহীন, নির্বিকার হাঁটছেন। আমি বুঝতে পারছি না, কি করব। যে কোনও একটা জায়গা দেখে ছেড়ে দিলেই তো হয়। বিবি হাওয়ার এই মাছ-পাখি-গাছের জন্য নিশ্চয়ই নগরপিতারা আলাদা জায়গা করে রাখেননি। আামার মাথায় অকস্মাৎ একটা বুদ্ধি খেলে যায়।

: আদিমাতা, আপনার নামে একটা মসজিদ আছে, হাওয়া মসজিদ, শহরের শেষপ্রান্তে।

: তো ?

: চলুন, সেখানে যাই। সেইখানে আপনার বয়ামের সব জিনিস উন্মুক্ত করে দিতে পারেন।

: না। তা হয় না। কোনও উপাসনালয়ে নয়।

: কেন মাতা ?

: আপনাদের উপাসনালয়গুলো তো জাত-পাতের বিভাজনে ভরপুর। একজনের প্রার্থনাঘরে আরেকজন এসে প্রার্থনা করতে পারে না। মাছ-পাখি-গাছ, মেঘ-মাটি-জলের তো কোন ধর্ম নেই। তাদেরকে কেন একটা নির্দিষ্ট ধর্মের নামে ছেড়ে দেবো।

: আহা, অসাম্প্রদায়িকতার অনন্য উদাহরণ আপনি!

: সাম্প্রদায়িকতা শব্দটিও আপনাদের আবিষ্কার। মানুষ তো মানুষই, মেঘ তো মেঘই, পাখি তো পাখি, মাছ তো মাছ, তার আর সম্প্রদায় কি হে!

: ঠিক। ঠিক। আপনার এই কথা আমি লিখে রাখব হে মহীয়সী।

: লিখে রাখবেন বলেই তো আপনাকে আমার সঙ্গী করেছি। কিন্তু এইসব কঠিন কঠিন বিশেষণে আমাকে ডাকবেন না। কেমন অস্বস্তি হয়।

: জি¦ ম্যাডাম।

: হা হা হা হা।

বিবি হাওয়া হাসতে থাকেন। আমি খানিকটা বিব্রত। ম্যাডাম বলা বোধহয় ঠিক হয়নি। তিনি তো কোনও অফিসের বড় কর্মকর্তা নন, রাজনৈতিক নেত্রীও নন, তাকে কেন ম্যাডাম ডাকব! নিজের মূর্খতায় আমি বিরক্ত হই। কিন্তু বিবি হাওয়ার চোখে-মুখে কোনও ক্লান্তি নেই। তিনি হাঁটছেন। দিন ফুরিয়ে আসছে। এইভাবে হাঁটতে থাকলে আমি তো পা ভেঙেই পড়ে যাব।

: বিবি হাওয়া।

: বলুন।

: বলছিলাম কি! একটু জিরিয়ে নিলে হতো না।

: আমার হাতে যে বেশি সময় নেই।

: তা আপনি যে কোনওখানেই এদেরকে ছেড়ে দিন না।

: ফাঁকিবাজি তো আমি শিখিনি। জীবনে একবার ভুল করেছিলাম, তার মাশুল অনেক দিয়েছি। আর ভুল করব না। সৃষ্টিকর্তা আমাকে বলেছেন, তোমাকে এইসব দেয়া হলো এক শর্তে, তুমি তোমার মন মতো জায়গায় এদের ছেড়ে দেবে।

: আর যদি মন মতো জায়গা না পান ?

: ফিরে যাব আমি!

: সে কি! তাহলে মানব সভ্যতার উন্নতির কি হবে ? প্রকৃতির বিকাশ কেমন করে হবে ?

: মানুষ তো অমর নয়, অবিনশ^র নয়। তার যা হবার তাই হবে।

: কিন্তু আপনার হাতের এই বয়াম, এইসব গাছ-পাখি-মাছ, মেঘ-জল-মাটি তো বদলে দেবে আমাদের জীবন।

: তাই তো আমার আসা।

: তাই তো বলছি, যেখানে খুশি ছেড়ে দিন।

: তেমন খুশিমতো জায়গা যে পাচ্ছি না লেখক।

বোঝা গেল, বিবি হাওয়া কোনও সমঝোতায় বিশ^াসী না। তিনি নিজের ইচ্ছা বা মত থেকে একচুলও সরবেন না। এখন তেমন উপযুক্ত জায়গা কই পাই ? কোথায় গেলে এই অমল পাখি-গাছ-মাছেরা মুক্ত হবে ? এই শহরে এমন কোনও জায়গা কি আছে যেখানে বিবি হাওয়ার বয়ে আনা মাটি-জল-মেঘ ছড়িয়ে দেয়া যাবে ? চিন্তায় আমার কপালে ঘাম জমে। আমি ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে যাই। পায়ের ব্যথা ভুলে যাই। হাঁটতেই থাকি, হাঁটতেই থাকি।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares