ল্যাটিন আমেরিকার ১৫ লেখকের অনূদিত গল্প : পৃথিবীর সবচেয়ে বেঁটে নারীটির গল্প : ক্ল্যারিস লিসপেকটর : অনুবাদ : রোখসানা চৌধুরী

ফরাসি পরিব্রাজক ও শিকারি মার্সেল প্রেত্রো, একদিন আফ্রিকান বিষুবরেখার ঠিক মাঝামাঝি জায়গা বরাবর পিগমি আদিবাসীদের সংস্পর্শে এসে বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা লাভ করল। সে জঙ্গলের ভেতর আকারের দিক দিয়ে অতিক্ষুদ্র পিগমি প্রজাতির সন্ধান পেয়ে কৌতূহলবশে জঙ্গলের আরও ভেতরে ঢুকতে লাগল। যেন একটা বাক্সের ভেতর আরেকটা, তার ভেতর আরেকটা, এভাবে জঙ্গলের যত ভেতরে যাওয়া যায় ততই তাদের ছোট আকারে দেখা যেতে থাকে। এভাবে কঙ্গোর একদম মাঝখানে গিয়ে সে আবিষ্কার করল সবচেয়ে বেঁটে প্রজাতিটি। মার্সেল তখন ভাবছিল, প্রকৃতির রহস্যময়তা কখনও কখনও তার নিজেকেও যেন ছাড়িয়ে যায়।

প্রচুর মশা, পোকা-মাকড়, গাছপালা, উষ্ণ ভেজা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর তার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ তাজা সুস্বাদু শাক-সবজি গ্রহণ করতে করতে সে মুখোমুখি হয়ে গেল ঐ জায়গার সবচেয়ে খর্বকায় নারীটির। তার উচ্চতা পঁয়তাল্লিশ সেন্টিমিটারের বেশি হবে না অথচ সে ছিল পূর্ণ যুবতী এবং কালো―একদম শিম্পাঞ্জির মতো কালো। সে সংবাদপত্রে খবর লিখে পাঠাল। মেয়েটি একটি গাছের একদম চূড়ায় তার আরেক খর্বকায় সঙ্গীকে নিয়ে বাসা বেঁধে থাকে। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা যখন বেড়ে চরম আকার ধারণ করছিল, গাছের ফলমূল পেকে ভরে উঠছিল মিষ্টি রসে, ঠিক সেই সময় মেয়েটি গর্ভধারণ করল। গুমোট গ্রীষ্মের থমধরা দুপুরে হঠাৎই মার্সেল সেই বর্ডার লাইনে এসে পৌঁছল যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে খাটো মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে সে এতটাই অবাক হলো যে বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুধাবনে যথেষ্ট সময় নিলেও ধীরে ধীরে সে চিন্তাশক্তি ফিরে পেল এবং দ্রুতই সে মেয়েটির একটি নামও ঠিক করে ফেলল ‘ছোট্ট ফুল’ নামে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির প্রজাতিগত পরিচিতিকেও চিহ্নিত করতে সক্ষম হলো।

সে তার সম্পর্কে অতিদ্রুততার সঙ্গে তথ্য উপাত্ত জোগাড়ের কাজে লেগে পড়ল। আসলে এই মেয়েটির প্রজাতিটি খুব ধীরে বিলোপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ ছাড়াও কারণ হিসেবে ছিল দূষিত বাতাস, খাদ্য ঘাটতি আর বন্য জন্তুর খাদ্য হিসেবে নিঃশেষ হওয়া। বিষাক্ত এই জলজ বনভূমিতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল তাদের চারপাশ ঘিরে থাকা নীরব ঘাতক রূপী রাক্ষুসে প্রাণীরা। তারা বানরগুলোকে উত্তেজিত করে তুলত যাতে তারা পিগমিদের ডেকে নিয়ে আসে আর তারা খেয়ে ফেলতে পারে। এভাবেই পিছু হটতে হটতে তারা আফ্রিকার অন্তঃস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল। এখানেই অস্ট্রেলিয়ান পরিব্রাজক তাদের দেখা পেয়েছিল। টিকে থাকার কৌশল হিসেবেই তারা গাছের চূড়াগুলো বেছে নিচ্ছিল। সেখান থেকে তারা নামত বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে। যেমন শস্য ভাঙান, রান্না করা কিংবা শাক-সবজি সংগ্রহের জন্য নেমে আসত।

বাচ্চা কাচ্চা হলে অবশ্য তাদের আটকে রাখা যেত না। তবে এত ছোট্ট বেঁচে থাকা জীবনের জন্য ঐটুকু স্বাধীনতা আসলে তাদের পাওনাই ছিল। যদিও হিংস্র জন্তুর ভয় কখনও তাদের পিছু ছাড়েনি। এমনকি তাদের ভাষা পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ছিল। সে ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত আর সরল। এমনকি খুব প্রয়োজন না-হলে জলজ বনভূমির মানুষেরা বেশির ভাগ সময় আকার ইঙ্গিতেও কাজ চালিয়ে নিত, কখনও কখনও পশু-পাখির আওয়াজে ডাকাডাকিও চলত। দেব দেবতার তুষ্টি আয়োজনে তারা যখন ড্রাম বাজিয়ে নাচত, কখনও না কখনও দানবীয় আক্রমণ এসে হামলা করে―সেজন্য পুরুষেরা সবসময় চারপাশে লক্ষ্য রাখত। কারণ তারা কখন কোন স্বর্গ-নরক থেকে অকস্মাৎ হানা দেবে এর কোনও আগাম ধারণা করা যেত না।

পরিব্রাজকের আবিষ্কারের মুহূর্ত পর্যন্ত ঐ অঞ্চলের বেঁটে মানুষগুলোর জীবন-যাপন ছিল মোটামুটি একরকম। মার্সেলের হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছিল কারণ পৃথিবীতে কোনও রত্নই আর বিরল নেই। এমনকি ভারতীয় ঋষিদের প্রজ্ঞাও এখন সুলভ। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষটিও এমন বিস্ময়ের সম্মুখীন হয়েছেন কি না জানা নাই, এ যেন অষ্টম আশ্চর্যের মুখোমুখি হওয়া আর কি। তার সামনে তখন পৃথিবীর সুন্দরতম স্বপ্ন দণ্ডায়মান। এর সঙ্গে কখনও অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা চলতেই পারে না।

পরিব্রাজক অতি নম্রভাবে গভীর অনুভব সহকারে তাকে সম্ভাষণ করল ‘অ্যাই মেয়ে, তুমি দেখছি এক ছোট্ট সুন্দর ফুল।’ এত নিবিড় গভীর প্রকাশ তার স্ত্রীও তার কাছ থেকে কখনও কল্পনা করতে পারত না। সেই মুহূর্তে, ছোট্ট মেয়েটি অস্বাভাবিক আবেগে নিজেকেই আঁচড়ে খামচে দিচ্ছিল। আর পরিব্রাজক যেন তার সারাজীবনের দুঃসাহসিক অভিযান, দুর্দমনীয় লক্ষ্য আর উচ্চাকাক্সক্ষার চূড়ান্ত পুরস্কারটি পেয়ে যাচ্ছিল তখন। তার সারাজীবন ছিল বিভিন্ন চড়াই-উতরাইয়ের অভিজ্ঞতায় পূর্ণ, সেদিক থেকে সে চোখ ফিরিয়ে এই বিস্ময়ের পানে আবিষ্ট হয়ে রইল দীর্ঘ সময়।

লিটল ফ্লাওয়ারের ছবি রবিবারের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছাপা হলো, সেখানে যেন মেয়েটির নবজন্ম হলো। তার গায়ে একটা শাল জড়ান ছিল, গর্ভাবস্থা ছিল শেষ পর্যায়ে কাজেই উদর ছিল স্ফীত, নাক চ্যাপ্টা, কালো মুখ, চোখগুলো গভীরভাবে বসান, পা-গুলো দুপাশে ছড়িয়ে বসেছিল সে, দেখতে অবিকল একটা কুকুরীর মতোই লাগছিল তাকে। একই দিনে শহরের কোনও এক অ্যাপার্টমেন্ট ফ্ল্যাটে বসবাসরত কোনও এক নারী তার ঐ ছবি পত্রিকায় দেখার পর দ্বিতীয়বার ভ্রƒক্ষেপ করেনি ছবিটির দিকে, কারণ ‘এটা তাকে ভীষণভাবে বিরক্ত করে তুলছিল।’

অন্য আরেক ফ্ল্যাটের পাঁচ বছরের বালিকাটি লিটল ফ্লাওয়ারকে নিয়ে বলা তার বাবা-মায়ের ভাষা আড়াল থেকে শুনে ভীত হয়ে পড়েছিল। এই বাড়িতে সে ছিল সবচেয়ে ছোট সদস্য। অতিরিক্ত আদর-সোহাগ পাওয়ার জন্য এটা ছিল মূল কারণ। আবার তার উপর মাত্রাতিরিক্ত শাসনও ছিল সবার তরফ থেকে; সেটাও সবার চেয়ে ছোট বলেই। তো সেই বালিকাটির মনে লিটল ফ্লাওয়ার সম্পর্কে এমন এক ধরনের অনুভব এল, যা কি না অনেক দিন পর অন্য কোন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গে তার একই ভাবনার উদয় হয়েছিল, এখন যেটি তার অপরিপক্ব চিন্তাপ্রসূত অথচ সুদূর কোনও এক ভবিষ্যতে পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে ভাবনাটি হাজির হয়েছিল এভাবে―‘দুর্ভাগ্যের কোনও সীমারেখা থাকে না।’

একই সময়, অন্য একটি বাড়িতে বিবাহ প্রসঙ্গে অনিচ্ছুক অতিষ্ঠ একটি যুবতী মেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ল, মা দেখেছ তার ছবিটা ভালো করে দেখ―বেচারিকে দেখ, কি ভাবভঙ্গি।

হুমম, যুবতীর মা মাথা নেড়ে বলল, পরিস্থিতি কঠিন, অবশ্য গর্বিতও। কিন্তু এই বিষণ্নতা তো একজন জন্তুর মামনি, মানুষের নয়।

ওহ মা। যুবতী মেয়েটি প্রতিবাদ করে উঠল। আরেকটি বাড়িতে তখন এক বুদ্ধিমান বাচ্চা আরও অধিক মহৎ আইডিয়ার উদ্ভব ঘটাচ্ছিল।

‘মাম্মি আমরা ঐ ছোট্ট মহিলাটিকে আমাদের ছোটবাবু পলের বিছানার পাশে রেখে দিতে পারি না ? সে জেগে উঠে ভয় পেয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিবে, তখন কি মজাটাই না হবে। আমরা ঐটাকে পুতুল বানিয়ে খেলতে পারব, তাই না মা ?

তার মা তখন বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের সাজসজ্জা করছিল। তার মনে পড়ল তার রাঁধুনী কোনও এক সময়ে তাকে তার ছোটবেলার গল্প শুনিয়েছিল। সে বড় হয়েছিল এতিমখানায়। খেলবার জন্য কোনও খেলনা ছিল না সেখানে। হঠাৎ একজন বালিকার মৃত্যু ঘটলে এতিমখানার বালিকারা দুষ্টুমি করে খেলাচ্ছলে তার লাশটি লুকিয়ে রাখে কাবার্ডের ভেতর, শুধু তাকে পুতুল ভেবে খেলবে বলে। তারা সত্যি সত্যি এতিমখানার ওয়ার্ডেন মাসির চোখ ফাঁকি দিয়ে তাকে নিয়ে খেলা করেছিল, গোসল করিয়েছিল আর চকলেট টকলেটও মুখে তুলে দিয়েছিল।

সেই কাহিনি মনে পড়তেই সে চুলের ক্লিপ আর চিরুনি হাতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। সে মনে মনে স্বীকার করে নিল, ভালোবাসারও নিষ্ঠুর দিক রয়েছে। সে ভাবল সুখী হতে গেলে হিংসা-বিদ্বেষটাও জীবনের খুবই স্বাভাবিক অংশ। সে এটাও জানত যা কিছু নিয়ে খেলা করা যায় তার প্রতি হিংসার আচরণই করতে হয়। অসংখ্য অগণিতবার আমরা ভালোবাসার জন্য, ভালো থাকার জন্য হত্যা করেছি পরোক্ষভাবে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। সে তার দুষ্টুমিতে ভরা সন্তানের মুখের দিকে তাকাল, আর মনে হলো যেন ভয়ংকর মুখের কোনও অচেনা আগন্তুককে দেখছে এবং তার চেয়েও ভয় পেল নিজের দিকে তাকিয়ে। শরীরের চাইতেও অধিক যে আত্মা তার দিকে তাকিয়ে দেখল, সে উৎসুক হয়ে ঝুঁকে আছে জীবন আর সুখের দিকে, তীব্রভাবে। তারপর আবার সে তার শিশুটির দিকে তাকাল। গোপন সুখে তার মন ভরে গেল। কি সুন্দর বেড়ে উঠছে শিশুটি। দাঁত না উঠতেই তার বাচ্চাটা কেমন সবকিছু কামড়াতে পারে, দেখে মনে হলো ওকে আরেক সেই নতুন স্যুটে কেমন দেখাবে ? অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে সে তার শিশুটির আরও অধিক পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দিতে চাইল, আরও আরও শৌখিন পোশাকের কথা ভাবল কারণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে শৌখিনতা, বিলাসিতা কিংবা অত্যধিক পরিচ্ছন্নতাই পারে ঐ কালো বানরমুখীর চাইতে তাদের আলাদা করে দেখাতে।

অবশ্য অবশ্যই সে নিজেকে আর তার সন্তানকে ঐ মেয়েটির সঙ্গে দুস্তর ব্যবধানের ফারাক রয়েছে বলে প্রমাণ করে দিতে বদ্ধপরিকর।

মা আবার বাথরুমের আয়নার দিকে তাকায়, তাকিয়ে হাসে মৃদুভাবে, খুব সচেতনভাবেই মনে মনে কালো বানরমুখীর পাশে নিজের মুখ বসিয়ে একটা সীমানা প্রাচীর দেখতে পায় যেখানে সহস্রাব্দের ফারাক চোখে পড়ে। অথচ বহুদিনের অভিজ্ঞতা মারফত সে এটাও জানত, এইসব রবিবারগুলো পৃথিবীতে আসে, যা তার নিজের কাছ থেকে নিজে কখন যেন হারিয়ে গেছে, নিজেকে সে অনেকটা আটকে ফেলেছে চার দেয়ালের ভেতর আর তা সহস্রাব্দ কাল আগেই। অনুভব করলেও চেতনায় নেই আর সেসবকিছু।

অন্য আরেকটি বাড়িতে চার দেয়ালের ভেতরের মানুষগুলো পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চি উচ্চতার নারীটিকে নিয়ে উত্তেজনায় ফেটে পড়ছিল। তারা একটা মাপের ফিতা নিয়ে বসে বসে মেয়েটিকে নিয়ে সব কাল্পনিক আবিষ্কারের ভাবনায় ডুবেছিল। তবে মেয়েটি ছিল যে কোনও রকম কল্পনার অতীত অচিন্ত্যনীয় রকমের ছোট। পরিবারের প্রতিটি সদস্য উত্তেজনায় ছটফট করছিল, স্থির থাকতে পারাটা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তারা যে তবুও কিছু করে ফেলছিল না, এটা ছিল নিতান্তই তাদের বদান্যতা। তাদের উৎসুক মন কিন্তু যে কোনও মুহূর্তে জেগে ওঠার জন্য প্রস্তুত ছিল। কেইবা না চায়, কোনও মানুষকে সম্মোহিত করতে কেবল আত্মসন্তুষ্টির জন্য? কিন্তু দুনিয়ার মজাটা হলো এই যে, এরকম মুহূর্তেও কোনও কোনও নীরস আদম সন্তানের উপস্থিতি দেখা যায় যাদের মধ্যে আবেগ অনুভূতি বলতে কিছুই থাকে না।

সেরকমই একজন এই পরিবারের বাবাটি। আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে পত্রিকার দিকে চোখ রেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি সেই মেয়েটি এখানে থাকলে এই মুহূর্তে আমাদের পরিবারের বিশাল ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়ে যেত। সাধারণত আমাদের কোনও আলোচনাই ঝগড়া ছাড়া শেষ হয় না।’

‘তুমি সব সময়ই খালি অলক্ষুনে কথা বলো।’―মা বলে উঠল।

‘মা ভাবতে পারো তার বাচ্চাটা আরও কত্ত ছোট হবে।’―তাদের তেরো বছরের কিশোরী মেয়েটি মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠল।

‘তার বাচ্চাটাও বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র কালো বাচ্চা হিসেবেই জন্ম নেবে।’―মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠল মা―‘খালি ভাবো যদি এই টেবিলের উপর মেয়েটিকে রাখা যেত ফোলা পেটসহ কেমন দেখাত ?’

‘যথেষ্ট হয়েছে এইসব বিরক্তিকর আলাপ।’―অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে পত্রিকা ফেলে উঠে দাঁড়াল বাড়ির গৃহকর্তাটি।

‘কি আশ্চর্য, তোমাকে তো মানতেই হবে জিনিসটা খুবই অদ্ভুত, আর কখনও এমন শুনিনি আমরা এই জীবনে। তুমিই একজন, দেখলাম যার কাছে বিষয়টির কোন গুরুত্ব নেই। গৃহকর্তার আকস্মিক বিরক্ত প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ গৃহিণী বলে উঠল। আর হ্যাঁ, কী ছিল সেই অস্বাভাবিক অসাধারণ বিষয়টি মেয়েটির মধ্যে, যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি ?

সম্ভবত তাঁর হৃদয়, হতে পারে সে কালো। এরই মাঝে সে তার বুকের ধুপপুকানির ভেতর আরও অসাধারণ কিছু খুঁজে পেয়েছিল―তা ছিল তার সন্তান। পরিব্রাজক মনোযোগ সহকারে তার ফোলা পেটের দিকে তাকিয়ে থেকে আবিষ্কার করতে পেরেছিল হৃদস্পন্দনের বিরল অনুভবকে। তার সেই অভিজ্ঞতা ছিল কৌতূহল আর উৎসাহের যৌথ ফলাফল। যেন আবিষ্কারের সাফল্যে শোভাযাত্রা বের করার মতো বিজয়োল্লাস।

আসলে সবচেয়ে অসাধারণত্ব ছিল তার হাসিতে। ছোট্ট ফুলের স্মিতহাস্য ছিল উষ্ণ, মন ভোলানো। সে যেন নিজেকে আবিষ্কার করছিল প্রতিমুহূর্তে, প্রতিনিয়ত সে যেন জেগে উঠছিল অনির্বচনীয় আনন্দে যা কখনও আগে হয়নি এমনভাবে। এমনকি যখন গাছের শাখায় শাখায় লাফিয়ে বেড়াত তখনও না। অথচ এখন এই শান্ত নীরব মূহূর্তে কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে তার এইসব অনুভবকে সে থামিয়ে রেখেছিল। হঠাৎই সে হেসে উঠল, অনন্যসাধারণ সেই হাসি―এই সেই হাসি, যার আছে তার কোনও বাক্য বিনিময়ের প্রয়োজন হয় না। এই সেই হাসি পরিব্রাজক শেষ পর্যন্ত যে হাসির কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে না। সে নিজেই যেন সেই হাসিকে উপভোগ করছিল। কিন্তু তবু সে আবেগে বশীভূত হয়নি, বিভোর হয়ে পড়েনি স্বয়ং অস্তিত্বের ভেতর। সে নিজেকে এতটাই স্বতন্ত্র রেখেছিল যে তার জন্তসুলভ হাসিও সুখের নাজুক প্রকাশ ঘটাচ্ছিল। পরিব্রাজক সবকিছু মিলিয়ে অপ্রতিভ আর বিব্রত হয়ে পড়েছিল। তার প্রধান অসাধারণত্ব ছিল তার হাসিতে, দ্বিতীয়টি ছিল তার শরীরের ভেতর যা ইতোমধ্যে নড়াচড়া শুরু করেছিল।

তার আরও অসাধারণত্ব ছিল তার উষ্ণ বুকে, যেখানে সে ভালোবাসা অনুভব করছিল। সে শ্বেতাঙ্গ পরিব্রাজককে ভালোবেসে ফেলেছিল। সে যদি বলতে পারত, যদি প্রকাশ করতে পারত তার সেই ভালোবাসার কথা তাহলে সে গর্বিত হতে পারত। কিন্তু প্রকাশ করলে সেই গর্ববোধ কমে যেতে পারত কারণ সে পরিব্রাজকের হাতের আংটি আর পায়ের বুট জুতাও ভালোবেসে ফেলে ছিল। এতে পরিব্রাজক হতাশ হয়ে পড়তে পারত আর ছোট ফুলের তা বুঝতে পারারও কথা ছিল না।

ভালোবাসার আদি অকৃত্রিম শর্ত ভুল বোঝাবুঝি। ধরা যাক, কেউ যদি ভুলক্রমে অনেকগুলো সন্তানের জনক জননী হয়ে পড়ে তাহলে মানুষ তাদের তাৎক্ষণিক ঐ মুহূর্তের রোমান্টিক আবেগপ্রবণ মনকে ভুলে গিয়ে তাদের বেখেয়ালি বেহিসেবি আচরণকে দোষ দেবে। পরিব্রাজকের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল মেয়েটি তার বাহ্যিক সম্পদের প্রেমে পড়েছে। আদতে গহিন অরণ্যের ভেতর কোনও নাগরিক সভ্যতার বাঁধাধরা নিষ্ঠুর হৃদয়হীন সূত্রগুলো কাজে আসে না। এখানে ভালোবাসার মানুষটির বুট জুতাও কাউকে শিহরণ জাগাতে পারে। অদ্ভুত গায়ের রঙ যার হলুদাভ সেই ফর্সা মানুষটির হাতের আংটি ঝিলিক দিলে সেটাও ভালোবাসা বলে ভ্রম হতে পারে এমন নির্জন অরণ্যে। ছোট মেয়েটি ঝলকাচ্ছিল ভালোবাসায় আর হাসিতে। উষ্ণ ছোট্ট গর্ভধারিণী নারীটি।

আসলে পরিব্রাজকও তার হাসির বিপরীতে হাসির প্রত্যুত্তর দেবার চেষ্টা করছিল কিন্তু সে নিজেই বুঝতে পারছিল না একজন পূর্ণবয়স্ক পূর্ণ গড়নের মানুষের প্রতিক্রিয়া ঐ মুহূর্তে কেমন হওয়া উচিত।

অপ্রতিভ মানুষটির মুখে বিব্রত ভাবটির ঝলক ফুটে উঠছিল সবুজাভ গোলাপী অভায়। বিব্রতভাব কাটাতে সে মাথার হেলমেটটা বারবার ঠিকঠাক করতে চেষ্টা করছিল। আর এই চেষ্টাটা তার মনের ভেতরকার শৃঙ্খলাবোধকেও আহ্বান করল যেন। ছোট মানুষগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর করা, নোটস নেয়ার কার্যপ্রণালির রীতিমাফিক কাজের ভেতর ডুবে যেতে চাইল সে। ইতোমধ্যে ঐ আদিবাসীদের কিছু ভাষা-শব্দ অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত রপ্ত করেছিল সে। সে এখন যে কাউকে প্রশ্ন জিগ্যেস করার যোগাযোগে সমর্থ হয়েছে। ছোট মেয়েটিও উত্তর দিতে পারত সামান্যই। কিন্তু এই সামান্যতেও মেয়েটি ছিল অসামান্য। তার বাসস্থান যে গাছটি, গাছের উপর তার থাকার বাড়িটি এগুলো সে মেয়েটির ইশারাতেই জেনে ছিল। আসলে সব মিলিয়েই মেয়েটি সত্যি ছিল অনন্য, ছোট একটি ফুলের মতোই। সে কোনও কিছু না বললেও আসলে তার গভীর কালো চোখজোড়া অনেক কিছু বলে দিতে পারত। তার চোখজোড়া ছিল নিবিড় সম্মোহনী ক্ষমতায় পরিপূর্ণ।

পরিব্রাজক বেশ ক’বার সেই চোখের ঝলকানিকে নিজেও আপ্লুত অনুভব করেছিল। অসংখ্যবার তার নিজেকে সামাল দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতকিছুর পরেও তার মতো করে নিখুঁতভাবে পেশাদার কাজটি এত ভালোভাবে কেউ চালিয়ে নিতে পারত না।

খবরের কাগজ পড়া শেষে ভাঁজ করতে করতে কোনও এক ফ্লাটের বৃদ্ধা মহিলা বলে উঠল―‘খুব ভালো নাটক চলছে, এটা নাটক ছাড়া আর কিছু না, আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি―তবে খোদাই জানে তার মনের ভেতর কি আছে।’

অনুবাদক : প্রবন্ধকার, গবেষক, অনুবাদক, অধ্যাপক বাংলা বিভাগ

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares