ল্যাটিন আমেরিকার ১৫ লেখকের অনূদিত গল্প : পলাতকেরা : আলেজান্দ্রো কার্পেনতিয়ার : মূল স্প্যানিস থেকে অনুবাদ : জয়া চৌধুরী

পায়ের চিহ্নটা গাছের গোড়ায় গিয়ে মরেছিল। বাতাসে একটা কড়া কালো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল নিশ্চিত। পচা ফলের ওপর ভ্যানভ্যান করতে থাকা মাছিগুলো বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠে পড়ছিল। কিন্তু কুকুরটা―কুকুর ছাড়া অন্য কোনও নামে ওকে কেউ কখনও ডাকেনি, সে ক্লান্ত ছিল। মাংসপেশিগুলো ছাড়ানো আর গা-হাত-পা ঝেড়ে সোজা করবার জন্য বারকয়েক ডিগবাজি খেয়ে নিল সে। অন্ধকার ঘনিয়ে এলে বহুদূরে পশুর দলের চিৎকার মিলিয়ে এসেছিল। কালো গন্ধটা ঘুরেই যাচ্ছিল চারপাশে। হয়তো বড় শিঙা ওপরে কোথাও চোখ দিয়ে শুনতে শুনতে গাছের ডালে দু-পা ঝুলিয়ে লুকিয়ে আছে।

যাই হোক কুকুর কোন কিছু খুঁজবার মতলবে নেই এখন। ওখানে আর একটা গন্ধ ভেসে আসছে। সে গন্ধ মাটিতে লেগে থাকা গন্ধ ঠিক কিউবার বেখুকাল গাঁয়ের লোকের পোশাকের মতো, যাতে এক ঘষায় গন্ধটা উবে যায়। মাদি কুকুরের গন্ধ। যেমন গন্ধ কুকুরের গায়ে লেগে থাকে। সে দাঁত চিতিয়ে হাসছে। গর্তটার ওপরে পৌঁছতে আর, যেটা কাঁধের হাড়ের মাঝখানে ফাঁক করে দিয়েছিল সেখানে ছোঁয়ার জন্য ছোট্ট জিভটা লম্বা করে, পা দুটো ওপরে তুলে কাতরাচ্ছে। ছায়ারা আরও ভিজে যাচ্ছিল। পায়ের পাতায় ভর করে কুকুর ডিগবাজী খেল। বুদ্ধির ঘণ্টা। ধীরে ধীরে উড়ছিল। কান দুটো খাড়া হলো। উপত্যকায় কুয়াশা আর ধোঁয়া একই রকম নীলচে অনড়। যার ওপর দিয়ে একটার পর একটা সিল্যুয়েট ভেসে যাচ্ছে প্রতিবার আরও বেশি বেশি করে। একটা ইটের চিমনি, গির্জার চূড়া, আর আলো এমন জোরালো যেন তা জলাশয়ের তলাও আলোকিত করে দেবে। কুকুর ক্ষুধার্ত ছিল। কিন্তু সেখান থেকে মাদি কুকুরের গন্ধ আসছিল। গন্ধটা একেক সময় গাঢ় হয়ে উঠছিল। কিন্তু সে তোয়া তার নিজের আবেগের গন্ধ। অন্য আবেগের ডাকে সাড়া দিয়ে উথলে ওঠা নিজস্ব আবেগের গন্ধ। কিন্তু তা ছড়াচ্ছিল সবার নাকে। ঘাড় লম্বা করে এগিয়ে যেতে যেতে পেছনের পা দুটো উঞ্ছবৃত্তি করছিল। পাঁজরের নিচে ছোট্ট ছোট্ট শ্বাসের তালে তালে পেটটা কুঁচকে ঢুকে গিয়েছিল ভেতরে। প্রখর রোদে ঝলসে যাওয়া ফলগুলো পড়েছিল এখানে ওখানে। সূর্য নরম মন্ডের মতো আলো বিকীরণ করতে করতে ভেজা শব্দের সঙ্গে মাটিতে সমতলে ছড়িয়ে পড়ছিল।

যেমন করে বড় চাষির পেছন পেছন যায়, তেমন করেই নিজের গন্ধ শুঁকে যেখানে যেতে ইচ্ছে করছে সেখানে না গিয়ে লেজ নামিয়ে পাহাড়ের দিকেই ছুটছিল কিন্তু। কিন্তু মাদি কুকুরের গন্ধটা আসছিলই। শুঁকতে শুঁকতে নাকটা আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলে নিজের দিকেই ঘুরে আসছিল। পথ হারিয়ে ফেলছিল সে। কাঁটাঝোপের সুগন্ধ তীব্র হয়ে উঠছিল। পচে ওঠা পাতার ফাঁকে মাঝে মাঝে সূত্র হারিয়ে ফেলছিল কুকুর। আবার তেজিয়ে উঠে অপ্রত্যাশিত মেজাজে লেজের ঝাপটে মাঝে মাঝে গজিয়ে ওঠা টুকরো জমিতে হাঁটছিল। দ্রুত পথ হারিয়ে ফেলল কুকুর। পথের যে সুতোটা ও গড়ে তুলছিল ভাঙছিল একটা নকুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে তা হারিয়ে ফেলল। দু’ঝাঁকুনি দিয়ে গ্লাভসের ভেতর কাস্টানেট বাজানার মতো আওয়াজ দিচ্ছিল ওটা। মেরুদণ্ড বরাবর ওটাকে চিরে ফেলল কুকুর। মুখ দিয়ে কামড়ে ছুঁড়ে ফেলল … তবে হঠাৎই ওরা থেমে গেল। একটা পা সংশয়ে রেখে দাঁড়াল। দু’ চারবার চিৎকার করবে তবে অন্ধকারে পায়ের চাপকেও রেখে দেবে। কিছু ইট অনেক দূরে পাহাড় থেকে নেমে আসছিল।

ওরা সেই লোকটার কুকুরবাহিনী নয়। ওদের গলার আওয়াজটাই আলাদা, অনেক বেশি কর্কশ আর ভাঙা ভাঙা। শ্বাসনালির ভেতর থেকে বেরোচ্ছিল আওয়াজটা। শক্ত চোয়ালের জন্য আরও বেশি তীক্ষè লাগছিল। কোনও জায়গায় মদ্দাগুলোর মধ্যে মারামারি বেঁধে গিয়েছিল যেগুলোর গলায় কুকুরের মতো নাম লেখা তামার পাতের তৈরী বকলস পরান ছিল না। এতদিন যত কণ্ঠ শুনেছে ওই অচেনা গলা তার চেয়ে ঢের বেশি প্রভাব বিস্তারকারী। কুকুর ভয় পেল। উল্টোদিকে দৌড়তে শুরু করল যতক্ষণ পর্যন্ত না রাস্তাটা চাঁদে গিয়ে মেশে। ততক্ষণে মাদি কুকুরের গন্ধটা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। উফ ভীষণ কালো গন্ধ ছিল ওটা। মুখ নিচে নামান, ডোরাকাটা প্যান্টি পরা ওই কালো ওখানে ঘুমোচ্ছিল। ভোর থেকে পথের যে সুতোটা অনুসরণ করছিল কুকুর, চাবুকের ঘায়ে একটা বিরাট পাক খেয়ে যেখানে হাঁসমুরগির খড় গু রাখার কড়াই ছিল সেখানেই তখন প্রায় নিজের দিকেই খুঁজতে গেল। কিন্তু ওপরে কোথায় জানত না, মদ্দাগুলোর ঝগড়া হয়েই যাচ্ছিল। বড় শিঙার পাশটাতে চিবনো হাড়ের স্তূপ ছিল। আত্মবিশ্বাসী কান নিয়ে কুকুর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। মনে মনে ঠিক করা আছে ক’টা পিঁপড়ে জুটলে কামড়ে মাংসের স্বাদ নিয়ে নেবে। তাছাড়া বাকি কুকুরগুলো যারা সাঙ্ঘাতিক জোরে চেঁচাচ্ছিল সেসব শুনে ওর ভয় ভয় করছিল। তার চে এখানে এখন লোকটার পাশে থেকে সেসব শোনা ভালো। যা-ই হোক দখিনে বাতাস বিপদের গন্ধ পৌঁছে দিচ্ছিল। নিজের চারপাশেই তিনপাক ডিগবাজি খেয়ে নিল কুকুরটা। ক্লান্ত হয়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে বসল। ওর পা-দুটো একটা দুঃস্বপ্নের পিছু পিছু দৌড়িয়েছিল। ভোরবেলা, বড় শিঙা মাথার ওপর এমন কায়দায় থাবড়া দিল যেন ওটা অনেক মেয়ের সঙ্গে শুয়েছে। গরমের খোঁজে কুকুর বুকের কাছে এগিয়ে এল। দু’জনেই একই দুঃস্বপ্ন দেখে প্রাণপণ দৌড়ে ব্যস্ত। মাকড়সাটি না নিচে নেমে এসেছিল ব্যাপারটা ভালো করে দেখবার জন্য। সে সুতোটা ধরে ফেলল আর তারপরেই আমন্ডের গাছ যেগুলোর পাতা গজাচ্ছিল তার মাঝে হারিয়ে গেল।

অভ্যেসবশে বড় শিঙা আর কুকুর দুজনে তীক্ষè আওয়াজে জেগে গিয়েছিল। গায়ে গা ঠেকিয়ে ঘুমিয়েছিল এই সত্যিটা উপলব্ধি করে দুজনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। দু’জনে দু’জনের মুখ শোঁকাশুঁকি করে অনেকটা সময় পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। তাকে মালিক স্বীকার করে নিয়ে কুকুর নিজেকে সঁপে দিল ওর কাছে। কেলেটা কিছুটা বন্ধুত্ব মেরামত করা যাবে কি না ভেবে উৎকণ্ঠায় ছিল। উপত্যকা ঘুম ঘুম। গিজগিজে ঘন শরবনে, দাস হবার নিয়তি নিয়ে, চ্যাপেলের রাজকীয় দণ্ডের সামনে এখন খুব আস্তে সাড়া দিল কুকুর। হিসহিস আর হাম্বা হাম্বা রবের মাঝে সেখানকার লকলকে সবুজ পাতাগুলো সূর্যের আলোর থেকে বাঁচতে ছায়ায় হেলে রয়েছিল, ঠিক যেমন করে মেহগনি গাছে বিছানায় নাছোড় শব্দেরা ঘুমোয়। বড় চাষিরা কড়ে আঙুল নাড়িয়েই নিশ্চিত হবে ডিমগুলো এখনও ফোটেনি সেই আশায় মোরগগুলো মুরগিদের তড়িঘড়ি ঢেকে ফেলার জন্য চারপাশে ঘুরঘুর করছিল। খামারবাড়ির চাকার ওপরে একটা ময়ূর বারবার ডিগবাজি খেতে খেতে চিৎকার করে সরগরম করে রাখছিল। চিনিকলের ঘোড়াগুলো চারপাশ ঘিরে দীর্ঘ পাক খাওয়া শুরু করেছিল। আখের রসে ডোবান রুটি ভর্তি ক্যাসারোলগুলোর সামনে দাসেরা প্রার্থনা করছিল। সিবা গাছের শেকড়ের মাঝে ফ্যানার চিহ্ন রেখে যেতে যেতে বড় শিঙা ওর শিং খুলে বসেছিল। কুকুর একটা নরম পেয়ারার দিকে পা বাড়াল। আখের টুকরোর ভেতরে গুঁড়োগুলো উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। হাউন্ডদের ধেড়ে ব্ল্যাক হান্টারটা অধৈর্য হয়ে ওর শেকল নাড়াচ্ছিল।

আমার সঙ্গে যাবি―বড়ো শিঙা জিজ্ঞেস করল।

অনুগত ছাত্রের মত কুকুরটা ওর পিছু পিছু রওনা হলো। নিচে বড্ড বেশি চাবুক, বড্ড বেশি শেকল, যারা ফিরে এসেছিল তারা সব্বাই দুঃখ করছিল। এখন আর মাদিটার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু কালো গন্ধটাও আসছিল না। এখন কুকুর সাদা গন্ধের দিকে অনেক বেশি মনোযোগী, বিপদের গন্ধ। কেননা বড় চাষির গন্ধ সাদা। কড়া মাড় দেওয়া জামা আর চকচকে শুয়োরের চামড়ার গোড়ালিবন্ধের ভেতর থেকেও সে গন্ধ বেরোত। এটা বাড়ির মহিলাদের গন্ধের মতো একরকম গন্ধ। তাদের চুলের ফিতের ভেতর যতই পারফিউম লাগান তা সত্ত্বেও যে গন্ধ বের হতো ঠিক তেমন গন্ধ। চ্যাপেল থেকে আসা ছায়া এত কুৎসিত এত ঠাণ্ডা আর ভেসে আসা গলান মোমের দুর্গন্ধ তাতে, সঙ্গে ধূপকাঠির গন্ধ মিশে একেবারে পাদ্রীদের গায়ের মতো গন্ধ। ওপরে অর্গানবাদক সঙ্গে বয়ে আনা হারমোনিয়মের বেলো প্রাণপণ ফুঁ দেওয়া সত্ত্বেও বড্ড আলসে। ঠিক যেমন হাঁফাতে থাকা প্রজাপতির ঝাপটা। তাকে সাদা গন্ধের থেকে পালাতে হতো। কুকুর পক্ষ বদলে নিল।

৩.

প্রথম দিনগুলোতে বড় শিঙা আর কুকুর সেই খাবারের নিশ্চিন্ততা বড্ড মিস করছিল। বিকেল হলে বাইরে রাখা বালতির ফাঁকা হাড্ডিগুলোর কথা খুব মনে পড়ছিল কুকুরের। বড় শিঙার মনে পড়ছিল প্রার্থনার পরে কিংবা যখন তারা রবিবারের তালবাদ্যগুলোকে সাজিয়ে রাখতে যেত তখন ব্যারাকে বড় বড় বালতিতে করে আসা বানমাছ আর ঈল মাছের কথা। তাই সকালে অনেক বেশি করে ঘুমিয়ে ওঠার পরেও ঘণ্টা নেই, পায়ের লাথি খাওয়া নেই ভোর থেকেই শিকার ধরতে অভ্যেসমতো দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কুকুরটা একটা দারুগাছের পাতার ভেতর থেকে লুকনো হুটিয়া পশুর গন্ধ পাচ্ছিল। বড়ো শিঙা পাথরের ওপর গুটলি পাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। দিনটা নোংরা জীবারোদের দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেখানে ওরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ছিল। কান ছিঁড়ে, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা চিরে গিয়ে থাকতে পারে ওদের, কিন্তু তবু তখনও কাজ শেষ হয়নি, একটা পাহাড়ের তলায় জড় হয়ে মারের চোটে নেতিয়ে পড়ে রইল স্রেফ। আস্তে আস্তে কুকুর আর বড় শিঙা ভুলেই গেছিল শেষ কবে নিয়মিত খেতে পেত। একবারে যা জুটত তাই গবগব করে খেত এটা ভেবে যে ফের কবে খাবার জুটবে তার ঠিক নেই। আর পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে আসা জল যা উপত্যকাকে সবুজ কার্পেট বানিয়ে তুলেছে সে জল খেত। ভাগ্য ভালো কুকুর ফল খেতে জানত। বড় শিঙা যখন কোনও আমগাছ বা মামে ফলের গাছ ঝাঁকাত কুকুরের মুখ লাল বা হলুদ রঙে মাখামাখি হয়ে যেত। তার ওপর সোমবচ্ছরের ডিম বিক্রেতার মতো, কোনও কোয়েল পাখির বাসার ডিম নিয়ে পুষিয়ে নিত। কিংবা কোনও নদীর মুখের কাছটা বিপরীতমুখী স্রোতে চিংড়িরা ঘুমিয়ে থাকে, যেখানে বিশেষ প্রজাতির শামুকে কিলবিল করে, সেগুলো ধরে খেত।

একটা গুহায় থাকত ওরা। ওটা ফার্ন গাছের সারের আড়ালে বেশ লুকনো একটা জায়গা। সেখানে সময়ের কোলাহলের ঠাণ্ডা ছায়ায় স্ট্যালাকলাইটগুলো সান্ত্বনাহীন কেঁদেই যেত। একদিন কুকুর দেয়ালের পায়ের কাছটা খোঁড়া শুরু করল। দ্রুত তার দাঁতগুলো একটা বড় হাড্ডি আর কিছু পাঁজরের হাড্ডি যেগুলো এত পুরোনো যে তার আর কোনও স্বাদই নেই, সেগুলো টেনে বের করল। ওগুলোকে গুঁড়ো করতে গিয়ে জিভ ভেঙে যাবার উপক্রম। পরে বড় শিঙার কাছে এসে উপস্থিত হলো। সে আবার তখন চামড়ার বেল্ট আর মানুষের খুলির টুকরো পরে সেজে রয়েছে। যদিও সেই জায়গাটা পাথরকুচি আর ভাঙা হাঁড়িকুঁড়ি দিয়ে ঠাসা ছিল, যেগুলো কাজে লাগানো যেতে পারত। বড় শিঙা তো বাড়িতে এসব মরার জিনিষপত্র দেখে ভয়েই অস্থির। সেদিন বিকেলেই বৃষ্টির পরোয়া না করেই ঠাকুরের নাম জপতে জপতে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ভেজা কুকুরের গায়ে যেরকম গন্ধ থাকে বীজ আর শেকড়বাকড় মোড়া জায়গাটায় ঠিক সেরকম গন্ধের মধ্যে দুজনে ঘুমিয়ে কাটাল সেখানে। রাত নেমে এলে নিচু ছাদওয়ালা একটা থাকবার জায়গা যেখানে মানুষ ঢুকতে গেলে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে পারবে তেমন জায়গা খুঁজে বের করল। সেখানে অন্তত তেমন হাড্ডি পাওয়া যাবে না যেগুলো ভয় দেখানো আর বাজে চিন্তা আনা ছাড়া আর কোনও কাজেই আসে না।

বহুদিন চাবুকের মার খাওয়ার অভ্যাস না থাকার ফলে দুজনেই রাস্তা খুঁজে বার করার চেষ্টা শুরু করল। কখনও চেনা রাস্তা চোখে পড়ে, কোনও রমণী হয়তো নাজারেনোর পোশাক পরে আছে কিংবা কোথাও গিটারের টুকরোটাকরা পড়ে আছে, এভাবেই সেসবের মালিকের খোঁজ পেয়ে যেত যারা দূর থেকে নিঃশব্দে তাদের দিকে চেয়ে থাকত। কোনও সন্দেহ নেই যে বড় শিঙা একটা কিছুর প্রত্যাশা করত। গিনির ঘাসগুলোর মাঝখান, একটু সরে আসা রাস্তা যেটা একটা ব্যাঙ লাফ দিয়ে ডিঙ্গোতে পারবে সে দিকে কেবলই একদৃষ্টে চেয়ে বসে থাকত। কোন প্রজাপতি ধাওয়া করতে গেলে কিংবা ওটা ছুঁতে চেষ্টা করতে গিয়ে বা লাফালে, কুকুর অবিশ্যি প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ত। ঝলমলের পোশাক পরা জুনজুন পাখি শিকার করার মতই অসম্ভব ব্যাপার সেটা।

একদিন বড় শিঙা অপেক্ষা করছিল কিছু একটার জন্য, তবু থাবার ওপর হেলমেটের ঠুংঠুং শব্দ পাওয়া গেল। দুলকি চালে একটা ঘোড়া হেঁটে আসছিল। কারও একটা রঙিন খচ্চর। রডের ওপর দাঁড়িয়ে কালাশ গাড়ির ড্রাইভার গ্রেগোরি চামড়ার কোটটা ঝাড়ছিল, সেই অবসরে প্যারিশ প্রিস্ট মশাই পেছনে রুটি প্রসাদ বিতরণের ঘণ্টি বাজাচ্ছিলেন। কতদিন কতদিইন পরে কুকুর ঘোড়ার চাইতে জোরে দৌড়ানোর মজা পেল। মুহূর্তের জন্য তার সতর্ক থাকার কথা তার মনে ছিল না। পাহাড়ের ঢালে কুঁকড়ে হামাগুড়ি দিয়ে, রোদে নীল হয়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে সে গাড়ির কাছে গেল। খচ্চরটার নালের কাছটায় মুখ নিয়ে ঘেউঘেউ করে উঠল। পাদ্রি আর ড্রাইভারকে দাঁত খিঁচিয়ে ডানপাশে, বাঁ পাশে, সামনাসামনি যাচ্ছিল আর ফিরে ফিরে হেঁটেই যাচ্ছিল। চোখের ঠুলি খুলতে খুলতে হাঁ মুখ করে খচ্চরটা প্রাণপণ উঁচু করে লাফ দিল।

হঠাৎই একটা রড ভেঙে ফেলল তারপর ছুড়তে লাগল সেগুলো। তারপর ভীতু পুরুত আর কুকুরটা ভয় পাওয়ানোতে তাদের মাথা ঠুকে গেল পাথরে। গুঁড়োগুলো রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল।

বড় শিঙা দৌড়ে আসছিল। কুকুরকে আটকানোর জন্য একটা লতার দড়ি ঘোরাচ্ছিল ততক্ষণে কুকুর মাফ চাইছিল। কিন্তু কালো অবাক হয়ে থেমে দেখল যতটা খারাপ হয়েছে ভাবছিল তত খারাপ কিছু হয়নি। প্রিস্টের চাদর কাপড় আর ড্রাইভারের উঁচু বুট আর জ্যাকেট কেড়ে নিয়ে এসেছে সে। পকেটগুলোয় অন্তত পাঁচ দুরা টাকা পাওয়া গেল। তার ওপর রুপোর ঘণ্টি। চোরেরা পাহাড়ে ফিরে এল। সে রাতে বড় শিঙা আলখাল্লায় মুড়ে ঘুমিয়ে বহুদিন পরে ভুলে যাওয়া মধুর স্বপ্ন দেখল। মনে পড়ল মড়া পোকায় ভর্তি তেলের কুপির কথা, যেগুলো অত রাতে গ্রামের শেষ বাড়িগুলোয় পুড়েছিল। সেখানেই রাজার কাছে বোনাস পেলে যেমন দেখায় তার চেয়ে বেশি খরচ করতে চেয়েছিল দুবার। না-পেয়ে তারা ছেড়ে এসেছিল। কালো তারপর থেকে অবধারিতভাবে মেয়ে চাইত।

৪.

ভোরবেলা শরৎ তাদের গ্রাস করে নিল। পেছনের পায়ের পাতার মাঝখানে একটা অসহ্য শক্ত ভাব আর চোখ কটকট নিয়ে কুকুর জেগে উঠল। গরম না লাগা সত্ত্বেও জিভ বের করে হাঁপাচ্ছিল। ক্যানাইন দাঁতের ফাঁকে নাছোড়বান্দা লোকের মতো নরম জিভটা ঝুলতে লাগল। বড় শিঙা একাই কথা বলছিল। দু’জনেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। শিকারের কথা ভুলে দুজনেই ভোর ভোর পথে রওনা দিল। কুকুর এলোমেলো পায়ে হাঁটছিল। একটা চেনা গন্ধ খুঁজছিল নিরর্থক। যে পোকামাকড়গুলোকে সবসময় ভয় পেয়ে এসেছে ধ্বংসের নেশায় সেগুলোকে মেরে যাচ্ছিল। দাঁত দিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে গুঁড়ো গুঁড়ো করছিল। নরম গাছগুলোকে হিঁচড়ে টেনে যাচ্ছিল। একটা ব্যাঙ তার চোখে থুতু ছেটানমাত্র হাঁপানিটা থামল তার। বড় শিঙা অপেক্ষা করছিল এমনভাবে যা জীবনেও সে করেনি। কিন্তু সেদিন তার পথে কেউ এসে পড়েনি। রাত হলে যখন প্রথম বাদুড়েরা মাঠের ওপর পাথরের মত উড়তে থাকে লোকটার বাড়ির দিকে সে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল। সেই এক চিহ্ন। শেকল থাকা সত্ত্বেও কুকুর তার পেছন পেছন গেল। নদীগর্ভের সরু খাত দিয়ে বড় কুঁড়েটার কাছাকাছি চলে এসেছিল ওরা। একটা গন্ধ তাড়া করছিল তাদের। পোড়া কাঠের পুরোনো গন্ধ একটা, ঘোড়া মাথার বর্মের উকোর গন্ধ ছিল ওটা। নিশ্চিত ওরা পেয়ারার জেলি বানাচ্ছিল। যদিও গোটা চত্বরে মার্মালেডের একটা মিষ্টি গন্ধ ছেয়ে ছিল। কুকুর আর বড় শিঙা, পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল, একজনের কাঁধের উচ্চতায় আর একজনের কাঁধ ঠেকিয়ে গন্ধটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ একদল কালো বাহিনী কামারের যাবার রাস্তায় এসে ঢুকে পড়ল। বড় শিঙা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বুনো তুলসীর ঝোপের ওপর ফেলে দিল। একটা চওড়া থাবা এসে চিৎকার ডুুবিয়ে দিল। এলাকাটার সীমা পর্যন্ত কুকুর এগিয়ে গেল, একাই। দোন মার্শালের দখল করা ইংলিশ কুকুরীটা যেটাকে প্যারিসের প্রদর্শনীতে পেয়েছিলেন তিনি, ও সেখানে ছিল। পালানোর চেষ্টা একটা হয়েছিল বটে। বেপরোয়া ভঙ্গিতে লেজ মাথায় তুলে কুকুর পথ কেটে দাঁড়িয়েছিল। তার শক্তিশালী পুরুষালী গন্ধ কুকুরীকে এতটাই বুঁদ করে ফেলল যে সে ভুলে গেছিল ঘন্টাখানেক আগেই সে প্রাসাদের সাবান দিয়ে চান করে এসেছে।

গুহায় ফিরে কুকুর আলো জ্বালল। দেখল বড় শিঙা পাদ্রির জোব্বা দিয়ে আপাদমস্তক মুড়ে ঘুমোচ্ছে। নিচে নদীতে দুটো সমুদ্র-গাভী নলখাগড়ার মধ্যে হুটোপাটি করছিল। শনে আটকান ফেনার ওপর তারা লাফঝাঁপ দিচ্ছিল।

৫.

বড় শিঙা আরও আরও বেশি করে বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। দিনরাতের যে কোনও সময়ে গ্রামের চারপাশে মাঝেমধ্যেই গটগট করে পাক খেয়ে আসছিল। কিংবা কোনও একলা দোয়েলের খোঁজে অথবা বেত বা পর্ণ কিংবা ড্রাগন ফলের খোঁজে বনের কেয়ারটেকার থাকা সত্ত্বেও সে চক্কর কাটতে যেত। তাছাড়া হাইওয়ের মাঝে থাকা সরাইখানায় রাত থেকে যে সাহসে পান করেই চলেছিল বড় শিঙা, তাতে দিনে দিনে তার লোভ বেড়েই গিয়েছিল। বারকয়েক সে গুয়াখিরো চাষিকে ঘোড়ার ওপর থেকে ফেলে দিয়ে তারপর লাঠি দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে তার থেকে কোমরের বেল্ট নিয়ে এসেছিল। এইসব দৌড়গুলোয় কুকুর তার যথাসাধ্য সাহায্য করেছিল বড় শিঙাকে। যাই হোক আগের চেয়ে কুকুর কম খেত। তার জন্য কোয়েল, সারস বা গালিনুয়েলার ডিম খাওয়া সে কারণেই বড্ড বেশি জরুরি হয়ে পড়েছিল। তার ওপর বড় শিঙা ক্রমাগত একটা ছায়ার মতো ভয়ে বাস করত। কুকুরের একবার নিচু গলায় ঘেউ ঘেউ শুনলেই চুরি করে আনা অস্ত্র ছুঁড়ে দিত তার দিকে নইলে গাছে চড়ে বসত।

বসন্তকালের ঝুটঝামেলার পরে এখন গ্রামের কাছাকাছি যেতে কুকুরটা প্রতিবার আরও বেশি করে অনিচ্ছা প্রকাশ করত। ওখানে বড্ড বেশি বাচ্চাকাচ্চার বাস। তারা খালি পাথর ছোড়ে, লোকজন বেশি বেশি লাথি কষায় কিংবা তার গায়ের এতটুকু গন্ধ নাকে গেলেই সে তল্লাটের কুকুরগুলো একেবারে বাহিনী তৈরি করে ঘেউঘেউ শুরু করে সমস্বরে। তাছাড়া বড় শিঙা রাতে অনিশ্চিত পায়ে ফিরত। তার মুখ থেকে এমন একটা গন্ধ বেরুত সেটা তামাকের চাইতেও কুকুরের বেশি অসহ্য লাগত। সে কারণে মালিক যখন একটা আলো ঝলমলে বাড়িতে ঢুকতে যেত কুকুর একটা বুদ্ধিমান দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখত। এভাবেই সে রাত কাটিয়ে দিচ্ছিল। একদিন রাতে একজন কালো পুডিং বিক্রেতার বাড়িতে বড় শিঙা বেশি সময় আটকে পড়েছিল।

শিগগিরই কুঁড়ে ঘিরে ফেলল একদল সাবধানী লোক যাদের হাতে  দেশি মদের বোতল। একটুক্ষণের মধ্যেই বড় শিঙাকে ল্যাংটো অবস্থায় চিল চিৎকার করতে করতে রাস্তায় দেখা গেল। বের করে দিয়েছে ওরা। কুকুর যখন অচেনা লোকগুলোর গায়ের গন্ধ শোঁকা শেষ করে ফেলেছে সে ততক্ষণে পাহাড়ের মাথায় চড়তে নলখাগড়া বনের পাশ দিয়ে দৌড় দিল।

পরদিন বড় শিঙাকে পথ দিয়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল। সারা গায়ে তার ক্ষত। তাতে আবার সারবার জন্য নুন দেওয়া। ঘাড়ে হাঁটুতে কামড়ের দাগ। তাকে সন্ত ফার্দিনান্দের বেনেমেরিতার চার বাহিনী তাড়া করে আসছিল। ওরা তাকে দু পা অন্তর লম্বা লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল যেন সে চুরি করেছে কিংবা মদ গিলেছে অথবা কোনও খারাপ কাজ করেছে।

৬.

কুকুর উপত্যকার ওপর ঝুলে থাকা পাহাড়ের কার্নিশে বসল। তারপর চাঁদের দিকে চেয়ে খুব কাঁদল। গোলাকার চাঁদ যখন তার চারপাশে আলো ছড়িয়ে পৌঁছেছিল তখন মাঝেমাঝেই একটা গভীর কষ্ট তার মন ছেয়ে ফেলছিল। আশপাশের গাছের পাতায় তার ছায়া পড়ছিল। বৃষ্টির রাতে ঝলমলে গুহার ঘরগুলো তার জন্য চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন শীতে তার কাছে এগিয়ে আসা মানুষের উষ্ণতা কেমন হয় তা চিনত না সে। কে তার গলায় তামার বকলস পরিয়ে দিয়েছিল সেকথাও মনে করতে পারত না। পাদ্রির জোব্বাটা সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ঘুমোতে বড় কষ্ট হতো। ক্রমাগত শিকার করে যেত। বদলে যাদের খাওয়া যেত না, তাদের প্রতি অনেক সহ্যক্ষমতা বেড়ে গেছিল তার। গরম পাথরের মায়া কাটিয়েছিল সে। উলটে চুরিও করত না। কারণ বড় শিঙা তখন বেল্ট কেড়ে আনা বা মাখন সংগ্রহ করতে গিয়ে আর সেসব পাহারা দিত না। তার ওপর সাপের লেজ ধরে পাকড়াতে গেলে সে গন্ধ তার অসহ্য লাগত। যা কি না অন্যের বাধার কারণের ওপর নির্ভর করত সেসব বাধাগুলোই তার আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল। ভীষণ খিদে পেলে―নোংরা খিবেরো চাষিদের সঙ্গে সঙ্গেও ঢুকে যেতে পারত―কিন্তু তাছাড়া কখনই নয়।এখন সে জলচর পাখি, নকুল, ইঁদুর আর গ্রামের মুরগির খোয়াড় থেকে পালিয়ে আসা অন্যসব মুরগি দিয়েই খুশি থাকত। যাই হোক লোকটাকে ভুলেই যাওয়া হয়েছিল। কুকুর খুঁজছিল মানুষের প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে গোপন কোনও আশ্রয়। মোটা বট জাতীয় ড্রাগো গাছ ঘেরা দুনিয়ায় যেখানে নতুন কাঠের আলবারকা বুটের আওয়াজে ঢেকে যায় বাতাসের শব্দ। যেখানে অর্কিডের দুলুনি, কেঁচোর সরসর, সাদা কানওয়ালা সবুজ সরীসৃপেরা বুকে হেঁটে চলে, ইত্যাদি সেইসব জিনিষ যা ওরা মানুষেরা কী ভীষণ বাজে বলেই জানে, আর সে কারণেই সেসব যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে যায়। ওখানে ধ্বংসাবশেষ ছিল। তাদের পাঁজরের ওপর শূন্যতা আঁকা, গাছপালার জঙ্গলে আটকে থাকা উল আর কাঁটা ছিল না ততদিনে।

আগিনালদো গাছে পাতা গজাতে শুরু করলে বসন্তকাল এল। একদিন বিকেলে একটা অজানা অস্থিরতা তাকে গ্রাস করতে লাগল। কুকুর নতুন করে সেই মাদির গন্ধটা পেতে শুরু করল, এবার আরও শক্তিশালী আরও বিদ্ধকর গন্ধ, যে কারণে তাকে পাহাড় থেকে নেমে পালাতে হয়েছিল। এখনও চিৎকার করতে করতে পাহাড় থেকে নেমে পড়ল। এই দফাতে কুকুর খুব সতর্কভাবে চিহ্ন অনুসরণ করতে লাগল। একটা স্রোত টপকে পেরিয়ে আসার পর আরও দৃঢ়ভাবে। এখন আর ভয় নেই তার। গোটা রাত পায়ের চিহ্ন দেখে দেখে নাক মাটিতে ঠেকিয়ে হাঁটল। জিভের ডগা থেকে লালা ঝরতেই লাগল। ভোরবেলা গন্ধটা একদম সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছুল। সেখানকার জিবারো কুকুরদের দলের সামনে পড়ে গেল। অনেক অনেক পুরুষ কুকুর, গায়ে গতরে নেকড়ের মতো। জ্বলজ্বলে চোখে, পায়ের পাতায় ভর দিয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে ওখানে দাঁড়িয়েছিল তারা। আক্রমণ করতে উদ্যত। তাদের পেছনেই মাদির গন্ধটা আটকে গিয়েছিল।

কুকুর একটা বিশাল লাফ দিল। জিবারোরাও মাথা লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। শরীরগুলো একটা আর একটার সঙ্গে পাশাপাশি লাগান। বৃত্তাকারে দাঁড়াল। কুকুর দ্রুত শুনতে পেল চিৎকার যেন তীক্ষè হুলের মতো। মুখভর্তি রক্ত। কানগুলো খাড়া। সে যখন বুড়ো জন্তুটার কাছে গেল দেখল তার গলা চেরা, অসহায় রাগে বাকিরা পিছিয়ে গেল। তখন কুকুর ঘেরাও জায়গার মাঝে গিয়ে দাঁড়াল। খাড়া চুল আর ধূসর গায়ের কুকুরীর সঙ্গে শেষ লড়াই লড়বার জন্য এগিয়ে গেল সে, যেটা তখনও বাইরের কুকুরগুলোর ধারাল হাতের কাছ থেকে বেঁচে আছে। তার পেটের ছায়ায় চলার পথের চিহ্ন হারিয়ে গেল।

৭.

জিবারোরা দল বেঁধে শিকার করে। সে কারণে বড় টুকরো খোঁজে তাঁরা, যাতে সেখানে অনেকটা মাংস আর হাড্ডি থাকে। যদি কোনওদিন একটা হরিণ ধরা পড়ত তো সেটায় পুরো দিনের কাজ চলে যেত। প্রথমে ঘটনা ঘটবে। পরে জন্তুটা এক লাফে যদিও বা নিজেকে বাঁচাতে পারে একটুর জন্য, শর্টকাট। পরে যখন গুহা এল তাকে বাঁচাতে, অবরোধকাল। অজস্র ব্যথা পাওয়া বা সহ্য করা সত্ত্বেও জন্তুটা, যে কি না বরাবরই একপাল হিংস্র জিবারোর সামনে মরে যায়, সে তখনও জীবিত। কুকুর তখন শরীরের ওপর বাদামি চুলগুলোকে টেনে উপড়ে ফেলতে ফেলতে বাছতে শুরু করেছিল আর সেটার উষ্ণতা থাকা সত্ত্বেও ঘাড়ের আর্টারি থেকে কিংবা ছিঁড়ে আনা কানের শেকড়গুলো থেকে গরম রক্ত খাচ্ছিল। জিবারোদের অনেকেই একটা চোখ হারিয়েছিল। বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে আনা হয়েছিল ওটা। আর প্রত্যেকের গায়ে আঘাতের চিহ্ন, লাল চামড়া ছাড়ানো দগদগে ঘা আর খুবলানোর ক্ষত। মারামারির দিনগুলোয় কুকুরগুলো নিজেদের মধ্যে লড়ত, সেইসময় মাদিগুলো নির্বিকার মুখে লড়াইয়ের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করত। অজানা মানুষের ঘণ্টি বৃষ্টির ছাঁটের সঙ্গে ভেসে আসা সেই আওয়াজ কুকুরের দূরতম স্মৃতিতেও আসত না।

একদিন আঙুর কাঁটাঝোপ আর বাজে জিনিসের ক্ষেতের ভেতর বরাবরকার মতোই কিছুর গন্ধ শুঁকে চলছিল জিবারোর দল। সাবধানে শামুকগুলোর শুঁড় বাঁচিয়ে পৌঁছে গেছিল সেইখানে যেখানে মরা মানুষের মতো মুখওয়ালা একখণ্ড পাথর পড়েছিল। মানুষ সবসময় হাড়গোড় আর নানান বর্জ্য ফেলে রেখে যায়। কিন্তু ওদের থেকে সবচেয়ে সাবধানে থাকতে হয়। কেননা, ওরা হলো সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী। সেকারণে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে জন্তুরা। সেভাবে সুবিধা হয় দেখতে লাঠি আর জিনিস নিয়ে তারা কী করছে। জিবারোর দলটা চেঁচানো বন্ধ করে দিয়েছে।

হঠাৎ মানুষটার উদয় হলো। কালো গন্ধটা আসছিল। কিছু ভাঙা শেকল যেগুলো কোমর থেকে ঝুলছিল তার পায়ের তালে তালে চলছিল। অন্যগুলো আরও মোটা ডোরাকাটা পাজামার তলা থেকে বাজছিল। কুকুর চিনতে পারল বড় শিঙাকে।

কুকুর! আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে বলে উঠল সে―কুকুর!

কুকুর ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। পায়ের গন্ধ শুঁকতে লাগল যদিও ছুঁয়ে থাকা ছাড়েনি সে। এক পাক ঘুরে নিল, ল্যাজ নাড়াতে লাগল। যখন তাকে ডাকত সে তখন পালাত। আর যখন তার ডাক পড়ত না দেখে মনে হত সেই মানুষের গলার স্বর শুনতে চাইছে। সেই গলা যা অন্য সময় বুঝে যেত কিন্তু এখন এত অচেনা শোনাচ্ছিল। এত বিপজ্জনকভাবে নির্দেশ অগ্রাহ্য করার মতো সে স্বর। শেষ পর্যন্ত বড় শিঙা কয়েক পা এগোল, তার ভোঁতা হাতটা মাথার দিকে বাড়াল। একটা অদ্ভুত গলায় চিৎকার করে উঠল কুকুরটা। বোবা আর কান্না কান্না গলার মিশ্রণ সে আওয়াজ লাফ দিয়ে উঠে এল কালো গলার কণ্ঠায়। হঠাৎ মনে পড়ল যেদিন একজন ক্রীতদাস পাহাড়ে পালিয়ে উঠেছিল সেদিন সেই মালিক লোকটার বলা পুরনো উপদেশগুলো।

৮.

যখন মাদির গন্ধটা আর পাচ্ছিল না, সময়টা শান্ত হয়ে এসেছিল। জিবারোরা ঘুমাচ্ছিল। এতখানি ক্লান্ত ছিল যে টানা দুদিন ধরে ঘুমাচ্ছিল ওরা। ওপরে গাছের ডালে সূর্যের তেজ ঝিকিমিকি করে ছড়িয়ে পড়ছিল। ওরা আশা করেছিল যে কাজ শেষ না করেই দলটা হাঁটা শুরু করবে। কুকুর আর ধূসর রঙের মাদি কুকুর দুজনের এত আনন্দ হচ্ছিল যা আগে কখনও হয়নি। তারা বড় শিঙার পরিপাটি শার্টটা নিয়েই খেলা করছিল। দাঁতের ছুঁচলো অংশে কতখানি দম আছে তা পরখ করবার জন্য প্রত্যেকেই একধার থেকে কথা বলছিল।

যখন একটা সেলাই খুলে গেল দুজনেই ধুলোর পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। তারপর আবারও চোখে চোখ রেখে প্রায় নাকে নাক ঠেকিয়ে নতুন উৎসাহে শুরু করল গড়াগড়ি। গলার আওয়াজ এত উঁচুতে উঠল যে তা গাছের ডগার সীমাও ছাড়িয়ে গেছিল।

বহু বছর ধরে পাহাড়ি শিকারিরা শেকল আর হাড়গোড়ের বিপদ এড়াতে সেই পথ মাড়ানো এড়িয়ে যেত।

(লেখক পরিচিতি : কিউবান কথাসাহিত্যিক আলেজো কার্পেন্তিয়ার ১৯০৪ সালে সুইজারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তার জন্মস্থান ত্যাগ করে কিউবার হাভানে বাস করতে শুরু করেন। সঙ্গীত বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। সাংবাদিক, নাট্যকার, একাডেমিক প্রবন্ধকার হিসেবে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। আধুনিক যাদুবাস্তবতার জনক তিনি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের নাম হলো El reino de este mundo (The Kingdom of this World)। ১৯৮০ সালে তিনি ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে মারা যান।)

অনুবাদক:

মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত এযাবৎ পাঁচটি অনূদিত বই ও বাংলায় যৌথভাবে একটি মৌলিক কবিতার বই। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নিয়মিত অনুবাদ করে থাকেন।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares