ল্যাটিন আমেরিকার ১৫ লেখকের অনূদিত গল্প : জন্মানোর আগে : আগস্তো রোয়া বাসতস্ : অনুবাদ : উপল মুখোপাধ্যায়

যখন বললে এত দিন আগের কথা মনে নেই, কারও থাকেও না, এখন তো আর ছেলেমানুষির বয়স নেই। আমি চুপ করে যাই। তবে তা শুধু বাইরেই।

কথা বলার লোকই নেই, তুমি তো শুনতেই চাইলে না, কী আর করি নিজের সঙ্গেই কথা বলতে থাকি। বাজে না-হয় বকলাম না কিন্তু বাজে চুপ থাকা যায় কি ? মুখটা দেয়ালে ঠেকিয়ে নিঃশ্বাসের মতো নিজের বেরিয়ে আসা কথাগুলো বুঝতে চাই, চুনকামের স্বাদ নিই আর বেয়ে ওঠা খয়েরি ছোট ছোট আরশোলাদের একটু একটু করে দাঁতে কেটে ছেড়ে দিই। তারপর আরশোলারা দেয়াল বেয়ে ছাদের ওপর জমাট বাঁধা অভ্রান্ত মাকড়সার জালে ধরা পড়ে।

আর তুমি বল : কী গুজুর গুজুর করছিস। খালি এক কথা। বেহদ্দ বোকার মতো জীবনটা বরবাদ করবি। তোর বাবা যেমন গিটার গিটার করেই মরল। সে তবু একটা মরদ ছিল বটে। আর তোর কাজ হলো সারাদিন ফিসফাস করে হাবিজাবি বকা নয়তো অলক্ষুণে ড্রামটা পিটিয়ে লোকের কান ঝালাপালা করা। কবে যে থামবে এসব : কাজের কাজ করার কথা ভাব দেখি, ড্রামার হওয়া তোর কম্ম নয়, গান টানও না। ভগবান জানে কপালে কী আছে তোর। চুপ করে থাকি পাছে তুমি আঘাত পাও। তোমার চোখ দুটো নেকড়ের গা পেছলানো ব্যথার ধূসর রঙে ভরে যাক চাই না। ওই রঙ যেন রাস্তার পাশের বিষণ্ন ক্লান্ত গাছের যার পাতাগুলো কবে মরে, ঠাণ্ডা হয়ে, ধূলো পড়ে রোগে ধসে গেছে। শবযাত্রার বিষণ্ন পোশাকে তোমাকে মনে হয় ওই গাছ। তোমাকে আর জ্বালাব না বলেই চুপ থাকি। তাকাই তোমার ঠোঁটের দিকে―প্রার্থনার উচ্চারণে উঠছে পড়ছে আর আমিও ডুবে যাই সেই বিষণ্নতায়। যে জন্য তা সে শোকের মাত্রা কমেছে বটে কিন্তু কেড়ে নিয়েছে তোমার পোশাকের সব রঙ, সব হাসি। আরও চুপ থাকি যখন বাবার কথা ভাব। তখন তুমি কোনও কথাই বল না, ভেতরের নৈঃশব্দ্য ছেয়ে ফেলে তোমায়। আর সেই ফাঁকে আমি আবার কথা শুরু করি, তোমার চাউনি ভরসা দেয়, আমি ভরসা পাই সে দৃষ্টিতে।

মনে হয় বাবার মতো বড় হয়ে ঠিক বাবার মতো দেখতে হয়ে উঠছি, তোমার চোখের ভেতর দিয়ে যে বাবাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। কল্পনায় বাবার মতো গম্ভীর করি গলা যেন অবিকল একই শোনায়। প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করি আমার জন্মের আগের স্মৃতিগুলোকে, খুব কিছু মনে পড়ে না। কিন্তু সেগুলো কিছুতেই হারাতে দিই না যাতে তোমায় সেবারের মতো খেপে উঠতে না দেখতে হয়, তোমার চোখে ভালো সাজতে চাই। ওই স্মৃতি তোমায় ফিরিয়ে দিয়ে ভালো লাগাতে চেষ্টা করি যেন বড় পাখিটা তা দিয়ে দিয়ে ছোট ছোট স্মৃতিগুলোকে ফোটাচ্ছে। যখন স্মৃতিদের সঙ্গে একা হয়ে যাই, ওরা যখন অন্ধকারে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, এক গভীর অসহায়তা ছেয়ে ফেলে আমায়, ভয়ের নয়, বিরাট একাকীত্ব। বড্ড বেশি একা।

আগুনে ঝাঁপ দিতে আসা পোকাদের বোতলে পুরে নিয়ে আসি বিছানার অন্ধকার তলা থেকে। আরও খারাপ হয় তাতে, অন্ধকারের সবুজ ধারগুলো বোতলটাকে ঘিরে ধরে। স্মৃতিগুলো গুঁড়ি মেরে বোতলের পোকাদের খেয়ে শেষ করে, ঘুমোতে পারি না শুধু অপেক্ষা করি কখন ওগুলো ঠুকরে খেয়ে ফেলবে আমাকেও।

তুমি যখন গাধার পিঠে দুধ আর চিজ চাপিয়ে শহরে যাও, আমি আকাশের দিকে মুখ করে উঠোনে শুয়ে থাকি। সূর্যের মুখে সোজা তাকালে সব অন্ধকার হয়ে যায়, কিন্তু তার মধ্যেও সৈন্যদের আসতে দেখি, অ্যাকাশিয়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ওরা তোমার সঙ্গে তর্ক করে, আমি গুটিশুটি মেরে তোমার ভেতর ঢুকে থাকি, পালাতে পারি না। মানবে না জানি, এখানটা কিন্তু একদম অন্যরকম―গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতে কী যে ভালো লাগে যদিও ঘিরে থাকা স্মৃতির ভার বড় বিষণ্ন, বড়ই। ও নিয়ে আর কার সঙ্গেই বা কথা বলব, আমার বয়সী ছেলেপিলেরা আমায় খেপায়, দল বেঁধে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাকে, চেল্লায় বুনো টিয়ার খনখনে আওয়াজে।

ওরা কেউ এখনও জন্মায়নি, তার মধ্যে বড়টা সবচেয়ে দুষ্টু, স্বভাব পাজি, কেন যে ও এমন হলো বোঝা দায়। ঘন ঝোপের আড়াল থেকে আমার দিকে পাথর ছোড়ে, পচা কমলালেবু বৃষ্টি করে যখন পাহাড় বেয়ে পায়রা শিকারে যাই যে শিকার আর করা হয় না। সেবার তুমি নিজেও তো খুব মারলে আমায় আদুড় গায়ে কুরুপিকাই গাছের আঠা দিয়ে পাখির পালক লাগিয়ে আসায়। এখন নর্দমা ডিঙাতে সাহস হয় না, পিঠে পাখির পালক লাগিয়ে রক্তারক্তি বাঁধানোর পর আর যাই না। সবচেয়ে দূরে বলতে যাই ব্রিজের কাছে ট্রেনের শব্দ শুনতে, জলে মাথা নামিয়ে ছোট্ট একটা শন ডাঁটার ফুটো দিয়ে শ্বাস নিই। ব্রিজের থামটা জোর আঁকড়ে থাকি যাতে থরথর কাঁপনের শব্দ দাঁত দিয়ে বোঝা যায়।

বা নদীর গুহাটার ভেতর ড্রামটা নিয়ে লুকোই। একমাত্র ইউসেবিও আমার কথায় কান দেয়। ও নখ দিয়ে পাথর আঁচড়ায় আর খাবার খোঁজে। কিন্তু ওতো শুনতে পায় না আর বোঝাও যায় না আমার কথার মানে বুঝছে কি না শুধু আঠাল চোখে চেয়ে থাকে, মাথা নেড়ে খালি না বলে, গাছের পাতা পড়ার শব্দেও তার সম্মতি নেই।

এ সবে আমার কিছু যায় আসে না। জন্মের আগের স্মৃতিগুলোই বড় জ্বালায়―এত নাছোড়বান্দা তারা

যে কিছুতেই ভুলতে পারি না, অন্যমনস্ক থাকলেও বারবার ফিরে আসে।তোমার কাছে যা স্মৃতি আমার

কাছে তা নয়, ওসব তো তোমার জীবনে একবারই ঘটেছে, আমার জন্য তারা রোজই ঘটে, প্রত্যেকবার

একই রকম ভাবে, ঘটতে থাকে। রোজ সকালে সৈন্যরা বাবাকে খুঁজতে আসে, বাবা লুকিয়ে থাকে পাহাড়ের কোলে। তারা খেপে চিৎকার করে আর রাইফেলের কুঁদো দিয়ে মেরে বাড়িটা তছনছ করে, আলমারিগুলো ভেঙে ফেলে, এমনকি ছোট ড্রয়ারগুলো যেখানে একটা ইঁদুর লুকতে পারে কি না সন্দেহ, রেহাই পায় না। সেই সময় উঠোনের ওপার থেকে কেউ তাদের বিদ্রƒপ করে ওঠে, তারপরই একটা দ্রুতলয় বেয়াড়া গানের চড়া সুর ছেয়ে ফেলে, বাবারই গলায় গাওয়া গান, রাগে ক্ষোভে রুদ্ধ হয়ে আসে স্বর।

গলাটা আসছে ওপর থেকে যেন বাবা কোন গাছ বেয়ে ওপরে উঠেছে। সৈন্যরা বন্দুক তাক করে গুলি করতে গেলে ওই কণ্ঠস্বরটা গাছেদের ডালপালা কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। তুমি ভয় পেয়ে ছুটে গিয়ে সৈনদের অনুরোধ কর গুলি না চালাতে, যেন কোনে গোপন কথা তাদের বলতে চাইছ: আরে ওটা তো পানচিতো পাগলটা, ভগবানের দোহাই ওকে কিছু কর না।

সৈন্যরা ওকে নামিয়ে আনে, তলোয়ারের ভোঁতাটা দিয়ে মারে, লাথি মারতে মারতে উঠোনের মধ্যিখানে

ফেলে আর তাদের গুলিগুলো এক ঝাঁক সবুজ পালক উড়িয়ে দেয় তাতে লাল ছিটে লেগে থাকে, টিয়ার মৃত্যু হয়,―তুমি আর আমি দেখি সে কেমন আস্তে আস্তে মাটিতে পড়ে, বন্দুকের ধোঁয়ার মেঘ তাকে ভাসিয়ে রেখেছিল আর সূর্যের আলোর আদরে সে আস্তে আস্তে নামে। এবার কিন্তু সৈন্যরা তোমার দিকে এগোয়, ভয়ানক এক শ্লথ নিশ্চিত গতিতে, তারা তোমার হাত চেপে ধরে, মেরে মাটিতে শোয়াতে যায়, পোশাক তুলে ফেলে, ছিঁড়ে ফেলে। তুমি চিৎকার কর, আছাড়ি পিছাড়ি খাও, চিৎকার কর, কামড়াতে যাও, পা ছোড় যেন মরার পরও তোমার চিৎকার চারদিক ছড়িয়ে যাবে। যতবার তুমি বমি করতে যাও, তা আমাকে শক্ত করে চেপে ধরে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করে ফেলে আমায়, বিলীন হবার শেষ সীমায় পৌঁছে যাই আমি। মনে হয় এ অবস্থা থেকে আর বোধহয় বেরিয়ে আসতে পারব না। ঘোড়ার ক্ষুর বাজে, বাবার ঘোড়াও হতে পারে, আরও লোক আসছে, কোথায় ঘোড়ার নালের আওয়াজ হল, বন্দুকের শব্দ, ঘোড়ার চিঁহিহি ডাক, সূর্যের অশেষ অন্ধকারে কিছুই দেখি না। বাবা পাহাড়ে লুকিয়ে আর কোনও দিনই ফিরবে না।

তুমি এসব শুনতে চাও না, আমাকে বল থামতে, বাজে বকা বন্ধ করতে। বলতে থাক বুদ্ধিশুদ্ধির অভাব

বলেই বাজে বকতে বকতে জীবনটাকে শেষ করে ফেলব, ছোট বয়সেই ফুরিয়ে যাব আমি। তোমার ছোট্ট শরীরটা চেঁচায় : শেষবারের মতো বলছি তোকে মানুষ হ। আমি কিন্তু বেশি দিন নেই তখন কী করবি। ওই যে বলে না―মা-মরা বাছুরের দুধ জোটে না। সারাদিন টো টো করে না-ঘুরে গরুগুলো গোয়াল থেকে বের কর।

আমি কিন্তু নড়ি না। চুপ করে তোমায় দেখতে থাকি, এ কোণ ও কোণ ঘুরে কাজ করতে। আসবাবের

মধ্যে ঝুঁকে পড়ে পড়ে, কখনও ঝাঁটা ধূলোর মেঘ উড়িয়ে তোমায় আড়াল করে―আর তারপরই তুমি

উঠোনে, বাগানে, ক্রমশ মিলিয়ে ছোট হতে হতে এক ঝলক হাওয়ার মতো কলাঝোপের রোদে ঝলসান পাতার মধ্যে মিলিয়ে যাও। ঠিক তখনই ড্রামটা নিয়ে গুহার দিকে রওনা দিই, ড্রামের গভীরতম বাদ্যি আর জলের স্রোতের শব্দে ডুবে থাকি। একটা ছোট ফাঁক দিয়ে গুহায় আলো ঢোকে, সেই আলোয় এক নারকেল গাছ এলিয়ে থাকে, নদীর ছোট ছোট ঢেউরা এক বুক আলো নিয়ে আকাশের থেকে মুখ ফেরায়।

ঠিক যখন তোমার মধ্যে ছিলাম আর তোমার চোখ দিয়ে দেখতাম সে রকম, মৌচাকের গুটিপোকা যেমন অপর পারে মধু ঝরার শব্দ শোনে।

যখন ঝড় ওঠে আমি আর কিছু না পেরে জানালার কাচটা চাটতে থাকি যতক্ষণ না-সারা শরীরে বৃষ্টি আর বজ্রপাতের পোড়া স্বাদ পাই। যখন ভীষণ মেঘের বুকে বাজের গুরু গুরু আওয়াজ ওঠে, আমি জানালার কাচ চাটা বন্ধ করি আর ড্রামটা বাজাতে থাকি―বাইরের শব্দের সঙ্গে তাল মেলে না কিছুতেই বেতাল বাদ্যির ঝটকায় আমার আঙুল, হাত আর পেটজুড়ে খিঁচ ধরে যতক্ষণ না বমি শুরু হয়ে সব করে ফেলা ভুলগুলো উগরোয়। আমার যত জঘন্যতম ভুলেরা, আখের রস গেঁজান ঘন মদের মতো রাতের প্রার্থনা সঙ্গীত : ‘আমি পাপী হে’-র সঙ্গে মাথায় ঢুকে পড়ে প্রলাপের মতো বকায় আর ভেতর থেকে উঠে আসা থুথুর সঙ্গে ভগবানের নামটাও বৃথাই দেয়ালে ছিটিয়ে যায়। আমার কথা যদি একটু শুনতে কী ভালোই না-হতো। জন্মের আগের কথা বলতেই সবচেয়ে আনন্দ পাই ওটা চাগিয়ে তোলে আমায়, তোমায় কষ্ট দিতে নয়―বিশ্বাস কর। শুধু তোমার সঙ্গে থাকতে, মনে হয় আবার তোমার ভেতর ঢুকছি ভিজে একসা হয়ে জঠরের অন্ধকারে। তোমার যাবতীয় উৎকণ্ঠার ওমে জড়িয়ে ধীরে ধীরে মাথার মধ্য অনুভব করি তোমার চলার ছন্দ তা শান্ত করে আমায় যখন বাবার খোঁজে পাহাড়ের পথে চলি। দেখি মনে করতে পারি কি না।

তোমায় আমায় সব সময় আলাদা করে বাবার মৃত্যু, কী বোকা বোকা ব্যাপার না, তু

মি বলতে থাক; এক মৃত্যুতে নাকচ হলো লোকটার সারা জীবন বেঁচে থাকা : একটা উচ্ছল বেঁচে থাকা, তার রাগগুলো, সৌভাগ্যের চিহ্নগুলো, অন্যদের থেকে বেশি জানার সত্যিটা, বেলাগাম আর আমুদেপনায় ভরা জীবন। বেশি সাহসিকতা, সব কিছুই বেশি বেশি রকমের। একটা বিরাট প্রাণবন্ত লোক। কে বিশ্বাস করবে ওই রকম একটা লোক, সারারাত গিটার আর গানের আসর সেরে ফেরার সময় বাদামী ঘোড়াটা থেকে পড়ল আর মরল, একেবারে বাড়ির দোরগোড়ায়। পড়ার সময় গিটারটা ভেঙে যায়। সে শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে আর দুর্ঘটনার কথা জানতে পারি। আমরা দেখলাম লোকটার প্রাণহীন শরীর পড়ে আছে আবর্জনার স্তূপে। বিহ্বল করার মতো দৃশ্য।

আর তো বাবা নেই কথা বলার তাই মৃত মানুষটা সম্বন্ধে যা বলতে চাও শুনি, সে মৃত মানুষটা যে তোমার মধ্যে বারবার মরেই চলে। সেটাই স্বাভাবিক : তোমার চোখে যদি তাকে দেখি দেখতে পাব সে তোমায় আনন্দ দিয়ে যায়। আমি কিন্তু তাকে অন্যভাবে দেখি, জানি তাতেই তোমার যত বিরক্তি। মৃত্যুর কথা বলতে বলতে যখন মাথায় আঘাত লাগার কথাটা এল তোমার হাত থেকে আঘাতটা ছুটে আসে আমার মাথায় আর মাথাটা ঠুকে যায় দেয়ালে, পা থেকে মাথা যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠে। যা চাওয়ার তা না চাওয়ার দুঃখ, আমি যা চাইছি তা তোমায় বোঝাতে না পারার দুঃখ। মাথা ঠোকার সময় দেয়াল থেকে উঠে আসা পিঁপড়েদের টের পাই, ক্ষুধার্ত ওরা, আমার মাথা জুড়ে রয়েছে, আর আমি ঠায় দাঁড়িয়ে তোমায় দেখি। ভাবি স্বামীকে খুব ভালোবাসতে বলে আমার জন্যও হয়তো একই মৃত্যু চাইছ যাতে দুজনের প্রতিই অবিচার না-করা হয়। এটাই মনে সয় আমাদের তিনজনের জন্য সঠিক। মাথা নিচু করে দাঁড়ালে তুমি আবার না মারলেও হয়তো অন্য কোন আঘাত ছুটে আসবে, আমিই হয়তো নিজের মাথা ঠুকব দেয়ালে, গাছগুলোয়, ছাগলছানার মতোই আর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাব মাটিতে, শুধু তোমায় দেখাতে যে আমরা একই ভাবি।

বুঝি স্মৃতির যন্ত্রণা থেকে তুমি মার, তবে অনেক অতীতের কথা ভাবার জন্যই এই মার আমার প্রাপ্য নয়। আমার দোষ আর গ্লানি খুব মনে রাখার মতো কি―ঠিক জানি না। যা সঠিক জানি সে হলো আমাকে পা ছুড়ে ছুড়ে একই জায়গায় আঘাত করতে হবে, আমার চারপাশ আবদ্ধ, ভেঙে দিতে হবে জঠরের জলঘেরা চাপ চাপ আকাশ যা পা-টাকে চেপে ধরছে। প্রাণপণে―আকারহীন মাংসপিণ্ডের মতো পৃথিবীর বুকে গড়িয়ে পড়াটা, জন্মানোর আগেই অনাথ হওয়াটা, জীবনকে না জেনেই অপছন্দ করাটা―থামাতেই হবে। তাই আমি তোমার থেকেও ক্লান্ত , জন্মানোর আগেই আমি তোমার থেকে বড়, মরা বাবার থেকেও বড়। শহরের সবচেয়ে বয়স্ক লোকটার থেকেও। যখন বলি সব স্মৃতিগুলোই আমার জিম্মায় তোমার বিশ্বাস হয় না কেন ? তুমি বল : যেটার কিছুই জানিস না সে নিয়ে বকেই চলেছিস। আমাকে ও সব নিয়ে বলতে শুনে তোর মনে হলো : সত্যিই তো ওসব তোর চোখের সামনেই ঘটেছে, যা নিজের সঙ্গে না ঘটছে তা মনে থাকার কথা নয়, বুঝলি। সে সব যুক্তি দিয়ে বুঝতে লাগে। আমি বলি―এত সব করে কি মনে রাখা যায়, এ তো ভুলে যাওয়াই এক রকম। ও সব কথা আমি যুক্তি দিয়ে বুঝতেও চাই না, তুমি তো জানই আমার আধপাগল দশা। নাড়ি বেয়েই স্মৃতিরা ধরা দেয়, চোখ বুজলেও ওদের দেখি : ওরা ওখানেই আছে।

তবে যখনই বাবাকে নিয়ে বলতে শুরু করি তুমি রেগে গিয়ে থামাও। একটু বোঝার চেষ্টা কর। ওর

সম্পর্কে একটা কথা বলবি না। লোকটাকে তো চিনলিই না। আর চিনবিই বা কি করে সে যখন মরল তুই তো পেটে, ছমাসের। সে ছিল এক মরদ আর তার গিটারটা ছিল দুই মরদ সমান। সে গাইতে গাইতে প্রকাণ্ড হয়ে স্বর্গ ছুঁয়ে ফেলত, তার ছায়ায় বসে লোকে তারিয়ে তারিয়ে ভাবত যাক জীবনটা ততো খারাপ নয়। সে গরিবের অধরা সব দামি জিনিস হাতে ধরে মাটিতে নামাতে জানত। তোর মধ্যে তার কণা মাত্র নেই দেখে আফসোসের সীমা নেই রে। সে ঠিকই বুঝেছিল মরাতেই শেষ হবে তার কাজের ধারা। মরার খানিক আগে আমায় দিয়ে দিব্বি করিয়ে নিল―তার সঙ্গে গিটারটাও যেন কবরে যায়। তার শেষ ইচ্ছে আমি পূরণ করেছি।

আমার কিন্তু সবই মনে আছে,না-তোমায় খুশি করার জন্য বলছি না। বলছি কারণ এর থেকে সত্যি আর কিছু নেই। কবর দেওয়ার আগের কাল রাত্রিতে তোমায় দেখলাম দেহের সঙ্গে গিটারটা যেন কফিনে ঢোকাবেই। প্রথমে খুব ধীরে, যত্ন করে যেন না লাগে এমন করে ফাঁকটায় ঢোকাতে চাইলে। তুমি অঝোরে কাঁদছিলে দুজনই নেয়ে উঠছিল সে কান্নায়, সদ্য বিধবার বিলাপ। বারবার যেন আদরে নরম করছ যেন ওরাও টের পায় এমন করে, জাপটে ধরে দুজনকেই এক করতে চাইছ। কিন্তু মৃত মানুষটা বড্ড বড়, সে যেন আরও বড় হচ্ছে জায়গা ছাড়তে চাইছে না, কিম্বা গিটারটাই হয়তো পেশল ঘামে ভেজা মৃত মানুষটার মতোই কফিনে ঢুকতে চাইছে না।

তুমি তোমার স্বামীকে ডাকছ। আদর করে মানাতে বলছ এমনভাবে যা কেউ নয়, শুধু তুমিই পার, তাকে ভালো সব কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছ। কী সুন্দর দুজনে এক সঙ্গে কাটালে, সে নিজের গিটারটা কত ভালোবাসে, অনুরোধ করছ, একটা হাত তুলছ। পা, তার মাথাটা তুলে ধরছ। এ সবে কিছুই হয় না। মৃত মানুষটা রাগে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে, নিজের শেষ ইচ্ছে উপেক্ষা করে, তার আর কোনও সঙ্গীত দরকার নেই, শুধু নৈঃশব্দ্য আর শান্তি, বাইরে গিটারটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দে প্রতিবাদ করছে, তার কাঠের শরীর ভেঙে যাচ্ছে, তারগুলো দলা পাকিয়ে বাঁধন থেকে খসে যায়, যে লোকটা তাকে অপমান করেছে তার ওপর খেপে ওঠে, যে মরার পর শুধু একাই হতে চায়। অনেক চেষ্টায় না-পেরে তুমি রেগে ওঠ। যা ভালোয় ভালোয় হলো না তা নিষ্ঠুর ভাবে কর, গিটারটা মেঝেয় আছড়ে আছড়ে ভেঙে কফিনের ভেতরে সাজাও। তোমার শোকের কাতরানি বা আছড়ে ফেলা কোনওটাই লোকে শোনে না।

তাদের আরকি তারা কান্নার ভাঁড়ামো করতে করতে হাসে। এক সময় এই হাসি আর কান্নার আলাদা মানে হারিয়ে যায়, সে সময় তারা আচ্ছন্ন হয়ে ভেতর থেকে সব হতাশা উগরোতে থাকে, একদম খালি হওয়ার পর তাদেয় সব শব্দরা মিলিয়ে যায়।

তুমি কথা রেখেছ। শুধু আমিই বুঝি মৃত মানুষটা, যাকে লোকে আমার বাবা বলে, এসে আমার সঙ্গে থেকে যায় অথচ জায়গাটা দুজনের মতো বড় নয়। আর বুঝি আজ নয় কাল সে এখান থেকে আমায় ঠেলে সরিয়ে ফেলবে। তাই আমি তোমার মার সহ্য করি, বলি না কিছু, তোমার করা অপমানের বোঝা বয়ে চলি, জানি তোমার একমাত্র কাজ হলো তার কথাই ভাবা, সেই তো সবচেয়ে পলকা এখন, সবচেয়ে অসহায়, আমার থেকেও তায় দিকে নজর দেওয়াই এখন কাজ। তোমার দুঃখের ভার কমাতে পাল্লার অন্য দিকে একটা কিছু আমায় চাপাতেই হবে যাতে তোমার দিকে সেটা হেলে পড়ে, ডন লুকাসের দোকানের দাঁড়িপাল্লার মতো, তুমি যখন আমায় মুদির দোকানে পাঠাও দেখি একদিকে কালো কালো সিসের বাটখারা রয়েছে অন্য দিকে মুঠো খানেক কফি বা বিস্কুট ফেললে সেটা অন্য দিকে হেলে পড়ে। আমি তোমায় এই দুটুকরো হবার ভারমুক্ত করতে ছাই, যে ভাবে তুমি দুঃখে নুয়ে। কাল যাব সেই ব্রিজের কাছে, ট্রেনের গুম গুম আওয়াজ শুনব।

ব্রিজের থামটা জাপটে ধরব, তবে এবার আর শনের ডাঁটাটা মুখে পুরে শ্বাস নেব না; জলের তলায় থাকব দাঁতে দাঁত চেপে যতক্ষণ না ট্রেনের থর থর কাঁপন আমার মধ্যে পুরো মিলিয়ে যায় তার সঙ্গে মিলিয়ে যাবে আমার ভেতর ড্রামের তালে বাজতে থাকা শব্দেরা।

লেখক পরিচিতি :

প্যারাগুয়ের ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকার আগস্তো রোয়া বাসতস্ জন্মেছেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে। কিশোর বয়সে তিনি বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ের যুদ্ধে যোগ দেন। পরে তিনি সাংবাদিকতা, সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা ও অধ্যাপনা করেন। Yo el Supremo (I, the Supreme) তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। ১৯৮৯  খ্রিস্টাব্দে তিনি এই উপন্যাসের জন্য Premio Miguel de Cervantes পুরস্কার পান। এটা লাতিন সাহিত্যের সেরা পুরস্কার।  ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান।

অনুবাদক : গল্পকার, অনুবাদক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares