বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : বন্দি : আফসানা বেগম

আজও মিটিঙে যাওয়া হবে কি না নিশ্চিত নন সিনিয়র প্রফেসর আবিদ হাসান। মেজাজটা খুব খারাপ। বাসার দরজা না খুললে যাবেন কী করে! চারতলার বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে নিচের মাঠের দিকে তাকান তিনি। বাচ্চাদের কলকাকলী নেই। ঘাসের মাঝে বয়ে চলা সরু রাস্তায় সাইকেল থেকে পড়ে কনুই আর রক্তারক্তি হাঁটু চেপে ধরে ভ্যা ভ্যা কান্নার আওয়াজ নেই। ওরকম একটা বাচ্চাকে তিনি সাইকেল টেনে হিঁচড়ে নিজেদের বিল্ডিঙে পৌঁছান পর্যন্ত দেখতে থাকেন। আহা রে, বেচারা! দৃশ্যটা ভেবে আবিদ হাসান নিজের কনুই আর হাঁটুতে হাত বোলান। তারপর আবার নিচের ঘাস বিছানো মাঠটার দিকে ঝোঁকেন। সকাল পেরোনো রোদের হালকা তেজে সাত-আটটা শালিক ঘাসের মধ্যে কিছু খুঁটছে। লকডাউনে তারা নিশ্চয় খুশি, বাচ্চাদের ছোটাছুটিতে ফুড়ুৎ করে পালাতে হয় না। মাঠে বাচ্চাদের পা-সমেত বল আর সাইকেলের চলাফেরা নেই এক বছরেরও বেশি। ওদিকে ঘাস ঘন হয়ে শালিকদের পা ডুবে গেছে; পালক আর ঠোঁট ছাড়া সবটুকু উধাও। বারান্দার পাশে বাতাসে বিশাল শিশু গাছের পাতায়-ডালে ঘষাঘষির শব্দে আবিদ হাসান চমকে ওঠেন, কাঁপা হাতে টেবিলের উপরে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে স্বগোতোক্তির মতো বলেন, ‘আমার মিটিং!’ তারপর কাঁপা হাতেই উঠে দাঁড়ান। আজকাল পারকিনসনটা বেশি ভোগাচ্ছে, ফিজু নিয়ম করে ওষুধ দিলেও। 

আবিদ হাসান ঘরে এসে দেয়ালে টাঙান ঘড়ি দেখেন। সাড়ে দশটা। দশটা বাজার ঢং ঢং শব্দটা তার বারান্দা থেকে শোনা উচিত ছিল। কানের যন্ত্রটা পরতে ইচ্ছা করে না। ফিজু অবশ্য বহুবার বলেছে, নতুন চশমা নিলে যেমন প্রথম কয়েকদিন নাকের উপরে উটকো ঝামেলা মনে হয় কিংবা ব্যথা ব্যথা লাগে, কানের যন্ত্রটাও প্রথম প্রথম খানিকটা ওরকমই লাগে। কয়েকদিন জোর করে ব্যবহার করলেই নাকি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আবিদ হাসানের ঘণ্টা দুয়েকের বেশি ওটা কখনওই ব্যবহার করা হয়নি। কিংবা তার চেয়েও কম সময়ে কানদুটো টনটন করে, সহ্য করা যায় না। তখন তিনি যত্ন করে যন্ত্রটা থেকে ব্যাটারিগুলো খুলে কানের দুল রাখার মতো ছোট্ট বাকসে রাখেন।

আলমারি খুলে সুতির বাদামি শার্টে একটা হাত ঢোকাতে ঢোকাতে আবিদ হাসান বলেন, ‘ফিজু, আমার মিটিং-এর দেরি হয়ে যাচ্ছে যে, মা … এগারোটার আগে ডিপার্টমেন্টে পৌঁছতে পারব তো ? ইস্, আরও আগে রওনা দেয়া উচিত ছিল!’ বলে নিয়ে তিনি খাবার ঘরের দিকে উঁকি দেন। আবিদ হাসানের কথার জবাব আসে না। হতাশ হয়ে তিনি শার্টে আরেকটা হাত গলান। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কলার ঠিক করতে করতে বলেন, ‘ফিজু ? ফৌজিয়া, মা তুমি কোথায় গেলে ? দরজাটা খুলে দাও আমি মিটিঙে যাই।’ বেশি গুরুত্বের কথা বলার সময়ে আবিদ হাসানের মুখে বড়ো মেয়ের নামটা ফিজু থেকে ফৌজিয়া হয়ে যায়। 

খাবার ঘরে কাউকে হাঁটতে শোনা যায়। প্রফেসর আবিদ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে খাবার টেবিলের দিকে আসেন। মতির মা টেবিলে ধোঁয়া ওঠা সাদাটে স্যুপভরা বাটি রাখে, বাটির পাশে গোল চামচ। মুরগির হাড়সমেত টুকরো কুচি কুচি করে কেটে বহুক্ষণ জ্বাল দিলে স্যুপটা ওরকম সাদা হয়। তারপর ছেকে নিয়ে কর্ন ফ্লাওয়ার দিলে আরও সাদা। আবিদ হাসান ভাত তেমন খেতে পারেন না বলে ফৌজিয়ার নির্দেশে স্যুপে খানিকটা কর্ন ফ্লাওয়ার গুলে মিলিয়ে দেয় মতির মা। সে কারণে সাদা বাটির মধ্যে স্যুপটা একটু বেশিই সাদা দেখায়।  আবিদ হাসানের উপস্থিতি লক্ষ করে মতির মা বলে, ‘আইসেন দাদু ? লন তাইলে, গরম গরম স্যুপটা খাইয়া ফালান।’

‘আরে, রাখো তো তোমার স্যুপ, ফৌজিয়া কই ? আমার মিটিং আছে তো, অলরেডি দেরি হয়ে গেছে। এই শরীরে ডিপার্টমেন্ট পর্যন্ত কি দৌড়ে যাব ? স্যুপ এসে খাব আমি, ফৌজিয়াকে ডাকো।’

‘আহ্হারে দাদু, উনি তো বাইত্তে নাই। ভার্সিটিত গেছেন গা। আপনে খালি খালি মিটিং লইয়া এত টেনশন লন ক্যান ? স্যুপ খান। প্রতিদিন স্যুপ না খাইলে কিন্তু করোনা হইব।’

‘কে বলল ? এসব আজেবাজে কথা কে শিখিয়েছে তোমাকে ? আশ্চর্য ব্যাপার, স্যুপ যে খায় তার করোনা হয় না ?’

‘অত কথায় কাম কী, দাদু ? খালাম্মার নির্দেশ, এগারোটা বাজনের আগেই আপনেরে স্যুপটা খাওয়ায়ে দিতে হইব।’

‘খালাম্মার নির্দেশ বললেই হলো ? সে কি পুলিশ নাকি ? তার নির্দেশ আমি কেন মানব ? সে কই সেটা আগে বলো তো ?’

‘মরো জ্বালা, আপনে দেহি কিছুই হুনতাছেন না। খালাম্মা গেছেন ভার্সিটিত, মিটিং আছে উনার।’

‘তার মিটিং আছে, সেটা জরুরি, আর আমার মিটিংটা জরুরি না, তাই না ? দরজা খোলো, আমি রেডি। তাড়াতাড়ি যেতে হবে।’

মতির মা কথায় সুবিধা করতে না পেরে মাথায় একটা হাত রেখে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আঁচলটা কোমরে ভালোমতো গুজে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রফেসর আবিদ হাসান তার বেয়াদবি দেখে বিস্মিত বোধ করেন। কিন্তু মুখে কিছুই বলেন না। বরং ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে স্যুপের বাটির উপরে মাথা ঝুলিয়ে বসেন। তারপর গোল চামচ বাটিতে রাখতে গেলে চশমাটা বাষ্প লেগে ঘোলা হয়ে যায়। টুং করে বাটিতে চামচ ছেড়ে দিয়ে তিনি চশমা খুলে ন্যাপকিন দিয়ে মুছে নেন। রাগ আর অভিমান আসে একসঙ্গে, তিনি বড়ো মেয়ের বাড়িতে থাকেন কারণ তাকে তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু তাই বলে মেয়ে তার উপরে আর্মি-রুল জারি করে রাখতে পারে না। এরশাদের আমলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও নিয়ম ভেঙে মিছিলে গিয়ে তিনি চাকরি নিয়ে অনেক ঝামেলায় পড়েছিলেন। তবু তো সেনাবাহিনী সরকার তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। আর এখন কি না নিজের মেয়ে তাকে দিনরাত মিলিটারি রুল দেখাবে! সে যখন বলবে খেতে হবে, দরজা দিনরাত বন্ধ থাকবে, একের পর এক বিভাগীয় মিটিং আর ক্লাসে তিনি অনুপস্থিত থাকবেন―এসব কতদিন সহ্য করা যায় ? স্যুপটা শেষ করে তিনি সদর দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। নিচ থেকে উপর পর্যন্ত পাঁচটা সোনালি আর তামাটে তালা লাগান। তার মধ্যে তিনটা কম্বিনেশন লক। অন্য দুটোও এমন যে, দুটো একসঙ্গে চেপে না ধরলে দরজা খুলবে না। এসবের কোনও মানে হয় ? ফিজু কি তাহলে সত্যিই তাকে পুলিশ-আর্মির মতো জেলে পুরে রেখেছে! ভাবতেই তার রাগ উবে গিয়ে মন খারাপ হয়ে যায়। ফিজু শুধু নিজেকে নিয়েই আছে, নিজের অনলাইন ক্লাস-মিটিং তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ আর আবিদ হাসানের যেন একের পর এক মিটিঙে অনুপস্থিত থাকলেও অসুবিধা নেই। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফিজুকে বড়ো নিষ্ঠুর লাগে। আবিদ হাসান তালায় তালায় তলিয়ে যাওয়া দরজাটার পাশে পরিপাটি করে গোছানো বিছানায় বসেন। চাদরের উপরে হাত বুলিয়ে ভাবেন, বসার ঘরে একটা আস্ত ডাবল বেড রাখার কোনও মানে হয়! ফিজুর পছন্দ-টছন্দও বাড়াবাড়ি রকমের বদলে গেছে।

দরজার লকে খুটখাট আওয়াজ হয়। আবিদ হাসান সেদিকে তাকান। চাবি ঘোরানোর শব্দ। ফিজু এল বুঝি। এসে আর কী হবে, এখনও কি আর মিটিঙের সময় আছে ? একের পর এক লকে শব্দ হয়। কোনওটা ঘুরে যায় কোনওটা দরজা আর চৌকাঠের মাঝখান থেকে সরে আসে। আবিদ হাসান সেদিকে তাকিয়ে থাকতেই দরজা খুলে যায়। ফৌজিয়া এমন চালাক, লকগুলো খুলে একেবারে টুক করে ঢুকে নিয়েই ফটাফট লকগুলো আবার লাগিয়ে ফেলে। কম্বিনেশন লকের নম্বরগুলোর জায়গায় আঙুল বুলিয়ে এলোমেলো করে দেয়। আবিদ হাসানের মেজাজ এবারে চরমে চলে যায়। মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হয়ে ব্যাংকের লকার আর ভল্ট সামলানোর দায়িত্বে থাকলে ভালো হতো।

‘আজকেও তুমি এত দেরি করলে, ফৌজিয়া ? আমাকে এভাবে আটকে রাখলে ডিপার্টমেন্টে যাব কী করে ? তোমার জন্য আজকের মিটিংটাও মিস করলাম। কথা দিয়েছি আমি, ওরা আমার জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করে ছিল। কী ভাববে বলো তো ? দিনের পর দিন এভাবে চলে ?’

‘চলছে তো, বাবা,’ কানের দুল খুলতে খুলতে ফৌজিয়া নির্লিপ্ত উত্তর দেয়। মুখ থেকে মাস্ক খুলে ময়লার বাকসে ফেলে দেয়। বাইরের জিনিস এনে রাখার ট্রে-র উপরে দুল, হ্যান্ডব্যাগ আর কয়েকটা ফাইল রেখে সোজা খাবার টেবিলের পাশের বেসিনে হাত ধুতে চলে যায়।

‘চলছে মানে ? কী চলছে ? একের পর এক মিটিং মিস করে করে আমি …’

‘স্যুপ খেয়েছ ? আমি বাইরে থেকে এলে এত কাছে এসো না তো! শরীরের নানান সমস্যার মধ্যে তোমার করোনা হলে আর বাঁচাতে পারব না, বাবা।’

‘আমি কি আসলে বেঁচে আছি ? তুমি আমাকে ডিপার্টমেন্টে যেতে দাও না। নিজে তো যাচ্ছ ঠিকই। তাতে করোনা হতে পারে না ?’

‘আমার তো তোমার মতো সুগার, প্রেসার, পারকিনসনের সমস্যা নেই, বাবা। আর আমি সাবধানে থাকি। অনেক বেশি সাবধানে থাকি। এই দেখ, দুটো মাস্ক খুললাম, দেখেছ ? হাত ধুতে ধুতে সাদা হয়ে গেছে।’

আবিদ হাসান মেয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ঘড়ির নিচের চামড়ার মতো মেয়ের কবজি আর বাহুতে বর্ণবৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এমনিতেই ফরসা হাত, ধুতে ধুতে আঙুলগুলো বড়োসড়ো টিকটিকির মতো দেখাচ্ছে। আবিদ হাসানের খানিকটা অস্বস্তি হয়। তবে অস্বস্তি চেপে তিনি বলেন, ‘আর তুমি মনে কর আমি সাবধানে থাকতে পারব না ? আসল কথা হলো, তুমি আমার উপরে বিশ্বাস রাখতে পার না। কিন্তু আমার এতগুলো মিটিং যে মিস হয়ে গেল, কে জানে ডিপার্টমেন্ট কীভাবে চলছে। ছাত্রদের ক্লাস ছাড়াও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কত কী থাকে! উহ্ আমি আর ভাবতে পারছি না!’

কনুই পর্যন্ত ধোয়া হাত মুছতে মুছতে ফৌজিয়া বাবার পাশে বসে। বাবার ঘাড়ে হাত রেখে বলে, ‘এমন কর কেন, বাবা ? বুঝতে চেষ্টা কর, ১৯৯৬ সালে ইউনিভার্সিটি থেকে তুমি রিটায়ারমেন্টে গেছ। এটা ২০২১। ২৫ বছর চলে গেছে, বাবা। কীসের মিটিং তোমার ? বাদ দাও। আজ তুমি স্যুপ খেয়েছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। দুপুরে খাবার আগে এই সময়টায় একটু রেস্ট নেবে, তাহলে আরও ভালো হবে।’

‘আর কত রেস্ট নেব, ফিজু! তুমি কী বলতে চাচ্ছ, ওরা আমাকে মিটিংয়ের জন্য ডাকেনি ? আমার অ্যাডভাইস চায়নি ?’

‘কে ডাকবে, বাবা ? তুমি যে ডিপার্টমেন্টে পড়াতে, আমি এখন সেখানকারই শিক্ষক। তোমাকে ডাকলে আমি জানতাম না, বলো ?’

‘তুমি ঠিকই জানো যে, ওরা আমাকে মিটিঙে ডেকেছিল। আমার আরও একটা কী যেন জরুরি কাজ ছিল ডিপার্টমেন্টে… ,’ মাথা চুলকে জানালার বাইরে লক্ষ্যবিহীন তাকান আবিদ হাসান। সেদিকে অর্থপূর্ণ কিছুই খুঁজে পান না। তাই কথা শেষ করেন, ‘যা হোক, জরুরি কাজটা এখন কেন যেন কিছুতেই মনে পড়ছে না। বয়স হয়েছে তো … কিন্তু তুমি নিশ্চয় জানো যে, ওরা আমাকে ডেকেছিল। তুমি বাড়িতে আটকে রাখলে, তাই যেতে পারলাম না।’

ফৌজিয়া হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের গম্ভীর শিক্ষকের মুখভঙ্গি ধরে রেখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবিদ হাসান মেয়ের চোখের দিকে একবার দেখে নিয়ে চোখ নামান। তারপর বিছানা থেকে উঠে ক্লান্ত হাতে শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে নিজের ঘরের দিকে যান। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়ে তাকে বাইরে বেরোতে দেবে না। এভাবে একের পর এক মিটিং আর ওয়ার্কশপে অনুপস্থিত থাকলে ওরা কি তাকে আর ডাকবে ? সবার কাছে তিনি জীবিত অবস্থাতেই মৃত হয়ে যাবেন। তারপর যেদিন সত্যি সত্যিই তিনি মারা যাবেন, মানুষে শুনে চোখ কপালে তুলে বলবে, উনি এতদিন বেঁচে ছিলেন নাকি, জানতাম না তো!

এভাবে বেঁচে থেকেও সবার নজরে মরে যাওয়া কি ভালো! নিজের বিছানার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আবিদ হাসানের নিদারুণ অসহায় লাগে। কত নামডাকঅলা শিক্ষক ছিলেন তিনি! ফৌজিয়া ঠিকই বলেছে হয়তো, বহু বছর অগে তিনি অবসরে গেছেন। তার আগে দুই কিস্তিতে বিভাগের প্রধান ছিলেন। তখন ফৌজিয়ার মতো তরুণ শিক্ষকেরা তো বটেই,  সিনিয়র শিক্ষকরাও বরাবর তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকত। ধীরে ধীরে সময় বদলেছে। তিনি জানতে পেরেছেন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। ফৌজিয়াই বলেছে তাকে, কার শিক্ষক হওয়া উচিত ছিল আর কে কী কারণে হয়ে গেলেন। আরও শুনেছেন, এখন নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ আর আন্দোলন হয় না। সমস্তকিছু যান্ত্রিকভাবে চলছে, কোথাও কোনও অনিয়ম নেই। সোজা কথা, যা ঘটে সবকিছুকেই নিয়ম বলে ছাত্র-শিক্ষকেরা মেনে নিতে পারে। তারা গা বাঁচিয়ে চলাও শিখেছে। যে যার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত―নিজ নিজ ব্যক্তিগত সংগ্রাম। সমষ্টি নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। সামষ্টিক কোনও চাওয়াও নেই। নিজনিজ আখের গোছালেই হলো। সামান্য কিছু বিপ্লবী ছাত্র-শিক্ষকও আছে বটে। তবে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য তাদের সমর্থনের দলকে ক্ষমতাহীন থাকতে হয়। নিজের সমর্থনের দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের সব কাজই যৌক্তিক মনে হয়, তাই তারা প্রতিবাদ করতে পারেন না। সমর্থনের দলের সিদ্ধান্ত যতই অযৌক্তিক হোক, তাদের আন্দোলনের প্রেরণা বলে কিছু থাকে না। আবার আবিদ হাসানের মতো আপাদমস্তক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করা একঘরে শিক্ষকও আছেন দু’একজন, তাদের কেউ কেউ সরাসরি তার ছাত্রও ছিলেন। বহু আগে একদিন সেরকম একজন এসে তাকে বলে গিয়েছিলেন, শিক্ষক লাউঞ্জে বসে থাকলে তার অস্বস্তি হয়, মনে হয় বড়লোকের পরিপাটি বসার ঘরে তিনি যেন গরিব আত্মীয়―অপরাধী মুখে গুটিশুটি হয়ে বসে আছেন। এসব জেনে আবিদ হাসানের মনটা যারপরনাই খারাপ হয়। এই সমস্তকিছুর মধ্যে শুধু এটাই মাথায় ঢোকে না যে, তার মতো মানুষকে তারা বিভাগীয় সিদ্ধান্তের জন্য বরাবর এটাসেটা মিটিঙে ডাকেন কেন ? তিনি আজীবন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেও প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। তার মুখ দিয়ে তো তাদের মনমতো কিছু তারা বলাতে পারবেন না। আবার পরমুহূর্তে ফৌজিয়ার কথাটা মাথায় আসে। সে নিজেও তো ওই বিভাগেই পড়ায়, আবিদ হাসানকে মিটিঙে ডেকে ফোন দিলে সে কি জানত না ? আচ্ছা, ফোনটা কখন এল ? এসেছিল কি ? নাকি সত্যিই আসেনি!

ভাবতে ভাবতে অসহায় লাগে। মাথার উপরে হাত বোলান তিনি। প্রায় চুলবিহীন মাথাটা অযথা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জ্বর-টর না তো! তা হলেই হয়েছে। ফৌজিয়াকে বললে বলবে, ‘হায় হায়, শেষ পর্যন্ত বাড়িতে কোভিড চলেই এল!’ তারপর মানুষের হাতে হাতে ঘোরা ওষুধের লিস্ট ধরে খাওয়াবে, খামোখাই টেস্ট করতে গিয়ে নাকে খোঁচা লাগাবে। ভাবতে গেলেই আবিদ হাসানের নাকটা টনটন করে ওঠে। আগেও দুবার ফৌজিয়া সামান্য সর্দি-কাশি, গা ম্যাজম্যাজের কারণে বাড়িসুদ্ধ লোকের কোভিড টেস্ট করিয়ে ছেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মেজাজটা খিঁচড়ে যায়। এটা কোনও জীবন হলো ? ঘর আর বারান্দা আর স্যুপ। সমস্তকিছু বাদ দিয়ে শুধু শরীরটা সুস্থ রেখে বেঁচে থাকাটা যে কতটা মরে যাওয়া তা ফৌজিয়াকে কে বোঝাবে!

যা হোক, নিজের ঘরে এলে আবিদ হাসান পুরো পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারেন। এর খুব সহজ কৌশল তার জানা আছে―কানের যন্ত্রটা না-পারা। পৃথিবী যদি শব্দবিহীন হয় তবে প্রতিটি জিনিসের উপস্থিতিও অগ্রাহ্য করা সহজ। চোখ থাকলেও, চারদিকে আলো থাকলেও, শব্দ যদি ভেসে না আসে তবে মনোযোগ সেদিকে আকর্ষিত হবে না। তাই ওদিকে ফৌজিয়া বা তার ঘরবন্দি কম্পিউটারের সামনে উবু হয়ে থাকা ছেলেরা কিংবা মধ্যরাতে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলান স্বামী, ডাক্তার ফরিদ নিজেদের মধ্যে কী কথাবার্তা বলল তা নিয়ে আবিদ হাসানের কোনও মাথাব্যথা থাকবে না। আর ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দিলে পোয়াবারো, সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হবার এর চেয়ে সহজ বুদ্ধি আর নেই। কেবল দু’ কদম পায়চারী করে বারান্দাটার দিকে যাওয়া চলে। সেখানে গেলে শিরীষ গাছের ডালে আর পাতায় ঘর্ষণ, ডাল-পাতাদের নানান কথাবার্তা শোনা যায়। আবিদ হাসান বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন অনেক সময়। তবে কখনও তার মনে হয়েছে, তিনি কি সত্যিই সংগীতের মতো এক ছন্দে বয়ে চলা ওই মৃদু শব্দগুলো শুনতে পান নাকি ডাল আর পাতাকে নড়তে দেখলে অতীত স্মৃতি থেকে শোনা শব্দ কল্পনা করে নেন ?

ফৌজিয়ার মাথার কাছে রাখা ফোন বেজে উঠলে সে দরজা খুলতে ওঠে। কাঁচা ঘুম ভাঙার বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে আসে। বহুদিন হয়েছে ডাক্তার ফরিদ তার তৃপ্ত বা হাসিমুখ দেখেনি। যে শুক্রবারটা ফৌজিয়া বাড়িতে থাকে আর অনলাইন ক্লাসও থাকে না, তখনই দেখা যায় ডাক্তার ফরিদের জরুরি ডিউটি পড়েছে। নাইট ডিউটি শেষে রাত দুইটায় ফিরলে ফৌজিয়া উঠে দরজার একের পর এক লকে চাবি ঘোরায়, কম্বিনেশন মেলায়। ফৌজিয়া মাঝে-মধ্যে চোখটা খোলেই না। চোখ বুজে হাতড়ে দরজা খোলে। কম্বিনেশন লকের নম্বর মেলাতে যখন চোখটা টেনে খুলতে হয়, তার মুখ থেকে ক্রমাগত ‘উফ্’, ‘ধুর’ ধরনের শব্দ বেরিয়ে আসে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেসব শুনলে ফরিদের মায়া লাগে। কোনও দিন বেশ রাত করে ফেরার জন্য অনুতাপ হয়। এই অপরাধবোধের কারণে সে হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও যেতেও পারে না। কোনওদিন নাইট ডিউটি না থাকলে ইচ্ছে করে একটু ক্লাবে যায় বা কোনও বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় বসে। যেতে পারে না। মনে হয়, ডিউটির জন্য নাহয় ফৌজিয়া কষ্ট পায়, সেটা চলতে পারে, কিন্তু শুধু শুধু আড্ডা দিয়ে এসে রাতবিরাতে তার ঘুম ভাঙাবে তা কি হয়!

ফরিদকে দেখে ফৌজিয়া বলে, ‘আজও ডিউটি ছিল তোমার ? আমি ভাবলাম কোথাও আড্ডা দিচ্ছ।’

‘কী বলো, ডিউটি ছাড়া যাই না তো কোথাও। এত রাতে তোমাকে উঠিয়ে এই সমস্ত লক-টক খোলাখুলি …’

‘হুম, বুঝি আমি। মনে হয় বলি যে, বন্ধুদের কাছে যেও মাঝেমধ্যে। কিন্তু প্রতিদিন মধ্যরাতের পর বিছানা থেকে উঠে কম্বিনেশন লকের নম্বর সেট করা সত্যি কঠিন।

‘দাও না বাড়ির অন্য কাউকে নম্বরগুলো শিখিয়ে … মতির মাকে বিশ্বাস নেই বুঝলাম, সরল-সোজা মানুষ, বাবা তাকে ফুসলিয়ে সোজা বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু ছোটো ছেলেটাকে তো শিখিয়ে দেয়া যায়, ওরা রাত জাগা প্রজন্ম, ঘরে উঁকি দিলে দেখবে এমন ভাব করছে যেন এখন ভরদুপুর।’

‘ওই কুশলের কথা বলছ ? ওকে বাবা ডেকে দরজা খুলে দিতে বললে সে ফোন থেকে চোখ না সরিয়ে এসে চুপচাপ খুলে দিয়ে আবার গিয়ে ফোন নিয়ে বসে পড়বে। মাঝখানে কী হয়ে গেল বলতেও পারবে না। আর মাঝখান থেকে আমার বাবাটা …’

‘হুম। আমি বুঝি। সেবারে যখন উনি হারিয়ে গেলেন, কী ভয়ানক দিনটা গেল আমাদের!’

কথায় কথায় ফরিদ হাত ধুয়ে নিয়ে বাড়ির কাপড় হাতে বাথরুমের দিকে যায়। ফৌজিয়া আর কথা না বাড়িয়ে পাশ ফিরে শোয়। সেই দিনের কথা ভেবে বুক কেঁপে ওঠে। সকালের দিকেই আবিদ হাসান মেয়েকে বলেছিলেন যে, সেদিন তার জরুরি একটা ওয়ার্কশপ আছে। ফৌজিয়া মনে মনে হেসেছিল, মানুষ বয়স হলে সত্যিই কত ছেলেমানুষ হয়ে যায়! কী করে তিনি ভাবেন যে ফৌজিয়াকে ক্লাস-ওয়ার্কশপের কথা বললেই সে বিশ্বাস করবে! কিছুই সহজে ভোলেন না অথচ কেবল ভুলে যান যে তিনি সেই কবে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন। সেদিন সকালবেলা ফৌজিয়া বাজারের জন্য বেরিয়ে গেলে আবিদ হাসান তৈরি হন। ফৌজিয়া তার ওয়ার্কশপে যাবার প্রয়োজন উড়িয়ে দিলে কী হবে, তাকে তো সেখানে হাজির হতেই হবে! তাই মতির মাকে ডেকে বলেন, ‘আমার স্যুপটা তাড়াতাড়ি দাও দেখি …’ মতির মা তো অবাক, আজ সূর্য কোনও দিকে উঠেছে! তিন চার চুমুকে স্যুপ শেষ করে তাকে তিনি বলেন, ‘খুব জরুরি দরকার আছে, বুঝলে ? ডিপার্টমেন্টে যেতে হবে।’

মতির মা খাবার ঘরের জানালা দিয়ে নিচে উঁকি মেরে বলে, ‘গাড়ি তো অহনও আহে নাই, দাদু। আপনে বহেন আমি নিচে গিয়া দেইখা আসি।’

‘আরে না, গাড়ি আমিই আসতে মানা করেছি। সাত-আট মাস হলো এই করোনা আর করোনা! আগে আমি প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির আশেপাশে কতটা হাঁটতাম বলো তো ? আর এখন কী করি, ঘরে হাঁটা কোনও হাঁটা নাকি!’

মতির মা ঠোঁট চেপে মাথা উপর-নিচে নাড়ে, তা তো ঠিক―এমন ভাবই দেখায়। তারপর কিছু একটা ভেবে বলে, ‘কিন্তুক গাড়িতে না গেলে খালাম্মায় যদি … ’

‘আরে, ধানমন্ডি থাকার সময়ে তো গাড়িতেই যেতাম। এটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা না ? এত কাছে আবার গাড়ি কী ? ওই যা বলছিলাম, গেলে একটু হাঁটা হবে, বুঝেছ ? তাই আজ গাড়ি না নিয়ে হেঁটে যাব ডিপার্টমেন্টে। শরীরটা এত জমে আছে না, একটু নাড়ানো দরকার।’

মতির মা বলে, ‘এক্কেরে ঠিক কইছেন, দাদু। ঘরে বইসা বইসা খালি স্যুপ খাইলে শইল টিকত না, নাড়ানির দরকার আছে।’

এরপর খুব সহজে ব্যাপারটা ঘটে যায়। মতির মা চেয়ার টেনে এনে তাতে ওঠে। তারপর উপরের ছিটকিনি খোলে। ড্রয়ারে লুকানো চাবি দিয়ে একে একে দুটো লক খুলে দরজা মেলে দাঁড়ায়। আবিদ হাসান সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে যান। নামতে নামতে বলেন, ‘শোনো অনেকদিন পরে বেরোচ্ছি তো, আমার আসতে কিন্তু দেরি হবে, ফিজুকে বলে দিও।’

বিকেল নাগাদ ফৌজিয়া বাড়ি ফিরে, কাপড় ছেড়ে, দুটো জরুরি ফোনে কথা বলে যখন আয়েশ করে খেতে বসে তখন মতির মা এসে বলে, ‘দাদু তো আইজ হাঁইটাই ডিপাটমেন্ট গেছে গিয়া। শইলডা নাড়ানি দরকার, খালি স্যুপ খাইলে হইব ?’

ফৌজিয়ার মুখের ভিতরে ভাতের লোকমা আটকে থাকে, চোয়াল আর নড়ে না।

‘বলে কী! দরজার চাবি কোথায় পেল ? উপরের ছিটকিনি ?’

‘আমি খুইলা দিছি, খালা। বুড়া মানুষ কি পারে ?’

‘এটা কী করেছ তুমি! বাবা যদি বাইরেই যাবেন তাহলে আমি কি চাবি লুকিয়ে রাখি ?’

‘আমারে তো তিনি কইলেন জরুরি কাম-কাইজ আছে। আর হাঁটাচলা করার ব্যাপারে কইলেন … আগে কত হাঁটতেন না দাদু ?’

‘থামো তুমি! আগের আর এখনকার সময় এক হলো ? করোনার কথা জানো না ? আর জানো তুমি যে বাবা আজকাল কত কিছু ভুলভাল বলেন। কীভাবে তুমি তাকে দরজা খুলে … যাও আমার সামনে থেকে।’

ফৌজিয়া ভাতের প্লেট ঠেলে মাথায় হাত রাখে। তারপর ফোনে বিভিন্ন নম্বর টিপতে থাকে। নাহ্, পরিচিত কারও বাড়িতে যাননি তিনি। ফৌজিয়া ডিপার্টমেন্টেও ফোন করে। এই বিকেলে সেখানে কে ফোন ধরবে! শেষে চেঁচামেচি করে ছেলেকে ডেকে সোজা বাইরে বেরিয়ে যায়। সামনে যখন কোনও উপায় দেখে না তখন বিল্ডিঙের দরজায় দরজায় কলিং বেল বাজিয়ে বাবার কথা জানতে চায়। তার উৎকণ্ঠায় আশেপাশের মানুষও জড়িয়ে পড়ে। সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাড়িগুলোর আশেপাশে, চায়ের দোকানে, মাঠে, সামান্য দূরে মোড়ে খুঁজতে থাকে।

‘আমারে মাফ দেন, খালাম্মা,’ মতির মা কাঁদতে থাকে। ফৌজিয়া তাকে কী বলবে বোঝে না। মতির মাকে চালাকচতুর বলেই মনে হতো। তবে ফৌজিয়া নিজেকেই দুষতে থাকে। বাবার মানসিক পরিস্থিতি মতির মাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললে হতো। আর দোষ কেবল তাকে দেয়া যায় না। বাবা নিজে নিজেও তো সবার অলক্ষ্যে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে পারতেন। হাতের লাঠিটা ব্যবহার করে সবচেয়ে উঁচু ছিটকিনিটা তিনি খুলতে চেষ্টা করে ফৌজিয়ার কাছে বেশ কয়েকবার হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। আফসোসে ফৌজিয়া লুকিয়ে চোখের পানি মোছে। বাবাকে হারিয়ে ফেলা তারই অবহেলা যেন। আর কি পাওয়া যাবে! পেলেও, করোনা তো হবেই … তারপর ?  

আবিদ হাসানকে কোথাও পাওয়া যায় না। শেষে রাত আটটা নাগাদ যখন থানায় ডায়রি করার জন্য ফৌজিয়া আর ফরিদ রওনা দেবে তখন মতির মা দৌড়ে এসে বলে, ‘দাদু কিন্তু প্রায়ই আগের বাইত্তে যাওয়ার কথা কইতেন। ওই জায়গা নাকি তার বেশি ভালো লাগত। যেইহানে খুশি যাইতে পারতেন।’

ফৌজিয়া স্বীকার করে, বাবা এরকমটা বলতেন বটে। কিন্তু একা একা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে অত দূরে যেতে পারবেন! হয়তো পারবেন না। ভাবতেই ফৌজিয়ার বুকটা কেঁপে ওঠে। হ্যাঁ, কোভিডের ডামাডোলের আগে জীবনটা অন্যরকম ছিল। তারা ধানমন্ডিতে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে থাকত, আবিদ হাসান প্রতিদিন সন্ধ্যায় খুট খুট করে লাঠির শব্দ তুলে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে হাঁটতেন। সেখানে কি যেতে পারেন ? হয়ত পারেন আবার হয়তো না-ও। নানান সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে ফৌজিয়া ডুকরে কেঁদে ওঠে। ভাইবোনরা তাকেই দোষ দেবে। বাবা তাদের সবার মধ্যে বড়ো মেয়ের বাড়িটাকে বেছে নিয়েছে থাকার জন্য। অন্যেরা মনে মনে স্বস্তি পেয়েছে হয়তো, ফৌজিয়া তেমনই অনুমান করে। কিন্তু এখন যখন বাবা তার বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছে তখন তার নিস্তার নেই। থানায় যাবার পথে ফোনবুক খুঁজে ফৌজিয়া আগের বাসার প্রতিবেশীর ফোন নম্বর বের করে। বাবা ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোন করে কথা বলতেন। কে জানে, তার কাছে চলে যেতেও পারেন! ফৌজিয়া মনে মনে বলে, তাই যেন হয়। তিনবার কল করলেও ভদ্রলোক ফোন ধরেন না। চারবারের বার ফোন তুলে শুধু ‘জি, জি’ বলতে থাকেন।

ভালো আছেন ?

জি।

আমি ফৌজিয়া বলছি। আপনার প্রতিবেশী ছিলাম।

জি।

ইতিহাস পড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে, চিনতে পেরেছেন নিশ্চয় ?

জি।

আমার বাবার কথা মনে আছে ?

জি।

বাই এনি চ্যান্স, উনি কি আপনার বাসায় ?

জি।

সে কী, তাই নাকি!

জি।

কখন গেলেন উনি ?

জি।

মানে, আপনি প্লিজ উনাকে বের হতে দেবেন না।

জি।

আমি গাড়িতে, দ্রুতই আসছি কিন্তু।

জি।

উনাকে যে কোনওভাবে আটকে রাখুন প্লিজ।

জি।        

থানার দিক বদলে গড়ি চলে যায় ধানমন্ডি। লেকের পাড়ে গিয়ে গাড়ি থামলে ফৌজিয়া মনে মনে মতির মাকে ধন্যবাদ দেয়, ভাগ্যিস এই ভদ্রলোকের কথা সে মনে করেছিল। বাবার মন হয়তো এ বাড়িতেই পড়ে থাকে, লেকের ধার ধরে হাঁটতে ইচ্ছা করে তার। কী ভাবেন তিনি, এখানে চলে এলে করোনার বিধিনিষেধ থাকবে না ?

ভদ্রলোক আবিদ হাসানকে নিয়ে বসার ঘরে বসে ছিলেন। ফৌজিয়া ঢুকতেই কাচুমাচু মুখ করেন। আবিদ হাসান চমকে উঠে বলেন, ‘তুমি এসে পড়েছ ? খুব ভালো করেছ। দেখো, আমাদের জায়গাটা আগের মতোই আছে। ভাবলাম কয়েকদিন এখানে থেকে যাই।’

‘কী করে থাকবে, বাবা ? আমরা যে বাড়ি ভাড়া দিয়ে ফেলেছি। মনে আছে, তুমি বলেছিলে মেয়ে তার পদের গুণে কোয়ার্টার পেয়েছে, আমরা সেখানেই থাকব, মনে আছে ?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু ফৌজিয়া, ওখানে যেতে না যেতেই বন্দি থাকা শুরু হলো। আমার ভালো লাগে না।’

‘আমার কি ভালো লাগে, বাবা ? কিন্তু দেখো, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, তখন তুমি ইচ্ছামতো বাইরে ঘুরতে পারবে।  কিন্তু তুমি আজ যেভাবে একা চলে এলে, রাস্তায় যদি তোমার কিছু একটা …’ ফৌজিয়ার কণ্ঠস্বর কাঁদো কাঁদো হয়ে আসে, ‘বাবা, তুমি মুখে একটা মাস্ক পর্যন্ত পরে আসনি, কী বিপদ! আর এতদূর হেঁটে এলে কী করে, তাও আবার মাস্ক ছাড়াই …’

প্রতিবেশী ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বলেন, ‘আসলে আমি উনাকে নিউ মার্কেটের কাছে হাঁটতে দেখে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলাম। আপনাদের বাসা তো চেনা নেই আর উনিও আমাদের এখনে আসতে চাইলেন, তো ভাবলাম … স্যরি আপনারা হয়ত অনেক টেনশনে ছিলেন, ফোনও ধরতে পারছিলাম না, উনি যদি আবার আপনার খবর পেয়ে বেরিয়ে যেতে চান, বুঝতে পারছেন আশা করি।’

‘না না, সে তো বুঝতেই পারছি। কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব!’

‘ভয় হচ্ছিল কখন চলে যেতে চান। তবে আমি তো অবাক, এসেই বললেন, আপনাদের এখানে থাকতে চলে এলাম। ওখানে ভালো লাগছে না।’

‘আপনি যে বুঝতে পেরেছেন উনার ব্যাপারটা―কী বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে!’

‘না না, ঠিক আছে। এখানে থাকতে উনি হাঁটা শেষ হলে মাঝে-মধ্যে আমার এখানে আসতেন।’

ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফৌজিয়া দেখে আবিদ হাসান জানালা দিয়ে বাইরে লেকের দিকে তাকিয়ে আছেন। অর্থহীন অন্যমনস্ক দৃষ্টি। সে এগিয়ে গিয়ে যখন তার বাবার বাহুতে হাত রাখে, তিনি বুঝে ফেলেন, ধরা পড়ে গেছেন। তার অপরাধী মুখ দেখে ফৌজিয়ার মায়া লাগে। ব্যাগ থেকে মাস্ক বের করে তার মুখে লাগিয়ে, স্যানিটাইজার হাতে মেখে দেয় সে। তারপর বলে, ‘চলো বাবা, আমরা লম্বা ঘোরাঘুরি করে বাসায় যাবো।’

সে রাতে আবিদ হাসানের চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে আসা পর্যন্ত ফৌজিয়া শহরের এ মাথা ও মাথা চষে বেড়ায়। তিনিও খুশি, বহুদিন পরে শহরটা খানিক দেখা হলো। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন। শুধু মাঝে-মধ্যে বলেন, ‘কী শহরটা কী হয়ে গেল। এত মানুষ, এত গাড়ি, এত রিকশা … ’ তারপর নিজের মাথার দু’পাশে চেপে ধরেন। ফৌজিয়া বাবার হাত ধরে বলে, ‘অনেক বদলে গেছে, বাবা। তাই তো তুমি বেরোলে আমি ভয় পাই। ঠিক যেমন আমি যখন স্কুলে পড়ি, তোমার ছোট্ট মেয়েটা, তুমি বাইরে যেতে দিতে না, মনে আছে ?’

আবিদ হাসান হাসেন।

ফৌজিয়া জানে না সে হাসির অর্থ কী। বাড়ি থেকে পালিয়ে ফৌজিয়াকে বেশ শায়েস্তা করা গেছে, এ বুঝি খুব মজার ? ভাবতে ভাবতে ফৌজিয়াও হাসে।

দরজার জন্য অনলাইনে কত কঠিন তালা অর্ডার করা যায়, তা নিয়ে ফরিদ রাতে বাড়ি ফেরার পর থেকে ব্যস্ত। পরদিন তিন তিনটা কম্বিনেশন লক নিয়ে আসে মানুষেরা। তারপর ড্রিল মেশিনের শব্দ, ঠুকঠাক হাতুড়ির শব্দ। তালা লাগিয়েও ক্ষান্ত হয় না ফৌজিয়া। শোবার ঘর থেকে খাট খুলে বসার ঘরে এনে বসায়। এই করোনাকালে অতিথির প্রত্যাশা নেই। বরং বাইরের দরজার পাশে ঘুমিয়ে থাকলে বাবার গতিবিধিও লক্ষ করা যাবে, আর বেশ রাতে ফরিদ বাড়ি ফিরলেও সহজে খুলে দেয়া যাবে।

কয়েকদিন দরজা খোলার চেষ্টা করে আবিদ হাসান ফৌজিয়ার উপরে বেশ রেগে যান। তালার উপরে ছোটো ছোটো কয়েকটা চাকায় কিছু নম্বর লেখা। কিন্তু সেসব যতই ঘোরানো যাক, তালা খোলে না। ওদিকে মতির মাকে জিজ্ঞাসা করলে ঠোঁট উল্টায়, ‘এই তালা হইছে গিয়া পড়ালেকা জানা মাইনষের, দাদু। আমগো কি সেই কপাল আছিল যে পড়ালেকা শিখমু ? তাইলে আর আমারে এইহানে কাম করতে দেকতেন না কইলাম।’

আবিদ হাসানের কাছে নিজের দুঃখের চেয়ে মতির মায়ের দুঃখটা বড়ো লাগে তখন। আহা রে, পড়ালেখা শেখার ইচ্ছা ছিল বেচারার। জীবনে সুযোগ আসা আর না-আসা একটা বড়ো ব্যাপার। সুযোগ পেলে মানুষ এক আর সুযোগ না পেলে সস্পূর্ণ আরেক। এই যেমন, আবিদ হাসান বাড়িতে আটকে থেকে থেকে কেবল করোনায় আক্রান্ত আর মৃত্যুর খবর পড়ে পড়ে দেখে দেখে একরকম আর বেরিয়ে গিয়ে মুক্ত বাতাসে করোনার ভয় উড়িয়ে দিয়ে জোরে শ্বাস নিতে পারলে আরেকরকম।

তবে এক সারিতে চৌকাঠ ফুটো করে তালার পর তালা লাগানোর পর থেকে ফৌজিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। ছুটির দিনে সকাল সকাল চা আর দৈনিক পত্রিকা নিয়ে বারান্দায় বসতে পারে। ফরিদের সঙ্গে দু-চারটা কথাও বলতে পারে।

‘ডাক্তার, করোনা-টরোনা বাঁধিও না আবার। বাবা তো বাবা, আমাদের বয়সও কিন্তু কম হলো না। তোমার ডায়াবেটিস আর আমার ব্লাড প্রেসার, হলে আর রক্ষা নেই,’ ফৌজিয়া বলে।

‘কী আর করা যাবে, যখন বিয়ে করেছিলে ডাক্তারকে, তখন কি আর জানা ছিল যে প্যানডেমিক আসবে ? জানলে করতে ?’

‘উহু,’ ফৌজিয়া দুদিকে মাথা নাড়ে। ফরিদ মজা পায় ঠিকই তবে কেন যেন হুট করে গম্ভীর হয়ে যায়, ‘সারাদিনে অন্তত পঞ্চাশটা করোনা রোগীর নাড়ি টিপে, বুক-পিঠ পরীক্ষা করে কত ছটাক ভাইরাস আমার ফুসফুসে ঢুকে যায়, কে জানে!’

ফৌজিয়াও গম্ভীর হয়ে ওঠে, তারপর ধীরে বলে, ‘কী আর করা, কাজ তো কাজই, করতে হবে। করোনা রোগীর নাড়ি না টিপে পালানোর কোনও পথ নেই তোমার।’

‘কিন্তু জানো, শুধু আমি বা আমরা নই, ছোটো ছোটো বাচ্চাদের কথা ভাবো, যারা কতদিন ধরে বাড়ির মধ্যে বন্দি হয়ে আছে,’ বলতে বলতে নিচে মাঠের দিকে ইশারা করে ফরিদ, ‘দেখো মাঠগুলো বন্ধের দিনেও কেমন খাঁ খাঁ করছে! এ বাড়িতে যখন প্রথম এলাম, নিচে বাচ্চাদের চিৎকারে এই চারতলার বারান্দায়ও শান্তিমতো বসা যেত না।’

ফৌজিয়া চুপ করে থাকে। বাচ্চারা হয়তো অন্যরকম হয়ে যাবে। এই প্যানডেমিক শেষ হলেও তারা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না, বন্ধু হবে না, শিশুর সরলতায় বড়োদের হাসাবে না। তারা একেকজন গম্ভীর আর বুঝদার বাচ্চা হবে … ‘ধুর!’ ফৌজিয়ার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়।

‘কী হলো, কিছু ভুল বললাম ?’ ফরিদ বলে।

‘আরে না না, ওই বাচ্চাদের ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের কথা ভাবছিলাম আর কী, কোভিডের এই লকডাউনের ভোগান্তি তাদের জন্য অন্যরকম হবে।’

‘একদম। আর বয়স্কদের কথা চিন্তা করো ? তাদেরও সেই একই অবস্থা, শিশুদের মতো। দেখ না আমাদের বাড়িতে তোমার বাবা, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এটা ভাবতে ভাবতে যে, তুমি তাকে আটকে রেখেছ।’

ঠিক তখনই সেখানে আবিদ হাসান উপস্থিত হলে ফৌজিয়া কোনও মন্তব্য করে না। তাদের চুপ হয়ে যেতে দেখে তিনি অপ্রস্তুত হন। কিন্তু শিশুর মতো জেদি গলায় বলেন, ‘আমার যে আর ভাল্লাগে না। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে ?’

ফরিদ আর ফৌজিয়া এরওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ফৌজিয়া চুপ থাকে। ফরিদ হেসে বলে, ‘তার কি কোনও ঠিক আছে, বাবা ? কেউ বলতে পারে না অবস্থা এখন কোন দিকে যাবে, ভালোও হতে পারে বা হতে পারে এর চেয়েও আরও অনেক খারাপ।’

‘কী বললে ?’

‘বললাম যে ঠিক নেই, বাবা। এই ধরেন হুট করে কোনও পরিবর্তন তো আর আসবে না, দেখা যাক কী দাঁড়ায়।’

‘আরে তুমি দু’বার দুই কথা বলছ কেন ? যা জানতে চেয়েছি ঠিকঠাক বলে ফেল না। আর কতদিন এভাবে বন্দি থাকতে হবে ?’

‘সেটাই তো বলতে চেষ্টা করছি।’

‘তো কী সব বলছ তুমি, শুনতে পাচ্ছি না, আরও জোরে বলো। দু’বার তো দুরকম কী যেন বললে।’

‘আসলে বাবা তোমার লিপ রিড করে কথা বুঝতে চাইছেন, ফরিদ। শুনতে পাচ্ছেন না,’ ফরিদের দিকে তাকিয়ে ফৌজিয়া মিনমিন করে বলে।

ফরিদ বলে, ‘বাবা কানের যন্ত্রটা পরেননি ?’

‘ধুর ওটা বাবা পরেন নাকি!’ ফৌজিয়ার গলায় বিরক্তি।

‘বাবা, বাবা, শুনতে পাচ্ছেন ?’ আবিদ হাসানের বেশ কাছে গিয়ে ফরিদ প্রায় চিৎকার করে বলে।

‘এভাবে চিৎকার করছ কেন তুমি ? আমি জানতে চাচ্ছি, এই করোনাকাল আর কত দিন ?’

‘সে তো বলা যাচ্ছে না, বাবা। কিন্তু আপনি কানের যন্ত্রটা পরেন না কেন ?’ ফরিদের গলাটা উচ্চগ্রামে উঠে যায়।

‘পরি না। কানটা কুরকুর করে, কানের পাশে ব্যথা হয়। কিন্তু তুমি ডাক্তার, তুমি জানো না এই অসুখটা কতদিন থাকবে ?’

ফরিদ উত্তর দেবার আগে ফৌজিয়া ধৈর্যহারা হয়ে যায় হঠাৎ। বাবার কানের যন্ত্র না পরার যুক্তিকে উড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘আসল কথাটা বলো না কেন, বাবা ? আমাদের কথা যদি তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো, তবে কি আর শোনার জন্য কানে ওটা পরতে না ? তুমি আসলে ধরেই নিয়েছ যে আমরা যা বলি তা এতই অপ্রয়োজনীয়, যে তোমার সেসব না শুনলেও চলে।’

‘আহ্ ফৌজিয়া, এভাবে কথা বলছ কেন ওঁর সাথে ?’ ফরিদ বিরক্ত হয়। ফৌজিয়া একইরকম চড়া গলায় বলে চলে, ‘ঠিকই বলছি। বাবাকে কতবার বলেছি, একটা নতুন চশমাও তো নাকের উপরে বসলে কয়েকদিন ব্যথা করে, কান টনটন করে, দৃষ্টিতে অস্বস্তি হয়, কিন্তু কয়েকদিনেই সেসব অভ্যাস হয়ে যায়। কানের যন্ত্রটারও একই ব্যাপার। কয়েকদিন কষ্ট করে ব্যবহার করলেই হয়ে গেল। বলিনি আমি তোমাকে, বাবা ? অস্বীকার করতে পারবে ?’

‘আহা, তুমি তো বলেছ, কিন্তু আমি ব্যবহার করেই বলছি, আমার কানে ব্যথা লাগে, আর মাথাটা একদম ধরে যায়।’

‘দেখেছ, দেখেছ, ফরিদ, বাবা কিন্তু আমার কথা পাত্তাই দেননি,’ ফৌজিয়া বলে। তার চড়া গলার কথা চলতেই থাকে। অথচ আবিদ হাসানকে দেখলে মনে হয় তিনি যেন কিছ্ইু শুনতে পান না। বোকা বোকা চোখে ফৌজিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর কিছু ভুলে যাবার ভঙ্গিতে মাথা চুলকে বিড়বিড় করেন, ‘আমি তাহলে বাইরে যাব কবে ? আর আমার মিটিং ? সেসবের কী হবে ? আমি কি তাহলে দিনের পর দিন …’

বাবার কথাগুলো কানে যেতে যেতে আর উদভ্রান্ত ভঙ্গিটা দেখে ফৌজিয়ার গলায় কথা আটকে যায়। রাগের বদলে হুট করে চোখ জলে ভরে। ওদিকে থুথু জড়ান দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করতে করতে আবিদ হাসান নিজের ঘরের দিকে যান। ধীরে ধীরে দরজাটা ভিড়িয়ে দেন, দেখে মনে হয় কপাট আর চৌকাঠের মিলে যাওয়ার শব্দটা তিনি কাউকে জানাতে চান না। এখন তিনি নিশ্চয় বারান্দায় নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, তারপর শিরীষ গাছের পাতার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। কানের যন্ত্রটা তখন মোটেও দরকার পড়বে না।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares