শোকাঞ্জলি : নূরুল হক : কবির প্রতিকৃতি : মারুফ রায়হান

‘মৃত্যুতে আমার কোনও সমস্যা নেই

           কারণ

   জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে

    তাতেই তো বসবাস করি

    তাই

মৃত্যুতে আমার কোনও গড়িমসি নেই     

  যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি’

কবি নূরুল হকের এ কবিতা আমার আগে পড়া ছিল না। কবির জীবনাবসানের পর একদিন কবিকন্যা চরু হকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তাঁর বাবাকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি একটি লেখা আমাকে মেইল করেন। সেই লেখার প্রথমদিকে কবিতাটি রয়েছে। পড়ে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থাকি। জীবনকে সহজভাবে গ্রহণের ভাবনা আমরা এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করি। হঠাৎ পাওয়া জীবন একদিন না একদিন থামবে। মৃত্যু এসেই থামাবে। সেই মৃত্যুকে জীবনের ওপরে স্থান না-দিয়ে জীবনবাদী থাকা এবং জীবন উপভোগ করার মতো মন আমাদের থাকে না। কিন্তু একজন কবি যখন প্রায় সহজভাবে অনেকটা নিরাসক্ত স্বরে জীবন-মৃত্যুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন, তখন আমরা আন্দোলিত হই।

এই সামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্যরে সূচনায় আমি কবিকন্যা চরু হকের ওই লেখা থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দিতে চাই, একজন কবির প্রতিকৃতি বুঝে উঠতে।

কবিকন্যা লিখেছেন :

নেত্রকোনা জেলার মদন থানার বালালী গ্রামে ১৯৪৪ সালের ২৫ নভেম্বর সূর্যালোকে পদার্পণ করেন আমার বাবা। ভাটি এলাকার হাওর ও নদীবেষ্টিত এই গ্রাম অনেকটা সময়ই থাকে নীল জলরাশিতে থইথই। আষাঢ় মাসের ভাসা পানির দেশ। বড়ো দরিদ্র এই গ্রামের মানুষ। চারদিকে ছড়ান-ছিটান ছোট ছোট কুঁড়েঘর, মাঝে মাঝে দু’একটা টিনের ঘর। ভাটি এলাকার খানদানি পরিবারের জন্য ওগুলো বরাদ্দ। এই গাঁয়েরই একটি খানদানি অথচ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে আমার বাবা অর্থাৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি নূরুল হকের জন্ম। পিতা মো. আবু সাইদ  মুন্সি ছিলেন মসজিদের ইমাম। মা মজিদা খাতুন। দাদা মো. শাহানেওয়াজ মুন্সি, তাঁর বাবা মো. সলিম মুন্সি ও তাঁর বাবা মো. রওশন মুন্সি। এঁদের সকলেই ছিলেন স্বপ্রতিষ্ঠিত মসজিদের ইমাম। ইমামতির জন্য তাঁরা কোনও প্রকার হাদিয়া নিতেন না। আমার দাদা অর্থাৎ আবু সাইদ মুন্সির পূর্ব-পুরুষেরা ছিলেন পীর। কবি নূরুল হক পীর বংশের সন্তান। আর তাই তাঁর রক্তধারায় বইছে প্রতিদিনকার জীবন-জটিলতার কোলাহল এড়িয়ে নিষ্কলুস, নির্মোহ একটি জীবন যাপন করার গভীর আকাক্সক্ষা। তাঁর সারাটা জীবন এক অনন্য সাধনা। নিজেকে বিকশিত করার, হয়ে ওঠার সাধনা।

ড. সরকার আমিন বাবার কিছু ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে। সেখানে বাবার কাছে তিনি জীবনে কি লক্ষ্য থাকা উচিত তা জানতে চেয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে স্মিত হাসি দিয়ে বাবা জবাব দিয়েছিলেন, ‘জীবনে আসলে কোনও লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। জীবন নিজেই একটা লক্ষ্য।’ জীবনকে উপলব্ধি করা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে, প্রতিটি পদক্ষেপকে উৎসবের মতো আস্বাদন করাই ছিল আব্বার জীবনবোধের মূল নোঙর। ওশো রজনীশের একটি বাক্য আব্বা প্রায়ই আওড়াতেন, ‘মনে রেখো, ঝড় তোমার চারদিকে। কিন্তু তুমি ঝড় নও। তুমি থাকবে সদা-সর্বদা শান্ত, সমাহিত।’ তেমনি দেখতাম বাইরে থেকে যখনই বিক্ষুব্ধ ঘটনাবলি আকস্মিক এসে আব্বাকে চুরচুর করে দিতে চাইতো, আব্বা তখনই আশ্রয় নিতেন অন্তরতম সত্তার গভীরে। হোক না বাইরে যতই সীমাহীন ঝড়, আঘাত, ভেতরে ততই তিনি জ্বালাতেন তাঁর শান্ত প্রদীপশিখা। কী আশ্চর্য দ্যুতি তার, কী অদ্ভুত শক্তিমান আর স্থির।

২০২০ সালে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হলো আব্বার কবিতাসমগ্র। কবি সরকার আমিন কবিতাসমগ্র প্রকাশিত হবার পেছনে আব্বার অনুভূতি ব্যক্ত করতে বলেছিলেন। আব্বা জানান, এই প্রকাশ নিয়ে আব্বা ব্যাকুল নন। কেননা, তাঁর  এখনও মৃত্যু হয়নি। একটু পরিহাসের সুরেই বুঝি বলা কথাটা। আরও জানান,  তাঁর  বহু লেখা এদিকে-সেদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলোও সংগ্রহ করে একত্রিত করা প্রয়োজন। আর তাছাড়া আত্মপ্রচার আব্বার জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। আব্বার জীবনের মূল লক্ষ্য এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মহা-যজ্ঞের সাথে, মহাশক্তির সাথে একীভূত হওয়া।

কন্যা হিসেবে আমার এই ব্যক্তি জীবনে দেখা কবি নূরুল হককে, যিনি একটি ঋজু জীবন যাপন করেছেন প্রতিটি মুহূর্তে এবং একটি উৎসবমুখর জীবন যাপন করেছেন আপাদমস্তক। আর সেই উৎসবমুখর জীবন যাপনের বাহ্যিক রসদ  কী ছিল ? বই, অগুনতি প্রাণের ছায়া, মাটির গন্ধ আর জগতের প্রাণ-প্রবাহ। ভোলা সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করাকালীন ভোলার এক পিরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তার একটি কথা আব্বা আমাদের সবসময় বলতেন। সেটি হলো, ‘সাদাসিধা খানা, পায়ে দলে চল না, বানোয়াটকা চিজ ইস্তামাল না কার না। ‘যতদূর মনে পড়ছে এই রকমই একটা  কথা। যায়  অর্থ দাঁড়ায়, ‘খাবার খাবে সাদাসিধা, চলতে হবে পায়ে হেঁটে এবং কৃত্রিম জিনিস সর্বদা পরিহার করে চলতে হবে।’ আব্বা নিজের জীবনেও ঐ পিরের কথাগুলোরই পদাঙ্কসরণ করেছিলেন। আব্বার আহার-বিহার, চলন-বলন, জীবন যাপন সবই ছিল সন্তের মতোই; সরল নিরলঙ্কার। তাঁর কবিতার মতোই নিরলঙ্কার কিন্তু হীরকদ্যুতির ন্যায় অপার্থিব বোধের আকরে পূর্ণ। তাই তাঁর কবিতার মতো সাধারণের মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে বেড়ান অসাধারণকে। তাঁর কাছে কবিতা ও জীবন ছিল একে অন্যের পরিপূরক।

দুই

২০১৪ সালে একুশের সংকলন-এর ক্রোড়পত্রে নির্বাচিত ৫০ বইয়ের তালিকায় নূরুল হকের কবিতাকে শুরুতেই স্থান দিই। অস্বীকার করব না এই কবির মাত্র একটি গ্রন্থ এর আগে আমার সংগ্রহে ছিল। ভালো লেগেছিল। কিন্তু শাহবাগ থেকে মালোপাড়া বইটি হাতে নিয়ে তার কয়েকটি কবিতা দ্রুত পড়ে ফেলে আমি প্রাথমিকভাবে বইটির পক্ষে ভোট দিয়ে রাখি। পরে চূড়ান্ত নির্বাচনের সময় এটিই আমার কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। ক্রোড়পত্রে বইটি নিয়ে ছোট্ট করে যা লিখেছি তা নিচে উদ্ধৃত করছি :

‘স্বকাল-স্বভূমির দীর্ঘশ্বাস ও দীর্ঘবাদন, অর্জন ও বিসর্জন এবং আর্তি ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে নিজের আত্মাকে সংযুক্ত করে নূরুল হকের মতো সত্যিকারের কবিতা লিখতে পারেন ক’জন ? সত্তরোর্ধ্ব নিভৃতচারী সহজিয়া এই কবি এখনও অপঠিত ও না-গৃহীত রয়ে গেছেন কবিতারাজনীতিতে বিশ্বখেতাব পাওয়ার যোগ্য এই অবাক বাংলায়।’

আমাদের কবিতাঙ্গনে হেভিওয়েট কিছু কবির নাম বারবার উচ্চারিত/আলোচিত হয়। তাঁদের নাম নিশ্চয়ই স্মরণযোগ্য। কিন্তু কবিতার কারণে নয়, মঞ্চশোভা বর্ধনের জন্য তাঁদের নাম আলোচনায় আসে।  তাঁদের দিকে তাক করা থাকে প্রচারের আলো। তা থাকুক, আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু এর সমান্তরালে যদি নূরুল হকের মতো কবিরাও সাহিত্য সমালোচক/সাহিত্য সম্পাদকদের সম্মান পেত―আমার কোনও খেদ থাকত না। দ্বিতীয়ত, খুব সচেতনভাবে গোষ্ঠীবদ্ধ ক’জন কবি লেখায়-আলোচনায় -প্রচারণায় এমন একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসী যে মাতৃভূমি ও সমকাল নিয়ে রচিত কবিতা কোনও কবিতাই নয়। নতুন পাঠক নিশ্চয়ই এতে বিভ্রান্ত হন। কবিতায় রাজনীতির বিষয়আশয় উঠে এলে তাকে এক কথায় স্লোগান বলে খারিজ করার প্রবণতাও দেখা যায়। নবীন পাঠক এতে প্রভাবিত হন। জীবনানন্দ দাশকে বুঝলে আমার অবশ্যই মানব যে, কবিতা অনেক রকম। বিষয় বা প্রকাশভঙ্গি যেমনই হোক না কেন, একটি লেখা কবিতা হলো কি না সেটাই আসল।

কবির কি কোনও নির্দিষ্ট দেশ থাকে ? যে-ভাষায় তিনি লেখেন সে-ভাষাভাষি মানুষের প্রতি আলাদাভাবে তাঁর কি কোনও দায়িত্ব থাকে ? মাতৃভূমির জন্যে তাঁর কী কর্তব্য থাকে ? এখানে উৎকীর্ণ তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বহুমুখী জবাব মনে আসে, নতুন জিজ্ঞাসাও তৈরি হয়। সেই পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নের আগমন, আর ক্রমাগত জবাব অন্বেষণের জটিলতা আমরা এড়াতে পারি না। কবির নিজস্ব দেশ অবশ্যই থাকে, যদিও তিনি হতে পারেন বিশ্বনাগরিক, সেটাই কাম্য। একজন বড় মাপের কবি নিশ্চিতভাবেই হন সকল দেশের, অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের কণ্ঠস্বর। যদিও একান্ত স্বদেশের আকাশমাটির স্বাদ ও অভিজ্ঞতা প্রচ্ছন্ন থাকে তাঁর রচনায়; দেশকে পাওয়া যায় তাঁর উপমা, চিত্রকল্পের প্রয়োগ-সংকেতে, আবেগের আঙ্গিকে, উচ্চারণ-ভঙ্গিতে। শুধু দৈশিক পরিচয় নয়, একজন প্রধান কবির লেখায় স্পন্দমান থাকে নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যও। স্বদেশের সীমানার বাইরের কোনও ক্রিয়ায় শৈল্পিক সাড়া দিতে গিয়ে তিনি যখন সেই অঞ্চলের মানুষের অনুভূতির অংশীদার হয়ে ওঠেন তখনও শব্দে-ছবিতে তিনি ইশারা রেখে চলেন আপন বংশের, আপন ভূমির। কবি তুলে ধরেন সত্যের স্বরূপ, শেকড়ের বিবৃতি, নীলিমার বেদনা। অনুভূতির বৈচিত্র্যে ভরিয়ে তোলেন পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি। সত্য অন্বেষণ এবং অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার শিল্পিত প্রকাশ―প্রধানত : এ দুটি তাঁর আরাধ্য। প্রকৃত প্রতিভা তাই পরিণত হন দ্রষ্টায়, কল্যাণময় স্বাপ্নিকে এবং দ্রোহীর প্রতীকে। অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপিত করেন স্বগোত্রের মানুষকে। আর সজ্ঞানে বা অসচেতনভাবে সমৃদ্ধ করে চলেন মাতৃভাষাকে। সমাজ প্রায়শই কবির মর্ম বুঝে উঠতে ব্যর্থ হয়, উপেক্ষা করে তাঁর অনিবার্য প্রয়োজন। যদিও কবি নিবেদিত থাকেন স্বকাল ও সমাজেরই কাজে। বাংলার কবির রচনায় যদি বাংলাদেশই না থাকে, বাঙালির স্বপ্ন ও সংকট না বিম্বিত হয়, তাহলে বাংলায় লেখা বলেই কি ওই কবিতাকে বাংলা কবিতা বলে মেনে নেয়া যায় ? কবিকে বুকে টেনে বলা যেতে পারে :  আমাদের কবি, বাঙালি কবি!

মাতৃভূমির জন্যে কবির নিশ্চয়ই কর্তব্য থাকে। মাতৃভূমি বিপর্যস্ত নিষ্পিষ্ট বিদীর্ণ হতে থাকলে, এবসার্ড নাটকের উপাদানে উপহাসিত হতে থাকলে, কবি নীরবতা পালন করতে পারেন না। কবি নিজে সংবেদনশীল শিল্পী, সংবেদনশীলতা জাগানোও তাঁর একটি প্রধান কর্তব্য। নূরুল হকের কবিতার বইটি পড়ে আমি এতে অনেকগুলো কবিতার সন্ধান পাই যা সর্ববিচারে উৎকৃষ্ট কবিতা। শাহবাগ থেকে মালোপাড়া―এই নামটির মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে দুটি এলাকার নাম করা হয়েছে। শাহবাগের গণজাগরণ প্রত্যক্ষ করেছিল বাংলাদেশ এবং শাহবাগকে বিতর্কিত করে তোলার বা শাহবাগ বিতর্কিত হয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত এমন একটি স্বপ্ন-প্রতিজ্ঞায় আন্দোলিত হয়েছিল দেশের সব শ্রেণির সব পেশার মানুষ যা স্বাধীনতার পর আর দেখা যায়নি। একাত্তরের বাংলাদেশের হৃদয়ের আলোকশিখার সঙ্গে কিছুটা তুলনা দেয়া যায় ২০১৩ সালের শাহবাগের নবজাগরণকে। গজদন্তমিনারবাসী কবিও আন্দোলিত হয়েছিলেন শাহবাগ-শিহরণে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে জরুরি হলো যুদ্ধাপরাধীদের ন্যায্য শাস্তি দেয়া। সেখানে সামান্যতম আপস কাম্য হতে পারে না। শাহবাগ, স্পষ্ট করে বললে, বাংলাদেশ জ্বলে উঠেছিল রাজাকারদের ছাড় দেয়ার আশঙ্কায়। তাই নূরুল হকের কবিতা প্রথমত স্পর্শ করেছে শাহবাগের আবেগ। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার যশোরের মালোপাড়া গ্রামের গল্প, যা আলাদা কিছু নয়; সেখানেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নৃশংসতা। নূরুল হকের এই কবিতার বইয়ের নামে স্পষ্টত সমকালে স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে মানুষের জাগরণের বিষয়টি প্রধান হয়ে উঠলেও এতে রয়েছে বাংলার হৃদয়েরই নানা ক্ষত ও ক্ষমতার শৈল্পিক সুষমা ও সংকেত। শাহবাগের শহিদ রাজীবকে তিনি যে মহিমায় চিত্রিত করেছেন তা অভিনব। এমনটা আমি আর কারও কবিতায় পাইনি।

রাজীবকে নিয়ে একাধিক কবিতার (শাহবাগের উচ্চারণ) একটি থেকে কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি :

… দেখা যাচ্ছে মৃত্যুতেও তাকে পরাস্ত করা যাচ্ছে না

তাই তার কৃমিকীট নাড়িভুঁড়ি খেতে শুরু করেছে

শবভুকেরা

রাজীব এখন আমাদের চেতনায় ধ্রুবতারা

রাজীব তুমি চলো

আমরাও ছুরিতে চুমু খেতে খেতে

তোমার দেখানো পথ ধরে

চলতে থাকব। 

২০১৩ সাল বাংলাদেশকেই প্রতিক্রিয়াশীলেরা পাঠাতে চেয়েছিল বার্ন ইউনিটে। মুক্তিযোদ্ধা কবির চোখ কত সইবে ? ‘হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ছটফট করা অভিশপ্ত আগুন, অঙ্গার হয়ে যাওয়া গরুর শরীর দেখতে কবির ভাল্লাগে না’। তাই তিনি চোখ ঢাকার কথা বলছেন এভাবে―‘ঢাকো আমার চোখ, কালো কালো মেঘের পালক দিয়ে।’ এটাই তো কবিতা। ৫ মে ছড়িয়ে পড়েছিল হেফাজতি অন্ধকার। এ নিয়েও রয়েছে একাধিক কবিতা। খুব ছোট্ট একটি কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সূক্ষ্ম অপমানবোধের অনুরণন কী দারুণভাবেই না উঠে এসেছে। ছোট্ট কবিতার (৪২ বছর পর) পুরোটাই তুলে দিচ্ছি :

সোনার গাছে ফুল ধরবে

ফল ধরবে বলে

পুঁতেছিলাম বীচি

আজকে দেখি মান বাঁচানোই দায়

জল ঢেলেছি

হৃদয় থেকে

এতটা কাল

শুধুই মিছামিছি ?

হরতাল-অবরোধে দেশ যখন সন্ত্রস্ত বিপর্যস্ত, এক পাহাড়সম অস্বস্তি আমাদের ঘিরে ধরেছে, তখন নূরুল হকের ‘হালুয়া’ কবিতাটা চোখের সামনে মেলে ধরি। তিনি লিখেছেন : হরতাল এবং অবরোধ এক ধরনের হালুয়া/যা রাস্তায় ছিটিয়ে দিলে/কতই না জীবজন্তু ছুটে আসে। টিভির টক-শো নিয়ে নূরুল হক যে কবিতা লিখেছেন (টক- শো’র ঠোঁটগুলোকে জিন্দাবাদ) তাও প্রকৃতার্থে কবিতাই হয়ে উঠেছে। সহজ উচ্চারণ কিন্তু সত্যের আন্তর চেহারা উঠে আসে যখন তিনি বলেন, ‘নোংরা কোমলতার ফাঁক দিয়ে … দানবের হিংস্র নিঃশ্বাসের মতো/ বেরিয়ে আসছে বিষাক্ত মিথ্যা…

২০১৩ সাল―এই একটি বছর বাংলাদেশ দেখেছে যুগপৎ নতুন নক্ষত্র ও পুরোনো অমাবস্যা; লক্ষ রজনীগন্ধার মতো ফুটেছে আশা, ফের আশাভঙ্গের আর্তনাদে খানখান হয়ে গেছে আকাশ। চারপাশ হয়ে উঠেছে ‘পরাবাস্তবের লাঠিসোটা’। আগামী প্রজন্ম যদি এই একটি বছরের বাংলাদেশকে কবিতায় পড়ে উঠতে চায়, এবং একইসঙ্গে একজন প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধার ক্রোধ ও দীর্ঘশ্বাসের ধরনকে শনাক্ত করে নিতে চায় তবে নূরুল হকের এই একটি গ্রন্থই যথেষ্ট। সমকাল-চিরকালের নাকাড়া হয়ে বেজে ওঠা কবিকণ্ঠ কবিতারই রূপময় উপার্জন।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares