শোকাঞ্জলি : বশীর আল্হেলাল : সাহিত্যের নির্মোহ এক পথিক : মণীশ রায়

লম্বা ছিপছিপে গড়ন। টিকালো নাক। গৌরবর্ণ গায়ের রং। মাথাভরা কালো ঝাকড়া চুল। চোখে কালো ফ্রেমের  ভারী চশমার ভেতর লুকিয়ে রাখা  উজ্জ্বল তীক্ষè দুটি চোখ।  

পাশ থেকে কথাকার হরিপদ দত্ত প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘জানেন কে ?’ স্বভাবজাত কর্কশ গলায় আমাকে জিজ্ঞাসা  করলেন; সবাইকে তিনি আপনি সম্বোধন করে থাকেন, তাই  যথেষ্ট বয়োজ্যেষ্ঠ ও ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও  যথারীতি  আমাকেও। 

‘কে ?’ বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়ার চোখেমুখে তখন বিস্ময়। লেখক হবার স্বপ্ন দু-চোখে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে যখন-তখন চলে আসি  বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তাই লেখক হিসেবে চোখের সামনে যাঁকে দেখি তাঁকেই অপার বিস্ময়ের উৎস বলে মনে হয় নিজের কাছে।

‘বশীর আল্হেলাল। খুব সিরিয়াস লেখক। বামপন্থি ঘরানা, বুঝলেন ?’

‘তাই ?’ সেই প্রথম দেখা তাঁকে। গায়ে পড়ে পরিচিতও হয়েছিলাম। পাতলা কণ্ঠস্বর। নিরিবিলি নির্বিরোধ মানুষ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলতে চান না। বেশির ভাগ সময়  নিজের বিশ^াস ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে  নিজের সঙ্গেই সময় কাটানোর অভ্যেস যাঁর, তাঁর সঙ্গে কি আলাপ জমে সহজে ?

আসলে ঘনিষ্ঠতা তৈরির জন্য যেরকম হিপহিপ হুররে কিসিমের দরবারি স্বভাবের প্রয়োজন হয়, সম্ভবত তিনি তা নন। বাকপটু রসিকপ্রবর কথাকার রশীদ হায়দার, তারুণ্যবান্ধব আড্ডাপ্রিয় কবি রফিক আজাদ কিংবা অনন্য বাচনভঙ্গিসম্পন্ন কবি আসাদ চৌধুরী তখন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা; তাঁদের টেবিল ঘেঁষা চেয়ারে বসে যে আন্তরিক আনন্দ মিলত এ তরুণের, প্রয়াত সাহিত্য সম্পাদক ও কবি আবুল হাসনাতের মতন সারাক্ষণ নিজের ভেতর বুঁদ হয়ে থাকা বশীর আল্হেলালের কাছে বসে কি তা পাওয়া যায় ? এক-দুটো দরকারি কথা ছাড়া আর কিছুই মিলত না। একেবারেই নিরামিষ। অথচ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতা খ্যাত কবি রফিক আজাদের সামনে বসে দিব্যি আড্ডা দেবার স্বাধীনতা ছিল তখন। প্রথা ভাঙার এরকম পরমানন্দ আর কোথায় পাব ? লেখক হওয়া মানেই তো সমস্ত সংস্কারের অর্গল ভেঙে ফেলা―তরুণ বয়সের  সেসব উদ্দাম উন্মাদনাময় দুষ্টুমির আশকারার সুযোগ কই বশীর আল্হেলালের কাছে ?

অগত্যা তাঁকে দূর থেকেই শ্রদ্ধার চোখে দেখে এসেছি চিরকাল। তিনি কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার তরলে ভেসেছেন বলেও খুব একটা শুনিনি। তাছাড়া পূর্ববঙ্গ তাঁর আবাস নয়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর তিনি রাজশাহীতে ভাই-এর কাছে থেকে পড়াশোনা করেছেন সত্যি। কিন্তু এখান থেকে মেট্রিক পাস করে ফের তিনি নিজের জন্মভূমিতেই পাড়ি জমিয়েছেন। বহুদিন পর ১৯৬৮ সালে মাকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে একেবারে  চলে এলেন এদেশে।

তখনকার লাখ-লাখ ভিটাচ্যুত উদ্বাস্তুদের জীবনে কেবলই দীর্ঘশ^াসের গল্প―তিনি তাঁদেরই একজন। উপমহাদেশটির এ মর্মান্তিক বিভাজনের জন্য দায়ী কে ? সাধারণ মানুষ ? নিশ্চয়ই নয়। এজন্য যদি দায়ী করতে হয় তাহলে অবশ্যই উপমহাদেশের কিছু রাজনীতিবিদের কূটচালকে আঙুল তুলে দেখাতে হয়; তাঁদের উচ্চাভিলাষ আর দুরভিসন্ধির কারণে দীর্ঘদিনের  ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে গেল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির যে অমলিন বিজয়ের হাসিটা হতে পারত এ উপমহাদেশের মহান এক অর্জন, কদিনের ব্যবধানে সেটি পাল্টে হয়ে উঠল নিরীহ মানুষের হাহাকার ও হতাশামেশা রক্তরঞ্জিত আর্তনাদ!  

অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেইসব বুড়ো ভামেরা (খোকা) সাতচল্লিশের দেশভাগটা শেষ পর্যন্ত ঘটিয়েই ছাড়ল! এঁদেরই কেউ রক্তভেজা আঙুল তুলে মুর্শিদাবাদের আদি মুসলমানদের বলে উঠল, এটা তোমাদের দেশ নয়। পাকিস্তান তোমাদের নয়া দেশ। সেখানে চলে যাও, সেখানেই মিলবে তোমাদের নিজস্ব তমুদ্দন। আর পূর্ববঙ্গের প্রতিষ্ঠিত আদি হিন্দু ব্যবসায়ী-পেশাজীবীদের বলা হলো, অনেক খেয়েছ, আর নয়। জলদি করে এখান থেকে পাততাড়ি গুটাও, হিন্দুরা  হিন্দুস্তানে কেটে পড়ো ভালোয় ভালোয়। এ নদী, বাড়ির ধারের সবুজ বনানী, স্মৃতিবাহী সেইসব কামিনী-শিউলি ফুলের গাছ, তুলসিতলা, বাড়িঘর, পুকুর-দিঘি কিছুই আর তোমাদের নয়। তুমি এখন থেকে নিজভূমে পরবাসী।

হয়তো বা এ কষ্টকে বুকে ধারণ করেই গিরিনবাবু ১৯৪২ সালের আশপাশে গেয়ে উঠলেন, ‘কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি, মামার বাড়ি চাতলপাড়, বাপের বাড়ি বওনবাইরা, নিজের বাড়ি নাই আমার …’

যে মানুষটির জন্ম মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে, যিনি জলপাইগুড়ি কলেজে পড়েছেন, কোলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেছেন বাংলায়, যিনি চাকরি করেছেন কোলকাতার হজ কমিটিতে এবং কমিউনিস্ট পার্টির খাতায় নাম লিখিয়েছেন, পেয়েছেন দুষ্প্রাপ্য-দুর্লভ লাল কার্ড―তাঁকেই রিফিউজির তকমা পরে মাকে নিয়ে  চলে আসতে হলো এদেশে, ১৯৬৮ সালে। ভাগ্য ভালো, ১৯৬৯ সালেই বাংলা একাডেমির সহ-অধ্যক্ষ পদে চাকরিটা পেয়ে গেলেন। আপন ভাই তৎকালীন পাকিস্তানে সরকারি চাকরি করতেন। তাই হয়তো অতটা দগ্ধ হতে হয়নি অপরিচিত পরিবেশে।  

যেভাবে বিখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাবা দেশভাগের সময় কোলকাতায় মাথাগোঁজার একটুখানি আশ্রয় খুঁজেছেন, যেভাবে শওকত ওসমান কিংবা শওকত আলীরা চিরতরে চলে এসেছেন এপারে, ঠিক একইভাবে তাড়া খাওয়া হরিণের মতন বশীর আল্ হেলালও  ছুটে এলেন এদেশে। আশা একটাই, নতুন পরিবেশে নব উদ্যমে বাঁচবেন।

জীবনের যে সময়টা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়―যখন মানুষের রুচি, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়―সেই শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দীর্ঘ বসন্ত কেটেছে তাঁর পশ্চিমবাংলায়। তিনি যখন এদেশের অপরিচিত পরিবেশে পা রাখলেন তখন দেশটি রীতিমতো পুড়ছে। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’ জাতীয় সংগোপন হাহাকারে দগ্ধ হচ্ছে প্রতিটি সচেতন মানুষের অন্তর। ইতোমধ্যে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের ছয় দফা প্রস্তাব ও দাবি আদায়ের লক্ষ্যে চলছে দেশব্যাপী আন্দোলন। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় ও একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সব যেন একই সূত্রে গাঁথা এক দুর্বার আন্দোলনের মহাযজ্ঞ। মুসলিম লীগের পাকিস্তান নামের ধর্মাশ্রয়ী দর্শনটি ক’দিনেই অর্থহীন খেলো বলে প্রমাণিত হচ্ছে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের কাছে।  

জাতির এরকম এক ক্রান্তিলগ্নে বশীর আল্হেলাল চলে এলেন এদেশে। বাংলা একাডেমির চাকরিতে যোগ দিলেন এবং দেশটিকে ভালোবেসে আপন করে নিলেন।

তাঁর সাহিত্য ও গবেষণা নিয়ে প্রাথমিকভাবে কোনও মন্তব্য করতে চাইলে অবশ্যই বলতে হবে, তিনি অতি দ্রুত এদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনা বা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন। সম্ভবত সকল রকমের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার যে প্রগতিশীল মানসিকতা তাঁর ভেতর তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকে, সেই বোধই তাঁকে এদেশের প্রতিটি আন্দোলনকে আত্মস্থ করতে সাহায্য করেছিল।

বশীর আল্হেলাল ছিলেন সম্ভ্রান্ত সুসংস্কৃত ভারতীয় এক মুসলিম পরিবারের সন্তান। এঁদের পূর্বপুরুষগণ ভাগ্যান্বেষণে ইরাক থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন ভারতে। তাঁর পিতা ও পিতামহ ছিলেন ফার্সি ভাষার কবি ও লেখক। তাঁরা নিয়মিতভাবে লেখলেখির চর্চায় মগ্ন ছিলেন। তাঁদের প্রকাশিত বইও ছিল সেকালে। তিনি ছিলেন সেরকম লেখকঐতিহ্যে উদ্ভাসিত এক পরিবারের উত্তরাধিকারী। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ভেতর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত লেখকসত্তার স্ফূরণ ঘটেছিল, তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।

লেখালেখির সবচেয়ে বড় যে উপাদান তা হলো, সর্বক্ষেত্রে নির্মোহ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজস্ব ভঙ্গিতে জীবন নামক চর্বিতচর্বণ বিষয়টির নানা রূপ ও অবয়বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা, সংগীতে যাকে বলা হয়ে থাকে গায়কী, সেরকম। বশীর আল্হেলালের বেলায় লেখকের এই কল্পনা ও বাস্তব মেশান দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল একেবারেই মজ্জাগত ও জন্মগতভাবে প্রাপ্ত  এক গুণ। তাঁর নিজস্ব অর্জন বলতে বোঝায় কেবল বিবিধরকমের অধীত বিষয়বস্তু ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে জন্মসূত্রে পাওয়া তাঁর বাস্তববোধ ও কল্পনাশক্তিকে মিলিয়ে নিয়ে একরকম সিদ্ধান্ত নেয়া। তাই ধর্মীয় কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে পড়ে সাহিত্যকে কখনও কলুষিত করেননি তিনি। প্রবন্ধের বিচার-বিশ্লেষণ কিংবা গল্প-উপন্যাসের পটভূমি রচনা বা চরিত্রচিত্রণ―সবখানেই তিনি একটি মাত্রা মেনে চলেছেন সর্বক্ষণ। সেই মাত্রাবোধের লক্ষণরেখার ভেতর অবস্থান করেই তিনি প্রতিটি ঘটনা-অনুঘটনাকে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। 

তাঁর লেখা মোট বই’র সংখ্যা চল্লিশ। প্রবন্ধ সংকলন, শিশু-সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে এ সংখ্যা। তাঁর রচিত কথাসাহিত্য ও গবেষণার ভেতর তুলনা টানতে চাইলে এককথায় যা বলতে হয় তা হলো, তিনি যত না কথাকার, তার চাইতে অনেকবেশি গবেষক। তাঁর গবেষণাধর্মী কাজগুলো ছিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অনবদ্য। এদেশের বিশিষ্ট মননশীল গবেষক  বদরুদ্দীন উমর যেভাবে নানারকম প্রেক্ষপট টেনে বাঙালির ভাষা আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, সেখানে বশীর আল্হেলাল আরও গভীরে গিয়ে সত্যিকার ইতিহাসকে টেনে আনতে চেয়েছেন। সেজন্য তিনি ইত্তেফাক ও আনন্দবাজার পত্রিকার প্রসঙ্গ টেনেছেন বার বার। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন ভাষা আন্দোলনের শেকড় এদেশেই অর্থাৎ জনমানুষের অন্তরেই সুপ্তভাবে জাগ্রত ছিল, একটু উসকে দেয়ার অপেক্ষায় ছিল শুধুমাত্র, কোনও সুদূর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর জন্ম হয়নি। সুধীসমাজে অত্যন্ত সমাদৃত তাঁর এ গবেষণা গ্রন্থটি।

তিনি ছিলেন দৈনিক পত্রিকাগুলোর নিয়মিত লিখিয়ে। ভাষা-সাহিত্য ও অন্যান্য সমকালীন বিষয় নিয়ে  তখনকার দৈনিক বাংলা পত্রিকায় একশত পঁয়ষট্টিটির মতো প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল তাঁর। একসময় দৈনিকগুলোর বিশেষ সংখ্যা খুললেই যাঁর নাম সবার আগে জ¦লজ¦ল করত তিনি বশীর আল্হেলাল। 

তাঁর গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাকসংযম। কম কথায় বেশি বুঝাতে পারার এই দক্ষতা তাঁর লেখার প্রধান গুণগত উপকরণ। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ স্বপ্নের কুশীলব প্রকাশিত হয় কোলকাতা থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৮টি ছোটগল্প নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় প্রথম কৃষ্ণচূড়া শিরোনামে। ‘দুই কুত্তার গল্প’, ‘জলবন্দি’, ‘কলি কিংবা অভিধানগুলোকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দাও’ গল্পগুলোয় সংযমের সেই প্রমাণ মেলে। ১৯৭৭ সনের বিপরীত মানুষ গল্পগ্রন্থটিও তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি-মানসিকতার লেখককুল সাধারণত সহজে তাঁদের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেন না। কেননা এ বাধা অতিক্রম করবার জন্য যে আধুনিক, উদার, দ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গি বা আত্মত্যাগের প্রয়োজন হয় তা বেশির ভাগ মতুয়া বা কেরানিসুলভ বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন লেখকের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। একটা সীমানায় এসে তাকে থমকে দাঁড়াতেই হয়, চাইলেও সীমাবদ্ধতার কারণে লেখক আর সামনে এগোতে পারেন না। লেখকের বুকের ভেতর বাবা-মা-ভাই-বোন, দেশ-কাল, ধর্ম, সংস্কৃতি সব একসঙ্গে কথা কয়ে উঠতে চায়। এসব শক্তিশালী উপাদানকে পাশ কাটিয়ে নতুন কোনও  মানুষকে বোঝা ও জানার অভিব্যক্তি অর্জন করা সত্যি  দুরূহ এক কাজ। যে লেখকের দেখার চোখ কিংবা মূল্যবোধ শৈশব-কৈশোর থেকেই স্থির হয়ে যায়, সেই শ্রেণির কোনও লেখক যখনই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে উপজীব্য করে গল্প বলতে চান তখন সেটি নিজের অজান্তে হয়ে পড়ে তারই গল্প। বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী বলিষ্ঠ ক’জন লেখক ছাড়া নিজেকে অতিক্রম করার এ দুরূহ কাজে সাফল্য আসেনি বললেই চলে। নিজের আয়ত্তের বাইরে এসে জীবনকে অনুধাবন করা ও তাতে বাস্তবতার গুঁড়োমসলা ঢেলে গল্প রচনা করা সত্যি কঠিন এক কাজ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বশীর আল্হেলাল সেই অদৃশ্য অনতিক্রম্য  মূল্যবোধের  দেয়ালটি অতিক্রম করতে চেয়েছেন। ‘প্রাণগঙ্গা’র রুটি-দোকানদার এবাদ আলী কিংবা ‘ঢেঁকিশালের স্বপ্ন’ গল্পের গোলাম চরিত্রের ভেতর দিয়ে তিনি সে চেষ্টাই করেছেন। ‘মাধুরি’ গল্পে তিনি দেশভাগ পরবর্তী পূর্ববাংলার এক হিন্দু পরিবারের চিত্র আঁকতে চেয়েছেন। জন্মমাটির টান ও দেশান্তরী হবার হাতছানিতে ক্ষতবিক্ষত সংখ্যালঘু নারীর হাহাকারকে তুলে ধরেছেন তাঁর গল্পে। এগুলো লেখক হিসেবে তাঁর সীমানাকে অতিক্রম করবারই প্রয়াস, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

বশীর আল্হেলালের প্রবন্ধেও রয়েছে ক্ষুরধার এ অভিব্যক্তি। মাত্র আঠাশ পৃষ্ঠার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। এর পটভূমি আঁকতে গিয়ে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে মুসলিম লীগবিরোধী নানা সংগঠনের আত্মপ্রকাশের কথাও তুলে ধরেছেন। লাহোর প্রস্তাব, প্রজা আন্দোলনকেও তিনি টেনে এনেছেন তাঁর বক্তব্যকে স্পষ্ট করার জন্য। মোট ৭৪ পৃষ্ঠার বাংলা গদ্য গ্রন্থটির কথাই ধরা যাক। বংলা ভাষার উৎপত্তি দিয়ে শুরু আর শেষ হয়েছে পরশুরামের গদ্য ও ডিএল রায়ের নাট্যভাষা দিয়ে। তিনি বাংলা গদ্যের উন্মেষের তুলনায় বাংলা কাব্যভাষা কেন আগে চর্চিত হয়েছে―এরও বেশ ক’খানা ব্যাখ্যা  উপস্থাপন করেছেন পাঠকের সামনে। তারপর একে একে পর্তুগিজদের ছাপাখানা, শ্রী রামপুর মিশন ও বাংলা গদ্যচর্চা, পাদ্রী সাহেব উইলিয়াম কেরি, তাঁর শিষ্য রাম রাম বসু, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও তখনকার লেখক-পণ্ডিতগণ, হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর সনাতন রীতিনীতি ভাঙার দুর্দম প্রচেষ্টা―সবকিছুকেই সংক্ষিপ্তভাবে স্পর্শ করেছেন এ লেখায়। ফলত একনজরে বাংলা গদ্যচর্চার সঠিক ইতিহাসের পাশাপাশি একটি সামাজিক চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে পাঠকের মনে।

শিশু সাহিত্যিক হিসাবেও বশীর আল্হেলাল ছিলেন মার্জিত রুচি সম্পন্ন একজন লেখক। ছোট ছোট বাক্যবন্ধ  ও  শব্দবিন্যাসের মারপ্যাঁচ ঘটিয়ে বেশ একটা মনোরম চিত্র তৈরি করতে পারতেন তিনি। ফলে সামান্য বিষয়ও সহজে উতরে যেত তাঁর বলার মুন্সিয়ানায়। শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্বটাও তিনি ভালোই উপলব্ধি করতে পারতেন। তাই ‘আনারসের হাসি’ গল্পে কিছু বলতে না চেয়েও অনেক কিছু যেন বলতে চেয়েছেন। আনারসের হাজারটা চোখ, রসময় হাসি কিংবা দুঃখমেদুর কান্না―সব তিনি এঁকেছেন ইঙ্গিতবাহী সরলতায়।

তিনি উপন্যাস লিখেছেন মোট ছটি। কালো ইলিশি, ঘৃতকামারী, নূরজাহানদের মধুমাস, যে পথে বুলবুলিরা যায়, শিশিরের দেশে অভিযান, শেষ পানপাত্র। তিনি শহর ও গ্রাম দুই পটভূমিতেই গল্প বলতে পারতেন। তাঁর বিশ^াসগুলোও ছিল বহুবর্ণ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তিনি ছোটবেলায় অসম্ভব ধার্মিক ছিলেন। বানিয়ে বানিয়ে ইসলামি গল্প বলতেন সহপাঠীদের। নবিজীর জীবনী তাঁর ঠোঁটস্থ ছিল। পরবর্তীকালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে লাল কার্ড পেয়েছিলেন। নিজস্ব মানসগঠনে এসব তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল সন্দেহ নেই। তিনি ছিলেন ইতিহাসের মনোযোগী এক পাঠক। ঘটনার প্রেক্ষিতটুকু তিনি সুচারুভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন বলে গবেষণা-প্রবন্ধে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ভাষা আন্দোলনের সেই মোহনায় গ্রন্থ দুটির ভেতর দিয়ে বার বার তিনি তাঁর প্রতিভার সেই স্বাক্ষরটুকুই রেখে গেছেন। 

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে নতুন  দেশটির অভ্যুদয় ঘটে সেটির নাম বাংলাদেশ। উর্দু নয়, এদেশের সাধারণ মানুষের মুখের ও প্রাণের ভাষা বাংলাই হচ্ছে এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মুখ্য চালিকা শক্তি। এ ভাষাকে শুদ্ধভাবে সবক্ষেত্রে পৌঁছে দিতে যাঁরা নিরলস কাজ করে গেছেন সূচনালগ্নে, বশীর আল্হেলাল তাঁদের ভেতর পড়েন। আদর্শ বাংলা বানান, বাংলা ভাষার নানান বিবেচনা, বাংলা উচ্চারণ, কিশোর বাংলা উচ্চারণ মঞ্জুরী, প্রশাসনিক পরিভাষা সংকলন ইত্যাদি। তাছাড়া, উচ্চারণ ও বানান নিয়ে বাংলা একাডেমি ও নানা সরকারি  প্রশিক্ষণেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সবশেষে, বশীর আল্হেলাল সম্পর্কে একটি প্রশ্ন সচেতন পাঠকের মনে থেকেই যায়। তাঁর কোন্ পরিচয়টি শক্তিশালী ? কথাসহিত্যিক নাকি গবেষক ? শুদ্ধ বাক্যগঠন, শব্দচয়ন, যথার্থ অলংকার প্রয়োগে দক্ষ ও নির্মোহ একজন ভাষা-গবেষক ও সাহিত্যিক তিনি। কিন্তু  ঘটনার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও বিশ^স্ত চরিত্রচিত্রণের ভেতর দিয়ে একজন সফল তীক্ষè ও তীব্র কল্পনাশক্তিসম্পন্ন পরিমিতিবোধের  কথাসাহিত্যিক যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত সরসতার দিকে পাঠককে ধাবিত করেন, এর যেন খানিকটা খামতি রয়েছে বশীর আল্হেলালের বেলায়। গবেষক ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাঝে তুলনা করলে যেরকম উত্তর মিলবে, বশীর আল্হেলালের দুটি আলাদা সত্তার তুলনামূলক আলোচনা করলেও কেন যেন মনে হতে পারে, তাঁর গবেষণা করার  সত্তাটি অধিকতর প্রখর ও সতেজ।

 জীবদ্দশায় তিনি কবিতারও চর্চা করে গেছেন। কবিতা রচনায় তাঁর নিজস্ব এক ভঙ্গিমা ছিল। এর নাম রেখেছিলেন ভণিতা। এরকমই একটি উদাহরণ টানা যেতে পারে :

‘চিঠির বাক্সে চিঠি আছে, পায়ে আমার বাত

ও মেয়ে ওটা এনে দিবি ? নামছে আঁধার রাত

আঁধার রাতে অন্ধ আমি, সকাল হওয়ার পরে

দেহ খাঁচায় তখনও পাখি থাকবে ধৈর্য ধরে

আশা আছে এতটুকু দে রে এনে দে চিঠিখানা

এই শেষবার সে লেখেনি আর ভুল ঠিকানা ..’

বশীর আল্হেলাল ১৯৩৬ সালের ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আর মৃত্যুবরণ করেন ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট। হিসাব করলে বয়স প্রায় পঁচাশি বছর। একে দীর্ঘজীবন না বলে অর্থবহ জীবনই বলা উচিত। কেননা এ জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি তাঁর সৃজনকর্মের স্বাক্ষর রেখে গেছেন অকাতরে। এর জন্য তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলো হলো, ১৯৯১ সালের আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৩ সালের  বাংলা একাডেমি পুরস্কার, কোলকাতার গৌরি ঘোষাল স্মৃতি সম্মান পুরস্কার ২০০২, লেখিকা সংঘ পুরস্কার এবং অধ্যাপক আবুল কাশেম পুরস্কার ২০০৪। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ছকভাঙা উপন্যাস তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’র লেখক প্রয়াত দেবেশ রায়ের বাল্যবন্ধু। তাঁর সাহিত্য ও রুচিবোধ সেভাবেই গড়ে উঠেছিল। আশা করব, তাঁর প্রতিটি সাহিত্য কীর্তি বিপুলভাবে পঠিত ও বহুল আলোচিত হবে এদেশে এবং বশীর আল্হেলাল চিরকাল জীবিত থাকবেন পাঠকের মননে ও স্মৃতিতে।

 লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares