প্রবন্ধ : কাজী মোতাহার হোসেন : মুক্তজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ : মাসুদ রহমান

কাজী নজরুল ইসলাম প্রায়ই নাম নিয়ে রসিকতা করতেন। যেমন, একসময়ের বিদূষক সজনীকান্ত দাসকে বলেছেন ‘সজনে ঘণ্ট খাস’, চিরসুহৃদ আফজলকে (আফজল্-উল হক) ডেকেছেন ‘ডাবজল’ বলে। এসবের অধিকাংশই ছিল অনুপ্রাস সৃষ্টি বা ধ্বনিগত সমিল সংযোজনামাত্র, অর্থসংশ্লেষ কমই থাকত বলা চলে। তবে কাজী মোতাহার হোসেনকে ‘মোতিহার’ বলাটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলে মনে হয়। কাজী মোতাহারকে লিখিত কাজী নজরুলের এ পর্যন্ত প্রাপ্তির হিসেবে প্রথম চিঠিতে (২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮) স্বাভাবিক সম্বোধন দেখা যাচ্ছে―‘প্রিয় মোতাহার’। দ্বিতীয় চিঠির (২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮) সম্বোধন ছিল শুধু ‘বন্ধু’। তারপর তৃতীয় চিঠিতে (০১ মার্চ ১৯২৮) লিখলেন ‘প্রিয় মোতিহার’ এবং শুরুতেই জানালেন : ‘তোমায় এবার থেকে মোতিহার ব’লে ডাক্ব।’ এই চিঠির মধ্যে আরও একাধিকবার সম্বোধনটি করেছেন আরেকটু অর্থ-আরোপ ও অন্তরঙ্গ সুরযোগে। যেমন লিখছেন : ‘আচ্ছা মোতিহার! তুমি কোনদিন কাউকে ভাল বেসেছিলে ?’ বোঝা যায়, মোতাহার থেকে মোতিহার এই নামায়নে নজরুল ধ্বনির চেয়ে অর্থকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি। নিজ জীবনে কাজী মোতাহারকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া মূল্যবান মোতিমালাপ্রাপ্তি হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন এবং তাঁকে কণ্ঠে অর্থাৎ হৃদয়ে গ্রহণ করেছিলেন।

কাজী মোতাহার হোসেন শুধু বন্ধু নজরুল নয়, তাঁর সমাজ-সম্প্রদায় বা দেশ-জাতির কাছে রত্নবিশেষই। আধুনিকপর্বে বাঙালি মুসলমানের প্রথম প্রকৃত নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে যে সংগঠনের মাধ্যমে সেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র তিনি ছিলেন―সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রের ভাষায়―‘হৃদয়’। এই সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিসংখ্যান বিজ্ঞানী, উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু (যাঁর নামে রয়েছে আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা), যথার্থই সংগীত সমঝদার প্রভৃতি। এভাবে বহুধারায় তাঁর অসাধারণ প্রতিভা প্রবাহিত হয়েছে। আর উল্লেখ করতে পারি যে, মূলত তাঁরই প্রেরণা-পরিচালনা, আদর্শ-অনুসরণে সন্তান ও উত্তরসূরিগণও নানা ক্ষেত্রে সাফল্য-প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।

অথচ কাজী মোতাহার হোসেনেরই প্রতিষ্ঠা তো পরের কথা, পড়াশোনাই বেশিদূর এগোনোর কথা ছিল না। আবার আর্থ-সামাজিক অর্জনের পাশাপাশি চিন্তা-চেতনায় সাম্প্রদায়িকতা-সীমাবদ্ধতা থাকার সম্ভাবনাও ছিল। তাঁর জীবনরেখা টেনে কথাটা ব্যাখ্যা করা যাক। সারা বছর কাজ থাকত না পেশায় আমিন পিতা কাজী গওহরউদ্দীনের; তাই ‘ছাত্র থাকাকালে দুঃসহ দারিদ্র্য ছিল মোতাহার হোসেনের নিত্যসঙ্গী’ (পৃ. ১৯)। পড়াশোনাটা তিনি চালাতে পেরেছেন মেধাবী হওয়ার কারণে, স্কুল পর্যায় থেকেই বৃত্তি পাওয়ার সুবাদে। স্নাতকোত্তর ক্লাসে পড়ার সময় তো বৃত্তির টাকাটাও গ্রামে অসুস্থ বাবার জন্যে পাঠিয়ে দিতেন; নিজে চলতেন ‘প্রাইভেট ট্যুশন’ করে পাওয়া ২০/২৫ টাকা দিয়ে। আর ভাবনায় নেতিবাচকতা ঢুকে পড়তে পারত প্রেসিডেন্সি কলেজের ঘটনায়। সেসময়ের কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের শিক্ষালয় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত পড়া হয়নি। কারণ শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপকের নিকট থেকে প্রাপ্য-প্রার্থিত আনুকূল্য পাননি। এ ‘ঘটনায় প্রেসিডেন্সি ছেড়ে রাজশাহী কলেজে গিয়ে ভর্তি হন’ (পৃ. ৪২)। এতসব বিঘ্নের পরও তিনি নিজ মেধা ও একাগ্র সাধনার কারণে সর্বোচ্চসম্ভব কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন শেষ করেন এবং বর্ণাঢ্য কর্মজীবন লাভ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় তিনি দুঃখ পান বটে, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল স্কুলের শিক্ষক জ্যোতীন্দ্রমোহন রায়ের স্নেহ-উদারতার সুবাস। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পূর্ববাংলা ও আসামের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করলেও কুষ্টিয়া হাই স্কুলের এই শিক্ষক সন্তুষ্ট হননি; তাঁর দৃঢ় বিশ^াস ছিল মোতাহার সমগ্র বাংলা ও আসামের অর্থাৎ কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের সামগ্রিক মেধা তালিকায় দশজনের মধ্যে একজন হওয়ার মতো ছাত্র। মেকানিক্সে ৮০ নয়, ১০০ তে ১০০ পাওয়ারই কথা তার, ইংরেজিতেও নিশ্চয়ই নম্বর কম দেওয়া হয়েছে। পরে ঠিকই জানা যায়, খাতা খোয়া যাওয়ার জন্যে মেকানিক্সে তাঁকে গড় করে ৮০ নম্বর দেওয়া হয়েছে। সেসময় খাতা পুনর্মূল্যায়নের নিয়ম ছিল না বলে কিছু করা যায়নি। কাজী মোতাহার কোনওদিন তাঁর এই শিক্ষকের কথা ভোলেননি। ওই স্কুলেই প্রিয় শিক্ষকের নামে ছাত্রবৃত্তি চালু করেছিলেন নিজ অর্থ দিয়ে। পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষায় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রীতিময় সান্নিধ্য পেয়েছেন, তেমনি পরিসংখ্যানবিষয়ক গবেষণায় পেয়েছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশকে। চাকরি জীবনে তো যুক্ত হলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র সঙ্গে। এমনিভাবে মানবতা, মুক্তবুদ্ধি আর বিজ্ঞানচিন্তায় ঋদ্ধ হলেন মানুষটি। আবার তাঁর ধর্মপ্রাণতা ও ধর্মীয় আচারনিষ্ঠতা কখনও বিরোধ সৃষ্টি করেনি সাহিত্যচর্চা কিংবা সংগীতের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাতে। আজকের বিশে^ও এরকম একাধারে ধার্মিক কিন্তু অসাম্প্রদায়িক মানুষ বড়োই কাক্সিক্ষত, কিন্তু বিরল বটে। এমনকী কারও কারও কাছে এ যেন পরস্পরবিরোধী বিষয়। এ প্রসঙ্গে আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ থেকে কাজী মোতাহার হোসেনের একটি অগ্রন্থিত প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই। ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন :

…ধর্ম প্রসঙ্গ নিষ্ফলও নয়, নিন্দনীয় নয়। ধর্মপ্রসঙ্গ অত্যন্ত গভীর ও মীমাংসার অতীত বলে এড়িয়ে চলে মানুষ কখনও মনে শান্তি অনুভব করতে পারে না। আবার যার যেমন খুশি, সে সেইরকম ঐশ^রিক কল্পনার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে―এই মনে করে নিশ্চিন্ত উদাসীনতার আশ্রয় লওয়াও চিন্তার শৈথিল্য, আর অন্যের সঙ্গে প্রীতি ও সৌহার্দের আদান প্রদানে অনিচ্ছার পরিচয় দেয়। …আলোচনা ও অনুসন্ধান সত্য নির্ণয়ের জন্যই করা দরকার। নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করা বা অন্যের মত খণ্ডন করবার জন্যই যে আলোচনা হয়, তা অসার্থক। ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতে হলেও মোহ বা বিদ্বেষ থেকে বিমুক্ত হয়ে, ঐতিহাসিক ঘটনা বা সত্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে, তুলনা করে বিচার করা উচিত। তা’হলে যিনি ধর্মপ্রবণ, তাঁর প্রত্যয় দৃঢ় হবে, আর যিনি ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন তিনিও হয়ত ‘ধর্মবৃত্তি অনেক মহৎ কাজের প্রেরণা জুগিয়েছে’―এই ঐতিহাসিক সত্যটি স্মরণ করে অন্য লোকের ধর্মবিশ^াসের প্রতি বিদ্রƒপ কশাঘাত করবেন না। (পৃ. ১২৭)

আজ থেকে নব্বই বছর পূর্বে করা তাঁর এই বক্তব্য এ মুহূর্তেও কত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায়!

কাজী মোতাহার হোসেনের এমনই কয়েকটি মোতিমাণিক্য দিয়ে স্বর্ণাভ সূত্রকথনে হার বা মালিকা গ্রন্থন করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী কাজী মোতাহার হোসেন : মুক্তজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ নামে। পরিশিষ্ট ছাড়াও বস্তুত বইটিকে দুটি অংশে দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয় বা অগ্রন্থিত অংশের কথাই আগে বলি। সেখানে রয়েছে কাজী মোতাহার হোসেনের প্রবন্ধ, অভিভাষণ, কার্যবিবরণী, ব্যক্তিগত পদ্য, স্মৃতিচারণ, বিজ্ঞানবিষয়ক রচনা ইত্যাদি বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে দশটি রচনা; যথা : ‘ধর্ম ও শিক্ষা’, ‘বানান সংস্কার’, ‘সাহিত্যবিশারদ’, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যবিবরণী : এক’, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যবিবরণী: দুই’, ‘সভাপতির অভিভাষণ’, ‘বিবাহমঙ্গল’, ‘The Teaching of StatisticsÕ, ÔGrowth of Scientific IdeasÕ, ÔDacca College : In my memory’। মোতাহার হোসেনের প্রথম গ্রন্থ সঞ্চরণ (১৯৩৭)-এ রবীন্দ্রনাথ ‘বিচিত্র ভাব ও আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জল রূপ’ দিতে দেখেছিলেন। এই রচনা-সঞ্চয়ন পাঠ করেও সেকথা বলা যায়। অমূল্য এই মণিচয়।

গ্রন্থের প্রথম অংশে গ্রন্থকার ডক্টর চৌধুরী পরিপূর্ণ মোতাহারকে উদ্ভাসিত করার প্রয়াস পেয়েছেন কয়েকটি মূল্যায়নধর্মী রচনা ও গবেষণা-উপস্থাপন করে; যথা : ‘জীবন ও কৃতির সন্ধানে’, ‘মুক্তচিন্তার মনস্বী’, ‘বিজ্ঞানের ভুবনে’, ‘মননচেতনার ভাষ্য’, ‘মার্জিনে মন্তব্য ও আরজ-দর্শন’, ‘স্মৃতিকথন অথবা রম্য জীবনভাষ্য’, ‘অন্তরঙ্গ আলাপ’, ‘পত্রালির স্মৃতি’, ‘একটি গ্রন্থ-ভূমিকা ও তার টীকা-ভাষ্য’। এসব আলোচনায় নানা বিষয়ে আবুল আহসান চৌধুরীর অধিকার, যুক্তিধর্মিতা ও মুক্তভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। এ পর্যায়ে বিজ্ঞানী ও মানবতাবাদী মোতাহারের মেলবন্ধন মূল্যায়নে আলোচকের অপ্রতিম উপভোগ্য বাক্বিন্যাসের কিছুটা তুলে ধরছি। ‘বিজ্ঞানের ভুবনে’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে :

সত্যের অনুরোধে এ কথা বলতেই হয় যে, আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চা যাঁরা করে থাকেন―বিজ্ঞান-পঠন-পাঠনের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের অনেকেই পুঁথিশাসিত বিদ্বান এবং তাঁরা সংস্কার, গোঁড়ামি, অন্ধবিশ^াস, ভাবালুতা, রক্ষণশীলতা, শাস্ত্রের দাসত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। কিন্তু মোতাহার হোসেন কখনও অন্ধবিশ্বাস বা প্রথার আনুগত্য করেননি, মানেননি সংস্কারের শাসন―ছিলেন যুক্তি, প্রগতি ও শ্রেয়চেতনার পক্ষে―পরিপূর্ণ বিজ্ঞানমনস্কতায় সমর্পিত সৃজনশীল এক বিজ্ঞানসাধক। কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে এখানেই অন্যদের মৌলিক ফারাক এবং এই বিবেচনাতেই তিনি স্বতন্ত্র ও অনন্য। (পৃ. ৫৬)

বইটির শুরুতে আছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখিত ‘ভূমিকা’। পরিশিষ্টে রয়েছে মোতাহার-কন্যা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন সংগৃহীত-গ্রন্থিত কাজী মোতাহার হোসেন : জীবনপঞ্জি এবং নানা খসড়া ও তথ্যদলিলের প্রতিলিপি।

‘১২০তম জন্মবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্য’ হিসেবে প্রকাশিত, মোতাহারের ১১ সন্তানকে উৎসর্গকৃত বইটির প্রাথমিক দৃষ্টিতে শ্রেণিগত পরিচয় সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ, এতে কাজী মোতাহারের ১০টি রচনার বিপরীতে গ্রন্থকারের স্বাক্ষরে রয়েছে নয়টি রচনা, যেগুলোর মধ্যে আবার অন্তর্ভুক্ত আছে কাজী মোতাহারের ১১টি চিঠি, জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থার প্রকাশকাল অনুল্লেখিত সমাজ ও ঐতিহ্য নামক গ্রন্থের দীর্ঘ ভূমিকা; ‘অন্তরঙ্গ আলাপ’ও মূলত মোতাহার-ভাষ্য। দেখা যাচ্ছে, কাজী মোতাহার হোসেনের সরাসরি লেখা-কথা এই গ্রন্থের প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে আছে। তবে এইসব মিলিয়ে মোতাহার জীবন-মননের পূর্ণ বিবরণী পেশ করে গ্রন্থটিকে অতুল্য মহিমা দিয়েছেন অধ্যাপক চৌধুরী।

আবুল আহসান চৌধুরী বাংলা ভাষা-সাহিত্য-ইতিহাসের নানা ব্যক্তি-বিষয়-অধ্যায় নিয়ে প্রমাণাদি উদ্ধার ও যুক্তিনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে খ্যাতিমান হয়েছেন। কাজী মোতাহার হোসেনকে নিয়ে এটি তাঁর প্রথম প্রকাশনা নয়। বস্তুত মোতাহার-চর্চায় তিনি সবচেয়ে এগিয়ে। ইতঃপূর্বে কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলি ৩য় (১৯৯২) ও ৪র্থ খণ্ড (১৯৯২), কাজী মোতাহার হোসেন প্রবন্ধ-সংগ্রহ (২০০৭), কাজী মোতাহার হোসেন : জীবন ও শিল্প (২০০৭), প্রগতি মননের তপস্বী (২০১৮) প্রভৃতি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। এর বাইরে মুসলিম সাহিত্য সমাজ নিয়ে তাঁর কৃত গবেষণা ও লেখালেখিতে অনিবার্যভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়েছেন মোতাহার। তবে আবুল আহসানের মোতাহার-চর্চায় কিছু ভিন্ন মাত্রাও উল্লেখ্য। যেমন, তিনি কাজী মোতাহারকে দিয়ে লিখিয়েও নিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত লোকসাহিত্য পত্রিকা ও অন্যবিধ উপলক্ষে বা ইতিহাস নির্মাণের প্রয়োজনে কাজী মোতাহারকে নিয়মিতভাবে তাগাদা দিয়ে স্মৃতিকথামূলক রচনা প্রণয়ন করিয়ে নিয়েছেন। মোতাহারের স্মৃতিকথা (২০০৪) গ্রন্থটি মূলত স্নেহসিক্ত আহসান চৌধুরীর অনুরোধ-আবদারসৃজিত রচনার সংকলন। আত্মজীবনী রচনায় অনীহ বাঙালিদের মধ্যে কাজী মোতাহারের মতো ব্যক্তিত্বকে দিয়ে এইসব স্মৃতিকথন রচনা করিয়ে নেওয়ার জন্যে আবুল আহসান চৌধুরীকে আলাদাভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। তবে তিনি যে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় উনিশ শতকের ‘খ্যাতি কুড়িয়েছেন’ ও ‘অপেক্ষাকৃত স্বল্প-পরিচিত’ বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক-সাময়িকপত্রসেবীর দুটো তালিকা দিয়েছেন (পৃ.৭৬), তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে প্রথম ভাগে শেখ আবদুর রহিম কিংবা আবদুল হামিদ খান ইউসফ্জীর বিপরীতে দ্বিতীয় ভাগে মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন বা খানবাহাদুর আহসানউল্লাহর অন্তর্ভুক্তি সম্ভবত সর্ববাদীসম্মত হবে না। ১১ আগস্ট ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত গ্রন্থকার-গৃহীত মোতাহার হোসেনের সাক্ষাৎকারটির কথাও উল্লেখযোগ্য, যেটি আলোচ্য গ্রন্থে ‘অন্তরঙ্গ আলাপ’ শিরোনামে মুদ্রিত। তবে মোতাহার হোসেনের অন্তরের আরও একান্ত চিত্র ধরা পড়েছে অন্য দুটো রচনায়। ‘পত্রালির স্মৃতি’তে আছে মোতাহার হোসেনের ১১টি চিঠি। এসব চিঠিতে একান্ত ব্যক্তিগত-পারিবারিক প্রসঙ্গসূত্রে মোতাহার-মানসের মহিমা কিছু বিচ্ছুরিত হয়েছে। এ পর্যায়ে আমাদের উল্লেখ করতে হচ্ছে যে, আবুল আহসান মোতাহার হোসেনের স্নেহের ভাগিনেয়; চিঠিগুলো তাঁকেই লেখা, সাহিত্য-ইতিহাস প্রসঙ্গও বেশকিছু চিঠির উপজীব্য হয়েছে। তাই এক-দুটো টীকাভাষ্যও দরকার ছিল। যেমন  ১ সংখ্যক চিঠির কৃষ্ণময় ভট্টাচার্য বা ৬ সংখ্যক চিঠির আবদুল ওয়াহেদ সম্পর্কে পাঠকের জানবার আগ্রহ হতেই পারে। দ্বিতীয় রচনাটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক―শিরোনাম ‘মার্জিনে মন্তব্য ও আরজ-দর্শন’। স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের (১৯০০-১৯৮৬) সত্যের সন্ধানে (১৯৭৩) ও সৃষ্টিরহস্য (১৯৭৮) পাঠের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। মোতাহার হোসেন বইপত্রিকা পড়বার কালে মার্জিনে তাঁর মন্তব্য লিখে রাখতেন। এই দুটো আলোচিত-সমালোচিত বই পড়ার ক্ষেত্রেও সেটা করেছিলেন। দ্বিতীয় গ্রন্থের একটি ‘পরিচিতি’ও আলাদাভাবে লিখেছিলেন। সেটি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি আবুল আহসান চৌধুরী মোতাহারকৃত মন্তব্য বিশ্লেষণ করে রচনাটিকে ঋদ্ধ করেছেন।

শুধু আত্মীয়তার কারণেই কাজী মোতাহারের প্রিয়পাত্র হননি আবুল আহসান। বস্তুত পঠন-পাঠন, ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসা ও সাহিত্যচর্চার কারণে গ্রন্থকার তাঁর মাতুলের প্রিয়তর ‘স্নেহবরেষু ভাগ্নে’ হয়ে উঠেছিলেন এবং উত্তরাধিকার হয়েছিলেন মোতাহারের অনেক সাহিত্যসংগ্রহ ও লেখালেখির, এমনকী খসড়া বা বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপিরও। যথাযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ডক্টর চৌধুরী উত্তরকালের কাছে সেগুলো উপস্থাপন করলেন।

অগ্রন্থিত রচনাগুলোর মধ্যে মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যবিবরণী প্রসঙ্গে কিছু বলতে হয়। সাধারণত সংগঠনের কার্যবিবরণী সম্পাদকই লিখে থাকেন এবং সভাপতি তাতে প্রতিস্বাক্ষর করেন। এর বিপরীত নজিরও আছে। তবে হস্তাক্ষর, ভাষাভঙ্গি ও প্রসঙ্গ প্রমাণ দেয় যে এগুলো ‘সাহিত্য সমাজে’র তৎকালীন সম্পাদক কর্তৃকই লিখিত হয়েছিল। ‘গান সমাপ্ত হইবা-মাত্র বক্তৃতা-ক্লান্ত সভার ভঙ্গ হইতে কিছু মাত্র বিলম্ব হয় নাই―এমন কি ধন্যবাদ গ্রহণ বা প্রদানের জন্যও নয় (পৃ.১৩৯)।’―এরকম সরস বাক্ভঙ্গি মোতাহার হোসেনের প্রবন্ধরাজিতেও সুলভ। অধিবেশনগুলোতে সভাপতি নির্দিষ্ট ছিল না। বিভিন্ন দিন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি সভাপতিত্ব করেছেন। সভাপতির প্রতিস্বাক্ষরবিহীন বিবরণীও পাচ্ছি আমরা। তবে রচনা দুটোকে পুুরোপুরি অগ্রন্থিত বলা যাবে কি ? সেগুলো এক অর্থে আবুল আহসান চৌধুরীর সুবাদেই এর আগে একরকম গ্রন্থিত হয়েছিল। তাঁরই সংকলন-সম্পাদনা-ভূমিকায় ২০১৫ সালে গ্রন্থাকারে পাওয়া গেছে মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬Ñ১৯৩৮। তবে সেটি ছিল প্রতিলিপি মুদ্রণ; এখানে কম্পোজকৃত পাঠ মুদ্রিত হয়েছে। কালদষ্ট পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধার কখনই সহজসাধ্য হয় না। পরিশিষ্টে সংযোজিত প্রতিলিপি সেকথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। 

অগ্রন্থিত রচনা উপস্থাপনা সার্থক হয় প্রাসঙ্গিক আলোচনায়। তাছাড়া আবুল আহসান চৌধুরীর লক্ষ্য ছিল পরিপূর্ণভাবে মোতাহার-মননমানসের পরিচিতি প্রদান ও মূল্যায়ন। সেদিক দিয়ে তিনি নিজেকে যোগ্যতম বলে প্রমাণিত করেছেন তাঁর আলোচনাসমূহে। কাজী মোতাহার হোসেন সম্পর্কিত আলোচনা, তাঁর অগ্রন্থিত-দুষ্প্রাপ্য রচনা ও প্রমাণাদির সঙ্গে গ্রন্থটির আনিসুজ্জামান রচিত ভূমিকাটিও মূল্যবান। যথারীতি আমাদের সদ্যপ্রয়াত মনীষী আনিসুজ্জামানের এই ভূমিকাটিও স্বল্পায়তন, কিন্তু সারগর্ভ। গ্রন্থ-ভূমিকা রচনাকে তিনি শুধু অনুরোধ-উপরোধ রক্ষা হিসেবে মনে না-করে মনোযোগের সাথে পাণ্ডুলিপি পাঠ শেষে, চিন্তা-যুক্তির জারণে দিকনির্দেশি বক্তব্য পেশ করতেন। এই ভূমিকা রচনাতেও তার প্রমাণ মেলে। বইটি পাঠ করার সময় মোতাহার-সান্নিধ্যস্মৃতি তাঁকে ‘স্মৃতিকাতর’ ও শ্রদ্ধাপরবশ করলেও এক সাক্ষাৎকারে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষাচিন্তা প্রসঙ্গে কিছুটা ভুল তথ্য দিয়েছিলেন কাজী সাহেব, সেটি উল্লেখ করে গ্রন্থকারকেও তাঁর কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দেন। অবশ্য গ্রন্থকার যথাস্থানে তাঁর কর্তব্যটি পালন করেছেন। এমনিভাবে দায়িত্বনিষ্ঠ সম্পাদনা ও সারবান মূল্যায়নের একটি স্মারকরত্ন হয়ে উঠেছে গ্রন্থটি।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares