প্রবন্ধ : মানুষ পাচারের গল্প : সুব্রত কুমার দাস

ইমদাদুল হক মিলন তাঁর ঔপন্যাসিক জীবন শুরু করেছিলেন যাবজ্জীবন দিয়ে। ১৯৭৬ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত সুখপাঠ্য সে উপন্যাস মহৎ এক সৃষ্টি না হলেও লেখকের তরল প্রয়াস নয়। পরবর্তী পর্যায়ে মিলনের কলমে আমরা তিন ধরনের উপন্যাস পেয়েছি : প্রেমের উপন্যাস, সিরিয়াস উপন্যাস এবং বিষয়গতভাবে মহৎ কিন্তু কম আদৃত উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে রচিত জীবনপুর সাধারণ ও সিরিয়াস উভয় গোষ্ঠীর পাঠককেই আকৃষ্ট করবে বলে বর্তমান আলোচকের বিশ্বাস।

যাবজ্জীবন এর লেখক যখন ভূমিপুত্র (১৯৮৫) লিখেছিলেন তখন সে উপন্যাসের ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি এবং গ্রামীণ জীবন সব কিছু মিলে যে অদ্ভুত এক রস ইমদাদুল হক মিলন সৃষ্টি করেছিলেন তা, বিশেষভাবে নন্দিত হয় নূরজাহান (প্রথম পর্ব ১৯৯৫, দ্বিতীয় পর্ব ২০০২) প্রকাশের ভেতর দিয়ে। বিশালাকার সে উপন্যাস উভয় বাংলাতেই বিপুলভাবে পঠিত। সে উপন্যাসের তৃতীয় খণ্ডের অপেক্ষায় অধীর বাঙালি পাঠকের সংখ্যাও কম নয়। এমন মন্তব্যও অনেক সমালোচকের মুখে সমীচীন যে মিলন আর কোনও উপন্যাস না লিখলেও শুধুমাত্র নূরজাহান-এর জন্যই বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে পারতেন। অন্যদিকে কম জনপ্রিয় কিন্তু বিষয়ভারে গুরুত্বপূর্ণ মিলনের অন্যান্য উপন্যাস হলো রাজাকারতন্ত্র, ঘেরাও, দ্বিতীয় পর্বের শুরু, মহাযুদ্ধ, নিরাপত্তা হই, বালকের অভিমান, কালোঘোড়া, সুতোয় বাঁধা প্রজাপতি ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সে সকল গ্রন্থ মহৎ সাহিত্যের নজির না হলেও ভালো প্রয়াস হিসেবে নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার। প্রবাস জীবন নিয়ে রচিত পরাধীনতা (১৯৮৫) বা পরবাস (১৯৮৭)ও অনেক পাঠকের চোখে জল আনতে সক্ষম হয়েছিলও বলে জানা যায়। কিন্তু এ সবের বাইরেও রয়েছে ইমদাদুল হক মিলনের অধিক গ্রহণযোগ্যতা। সরলরৈখিক তরল তেমন উপন্যাসও মিলন রচনা শুরু করেন আশির দশকের শেষ দিকে। ১৯৮২ তে তেমন উপন্যাস রাধা ও কৃষ্ণ এবং দুঃখকষ্ট। সে তালিকা দীর্ঘ হয়ে চলে যত দূরে যাই, যদি ভালবাসা পাই, কেউ কথা রাখেনি, ভালবাসার সুখদুঃখ প্রভৃতি দিয়ে। তরুণ-তরুণীর প্রেমকে আশ্রয় করে রচিত এমন উপন্যাসের ধারাটিও কিন্তু বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি প্রতুল নয়। আর সে ধারাতে খুব দ্রুত ইমদাদুল হক মিলনের বিক্রিবাটা বেড়ে যাওয়ায় রচিত হতে থাকে একের পর এক প্রেমকাহিনি এবং ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে পড়তে থাকে সে সবের লেখকই প্রকৃতপক্ষে যাবজ্জীবন বা ভূমিপুত্র-র লেখক।

এই বহু ধারার সফল নির্মাতা মিলন, তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস জীবনপুর ২০০৮ সালে প্রকাশিত কেমন আছ সবুজপাতা এবং মৌসুমী’র পরবর্তী প্রযোজনা। স্মৃতিকাতরতার উপন্যাস হিসেবে যে দুটির উপন্যাসের সাথে আমাদের আলোচিতব্য জীবনপুরও একই তালের, তবে সন্দেহাতীত যে জীবনপুর অধিক মনোগ্রাহী, ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট, বাস্তবনিষ্ঠ।

জীবনপুর প্রকৃতপক্ষে দুটি ঘটনার বুননে তৈরি। যে ঘটনা দিয়ে উপন্যাসটির শুরু ও শেষ সেটি লালু নামের এক বেকারত্ব জর্জরিত যুবকের দেশত্যাগের কাহিনি। সে কাহিনি এক মর্মন্তুদ মাত্রা ধারণ করে যেহেতু দেশ ত্যাগ করে সে আসলে চলেছে পাকিস্তানের উদ্দেশে; শেষ পর্যন্ত তাদের গন্তব্য দুবাই হলেও আপাত গন্তব্য পাকিস্তান তার জন্য সৃষ্টি করে চলেছে অসহনীয় এক যন্ত্রণা কেননা, লালু নিজে জড়িত ছিল মুক্তিযুদ্ধে যে যুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি ছিল পাকিস্তান নামের দেশটি। এবং উপন্যাসটি লালুর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়কে আশ্রয় করার ফলে হয়ে ওঠে অধিকতর মূল্যবান। তবে গ্রন্থটি শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গটিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটি চলে যায় আরও অতীতে যেখানে লালুর শৈশব তার শৈশবিক দুঃখবেদনা, ক্রমে কৈশোরত্বে উত্তরণ, কৈশোরিক স্মৃতিসমূহ ইত্যাদিও ফ্ল্যাসব্যাকে সহজেই উঠে আসে :

আমি পাকিস্তানে চলে যাচ্ছি।

ভাবা যায়, একজন মুক্তিযোদ্ধা চলে যাচ্ছে পাকিস্তানে! যে দেশ আমাদের সবচাইতে বড় শত্রু, যে দেশের বিরুদ্ধে নয়টি মাস যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, একাত্তর সালে যে দেশের শূকরছানাগুলো হত্যা করেছে আমাদের তিরিশ লক্ষ মানুষ, সম্ভ্রমহানি করেছে তিন লক্ষ মা-বোনের, আমি চলে যাচ্ছি সেই দেশে!

আমি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করিনি। আসলে করার চান্স পাইনি। করতে চেয়েছি, কমান্ডার করতে দেননি। তিনি আমাকে লাগিয়েছিলেন অন্য কাজে।

শুধু অস্ত্র হাতে যাঁরা যুদ্ধ করেছেন তাঁরাই কি মুক্তিযোদ্ধা ?

তাঁদেরকে যাঁরা সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তাঁরা কি মুক্তিযোদ্ধা না ? শত্রু শিবিরের খবর যাঁরা এনে দিয়েছেন, কোথা দিয়ে কীভাবে আক্রমণ চালালে ধ্বংস করা যাবে শত্রুশিবির, হাতের তালুতে জীবন নিয়ে যাঁরা এই কাজ করেছেন তাঁরা কি মুক্তিযোদ্ধা না ?

আমি সেই রকম এক মুক্তিযোদ্ধা।

একাত্তর সালে আমার বয়স সতেরো-আঠারো। (পৃষ্ঠা ০৯)

আর যেদিন উপন্যাসের কাহিনি উন্মোচিত হয়, লালু পাকিস্তানের পথে, সে তারিখটি হলো ২৩ মার্চ ১৯৮২। অর্থাৎ লালুর আটাশ উনত্রিশ বছর বয়সে জীবনপুর গ্রন্থটি উন্মোচন, একটি কাহিনি সামনে এগোয় কয়েক মাস, আর একটি এগিয়ে পুরো এক দশকের বেশি লালুর জীবনে। আয়তনের দিক দিয়ে ফ্ল্যাসব্যাক দীর্ঘ―বর্তমানের কাহিনির প্রায় দ্বিগুণ। উপন্যাসটি বর্তমান যে চলা ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে ভারতের পশ্চিম বাংলা হয়ে দিল্লি হয়ে অমৃতসর … এ এক অনাস্বাদিত ভ্রমণ। ১১টি অধ্যায় বিভাজনে পুরো গ্রন্থটি নির্মিত। অধিকাংশ সময়ে বিভাজনগুলোর শুরু হয় যাত্রাপথে অবস্থান নির্দেশ করে। একটু হিসাব কষে দেখা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে :

(১) আমি পাকিস্তানে চলে যাচ্ছি

(২) রাজশাহী পৌঁছালাম সন্ধ্যার পর

(৩) ভগবান গোলা থেকে কলকাতা

(৪) [ট্রেনে চলেছে কথকসহ দলবল]

(৫) দিল্লি পৌঁছালাম দুদিন পর

(৬) [দিল্লিতেই অবস্থান]

(৭) [দিল্লিতেই অবস্থান]

(৮) অমৃতসরে আমাদেরকে তোলা হলো এক শিখের বাড়িতে।

(৯) [অমৃতসর থেকে পাকিস্তানের পথে]

(১০) আমাদের পুরো দলটিকে পাকিস্তান আর্মি তাদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল

(১১) ওয়াগা বর্ডার জায়গাটা দেখলেই ভয় লাগে।

লালুদের যাত্রাপথ আমাদের অধিকাংশেরই অচেনা। কখনও কখনও কারও শ্রুতিনির্ভর অভিজ্ঞতা থাকলেও বাস্তবে সে পথে মাড়াই করার অভিজ্ঞতা ইমদাদুল হক মিলন পেলেন কীভাবে! সে কারণেই কি সে ঔপন্যাসিকের কলমকে সালাম করতে দ্বিধা করেন না বাংলা ভাষার সমকালীন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধান লেখকেরাও।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের সেই দিনটির বর্ণনা পড়া যাক :

খোরশেদ বলল, এখন হইতাছে আসল কাম। খাল সাঁতরাইয়া ওই পাড়ে যাইতে হইব। যে যেইভাবে পারো সাঁতরাইয়া পার হও। কাপড় চোপড় ভিজাইতে না চাইলে খুইল্লা হাতে লও। এখন আর লজ্জা শরম কইরা লাভ নাই।

আশ্চর্য ব্যাপার, মেয়েগুলো পর্যন্ত নিঃশব্দে তাদের শাড়ি ছায়া ব্লাউজ সব খুলে ফেলল। এক হাতে শাড়ি ছায়া ব্লাউজ ধরে অন্য হাত দিয়ে ছ্যাঁচড়ে ছ্যাঁচড়ে পানিতে নেমে গেল। কোলের বাচ্চাগুলোর একটাকে নিয়েছে খোরশেদ, একটাকে মোফাজ্জল আর একটা দেখি মনোয়ারের কোলে। জামা কাপড়ের সঙ্গে এক একটা বাচ্চাকে এক হাতে উঁচু করে ধরে নিঃশব্দে খাল পেরোচ্ছে তারা।

আমিও দিগম্বর হয়েই খালে নেমেছি। সঙ্গের ছোট্ট ব্যাগটা আর লুঙ্গি শার্ট একহাতে ধরে ধীরে ধীরে পানি ভাঙছি। কী যে কষ্টকর ব্যাপারটা। স্বাভাবিক অবস্থায় এইটুকু খাল পার হতে এক দেড় মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা না। আমাদের লেগে গেল চার পাঁচ মিনিট।

ওপারে এসে যে যার  কাপড় চোপড় পরছি। সার্চলাইট ধীরে ধীরে ঘুরে আসছে আমাদের দিকে। সেই আগের কায়দায় মাটিতে শুয়ে পড়েছি আমরা। সার্চলাইট ঘুরে যাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে বাঘের মতো হুংকার ছাড়া গলায় কে যেন বলল, হল্ট। (পৃষ্ঠা ১৮৩)

এমন একটি দৃশ্যের অভিজ্ঞতা পাঠকের জন্য রোমহর্ষক। দৃশ্যটি পড়ার সময় বারবার লোকনাথ ভট্টাচার্যের (১৯২৭-২০০১) বাবুঘাটের কুমারী মাছ (১৯৭২) উপন্যাসটির নগ্ন মানুষদের চিত্রকল্পটি পাঠকের মস্তিষ্কের অলিগলিতে উঁকিঝুঁকি মারবে।

রোমহর্ষক অনুরূপ আর একটি ঘটনা উপন্যাসটিতে রয়েছে সামান্য আগেই। অমৃতসরে সেই শিখ পরিবারে লালুসহ সকলের রাত যাপনের পরদিন সকাল সেটি। অন্যদের মতো লালুও গিয়েছে লোটা হাতে ঝোপঝাড়ের ভেতর প্রাতঃকার্য সারতে। প্রাতঃকার্য চলাকালে লালুর প্রথম চোখে পড়ে জঙ্গলের ভেতর থেকে লম্বা গলার দুটো শকুন এগোয় তার দিকে। তারপর ?

[…] সেই দুটো শকুনের জায়গায় তখন চারদিকের জঙ্গল থেকে বেরিয়েছে পঞ্চাশ ষাটটা শকুন। চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে আমার দিকে।

আরে, শকুনে কী জ্যান্তই খেয়ে ফেলবে আমাকে ? এগুলো কী ভারতীয় শকুন, নাকি পাকিস্তান থেকে গোপনে এসে ওত পেতে আছে এই জঙ্গলে ? বাংলাদেশি পেলেই জ্যান্ত ঠুকরে খাবে ?

এ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আমার।

কেন শকুনগুলো ওইভাবে চারদিকে এগোচ্ছিল  একজন মানুষের দিকে ?

কী উদ্দেশ্য এদের ?

শকুনগুলো কি আমাদের আসলে লাশ মনে করেছিল ? মরে পচে গলে যাওয়া মানুষের লাশ ? লাশ মনে করেই কি আমাকে ঠুকরে খেতে ওভাবে এগোচ্ছিল ?

ভয়ে আমার তখন কলিজা শুকিয়ে গেছে। অর্ধেক হওয়ার পর পায়খানা বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও রকমে  পানি খরচ করে লোটা হাতে নিয়ে একটা দৌড় দিলাম। এক দৌড়ে সোজা সেই শিখের বাড়িতে। (পৃষ্ঠা ১৭১)

পাকিস্তান যাত্রায় লালুর যে কিন্নতা তা যে কোনও সংবেদনশীল পাঠককেই স্পর্শ করতে বাধ্য। সে যাত্রার পথে পথে কত বিভীষিকা, কত অভাবিত ঘটনারাজি। জীবনপুর যদি শুধু সে যাত্রার কাহিনি নিয়েই বিকশিত হতো তা হলেও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উপন্যাস হতে কোনও বাধা থাকত না। কেননা, সে উপন্যাসেও অন্তর্ভুক্ত থাকত সেই সব আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ব্যাপার স্যাপার যা লালু প্রত্যক্ষ করে। বাংলাদেশের মেয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার যে সংবাদ পত্রপত্রিকায় আমরা পড়ি, মিলন তেমন জিনিসকে উপন্যাসে তুলেছেন মমতা দিয়ে। কেমন করে পাচার প্রক্রিয়াধীন সে মেয়েরা লালুদের যাত্রাকালে সহজেই শয্যাশায়ী হতে থাকে দালাল থেকে শুরু করে সীমান্তরক্ষীদের তার অনবদ্য চিত্রায়ন জীবনপুর-এর পাঠকে আবিষ্ট  করে। যাত্রাপথের বিঘ্ন দূর করতে সে সকল মেয়েদের ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টি কিন্তু লালুকে দ্রোহী করেছে বারবার। জ্বলে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা লালুর অন্তর্গত চেতনা, যে চেতনা কিশোর লালুকে ১৯৭১ সালের দিনগুলোতেও উদ্যমী ও সক্রিয় রেখেছিল পুরো দশ মাস ধরে।

তবে এই যে দেশ ছেড়ে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা, তার ভেতরে মুক্তিযুদ্ধে লালুর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ ইত্যাদির সাথে সাথে আরও যে একটি ব্যাপার প্রবিষ্ট হয় তা হলো বিলুর কথা। বিলুর সাথে লালুর যে ভাব ভালোবাসা ছিল তা স্পষ্ট হয়। বিলুর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় লালুর যে অন্তরীণ ক্রোধ সে সবও ভূমিকা রাখে দেশ ত্যাগে লালুর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে। যদিও আমরা বুঝতে পারি আশির দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের যুবসমাজের জন্য যে হতাশার ব্যাপকতা বিস্তার লাভ করেছিল সে সবও ছিল অন্য সব যুবা বয়সের মানুষের মতো লালুর জন্য প্ররোচনা। ভাগ্যানুসন্ধানে দেশান্তরিত হতে চাওয়া।

লালুর পাকিস্তান যাত্রার কাহিনিতে প্রথম ফ্ল্যাসব্যাক এসেছে ২৩ পৃষ্ঠা পর (৩২ পৃষ্ঠাতে)। ‘আমাদের বাড়ি ছিল বিক্রমপুর’ বলে সে আখ্যানের শুরু। এমন শুরু কি স্পষ্টতই এজন্য যে, বিক্রমপুরের কিশোর লাল মিয়া ওরফে লালুর ভেতর প্রচ্ছন্নে রয়েছেন কথাকার মিলন নিজেই। অন্তত লালুর বেড়ে ওঠার ভেতর যে মিলনের বেড়ে ওঠাকে প্রত্যক্ষ করতে দোষ নেই তা স্পষ্ট। লেখকের বেড়ে ওঠার স্মৃতিবাহী সে ধারাটি যা জার্মান শব্দ ‘নরষফঁহমংৎড়সধহ’ নামে পরিচিত তা কি ইমদাদুল হক মিলনের আর কোনও উপন্যাসে লক্ষিত ? সে স্মৃতিরচনার ভেতর একসময় আসে বিলু নামের সেই মেয়েটি।

শৈশবের বর্ণনা ইমদাদুল হক মিলন দিয়েছেন সরল ভাষ্যে। আত্মকথনের ভঙ্গিতে। উত্তম পুরুষে। প্রথম ১০/১২ পৃষ্ঠার বর্ণনায় খুব পরিকল্পিতভাবে না হলেও এসেছে পরিবারের মানুষদের কথা―বিশেষ করে তার মা ও বড় ভাইয়ের কথা। অন্য ভাইবোনদের কথাও আসতে থাকে। সে বর্ণনারাশির দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে ৫৬ পৃষ্ঠাতে। বাবা-মা-ভাই-বোনসহ গ্রামীণ যে পরিবেশ লালুর কৈশোরকে মথিত করেছে তা বিবৃত হয়েছে পূর্ণ বিস্তারে, তবে এসবের ভেতর দিয়ে উপন্যাসটি নতুন যে মাত্রা পেয়েছে তা হলো শৈশব-কৈশোরের লালুর সময় ছিল সরলতায় ভরা আর যে লালু বর্তমানে মানুষ পাচারের মতো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ব্যবসার শিকার।

বিলু নামের মিষ্টি মেয়েটি যে কি না শিশু বয়সেই লালুর হাত ধরে বলেছিল ‘এই হাত কখনও ছাড়বো না’ সেই বিলুর প্রসঙ্গটি সাজিয়ে গুছিয়ে ঔপন্যাসিক শুরু করেন ৮১ পৃষ্ঠায়। কেমন করে কৈশোরকালীন মারামারির ভেতর দিয়ে তাদের মুখ চেনা এবং তাদের ভাব ভালোবাসা। এক সময় এমন হলো বিলুকে ছাড়া লালু থাকতে পারত না। রাতে পড়াশোনা শেষে লালু চলে যেত বিলুর ঘরে। দুজনে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে যেত যা ক্রমে লালুর ‘নেশা’ হয়ে যায় যদিও লেখক জানিয়েছেন ‘দুজনে একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের কারও মধ্যেই কোনও ফাজিল আচরণ নেই। শরীর ইত্যাদি আমাদের ভাবনায় আসে না। আমি ছেলে, বিলু মেয়ে এই বোধটাই কাজ করে না। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি। এ ওর ওপর তুলে দিই পা। শুধু এইটুকুই’ (পৃষ্ঠা ৮৭)। যদিও আধুনিক পাঠক লেখকের এই সারল্যকে কপটতা ভাবলে তেমন ভাবনাতে নিশ্চয়ই দোষের কিছু হবে না। তারপর একদিন গভীর রাতে বিলুর বাবা বিষয়টি আবিষ্কার করলেন, কোনও নাটকীয়তা ছাড়াই বিলুকে তিনি কিশোরগঞ্জে নিয়ে গেলেন। কিশোর লালুর মাথায় ভেঙে পড়ল বিশাল এক আকাশ। তারপর ক্রমে ক্রমে অনেক চড়াই উতরাই-এর ভেতর দিয়ে আজকের দিন।

উপন্যাসের ভেতর সরবে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিটির বিকাশ ঘটেছে ১১৩ পৃষ্ঠায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। ঈশ্বরগঞ্জ থানা কম্পাউন্ডে ট্রেনিং শুরু হয়েছে। ট্রেইনার বজলু ভাই। ইপিআর (বর্তমান বিডিআর) এর গুলি খাওয়া এক সৈনিক এসে শুরু করলেন ট্রেনিং যেখানে শামিল লালুর মতো ৫০/৬০ জন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া না-যাওয়া, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ নিয়ে লালুর দশ মাস। সে সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তিযুদ্ধে যাবে, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ফিরে আসবে; কিন্তু পরে ‘আমার অসহায় মাকে আমি কার কাছে ফেলে যাবো’ (পৃষ্ঠা ১৩১) ভেবে সে আর যেতে পারে না।

এই যে দুটি গল্পের সুতো ক্রমে ক্রমে বুনতে বুনতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি সৈন্যের প্রসঙ্গ চলে আসে ভারত-পাকিস্তান বর্ডার পার হওয়ার সময়। সবচেয়ে বেশি রক্ত হিম করা অধ্যায় বোধ হয় নয়। অমৃতসর থেকে পাকিস্তানের পথে লালুদের দলটি। ক্লান্তিহীন হাঁটার একপর্যায়ে অন্ধকার রাতে দলটি ধরা পড়ে যায়। লেখকের ভাষ্য ‘পুরো দলটা আমরা ধরা পড়ে গেলাম…’ এবং মুহূর্তেই লেখক বলেন আমি একদিন আর্মির হাতে ধরা পড়ে গেলাম। চলে আসে ১৯৭১ সালে লালুর ধরা পড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটি। সে যাত্রায় লালুরা রক্ষা পেলেও রক্ষা পায়নি কর্নেল তাহেরের শ্বশুর বাড়ির পরিবার। মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেল তার ডাক্তার শ্বশুর এবং শালিকাকে।

জীবনপুর উপন্যাসে ইমদাদুল হক মিলন যে বর্ণনাকৌশল ব্যবহার করেছেন তা খুব বেশি অভিনব নয়। তবে মানুষ পাচারের যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা অভিনবত্বের দাবিদার। সে অভিজ্ঞতার এমন বাস্তব সাহিত্যাচরণ সন্দেহাতীতভাবেই প্রশংসার দাবিদার। জনপ্রিয় সাহিত্যের রূঢ় সমালোচকেরাও মিলনের এ প্রয়াসকে অভিনন্দন জানাবেন বলেই মনে হয়। সে প্রয়াস পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে লালু হয়ে ওঠার সময়কাল এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিসমূহ। আর এভাবেই জীবনপুর সকল ঘরানার পাঠকের কাছেই আদরণীয় হওয়ার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল। নূরজাহান ২য় খণ্ডের পর জীবনপুর তাই সত্যিকার অর্থেই মনোযোগী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম।

 লেখক : প্রবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares