ল্যাটিন আমেরিকার ১৫ লেখকের অনূদিত গল্প : নিলাম : মারিয়া ফেরনান্দো আম্পুয়েরো : অনুবাদ : ফারহানা রহমান

আশেপাশে অনেক মোরগের উপস্থিতি টের পাচ্ছি।

হাঁটু ভেঙে, মাথা লুকিয়ে ময়লা কাপড়ে পুরো শরীর ঢেকে চুপ করে লুকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি ঠিক কতগুলো মোরগ পেতে পারি।

আর এগুলোকে যদি খাঁচায় বা খোয়াড়ে ঢোকানো হয় তাহলে এদের সঠিক সংখ্যা ঠিক কত হতে পারে ? বাবা লড়াকু মোরগ পালে। আর যেহেতু বাবার সাথে সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই তাই সব জায়গায় আমাকেই যেতে হয়। প্রথম প্রথম অসহায় মোরগগুলোকে লড়াই করতে করতে ধুলোর ওপর মরে পড়ে থাকতে দেখে আমি খুব কান্নাকাটি করতাম। আর আমার এরকম কান্নাকাটি দেখে বাবা আমাকে ভীতু আর ন্যাকা বলত।

মাঝে-মাঝে গভীর রাতে দৈত্যের মতো বড় ভ্যাম্পায়ার কোনও মোরগ আমাকে গিলে খাচ্ছে এমন ভয়ানক স্বপ্ন দেখে আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠতাম। বাবা আমার বিছানার কাছে ছুটে এসে বকাবকি শুরু করে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘ওহহো! এত ন্যাকামি করো না তো, ওরা কি মানুষ নাকি যে এত ঢং করছ ? ওগুলো শুধুমাত্র কতগুলো মোরগ, বুঝলে ?’

এসব দিনের পর দিন দেখতে দেখতে একসময় আমিও এসব দৃশ্যের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। কান্নাকাটি থামিয়ে দিয়ে নিরাসক্তের মতো ধুলোবালির উপর রক্তাক্ত নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে পড়ে থাকা মোরগগুলোকে দেখতে লাগলাম। আর আমাকেই সবসময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পালক এবং রক্তাক্ত নাড়িভুঁড়িসহ মোরগগুলোকে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ওই জায়গাগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দিতে হতো। ওগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি বলতাম, ‘বিদায়! হে বীর মোরগেরা! স্বর্গে গিয়ে চিরকালের জন্য সুখে-শান্তিতে থেক তোমরা। ওখানে হাজার হাজার ক্ষেত-খামার রয়েছে যেখানে সারাদিন মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারবে। এছাড়াও রয়েছে খাওয়ার জন্য অগুনতি পোকামাকড় আর শস্য। সেইসাথে পাবে প্রেমময় কিছু সুখী পরিবার যারা তোমাদের মতো লড়াকু মোরগদের ভীষণ ভালোবাসে।

প্রতিটি মোরগ-লড়াইয়ের দিনেই কয়েকজন মোরগ-যোদ্ধা আমাকে কিছু চকলেট-ক্যান্ডি বা খুচরো টাকা পায়সা দিত যাতে ওরা আমার শরীর হাতাতে পারে এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে পারে। কিন্তু এসব গোপন কথা আমি আমার বাবাকে কখনও বলতে পারতাম না। খুব ভয় পেতাম। মনে হতো বাবা যদি এসব শুনে আবারও ধমকে উঠে বলে বসে, ‘ন্যাকামো করার আর জায়গা পাও না ? এত ন্যাকা হয়েছো কেন ? ওরা তোমার কি করবে ? ওরা শুধুমাত্র মোরগ-যোদ্ধা বৈ কিছু নয়, এত ভয় পাওয়ার কী আছে ? যতসব ঢং!’

একদিন রাতে লড়াইয়ের ময়দানে হেরে যাওয়া একটি মৃত মোরগকে আমি পুতুলের মতো করে কোলে করে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার সময় বুঝতে পারলাম যে ওটার পেট ফেটে নোংরা আবর্জনা বের হয়ে আসছে। আর সেইসাথে আমি আরেকটা বিশেষ ব্যাপারও খেয়াল করলাম যে সেইসব বীরপুরুষেরা, যারা মোরগ-লড়াইয়ের সময় একটা মোরগ যেন অন্য মোরগের পেট ফাটিয়ে দেয় সেজন্য উন্মাদের মতো চেঁচাতে থাকে তারাই কি না সত্যি সত্যি নাড়িভুঁড়ি বের করা মৃত মোরগদের পায়খানা আর রক্ত দেখলে ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলে। এসব অসভ্য লোকদের নোংরা স্পর্শ থেকে আর চুকচুক করে জানোয়ারের মতো করে চুমু খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি একটা ফন্দি আবিষ্কার করেছিলাম। আর তাই ওই বদমায়েশ লোকগুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি মৃত মোরগটার রক্তাক্ত নাড়িভুঁড়ি থেকে নোংরা আবর্জনা নিয়ে আমি আমার হাত, পা, মুখ আর সারা শরীরে এসব মাখিয়ে রাখতাম। আমার সারা শরীরে মুরগির রক্ত আর পায়খানা মেখে আছে দেখে ওরা আর আমাকে চুমু খেতে বা আমার শরীরটা হাতড়াতে পারত না।

ফলে মহা বিরক্ত হয়ে ওরা বাবাকে বলতে লাগল যে,

‘দ্যাখো দ্যাখো তোমার মেয়ে একটা পেত্নী হয়ে গেছে।’

কিন্তু বাবা এসব কথায় পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগল যে আমি না বরং যারা আমাকে পেত্নী বলছে তারাই আসলে শয়তান। আর ওরা যেন ওদের হাতে ধরা ছোট ছোট মদের গ্লাসগুলো সজোরে বাড়ি মারতে থাকে আর তাহলেই ওদের ভেতরে যে শয়তান লুকিয়ে আছে সেসব দূর হয়ে পালিয়ে যাবে।

যেখানে মোরগযুদ্ধ হয় সেই জায়গাটি থেকে বা মাঠটি থেকে ভয়াবহ দুর্গন্ধ ভেসে আসতে থাকে। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেও মাঝেমাঝে আমি একটি কোণায় স্ট্যান্ডের নিচে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। আর কোনও একটি বদমায়েশ লোক আমার স্কুলের ইউনিফর্মের নিচ থেকে আমার আন্ডারওয়্যার ধরে টানাটানি করছে এমন এক পরিস্থিতিতে আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেত। এইসব শয়তান লোকদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এক বা একাধিক মরা মুরগির মাথা নিয়ে আমি আমার পেনটির সাথে সেপটিপিন দিয়ে আঁটকে রাখতাম। আমাকে মরা মুরগির মাথা দিয়ে বেল্ট তৈরি করে কোমরের সাথে ঝুলিয়ে রাখতে হতো। আর ওই কুত্তার বাচ্চা বীরপুরুষগুলোর ছোট্ট কতগুলো মরা মাথা সরিয়ে আমার স্কার্ট উঠিয়ে পেনটি খোলার মতো সাহস হতো না।

মাঝেমাঝে মুরগির নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করার জন্য বাবা আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন। মাঝে-মাঝে অবশ্য বাবা নিজেও এসব নোংরা পরিষ্কার করত। আর তখনই তাঁর বন্ধুরা তাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য খোঁচা মেরে কথা বলত। বাবার কাছে তারা জানতে চাইত যদি বাবাকেই সব কাজ একাই করতে হয় তাহলে আমাকে বাবা এখানে শুধুশুধু কেন নিয়ে আসে ? মাঠে পড়ে থাকা রক্তাক্ত মোরগ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে করতে বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ফ্লাইং কিস ছুড়ে মারতেন। আর তাঁর বন্ধুরা এসব দেখে হাসাহাসি করত।

যাকিছু হোক না কেন হাজার মাইল দূর থেকেও আমি মুরগির গন্ধ চিনতে পারতাম। এটাই তো আসলে আমার জীবনের ঘ্রাণ। আমার আর আমার বাবার গায়েও তো এই গন্ধই লেগে আছে। আর এই ঘ্রাণ থেকেই আমি রক্তের সুরভী পাই, মানুষের গন্ধ পাই। গুয়ের গন্ধ, সস্তা মদের গন্ধ, টকটক মিষ্টি গন্ধ আর ইন্ডাস্ট্রির গ্রিজের গন্ধ কী নেই এখানে। সবকিছু আছে সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এই ঘ্রাণের ভেতর। আর এটা যে একটা ভীষণ গোপন কারবারের জায়গা এবং একটা আন্ডারগ্রাউন্ড জয়েন্ট যেখানে অবস্থিত মানুষেরা কেউ জানিই না যে তারা আসলে কোথায় আছে বা কেমন আছে ? আর এখানে থেকে তুমি আসলে ঠিক কেমন আছ ? খুব ভালো আছ নাকি রীতিমত সারাক্ষণ ঠাপ খাওয়ার উপর আছ সেটা বোঝার জন্যও যে খুব একটা বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন আছে তাও কিন্তু নয়।

চল্লিশ বছরের এক লোক আশপাশ কোথাও থেকে কথা বলে ওঠে। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নোংরা-টাকলু-ভোঁটকা একজন লোকের ছবি। লোকটি নিশ্চয়ই হাতকাটা একটি সাদা গেঞ্জি, একটি হাফপ্যান্ট আর একজোড়া চপ্পল পরে আছে। আর লোকটার সেই চপ্পল ছাপিয়ে বেরিয়ে পড়েছে তার নোংরা লাললাল, বড়বড় বুড়ো আঙুলের নখগুলো। এখানে আমার পাশে আরও অন্য মানুষও আছে। তারা নোংরা কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে ছিল।

‘আচ্ছা, আচ্ছা দেখতে দাও! আর সবাই তোমরা এবার একটু শান্ত হয়ে বসো তো। সবাই শুনে রাখো, প্রথম যেই কুত্তার বাচ্চাটা কথা বলে উঠবে আমি কিন্তু ওর মাথায় একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেবো। চুপচাপ সবাই আমার কথা শুনবে। আর যেহেতু আমরা সবাই মিলে একসাথে কাজ করছি তাই এই রাতটাকে চল সবাই মিলেই স্মরণীয় একটি রাত করে রাখি।’

আমার মাথার সাথে ওই নোংরা ব্যাটাটা ওর বিশাল বপুটা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পকেটে রাখা পিস্তলের বাঁটটা আমার মাথায় এসে ঠেকল। আমি তখনই বুঝতে পারলাম যে শয়তানটা কোনও ফাইজলামি করছে না বা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছে না।

আমার ডান পাশে কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে কান্নাকাটি করছিল। আমার মনে হয় তার মাথায় ঠেকিয়ে রাখা বন্দুকের স্পর্শ সে আসলে সহ্য করতে পারছিল না। এর ঠিক পরপরই শুনতে পেলাম ওর গালের উপর এসে সজোরে ঠাস করে পড়া একটি চড়ের শব্দ। ‘শোন! নবাবজাদি! আমার কারণে কিন্তু কেউ কাঁদে না। তুমি কি তেমন কিছু ? নাকি তোমার ছোট্ট সোনাবাচ্চা যিশুর কাছে ফিরে যাওয়ার খুব শখ হয়েছে ?’

একটু পরেই দেখা গেল বন্দুকওয়ালা সেই ভুঁড়িওয়ালা বদমায়েশ লোকটা ফোনে কথা বলতে বলতে দূরে কোথাও হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। সে একটি নম্বর বলল, ‘ওরে বদমায়েশ! ছয়টি, ছয়টি।’ সে আরও বলল যে, ‘দ্যাখ, এবার কিন্তু দারুণ সব মাল জুটসে বুঝছস ? এই মাসের মধ্যে সবচেয়ে সেরা মালগুলোরেই পাইয়া গেছি কিন্তু। তোরা কিন্তু ভুল কইরাও এইসব জোস মালগুলানরে মিস করিস না, তাইলে কিন্তু পরে জম্মের মতো পস্তাবি কইয়া দিলাম।’ শয়তান লোকটা একের পড় এক ফোন করে অনেকের কাছেই এসব বলতে লাগল। আর জানোয়ারটার ভাবসাব দেখে মনে হলো যে আমাদের কথা একবারেই ভুলেই গেছে।

আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে মাথায় হুড পরে মুখ ঢেকে একজন লোক খুক খুক করে কেশেই যাচ্ছিল।

ফিসফিস করে লোকটি বলল, ‘আমি না এই ভয়ানক ব্যাপারটা সম্পর্কে অনেক আগেই শুনেছি। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমি এসব কখনও বিশ্বাস করিনি। আমি ভাবতাম এগুলো সব ভুয়া গালগপ্প। বড় বড় শহরে এসব কতধরনের আজগুবি কাহিনিই তো শোনা যায়। ভাবতাম এগুলোও হয়তো সেরকমই কিছু যাকে ওরা নিলাম বলে ডাকে। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা প্যাসেঞ্জারদের তুলে নেয় এবং কিডন্যাপ করে। কারণ ওরা ভাবে যে ওরা এভাবে অনেক টাকা কামাতে পারবে। আর এরপর ক্রেতারা আসে এবং কিডন্যাপ হওয়া মানুষদের মধ্যে ওদের যাদেরকে ভালো লাগে তাদেরকে নিয়ে দামাদামি করে। এবং অবশেষে দুপক্ষের দাম-দর নিয়ে সমঝোতা হলে যাকে বা যাদেরকে পছন্দ হয় তাকে কিনে নিয়ে যায়। ক্রেতারা কিনে নেওয়া মানুষদের কাছ থেকে তাদের সব মালামাল ছিনিয়ে নেয়। এরপর তাদেরকে দিয়ে অন্যের বাসা থেকে চুরি করতে বাধ্য করে অথবা তাদেরই নিজেদের বাসা থেকে সমস্ত মালামাল বা ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ইত্যাদি নিয়ে এসে ক্রেতাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করে। আর নারী ? হায় খোদা নারীদের সাথে যে কী কী করে ?’

আমি জানতে চাইলাম, ‘কী করে ? নারীদের সাথে ওরা কী করে ? প্লিজ বলুন আমাকে।’

আমার কথা শুনে লোকটি বুঝতে পারল যে আমি একজন নারী। ফলে কোনও কথা না বলেই লোকটি নীরবে সেখান থেকে চলে গেল।

সে রাতে যখন আমি ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম আর প্রথমেই যেটা ভেবেছিলাম যে অবশেষে ট্যাক্সিতে উঠে বসতে পারলাম! সিটের উপর মাথা হেলান দিয়ে আমি চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করলাম। সেদিন আমি ভীষণ ডিপ্রেশনে ভুগছিলাম এবং অনেক মদ খেয়েছিলাম। বারে গিয়ে মদ খেতে খেতে অন্যদের সাথে আমাকে বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে হয়। লোকগুলোর সাথে, এমনকি ওদের স্ত্রীদের সাথে এমনভাবে মিশতে হয় যেন আমি ওদের কতদিনের চেনা একজন পুরোনো বন্ধু! আমি সবসময়ই অভিনয় করি। কারণ আমি একজন পাকা অভিনেত্রী। কিন্তু অবশেষে আমি যখন বাসায় যাওয়ার জন্য ট্যাক্সিতে উঠে বসি তখন বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। নিজেকে কিছুটা হালকা মনে হয়। মনে মনে ভাবি, যাক! এবার অন্তত বাড়ি ফিরে চিৎকার করে কাঁদতে তো পারব! আমার মনে হয় আমি কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কেমন যেন হঠাৎ করেই ঘুমটা ছুটে গেল। চোখ খুলে দেখি কেমন একটা অপরিচিত অদ্ভুত কোনও একটা জায়গায় এসে গাড়িটা দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে এটি একটি শিল্পাঞ্চল। এখানে অনেক বড় বড় কলকারখানা আছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভয়ে যেন আমার মাথার মগজটাই সেদ্ধ হয়ে যেতে লাগল। মনে মনে ভাবলাম এবার তো সারাজীবন ধরে এখানেই আটকে থেকে আমাকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হবে।

ট্যাক্সি ড্রাইভার একটা বন্দুক বের করে আমার চোখে চোখ রেখে ভীষণ ভদ্রভাবে বিদ্রুপ করে; ‘ম্যাডাম নাইমা যান! আমরা জায়গামতো আইসা গেছি।’

সবকিছু খুব তাড়াহুড়ো করে হলো। আমি গাড়ির দরজাটা লক করার আগেই কেউ একজন দরজাটা টান দিয়ে খুলে ফেলল। আরেকজন এসে মুহূর্তের মধ্যে কালো কাপড় দিয়ে আমার মাথাসহ চোখ, মুখ সব ঢেকে দিল। ওরা আমার হাতগুলো পিঠ-মোড়া করে দড়ি দিয়ে বেঁধে গ্যারেজের এক কোনায় যেখান থেকে মরা মুরগির আবর্জনার গন্ধ ভেসে আসে, সেখানে নিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে নিলডাউন করে বসিয়ে রাখল।

ওদের কথাবার্তার শব্দ দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল। ওই ভোটকা লোকটার কথাবার্তা, তারপর শুনতে পেলাম অন্য একজনের কথা আর এভাবেই অনেকের কথাই ভেসে আসতে লাগল। একের পর এক লোকজন আসতেই লাগল। ওরা একের পর এক বিয়ারের ক্যান খুলে খাচ্ছিল আর হাহাহিহি করেই চলেছিল। ওদের কাছ থেকে গাঁজা (মারিওয়ানা) ছাড়াও আরও অনেক নেশা করার বস্তুর তীব্র গন্ধ ভেসে আসতে লাগল। এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আমার পাশের মানুষটি যে আমাকে এতক্ষণ ধরে শান্ত থাকার জন্য অনুরোধ করছিল সে একেবারে চুপ মেরে গেল। আমার ধারণা ও হয়তো এখন তার নিজেকে শান্ত রাখা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে গেছে।

আমার সাথে আলোচনার এক ফাঁকে সে জানিয়েছিল যে তার একটি আট মাসের এবং একটি তিন বছরের ছেলে আছে। হয়তো এখন সে ওই বাচ্চাগুলোর কথাই মনে মনে ভাবছে। আর নিশ্চয়ই এই অসহনীয় নেশাগ্রস্ত পরিবেশের কথা ভাবছে যেখানে সে নিজের অজান্তেই প্রবেশ করেছে। আর আমি নিশ্চিত যে সে আসলে এসবই ভাবছে। যখন গাড়ির পেছনে এইসব পশুগুলো হাঁটুর ভেতর মাথা গুঁজে বসে থাকে আর তখন যে কোনও দোকানে গাড়ি থামিয়েই সে সবাকেই দেখে যেভাবে হাত নাড়ায় গার্ডদের দেখেও সে সেভাবেই হাত নাড়াল। ও আসলে সবাইকে ওর সুন্দরী বউ আর তার আট মাস বয়সী এবং তিনবছর বয়সী ছোট্ট বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে নিয়ে যাচ্ছিল। ও সবাইকেই ওর নিজের বাসাতেই নিয়ে যাচ্ছে। আর এছাড়া ওর আর কোনও উপায়ও নেই।

আরও একটু সামনে, ডান দিক থেকে ঘ্যানঘ্যানানির শব্দ ভেসে আসছিল। একটা মেয়ে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কেঁদেই চলেছে। বুঝতে পারছি না এটাই কি সেই আগের মেয়েটাই কি না ? আর হঠাৎ করেই সেই ভোটকা লোকটা গুলি চালাল আর আমরা সবাই মেজেতে শুয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা চালালাম। বদমাইশটা কাউকে মারার জন্য গুলি করেনি। ও আসলে আমাদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করেছে। আমরা যে কতটা ভীতসন্ত্রস্ত আর বিধ্বস্ত হয়ে পড়লাম তাতে ওদের কিছুই এসে যায় না। আমার এই অসহায়ত্ব দেখে ওই ভোটকা বদমায়েশটা এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ আরও বেশি করে হাহাহিহি করতে লাগল। ওরা অট্টহাসি দিতে দিতে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আর আমাদেরকে ধাক্কা মারতে মারতে রুমের এক কোনায় নিয়ে জড় করল।

‘আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে! ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ আপনারা সবাই কি প্রস্তুত আছেন ? আমাদের নিলাম এই মুহূর্তে অফিশিয়ালি শুরু হলো তাহলে। তাহলে এখন আপনারা সবাই দয়া করে একটু উঠে দাঁড়ান। আহা! কি অদ্ভুতভাবে আর কি ভীষণ অমায়িকভাবে ওদের কথাগুলো বলল লোকটা। ওহ আমার রাজকন্যারা! আসো আসো আমার কাছে আসো! ওহহো ভয় পেও না ছোট্ট মামণি আমার। আমি কিন্তু কাউকে কামড়াই না। তোমরা এখানে আমার একটু কাছে এসে দাঁড়াও যাতে এসব ভদ্রলোকেরা যারা এখানে আছে, তারা যেন তোমাদেরকে ঠিকমতো দেখতে পারে। আর ওরা যাতে ঠিক তাকেই কিনে নিতে পারে যাকে ওদের প্রয়োজন হবে। বুঝেছ ? আর এটাই তো এখানকার নিয়ম তাই না ? বেশি টাকা দিয়ে সবচেয়ে ভালো মালটাকে বেছে কিনে নেওয়া। এটাই তো এখানকার ঐতিহ্য! কি বলুন সাহেবেরা ? আমি কি ভুল কিছু বলছি ? শুনুন দয়া করে সবাই আপনারা আপনাদের অস্ত্রগুলো নিচে নামিয়ে রাখুন। যতক্ষণ পর্যন্ত না এই নিলাম শেষ হচ্ছে, আমার দায়িত্ব হচ্ছে ওদের সবাইকে নিরাপদে রাখা। আর তারপর যখন আপনারা ওদেরকে মালপানি খরচ করে কিনে নেবেন তারপর ওরা আপনাদের সম্পত্তি। তখন ওদের সাথে যা ইচ্ছে করতে পারেন। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে। এখানে আপনাদেরকে পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়েছি। সহযোগিতার জন্য আবারও সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

ভোটকা লোকটা আমাদেরকে সবার সাথে এমনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল যেন সে কোনও একটি টিভির অনুষ্ঠানের উপস্থাপক তাই দর্শকদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের চোখ বাঁধা ছিল তাই যারা আমাদেরকে নিলাম থেকে কিনতে এসেছে তাদের কাউকেই দেখতে পাইনি। কিন্তু এতটুকু ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে লোকগুলো আমাদেরকে হাঁ করে গিলছে আর আমাদের দেহের বিস্তারিত মাপঝোক করে কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা সবাই হয় চোর না হয় ধর্ষক। আর ওরা নিশ্চিতভাবেই সাঙ্ঘাতিক ধরনের খুনি বা নৃশংস ধর্ষক অথবা তার চেয়েও খারাপ মানুষ বলেই তো নিলামে মেয়েদেরকে টাকা দিয়ে কিনতে এসেছে।

‘ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ!’

যারা প্যানপ্যান ঘ্যানঘ্যান করে, ভোটকুটা তাদেরকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আর যারা বলে যে তাদের ছেলেমেয়ে আছে, তাদেরকেও ব্যাটাটা দুচোখে দেখতে পারে না। এছাড়াও যারা লাগামহীনভাবে চিল্লাচিল্লি করে করে সবার মধ্যে গণ্ডগোল পাকায় তাদেরকেও এই মোটা লোকটা সহ্য করতে পারে না। আর তাদেরকে তো আরও দেখতে পারে না যারা ওকে এই কথা বলে শাসায় যে, সে খুব শিগগিরই জেলে পচে মরতে যাচ্ছে। যখন তখন ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে ও যে কারও পেটে ঘুসি মেরে বসে। পেটে ঘুসি খেয়ে দম বন্ধ হয়ে অনেকেরই মেঝেতে ধুপুস করে পড়ে যাওয়ার শব্দ আমি শুনেছি। আমি লড়াকু মোরগগুলোর দিকেই খেয়াল করার চেষ্টা করলাম। মনে হয় এখানে একটিও নেই। কিন্তু আমি নিজের ভেতরেই ‌ওদের শব্দ শুনতে পেলাম। মানুষ এবং মুরগির। ওহ! এত ঢং করার কিছু নেই। এত ভদ্র সাজার দরকার নাই। যতসব ঢং! এটাও কি বোঝ না ? ওরা শুধুমাত্রই কতগুলো লড়াকু মোরগ!

‘এই লোকটিকে নিয়ে আসো, আচ্ছা আমাদের নিলামে ওঠানোর জন্য প্রথম পণ্যের নাম কী ? কী নাম ওর ? ও বন্ধু আমার কথা বলছ না কেন ? ওহহো! রিচারডোওওওও! স্বাগতম! স্বাগতম! লোকটি একটি অদ্ভুত সুন্দর ঘড়ি পরেছে। সাথে দারুণ এক জোড়া এডিডাসের জুতো। আর কোনও সন্দেহ নেই যে রিচারডোর অনেক টাকা আছে। তিনি নিশ্চিতভাবেই একজন ধনী ব্যক্তি।

আচ্ছা চল তো দেখি ওর পকেটে আসলে কত মালপানি আছে! অরে বাপরে! এ দেখছি বেশ কয়েকটি ক্রেডিট কার্ড! আরও আছে মেসির ভিসা গোল্ড কার্ড। ওয়াও! দারুণ ব্যাপার দেখছি!’

ভোটকু শয়তানটা এরই মধ্যে নোংরা নোংরা জোকস বলতে লাগল।

এরপর ওরা কিডন্যাপ করে আনা রিচারডোকে নিয়ে নিলাম ডাকা শুরু করল। প্রথমেই একজন তিনশ টাকা দাম বলল। এরপরেই কেউ একজন একেবারে আটশ টাকা হাঁকাল। ভোটকু শয়তানটা রিচারডোর দাম বাড়ানোর উদ্দেশে খদ্দেরদের বলতে শুরু করল যে রিচারডো কিন্তু শহরের বাইরে যেখান থেকে নদীর অপরূপ দৃশ্য দেখা যায় এমন একটি মনোরম পরিবেশে ধনীদের হাউজিংয়ে থাকে। ফলে ওকে যে কিনবে সে ওকে জিম্মি করে অনেক বেশি টাকা আদায় করতে পারবে।

‘শোন তোমরা সবাই, দ্যাখো রিচারডো ওর সারাক্ষণ ব্যালকোনিতে বসে বসে যেরকম মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে সেটা একনজর দেখার মতো সৌভাগ্য আমাদের মতো গরিব মানুষদের কোনওদিন হবে না। আহারে! আর এমনই এক স্বর্গে বাস করে আমাদের এই প্রিয় বন্ধু রিচি। আচ্ছা এখন থেকে তো আমরা ওকে রিচি’ই বলতে পারি তাই না ? আমাদের এই বিশাল টাকাওয়ালা বন্ধু রিচারডোকে এখন থেকে আমরা কিন্তু সবাই রিচি বলেই ডাকব, বুঝলে ?’

কেউ একজন ভয়ানক শীতল ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল, আমি পাঁচ হাজার টাকা দিতে চাই। ওই ভয়ংকর কণ্ঠস্বরের অধিকারী লোকটাই রিচারডোকে কিনে নিয়ে চলে গেল। আর উপস্থিত সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে হাততালি দিতে লাগল।

‘গোঁফওয়ালা লোকটির কাছে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে গেল।’

ভোটকু লোকটা আদর করে ন্যান্সির পিঠ চাপড়ে দিল। ন্যান্সি হচ্ছে সেই মেয়েটা যে সবাইকে খুব শাসাচ্ছিল। আমি চোখ বাঁধা অবস্থাতেও এটা বুঝতে পারছিলাম কারণ লোকটা মেয়েটার স্তনগুলো হাতিয়ে হাতিয়ে সবার উদ্দেশ্যে নানা মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছিল। ভোটকুটা নিজের মুখের লালা চুকচুক করে চাটতে চাটতে বলতে লাগল, ‘দ্যাখো দ্যাখো ওর এগুলো কি টসটসে আর কতই না লোভনীয়! কেমন খাড়া দেখেছ তোমরা ? তবে এই খাসা মালটার শরীরটাকে না হাতিয়ে বলতে পারছি না সেগুলো ঠিক ক্যামন ?’ অসভ্য শয়তানটার কথা শুনে আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। মেয়েটার সাথে ও এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। কে ঠেকাবে ওকে ? এখানে তেমন একজনও নেই। বরং সবাই লোকটাকে তাল মারছে। ন্যান্সির গলা শুনে বুঝেছিলাম ও অল্পবয়স্ক একটি মেয়ে। খুব বেশি হলে ১৯ কী কুড়ি বছরের হবে। হয়তো মেয়েটি একজন নার্স অথবা স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায়। ভোটকু বদমায়েশটা ন্যান্সির শরীর থেকে জামাকাপড় সব টেনেহেঁচড়ে খুলে ফেলতে লাগল। ন্যান্সির কোমরের বেল্টটাকে টেনে খোলার শব্দ আমরা সবাই শুনতে পেলাম। এরপর সে মেয়েটার প্যান্ট এবং পেনটি দুটোই খুলে ফেলল। এই মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত ন্যান্সি কতভাবেই না অনুনয়বিনয় করতে লাগল। নোংরা হুড দিয়ে চোখমুখ ঢাকা অবস্থাতেও আমরা একেবারেই কাছ থেকে মেয়েটির এই ভয়াবহ পরিণতি বুঝতে পেরে সবাই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম।

লোকটা এরপর আরও বিশ্রীভাবে বলতে লাগল, ‘দ্যাখো দ্যাখো ওর ছোট্ট জবাটা! ওহ কী সুন্দর না ?’ ভোটকু কুত্তাটা ন্যান্সির অঙ্গটি জিভ দিয়ে চুকচুক চাটতে লাগল। চোখ-মুখ বন্ধ অবস্থাতেও আমরা এসব নোংরা শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। ওখানকার সব শয়তানগুলো এসব দেখে উত্তেজনায় হাউকাউ করতে করতে হাততালি দিতে দিতে উল্লাসে ফেটে পড়তে লাগল। এরপর শুরু হলো মাংসের বদলে মাংসের বেচাকেনা আর চিৎকারে চিৎকারে ফেটে যেতে লাগল আকাশ-বাতাস!

‘ভদ্র মহোদয়গণ! শুনুন, একেই বলে গুণ-মান ধরে রাখা। আর আমি ওকে সব দিক বিবেচনায় এই খাসা মালটাকে দশে দশ দিলাম। আপনারা যদি ওকে একটু ঘষামাজা করে সাফসুরত করে নেন না! ও কিন্তু তাহলে আকাশের তারার মতই ঝলমল করে উঠবে!’

মেয়েটা নিশ্চয়ই প্রকৃতপক্ষেই খুব সুন্দরী! ভোটকুর কথা শেষ হতে না হতেই একের পর এক খদ্দের ওর দাম হাঁকাতে লাগল। কেউ বলল দুই হাজার, কেউ তিন, কেউ সাড়ে তিন হাজার। ন্যান্সি সাড়ে তিন হাজারে বিক্রি হয়ে গেল। এর মানে এই দাঁড়াল যে আসলে বাজারে একজন রূপবতীর চেয়ে একজন ধনী ব্যক্তির দর সবসময়ই বেশি।

‘এবং দেখুন সবাই! এই অপূর্ব সুন্দর যৌনাঙ্গওয়ালি কিন্তু আপনাদের চোখের সামনে দিয়েই গলায় ক্রোশ ঝোলান হাতে সোনার আংটি পরা ভদ্রলোকটির সাথে তার ঘরে চলে যাচ্ছে। আর আপনারা কিন্তু এখন তাকিয়ে তাকিয়েই শুধু দেখছেন। তাড়াতাড়ি করুন মশাই।’

একের পর এক আমরা বিক্রি হতে লাগলাম। ভোটকু শয়তানটা আমার পাশের মেয়েটির কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে নিল। ওরই একটি ছোট্ট আট মাসের এবং একটি তিন বছরের ছেলে আছে। আর এখন সেই কি না এই নিলামের সবচেয়ে বড় হটকেক হয়ে গেছে। কারণ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের একাউন্টে তার অনেক টাকা আছে। সে নিজেও একজন অনেক বেতন পাওয়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সেইসাথে সে একজন বড় ব্যবসায়ীর ছেলে। এছাড়াও তার রয়েছে অনেক মূল্যবান শিল্পকর্ম এবং একজন সুন্দরী স্ত্রী। ফলে যেই খদ্দের তাকে কিনে নেবে সেই আসলে লটারির টিকিট হাতে পাবে। কারণ খদ্দেরটি বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ পেতে চলেছে। আর এই লোকটির জন্য নিলামের পাঁচ হাজার টাকা থেকেই ডাক শুরু হলো। সেটা বাড়তে বাড়তে দশ, তারপর পনের হাজার, শেষ পর্যন্ত কুড়ি হাজারে এসে দফা হলো। যে কুড়ি হাজার টাকা হেঁকেছে তার সাথে আর অন্য কেউ ঝামেলায় জড়াতে চাইল না।

নতুন করে আরেকজনের গলা শোনা গেল। সে কোনও কিছুতেই আর সময় নষ্ট করল না।

আর ভোটকু লোকটাও আর কোনও মন্তব্য করল না।

এরপর যখন আমার পালা এল আমি শুধুমাত্র লড়াকু মোরগদের কথা ভাবতে লাগলাম। আমি চোখ বন্ধ হয়ে মোরগের নাড়িভুঁড়ি ও নোংরা আবর্জনার কথা ভাবতে ভাবতে আমার নিজের পায়ুপথ খুলে দিলাম। আমি বুঝে গেলাম যে এই মুহূর্তে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা আমাকে এখানে দাঁড়িয়েই করে দিতে হবে। আর আমি সেটাই করলাম। আমি হাগু করে আমার পা দুটি এবং মেঝেটা একেবারে ভরিয়ে দিলাম। আমি এখানে একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে অনেকগুলো ভয়ানক অপরাধীর মাঝখানে একটি পশুর মতো দাঁড়িয়ে আছি। আর তাই একটি পশুর মতোই আমি সবার সামনেই আমার পেটের বর্জ্যপদার্থ ত্যাগ করলাম। আমি ওদের উদ্দেশ্যেই পায়খানা করে দিলাম। আর আমার পক্ষে যতটা নিখুঁত করে সম্ভব ততটাই মনোযোগী হয়ে আমি এক পায়ের সাথে অন্য পা ঘষতে লাগলাম। পায়খানার একটি দলাকে খুঁজে নিয়ে সারা গায়ে এবং মেঝেতে মেখে নিয়ে আমি উন্মাদের মতো করে চেঁচাতে শুরু করলাম। আমি একজন বদ্ধ পাগলের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রলাপ বকতে লাগলাম। আমি মোরগগুলো মরে যাওয়ার পর ওদেরকে কোলে নিয়ে যেভাবে স্বর্গের বর্ণনা দিতাম সেসব কথাই বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম। ওদেরকে আমি বলতাম যে ওরা স্বর্গে গিয়ে খুব সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে কারণ ওখানে অজস্র ধানক্ষেত এবং কোটি কোটি পোকামাকড় আছে যা খেয়ে ওরা জীবন কাটাতে পারবে। যদিওবা আমি জানতাম যে ভোটকুটা যে কোনও সময় আমাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু তার পরিবর্তে দেখা গেল শয়তানটা আমার ঠোঁটের উপর সজোরে একটা চড় কষিয়ে দিল। এতে আমার জিভের উপর ভীষণ জোরে একটি কামড় পড়ে ওখান থেকে গরগর করে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল। আর সেই রক্তে আমার বুক, পেট, আমার পায়খানা, পেশাব সব রক্তাক্ত হয়ে উঠল। আমি হাসতে লাগলাম। একজন মানসিক বিকারগ্রস্তের মতো হা হা করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম।

ভোটকু বদমায়েশটা প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিল না ঠিক কী করবে ? তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে নিলাম ডাকতে শুরু করল, –

‘বল বল, এই পেত্নীটার জন্য কত দিতে চাও ?’

কেউ নিলামের ডাক দিল না। এমনকি একটা শব্দ পর্যন্ত কেউ করল না।

ভোটকুটা বাধ্য হয়ে আমার ঘড়ি, মোবাইল ফোন, পার্স এগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করল। কিন্তু হায়! এসবই চায়নার সস্তা মাল। কেউ কোনও কিছু একটি পয়সা দিয়েও কিনতে রাজি হলো না।

শুয়োরটা শেষমেশ আমার স্তনে চাপ দিয়ে দিয়ে সবাইকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করল কিন্তু শয়তানটা আমার স্তন স্পর্শ করার সাথে সাথেই আমি গলা ফাটিয়ে তীক্ষè স্বরে চিৎকার করে বলতে লাগলাম, ‘পনের, কুড়ি কত দিবি ? কত দিবি ?’

কিন্তু একজন খদ্দেরও কোনও রা পর্যন্ত করল না। এমনভাব যেন প্রত্যেকে নিশ্চুপ হয়ে সিনেমা দেখছে।

ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের বাইরের উঠোনে বের করে দিল। আমার ঘাড়-মোড়া করে চেপে একটি গাড়ির ভেতর ঢোকাল।

তারপর তারা আমাকে সারা গায়ে দুর্গন্ধময় আবর্জনা দিয়ে ল্যাপটানো অবস্থায় ভেজা গায়ে, খালি পায়ে একটি হাইওয়ের উপর এনে গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

মূল গল্প : গল্পটি María Fernanda Ampuero Gi ÔCockfightÕ গল্পগ্রন্থ থেকে অনুবাদিত। মূল স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Frances Riddle। গল্পটির প্রকাশকাল এপ্রিল ২৯, ২০২০।

লেখক পরিচিতি :

মারিয়া ফেরনান্দো আম্পুয়েরো

ইকুয়েডরের একজন নারীবাদী লেখক এবং সাংবাদিক। ১৯৭৬ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি ইকুয়েডরের বৃহত্তর শহর ওয়ে ডাকিলে জন্মগ্রহণ করেন।

দ্য অর্গানিথাথিয়ান ইন্তারন্যাশনাল দে লাস মিগ্রাথিওনেস থেকে সেরা তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে পুরস্কৃত হন। এবং ২০১২ সালে স্পেনের ১০০ জন ল্যাটিন অ্যামেরিকান ক্ষমতাশালী নারীর মধ্যে একজন হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন।

২০১৮ সালে পিলিয়া ডি গ্যাওয় নামে তার প্রথম ছোটগল্পের বইটি প্রকাশিত হয়। বইটিতে ১৩টি গল্প আছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে স্প্যানিশ সংস্করণে বইটি ২০১৮ সালে লেখা সেরা ১০টি বইয়ের একটি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এবং কোয়াকিন গ্যাজেগোস লারা ইন্টারন্যাশনাল ফিকশন প্রাইজ অর্জন করে। পরে ২০২০ সালে ইংরেজিতে ককফাইট নামে অনূদিত হয়।

অনুবাদক : কবি, গদ্য লেখক, অনুবাদক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares