বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : আমি, অনামি অথবা হাসিব : হামীম কামরুল হক

রঞ্জিতাকে কথা দিয়েছিলাম তাকে নিয়ে কোনও গল্প লিখব না। আসলে ওকে আমি অনামির গল্প বলেছিলাম। আর  রঞ্জিতা আমার তিনটা গল্পের বই-ই পড়েছিল। স্পষ্টতই ধরে ফেলেছিল―অনামিকে নিয়ে ঘটনাগুলো ভেঙেই আমি বেশ কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। আমি রঞ্জিতাকে এও বলেছিলাম, অনামিকে নিয়ে একশ না হলেও পঞ্চাশটা গল্প লেখা যায়।

বলাবাহুল্য, রঞ্জিতার সঙ্গে গল্প লেখার মতো কিছু ঘটেনি। আদতে ওকে নিয়ে গল্প লেখার কথাও ভাবিনি কখনও―তাও ঠিক বলা যাবে না। এই যে রঞ্জিতার কথা এখানে বলছি, এতটুকু বলাটাও ঠিক হচ্ছে না। ফলে এ পর্যন্তই রঞ্জিতার কথা থাক। আমি বরং পাতাঘাটার গল্পটা বলি।

পাতাঘাটায় আমি গিয়েছিলাম হাসিবের সঙ্গে। হাসিবের তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। তার এতদিনের প্রেমিকা তাকে পুরো ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। যে-মেয়ে বলত, হাসিবই তাকে তৈরি করেছে―আজকের মায়মুনাকে, তথা মুনাকে। মায়মুনা সত্যিই একটা গ্রামের মেয়ে ছিল। ঠিকমতো কথাও বলতে পারত না। বলত, চুহে, মুহে। আর আজকে! মায়মুনা থেকে ‘মায়’ খসে গিয়ে যে মুনা জমাদ্দার। গুণ বলতে ছিল লেখাপড়ায় ভালো। তাও ফল ভালো করার ভালো নয়, চট করে কোনও একটা বিষয় বুঝে ফেলতে পারার ভালো গুণাটা ছিল। আর এই দ্রুত বোঝার জন্যই বোধ হয়, লেখাপড়ায় খাটতে চাইত না। অল্প পড়েই এমন নম্বর পেত, যেটুকু অন্যদের পেতে অনেক সময় দিতে হতো।

ডাগর নয়ন আর সুরেলা কণ্ঠস্বরের জন্যই হাসিবের ওকে বেশি ভালো লেগেছিল। মায়মুনাকে হাসিব প্রথমে নিয়ে যায় গান শেখাতে। সেখানে শুরুর দিকে কিছু শেখার পর ভর্তি করে দেয় ছায়ানটে। মায়মুনার কণ্ঠস্বর থেকে এলাকার উচ্চারণের টান সরে যায়, আর খসে যায় ‘মায়’। আর কী করে অল্পতে সুন্দর করে সাজতে হয়, শাড়ি পরতে হয় শিখে নিয়ে আগের মায়মুনাকে সে বিলকুল মুছে দেয়।

হাসিব স্বীকার করে মায়মুনা বা মুনা, আসলে এমন পরিশুদ্ধ মানুষ হয়ে উঠেছিল, যে হাসিবই আর তার সঙ্গে তালে লয়ে যেতে পারছিল না। হাসিব মাঝে মাঝেই মদ গাঁজা খেত, বিশেষ করে গাঁজা। মদ ভালো মানে বিদেশি হলে খেত শুধু। এসব মুনা তার সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার পরে জানতে পারে, যদিও এর ভেতরে মুনার জন্য হাসিবের টান কতটা―নানান ঘটনায় মায়মুনার আর কোনও সন্দেহ থাকে না। মুনা ধরেই নিয়েছিল, ভালো অনেক কিছুতে হাসিবের এত রুচি―এসবের পাল্লা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু দেখেছে গাঁজাটা ছাড়তেই পারছে না। এছাড়াও মুনা হাসিবের কথাবার্তা নিয়ে আপত্তি শুরু করে। ঢাকাইয়া টানে ‘অরে জিগা’, ‘কস না ক্যানবে’, ‘আবার জিগায়’―এসব একদম আর পছন্দ করতে পারত না। কথায় কথায় ‘হালা’, ‘হালায়’ বলা। অসহ্য লাগত। বিশেষ করে অপরিচিত লোকের ফোন এলে, হাসিব ‘হ্যালো’র বদলে ‘হালায়’ বলাতে অন্যরা যেখানে হেসে গড়াত, মুনার রাগে গা জ্বলত।

বুঝছ আয়নুল ভাই, যার জন্য করি চুরি হেই কয় চোর! খ্যাত চালায় ব্যাত!

এম এ শেষ করার পরই মুনা চলে যায় হালুয়াঘাট। তারপরই ময়মনসিংহে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিও হয়ে যায়। হাসিব দেখত মুনা ফোনে প্রথমে অল্প কথা বলত, সেটা আরও কমে আসতে থাকে, পরে একদম কথা বলতে চাইছে না, এরপর ফোন করলে ফোনই ধরত না। এদিকে হাসিবের বাবা তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন, হাসিব কিছুতেই এই সময়ে বিদেশে যাবে না। বন্ধুবান্ধব গিয়ে বাসায় ওর বাপকে বোঝায়, হাসিবের কোনও ক্ষতি হবে না, শুধু তাকে একটু সময় দিতে হবে। মুনার কথা ওর বাপমা জানত কিন্তু হাসিব যে ওর জন্য একেবারে পাগলাদিওয়ানা এসব জানত না। হাসিব বাপমায়ের সঙ্গে ততটা খোলামেলা ছিল না কোনও কালেই।

হাসিবের বড় ভাই রাকিব আরও সাত বছর আগে দেশ ছেড়েছে। সিডনি থেকে বার বার ফোনে ইমেইলে হাসিবকে বলছে চলে আসার জন্য। বলেছে, এসে কিছুদিন দেখ, যদি ভালো লাগে তো, নইলে আবার ফিরে যাবে। তাও হাসিব রাজি হয়নি।

হাসিব বলছিল, ভাইয়া তো এলাকায় পার্টি করত। দিনরাত বিপ্লবের স্বপ্ন দেখত। তারপর পার্টি ভেঙে গেল। বিপ্লবের ঘোর কাটল, আর বলতে গেলে কোনও মাত্র দেরি না করে সে চলে গেল অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে টিকে থাকার জন্য জানবাজি দিতে হয়নি। হাসিবের চেয়ে অনেক মেধাবী ছিল রাকিব। পড়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই গণিতে মাথা পরিষ্কার। স্কুলের আসগর স্যার অন্যদের বলে বেড়াত, এ ছেলে গণিতে লেগে থাকলে র‌্যাঙ্গলার হবে একদিন। যদি এ ছেলে পথে থাকে তো ওর জায়গা কেমব্রিজ। রাকিব ততদিনে সমাজবদলের নেশায় মাতাল। এম এ-তে এত কিছুর ভেতরেও প্রথম শ্রেণি পেয়েছিল। একবার জেলেও গিয়েছিল এরশাদের সময়। পার্টি ভেঙে গেলে মনটা কতটা ভেঙে গিয়েছিল রাকিব কোনও দিন কাউকে বলেনি। কেবল বলেছিল নাকি,  বাইরে বেরুলে মনে হয়, তাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করছে। যদিও হাসিবের মতে এটা ভাইয়ার নিজে নিজে ধরে নেওয়া বানানো ধারণা। তার সম্পর্কে এলাকায় কারও কাছে তেমন কিছু শোনেনি। আর কিশোরগঞ্জ শহরের কথা বাজিতপুরেও খুব আসত না তখন। আর ততদিন বাবার বদলির জন্য পুরান ঢাকায় চলে এসেছিল। গাঁজায় দম দিতে দিতে নেশায় পেলে হাসিবে কথায় ঢাকাইয়া চলে আসে।

সেভেন এইট নাইন টেন। পাকনা হওয়ার পুরো সময়টায় আমরা ছিলাম রায়সা বাজার। তবে ভাই প্রেমফ্রেমের চিপায় পড়ি নাইক্যা। জমাইন্যা ফ্রেন্ড কয়েকটা থাকলে আর প্রেম লাগেনি।

ভার্সিটিতে আইসা ফাঁইসা গেলি যে!

লোনলিনেস। কোন হালায় য্যান কইছিল, হয় প্রেম, নয়তো ঈশ্বর―লোনলিনেসের নিট ফল! ভার্সিটি তো ভালো লাইগ্যা গেল। হলে থাকনের এমন চান্স! ছাইড়া দিমু! আমার ফ্রেন্ডদের মধ্যে দুইটা মাত্র চান্স পাইল ঢাকা ভার্সিটিতে, আর আমি আইলাম এইহানে। এটাই তো কী কমু এক্কেরে গ্রাম, জঙ্গল কইলে আরও ভালো হয়। ঢাকার অরা কয় কিন্ডারগার্টেন। কেন জানি, এখানে কারও লগে জমার আগেই মুনার লগে জইমা গেল। ওর চক্ষুর ভিত্রে কী আছে আমার খোদায় জানে। একদম ডুইব্যা গেছিলামগা, তাও হালায় পরথম দিন থেইক্যাই।

তুই শালা মুনার জন্য অন্তত ঢাকাইয়া টানটা ছাড়তি।

দুরো হালায় অয় গেচে গেচে! তুমি আমাকে বাঁচাও ভাই।

বাঁচাইতে পারি। আমার কথা মতো কাম করতে হইব!

আল্লার কসম, যা কইবা হুনুম।

চল পাতারঘাট যাই।

পাতারঘাট ? হেইড আবার কোথায় ?

তোর অত জানা লাগবে না। তুই শুধু যাবি আমার সঙ্গে। ওকে ?

অক্কে!

আমি বলেছিলাম, তুই এই নেশাটা ছাড় ভাই আমার। আমি যেমন বলতাম, নানান কিছু দিয়ে বোঝাতাম। যদিও জানি, সব ছাড়া যায়, গাঁজার নেশা ছাড়া বোলে সবচেয়ে কঠিন। কোন্ কোন্ দেশে তো বলে গাঁজাকে বৈধও করে দিয়েছে। হাসিব কার কাছে শুনেছিল, বেশি করে দুধ খাবি, তাইলে কিছু হইব না। খাওয়া-ঘুম ঠিক রাখবি। আর কোনও অত্যাচার শরীরে করবি না, দেখবি কিচ্ছু হইব না। হাসিব তা-ই মানে। আর ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই। চোয়াল পর্যন্ত ভরাট। চাপাচুপা কোনও কিছু ভাঙেনি। কোনওভাবেই রোগা বলা যাবে না। বরং টানটান শরীরে পেটান একটা ভাব আছে।

কঠিন, কিন্তু অসম্ভব তো নয়। অসম্ভব ভাবলেই অসম্ভব। সম্ভব ভাবলে অনেক অসম্ভবও সম্ভব।

তুমি যে এত্ত সহজে এত্ত কঠিন কথা ক্যামনে কও! লাভ ইয়ু ভাই।

পাতাঘাটায় গিয়ে আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না আসলে হাসিবের জন্য কিছু করতে পারব কি না। আমার ইচ্ছা ছিল স্রেফ ওকে একটা নতুন জায়গায় নেওয়া। হাওয়া বদলে রোগ সারে―আগে লোকে খুব বলত। আমি নিজে দেখেছি, শুধু রোগই না, মনও চাঙ্গা হয়। আমি মন খারাপ হলে দূরপাল্লার কোনও বাসে উঠে পড়ি। যেমন বাংলাবাজার থেকে তেমন কোনও বাসে উঠে ধামরাই চলে আসি। কখনও মানিকগঞ্জ। বা চলে যাই গাজীপুরের দিকে। গাড়িতে জানালার পাশে একটা বসার জায়গা পেলে আর কিছু লাগে না আমার। যেতে যেতে মন-মাথা ফাঁকা হতে থাকে। আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়, যখন দেখি মাথা পুরো ফাঁকা। কোনও চাপ নেই। একদম হালকা হয়ে গেছি। এমনটা বহু আগে হঠাৎ একদিন হয়েছিল সিনেমা হলে ঢুকে। সে-সময় সিমনিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আসলে সিমনি আমার কাছে কী চায়! আমাদের মধ্যে তেমন কোনও সম্পর্ক তৈরি হয়নি। একই ব্যাচে পড়তাম। সিমনিই হঠাৎ করে আমার সঙ্গে মিশতে শুরু করে। নিজে থেকে ডেকে চা খেতে নিয়ে যায়। আমি আগে কখনও কোনও মেয়ের সঙ্গে একদম আলাদাভাবে ঢাকায় এসে সিনেমা দেখিনি। ও-ই টিকিট কেটেছিল। তারপর আবার সিনেমা শেষে খাওয়াতে নিয়ে যায় কেএফসিতে। সেখানে আমাকে টাকা দিতে দেয় না। আমার দিক থেকে একটাই করেছিলাম, সেদিন সিমনিকে ওর বাসা মানে মীরপুরে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। এ-ই। সেদিন ফিরে আসার সময় জানি না সিমনির জন্য আমার প্রেম পেতে শুরু করে! ঠিক প্রেমও না। কী যেন একটা! বুঝতে পারছিলাম না। তবে আগের অস্বস্তিটা কেটে গিয়ে নতুন একটা অস্বস্তি শুরু হয়। বুকের ভেতর মজার একটা ব্যথা কী যে ভালো লাগতে শুরু করে! সিমনির সঙ্গে আমি ভার্সিটিতে ঘুরতে শুরু করি। এর ভেতরে লাগে দুই ছাত্রসংগঠনে গণ্ডগোল। ভার্সিটি বন্ধ হয়ে যায়, আর সিমনি হঠাৎ করে বলা কওয়া নেই আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ঠিক সেই সময়ে আমি সিনেমা হলে ঢুকে হঠাৎ সিনেমা একটা দেখি। বাংলা সিনেমা নাচে গানে ভরপুর। রূপের রাণি, চোরের রাজা। দেলওয়ার জাহান ঝন্টুর ছবি। সিনেমা দেখে সেদিন মন পুরো ফাঁকা, মাথা ফাঁকা। মনে হয় বেরুনোর পর পরই আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে নিজের নামটাও ঠিকমতো বলতে পারতাম কি না। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব উধাও হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল আমি নিজেই উধাও। আমার নিজের কোনও শরীর নেই। একটা কাটামুণ্ডুর মতো ভাসতে ভাসতে বেরুচ্ছিলাম সিনেমাহল থেকে। ওই শেষবারের মতো কোনও সিনেমা হলে যাওয়া। আর কখনও হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয়নি। আর হাতের কাছে যে ক’টা সিনেমা হল ছিল দুমদাম বন্ধ হয়ে সুপার মার্কেট হয়ে গেছে। গুলিস্তান সিনেমা হলের জন্য বুকটায় জানি এখনও চিনচিন করে।

কিন্তু সেদিন থেকে আর নিজের মন খারাপ হওয়ার কোনও সুযোগ দিই না। কিছু একটা নিয়ে মাথায় মনে চাপ হলেই দাও ছুট। নিজের মতো একটা গান বলি, সুর বলি, বেজে ওঠে―দূরে দূরে দূরে কোথাও/ যাও ছুটে যাও।/ হারিয়ে যাও/ নিজের কাছ থেকে যাও দূরে। ফলে, আমি হাসিবের বেদনাটা নিজের মতো করে কিছু টের পাই। আর এজন্য আমার কৌশলটা আমি হাসিবের ওপর খাটাতে চাইলাম। আর সেও একটু মরিয়া ছিল ওই দশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। চাইছিল কেউ হাত বাড়াক। আর সে ওই হাতটা ধরে উঠে আসুক। আমি নিজে একটা সহজ নিয়ম জানি: না কান্দিলে মায়েও দুধ দেয় না। ফলে চাইতে হবে। চাওয়া ছাড়া পাওয়া নাই। এমনি এমনি হাওয়া থেকে পাওয়া হয় না। যারা পায় তারা ভাগ্যবান। আমি বা হাসিব সে ভাগ্য নিয়ে আসি নাই। চাইলেও তো পাওয়া যায় না। না-চাইলে তো প্রশ্নই ওঠে না।

হাসিব প্রথম প্রথম আমার সঙ্গে খুব মিশত। আমার রুমে খুব আসত। পরে মুনার সঙ্গে জমে গেলে আসা কমে যায়। বলতে কি আর ততটা রুমে আসত না। বাইরে চায়ের দোকানে, বিশেষ করে নুরু ভাইয়ের দোকানে যতটুকু দেখা হতো। দেখা হলে এমন করে করে কথা বলত যে প্রতিদিনই আমাদের কথা হয় দেখা হয়। আর একটা কাজ করত―হুট করে আমার চায়ের দামটা দিয়ে আবার হওয়া হয়ে যেত।

মুনার সঙ্গে প্রেমের সময়টা হাসিব খুব কম দিন আছে রাত দশটার আগে হলে ফিরত। আর যেদিন মুনার ছায়ানট থাকত, সেদিন তো কোনও ঠিক ঠিকানা ছিল না। ছায়ানটের দিনগুলোতে মুনাকে ঢাকায় পৌঁছে দিয়ে নিজে যেতে পুরান ঢাকায়। তার বাপ ততদিনে বনশ্রীতে বাড়ি করেছে। সেখানে না গেলে নিজের বাসায় খেয়ে ফের মুনাকে নিয়ে ফিরত ক্যাম্পাসে। ঢাকার নানান এলাকায় যেত, খেত, আর ঘুরত। হাসিবের বাড়তি সব টাকা জোগাত তার মা। নানার একমাত্র মেয়ে বলে পুরো একটা দোতলা বাড়ি পেয়ে গিয়েছিল মা।

পাতাঘাটা জায়গাটা এমনিতে তেমন কিছু না। নামই তো জানি না। অল্প একটু এলাকা। বাকিটা গ্রামের মতোই। তবে ঢাকা থেকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগে পৌঁছতে। যাওয়ার সময়ের বাইরের সিনসিনারিও বলে দারুণ। গেলে সেদিকে একবার ঘুরে আসতে পার। কার কাছে যে শুনেছিলাম। ব্যাংকে চাকরি হওয়ার পর প্রথম সেখানে যাই। তখনও বিসিএসের ভাইভা হয়নি। তারপর কলেজে চাকরি হলো। প্রথম মফস্বলে এলাম চিরদিন শহরে থাকা ছেলে। তখন একদিন ক্যাম্পাসে যাই। এমনিতে আর যাওয়া হয়ে উঠত না। ঢাকার দিকে ফিরতে হঠাৎ কী মনে করে নেমে পড়েছিলাম। তারপর আশ্চর্যজনকভাবে একদম ঢোকার মুখে হাসিবের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাও নাটকীয়ভাবে।

আমার হাতে সিগারেট ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে বলা নেই কওয়া নেই, ওই মিয়া ডাক দিয়ে আমার কাঁধে থাবা পড়ে। আমি চমকে উঠে ঘুরতে যাবে, তখনও পেছন থেকে রাগি গলায়, দেইখ্যা চলতে পারেন … বলতে আমি ঘুরে গেছি, হাসিব মুখোমুখি, একদম বোবা হয়ে যায়, তাও মুহূর্তকয়েক, তারপর প্রায় আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বলতে গেলে কেঁদেই ফেলে।

আরেক নাটকীয়তা ঘটে পাতাঘাটায় গিয়ে। সেটাও কম আজব ছিল না। যে দুমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের মতো হাসিবকে এনেছিলাম, ফেরার আগের দিন রাতে মনে হলো, সে একদম নতুন একটা সাদা কাগজের পাতা হয়ে গেছে। ঝকমকে ফকফকা টানটান।

অ্যামুজমেন্ট পার্ক থেকে ফেরার পর দুপুরে খেয়ে ঘুম। প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়, তখন জেগে দেখি ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। বাতি জ্বালাই। দেখি হাসিব নেই। বাথরুমেও নেই। বারান্দায়ও নেই। ফোন করলে দেখি ফোন বন্ধ। একটু চিন্তায় পড়ি। নিচে গিয়ে চাবি জমা দিয়ে আমি ভাবলাম একটু বেরিয়ে দেখি। তখন অভ্যর্থনা ডেস্কের ছেলেটা বলে, স্যার, ৩০৫ নম্বর না আপনি, আপনাকে বলতে বলেছে, হাসিব স্যারের আজকে ফিরতে একটু রাত হবে। চিন্তা যেন না করি।

আশ্চর্য। নতুন জায়গা। ও প্রথম এসেছে। এখানকার কিছুই তো চেনে না। বেতালের ছেলে না জানি কী বেতালে পড়েছে। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না ওর।

ক্যাম্পাসে দেখা হলে সেদিন বলেছিলাম, তুই তো পাস করে গেছিস, ক্যাম্পাসে কেন ?

হাসিব বলে, ক্যাম্পাস ছাইড়া দিসি, কিন্তু ক্যাম্পাস আমারে ছাড়ে নাইক্যা। ভাইভা দিয়াই হল ছাইড়া দিসি। কিন্তু মাইনক্যা চিপায় পইড়া গেছি!

সেদিন জানলাম, দোকানে দোকানে এত এত বাকি। ফলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। সেসব ধীরে ধীরে মেটাচ্ছে। প্রচুর টাকা সে খরচ করেছে মুনার পেছনে।

বলে, নাজিম ভাই কইত, ‘হাসিব্ব্যা এত পিরিত ভালো না। পিরিত ভেতরে রাখবি বেশি। ওপরে দেখাবি কম। তাইলে টিকব। নইলে ঘ্যাচাং!’ হালায়! নিজে কোনও মাইয়া মানুষের দশ হাতের ভিত্রে যায় নাইক্যা, হে আমারে পিরিত হিগায়!

আমি এলাকাটার এদিক ওদিক একটু ঘুরলাম। ভেবেছিলাম কোথাও চোখে পড়বে। পড়ল না। রাতের খাবার খাব ওর সঙ্গে এজন্য অপেক্ষা করছিলাম হোটলের রুমে।

দরজা খোলাই ছিল। হাসিব রুমে ঢুকেই বলে, কিছু মনে কইরো না। পরে কমু। বহুৎ খিদা লাগছে। চলো।

সত্যি বলতে কী, ঘরে যে-হাসিব ঢুকল তাকে একদম চিনি না। ওর চোখ মুখ থেকে যেন আলো বের হচ্ছিল। দুম করে একটা মানুষ এমন বদলে যেতে পারে! আগে কোনওদিন দেখিনি। নিজের বেলায় জানি, জায়গা পালটালে, হাওয়া বদলে মন ভালো হয়। কিন্তু এমন দিনের পর দিন ভোগা কোনও লোক এক নিমিষে বদলে যাবে! এটা একটু বিস্ময়কর ছিল।

খাওয়ার সময় এটা-ওটা কী সব বলল হড়বড় করে আধাখাওয়া মুখে নিয়ে চাবাতে চাবাতে ভালো বুঝলাম না। আমি কেবল ওকে দেখছিলাম, এ কোন হাসিব! রুমে এসে বলল, সে এখনই ঘুমিয়ে পড়তে চায়। পরের দিন সকালে উঠেই সে তাড়াহুড়া লাগাল, তাকে জরুরিভাবে ঢাকা ফিরতে হবে। আমি অবশ্য পাতাঘাটায় আরও একটা কাজ নিয়ে এসেছিলাম : আমার হবু স্ত্রীর বিষয়ে একটু খোঁজখবর। ইচ্ছা ছিল হাসিবকে নিয়েই যাব। কিন্তু হাসিব দুম করে চলে গেল।

এরপর আমিও নতুন কলেজে অনেক ব্যস্ত হয়ে যাই। পাতাঘাটায় যে-সম্বন্ধটা এসেছিল, সেটা এগোয়নি। এদিকে হাসিব চলে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। আর আমার কয়েকটা বছর কাটে এক রহস্যময় অনামির সঙ্গে। বলাবাহুল্য অনামির সঙ্গেও পাতাঘাটায়ই দেখা। সেবার তৃতীয়বারের মতো আমি গিয়েছিলাম ওখানে।

পাতাঘাটায় হাসিবের কী ঘটেছিল, সেটা জানার জন্য আকুল ছিলাম না। আমার একটাই চাওয়া ছিল : হাসিব ভালো হয়ে উঠুক। ওই বাজে দশা থেকে মুক্তি পাক। ভাঙা মনটা ওর জোড়া লাগুক। সেটা কতটা লেগেছিল তা জানি না, কেবল মনে পড়ে হাসিবের সেই উজ্জ্বল মুখ। কোনও একটা অন্ধকার ঘর হঠাৎ আলোয় আলোয় ভরে উঠলে যেমন হয়।

কীসে সমাধান হলো জানা হয়নি। হয়ত জানা হবে না। কেবল স্মৃতিতে রয়ে গেছে পাতাঘাটার সেই অখ্যাত হোটেল কক্ষে হাসিবের আলোয় ভরা মুখটার কথা।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares