রোচেল কাস্ক’র দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : আর্ট অফ ফিকশন

বিশ্বসাহিত্য : বরেণ্য সাহিত্যিকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন  : শেইলা হেতি

অনুবাদ : মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

রোচেল কাস্ক। ১৯৬৭ সালে কানাডায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতামাতা ছিলেন ব্রিটিশ। প্রথমে তারা লসএঞ্জেলসে এবং পরে ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে অভিবাসন করেন। বিশ বছর বয়সের পূর্বেই তিনি নিজের উপন্যাস প্রকাশ করা শুরু করেন। তার প্রথম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক। উপন্যাসটিতে তিনি প্রতিবিম্বিত করেছিলেন শিকড়-বিচ্ছিন্ন কিছু মানবমানবীর জীবনকে, যারা সবাই এই বেদনার্ত ও ভালোবাসাহীন পৃথিবীতে কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছিল।

বিবাহিত জীবনে দুই সন্তানের জন্মের পর তিনি নিজের জীবন নিয়ে রচনামূলক লেখাশুরু করেন। A LifeÕs Work ২০০১ সালে প্রকাশিত একটি স্মৃতিকথা। এই বইতে তিনি নিজের মাতৃজীবনের প্রথমদিককার সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকে সরাসরি বর্ণনার ভেতরে এনেছেন। বইটিতে সততা, বুদ্ধি, আত্মজ্ঞানবাদ (solipsism) ও নেতিবাচকতা (negativit―) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন স্মৃতিকথার ঢঙে। বইটি পাঠক সমাজে খুবই আদৃত হয়েছিল। সে-কারণেই A LifeÕs Work’কে একজন শিল্পী হিসেবে কাস্কের লেখক জীবনের প্রারম্ভ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু স্মৃতিকথার ধরনে আসতে তার প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল।

A LifeÕs Work উপন্যাসটির পর তিনি চারটি উপন্যাস লেখেন। প্রথমটির নাম The Last Supper (২০০৯)। যেখানে তিনি একটি পরিবারের ইতালিতে ভ্রমণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তারপর তিনি লিখেছিলেন Aftermath (২০১২), নিজের ডিভোর্স-জীবন সম্পর্কে। কিন্তু এই সময়েই তিনি স্মৃতিকথার (memoir) সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে শুরু করেন। বিশেষ করে একজন নারী লেখক হিসেবে। ফলে তিনি লেখার জন্যে অন্য একটি ফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের মধ্যে তার তিনটি যুক্ত লেখা (trilogy) প্রকাশিত হয়। এগুলো ছিল Outline (২০১৪), Transit (২০১৬) এবং Kudos (২০১৮)। এগুলোতে তিনি একটা গদ্য ফর্মের সৃষ্টি করেন, যেগুলো ছিল সমসাময়িক, গতিময় এবং অস্পষ্টতাহীন। এই উপন্যাসগুলোর চরিত্রগুলো ভবিষ্যৎ বা অপ্রকাশিত কোনও বর্তমানে বসবাস করার বদলে অতীত জীবনের মুহূর্তগুলো বর্ণনা করেছিল। মূলত উপন্যাস তিনটি ছিল ঘটনা পরবর্তী মনঃসমীক্ষণ বা post psychoanalysis। চরিত্রগুলোকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটা বিশেষ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে, যেখানে তারা নিজেদেরকে অর্থপূর্ণ গল্পের চরিত্র হিসেবে আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়। এই ট্রিলজি গুলো উপন্যাসের একটা উদ্ভাবনী ফর্ম হিসেবে খুবই সমাদৃত হয়েছিল। তবে এই সময়েই কাস্ক অনুভব করেন যে, পাঠকেরা বিশেষ করে একজন নারী বর্ণনাকারীর পরিবর্তে একজন অনুপস্থিত বর্ণনাকারীকে বেশি পছন্দ করেন।

এই সাক্ষাৎকারটি সম্পন্ন করা হয়েছিল দেড় বছর সময়কালের মধ্যে। চারটি পৃথক পর্বে। প্রথম আলাপচারিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কানাডার রকি পর্বতমালার ভেতরে অবস্থিত Banff Centre–G। দ্বিতীয়টি লন্ডনের জধহফড়স Random Houseflat–G। তৃতীয়টি পরিচালিত হয়েছিল ফোনের মাধ্যমে। তিনি কথা বলেছিলেন তার Norfolk coast এর বাড়ি থেকে। এই বাড়িতে তিনি তার শিল্পী স্বামী ঝরবসড়হ ঝপধসবষষ-কধঃু এর সাথে বাস করেন। আমাদের চূড়ান্ত আলাপচারিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল Siemon Scamell-Katz। এক উষ্ণ বিকেলে চায়ের টেবিলে। সেখানে তিনি গিয়েছিলেন শিক্ষা দিতে। এক সপ্তাহের জন্যে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়ে নিজের একটা পা গুটিয়ে যথার্থ ভঙ্গিতে তিনি বসেছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা ছিল খুবই উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত ও ঘোষণামূলক। খুব দ্রুত সমালোচনা ও সন্দেহের বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি তার মন্তব্য প্রদান করেছিলেন। উল্লেখ্য, সকল সময়েই তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস ও কর্তৃত্বের সাথে কথা বলে থাকেন। ফলে মনে হয় যে, তিনি পূর্ব হতেই তাকে কী কী প্রশ্ন করা হতে পারে সে সম্পর্কে ভেবে রেখেছেন।

সাক্ষাৎকারের এই আঠার মাস সময়কালে তিনি খ্যাতির শীর্ষে ছিলেন এবং পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। নিজের কথাগুলোকে প্রচার করার জন্যে। আলাপচারিতার বিভিন্ন পর্যায়ে হতাশা ও বয়সের সাথে সাথে ভাষা কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা তিনি আমাদেরকে শোনাচ্ছিলেন। বিশেষ করে কীভাবে তিনি নিজে উত্তরোত্তর লেখার নৈপুণ্য হারিয়ে ফেলছিলেন, সে সম্পর্কে।

দুই কন্যা AlbertineI and Jessie বাসা থেকে চলে যাবার পর কাস্ক অদ্ভুত ধরনের একটা স্বাধীনতা অনুভব করেছিলেন। তবে তার চেয়েও বেশি বেদনার্ত বোধ করেছিলেন একজন নারীর জীবন সম্পর্কে চিন্তা করে। যে তার সমগ্র জীবন মানুষদের উদ্দেশে সমর্পণ করে নিজে অন্যত্র চলে যায়। এই অস্বস্তি/অসহনীয়তা তার ভেতরে সৃষ্টিশীলতা নিয়ে ভিন্ন ধরনের ভাবনার সূত্রপাত করেছিল। বিশেষ করে তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে, তিনি কি কাজে বিলম্বিত হয়ে যাচ্ছেন, নাকি ইতোমধ্যেই তার কাজকে সম্পন্ন করে ফেলেছেন ? তবে যে শক্তি ও আতিশয্য নিয়ে তিনি আমার সাথে কথা বলছিলেন, তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, তিনি নিঃশেষ হয়ে যাননি, বরং নতুনত্ব ও উত্তেজনায় ভরপুর কোনও সৃষ্টির দিকে পুনরায় ধাবিত হচ্ছেন।

[সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন শেইলা হেতি।]

শেইলা : আপনার Saving Agnes (১৯৯৩) এর সেই বাক্যটা আমার পছন্দ হয়েছে, যেখানে উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট একটা পুরোনো বই খুঁজে পায়, যাতে সে ছয় বছর বয়সে লিখেছিল―‘চুপচাপ লুকিয়ে থাকাই ভালো।’

কাস্ক : (হেসে) এই উপদেশ আমি নিজেই জীবনে বাস্তবায়ন করিনি … ওটা করতে পারলে মনে হয় ভালোই হতো। Saving Agnes এর কথা আমার একেবারেই মনে নেই। বহু বছর যাবৎ আমি সেটা পড়িনি। অবশ্য মনে হয় না যে, আমি ইচ্ছে করলেও তা পড়তে পারতাম। এত বছর পূর্বের বই সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করা আসলেই কষ্টকর। পঁচিশ বছর বয়সের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে হয় নিজের সত্তার সবকিছুই ইতোমধ্যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আসলে সেটা তো ছিল শুধুমাত্র আমার পঁচিশ বছর বয়সের কোন ছবি―যেখানে আমি অদ্ভুত একটা হেয়ারস্টাইল নিয়ে বসে ছিলাম। আমার ধারণা উপন্যাস তার চেয়েও অনেক জটিল বিষয়।

শেইলা : বইটি লিখার বিষয়ে আপনি কি কিছু মনে করতে পারেন ?

কাস্ক : হ্যা।

শেইলা :  কেমন ছিল সেটা ? কীভাবে শুরু হয়েছিল ?

কাস্ক : হ্যাঁ। সেটা ছিল লেখক হিসেবে আমার গড়ে ওঠার সময়। সেই সময়ে আমি একটি নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে আনীত হচ্ছিলাম, এবং আমার বয়সের সাপেক্ষে কিছু অদ্ভুত কাজ করেছিলাম। আমি তখন বাইশ অথবা তেইশ। সেই সময়ে আমি পৃথিবীর সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। এমনকি তারা যা যা করছিল, সেগুলো থেকেও। সবার থেকে সরে গিয়ে একটা স্বতন্ত্র জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম। আমি জানি না, কেন আমি তা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানি যে, আমি তা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

শেইলা : আপনি তখন কোথায় ছিলেন ?

কাস্ক : লন্ডনে। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পর অন্য সকলের মতো আমিও লন্ডনে গিয়েছিলাম। জীবিকার তাগিদে। সেখানে আমি একটা জব করতাম, যেটা সম্পর্কে আমি Saving Agnesএ বর্ণনা করেছি। সেই সময়ে সাধারণত বিকেলের দিকে লিখতে বসতাম। এই উপন্যাসটি লেখা শেষ হবার পর সেটাই আমার জন্যে প্রারম্ভ হয়েছিল একজন লেখক হিসেবে। এবং সম্ভবত সে-সময়েই আমি একটা উপন্যাস কি তা অনুধাবন করতে সক্ষম হই। অতঃপর Saving Agnesএ বর্ণিত পৃথিবীকে পরিত্যাগ করে প্রভিন্সিয়াল ইংল্যান্ডে আমার পিতামাতার কাছে চলে যাই এবং তাদের সাথে বাস করতে থাকি। কিন্তু তাদের সাথে আমি সম্পর্ক ভালো রেখে চলতে পারছিলাম না। ফলে তাদের সাথে আমার অবস্থান সুখকর ছিল না। কিন্তু আমার যাবার আর কোনও জায়গাও ছিল না। তারা আমাকে বলেছিলেন আমি যদি লেখক হবার বাসনা ত্যাগ না করতে পারি, তাহলে আমি যেন তাদের থেকে চলে যাই। সুতরাং আমি তাদের কাছ থেকে চলে এসেছিলাম।

আমার নতুন বাসাটি ছিল অনেক বড়। সেখানে আমি ছিলাম সম্পূর্ণরূপেই একাকী। Saving Agnes বইটি লেখার অনেক স্মৃতিই আমার একাকিত্ব, নির্জনতা, আতঙ্ককে ঘিরে। সেখানে আমি নয় মাস ছিলাম। সারাক্ষণ লিখতাম। খুব কমই কারও সাথে সাক্ষাৎ হতো। আমার পিতামাতা অবশ্য সপ্তাহ শেষান্তে আসতেন। আমার কাছে কোনও টাকাপয়সা ছিল না। আমি সারাদিন ও সারা বিকেল লিখতাম। তারপর সবকিছু পুনরায় নতুন করে লিখতাম। হ্যাঁ, এটা আমার জন্যে আসলেই স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল।

শেইলা : আপনি যা লিখেছিলেন, তা কি আপনার পছন্দ হয়েছিল ?

কাস্ক : হ্যাঁ। সেই সময়ে আমার নিজের সম্পর্কে কোনও মতামত জন্মেনি। আত্মবিশ্বাস বা আত্মসম্মানবোধও ছিল খুবই ক্ষীণ। আমি ভাবতাম যে আমি কিছুই পারি না। আসলে অক্সফোর্ডে গমনই ঘরের বাইরে আমার জীবনে ঘটা প্রথম ভালো বিষয় ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত যেহেতু আমি সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি, সেহেতু কীভাবে লিখতে হয়, সেই বিষয়টা আমি শিখছিলাম। এই শিক্ষা ছিল ল্যাটিন বা সেরকম কিছু শেখার মতো। তবে আমি সত্যি সত্যিই শিখতে পেরেছিলাম। আমি মনে করি সেটা ছিল একমাত্র সময়, যখন আমি বুঝতে শিখেছিলাম পারদর্শিতা অর্জন বলতে আসলেই কি বুঝায়। কারণ অবশ্যই আমাদেরকে পারদর্শিতা অর্জন করা শিখতে হবে, কারণ সেটাই মৌলিক অর্জন ও বেড়ে উঠার মূলমন্ত্র। আমি নিশ্চিত যে, সেই সময়ে আমি তা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই সময়েও আমি জানতাম না একটা বই কি প্রক্রিয়ায় লেখা হয়, যেমন করে একটা শিশু জানে না যে, তারা কোত্থেকে আসে। সুতরাং আমি জানতাম না নতুন কোনও বই আদৌ লেখা হবে কি না এবং তা কীভাবে সম্ভব। ফলে আমার পরের বই যেটা আমি লিখেছিলাম সেটাকে আমার নিকটে মনে হয়েছিল যে, পূর্বেরটার চেয়ে সম্পূর্ণরূপেই অন্যরকম।

শেইলা : আপনি কি আপনার The Temporary (১৯৯৫) বইয়ের কথা বলছেন ?

কাস্ক : হ্যাঁ। বইটিকে আমার কাছে মিথ্যার সমাহার বলে মনে হয়েছে।

শেইলা : কেন ?

কাস্ক : ব্যাপারটা আসলেই মজার। এই উপন্যাসের দুইদিকে আমি আমার জীবনকে প্রায় ভাগ করে নিয়েছিলাম। একদিকে বাস্তবতা, অন্যদিকে বাস্তবতার অনুকরণ, যা কৃত্রিম অথবা শুদ্ধ নয়। পরের জীবনটা হলো আপনার চাওয়ার জীবন, কিন্তু সেই জীবনে প্রবল কষ্ট আছে সম্পর্কগুলো কৃত্রিম হবার কারণে। পরের বইটা ছিল সে রকমের। এর অভিজ্ঞতাগুলো ছিল মোহমুক্তির। কারণ Saving Agnes আমি আমার অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোই বর্ণনা করেছিলাম, যেগুলো আমাকে পাঠকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গিয়েছিল এবং দিস্তার পর দিস্তা কাগজ এই বই সম্পর্কে লিখিত হয়েছিল। একইভাবে The Temporary সম্পর্কে যদিও প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল অন্যরকমের। আমার ধারণা সেই সময়েই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওটা ছিল আমার জীবনযাপন সম্পর্কে সত্য একটা বই। কিন্তু পরের বইতে আমি তা করিনি। সেটাতে আমি আসলে আমার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে লিখেছিলাম। যেখানে আমি বর্ণনামূলক বা গল্পকথনের সহায়তা গ্রহণ করেছিলাম। এই গল্পগুলো আমার মনের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়নি।এটা বুঝতে পারার পর আমি সেটার পরের বই, ঞযব The Country Life (১৯৯৭) লিখেছিলাম, যা ছিল সত্য কাহিনি।

শেইলা : আমি একটু পিছনে যেতে চাচ্ছি। ঝধারহম অমহবং এর রিভিউগুলো আপনার কেমন লেগেছিল ?

কাস্ক : আমাকে তারা একটা খাম পাঠিয়েছিল। যেখানে প্রতিটি রিভিউ’র ফটোকপি দেওয়া হয়েছিল। আমার পিতামাতার বাগানের সিঁড়িতে বসে আমি পাঠ করেছিলাম। সেগুলো ছিল আমার জন্যে থেরাপির মতো; বিস্ময়কর ও রোগমুক্তির মতো অভিজ্ঞতার প্রতিবিম্ব।

শেইলা : সেখানে কি আপনার সত্তা প্রতিবিম্বিত হয়েছিল ?

কাস্ক : অবশ্যই। তবে লেখার ভেতর দিয়ে সেই একবারই হয়েছিল। জীবনে আর কোথাও সেটা ঘটেনি।

শেইলা : আপনি কীভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, লেখালেখির জগতেই আপনার স্থান হবে ?

কাস্ক : আমি জানতাম না যে, কোনও একদিন আমি লেখক হব। আমি কখনওই সমসাময়িক কালের বইপুস্তক পড়িনি। সুতরাং লেখকের জীবন সম্পর্কে আমার স্পষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। কিন্তু জীবনের প্রথম থেকেই, এমনকি লসএঞ্জেলসে বাস করার সময়, অর্থাৎ আমার আট বছর বয়সের পূর্বেই আমি ভাবতাম যে আমি ভবিষ্যতে একজন লেখক হব।

শেইলা : হ্যাঁ, আপনি তো লিখতেন।

কাস্ক : হ্যাঁ। আমার ধারণা আমার লেখাগুলো ছিল পরিপার্শ্বের প্রতি আমার এক ধরনের সাড়া প্রদান। বিশেষ করে আমাকে ভুল বোঝা হয়েছিল এবং আমার ভেতরে অনুভূতি জন্মেছিল যে, আমার পিতামাতা আমার উপরে একটা জীবন চাপিয়ে দিতে চাইতেন, যেটা আমি পছন্দ করতাম না। আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল যে, আমি যে ধরনের জীবনের কথা ভাবি, তা কি সঠিক ? নাকি আমি ভুল ? খুব শুরু থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, লেখালেখির মধ্য দিয়ে সত্য আবিষ্কার করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, এর মধ্য দিয়ে সত্যকে রক্ষা করাও সম্ভব। সত্য হলো আমি যা বলতে পারি, এবং যা বলতে পারি না, তার সবকিছুই এখানে লেখা সম্ভব। এটাই আমার ভেতরে একটা শক্তিশালী দ্বৈততার অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল।

শেইলা : লসএঞ্জেলসে বাস করা এবং লেখালেখি সম্পর্কে কি কি স্মৃতি আপনার আছে ?

কাস্ক : পাঁচ বছর বয়সের সময়ে স্কুলে আমি কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলাম, আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি যে কবিতাটি লিখেছিলাম, তা ছিল যথেষ্টই জটিল। সেখানে একটা স্বপ্নের জগৎকে বর্ণনা করা হয়েছিল, যেখানে অদ্ভুত ও আনন্দময় ঘটনা ঘটেছিল। কবিতাটিতে আমি একটা লাইন অন্য জায়গা থেকে এনে বসিয়েছিলাম। ঠিক নকল নয়, সেটা ছিল এমন একটা লাইন যা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল এবং আমি ভেবেছিলাম যে, লাইনটির অন্তর্ভুক্তি কবিতাটিকে অনেক সুন্দর করবে। কিন্তু সেটি নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল যে, কেউ না কেউ সেটাকে বের করে ফেলবে, বিশেষ করে কবিতাটি যেহেতু পুরস্কার পেয়েছে। আমার ভেতরে এমন অনুভূতিরও সৃষ্টি হয়েছিল যে, এই ধরনের পুরস্কার জেতা আমার প্রাপ্য ছিল না।

শেইলা : আপনি কি শৈশবে খুব পড়তেন ?

কাস্ক : আমার বোন আমার থেকে দুই বছরের বড়। শৈশবে সে আমার সাথে কিছুই করত না। কিন্তু আমি তাকে নকল করতাম। আমি মনে করি বড় হবার জন্যে এবং শিল্পী হবার পথে নকল করা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যাই হোক, সে ছিল বইয়ের পোকা। আমি তার এই স্বভাবকেই নকল করেছিলাম। আমার ছোট ভাই, যার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, সে ছিল আশাহীন ধরনের একজন টিভি এডিক্ট। আমেরিকায় সেই সময়ে চাইলে সারাদিনই কার্টুন দেখা যেত। এবং সে তা-ই করত। আমি যেহেতু তার সাথে সময় পার করতাম, সেহেতু অসম্ভব ক্লান্তি নিয়ে তার পাশে বসে থাকতাম। অপেক্ষা করতাম, কখন সে টিভি দেখা বন্ধ করবে।

শেইলা : আপনার পরিবার সত্যের আদলে বাস করছিল। শিশু হিসেবে এই ধরনের একটা পরিবারের প্রতি আপনার অনুভূতি কি ছিল ? বিষয়টি কি আপনার মানসিক পীড়নের কারণ হয়েছিল ?

কাস্ক : আমার ধারণা অগ্রহণযোগ্যতা দিয়েই পরিবারের সাথে আমার শুরু হয়েছিল। সেগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে প্রথমদিকের স্মৃতি। আমরা ছিলাম চার ভাই-বোন। আমার পিতামাতাও ছিলেন যথেষ্টই কম বয়সী। সুতরাং সেখানে বন্ধুরতা ও অসতর্কতা ছিল। শৈশবের অসুখী হওয়ার বিষয় নিয়ে আমি কখনও পরিপূর্ণ কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। আমার বয়স বাড়ার সাথে বিষয়টা আরও দুর্বোধ্য হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। পুরো বিষয়টাকেই আমার নিকটে ইডিপাসের পরিস্থিতির মতো মনে হতো, যেখানে তুমি সংজ্ঞায়িত হও এমন কিছু দ্বারা, যাদের নাম তুমি জান না। কারণ, যারা তা জানত, তারা আমাকে কখনও তা বলত না। এভাবেই আমি মূলত আমার পরিপার্শ্বের পৃথিবীকে অনুধাবন করেছিলাম। আমার শৈশব আমার ভেতরে এমন একটা অনুভবের সৃষ্টি করেছিল, যাকে আমি ট্রমা বলে অভিহত করতে পারি। কিন্তু আমার পৃথিবীতে এই অনুভূতিগুলোর জন্যে কোনও স্বতন্ত্র স্থান ছিল না। আমি এগুলোকে নিয়েই চলতাম ফিরতাম। এগুলো আমার সত্তাকে বিকৃত করত। সুতরাং শৈশবের পরিস্থিতি যা আমার লেখাকে প্রভাবিত করেছে, সেগুলো বার বার নতুনভাবে আমার নিকটে এসেছে।

শেইলা : আপনার ভাইবোনদের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ?

কাস্ক : হ্যাঁ। ভাই-বোনদের সাথে আমার নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমরা পরস্পরের সাথে আনন্দবেদনা শেয়ার করে থাকি। তবে তারা আমাকে একটা বিশেষ ধরনের যত্ন নিতেন, যা আমাকে আমার প্রাথমিক জীবন নিয়ে আরও বেশি অবাক করে। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতি ছিল এক ধরনের গার্হস্থ্য স্বৈরতন্ত্র। এখানে সত্যকে ভেঙেচুরে নতুন করে সৃষ্টি করা হতো। সুতরাং সেখানে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর কোনও উপায় ছিল না। কারণ, সত্যকে সেখানে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয়েছিল। ফলে ব্যক্তির উপরে ইতিহাসের প্রভাব বা কর্তৃত্ব চিরকালই আমার একটি আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে।

শেইলা : আপনার শৈশবে পিতামাতার মতো আপনার ভাইবোনরাও কি আপনাকে অগ্রহণযোগ্য একজন শিশু হিসেবে ভাবত ?

কাস্ক : লস এঞ্জেলসে গমনের পূর্ব পর্যন্ত আমি অসুস্থ ছিলাম। এমনকি ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পরেও আমার ভেতরে এক ধরনের অসুস্থতা ছিল। আমি ক্রনিক এজমার রোগী ছিলাম এবং অনেকবারই আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। একজন অসুস্থ শিশু তার ভাইবোনদের কাছে আসলেই বিরক্তিকর। কারণ পরিবারের সদস্যদের মনোযোগ তখন ভিন্নভাবে প্রবাহিত হতে থাকে, সংসারের অনেক কিছুই উলটপালট হয়ে যায়। এবং মনে হয় যে, অসুস্থ সদস্যের কারণেই সবকিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার অবশ্য তেমন কিছুই মনে নেই। কিন্তু আমার ভাইবোনরা তাই বলে।

শেইলা : আপনার পিতামাতা কী করতেন ?

কাস্ক : আমার পিতা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আমার মা তার ফ্যান্টাসিকে লালন করতেন (হাসি)। তারা দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের ভাইবোনেরা কেউই তাদের মত সংস্কৃতিবান ছিল না। সুতরাং একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাদেরকে আরোহণ করতে হয়েছিল। জীবনের শেষের দিকে তারা অপেরা দেখতে যেতেন, এবং পড়াশোনাও করতেন। এটা হয়েছিল কারণ তারা অভিযাত্রীসুলভ মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। তারা ভ্রমণও করতেন এবং নতুন নতুন জিনিসের সাথে পরিচিত হতেন। অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের চিন্তাভাবনার পরিসরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

শেইলা : সুতরাং আপনার আট বছর বয়সের সময়ে আপনি পরিবারের সাথে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন ?

কাস্ক : আমরা Suffol নামের ছোট্ট একটি গ্রামে বাস করতাম। আমাদের ভাইবোনদের সবাইকে বোর্ডিং স্কুলে প্রেরণ করা হয়েছিল। এগার বছর বয়সের সময়ে আমি বোর্ডিং স্কুলে গিয়েছিলাম এবং আঠার বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। এমনিতেই লস এঞ্জেলস থেকে এই গ্রামে আগমন আমার জন্যে ক্ষতিকর ছিল। তারপর আবার পরিবার থেকে অন্যত্র চলে যাওয়া আমাকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

শেইলা : ওটা আপনাকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন ?

কাস্ক : ওটা আমার মনোবল ধ্বংস করে দিয়েছিল। স্কুলটা ছিল ভয়াবহ ধরনের। আমি কখনও সেটাকে আপন ভাবতে পারিনি। প্রতি মুহূর্তেই আমি সেটাকে ঘৃণা করতাম। প্রথম দিন থেকে শেষদিন পর্যন্ত। সুতরাং সেটা ছিল সময় পার করার অভিজ্ঞতা। সাত বছরের জন্যে যা স্থায়ী হয়েছিল।

শেইলা : তারপর আপনি কী করলেন ?

কাস্ক : আমি অক্সফোর্ডে গিয়েছিলাম। আমার জন্যে সেটা ছিল পূর্ণ প্রতিভাস ও স্বাধীনতা। আকস্মিকভাবে আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম লোকজনের মধ্যে, যারা ছিল আমারই মতো। সেখানে যাবার পর পরিবার থেকে আমার মুক্তি ঘটেছিল জীবনে প্রথমবারের মতো। প্রথমবারের মতো আমি কিছুটা আত্মমর্যাদাও অনুভব করছিলাম। কারণ সেটা ছিল উচ্চ মানের একটি প্রতিষ্ঠান। সেটা আমার ভেতরে অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল যে, এই পৃথিবীই আমার জন্যে সঠিক জায়গা। এখান থেকেই আমার জীবনের স্বাভাবিক ভালোমন্দের শুরু হয়েছিল।

শেইলা : ওখানে আপনি কী বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন ?

কাস্ক : ইংরেজি। আমি Henry James ও ইয়েটসের কবিতা দিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। অক্সফোর্ডের পাঠ্যক্রম ছিল খুবই পুরোনো ধরনের। Middle English করার পর আমাদেরকে Anglo-Saxon শিখতে হত। তারপর Spenser I Pope পড়তে হতো। শেষ পর্যন্ত যখন আমরা Middlemarch এ পৌঁছলাম, আমার মনে হয়েছিল যে, আমি বর্তমান জীবনে প্রবেশ করেছি।

শেইলা : হেনরি জেমসের প্রতি আপনার ভালোবাসাই কি আপনি কীভাবে লিখবেন, তা শিখিয়েছে আপনাকে ?

কাস্ক : হ্যাঁ। সেটা ছিল চেতনার দুর্গ সম্পর্কে ধারণা। ওটার ভাষা ছিল দুর্ভেদ্য, যা সকল কিছুর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম ছিল। নিজ থেকেই। সেই ভাষার গাঁথুনি ছিল কংক্রিট স্ট্রাকচারের মতো স্থির, এবং এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত। ওটার বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গি আমার ব্যথাগুলোর জন্যে নির্গমপথ সৃষ্টি করত। বিশেষ করে ইংরেজ হবার বেদনা। তবে ওটা শুধু হেনরি জেমস ছিল না, একই সাথে ছিল Evelyn Waugh, যা কষ্টের দিকে তাকিয়ে হাসতেও সক্ষম ছিল।

শেইলা : ইংরেজ হবার বেদনা বলতে কী বুঝাচ্ছেন ?

কাস্ক : সামাজিক শ্রেণির বেদনা। এবং সেই সংগঠনের ভেতরে মানুষের সম্পর্কজনিত নিষ্ঠুরতা। লস এঞ্জেলস হতে আগমনের পর আমার পিতামাতাকে গভীর ধরনের বাছাই এবং ভাষার মাধ্যমে আঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। যেভাবে লোকজন তাদের সাথে কথা বলত, তাদেরকে ক্ষতবিক্ষত করত, তা ছিল খুবই দুঃখজনক। আমি সেগুলো শুনেছিলাম এবং দেখেছিলাম। আমি জানি না আমার পিতামাতা বিষয়টি নিয়ে সচেতন ছিলেন কি না, তবে তা তাদেরকে অসুখী ও পরিবর্তন করে দিয়েছিল। আমার নিজ অভিজ্ঞতায় স্কুলে ইংরেজ শিশুদের নিষ্ঠুরতাও ছিল যথেষ্টই ভয়ানক ধরনের। এবং এটা বুঝতে দীর্ঘদিন লেগেছিল কীভাবে আমার লেখার প্রাথমিক স্টাইল নিষ্ঠুরতাগুলোকে ধারণ করছিল। কিন্তু আমিও সম্ভবত নিজের সত্তার প্রতি নিষ্ঠুর ছিলাম। এমনকি বর্তমানেও আছি। আমি Beckett পড়ে অনাবিল মুক্তির স্বাদ পাই। কারণ সেটা হলো বেদনা যা দিয়ে মানুষ পরস্পরের সাথে কথা বলে। এবং বেকেটের রচনায় বেদনার আতিশয্য এতই বেশি যে, নিষ্ঠুরতাকে সেখানে অলীক ও বিনির্মিত বলে মনে হয়। আমার মনে হয় নাটকের ক্ষেত্রে এটা খুবই উপযোগী। আমার ধারণা Thomas Bernhard এর মতো আপনিও তা কল্পকাহিনিতে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু অন্যভাবে চিন্তা করলে এই ধরনের বই লেখা মানে কানাগলিতে পৌঁছে যাওয়া। সেখানে আপনি নিজেকেও খুন করে ফেলতে পারেন। কিন্তু আমার ধারণা উপন্যাস জীবনের সাথে সম্পর্কিত হওয়া এবং জীবনের ভূমিকেই প্রতিবিম্বিত করা উচিত।

শেইলা : এটাই কি তা, যা আপনি আপনার লেইট টুয়েন্টি সময়কালে ডি এইচ লরেন্স বিষয়ে পছন্দ করতেন ? লরেন্স থেকে পাঠ আপনার ভেতরে কি যোগ করতে সমর্থ হয়েছিল ?

কাস্ক : হ্যাঁ, সেটা ছিল সৌভাগ্যবানদের কণ্ঠস্বর হতে ইংরেজি ভাষার মুক্তিকাল। লেখক হবার পথে আর এ সময়ে আমি আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ নতুন একটা পথের দিশা পেয়েছিলাম। যে পথটি ছিল অন্যভাবে কাজ করার এবং যেখানে বাক্যগুলো শুরু হবার পর দিক পরিবর্তন করে অদ্ভুত কোনও দিকে চলে যেত। আসলেই তা ছিল অদ্ভুত। আমার ধারণা সেই সময়কালের অনেক লেখিকাই লরেন্স পড়ার কারণে প্রভাবিত হয়েছিল। সম্ভবত সেটা হয়েছিল যে, লরেন্স ছিলেন কর্মজীবী মানুষদের দল থেকে। কাজেই সৌভাগ্যবানদের বাইরে অন্য কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া মানে আসলেই নিজের ভেতরে নতুন কোন কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া।

শেইলা : আপনি বলেছেন যে, The Country Life এবং Saving Agnes এর উৎস ছিল আপনার সত্যিকারের সত্তা এবং সেটাই ছিল আপনার আসল প্রকাশ। আপনি এটাও বলেছেন যে, স্যাটায়ার লেখার ফর্মটি আপনি বাইরে থেকে গ্রহণ করেছেন। সেক্ষেত্রে বর্তমান পর্যন্ত আপনি যা কিছু লিখেছেন, সেগুলো বিবেচনায় নিলে আমার কাছে মনে হয় যে, আপনি সকল সময়েই ফর্মের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন। আমি জানতে আগ্রহী যে, কি করে একটা ফর্ম ধার করা হয়েছে, তা আপনার অন্তর্গত বেদনাকে প্রকাশ করতে সক্ষম।

কাস্ক : আমি মনে করি এর উত্তর হলো যে, Saving Agnes লেখার পূর্ব পর্যন্ত আমি আসলেই ফর্মহীন ছিলাম। এই সময়ে আমি নিজের আকৃতি, নির্যাস অথবা আত্মপরিচয় সম্পর্কে মোটেই সচেতন ছিলাম না। আমি জানতামই না যে, আমি কে। আমি এখন বুঝতে পারি যে, আমার ভেতরে কিছু একটার স্বল্পতা ছিল, প্রাথমিকভাবে বললেও তা ছিল ভালোবাসা। হ্যাঁ, এটাকেই আমি ভালোবাসা বলতে চাই। এটা হলো এমন জিনিস যা আমাদেরকে নিজেদের ফর্ম সম্পর্কে অবহিত করে। কিন্তু কোনও কারণে সেটা আমার ভেতরে ছিল না। আমার ক্ষেত্রে সেই আকৃতিগুলোকে অনুসন্ধান করাই ছিল আত্মানুসন্ধান। আমার আকৃতি এসেছিল আকস্মিকভাবে, এবং আমি তা দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছিলাম। আমি প্রায়ই ভাবি যে, আমার যদি সন্তান না থাকত, তাহলে হয়তো আমি লেখা চালিয়ে যেতেই পারতাম না। আমি এটাকেই সত্য বলে মনে করি যে, আমাকে কিছু পদ্ধতির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছিল, যেগুলোই আমাকে আকৃতি ও পরিচয় দিয়েছিল। সুতরাং আমার মাতৃত্বের প্রাথমিক সময়ে ফর্ম অনুসন্ধান আমার আমার জন্যে একটি কঠিন ব্যাপার ছিল। A LifeÕs Work শেষ হবার পর আমি আমার পূর্বতন স্টাইলে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বিবাহ ও সন্তানাদি আমার জীবনকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। ফলে সবকিছুই ত্রুটিপূর্ণ হওয়া শুরু করেছিল।

শেইলা : কী ধরনের ত্রুটি ছিল সেটা ? লেখা, নাকি জীবনের ক্ষেত্রে ?

কাস্ক : দুই ক্ষেত্রেই। অতীতে আমি স্যাটায়ারগুলো থেকে এক ধরনের আনন্দ পেতাম। তারপর A LifeÕs Work নিয়ে পুরো জিনিসটাই উল্টোদিকে ঘুরে গেল। আমি বুঝতে পারতাম না যে, কেন লোকজন আমার বইকে খারাপ ও নিষ্ঠুর বলে অভিহিত করা শুরু করেছিল এবং কেনই বা আকস্মিকভাবে আমাকে একজন সমস্যা সৃষ্টিকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। আমি জানতাম না যে, সেটা ছিল মাতৃত্ব ও নারীত্বের রাজনীতি। আমি এটাও বুঝতাম না যে, আমার যা বলা প্রয়োজন তা আমি বলেছি কি না। এবং সেগুলো লোকজনকে বিরক্ত করত, কারণ তারা মিথ্যের ভেতরে বাস করতে চাইত। নারীত্বের ভেতরে নিজের সাথে স্ব-প্রতারণার একটা স্বভাব আছে, বিশেষ করে যখন কেউ সন্তানসন্ততি লালন-পালনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। যেখানে চেহারা বা বহিরঙ্গকে প্রতিরক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা থেকে অন্য কাউকে খুব সহজেই বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এই ব্যাপারটা শুধুমাত্র সাধারণ জীবনের ক্ষেত্রেই ঘটে না, আমার বইয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে নারীত্ব নৈতিক দিক হতে ব্যক্তির জন্যে একাধারে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ সমষ্টিগত চিন্তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

শেইলা : আপনি কি বলবেন আপনার প্রথম তিনটি নভেলের স্টাইল থেকে সরে এসে ভিন্নতর A LifeÕs Work উপন্যাসটি শুরু করেছিলেন ? এবং কিভাবে আপনি সেটি লিখেছিলেন ?

কাস্ক : ওটা আমার আইডিয়া ছিল না। Reagan Arthur আমার আমেরিকান এডিটর ছিলেন, এবং তিনিই আমার The Country Life বইটি প্রকাশ করছিলেন। আমরা দুজনেই একই বয়সের ছিলাম এবং একই সময়ে আমাদের দুজনেরই সন্তানসন্ততি হয়েছিল। আমরা নিজেদের মধ্যেই মেইল বিনিময় করতাম আমাদের জীবন ও সন্তানসন্ততি নিয়ে। একসময়ে তিনি বললেন, আমি তোমার ইমেইলগুলো একটা ফোল্ডারে সংরক্ষণ করি এবং আমার প্রেগন্যান্ট বন্ধুদেরকে দেখাই। মনে হয় তিনি অথবা আমার ইংরেজি এডিটর, যিনি আমার ও সাথে সন্তান ধারণ করেছিলেন, আমাকে বইটি লিখতে বলেছিলেন। সুতরাং আমি এই দুইজন এডিটর এবং আমি মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম বিষয়টি নিয়ে কীভাবে লেখা যায়। Reagan ও আমি ইমেইলে যথেষ্ট হাস্য রসিকতা করতাম, যা আমার উপন্যাসের সুর ঠিক করে দিয়েছিল। সুতরাং রিগ্যান না বললে আমি কখনও বিষয়টি নিয়ে লিখতাম না।

শেইলা : কেন, নয় ?

কাস্ক : কারণ এটা লেখার অতীত একটা বিষয় ছিল। এবং যেহেতু আমি একটা লিটারেরি ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা করছিলাম, সেহেতু এই ধরনের একটি ব্যক্তিগত, গৃহস্থালি, নন-ইন্টেলেকচুয়াল জীবনকে লেখার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়ার চিন্তা আমার মাথার মধ্যেই ছিল না। তাছাড়া আমি কিই বা লিখতে পারতাম ?

A LifeÕs Work একটি মজার বই। আমি গল্পটি বলছিলাম পাঠকদেরকে হাসানোর জন্যে যে―শিশুর মা হওয়া আসলেই একটা কৌতুককর ব্যাপার। কিন্তু তারপর একটা ব্যাপার ঘটল, যা আমি মনে করি মাতৃত্ব থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। সেটা ছিল নতুন ধরনের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ববোধ। এবং এমন ধরনের কর্তৃত্ববোধ যা কখনও সামাজিকভাবে লজ্জিত হয় না।

শেইলা : আপনার এই বইটা পাঠকেরা কীভাবে গ্রহণ করেছিল ? আপনি সময়ের আগে চলে গিয়ে মাতৃত্ব সম্পর্কে লিখেছিলেন, অন্যভাবে। ফলে অনেকেই আপনার প্রতি কঠোর ও অপমানজনক রিভিউ লিখেছিল।

কাস্ক : সেটা আমার জীবনে ঘটা সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা ছিল। কারণ লেখাটি আমাকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এবং আমাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হয়েছিল, যা আমার জীবনে ইতোপূর্বে কখনওই ঘটেনি। আমি বিষয়টি সহ্য করতে পারিনি। তবে আমি কখনওই ভাবিনি যে, ওটা আমার ভুল ছিল এবং সেটা আমার লেখা উচিত হয়নি। কিন্তু সেটা ছিল ভয়ানক ধরনের পরাজয়। তবে এর পর আমি ও আমার স্বামী Exmoor এ সাহিত্যের পৃথিবী থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। ওটা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন ধরনের ভূমি, যেখানে সন্তানেরাই ছিল আমার সবকিছু। এবং সেখান থেকে ফিরে যাওয়া কখনও হবে না বলে আমি ভাবতাম।

শেইলা : আপনি একবার বলেছিলেন যে, নারী হিসেবে আপনার সমস্যাগুলো আপনার নিকটে প্রতিভাত হবার পরই আপনি অটো-বায়োগ্রাফি নিয়ে কাজ করা শুরু করেছিলেন। আপনার সেই সমস্যাগুলো কি ছিল ? এবং কেন ট্র্যাডিশনাল উপন্যাস নারীদের জীবনকে বিম্বিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল ? আপনি বিষয়টিতে কী দেখেছিলেন ?

কাস্ক : আমি অনুভব করেছিলাম যে, নারী হিসেবে অভিজ্ঞতাগুলো একান্তই নিজের হওয়া প্রয়োজন। এবং সেটা হতে হবে আত্মজীবনীমূলক ‘আমি’। আমার মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ হতে পারে। A LifeÕs Work উপন্যাসটি আমি লিখেছিলাম পর পর দুটো সন্তানের মা হিসেবে। পরের সন্তানের জন্মের সময়ে আমি বুঝতে পারলাম সন্তান হবার বিষয়টি কেমন। এই সময়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আমার স্মৃতি, ভাষা এবং বর্ণনা করার সামর্থ দেখে। স্মৃতিগুলো এত দ্রুতই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছিল যে, আমাকে দ্রুততার সাথে সেগুলোকে লিখে নিতে হয়েছিল এবং কীভাবে আমি সেগুলোকে দিয়ে উপন্যাস লিখতে যাচ্ছিলাম ?

শেইলা : কারণ কি এই যে নভেলগুলো তৈরি হয় পরিবর্তনযোগ্য তথ্য দিয়ে ?

কাস্ক : আসলে একটা উপন্যাস তুমি নির্মাণ কর। তোমাকে সেটা এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে সেটা দাঁড়িয়ে থাকে, যখন তুমি সেটার ভেতরে প্রবেশ করনি। স্মৃতিকথার গঠন/কৌশল ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে তুমিই সেই বিল্ডিং, যা তুমি নিজেকে দিয়ে তৈরি করেছ। অতঃপর লোকজনেরা সেখানে আসে এবং তোমার ভেতরে কিছুক্ষণ অবস্থান করে। কারণ সেই পয়েন্টে তুমি মনে কর যে, তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে শিশুর জন্মকে প্রত্যক্ষ করেছ। সেই মুহূর্তে সার্বজনীন বা চিরন্তন হওয়া অথবা নারীর অভিজ্ঞতা হিসেবে অনুভব করা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। সেই সময়েই আমি অনুভব করেছিলাম যে, স্মৃতিকথার বাইরেও কোনও ফর্ম থাকা উচিত।

শেইলা : A LifeÕs Work এবং ট্রিলজি’র মধ্যবর্তী বইগুলো আমাকে কিছুটা হতবুদ্ধি করে, কারণ প্রতিটা বইই পূর্বের বই থেকে নতুন কিছু শিখেছিল বলে আমার মনে হয় না।

কাস্ক : না, আংশিকভাবে তুমি সত্য। তুমি যদি আমার সেই সমস্যাকুল বছরগুলোকে কল্পনা করতে পার, তাহলে বুঝতে যে, সেই সময়ে আমি আমার বিবাহ হতে সৃষ্ট মায়া বা বিভ্রান্তিগুলোকে প্রতিরোধ করছিলাম এবং দেখছিলাম যে সেগুলো কীভাবে কাজ করেছিল। পাঁচজনের পরিবারের জন্যে আমিই একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলাম। আমার স্বামীর পূর্ববর্তী বিয়ে হতে একটা সন্তান ছিল, যাকেও আমি লালন করছিলাম। তারপরে ছিল আমার স্বামী ও দুই সন্তান। তাদের সকলকে আমার সাপোর্ট প্রদান করতে হয়েছিল বই লেখার টাকা দিয়ে। সুতরাং আমাকে লিখতেই হতো। সব সময়ে আমার বলার মতো কিছু থাকত না। কিন্তু তারপরেও আমি মনে করি আমার সেই বইগুলো ভালোই হয়েছিল। ২০০৬ সালে Arlington Park লেখার পর আমার মনে হয়েছিল যে, এর চেয়ে ভালো কিছু আমি কখনও লিখতে পারব।

শেইলা : আপনি কি এখনও মনে করেন যে, সেটি আপনার শ্রেষ্ঠ বই ?

কাস্ক : এক সময়ে, যখন আমি সেই জীবনটা যাপন করছিলাম, তখন আমার মনে হতো যে, আমার সামর্থ্যরে ভেতরে এটাই সবচেয়ে উঁচু ধরনের প্রকাশ। সেই যুগে আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলাম একটা ফর্ম, যা আমি ব্যবহার করতে পারি। আমি তখনও দেখতে পাইনি যে আমার অভিজ্ঞতা কিভাবে কোনও কিছুকে আকৃতি প্রদান করতে সক্ষম।

কিন্তু দ্রুতই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, স্মৃতিকথার ফর্মটি ত্রুটিপূর্ণ―এটা এতই সহজ যে, একে সাহিত্য বলে অভিহিত করা যায় না। এটা খুবই সহজ ছিল পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করার জন্যেও, যা আমি A LifeÕs Work উপন্যাসে বর্ণনা করেছি, কিছু সংখ্যক পাঠককে সতর্ক করার জন্যে। কিন্তু তারা সেটিকে অস্বীকার করেছিল এই বলে যে, আমার চিন্তাভাবনার ভেতরে ভুল থাকার কারণেই আমি তাদেরকে সেভাবে ব্যাখ্যা করেছি, কারণ সেভাবে তারা কখনও অনুভব করেনি। Aftermath উপন্যাসের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। আমি সত্যিকার অর্থেই বইটি লেখার সময়ে সেটিকে অধিকতর বস্তুনিষ্ঠ ও চিরন্তন করতে খুবই চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পাঠকেরা সেটিকে ভিন্নভাবে গ্রহণ করেনি। কিন্তু স্মৃতিকথা থেকে আমি একটা বিষয় শিখতে পেরেছিলাম। সেটা হলো ‘আমি’ হিসেবে বলার চেষ্টাটি আমি যা বলতে চাচ্ছিলাম, সেটাকেই ব্যাহত করছিল। ট্রিলজি’তে আমি অনুভব করেছিলাম যে, বিষয়টি আমি মহিলা লেখক হবার কারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি যা লিখতে চেয়েছিলাম সেটিই লেখা হয়নি।

শেইলা : আমি মনে করি যে, ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে এক ধরনের ছলনা বা ভান (pretense) সবসময়েই থাকে। সুতরাং এটা শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার যে, কোন্ ধরনের ছলনা আপনি করবেন এবং কোন্ ধরনের ছলনা আপনি করবেন না।

কাস্ক : হ্যাঁ। বর্তমান সময়ের ফিকশনগুলোতে pretense কে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে, সেটাই মূল সমস্যা। লেখক ও পাঠকদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া ছলনার বিষয়টি বর্ণনা করার পূর্ব পর্যন্ত অজ্ঞাত থাকে। বিষয়টা অনেকটা শিশুদের পারস্পারিক ফ্যান্টাসির মতো, যেখানে দুই পক্ষই ছলনা করতে রাজি থাকে। এটাকে পর্নগ্রাফিক পরিস্থিতির সাথেও বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে ফ্যান্টাসিকে স্টেজে ফ্রেশ বাস্তবতা হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রে সমস্যাটি অথবা অনেক সমস্যার একটি হলো, ফিকশনাল পরিস্থিতির সেট আপ (setup) তোমাকে সরাসরি আত্মপরিচয়ের রাজনীতি (politics of identity) এবং আত্মপরিচয়ের মূলে নিয়ে যাবে তথ্যের নৈর্ব্যক্তিক উন্মোচনের জন্যে। যা আত্মসত্তাকেও উন্মোচন করবে। এই ক্ষেত্রে ছলনা নির্মাণের মধ্য দিয়ে তুমি নিজেকেও প্রকাশ করতে সমর্থ হবে। যেখানে তুমি ফ্যান্টাসি ও নিজের অসচেতন সত্তাকেও প্রকাশ করছ।

Outline উপন্যাসের ক্ষেত্রে যে জিনিসটি আমি সরিয়ে ফেলেছিলাম সেটা ছিল জ্ঞাত ‘অজানা’―যা উপন্যাসকে ভান করতে হবে যে সে জানে না। নাটককে মঞ্চস্থ করার জন্যে। এই লুকিয়ে রাখা পূর্বজ্ঞান একটা বাক্যের পর্যায়ে কাভাবে সংঘটিত হয় এবং সেটাকে যদি তুমি বাক্যের ভেতর থেকে বের করে ফেল, তাহলে কি ধরনের পার্থক্য হয়, সেটা দেখাই আসলে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। সেক্ষেত্রে একটা নতুন ধরনের বর্ণনা (narrative) বের হয়ে আসে, যেখানে লেখক ও পূর্বজ্ঞান দুটোই বাদ পড়ে যায়। তখন যে ব্যক্তি পূর্বে কিছুই দেখেনি বা শোনেনি, সে বইয়ের সবকিছুই প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়। আমি চেয়েছিলাম প্রতিটি তথ্য যাতে তার সঠিক মালিকের কাছে ফেরত দিতে। এর ফলাফল যেটা হয়েছিল সেটা হল আমি অনুভব করেছিলাম যে আমি নিজেকে আদৌ প্রকাশ করিনি। এবং আমি কিছু একটা তৈরি করেছি যা সম্পূর্ণই আমার থেকে স্বতন্ত্র এবং এটার নৈতিক পরিচ্ছন্নতা ছিল খুবই সন্তোষজনক।

শেইলা : এই বইগুলোতে একটা জিনিস খুবই স্পষ্ট, তা হলো আত্মবিশ্বাস ও কণ্ঠের স্বচ্ছতা, সেটার অবিচলতা, এবং নিশ্চয়তা যে, তুমি যা করতে যাচ্ছ তা যথাযথ হচ্ছে।

কাস্ক : হ্যাঁ। আমি সত্যিকার অর্থেই ফর্মে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি লেখা শুরু করার পূর্বেই সেটা নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম। এবং তারপর, বাক্যগুলো আমাকে প্রতিদান দিয়েছিল অনেক বেশি দ্রুততার সাথে। যেটাকে আমি মনে করি সত্যিকারের নারীর রাজত্ব। এটাই সেই গন্তব্য যেখানে আমি পৌঁছতে চেয়েছিলাম। এটা কোনও নারীবাদী স্পেইস নয়, বিশেষ করে লিংগ নির্ধারিত কোন স্পেইসই নয়, কিন্তু এটা হলো এমন একটা স্পেইস যা ইশারা করে ভার্জিনিয়া উলফের (Virginia Woolfian) ভাবনার প্রতি যা আমাদেরকে পৌঁছে দেয় কোনও নারী বাক্য বা অনুচ্ছেদের স্থানে। যেখানে নারীদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যারা রাগ, অবিচার অথবা সে ধরনের দ্বারা মোটিভেটেড নয়। যা কোনও বা কোনওভাবে আত্মিক বা স্পিরিচুয়াল।

শেইলা : উপন্যাসটিতে বর্ণনাকারী, যার নাম ফায়ে, শুধু শোনে আর দেখে। সে অনেকটা রেকর্ডিং ডিভাইসের মতো। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। ফায়ে যে গল্পগুলো শুনত সেগুলো কি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে, নাকি কল্পনা থেকে লেখা হয়েছিল ? এই গল্পগুলো সৃষ্টির পেছনে আলকেমিটাই কি ছিল যে লোকজন তাদের জীবনের গল্প ফায়েকে বলত ?

কাস্ক : আমার ধারণা আমি শনাক্ত করতে পেরেছিলাম যে, কিছু কিছু পৃথিবী অন্য মানুষেরা আমার জন্যে তৈরি করেছিল। তার অর্থ হলো অন্য মানুষদের অভিজ্ঞতাগুলো আমার জন্যে খুবই উপকারী ছিল। এটা এমন শোনায় যে, আমি অন্য মানুষদেরকে ব্যবহার করতাম আমার হয়ে কাজ করার জন্যে। প্রকৃতপক্ষে এই নির্দিষ্ট উপহারকে তুমি তোমার বর্ণনায় ন্যারেটিভ ফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পার। একজন লেখক হিসেবে তোমার পথের শুরু হয় এমনভাবে যে, তুমি মনে লেখার ব্যাপারটাকে বিরাট রহস্যের ব্যাপার বলে মনে কর এবং তুমি জান না যে, এরপর আর কোনও বই লেখার আর কোনও সুযোগ তুমি আদৌ পাবে কি না। সুতরাং তুমি এমন কিছু সৃষ্টি করার চিন্তা কর, যেখানে তুমি নিজের জীবনকেই অকারণে কঠিন করে ফেলছে।

আমি মনে করি যে, এই বইগুলো লেখার সময়ে আমি কি অনুসন্ধান করছিলাম, তা আমি জানতাম। আমি জানি যে, এই ঘটনাগুলো কখন মানুষের জীবনে ঘটে এবং কীভাবে তারা সেগুলোকে প্রকাশ করে থাকে। এই বইগুলো সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, লোকজন ওভাবে কথা বলে না। কিন্তু আমি মনে করি তারা সম্ভবত সেভাবেই করে থাকে। হয়তো বা সব সময়ে নয়, তবে তারা করে। যে সমস্ত লোকজন আমার বইতে কথা বলবে, তারা মুহূর্তের জন্যে আগমন করে, যেমন কেউ একজন সাগরে যাবার পথে রকের উপরে এক মিনিটের জন্যে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে, এবং কেন সে সেখানে দাঁড়িয়েছে তা তারা দেখতে পাচ্ছে। তারা নিজেদেরকে  দেখতে পারে, চারপাশে কি আছে তাও দেখতে পারে এবং বলতে পারে যে, কি দেখেছে তারা। এই ধরনের কাজ তারা জীবনে বহুবার করতে সক্ষম নয়। সুতরাং আমি মনে করি যে, এই সময়গুলোতে তারা অসাধারণ কিছু বলতে সক্ষম। এবং এই সক্ষমতা তার বৃদ্ধি পেতে থাকে নির্দিষ্ট পথে জীবন যাপন করার কারণে এবং বিশেষ করে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে।

শেইলা : নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে জীবন যাপন করা বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন ?

কাস্ক : (হেসে দিয়ে) সঠিক ও সত্য পথে।

শেইলা : বইগুলোকে খুবই নৈতিক মনে হয় আমার কাছে, এবং আমি মনে করি যে, আপনি বর্তমান কালের সাহিত্যে দুটো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। এর একটা হলো জীবনের খুব কাছাকাছি যাওয়া এবং একই সময়ে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও নিজের গোপনীয়তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করা। এই দুটো জিনিস করতে পারাকে আমার কাছে পবিত্র ও কাক্সিক্ষত বস্তু বলে মনে হয়। কীভাবে আপনি কারও সাথে বিশ্বাঘাতকতা না করে এই ট্রিলজিটি লিখেছেন ?

কাস্ক : আমার প্রায় পঁচিশ বছর সময় লেগেছে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে। হ্যাঁ, এটা একটা নৈতিক পরিস্থিতি। আমি মনে করি আমি এটাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম এ কারণে যে, আমি নিজের জীবনেই মানবিক যোগাযোগের নীতিকে নিরীক্ষা ও প্রশ্ন করেছিলাম খুবই আতিশয্যের সাথে। আমার ভেতরে ইগো ও সাবজেক্টিভ আত্মসম্মানবোধের অনুপস্থিতি খুবই উপকারী ছিল এ বিষয়ে, যদিও এর কারণে আমার অভিজ্ঞতাগুলো কষ্টকর হয়েছিল। কিন্তু এটা আমাকে বুঝিয়েছিল যে, আমি নিরাবেগভাবে নিজেকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম। এটা আমাকে সাহায্য করেছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমার জন্যে কি চিরন্তন হবে, তা অনুধাবন করতে।

শেইলা : আমি আগ্রহী জানতে যে, আপনার সবগুলো চরিত্র তাদের গল্প বলার জন্যে একই ধরণের ভাষা ব্যবহার করে কেন ?

কাস্ক : আমি সেটাই চেয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে কারণে Outline লেখার আপেক্ষিকভাবে সহজ ছিল, তা হলো সেখানে গ্রিকরা ইংরেজি বলছিল, এবং আমি সেই গদ্য আসলেই পছন্দ করেছিলাম। তারা ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। পুরো ইউরোপেই সবাই যা করে থাকে। সেই ক্ষেত্রে এই ইংরেজিকে প্রচলিত মুদ্রার সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যা খুবই পরিষ্কার ও অসাধারণ এবং ইংল্যান্ড, আমেরিকা অথবা অন্য কোথাও’র ইংরেজির সাথে মিলে না।

আমার লেখা Kudos এর প্রাথমিক খসড়ার গঠন চূড়ান্ত চূড়ান্তটার মতোই ছিল, কিন্তু সেটার কাহিনিস্থল ছিল ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড। আমি এটা সহ্য করতে পারতাম না। লোকে যা কিছুই বলত, আমার কাছে মনে হতো নকল। সুতরাং আমি এই ছদ্মাবরণকে ভেঙে ফেলার চিন্তা করেছিলাম। এবং আমি সেটাকে পুনরায় লিখেছিলাম। বলতে পারো আমি পুরো বইটাকেই পুনর্বার লিখেছিলাম, যেখানে চরিত্ররা দ্বিতীয় ভাষায় কথা বলত। আমি মনে করি না আমি কখনও এমন কিছু লিখব যেখানে চরিত্ররো তাদের স্থানীয় ভাষায় কথা বলবে। আমি কল্পনাই করতে পারি না যে, আমি সেই বাক্যগুলো ব্যবহার করব, যা নির্দিষ্ট দেশ বা শ্রেণির ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

শেইলা : আমি মনে করি যে, আপনার সাম্প্রতিক সময়ের trilogyতে যে সমস্যা দেখানো হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে মধ্যবয়সীদের সমস্যা। এই সমস্যাগুলোর উদ্ভব পরিবার গঠন, ক্যারিয়ার গঠন এবং সেগুলোকে অর্থ দেওয়ার মধ্যে। যেখানে সমস্যাগুলো বাঁধা প্রদান করে থাকে। আপনি কি এ সম্পর্কে কিছু বলবেন ?

কাস্ক : আমি মনে করি মধ্য বয়স হলো যেই বয়স, যেখানে একটা ট্রাজিক সেন্স বিরাজ করে। এর কারণ হলো তুমি কিছু একটা দিয়ে গঠিত হয়েছ, যেগুলো তুমি যত্রতত্র খুঁজে বেড়িয়েছ। যা তোমাকে উন্মত্ততার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, তোমাকে স্থান হতে স্থানে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু তারপরেও সেগুলো সত্যিকারের ছিল না। সেগুলো ছিল তোমার বেড়ে ওঠা, তোমার লিঙ্গ ও সামাজিক শ্রেণি-সৃষ্ট। আমি মনে করি যে, তারপরেও সেখানে কোনও নির্দিষ্ট ক্ষণ ছিল, যখন আকস্মিকভাবে যা কিছুই তোমাকে বন্দি করে রেখেছিল, সেগুলোর বন্ধন শিথিল হয়ে যায়।

এটা হলো একটা মঞ্চের মতো যেটা ভেঙে পড়ছে অথবা নড়বড়ে হয়ে গেছে, যেটা দেখলে তোমার ভেতরে অবাক ও ভীত হবার ভাব সৃষ্টি হয়। তোমার ভেতরে চিন্তা আসে যে, তুমি এমন কিছুর পেছনে তোমার সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছে, যেটা বাস্তবে কখনও অস্তিত্বশীল ছিল না। যেটা একটা জেলখানার মতো, যার দরজা খোলা ছিল, কিন্তু সারাজীবন তুমি সেটার ভেতরেই বসেছিলে। আমি বইতে যা কিছু লিখছিলাম তার অনেক কিছুই এর সাথে সম্পর্কিত ছিল।

শেইলা : আমি মনে করি যে Michel Houellebecq আধুনিক সময়ের যেকোনও লেখকদের মধ্যে মানবিকতা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অন্ধকার ধারণা পোষণ করেন, যদিও তিনি খুবই ফানি প্রকৃতির। আমি আপনাকে তার কাছেই বসাব। জীবনে একটা বোধ আছে যে, সেটা হলো হারান বা ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নেওয়ার সমষ্টিগত অবস্থা। আপনি কি মনে করেন যে, আপনি ধরতে ধরতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন ? আমি এটাকে nihilism বলছি না, তবে ওটা এক ধরনের ব্যর্থতা, যেটার পেছনে মানুষেরা তাদের জীবনকে বিকশিত করে থাকে।

কাস্ক : আমি তোমার কথা শুনে অবাক হচ্ছি। আমি অবশই এটাকে পৃথিবী সম্পর্কে আমার ধারণা বলে মনে করি না। আমি মনে করি লেখা মৌলিকভাবেই জীবন সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ধারণা প্রকাশ করে থাকে। আমার জন্যে লেখা হল জীবনকে সুন্দর করার জন্যে সংগ্রাম। সেটাই হল ইতিবাচকতা। এবং আমি মনে করি যে, এর জন্যে আমি যে কষ্টের মুখোমুখি হই তা নান্দনিক ও নৈতিক, এবং সেগুলোর ইতিবাচক মূল্য আছে। আমি অনুভব করি যে, সত্য সম্পর্কে আমার যে জিজ্ঞাসা, তা হলো বিশেষ করে নারীদের সত্য। আমি এই সত্যের ভেতরেই বসবাস করেছি, ভ্রমণ করেছি, কষ্ট পেয়েছি এবং তার সাথেই বাস করেছি। এটা করতে অনেক সময় দিতে হয়েছে আমাকে। একজন নারী যার একটি ছয় মাস বয়সের শিশু রয়েছে, সে কেমন অনুভব করে যখন সে অন্যদেরকে বলে যে সে খুবই আনন্দে আছে ? সেটা কি তার বিশ বছর পরের অভিজ্ঞতার সাথে তুলনীয় হবে ? আমি মনে করি যে, মানুষেরা জীবনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভার (significant moral burdens)  বহন করে থাকে। এবং সেই মানুষদেরই আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়, যারা নিজেদের সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হয়, এবং যারা সত্যের স্বরূপ আবিষ্কার করতে আগ্রহী। একারণেই আমি ভাবি যে, আমার বইগুলোর অবস্থান নেতিবাচকের বিপ্রতীপে। কারণ আমি মানুষকে ক্যাপচার করার চেষ্টা করি, যখন তারা সত্য বলে।

বইগুলোর আরেকটা গুরুত্বপূর্র্ণ দিক হলো যে, বর্ণনাকারী হিসেবে যুবক ও শিশুরা আবির্ভূত হয়। তারা আবির্ভূত হয় দেখানোর জন্যে যে, বর্ণনাকারী সমন্বিতভাবে চেষ্টা করছেন শৃঙ্খল ভাঙার জন্যে। তার সন্তানদেরকে নিজের কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্যে। এটা এমন নয় যে, শুধুমাত্র মধ্যবয়সী মানুষদেরকে কথা বলতে দেয়া হয়। শিশুরাও সেখানে কথা বলে, যার সাক্ষী সে নিজেই। আমি এই ধরনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেই কথা বলার চেষ্টা করছি। স্বাধীনতা, যখন সেটা আসে, তখন কোনও কিছুই আর শৃঙ্খলিত থাকে না। এবং বই শেষ হয় স্পষ্ট ধারণার মধ্য দিয়ে যে, শুধুমাত্র লেখিকা নয়, শিশুরাও একই সাথে মুক্ত হয়।

শেইলা : আপনি পূর্বে বলেছিলেন যে, একটা জিনিস যা আপনি অনুভব করতে শুরু করেছিলেন, তা হলো লিঙ্গ বোধ থেকে মুক্ত হবার বোধ, বিশেষ করে নারী হবার বোধ থেকে। এই বিষয়টা আপনার পরবর্তী লেখাগুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করবে বলে আপনি ধারণা করেন ? বিশেষ করে আপনি যেখানে নারী হবার সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্টই লিখেছেন ?

কাস্ক : এটা একটা বিশাল প্রশ্ন। আমি মনে করি একজন নারী হিসেবেই আমি জীবন যাপন করছি।এই নারীত্বের জীবন আমি যথেষ্ট মৌলিক ও শ্রমসাধ্য হিসেবেই যাপন করেছিলাম। বর্তমানে আমি নির্দিষ্ট লিঙ্গের গোত্রভুক্ত বলে অনুভব করি না। এবং আমি জানতে চাই লিঙ্গের পরে কি আছে। আমার মনে হয় লেখার ভেতর এই অভিজ্ঞতাগুলোই অর্জন করেছি আমি, যার সুযোগ অন্য অনেকেই পায় না। তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যকিছু সম্পর্কে লেখে। কিন্তু আমার কাছে দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই প্রকাশিত হয়েছে।

নারী হবার কারণে তোমাকে অনেক ধরনের পুনরাবৃত্তি ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে শারীরিকভাবে অতিক্রম করতে হয়। আমি মনে করি পুরুষদের জীবন নারীদের জীবন থেকে অনেক বেশি স্থিতিশীল। একজন মানুষ সারাজীবনই একই ধরনের জীবন নির্বাহ করতে সক্ষম। আমি সব সময়েই ভাবতাম যে, পুরুষ হয়ে জন্মানটাই অধিকতর ভালো এবং সারাজীবন আমি পুরুষই হতে চেয়েছি। নারী হওয়ার কোনও সুবিধাই আমি খুঁজে পাইনি। এবং এটাই আমি শুনেছিলাম বড় হবার সময়ে, যা আমার কানকে ঝালাপালা করে দিয়েছিল। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি মনে করি যে, আমার জন্যে সময় এসেছে স্থিরতা অর্জনের।

আমি মনে করি না যে, পারিবারিক জীবনের বাইরে কি ঘটে তা নির্ধারিত। মানুষেরা বিভিন্ন কাজ করে এবং সেগুলোকে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি মনে করি না যে, সেগুলোর কোনও অর্থ রয়েছে। আমি দেখতে চাই ফিমেইল স্পিরিচুয়ালিটি আসলে কেমন ? একটা সত্যিকারের স্পিরিচুয়ালিটি হলো সেটাই যা একজন মানুষকে অনুমতি দেবে স্পিরিচুয়ালিটির সম্পূর্ণ পথকে অনুসরণ করতে। আমি একজন নারী হবার সমাপ্তিটা দেখতে চাই, তা যাই হোক না কেন।

শেইলা : সেক্ষেত্রে আপনি কি জানেন আপনার গন্তব্যে যাওয়ার পথ কী, অথবা কী হবে ?

কাস্ক : আমি বিগত বছরে তেমন কিছুই লিখিনি। কিন্তু একটা জিনিস আমি চূড়ান্তভাবে বুঝেছি যে, লেখার একটা নিজস্ব অস্তিত্ব ও অখণ্ডতা রয়েছে, যেটাকে মনে হতে পারে যে হারিয়ে গেছে। এমনকি সেটা এমনকিছু হতে পারে যা তোমাকে ক্ষতির দিকে ধাবিত করতে পারে। যদিও এই সময়ে আমি এরকম কিছু দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু সেটা এখনও আছে।

শেইলা : যখন আপনি লেখালেখি করেন না, তখন কি আপনি আপনি এমন কিছু করেন, যা আপনাকে লেখালেখির সাথে সম্পর্কিত রাখে, যেমন নোট গ্রহণ করা ?

কাস্ক : আমার নোটবই আছে, তবে আমি নোট নিতে আগ্রহবোধ করি না। আমি চাই না যে, সেগুলো আমার পর্যবেক্ষণগুলোকে গোলমেলে করে দিক। আমি সবকিছুকে পরিশুদ্ধ করতে চাই, এবং এই প্রক্রিয়াটি হলো কোনও ধারণা বা বিষয়কে পর্যাপ্ত সময় ধরে মনোযোগ দেওয়া। কোনও কোনও সময়ে ধারণা বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কোনও কোনও সময়ে তারা পরিষ্কার হয় ও কাঠিন্য লাভ করে। সেই সময়গুলোতে আমি দেখতে শুরু করি, এবং সেটার সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করি। ফলে সেই সম্পর্কে লেখার একটি সম্ভাব্যতা আমার ভেতরে তৈরি হয়। যে সময়ে আমি লেখার জন্যে প্রস্তুত, সেটা তখন ইতোমধ্যেই আমার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে। তখন আমি সেটাকে বাস্তবায়ন করি, অথবা করি না। আমি যদি সেটাকে ভুলভাবে লিখি, তবে সেটাকে ফেলে দিই এবং পুনর্বার লেখা শুরু করি। নিশ্চিতভাবে আমার গমন তখন এমন একটা লেখার দিকে ধাবিত হতে থাকে, যা অনেকটা ভিজুয়াল আর্টের মত। আমি নিজেকে টানতে টানতে একটা পর্যায় অতিক্রম করেছিলাম, কারণ আমি দেখতে চাচ্ছিলাম সেলফ-পোর্ট্রেট ও অটোবায়োগ্রাফির মধ্যে পার্থক্যটা কি এবং কেনই বা আমরা অটোবায়োগ্রাফি লিখে থাকি ? আমি আরও দেখতে চেয়েছিলাম অটোবায়োগ্রাফি লেখার সময়ে কেনই বা লোকেরা তাদের সীমানা অতিক্রম করে ফেলে ও ভাবে যে, তার তোমার সম্পর্কে সবকিছুই জানা ? কিন্তু যখন কোনও পেইন্টার একটি সেলফ-পোর্ট্রেট অঙ্কন করে তখন তারা কেনই বা প্রকাশকে অধিকতর সুন্দর করতে সক্ষম হয় ? এটা কেন ঘটে ? আমি যদি তা বের করতে পারতাম।

এবং আমি মনে করি যে, ভিজুয়াল আর্টিস্ট এর চলার জন্যে চাকা আছে, কিন্তু একজন লেখক চাইলেই যে কোনও সময়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে।

শেইলা : পথের পাশে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে মানে ?

কাস্ক : হ্যাঁ। আমি মনে করি বয়স বাড়ার সাথে তোমার ভাষার শক্তি হারিয়ে যেতে থাকে। এটা আমার একটা ধারণা। কিন্তু আমার যদি নির্দিষ্ট থিম থাকে, তবে সেটা হল বেশি বয়সের কাজ (late work)। ভিজুয়াল আর্টিস্টদের ক্ষেত্রে বেশি বয়সের কাজগুলো হলো ডিমের মতো, যা ভেঙে গিয়ে নিজের আসল সত্তাকে দৃশ্যমান করে থাকে। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে এটা ঘটতে পারে না। কারণ, বয়সের সাথে সাথে ভাষা তোমাকে বিট্রে করে এবং দেখিয়ে দেয় যে, তুমি কতটুকু বৃদ্ধ হয়ে গেছ। এটা তোমার আত্মপরিচয় সম্পর্কে অনেক কিছুই উন্মোচন করে দেয়, যেমন তোমার সামাজিক শ্রেণি। ফলে বৃদ্ধ হবার সাথে সাথে লেখকেরা বিব্রত হয় এবং জীবনের গল্পের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। এমনকি তারা এটা সঠিকভাবে বুঝতেও অসমর্থ হয়।

শেইলা : এটা কেন হয় ? কেনই বা লেখকরা কিছুটা হলেও বিব্রত হয়ে থাকে ?

কাস্ক : এটা হয়ে থাকে ভাষার কারণে। অনেকেই ভাষার পরিবর্তনের সাথে পেরে ওঠে না, ফলে ভুল শব্দ ব্যবহার করে এবং ভাষাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয় না। কিন্তু দৃশ্যমান পৃথিবী ভাষার উপরে নির্ভর করে না। কারণ একটি ইমেজ কখনও একটা বাক্যের মতো শনাক্তিযোগ্য হবার প্রয়োজন পড়ে না। একটা গল্প বলার জন্যে বাস্তব অবস্থাকে পুনর্নির্মাণ করতে হয়, যা ছবির ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে না।

শেইলা : কোনও নির্দিষ্ট শিল্পীর কথা কি আপনি বলতে পারেন ?

কাস্ক : আমি শিল্প ও শিল্পীদের সম্পর্কে যথেষ্টই লিখেছি এবং তাদেরকে আমি যথেষ্টই ঈর্ষা করে থাকি। ভাষা ভিন্ন অন্য মাধ্যমের কাজ যথেষ্টই স্থায়িত্ব লাভ করে। এগুলোর ভেতরে পেইন্টিং সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। শিল্পে নারীদের গল্প খুবই নিষ্ঠুর। Lovis Corinth নামের বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একজন জার্মান পেইন্টার সম্পর্কে আমি আগ্রহী হয়েছিলাম। যে বিষয়টা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল তা হলো ৫৩ বছর বয়সে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা আমার বয়সেরও কাছাকাছি এবং তিনি তার পেইন্টিং-হাত ব্যবহার করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেন। মজার ব্যাপার হলো এই শারীরিক দুর্ঘটনা তার পরিচিতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং তাকে তার জীবনের গল্প ও বেদনাতুর শৈশব থেকে মুক্ত করে দিয়েছিল, এবং তিনি পৃথিবীকে ভিন্নভাবে অঙ্কন করা শুরু করে দিয়েছিলেন। যেটা ছিল একটা রূপান্তরিত বাস্তবতা, যার কোনও সুনির্দিষ্ট পরিচয় ছিল না।

আমি মনে করি প্রত্যেকেই নিজের আত্মসংগঠন সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে থাকে এবং কেন সেটা সেরকম সে সম্পর্কে নানারকম জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে, কিন্তু নিজের ব্যাথা ও বেদনার ভেতরে বন্দি থাকার অনুভূতি আসলেই কষ্টকর। আমি সেই শিল্পীর সেই জিনিসটাই দেখেছিলাম। তিনি শুধু ছবিই আঁকেননি, নিজের সম্পর্কে কয়েকখণ্ড অটোবায়োগ্রাফিও লিখেছিলেন, কিন্তু কিছুই তাকে সমস্যামুক্ত করতে সক্ষম হয়নি। যে বিষয়টা তাকে পরিবর্তন করতে সমর্থ হয়েছিল, তা হলো তার শারীরিক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা।

শেইলা : এই ধরনের শারীরিক কোনও দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা কি আপনার জীবনে ছিল, যা আপনাকে সাহায্য করেছে আপনার বর্তমান পরিচিতিতে আসতে ?

কাস্ক : শারীরিক জীবনটা আমার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সম্ভবত, শৈশবে আমি যথেষ্ট অসুস্থ একজন শিশু ছিলাম। পুনরায় অসুস্থ হবার সম্ভাবনাই আমাকে ভীত করে তোলে। আমার মনে হয় যে, অসুস্থতা আমাকে ব্যর্থ করে দেবে।

শেইলা : আপনি কি মনে করেন যে, বর্তমানের কোনও লেখক আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করছে ? তারা কারা যাদের বই আপনি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়েন ?

কাস্ক : আমার মতে বর্তমান সময় হলো Hannah Arendts, GittaSerenys এবং Sophocles এর। আমার ইচ্ছে করে প্রশান্তির সাথে কবিতা পড়তে, কিন্তু আমার নৈতিক বোধ আমাকে গদ্যের বাইরে যেতে দেয় না। আমি ইতিহাসের কাছে থাকতে চাই এবং মন্দ সবকিছুকেই নিরীক্ষণ করতে চাই। আমি নিজেকে মনে করাতে চাই বিচারের অনির্ভরযোগ্যতা। এবং এসময়ে সংস্কৃতিকে আতিশয্যপূর্ণ সাদা ও পুরুষতান্ত্রিক মনে হয় যে, আমার সেখানে পুনর্বার যেতে ইচ্ছে করে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমি কিছু জাপানি ও কোরিয়ান সাহিত্য পড়েছি, আমার মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে। কিছুক্ষণ আগে আমরা পড়লাম লেখক KawabataÕi The Sound of the Mountain। খুবই আনন্দের পড়া এটা।

শেইলা : আমি বিস্মিত যে, আপনি ট্রিলজি শেষ করেছেন, যা প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে, এবং আপনার সন্তানেরাও বড় হয়ে গেছে, এবং আপনি ক্রমশ আপনার শেষ জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এই মুহূর্তে আপনার অবস্থান কোথায় ? আপনার যাপিত জীবন ও লেখালেখির সাপেক্ষে ?

কাস্ক : হ্যাঁ। আমরা যদি নিয়তির কথা বলি, সেক্ষেত্রে আমি বলব যে, আমি সেটার বাইরে চলে এসেছি। আমি মরে যেতে পারতাম। এমনকি আমি এখনও মরে যেতে পারি এবং সেটা আমার জন্যে খারাপ হবে না। আমি মনে করি যে, এক ব্যক্তির অনুভূতি যার সন্তানদেরকে সে স্নেহ দিয়ে বড় করেছে, তার অনুভূতির ভেতরে কোনও অপূর্ণতা থাকে না। যদিও সেগুলোকে বর্তমানে অস্তিত্বহীন বলে মনে হতে পারে, তবু তারা অস্তিত্বহীন নয়, বরং অস্তিত্বশীলই। তুমি আসলে যেখানে ফিরে যাচ্ছ তা আসলেই সত্যিকারের অস্তিত্ব।

সুতরাং একটি বিরাট স্নো-ফিল্ডের (snowfield) মধ্যে আমার অবস্থান, যা সম্পূর্ণরূপেই একটি খালি জায়গা। এবং এই খালি জায়গাতে আসতেই আমার এতদিন সময় লেগেছে। আমি ঈর্ষা করি সেই সকল শিল্পীদের, যারা একটু কম সংগঠিত (less structured) অবস্থা থেকে শুরু করে। আমি হলাম সেই ব্যক্তি যে, যার জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল প্রচণ্ড নিয়মকানুন, ধর্মীয় অনুশাসন ও শ্রেণিভেদের মধ্য দিয়ে। এমনকি নারীত্বের এমন পরিবেশে যেখানে মেয়েদেরকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয় তাদের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। তাদেরকে বলা হয় কঠোর পরিশ্রম করতে, তারপর হঠাৎ করে সাদা কাপড় পড়তে এবং অযুত সংখ্যক সন্তান ধারণ করতে। আমি মনে করি যে, শুরুতেই আমার অধিকতর স্বাধীনতা থাকলে আমার জন্যে ভালো হতো। আমি এখন যা চাই তা হলো এক ধরনের নিখুঁত ও অনিন্দনীয় লেখা অনুসন্ধান করতে। যেখানে ভাষার আত্মম্ভরিতা ঘিরে নির্জনতা আছে। সুতরাং আমি এমনকিছু সৃষ্টি করতে চাই, যেখানে আত্মপরিচয়ের ছাপ কম। আমি এখন ভাবছি কীভাবে তা করা যায়।

 লেখক : অনুবাদক, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares