বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : আমিষের গন্ধ : ফজলুল কবিরী

কলিজায় এভাবে কেউ দাগা দেবে মন্তাজ তা ভাবতে পারেনি। তার সিনার ভেতর উথালি-পাথালি অবস্থা। ক্ষোভে ফুঁসছে। গা কাঁপছে। ঘাম ঝরছে শরীর বেয়ে। মন্তাজের মাথা গরম। কিন্তু সে তা প্রকাশ করে অবস্থা আরও খারাপ করতে চাইছে না। একবার ভাবে ক্ষোভটা উগড়ে দিলে উচিত কাজ হবে। মাথা ঠিক রাখা সম্ভব না। কমিশনারের চামচা আকারে-ইঙ্গিতে কী অবলীলায় বুঝিয়ে দিল কত বড় চামারের সাথে এতদিন ঢলাঢলি করেছে। জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল মনে হচ্ছে। মুরগির ব্যবসায় নামডাক তার কম নয়। নগরজুড়ে কম-বেশি সাপ্লাই দেওয়ার হিম্মত সবার নজরে পড়েছে। দেশি-পাকিস্তানি-কচি-মাঝারি-টাইট-ঝুরঝুরা যেকোনও আইটেমের জন্য অর্ডার বানের স্রোতের মতো আসে। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। কখনও কল আসে। কখনও ডাইরেক্ট চলে আসে। মধ্যরাতে আসে। ভোরে আসে। সন্ধ্যায় আসে। সাপ্লাই চায়। দু-হাত উজাড় করে দেয়। ইজ্জতের সওয়াল সে কম বোঝে তাও নয়। বড় বড় পাবলিক খায়। খেয়ে আরাম পায়। নইলে তার কাছে ছুটে আসা কেন ? সে কি কারও পাতে ভাত তুলে দিতে দৌড়ায় ? কারও গায়ের কাপড় সেলাই করতে পিছু নেয় ? নাকি পাবলিকরে দেখাইয়া নিজে কোনও মুরগির গায়ের পালক খসাইতে গেছে ? কেউ তার গায়ে মলম মেখে মাসে মাসে মাসোহারাও নেয় না। নিজের গায়ের মলম সে নিজেই লাগায়। নিজের ঝাল নিজেই মেটায়। পৈতৃক ব্যবসা না এইটা। অনেক মেহনত করে দাঁড়াইছে। হকের ইনকাম। ইমানদারি ছাড়া এই লাইনে ভাত জুটত না। সেই শৈশব থেকেই তো দেখে আসছে বিজেনেসে ঠিকমতো দাঁড়াতে গেলে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। দুই নাম্বারি ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা নেই। এরে ঠকাও। ওরে নামাও। দু-হাতে পকেট ভারী করো। কিন্তু তার বুকের পাটা কম ছিল না। দাঁড়িয়ে গেছিল স্রোতের সাথে যুদ্ধ করতে করতে। এখন হাতে ভার বেড়েছে। কাঁধে নিতে হয়েছে এই দায়িত্ব। সামলানোর দায়ও তার। কখনও কখনও বড্ড ভারী ঠেকে। অবশ অবশ লাগে। হিমশিম খায়। সে হাল ছাড়েনি। রাতদিন খাটে। ঘুমের মধ্যেও অর্ডার নেয়। সাপ্লাই সামাল দেয়। স্বপ্নের ভেতর ডাক আসে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। ওপাশ থেকে কেউ শান্ত স্বরে বলে, কচি দেখে পাঠাইয়া দে কমিশনার সাহেবের আস্তানায়।

তারপর কোনও কিছু বলার সুযোগ পায় না। লাইনটা কেটে যায়। মাঝেমধ্যে ধন্দে পড়ে। কীভাবে এতসব ঠ্যালা সামলায় বুঝতে পারে না। নিজের কাছেই ধাঁধা মনে হয়। পাবলিক এত মুরগি গলা দিয়ে কীভাবে ঢুকায় তা নিয়ে কৌতূহল কখনও কাটে না ।

কমিশনারের সাথে খাতিরের লাইনটা বহুদিনের। লোকটার নরম আর কচি মুরগির প্রতি গভীর টান। ক’দিন পরপর টাটকা আর ভেজালমুক্ত আমিষের জোগান দেওয়া মন্তাজের জন্য ফরজ।

মন্তাজ সিনা বরাবর ডান হাতটা এনে কী মনে করে আবার নামিয়ে ফেলে। গায়ের ইস্ত্রি করা শার্ট থেকে সেন্টের ঘ্রাণ নাকে নেওয়ার চেষ্টা করে। কমিশনারের আস্তানায় অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে। গায়ের সুগন্ধি নাকের কাছে এসে ফের কোথায় হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। জায়গামতো এসে সবাই বিট্রে করছে তার সাথে। মুরগি পোড়া গন্ধ টের পাচ্ছে। গন্ধটা অসহ্য লাগে। পুরোনো রোগ নতুন করে মাথাছাড়া দিচ্ছে। চারপাশে এই পোড়া গন্ধ চক্কর মারে। হাঁটতে-বসতে পায়ের কাছে লেগে থাকে। ঘুমাতে গেলেও শান্তি নেই। নাকের কাছে ঘুরঘুর করে। এরকম পরিস্থিতিতে মন্তাজ বেশি বেশি সেন্ট মাখে গায়ে। বগলের তলে স্প্রে করে। কাপড়ের উপর ছিটায়। তারপর মুখ বোজে সেই গন্ধ নাকে নেয়। একটু আরাম পাওয়ার চেষ্টা করে। দেখা যায় ঠিক সেই মুহূর্তেই মোবাইলে রিং বেজে ওঠে। হোয়াটস অ্যাপে অর্ডার আসে। ইশারায় সব বোঝে ফেলে। অভ্যাস হয়ে গেছে। বিরক্তি নিয়ে বিষয়গুলো সামাল দেয়। সাপ্লাইয়ের হিসাব করে। তারপর ক্লান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে বিছানায় নিয়ে যায়। একা একা ছটফট করে। বউয়ের ঝামটা আর ষোড়শী মেয়ের মুখটি একবার স্মরণ করে। পরিবারকে বুকে আগলে রাখার ইচ্ছাটা প্রবল হয়। এভাবে পালিয়ে পালিয়ে কাটানো অস্থির জীবনটাকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হয়। একসময় ক্লান্তি তাকে ঘুমের ঘোরে টেনে নেয়। ঘুম নয়, যেন পুনরায় জাগরণ। আরেক চক্করে পড়ে যায়। ঘুমের মধ্যে সেই গন্ধ আবার হানা দেয়। পোড়া গন্ধ জড়িয়ে ধরে। স্বপ্নের মধ্যেই ধড়ফড় করে ওঠে বসে। দেখে মোবাইলে রিং বাজে। ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠে কেউ একজন বলে, মুরগি দিয়ে যাও। ডিসি সাহেবের আবদার।

 টাইট মুরগির ঝোল দিয়ে ডিনার। মন্তাজের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন ভাঙে না। রাত-বিরাতের ফারাক মাথা থেকে ছুটে যায়। সে দৌড়ায়। মুরগির পেছনে দৌড়ায়। কোত্থেকে এত কচি জিনিস জোগাড় করবে বুঝতে পারে না।

মাথার ভেতর মুরগির ডাক শোরগোল তুলতে শুরু করে … কক … কক … কক …

মন্তাজের মাথা ধরে। লেবু দিয়ে কড়া করে চা খেতে ইচ্ছা করে। মাথার রগগুলো ফুলে ওঠে। নিজের উপর কন্ট্রোল থাকে না ইদানীং। বয়স তো কম হয়নি। তবু তার ভেতর একটা অস্থির তেলাপোকা ঘুরপাক খায়। সারাগায়ে বোটকা গন্ধ নিয়ে তেলাপোকার মতো ছটফট করে।

কমিশনারের ছ্যালার ডাকে মন্তাজের স্বপ্ন ভাঙে। মন্তাজ সহসা উঠে দাঁড়ায়। মুরগি পোড়া গন্ধটা আবার নাকে আসে। সামলে নিয়ে উত্তর দিতে তৎপর হয়। আড়ষ্ট কণ্ঠে কী বলে তা নিজের কাছেই পষ্ট হয় না।

কমিশনার সাহেবকে কী মধু খাওয়াইছ তা তুমি জানো। তারপর একটু থেমে পুনরায় মন্তাজের কানে লোকটার কথা ভেসে আসে, মাথা ঠাণ্ডা রাখো। ভেজালে যেও না।

মন্তাজ চুপ করে থাকে। শব্দগুলো কানে বার বার ধাক্কা মারে। ঘেন্না লাগে। ব্যবসাটাই সে আর করতে চায় না। মন থেকে চায় ছেড়ে দিতে। মুরগির ব্যবসা তাকে অনেক দিয়েছে সত্যি বটে। নিয়েছেও তো কম না। বউ-বাচ্চার মুখ না দেখে কাটিয়েছে দিনের পর দিন। কোনও কিছু যে আর আগের মতো হবে না তারও প্রায় নিশ্চিত। কোথাও কোনও নিশ্চয়তা নেই। যেই জেদ বউ মাগিটার, একা থাকা যখন শিখে গেছে, আর ফেরান যাবে না। মেয়েটার জন্য মাঝেমধ্যে মন কাঁদে। নিজের কাছে রাখতে না পারার দুঃখ বুকে আঘাত করে। মেয়ের দেখাশোনা কিংবা যত্নআত্তিতে গলদ না রাখার চেষ্টা যে করে না তা নয়। হয়তো তার মন-মেজাজে এসব ঠিকমতো আসে না। কত বছর বাপ ছাড়া কাটিয়ে দিল। তবু মন্তাজ মেয়েকে আগলে রাখে। বউ আর মেয়ের দেখভালে কোনও ত্রুটি রাখেনি। স্বামীর সাথে এক ছাদের নিচে থাকে না বউ। কিন্তু টাকার গর্তে ঠিকই পা নামায়। এতকিছু নিয়ে তার ভাবনা পোষায় না। নিজের সুখ সে নিজেই কুড়ায়। তার আহারের অভ্যাসও আর দশটা মেন্দা মারা পুরুষের মতো না। বহুকাল আগেই রুচি পচে গেছে। বউয়ের কী দোষ। তারপরও ভাবে, তীব্র জেদ আর গোয়ার্তুমি তাকে এত বড় রাস্তায় এখনও ঢলে পড়তে দেয় নাই। কিন্তু আর পথ পাড়ি দিতে মন সায় দেয় না। চারপাশে খালি মুরগি আর মুরগি। মাঝেমাঝে মনে হয় শুধু কমিশনার কেন, নগরের মানুষের কলিজার মধ্যে সে মধু ঢুকিয়ে দিয়েছে। সবাই ছুটে আসে। কিন্তু কমিশনারের বিষয়টা আলাদা। বহুদিন ধরে বুকে আগলে রেখেছে তাকে।

ফলত কানে খালি বাজতে থাকে ভেজালে যাওয়া যাবে না। যাকে একবার ধরে, মুরগির নেশা তাকে আর ছাড়ে না। আমিষের গন্ধ দিনরাত তাড়িয়ে বেড়ায়। এমন নিষ্ঠুর টোপ দিয়ে তার ব্যবসাটাই গিলে খাবে এটা তার কল্পনারও অতীত ছিল। মাথাটাই খারাপ করে দিয়েছে। একরোখা স্বভাব একবার বলে সহজে হাল ছাড়বে না। ভেতরের অন্য মানুষটি বলে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে। খোদ এমপি সাহেবের আহার। ইলেকশনের প্যারা নিয়ে যে জটিল অবস্থা গিয়েছিল, সেই ঘাম এখনও শুকায়নি। নতুন করে আবার পেরেশানি নেওয়ার ধকল তার শরীর নিতে পারবে না।

মাল বড়। আহার বড়। পাশার দানও বহুগুণ বড়। এই পাওয়ার সামলানোর ক্ষমতা তার নেই। দানের গুটি হয়ে উলট-পালট খেয়েই জীবন পার হয়ে গেল। একটা দফারফা আসলেই কি করে ফেলবে হারামির বাচ্চার সাথে ? নাকি এর প্রয়শ্চিত্ত করে যেতে হবে জীবনভর! মন্তাজ কঠিন প্রতিজ্ঞা করে মনে মনে। এইবার সামলে নিতে পারলে আর পেছনে ফিরে তাকাবে না। পালিয়ে যাবে লোকচক্ষুর আড়ালে। কমিশনারের হাতের নাগাল থেকে অনেক দূরে। কেউ তাকে চিনবে না। কারও পেছনে লুকিয়ে থাকতে হবে না।

শরীরের ঘাম ঝেড়ে মন্তাজ বেরিয়ে আসে অসহ্য নরক থেকে। নিজে বহু কুকীর্তির দোসর হয়েছে ঠিকই, বরাবরই একটা যাতনা নিয়ে ফিরে আসে। এখন জগৎ-সংসারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় এমন একটা খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়।

কানের কাছে খালি বাজতে থাকে ফ্রেশ চাই। একটা লম্বা কাঁটা গলায় আটকে গেছে। বেহিসেবি জীবনের অভিশাপ এতদিন পর এভাবে পিষে ফেলবে ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসেনি। পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। ছাইভস্ম হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।

ইনিয়ে-বিনিয়ে শেষ পর্যন্ত বিষাক্ত সাপটি যে ছোবল মারল তারপর নিজের দুনিয়ায় সে আর নেই। মাথার উপর বোমা ফেলে কেউ তাকে নিয়ে তামাশা করছে। এতবড় স্পর্ধা ? কী অজুহাতে আত্মজাকে ওদের হাতে বলিদান দেবে এটা ভাবতে গিয়ে তার নিরক্ষর বুকে চাপা কান্না ভর করে।

অসংখ্য কচি মুরগির চিৎকারে তার মাথার ভেতর থেকে এতদিনের জমান মগজ ধীরে ধীরে গলে পড়তে শুরু করে।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares