বাংলাদেশের ১৫ লেখকের নতুন গল্প : ডুমুর পাখির মাংস : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

মানুষের সারিকে মনে হচ্ছিল মিছিলের মতো। হাজার মানুষ কিংবা তার চেয়ে বেশি। ওদের গন্তব্য একটা রেস্তোরাঁয়। আমরা রেস্তোরাঁ শুনতে অভ্যস্ত না। হোটেল বরং চেনা ও কাছের শব্দ। তবে আমি এই গল্পে রেস্তোরাঁ শব্দটাই ব্যবহার করব।

মানুষের ভিড় সেই রেস্তোরাঁতেই থাকে যেখানে পাওয়া যায় স্পেশাল কিছু। এই রেস্তোরাঁটা তাই। অথচ  ঢোকার দরজাটা এত সরু যে পাশাপাশি তিনজন মানুষ একসঙ্গে বের হওয়া যায় না, ঢোকা যায় না। ভেতরে দশটা টেবিল বসানোর জায়গা। এক টেবিলে বসতে পারে ছয়জন। ষাটজন মানুষ খেতে পারে একসঙ্গে। কাজ করে দশজন ওয়েটার। বাড়িতে নিয়ে খাওয়া নিষিদ্ধ। অর্থাৎ বাইরের চেহারা একেবারেই আহামরি কিছু না। এমনকি কোনও নাম নেই। দোকানের নামের জায়গাটা সাদা যেন মকবুল অপেক্ষা করছে, কেউ এসে সুন্দর একটা নাম দিয়ে যাবে। মহল্লাটাও আভিজাত্যহীন। অথচ যে সরু গলির মাঝামাঝি রেস্তোরাঁটা আছে সেই গলিতে গাড়ির ভিড়―দামি থেকে শুরু করে কমদামি, সব ধরনের। রিকশাতেও আসছে মানুষ। হেঁটে আসছে। অনেক রোদ। দুপুরটা তেতে আছে। ঘাম পড়ছে টপটপ। মোটা টাকমাথার একটা ছেলে বলছে, এসি থেকে বের হয়ে পারলাম না আর সাথে সাথেই এই অবস্থা, বলতে বলতে টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে কপাল মুছল। তারপরও এই ভিড় থেকে বের হওয়ার কোনও তাড়া তার ভেতরে দেখা যাচ্ছিল না।

আরেকজন হাতে মুঠো করে ধরে আছে টাকা। পোশাক দেখে মনে হয় নিজেকে সে অযত্ন করে অথবা নিজের যত্ন নেওয়ার আর্থিক সংগতি তার ভেতরে নাই। হয়তো বেশ কয়েকদিনের কাজের টাকা নিয়ে এসেছে এই রেস্তোরাঁয় খাবে বলে।

জুটি ধরে এসেছেও অনেকে। তাদের চোখেমুখেও ক্লান্তির ছাপ নেই। এর ভেতরে দু’জন রাতের লঞ্চে এসেছে, সকাল ৯টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক পেছনে পড়েছে ওরা।

এই রেস্তোরাঁটা কার এটাই বলা হয়নি। শেফ থেকে শুরু করে মালিক একজনই। লোকে তাকে মকবুল নামেই চেনে। মকবুল নামটা ঠিক ফ্যান্সি না। শুনে মনে হয়, অনেক আগের দিনের কারও নাম, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা নামেমাত্র, আর থাকলেও গ্রামের কোনও বোকা ছেলে। কিন্তু এই মকবুল শহরের তারকা হয়ে উঠবে এটা কয়েক বছর আগে মকবুলকে বললে সে নিজেও বিশ্বাস করত না।

ডুমুর পাখির মাংসের রেসিপি যেদিন তার হাতে এল সেদিন থেকেই সব বদলে যেতে শুরু করল। তবে এই রেসিপি সে কীভাবে পেল, এত এত ডুমুর পাখি কোথা থেকে এল, এই রহস্য সে কারও কাছেই বলে না।

আমরাও সেই রহস্য সন্ধানে যাব না। আমরা বরং মকবুলকে নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করব, যেটা আপনাদের কাছে গল্প মনে হতেও পারে, নাও হতে পারে।

দুই

মকবুলের বয়স চল্লিশের ঘরে নাকি ত্রিশের ঘরে ঠিক স্পষ্ট বোঝা যায় না। গল্পের জন্য বয়স বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও কী করে খুব সাধারণভাবে জীবন চালাতে চালাতে এক তরুণ অল্পদিনে কোটিপতি হয়ে উঠল সেটা বোঝার জন্য খানিকটা বলে রাখলাম।

মকবুল রেস্তোরাঁ দেওয়ার দু’বছর আগেও মিটফোর্ডের সামনে রাস্তায় শিঙাড়া আর সমুচা বিক্রি করে চলত। বলাটা বাহুল্য তার শিঙাড়া আর সমুচাতেও ম্যাজিক ছিল। তবে ওটা বিক্রি করে কয় পয়সা আর লাভ হতো ?

লাভ না হোক, তাতে কি জীবন থেমে থাকবে ? মকবুল বিয়েও করেছিল। ছোট্ট একটা সংসার। দৃশ্যত কোনও ঝামেলা নেই।

কিন্তু স্বপ্ন ছিল মকবুলের। খুব বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন। এমন স্বপ্ন দেখেছিল তার বাবা-মা। আপনি এমন কাউকে খুঁজে পাবেন না, যে তার সন্তানকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখে না। তবে মকবুলের ব্যাপারটা সামান্য আলাদা ছিল। যে তার কাছাকাছি এসেছে সে বলেছে ছেলেটা আলাদা। গ্রামে থেকে কী করবে ? শহরে যাও।

শহরে এল সে বিশের পর। পড়াশোনার ব্যাপারটা ধরবেন না। ওটা উহ্য থাক। তবে উহ্য থাকলে কী ? ওর জীবনটা কঠিন হয়ে উঠল। সবার কাছে প্রতিভাবান শুনে শুনে মকবুল ভাবত তার পক্ষে সবই সম্ভব। অথচ নিদেনপক্ষে একটা চাকরি জোগাড় করাই হয়ে উঠেছিল ভীষণ কষ্টকর। তারপর একদিন আচমকাই গ্রেগর সামসা এসে ভর করল মকবুলের ওপর। অবশ্য ঠিক সামসা নয়, সামসার রূপান্তর ঘটেছিল মানুষ থেকে প্রাণীতে। আর আমাদের মকবুল এক সকালে আবিষ্কার করল সে খুব ভালো রান্না করতে পারবে। শুরুটা হয়েছিল সামান্য এক ডিমভাজি দিয়ে।

তিন

এমন পাখি কেউ দেখেনি কোনওদিন। কখনও দেখে মনে হয় খুব সুন্দর কোনও মাছরাঙ্গা, কখনও কাঠঠোকরা, কখনও শালিক। মিনিটে এরা চারবার রূপ বদলাতে পারে। তবে বদলাবেই এমন কোনও কথা নেই।

বহু গবেষণা আর হৈ চৈ-এর পর জানা গেল বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোতেই আবির্ভাব হয়েছে এদের। মেলবোর্ন থেকে একদল পাখি বিশারদ এসে ওদের নিয়ে গেল, পাখিগুলো হারাল তাদের চরিত্র।

নাম দেওয়া হলো ডুমুর। ডুমুর ফুলের মতো অদৃশ্য নয়, রীতিমতো দৃশ্যমান। আর আমরা সেই শহরের সবচেয়ে গর্বিত বাসিন্দা, যে-শহরে পাওয়া যায় ডুমুর পাখি। ওদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে শহরের ঘরের জানালায় জানালায় দেখা যেতে থাকল তাদের। এমনকি এটাও দেখা গেল একই পাখি একজনের সামনে হয়ে থাকছে মাছরাঙ্গা, আরেকজনের সামনে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে টুনটুনি। ক্রমেই ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়ে এল। এমন কিছু যেটা কখনও ছিল না সেটা খুব সহজে মিশে গেল মানুষের জীবনের সঙ্গে। এরপরই দৃশ্যপটে আবির্ভাব হলো মকবুলের। মকবুল একদিন ঘোষণা দিয়ে বলল, ডুমুর পাখির মাংস সে খাওয়াবে সকলকে।

শুরুতে মিটফোর্ডের সামনে পরীক্ষামূলকভাবে বসল। ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। এরপর হলো কী, ঐ কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের মতো কাহিনি। আসল ও আদি মাতৃভাণ্ডারের রসমালাইয়ের মতো অনেকেই ডুমুর পাখির মাংস রান্না করা শুরু করলেও মকবুলের মতো করে কেউ পারছিল না। আগেই বলেছিল, মকবুল আলাদা। তাই পুরান ঢাকার সরু গলিতে তার চেয়েও মলিন একটা দোকান নিয়ে সে বসল। এত এত সুনামের পরও দোকান আধুনিক করার ব্যাপারেও সে ছিল উদাসীন। ব্যক্তি মকবুলকে চেনা না-থাকায় সেই মনোজগতে ঢোকার সুযোগ আমার নেই, তবে আপনাদের যেহেতু কেবল ঘটনা বলছি সেহেতু এতটুকু তথ্য দিয়ে রাখা যেতেই পারে।

চার

ডুমুর পাখির মতো পাখিকে মানুষ হত্যা করে কি আগ্রহ নিয়ে খায়। এত সুন্দর, এত মায়াময়, এত রহস্যঘেরা; তারপরও মানুষের জিহ্বার কাছে তার যেন কোনও দামই নাই। মকবুল রান্না করে, শিকার করে, ঐ পুরো ট্র্যাডিশনটা চালু করল কিন্তু নিজে কখনও খেয়ে দেখে না। একেকটা পাখি যখন হাতে ধরা পড়ে এবং চুলায় উঠে যায় তখন মকবুল তাদের জন্য কাঁদে। এই কথা শুনে লোকে হাসবে। অথবা বিশ্বাস করবে না।

তবে কথাটা লোকেরা না-শুনলেও এই কথা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এরকম একটা বিপন্ন প্রাণীকে এভাবে হত্যার শিকার হতে দেওয়া যায় না। যেহেতু এই বিষয়ে আইন নেই আর ডুমুর ঠিক বিপন্ন প্রাণীর শর্তগুলোও পূরণ করে না তাই হালে পানি পেল না। ওসব কথার সঙ্গে মকবুল কিন্তু আবার একমত। ঠিকই তো, এরকম আনকোরা একটা পাখি, এদের এভাবে মেরে ফেললে হয় ?

আইন নেই, তবে আইন হবে না এমন কোনও আইনও তো নেই। আন্দোলনে ক্রমেই মানুষ বাড়তে শুরু করল। কেউ কেউ অবশ্য এমন বলল, যারা আন্দোলন করে তারাও ডুমুর পাখির মাংস এসে খায়। তাতে আন্দোলনের খুব একটা ক্ষতি হলো না। এই হাসাহাসির আন্দোলন ক্রমেই সিরিয়াস হয়ে উঠল যখন ভার্সিটি পড়ুয়া এক ছেলে মাংস খেতে গিয়ে পদতলে চাপা পড়ল। আর যায় কোথায় ? হৈ হৈ হৈ …

আমরা ভেবেছিলাম মকবুলের দোকান ছেলেপেলে ভেঙেই ফেলবে। কিন্তু না, সেটা হয়নি, তবে আদালতের নজরে ব্যাপারটা এল, সংসদেও বিষয়টা উঠল। গবেষকেরা যখন জানালেন ছয় মাসে পাখির সংখ্যা কমেছে পাঁচ হাজার তখন আর বিষয়টা হেলাফেলার থাকল না। আইন পাস হয়ে গেল, ডুমুর পাখি শিকার ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ।  খবরটা শুনে খুশিতে মকবুল নফল নামাজ পড়ে ফেলল। নিরীহ প্রাণগুলো এবার বেঁচে যাবে।

পাঁচ

মকবুল ব্যবসার ধরন বদলাল। অর্থাৎ ট্র্যাডিশনাল রেস্তোরাঁর প্যাটার্নে চলে গেল। ভালো চলছিল সব। লাভ কমে এসেছিল, ভিড় কমে এসেছিল কিন্তু ক্ষতি কী ? জীবনে সুখ ছিল। অথচ একদিন তার বাড়ির দরজায় পুলিশ এসে হাজির।

আপনারা ?

আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।

নাটকীয়। বাংলা সিনেমার মতো। কিন্তু মকবুলকে গ্রেফতার করার প্রচুর কারণ তাদের কাছে ছিল। একটা কারণ হলো। প্রায় এদিক সেদিক ডুমুরদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। এত দ্রুত ওরা হারিয়ে যাচ্ছিল মনে হচ্ছিল ওরা যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে যাবে। আর এই শহরে মকবুল ছাড়া আর কে আছে যে পাখি হত্যা করতে পারে ? দ্বিতীয় আরেকটা কারণ হলো, মকবুলের দোকানে মুরগির মাংস খেয়েও কেউ কেউ এটা বলছিল, স্বাদটা পুরো ডুমুরের।

কোনও নিরেট প্রমাণ না-থাকার পরও মকবুলের জেল হয়ে গেল। মকবুলের শত অনুনয় কেউ শুনল না।

ডুমুর পাখির সঙ্গে মকবুল কিংবা আমাদের গল্পটা এখানেই শেষ। জীবন এরকমই।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares