প্রবন্ধ : নাগিব মাহফুজের কায়রো ট্রিলজি : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

[মিসরের কায়রো শহরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে নাগিব মাহফুজের জন্ম ১৯১১ সালে। তিনি মা-বাবার সপ্তম এবং সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। মাহফুজও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সরকারি চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন, যদিও একেবারে শুরুর দিকে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলেন। তিনি আরব্য রীতিনীতির পারিবারিক জীবনযাপন দেখে প্রথম দিকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি মনে করতেন বিয়ে করলে পারিবারিক জীবনে বন্দি হয়ে যাবেন এবং লেখালেখির জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে না।

              নাগিব মাহফুজের বয়স যখন সাত বছর ১৯১৯ সালের মিসরের (প্রথম বিশ^যুদ্ধ) যুদ্ধ তাঁর মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিনি জানালা দিয়ে দেখতেন ব্রিটিশ সৈন্যরা সাধারণ মানুষের বাড়িঘরের দিকে গুলি ছুড়ছে। এই নির্দয় আচরণে তিনি খুব ব্যথিত হতেন। কায়রো ট্রিলজিতে ব্রিটিশ ও অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যদের উপস্থিতি বেশ কিছু স্থান জুড়ে রয়েছে।   

              ১৯৩০ সালে তিনি তৎকালীন মিসরীয় বিশ^বিদ্যালয়ে (বর্তমানে কায়রো বিশ^বিদ্যালয়) দর্শনে স্নাতকে ভর্তি হন, ১৯৩৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৩৬ সালে এম.এ. সম্পন্ন করেন। লেখাপড়া শেষ করে কিছু দিনের জন্য সাংবাদিকতা করেন এবং তখনই তিনি ছোট গল্প লিখতে শুরু করেন। পরবর্তী সময় তিনি সরকারি আমলা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সত্তর বছরের মতো লেখালেখির জীবনে তিনি ৩৫টি উপন্যাস ও ৩৫০টি ছোটগল্প, এক ডজনের মতো সিনেমার স্ক্রিপ্ট ও পাঁচটি নাটক লিখেছেন। উপন্যাসগুলোর মধ্যে কায়রো ট্রিলজিই তাঁর সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত ও বিশ^ব্যাপী সমাদৃত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে তাঁর কয়েকটি মাত্র উপন্যাস পশ্চিমাদের দৃষ্টি কাড়ে। তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

              মাহফুজের প্রথম দিকে ঐতিহাসিক উপাদান নিয়ে লিখতে শুরু করেন এবং Abath Al-Aqdar (Mockery of the Fates, 1939), Rhadopis (1943), and Kifah Tibah (The Struggle of Thebes, 1944) তিনটি উপন্যাস লিখেন। যদিও তিনি ভেবেছিলেন ধারাবাহিকভাবে মিসরের ইতিহাসভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখবেন কিন্তু পরবর্তী সময় তিনি চিন্তা পরিবর্তন করে সমকালীন সাধারণ মানুষের জীবনব্যবস্থা, সামাজিক ইস্যু, সামাজিক পরিবর্তনের ফলে মানুষের জীবনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে লিখতে শুরু করেন যা তাঁকে নতুনভাবে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর লেখায় সমকালীন সমাজ-বাস্তবতা, সমাজতান্ত্রিক চেতনার রাজনৈতিক বিষয়, সমকামিতা এবং ঈশ্বর/ঈশ্বরবাদ ইত্যাদি বিষয় স্থান পায়। এর মধ্যে সমাজ বিবর্তন, মিসরের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং মানুষের জীবনের পরিবর্তনগুলো নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত হতে থাকে। মাহফুজের সাহিত্যকর্মে মিসরের বিংশ শতকের উন্নয়ন, পূর্ব-পশ্চিমের সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। তরুণ বয়সে নিজের আগ্রহের জন্যই বিশ^সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং ওয়েস্টার্ন ডিডেকটিভ, রাশিয়ার ক্ল্যাসিকস, আধুনিক লেখকদের লেখা যেমন : মার্সেল প্রাউস্ট, ফ্রান্স কফকা ও জেমস জয়সি প্রমুখ বিখ্যাত লেখকদের লেখা পড়তে আরম্ভ করেন। তাঁর গল্পগুলো নির্মিত হয়েছে মিসরের আধুনিক ও পশ্চিমা জীবনযাপনের সংস্কৃতি ধারণ করতে চায় এমন সাধারণ মানুষের যাপিতজীবনের ওপর ভিত্তি করে। মূলত এই স্বপ্ন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মধ্যবিত্তরাই দেখে থাকে। তাঁর আরেকটি উল্লেখযেগ্য রচনা হলো Tharthara Fawq Al-Nīl (Adrift on the Nile)  যেটি ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময় এই কাহিনির ওপর ভিত্তি করে সিনেমা হয় এবং আনোয়ার আল সাদাত এটিকে নিষিদ্ধ করেন। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও অত্যন্ত জনপ্রিয় রচনা হলো ঞযব ঈযরষফৎবহ ড়ভ এবনবষধরি The Children of Gebelawi (1959, also known as Children of the Alley)।

              নাগিব মাহফুজের অধিকাংশ লেখাতেই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি নিজেও বলেছেন, “In all my writings, you will find politics. You may find a story which ignores love or any other subject, but not politics; it is the very axis of our thinking”.

              আরব জাহানে নাগিব মাহফুজ ছিলেন বিতর্কিত লেখক। সালমান রুশদির বহুল বিতর্কিত উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ প্রকাশিত হওয়ার পর ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে মাহফুজ খোমেনিকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করেন। তবে তিনি রুশদির কাজ পছন্দ করেননি বা সমর্থন করেননি সে-কথাও প্রকাশ করেন।]

আমাদের হাতে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু অনূদিত নালন্দা থেকে প্রকাশিত কায়রো ট্রিলজির তিনটি খণ্ড এসেছে। এগুলো হলো―প্যালেস ওয়াক, প্যালেস অব ডিজায়ার ও সুগার স্ট্রিট। তিন খণ্ডে মোট চৌদ্দ শত পৃষ্ঠায় উপন্যাসের বিস্তৃতি। তিনটি ভিন্ন নামে ট্রিলজি আকারে প্রকাশিত হলেও পরিচ্ছদ হিসেবে প্রথম খণ্ড থেকে শুরু হয়ে তৃতীয় খণ্ডে ক্রম ধারায় ১৬৮টি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে। আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি (প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা ও বকুলকথা) কিংবা সমরেশ মজুমদারের (উত্তরাধিকার, কালবেলা ও কালপুরুষ) কিংবা গৌরকিশোর রচিত জল পড়ে পাতা নড়ে, প্রতিবেশী ও প্রেম নেই—তিনটি স্বতন্ত্র উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে নেই। বাংলা সাহিত্যে শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন ট্রিলজির বৈশিষ্ট্য কায়রো ট্রিলজির মতো লক্ষ্য করা যায়। তিন খণ্ডের স্বতন্ত্র তিনটি শিরোনাম থাকলেও এটিকে দীর্ঘ উপন্যাস বলেও ভুল হবে বলে মনে হয় না। অনুবাদক নিজেও ভূমিকায় লিখেছেন, কায়রো ট্রিলজি তিনটি পৃথক খণ্ডে বিভক্ত হলেও নাগিব মাহফুজের উদ্দেশ্য ছিল একটি গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করা। এটির রচনা শেষ হলে তিনি ফুলস্কেপ কাগজে এক হাজার পৃষ্ঠার অধিক আকৃতির পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে তার প্রকাশক সাঈদ আল-শাহারের কাছে যান। তিনি পাণ্ডুলিপি না পড়েই শুধু এর আকৃতি দেখে মন্তব্য করেন, ‘এটি কোন ধরনের দুর্যোগ ?’ বিশাল উপন্যাস প্রকাশের বিপুল ব্যয়ের কথা বিবেচনা করে তিনি মাহফুজকে পাণ্ডুলিপি ফেরত দেন, যদিও আরবি সাহিত্যের দিকপাল তাহা হোসেন উপন্যাসটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।’

প্রকাশক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ন হন নাগিব মাহফুজ এবং হতাশায় ভেঙে পড়েন। পরবর্তী সময় সরকারি একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রথম খণ্ড পর্যন্ত প্রকাশিত হলে এর জনপ্রিয়তা দেখে প্রকাশক প্রকাশনার ব্যয় নিজের আয়ত্তের মধ্যে রেখে প্রথম খণ্ড প্যালেস ওয়াক প্রকাশ করেন এবং ব্যবসায় সাফল্য পাওয়ায় প্রকাশনার ব্যয় হিসাব করে দ্বিতীয় খণ্ড প্যালেস অব ডিজায়ার এবং পরে তৃতীয় খণ্ড সুগার স্ট্রিট প্রকাশ করেন। আরব দেশেই এই উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী।   

              সময়ের হিসেবে এটিকে পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময়ের ব্যাপ্তিতে ফেলা যায়। উপন্যাসের সময়ের ব্যাপ্তি সরাসরি কোথাও উল্লেখ না থাকলেও ঘটনা প্রবাহে ১৯১৯ সালের প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর থেকে শুরু হয়ে ১৯৪৪ সালের গণগ্রেফতারের ঘটনার মধ্য দিয়ে সময়ের ব্যাপ্তি লক্ষ করা যায়। কেননা, ইতিহাসের মতো এই উপন্যাস সন তারিখ দিয়ে শুরু হয়নি, গল্পের বয়ানে রাজনীতি এসেছে এবং সেখানে লেখক কোনও কোনও ক্ষেত্রে সন-তারিখ উল্লেখ করেছেন মাত্র। চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সন-তারিখ থাকলেও ঘটনা প্রবাহের বিস্তৃতি একটু বেশি হিসেবে সময়ের ধারণা করা হয়েছে। ফিরে দেখা যাক উপন্যাসটি কী ধরনের রসদে এবং কোন স্থাপত্য কাঠামোয় নির্মিত হয়েছে।

প্যালেস ওয়াক

আল-সাইয়িদ আহমদ আবদ-আল জাওয়াদ, একজন দাপুটে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ধনাঢ্য অভিজাত ব্যবসায়ীর পরিবারকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই বিশাল আকারের পারিবারিক ও সামাজিক উপন্যাস। যদিও পারিবারিক ও সামাজিক উপন্যাস তদুপরি উপন্যাসের কয়েক অধ্যায়ে রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ রয়েছে যেখান থেকে উল্লিখিত সময়ের মিসরের ব্রিটিশ কলোনিয়ান রাজনীতির প্রকৃতি অনুধাবন করা যায়।

              আল-সাইয়িদ আহমদ আবদ-আল জাওয়াদ এতটাই দাপুটে প্রতাপশালী ছিলেন যে, তাঁর ভয়ে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান সব সময় তটস্থ থাকে। এমনকি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস এই বাড়ির কারও নেই। নিজের মর্যাদা ও আভিজাত্যের হায়ারার্কি বুঝানোর জন্য তিনি বাড়ির তেতলায়  থাকেন, মা ও ছেলেরা থাকে দোতলায় এবং দুই মেয়ে থাকে নিচতলায়। চৌদ্দ বছর বয়সে আমিনার বিয়ে হয়ে এখন চল্লিশোর্ধ্ব ধর্ম-ভীরু আমিনা চার সন্তানের মা হলেও মাঝ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন স্বামী কখন আসবেন কফি হাউজ থেকে প্রমোদ-আহ্লাদ শেষ করে। এই প্রমোদ-আহ্লাদ মানেই মদ্যপান, নারীর সাহচর্য, নৃত্য ও সংগীত উপভোগ করা। শামুকের মতো নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা প্রতিবাদহীন শান্ত ভদ্র মার্জিত পরম ধার্মিক আমিনা একদিন বিয়ের প্রথম বছরে রাতের বেলায় নিয়মিত বাইরে কাটানোর মৃদু প্রতিবাদ করায় স্বামী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি একজন পুরুষ মানুষ। একমাত্র আমিই আদেশ ও নিষেধ করার অধিকারী। আমার করণীয় সম্পর্কে কোনও সমালোচনা আমি সহ্য করব না। আমি তোমাকে শুধু বলব, আমাকে মান্য করতে। তোমাকে শেখানোর জন্য আমাকে বাধ্য করবে না।’ আমিনা মানসিক কষ্ট লাঘব করার জন্য একদিন মাকে জানিয়েছিলেন। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অবস্থান হয়তো দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মা ভালোই বুঝেছেন এবং নিজের মেয়েকে সান্ত্বনাস্বরূপ বলেন, ‘সে তার প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তোমাকে বিয়ে করেছে। চাইলে সে তাকেও রাখতে পারত, অথবা দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত। তার বাবার অনেক স্ত্রী ছিল। আল্লাহর অশেষ রহমত যে সে তোমাকেই তার একমাত্র স্ত্রী হিসেবে রেখেছে।’ মায়ের কথা শুনে আমিনা চিরকালের জন্য দমে যান এবং চার সন্তানের মা হয়েও শুধু স্বামীর খেদমত ও হুকুম তামিল করার জন্যই অপেক্ষা করেন। স্তব্ধ অন্ধকার রাতের নির্জন প্রহরে নিজের সন্তানের মঙ্গল কামনা করে, জিনের আছর থেকে নির্ভয়ে বাঁচার জন্য তিনি কোরানের একশ বারো নম্বর সুরা অবিরাম তেলওয়াত করেন।

              মাঝ রাতে স্বামীর স্নানাহারসহ যাবতীয় খেদমত করে তিনি দোতলায় নিজের রুমে ঘুমাতে যান। ভোরে আল সাইয়িদ স্নান শেষে রাজকীয় মেজাজে ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং নাতিদীর্ঘ মোনাজাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁর প্রার্থনা শেষ হলে আমিনা স্বামীর খেদমতে হাজির হন। শহরের ধনাঢ্য অভিজাত পরিবারের মতোই সকালবেলা ছেলেদের সঙ্গে সমৃদ্ধ নাশতা খেয়ে নিজের রুমে ঢোকেন। এক গ্লাস দুধে মধু ও তিনটি কাঁচা ডিমের মিশ্রণ নিয়ে আমিনা তাঁকে অনুসরণ করেন। এই খাবার হজমের জন্য এবং শক্তি ও যৌনবর্ধক হিসেবে নিয়মিত তিনি গ্রহণ করেন। তারপর ধীরে সুস্থে কফি পান শেষে রাজকীয় ভঙ্গিতে তিনি গোঁফে তা দিয়ে জামাকাপড় পরিধান করে মাথায় ফেজ টুপি লাগিয়ে ছড়ি হাতে বের হন। নাশতা খাওয়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আওয়াজে পারিবারিক কিছু কথাবার্তা হয়। তিনতলায় তাঁর শোয়ার ঘরের পাশেই ডাইনিং টেবিল যেখানে শুধু ছেলেদের একসঙ্গে নাশতা খাওয়ার অনুমতি আছে। অবশ্যই নাশতা খাওয়ার সময় আমিনা অতন্দ্র প্রহরীর মতো, কখনও তাঁদের দুই কন্যা খাদিজা বা আয়িশাও তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েদের খাবার টেবিল দোতলায়, তেতলায় তাদের খাবার পারিবারিক নিয়মের বাইরে। তবে ছেলেমেয়েরা বিকেলে কফি খাওয়ার সময় দোতলায় মায়ের সঙ্গে একত্র হয় মায়ের ডাইনিং টেবিলে। তখন সবাই প্রাণ খুলে কথা বলতে পারে। রাজকীয় পরিবারের যেন পিতা একজন স্বৈরাচার আর মা গণতন্ত্রের অধিকর্তা।  

              বাড়িতে আল-সাইয়িদ এত প্রতিপত্তি ও প্রতাপশালী হলেও নিজ সন্তানেরা প্রথম দিকে জানে না এত সুন্দর অভিজাত চেহারার গুরুগম্ভীর মানুষটি রাতের পর রাত নর্তকীদের বাড়িতে পড়ে থাকেন, বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করেন, নতর্কীর সংগীত উপভোগ করেন। সেখানে তিনি হাস্যরসপ্রিয়, আমুদে, উদার এবং বন্ধুবাৎসল্য। প্রবল বৈপরীত্যের দ্যোতনার ব্যঞ্জনায় এই চরিত্রটি এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে যে চরিত্র বাড়িতে সদালাপী গুরুগম্ভীর প্রতাপশালী মানুষ কিন্তু মদের আসরে বাকপটু, ভোজন-রসিক, গল্প-রসিক, সংগীত পিপাসু ও যৌনলিপ্সু। তবে তিনি যখন প্রার্থনা করেন তখন যান্ত্রিকভাবে সুরা তেলওয়াত, রুকু সেজদা দিয়েই শেষ করেন না, তাঁর প্রার্থনার ভিত্তি ভালোবাসা, আবেগ ও অনুভূতির সমন্বয়। শুধু প্রার্থনার ক্ষেত্রেই নয়, তিনি যে কাজই করেন সেটি নিষ্ঠার সঙ্গে আত্মমগ্ন হয়ে করেন এবং কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে পূর্ণ ভালোবাসা ও অকপট সততা দিয়েই বন্ধুত্বের মর্যাদা দেন। সম্পূর্ণ উপন্যাসটিতে আরবি কায়দায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ সম্ভাষণ এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়াসহ ইসলামি নিয়মে তাঁর রহমত প্রার্থনার শব্দ বা বাক্য আখ্যানটিকে আভিজাত্যের মাধুরীতে অলংকৃত হয়েছে। উপন্যাসের অনেক জায়গায় সংলাপ বা গল্পের প্রসঙ্গে লেখক যুক্ত করেছেন পবিত্র কোরআনের রেফারেন্সসহ আয়াত।  

              আল-সাইয়িদ আহমদ আবদ-আল জাওয়াদের তিন ছেলে : তিন জনের মধ্যে ইয়াসিন সবার বড় হলেও প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান এবং অন্য দুইজন ফাহমি ও কামাল আমিনার সন্তান। মেধাবী ও সুদর্শন তরুণ ফাহমির আনুগত্যে ও আচরণে মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই প্রীত। সে ছাত্র হিসেবেও ব্রিলিয়ান্ট এবং সম্ভাবনাময় তরুণ। বাবার প্রত্যাশা ছিল ফাহমি কর্মজীবনে বিচারক হবে এবং সেভাবেই ফাহমি এগিয়ে যাচ্ছিল। শিশু কামালের প্রতি বাবার বিদ্বেষী মনোভাব রয়েছে কোন কারণে তা প্রচ্ছন্ন বা প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়নি। বাড়ির প্রত্যেকেই তাঁর আনুগত্য মেনে চলুক, তাঁর হুকুমের আগেই যেন সবকিছু তৈরি হয়ে যায় এই ছিল তাঁর প্রত্যাশা বা হুকুম। সন্তানদের সঙ্গে সকালের নাশতার টেবিলে দেখা হয়, কিছু কথাবার্তা হয়। তাদেরকে সারাক্ষণ সামরিক শৃঙ্খলার মতো সুশৃঙ্খল থাকতে হয়। ভয়ে ভীত ও বিচলিত থাকায় খাবারের স্বাদ তারা ভুলে যায়। তিনি তীক্ষè দৃষ্টি ফেলেন তাদের উপর, কোনও ত্রুটি বের করতে চেষ্টা করেন। কোনও ছেলের চেহারায় বা জামায় কোনও দাগ থাকলেও তার দৃষ্টি এড়ায় না। এরপর শুরু হয় ধমক ও গালি। কখনও তিনি ফাহমির কাছে জানতে চান, ‘ওই কুত্তার বাচ্চাটা কি পড়াশোনা করছে, না ছেড়ে দিয়েছে ?’ শিশু কামালের খোঁজ-খবর তিনি এভাবেই নিতেন। ‘কুত্তার বাচ্চা’ গালিটা যেন কামালের জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে। প্রথম খণ্ডে খাদিজার বয়স বিশ উল্লেখ করা হয়েছে যে চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় মেয়ে, স্থূলাকায় খাদিজার চেহারাও মিষ্টি নয় এবং গায়ের রং কালো। অন্যদিকে ষোড়শী আয়িশা একহারা ধরনের হালকা-পাতলা, মুখ চাঁদের মতো, গায়ের রং ফর্সা ত্বকে গোলাপি আভা, চোখ তার বাবার মতো নীলাভ, মায়ের সুন্দর ক্ষুদ্র নাকের মতো নাক, দাদির চুলের মতো সোনালি বর্ণের চুল—অনিন্দনীয় সুন্দরী ও স্মার্ট। তবে হালকা-পাতলা স্বাস্থ্য আরব দেশে পুরুষের বেশি পছন্দ নয় বলে গৃহকর্মী উম্মে হানাফির ওপর বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত খাবার দিয়ে শরীরের মেদ বৃদ্ধির জন্য। যদিও তা সফল হয়নি। হয়তো আয়িশার সৌন্দর্যের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়েই খাদিজা আয়িশাকে সহ্য করতে পারত না। স্পষ্টভাষী, বাস্তববাদী, ধার্মিক ও কর্মঠ খাদিজা সুযোগ পেলেই আয়িশাকে কথায় ঘায়েল করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। আয়িশা তো আয়িশা, এমন দেখা যায় আয়িশার পোষা বিড়ালটিকেও খাদিজা সহ্য করতে পারে না, দুচোখে দেখতে পারে না। খাদিজার এমন ঝগড়াসুলভ স্বভাব ইয়াসিন, ফাহমি বা কামাল কেউই পছন্দ করে না। এজন্য যথাসম্ভব খাদিজাকে এড়িয়ে চলতেই দেখা যায়। অনেক পরিবারে অনেকের উপনাম থাকে যা আমরাও শৈশবে দেখেছি; আমাদের নিজেদেরও ছিল। এ-রকম উপনামের বাহার দেখা যায় এই উপন্যাসে যার মাধ্যমে একটি কথা বলা বাহুল্য যে, নাগিব মাহফুজ উপন্যাসের খুঁটিনাটি এত বেশি বিষয়ের অবতারণা করেছেন যে, পাঠক একদিকে মুগ্ধ অন্যদিকে বিস্মিত হতে বাধ্য। খাদিজা মাসহ অন্য ভাইবোনের উপনাম দিয়েছে, যেমন- মা আমিনাকে মুয়াজ্জিন (কারণ, এ বাড়ির সবার আগে ঘুম থেকে জাগেন) আয়িশা ও কামালের স্বাস্থ্য ক্ষীণকায় বলে একজনকে ‘কাঠি’ এবং অন্যজনকে ‘বিছানার খুঁটি’। আবার ইয়াসিন খুব কেতাদুরস্ত বলে তার নাম দিয়েছে ‘বাম্বা কাশার’। কোনো কারণে খাদিজা যখন ওদের ডাকে তখন উপনামেই ডাকে। 

              খাদিজার চেয়ে এক বছরের বড় সৎ ভাই ইয়াসিন। ইয়াসসিন স্থূলাকায় বাবার মতো লম্বা ও শক্তিশালী যুবক। ফাহমি এক সুদর্শন যুবক। ইয়াসিন সৎ ভাই হলেও পারিবারিক মধুর সম্পর্কের মধ্যে ইয়াসিনকে আলাদা করে বিবেচনা করা অসম্ভব। সেও বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে। কামাল হলো ইয়াসিনের প্রিয়, নেওটা এবং গল্প শোনার জন্য ইয়াসিনের বেশি সান্নিধ্য গ্রহণ করে। কামাল স্কুলের ফলাফল ভালো করে বলে বাড়ির সবারই আলাদা কদরও পায়।    

              দুপুরে ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে থাকে। দুপুরে আল-সাইয়িদ খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে আবার দোকানে গিয়ে বসেন, সন্ধ্যার পর দোকান থেকে বের হয়ে চলে যান প্রমোদের আস্তানায় এবং বাসায় ফেরেন মধ্য রাতে। এ-রকম ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ কড়া মেজাজের মানুষটিই যখন রাতে মদ ও নারীর আড্ডায় বসেন তখন তিনি সবার মধ্যমণি হয়ে সবচেয়ে রসিক এবং হিউমার দিয়ে সবাইকে চাঙ্গা করে রাখেন।

              বর্ণনামূলক উপন্যাসটির প্যালেস ওয়াক অর্থাৎ প্রথম খণ্ড সাড়ে পাঁচ শত পৃষ্ঠায় একাত্তরটি পরিচ্ছদে শেষ হয়। উপন্যাস এগিয়ে যায় আর পাত্রপাত্রীর বয়স ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মনে হয় এই ধরনের দীর্ঘ উপন্যাসের পাঠের ভালো লাগার আমেজ নিহিত থাকে চরিত্রগুলোর বয়স বৃদ্ধি এবং ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে যাওয়ার মধ্যে এবং চরিত্রগুলোর সঙ্গেও পাঠক জড়িয়ে যায়। সাধারণত নাতিদীর্ঘ উপন্যাসে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে থাকে বলে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে উপন্যাস শেষ হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যে জৈবিক পরিবর্তন, মিথস্ক্রিয়া ও রসায়ন উপেক্ষিত থাকে। দীর্ঘ উপন্যাসে এগুলোর বাড়তি মসলা হিসেবে পাওয়া যায় বলে পাঠ অধিকতর উপভোগ্য হয়। প্যালেস ওয়াকে চরিত্রগুলোর মিথস্ক্রিয়া ও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণগত পরিবর্তন, সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন পাঠককে নিয়ে যায় সেই সময়ে যখন উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল। এই উপন্যাস পাঠে আধুনিক মিসরকে মনে ধারণ করার কোনো অবকাশ নেই। মনে হবে সেই এখন থেকে একশ বছর আগের মিসরে অল্প মানুষের শহর, এখানে-সেখানে দু-একটি ফলের দোকান, দু-একটি ঘোড়ার গাড়ি, দু-একটি মোটর গাড়ি। লেখকের বর্ণনা, ভাষার গ্রন্থন, পরিমিতি বোধের সংলাপ এবং ধর্মীয় ও দার্শনিক পদবাচ্য উপন্যাসটিকে অনন্য উচ্চতায় স্থান করে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রসদ রয়েছে।  

              শেখ মাতওয়াল্লি একটি ভবঘুরে প্রকৃতির চরিত্র যে, চরিত্রটি অনেকটা যাত্রাগানের বিবেকের মতো এবং উপন্যাসজুড়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে পাঠককে আকৃষ্ট করে। এই চরিত্রটি শেষ খণ্ডেও পাওয়া যায় এবং তখন অশীতিপর ছন্নছাড়া বৃদ্ধ লোকটিকে রাস্তায় দেখে পাঠকের হৃদয়ও দ্রবীভূত হয়। একটি জীবন কীভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে—এই উপন্যাস পাঠে তারই স্বরূপ বিশেষভাবে হৃদয়ে দাগ কাটে, বুকের ভেতরে তৈরি হয় নিদারুণ হাহাকার। এ-রকম আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজিতেও জীবনের বিভিন্ন স্তরের রসায়ন উপলব্ধি করা যায়। শেখ মুতওয়াল্লি ও আল-সাইয়িদের কথোপকথনে মনে হবে যেন শেখ আল সাইয়িদের অন্যান্য বন্ধুর মতোই। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। একদিন শেখ এসে আল-সাইদের দোকানে এসে বলল, ‘দুর্বল অজুহাত শুধু দুর্বল পুরুষকেই মানায়। অনৈতিকতা অতি নিন্দনীয় এবং তা যদি একজন ভ্রষ্টা নারীর সাথেও হয়। তোমার মরহুম পিতা মহিলাদের ব্যাপারে উন্মত্ত ছিলেন। আল্লাহ তাকে মার্জনা করুন। তিনি বিশ বার বিয়ে করেছিলেন। তুমিও কেন তাঁর পথ অনুসরণ করো না ?’

              আল-সাইয়িদের শহরের নামকরা সংগীত নর্তকী ও কণ্ঠ শিল্পী জুবাইদার বাড়িতে যাওয়া এবং মধ্য রাত পর্যন্ত সেখানে থাকার ঘটনা শেখ জানত বলেই এমন নৈতিকতার উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু আল-সাইয়িদ হাসতে হাসতে জবাব দেন, ‘ভুলে যাবেন না যে, আজকের পেশাদার মহিলা বিনোদনকারীরাই গতকালের ক্রীতদাসী বালিকা, আল্লাহ যাদের ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো, আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল।’

              জুবাইদার বাড়িতেই আল সাইয়িদের রাতের আড্ডা হয়। তার পোষ্য কন্যা জানুবা দলের অন্যতম তারকা এবং সে বীণাবাদিকা, যার দিকে ইয়াসিনের দৃষ্টিও পড়ে। একদিন রাতে সেখানে গিয়ে তার বাবার অস্তিত্ব টের পায় এবং সতর্কতার সঙ্গে অন্য রুমে জানুবার সাহচর্যে মদ্যপান করে বাসায় ফেরে। এই রাতেই ইয়াসিনের কাছে বাবার চরিত্র উন্মোচিত হয়। 

              আয়িশা সুন্দরী ও স্মার্ট হওয়ার ফলে খাদিজা বড় বোন হলেও আগে বিয়ে হয় শওকত পরিবারে খলিলের সঙ্গে। এই বিয়ে খাদিজার কষ্টের সীমা বাড়িয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকেই খাদিজা পরিশ্রমী ও ধর্মপরায়ণা। কিন্তু এরপরও আয়িশার ভাগ্য এত ভালো কেন এ নিয়ে তার অভিযোগের শেষ ছিল না। পরে খাদিজার বিয়ে হয় বাবার বয়সী খলিলের বড় ভাই ইব্রাহিমের সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামী- সংসার নিয়ে অবশ্যই খাদিজা পরিপূর্ণ সুখী ছিল। সেখানেও একান্নবর্তী পরিবারে খাদিজাকেই নিতে হয় সংসারের ভার। আয়িশা ভাগ্যবতী শুয়ে বসে খাওয়ার মেয়ে, এখানেও বোনের ওপর হাল ছেড়ে দিয়ে শরীর বাঁচিয়ে আরাম আয়েশে দিন পার করে। তবে শাশুড়ির সঙ্গে খাদিজার টুকটাক লাগত প্রায় সময়ই। এই টুকটাক লাগার কারণ ছিল শাশুড়ির বিড়ালকে খাদিজা সহ্য করতে পারত না। এই বিচার প্যালেস ওয়াক পর্যন্ত গড়ালে আল-সাইয়িদ এসে খাদিজাকে শাশুড়ির কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।   

              ইয়াসিন ক্রমে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাতে মদ্যপান ও নারীর খেদমত নিয়ে বাসায় ফেরে। এক রাতে মায়ের বয়সী স্থুলাকায় গৃহকর্মী উম্মে হানাফিকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে জড়িয়ে ধরলে উম্মে হানাফি চিৎকার চেঁচামেচি করে নিজেকে রক্ষা করে। বাবার কাছে এই খবর গেলে খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ইয়াসিনকে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর নিজ স্ত্রীর সঙ্গে ভালো দিন যাচ্ছিল। মানুষের স্বভাব খারাপ হলে যা হয়। এক সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে আসা দাসী নিগ্রো মেয়েকে ছাদের পাশে এক ঘরে ধর্ষণ করার সময় স্ত্রী হাতেনাতে ধরে ফেলে। এই ঘটনার পরই আল সাইয়িদের মদের আসরের বন্ধুর মেয়ে ইয়াসিনকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। যদিও আল-সাইয়িদের সঙ্গে ইয়াসমিনের বাবার মধ্যে বন্ধুর কোনো গোলমাল হয়নি। তারা পূর্ববৎ বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। 

              আমিনা একদিন গোপনে কামালকে নিয়ে হোসাইনের মাজার (রা.) জিয়ারত করতে যান স্বামীর অনুমতি ছাড়া। দুর্ভাগ্যবশত একটি ছোটখাটো দুর্ঘটনায় পড়েন। গোপনে মাজারে যাওয়ার ঘটনায় ক্রুদ্ধ আল-সাইয়িদ আমিনার কোনো অজুহাত না শুনেই স্পর্ধার জন্য এক বাক্যে স্ত্রীকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। কিছুদিন পর ইয়াসিন মাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি আল-সাইয়িদের নিদারুণ নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়। আধিপত্যবাদের আরও একটি উদাহরণ বটে। 

              মেধায় ও মননে ফাহমি পরিবারের সবার দৃষ্টিতে আলাদা। পাশের বাসার মরিয়মের সঙ্গে সে প্রেম করে। দু’জন দু’বাসার ছাদ থেকে প্রথমে দৃষ্টি বিনিময়, পরে কিছু কথাবার্তা হয়। কিন্তু এই প্রেম বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তখন কায়রো শহরে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের সৈনিকেরা পাড়ায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াত। তাদের আস্তানাও ছিল বিভিন্ন মহল্লায়। মরিয়ম ইংরেজ সৈনিক জুলিয়ানের সঙ্গে প্রথমে দূর থেকে দৃষ্টি বিনিময় এবং পরে ফাহমিকে বঞ্চিত করে পালিয়ে বিয়ে করে চলে যায় ইংল্যান্ডে। তবে ফাহমি নারীর প্রেমের চেয়ে দেশের প্রেমে বেশি মগ্ন থাকত বলে মরিয়মের বিচ্ছেদে তার মধ্যে কোনো মনোপীড়া দেখা যায়নি। সে স্কুল পাস করে বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন ছিল অত্যন্ত তীব্র। শেষে ১৯১৯ সালের এপ্রিলের ৭ তারিখে সা’দ পাশা জগলুলের মুক্তির পর কায়রো উত্তাল হয়। এই উত্তাল তরঙ্গে ইয়াসিন, ফাহমি এমনকি কামালও স্কুল থেকে মিশে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সরকারি কর্মচারীরাও অফিস ছেড়ে মিছিলে মিশেছিল। এর পরের দিন আবার মিছিল হয় যে মিছিলে ফাহমি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়।   

              অত্যন্ত মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও উচ্চাকাক্সক্ষী  টগবগে তরুণ ফাহমির মৃত্যু দিয়ে প্যালেস ওয়াক খণ্ডের সমাপ্তি টানা হয়।

প্যালেস অব ডিজায়ার  

প্যালেস অব ডিজায়ারের বাড়িটা ইয়াসিনের মায়ের থাকলেও এই বাড়িটি ইয়াসিন পায় এবং পিতার সঙ্গে বনিবনা না হওয়াতে নারী-শিকারি যুবক ইয়াসিন এই বাড়িতে একা থাকতে শুরু করে।

সময় এগিয়ে যায় চরিত্রগুলোর বয়স বাড়তে থাকে। প্যালেস অব ডিজায়ার বা দ্বিতীয় খণ্ডে সব চরিত্রের বয়স বেড়ে গেছে। আয়িশার মেয়ে নাঈমা, দুই ছেলে ওসমান ও মুহাম্মদের মা হয়েছেন। খাদিজার দুই ছেলে আবদ আল-মুমিন ও আহমদ। ইয়াসিনের প্রথম স্ত্রীর ছেলে রেদুয়ান। পুরুষতান্ত্রিক বা পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য বিস্তারকারী আল সাইয়িদের চরিত্রের প্রভাব পড়েছে খাদিজার ওপর। যৌথ পরিবারে বড় বোনের ওপর দায়িত্ব দিয়ে আয়িশা আয়েশেই থাকে। তার স্বভাবেও পরিবর্তন ঘটে। সে স্বামীর সঙ্গে মদ্যপান করে, সিগারেটও টানে। এই অভ্যাস অবশ্যই তার স্বামী খলিলই করিয়েছে। খাদিজার শাশুড়ি থাকা অবস্থায় তার খেদমতে সবাই ব্যস্ত থাকত। শাশুড়ি মারা যাবার পর খাদিজাই সংসারের আধিপত্য বিস্তারকারী অভিভাবক বনে যায়। একদিন এক পারিবারিক আড্ডায় তিনি বলেন, আব্বা ছিলেন বলে আম্মা আমাদের ওপর কখনও সহিংসতা প্রয়োগ করেননি। … কিন্তু আমার বাড়িতে এবং তোমার একই অবস্থা, বাবার উপস্থিতি নামে মাত্র। … পরিস্থিতি যখন তখন আমার কি করার থাকতে পারে ? বাবা যদি মা হয়, তাহলে তো মাকে বাবার ভূমিকাই পালন করতে হবে।’

তবে খাদিজা ও ইব্রাহিমের দাম্পত্যজীবন দুজনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে অটুট সহযোগিতা ও পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ। দাম্পত্য জীবনে তারা অত্যন্ত সুখী হিসেবে শেষ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই।

কামালের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে বাবা জানতে চান। বাবার ইচ্ছে এমন কোনো বিষয় পড়ুক যা সরকারি চাকরি পেতে সুবিধা হবে। বিচারক হিসেবে কামালকেও দেখার বাসনা ছিল বাবার। দু’জনের বেশ যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। কামালের বুকের ভেতরে স্বপ্ন সে দার্শনিক বা বিখ্যাত লেখক হবে। খুব তুচ্ছ চাকরি পেশা হিসেবে তাকে জ্ঞান দেন এবং শিক্ষকদের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেন তার প্রতাপশালী পিতা। এখানে কোনো ভদ্র ঘরের মানুষ যায় না এমন কথাও বলেন। বাবাকে সে জব্দ করে এই বলে যে, সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন যে বিচারক তাঁকে কেউ মনে রাখেনি, মনে রেখেছে সক্রেটিসকে। তবে শেষ পর্যন্ত কামাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজেই ভর্তি হয়ে শিক্ষকতার পেশাকেই বেছে নেয়। আল-সাইয়িদ আহমদের কথায় বোঝা যায় সেখানকার সমাজে তখনকার সময়ে শিক্ষকতা পেশাকে তুচ্ছ পেশা হিসেবেই সমাজে বিবেচিত হতো। 

জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সচেতন ফাহমি প্রতিবেশী বাসার বাবা আল সাইয়িদের প্রেমিকা বাহিজার মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে গেলেও বাবার বাধা থেকে প্রেমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাজনীতিতে আত্মমগ্ন হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হয়। মরিয়ম পরে ব্রিটিশ সৈনিক জুলিয়ানের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে করে গৃহত্যাগ করে এবং সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তালাকপ্রাপ্তা হয়ে আবার স্বগৃহে ফিরে আসে। অসংখ্য নারীর সঙ্গে মেলামেশা করা ইয়াসিন নতুন করে মরিয়মের প্রেমে পড়ে। এক অশুভক্ষণে মরিয়মের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিতে গিয়ে দেখে মরিয়ম বাসায় নেই। মরিয়মের মা তাকে আপ্যায়নের সময় ইয়াসিন বাহিজার বেলুনের মতো আকর্ষণীয় নিতম্বের দিকে দৃষ্টি ফেলে। ক্রমে বাহিজার শরীরকাব্য গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে। বাহিজাও কাব্যের পাতা খুলে দিতে থাকে একের পর এক। দুজনের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ আলোচনার ভিত্তিতে প্যালেস অব ডিজায়ারের বাহিজার যাতায়াত এবং ইয়াসিনের সঙ্গে নিবিড় শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন ইয়াসিন আবিষ্কার করে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বসনাবৃত নারীকে যতটা সুন্দর দেখায় নগ্ন অবস্থায় ততটা আকর্ষণীয় নয়। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে স্থুল মাংস আর মেদ তার কাম্য নয়। ইয়াসিন মত পাল্টায় এবং কিছুটা ঝড় ঝাপটা অতিক্রম করে মরিয়মকে বিয়ে করে। কয়দিন টিকে এই বিয়ে ?

ফাহমি মারা যাওয়ার পর আল-সাইয়িদের পরিবারটি, বিশেষ করে মা ও বাবা শোকে মুহ্যমান ছিলেন। আল-সাইয়িদ রাতের আড্ডা তথা পান ও নারীর সান্নিধ্য ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু বন্ধুদের অনুরোধে পাঁচ বছর পর আবার হাউজবোটে যাওয়া শুরু করেন। তিনি জুবাইদার আস্তানাতেই গেলেন এবং পূর্বের ভাবমূর্তিতে ফিরে এলেন। জুবাইদার ভাইয়ের মেয়ে বীণাবাদিকা বয়সে তরুণী জানুবার প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। প্রথম দিন আল-সাইয়িদকে জানুবা সম্মানের সঙ্গে বিদায় করলে দ্বিতীয় দিন জুবাইদাকে বন্ধু ইফতেখারের মাধ্যমে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে জানুবার শরণাপন্ন হয় এবং তাকে ভোগ করার জন্য পূর্বের কলাকৌশল সবই প্রয়োগ করে। বলা যেতে পারে জানুবাও আল-সাইয়িদের রক্ষিতা কিন্তু জানুবা নিজেকে একেবারে উজাড় করে দেয়নি।

কামাল বড় হয়েছে। সুগার স্ট্রিটে বড় হচ্ছে খাদিজা ও আয়িশার ছেলেমেয়েরা। আয়িশা বড় বিলাসী। সে ধূমপান ও মদ্যপান করে স্বামীর সঙ্গেই। তারা দুজনই এই দলের। পক্ষান্তরে খাদিজা ও ইব্রাহিম ধার্মিক এবং সংসারের প্রতি মনোযোগী।

ইসমাইল লতিফের মাধ্যমে এক আধুনিক ধনাঢ্য সাদ্দাদ পরিবারের সন্তান হুসাইন সাদ্দাদের সঙ্গে কামালের বন্ধুত্ব হয়। দর্শন রাজনীতি সমাজনীতি সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা থাকায় কামাল তুখোর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখতে পারে। ইসমাইল লতিফ, হাসান সালিম ও হুসাইন সাদ্দাদও লেখাপড়ায় তুখোড়। তাদের আড্ডা ভালোই জমে। সাদ্দাদের বোন আয়িদাও আধুনিকা এবং  ফ্রেন্স ভাষা জানে। সাদ্দাদও ফ্রেন্স জানেন। তাদের স্বপ্ন মিসর ছেড়ে ফ্রান্সে চলে যাবে। কামালের নাক ও মাথা বড়। শরীরটা একহারা হালকা-পাতলা। আয়িদা হুসাইন সাদ্দাদের বোন। কামাল ও আয়িদার মধ্যে একটি সম্পর্কে উত্তাপ পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত হাসান সালিমের চক্রান্তে আয়িদা কামালকে ভুল বোঝে এবং এক সময় হাসান সালিমের সঙ্গে আয়িদার বিয়ে হয়। সে ফরেন মিনিস্ট্রিতে চাকরি পেয়ে আয়িদাকে নিয়ে ইরাক চলে যায়। হুসাইন সাদ্দাদও ফ্রান্সে চলে যায়। নিয়তির পরিহাস বড়ই নির্মম। শাদ্দাদ পরিবারের ব্যবসা নিলামে উঠাতে হুসাইন সাদ্দাদের ধনাঢ্য বাবা আত্মহত্যা করেন। সাদ্দাদের মা প্রাসাদোপম বাড়ি ছেড়ে দুই রুমের একটি বাড়িতে সাদ্দাদের ছোট বোন বুদুকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। আয়িদাও কোনো কারণে তালাকপ্রাপ্তা হয়ে মিসরে ফিরে আসে ততদিনে কামাল ওই টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক। ইংরেজি শেখার জন্য এই কলেজেই ভর্তি হয় আয়িদা এবং তার আবার বিয়ে হয় এই কলেজের এক সিনিয়র ইংরেজি শিক্ষকের সঙ্গে। একদিন ডায়রিয়ায় আয়িদা মারা যায় এবং সেই জানাজায় কামালও থাকে। অনেক দিন পর সাদ্দাদ যখন দেশে ফিরে আসে তখন আয়িদার মৃত্যুর খবরসহ অন্যান্য সব খবর কামাল জানতে পারে। ইংরেজি শিক্ষকের স্ত্রী যে আয়িদা ছিল এবং তার জানাজাতে সেও শরিক হয়েছিল ভেবে তার মনে বিষাদের ছায়া পড়ে। পাঠকের মনও বিষণ্ন হয়। 

              জানুবার প্রেমে পড়ে ইয়াসিন এক সন্ধ্যায় জানুবাকে বাসায় নিয়ে হাজির হয়। ঘরে স্ত্রী মরিয়ম থাকা সত্ত্বেও ইয়াসিনের এই দুঃসাহসে মরিয়ম কথা তুললে মরিয়মকে নির্যাতন করে বাসা থেকে বের করে দেয় এবং পরে জানুবাকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করে ইয়াসিন। এই সংসারটি উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবার হিসেবে দেখা যায়। তাদের এক মেয়ে হয় কারিমা নামে। 

              আল-সাইয়িদ অসুস্থ হয়ে প্যালেসে ওয়াকে শয্যাশায়ী। জানুবা সন্তান লাভ করে এবং স্বামীর ঘরে ভালো আছে। টাইফয়েডের মহামারিতে আয়িশার স্বামী ও ছেলেরা মারা যায়। আয়িশার কন্যা নাঈমা সুন্দরী তরুণী হয়ে উঠেছে। খাদিজার ছেলেরাও বড় হয়ে রাজনীতির অলিগলিতে বেড়াতে শুরু করে। শা’দ জগলুল ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে প্যালেস অব ডিজায়ার শেষ হয়।

সুগার স্ট্রিট

খাদিজা ও আয়িশার শ্বশুরবাড়ি শওকত পরিবারই সুগার স্ট্রিটের বাসিন্দা যেখানে খাদিজা ও ইব্রাহীম বসবাস করেন। তাদের প্যালেস ওয়াকের বাড়িটি ক্রমে নিস্তেজ হতে থাকে। রিডিং রুম, লেখালেখি ও কলেজ নিয়েই পড়ে থাকে কামাল। আল-সাইয়িদ অসুস্থ অবস্থায় দোকানে গিয়ে বসেন। আমিনা কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছেন। এখন তিনি একা একা হোসাইনের মাজারে যেতে পারেন এবং ধর্মকর্ম নিয়েই সারাক্ষণ থাকেন। বয়সের কারণে শরীরের শিথিলতার প্রভাব পড়ে মেজাজে, প্রতাপে এবং শেষাবধি পারিবারিক মূল্যবোধ তথা আচার-আচরণে। 

দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী আল-সাইয়িদ প্রথম দিকে নাশতার পরে দুধের সঙ্গে তিনটি কাঁচা ডিম খেতেন, শীতকালেও ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতেন, ইসলামে হারাম নয় বিধায় ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী মাঝে মাঝে গাঁজাও প্রয়োগ করতেন এবং নতুন প্রেমিকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সময় বিশেষভাবে তৈরি মদ্যপান করতেন যাতে পৌরুষ্য প্রমাণ করতে পারেন সেই আল-সাইয়িদ এখন হার্টের সমস্যার কারণে তেতলা থেকে নিচতলায় নেমে এসেছেন চলাফেরার সুবিধের জন্য। আমিনার থাকা ও কফির আসর দোতলাতেই আছে। আয়িশা এখন মায়ের সামনেই সিগারেট টানে। তার শরীরও আরও ক্ষীণ ও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কামালের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বইয়ের পরিমাণ বেড়েছে, নিজেও বিভিন্ন নিবন্ধ লিখছে এবং পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। আল-সাইয়িদের বন্ধুরা কামালের লেখা পত্রিকায় দেখে উল্লসিত হলেও আল-সাইদের মধ্যে এ নিয়ে কোনও প্রকার আগ্রহ দেখা যায়নি। ডারউইনের মতবাদ নিয়ে তার একটি নিবন্ধ ছাপা হলে একদিন কামালকে ডেকে বিবর্তনবাদ বিশ^াস না করার জন্য বলেন। তিনি জানতে চান যে, বানর থেকে মানুষ হয়েছে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কোনও নাস্তিক শিক্ষকের ধারণা কি না। কামাল মনে মনে হাসলেও পিতার প্রতি সমীহ রেখে সন্তোষজনক জবাব দেন। বাবার দৃষ্টিতে কামাল একটি নিষ্কর্মার ঢেঁকি।

আয়িদার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কামাল বিয়ে করবে না এমন সিদ্ধান্তে অটল। কিন্তু বিয়ে না করলেও কফি হাউজে যাতায়াত আছে, আর গোপনে রাতের অন্ধকারে হাউজবোটেও যায় নারীর সংসর্গে। একদিন এক হাউজবোটে গিয়ে দেখে বড় ভাই ইয়াসিন সিরিয়ালে বসে আছে অন্যান্য খদ্দেরের মতো। কামালকে দেখে ইয়াসিন হেসে বলল, তাহলে মাঝে মাঝে এখানে আসা হয়। কামাল প্রথমে বিব্রত হলেও পরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। ইয়াসিন কী মনে করে কামালকে নিয়ে বের হয়ে অন্য কফিশপে কফি পান করে এবং আলাপচারিতায় কামালকে তার পিতার চরিত্র সম্পর্কেও ধারণা দেয়। 

জুবাইদা তার বাড়ি বিক্রি করে দেয় জালিয়ার কাছে। জুবায়দা নিঃস্ব হয়ে পথের মানুষ। কামাল গোপনে মাঝে মাঝে পতিতাদের কাছে যায়, এমনকি বাবার প্রেমিকা জালিয়ার কাছেও। জালিয়া যে কামালের বাবার প্রেমিকা ছিল এ-কথাও প্রকাশ করে। বাবা ও ছেলের পরস্পরের গোপন অভিসারের কীর্তি আর কারও কাছেই গোপন থাকেনি। ইয়াসিন, কামাল ও বাবার নারী বিষয়ক সকল ঘটনা পরস্পরের কাছে প্রকাশিত হয় দিনের আলোর মতো। 

এই খণ্ডে রাজনৈতিক নেতাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চিত্রিত হয়েছে। রিয়াদ কালদাস যিনি কামালের বন্ধু এবং অগ্রসর চিন্তার লোক, নিজেও লিখেন ও কামালের লেখার ভক্ত পাঠক। অন্য চরিত্রটি সাওসান হাম্মাদ। কামালের পথ ধরে খাদিজার ছোট ছেলে আহমদ সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, কামালের মতো আহমদেরও ধর্মীয় বিশ^াস ক্রমে ফিকে হয়ে আসে এবং লেখালেখি বা পত্রিকায় কাজ করার ইচ্ছে দি নিউ ম্যান পত্রিকায় কাজ নেয় আহমদ। এই পত্রিকায় নিম্নবিত্ত বা বলা যায় শ্রমজীবী মানুষের পর্যায়ে অত্যন্ত মেধাবী আধুনিকা সাওসান হাম্মাদও পত্রিকায় কাজ করে। তাদের দু’জনের প্রণয় হয় এবং পারিবারিক অনেক বাধাবিপত্তি ও সংস্কার ভেঙে তারা বিয়ে করে।

ইয়াসিনের ছেলে স্মার্ট, সুদর্শন যুবক—রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। সে মন্ত্রীর পার্সোনাল সেক্রেটারি। এই সুবাদে নিষ্কর্মা বাবা ইয়াসিন শিক্ষা বিভাগের ছোটখাটো কর্মচারী থাকলেও বড় প্রমোশন দেওয়ার ব্যবস্থা করলে অফিসে অনেক গুঞ্জন হয়। কিন্তু ইয়াসিন কানেও নেন না কারও কথা। তিনি বরং অফিসে না এসে ফাঁকি দিয়েই বেতন নিয়ে যাচ্ছেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মিসরে রাজনীতি এবং সরকারি দপ্তরে যে স্বজনপ্রীতি ছিল তার প্রমাণ মেলে।  

উপন্যাসের চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে সুন্দরী ও আধুনিকা চরিত্র আয়িশার চরিত্রটিকে দুর্ভাগা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। টাইফয়েডে তার স্বামী ও ছেলেরা মারা যায়। অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে নাঈমার বিয়ে হয় খাদিজার ছেলে মুমিনের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পরের বছরই সন্তান প্রসবের সময় সেও মারা যায়। বুকে দীর্ঘশ^াস নিয়ে বেঁচে থাকে কেবল কঙ্কালসার আয়িশা। মুমিন পরে আবার বিয়ে করে বড় মামা ইয়াসিনের মেয়ে কারিমাকে।

বার্ধক্যে বিশ্রামের জন্য আল-সাইয়িদ আবদ আল-জাওয়াদ দোকানটি বিক্রি করে দেন এবং বিছানাই তাঁর শেষ ঠিকানা হয়। নিজে উঠতে বসতেও পারেন না। বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা সবই করেন এবং তার পূর্ণ সেবায় নিয়োজিত হন আমিনা। আমিনা এখন অনেক স্বাধীন। দান-খয়রাত নিজের মতো করতে পারেন, মাজারে গিয়ে প্রার্থনা করতে পারেন। এর মধ্য দিয়েই আল-সাইয়িদ একদিন মৃত্যুবরণ করেন।

উপন্যাসের শেষের দিকে গণ-গ্রেফতার শুরু হয়। খাদিজার ছোট ছেলে আহমদও গ্রেফতার হয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে এবং মুমিন গ্রেফতার হয় মুসলিম ব্রাদার দলের সদস্য হিসেবে।

শেষ অধ্যায়টি রচিত হয় আমিনার মৃত্যুশয্যা দিয়ে। আমিনার শেষ নিশ^াস কখন ত্যাগ করবে সে অপেক্ষায় আত্মীয়স্বজনরা তাঁর রুমে এসে ভিড় করে। ডাক্তার এলেও কোনো কাজ হবে না বলে কোনো ডাক্তারও ডাকা হয়নি। সমবেত মানুষেরা আমিনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অশ্রুভেজা চোখে ও বেদনায় কাতর হয়ে। 

কামাল ও ইয়াসিন বাইরে যায় কামালের বন্ধুকে এগিয়ে দিতে। ফেরার পথে ইয়াসিনের মেয়ে কারিমার সন্তানের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মহল্লার দোকান থেকে কিনে বাসায় ফেরে। আমিনার মৃত্যু ও ইয়াসিনের মেয়ে কারিমার সন্তান হওয়ার মধ্য দিয়ে কায়রো ট্রিলজির পরিসমাপ্তি ঘটে।

দীর্ঘ উপন্যাসটিতে অনেক চরিত্রের সমাবেশ, এর পর্যালোচনা কিছুটা দুরূহ। এই উপন্যাসটিতে ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয় পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এই আলোচনা থেকে রাজনৈতিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অটোম্যানের শাসন, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের কলোনিয়ান শাসনের কিছু দিক, শা’দ জগলুল ও নাসেরের রাজনীতিসহ জাতিয়াবাদী উন্মেষের নানা দিক উন্মোচিত হয়েছে এই উপন্যাসে। গভীর অনুসন্ধানী ও মনোযোগী পাঠক ছাড়া এই উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে ধারণ করা কিছুটা কঠিন বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে এই উপন্যাসের চিত্র আমরা দেখতে পাই তাদের আরব সমাজের একশ বছর আগের হলেও মিসরে অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে। আরব সমাজে পুরুষের আধিপত্যবাদ বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থাকা সত্ত্বেও খাদিজার পরিবারে এই রেওয়াজ পরিলক্ষিত হয়নি। এখানে অনুমান করা যেতে পারে যে, অধিকার আদায় কিংবা আধিপত্য বিস্তারের জন্য বুদ্ধিমত্তা ও শ্রমের প্রয়োজন তা নারীই হোক বা পুরুষই হোক। আহমদের স্ত্রী সাওসান হাম্মাদের মধ্যে মেধা ও মননের অভিকর্ষ দেখা যায় এবং তাদের দাম্পত্য জীবন পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্যও ক্ষুণ্ন হয়।

              সর্বোপরি একজন পাঠক হিসেবে বলতে পারি, এটি একটি ভালো লাগার মতো উপন্যাস। এটি শুধু উপন্যাসই নয়, এটি কালের দলিল, মিসরের সমাজের ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares