ল্যাটিন আমেরিকার ১৫ লেখকের অনূদিত গল্প : মার্গারিটা কিংবা ওষুধের ক্ষমতা : আদোলফো বিখয় কাসারেস : অনুবাদ : জয়া চৌধুরী

ঠিক মনে নেই কোন্ প্রসঙ্গে আমার ছেলে এই অনুযোগটা করেছিল :

তোমার তো সবকিছুই ভালো হয়। ছেলে বাড়িতেই থাকত আমার সঙ্গে। ওর বউ আর চারটে বাচ্চা নিয়ে। বড়টা এগারো আর ছোট মার্গারিটার দু’বছর বয়স। এ কথাগুলো বলার সময় ওর গলায় বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। ক্বচিৎ কখনও বউয়ের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলত। তাকে বলল :

এ কথাটা তুমি অস্বীকার করতে পার না প্রতিটা জয়েই কিছু না কিছু ন্যক্কারজনক ব্যাপার থাকে।

বউমা উত্তর দিল―প্রাকৃতিকভাবেই জয় ব্যাপারটা হলো ভালো কাজের ফল।

কিন্তু সবসময়ই তার মধ্যে কিছু নোংরামি থেকে যায়।

জয় নয়―মাঝখান থেকে বলে উঠলাম আমি―জয়ের ইচ্ছে।―‘জয়’ বিষয়টাকে দোষ দেওয়া আমার কাছে বাড়াবাড়ি রকমের রোম্যান্টিসিজম। বিবেচনাহীনদের পক্ষেই এরকম সুবিধাবাদী কথা বলা সম্ভব।

বুদ্ধিমতী হওয়া সত্ত্বেও, বউমা আমাকে তার যুক্তি বোঝাতে পারল না। এরপর দোষ খুঁজতে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম যে, জীবনটা আমার পুরোপুরি কেমিস্ট্রি বই আর ওষুধ তৈরির ল্যাবরেটরিতেই গেছে। আমার ‘জয়’ বলে যদি কিছু হয়েই থাকে সেটা হয়তো বিশ্বাসযোগ্য কিন্তু অসামান্য কোনও ব্যাপার নয়। এটা বলা যেতে পারে আমার কেরিয়ার সম্মানজনক। ল্যাবরেটরির হেড হয়েছি। একটা নিজস্ব বাড়ি আছে আর সেটা বেশ ভালোগোছেরই। ঘটনা এই যে : আমার তৈরি মৌলিক ফরমুলা, মলম, রঞ্জন যা দিয়ে ব্যথা কমান যায় ইত্যাদি কিছু জিনিস আছে। এলাকায় যে-সব ওষুধের দোকান আছে তাদের সেগুলো দিয়ে সাজানো। লোকে বলে তা দিয়ে যতজনকে উপশম করা যায় সে সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। তবু নিজেকে আমি সন্দেহ করবার অনুমতি দিয়েছি। কারণ মানুষ ও তার অসুখের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা আমার কাছে যথেষ্ট রহস্যময়। যা-ই হোক, আমি যখন আমার টনিক ‘ইয়েররো প্লাস’টা সামনে দেখতে পেলাম, ভেতরে একটা অস্থিরতা দেখা দিল। একটা ‘জয়ের’ নিশ্চিন্ততা এল। যেখানে সেখানে বুক ঠুকে বলতে শুরু করলাম যে ফার্মেসি আর মেডিসিন-এর লোকেরা যেন আমার কথাই শোনেন। মুখ ও মুখোশ ম্যাগাজিনের পাতায় এর স্বপক্ষে সাক্ষ্যও প্রকাশিত আছে। অতীতে মানুষ অন্তহীনভাবে টনিক খেয়েই চলত যতক্ষণে না ভিটামিন-এ তাদের ঝেঁটিয়ে সাফ করে দিল। যেন আগে সব ঠগ জিনিস চালু ছিল। ফলাফল তো চোখের সামনেই। তারপরে ভিটামিনেরও অযোগ্যতা প্রমাণিত হলো। সেটা অনিবার্যও ছিল। এখন দুনিয়াসুদ্ধ লোক তাদের দুর্বলতা আর ক্লান্তি দূর করতে টনিক কিনতেই দোকানের সামনে ভিড় জমায়।

এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু বউমা তার ছোট কন্যার অ-খিদে ভাব নিয়ে দুশ্চিন্তা করত। এর ফলস্বরূপ বেচারি মার্গারিটা, সোনালি চুল আর নীলাভ চোখ আর ফ্যাকাশে রঙের ক্লান্ত খুকি গম্ভীর হয়ে উঠছিল দিনদিন … মার্কামারা উনিশ শতকের স্ট্যাম্প যেন। প্রথামাফিক দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্যই যেন সে নিয়তিবদ্ধ হয়ে আছে।

ওষুধ বানানোর ব্যাপারে আমার দক্ষতা ছিল ওই … ‘কখনও না বানান’ পর্যন্ত। কিন্তু নাতনির জন্য উদ্বেগ আমার মধ্যে তাড়ার কাজ করল। একটু আগে যে টনিকটার কথা বললাম অতএব সেটা আবিষ্কার করা গেল। ওটার কার্যকরী ক্ষমতা দারুণ, অলৌকিক। বদলে ফেলার জন্য চার টেবিলচামচই যথেষ্ট। হপ্তাকয়েকের মধ্যেই মার্গারিটা গাবলুগুবলু ফুটফুটে ফর্সা বাচ্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চিত করে বলতে পারি তাকে দেখলে একটা আগ্রাসী তৃপ্তি আসে। সোজা হয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে খাবার খোঁজে ও। কেউ যদি দিতে না চায় রাগ করে সেখান থেকে চলে আসে। রোজকার মতো আজ সকালেও সাঙ্ঘাতিক একটা কিছু ঘটবে ভেবে খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছিলাম। যা ঘটল আমি কখনও ভুলতে পারব না। মেয়েটা টেবিলের মাঝখানে দুহাতে দুটো আদ্ধেক ক্রসেন্ট নিয়ে বসে আছে। খেয়াল করলাম লালচুলো পুতুলের মত বাচ্চাটার গালও যথেষ্ট লাল, রক্ত আর মিষ্টিতে রীতিমতো মাখামাখি। ঘরের এক কোণে পরিবারের বাকিরা একে অন্যের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে অবসন্ন বসে আছে। আমার ছেলের দেহে তখনও প্রাণ আছে। শেষ কথাটা যাতে বলতে পারে তার জন্য শক্তি প্রয়োগ করল।

মার্গারিটার কোনও দোষ নেই।

সাধারণত : এমন তীব্র স্বরে সে শুধু আমার সঙ্গেই কথা বলে থাকে।

লেখক পরিচিতি :

আদোলফো বিওয় কাসারেস : ১৯১৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস শহরে জন্ম । ১১ বছর বয়সে প্রথম গল্প লেখেন ‘আইরিস ও মার্গারিটা’। তাঁর লেখা বহু সায়েন্স ফিকশন আছে। নোবেল বিজয়ী খোর্খে লুইস বোর্খেস-এর সঙ্গে যৌথ ভাবে প্রচুর বই লেখেন তিনি। স্প্যানিশ ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার সেরভান্তেস পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। মৃত্যু : বুয়েনোস আইরেসে ১৯৯৯ সালে।

অনুবাদক :

মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত এযাবৎ পাঁচটি অনূদিত বই ও বাংলায় যৌথভাবে একটি মৌলিক কবিতার বই।

সচিত্রকরণ : ত্যাইয়েরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares