শোকাঞ্জলি : ভূঁইয়া ইকবালের পত্র-চর্চা, পাণ্ডুলিপি-চর্চা : মুহিত হাসান

এটা খুব উল্লেখ করবার মতো ব্যাপার যে, ভূঁইয়া ইকবালের (১৯৪৬-২০২১) জীবদ্দশায় প্রকাশিত দ্বিতীয় বইটিই ছিল একটি ভিন্নধারার পত্রসংকলন; এবং সেখানে অন্তর্ভুক্ত সব ক’টি চিঠিই দুষ্প্রাপ্য। তিনি নিজে বিপুল পরিশ্রমে সেগুলো সংগ্রহ করেছেন এবং পরে পরম যত্নে তাতে জুড়েছেন প্রাসঙ্গিক টীকা-ভাষ্য ও একটি দীর্ঘ ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র শীর্ষক (বাংলা একাডেমি, ১৯৮৫) ওই সংকলনটি আদতে নানা দিক থেকেই এক অন্যরকম গ্রন্থ। বইটির প্রকাশমুহূর্তও খেয়াল করার মতো। তখন বাংলাদেশে সামরিক শাসনের প্রশ্রয় পাওয়া মৌলবাদী শক্তি তো বটেই, এমনকি তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ কি ‘বাম-মনা’ অনেক লেখকও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘বাঙালি মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধপক্ষ’ বলে দাগিয়ে দেবার জন্য বিদ্বেষপূর্ণ মিথ্যা বয়ান তৈরিতে ব্যতিব্যস্ত। এহেন বিরুদ্ধ-সময়ে, ভূঁইয়া ইকবাল রবীন্দ্রনাথের লেখা এমন কিছু চিঠি নিয়ে বইটি প্রকাশ করলেন―যে চিঠিগুলোর প্রাপক ছিলেন সেকালের বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রখ্যাত লেখক ও বিশিষ্ট মানুষেরা। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে জসীমউদ্্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে সুফিয়া কামাল কিংবা আবুল ফজল থেকে বন্দে আলী মিয়া―এমন ঊনচল্লিশজনের বহুদিনের পুরোনো চিঠি উদ্ধার করার পর ঠিকঠাকভাবে প্রকাশের কাজটা সহজ ছিল না। এই চিঠিগুলো ছাপা হবার পর যেমন বাঙালি মুসলমান সমাজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের একটি পূর্ণতর চালচিত্র সামনে এসেছিল, তেমনি ভেঙে পড়েছিল তাঁকে জোরপূর্বক ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেবার রবীন্দ্র-বিদ্বেষী ছদ্ম-পণ্ডিতি অপ-তৎপরতা। তাঁর নির্মোহ সত্য-সন্ধানী গবেষক-সত্তার পরিচয় এই পত্রসংকলন সম্পাদনার নজির থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বস্তুত, ভূঁইয়া ইকবালের পত্র-চর্চার উদ্দেশ্যই ছিল যেন এই―জীর্ণ হারানো চিঠি উদ্ধার করে তা থেকে ইতিহাসের ধূলিময় সত্যের উন্মোচন আর ব্যক্তির জীবনকথা ও সামাজিক বিবরণ নির্মাণে নতুন উপাদানের জোগান দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালি মুসলমান সমাজের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের অতি ডান ও অতি বাম তরফের প্রতিক্রিয়াশীল বয়ানের বিপরীতে গিয়ে তিনি নিপাট সত্য তুলে ধরেছিলেন নিজে একটি বাক্য ব্যয় না করেও―রবীন্দ্রনাথের নিজেরই লেখা দুষ্প্রাপ্য চিঠি উদ্ধার করে। রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালি মুসলমানের আন্তরিক যোগাযোগের যে ইতিবৃত্ত তিনি নির্মাণ শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র-এর মাধ্যমে, তা পরে পূর্ণতা পেল বৃহদায়তনের রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ (প্রথমা প্রকাশন, মে ২০১০) গ্রন্থে এসে। ১৯১৪ থেকে ১৯৪১ অবধি বাঙালি ও ভারতীয় মুসলমান সমাজের একাধিক ব্যক্তিকে রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা শতাধিক পূর্ণাঙ্গ চিঠি ও চিঠির খণ্ডিত অংশ সেখানে সংকলিত হয়। সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের লেখা আটাশটি বাংলা ও নয়টি ইংরেজি চিঠিও বইটিতে লভ্য।

রবীন্দ্রনাথের চিঠি নিয়ে ভূঁইয়া ইকবালের কাজ অবশ্য এই বইতেই থেমে থাকেনি। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষে প্রকাশ পাওয়া রবীন্দ্রনাথ: তাঁর চিঠি, তাঁকে চিঠি (মূধর্ণ্য, ফেব্রুয়ারি ২০১১) তারই নিদর্শন। এই বইটি আকারের দিক থেকে মিতায়তন, মাত্র আশি পৃষ্ঠার; কিন্তু অন্তর্গত সারবস্তুর বিচারে ওজনদার। বিশ^ভারতীর রবীন্দ্রভবনের মহাফেজখানা থেকে রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু অপ্রকাশিত চিঠি ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অথচ আজও অগ্রন্থিত থাকা চিঠি রয়েছে বইটির প্রথম ভাগে। দ্বিতীয় ভাগে আছে রবীন্দ্রনাথকে লেখা  আটাশজন খ্যাত-অখ্যাত ব্যক্তির চিঠি, এগুলোও রবীন্দ্রভবন থেকে উদ্ধারকৃত। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ: তাঁর চিঠি, তাঁকে চিঠি প্রকাশের পরেও অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত রবীন্দ্র-পত্রের অমূল্য সম্ভারের খোঁজ করে চলেছিলেন ভূঁইয়া ইকবাল। তাঁর এই অব্যাহত নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধানের নিদর্শন দেখি মাসিক সাহিত্যপত্র কালি ও কলম-এর ২০১৭ সালের অক্টোবর এবং নভেম্বর সংখ্যায়। ওই দুই সংখ্যায় ‘রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি অগ্রন্থিত পত্র’ শিরোনামের অধীনে বিভিন্ন গ্রন্থ ও সাময়িকপত্র থেকে রবীন্দ্রনাথের অগ্রন্থিত ঊনত্রিশটি চিঠি তিনি টীকা-ভাষ্যসমেত সংকলন করেছিলেন। ২০১৭-য় প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যাতেও তাঁর সংগৃহীত রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত দুটি চিঠি ছাপা হয়; সে দুটি চিঠি আকারে ছোট, কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে বড়―পত্রদ্বয় লেখা হয়েছিল আজকের চাঁদপুর জেলার দুই কিশোর ভ্রাতা অমরেন্দ্রনাথ ও হীরেন্দ্রনাথ (এঁদের মধ্যে প্রথমজন পরে আয়কর কর্মকর্তা হন, অপরজন ‘ইন্দ্রজিৎ’ ছদ্মনামে খ্যাত লেখক) এবং তাঁদের স্কুলশিক্ষক পিতা সারদাচরণ দত্তের অভিনন্দনের প্রত্যুত্তরে।

কবি অমিয় চক্রবর্তীর বেশ কিছু চিঠি সংগ্রহের পর তা ভূঁইয়া ইকবাল সংকলন করেন অমিয় চক্রবর্তীর স্মৃতিকথা ও পত্রাবলি (সাহিত্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২০) শিরোনামে। এতে সংকলিত যে রচনাংশটি ‘স্মৃতিকথা’ হিসেবে চিহ্নিত, সেটিও আদতে পত্রাকারে লিখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী; যার প্রাপক অনুজ কবি নরেশ গুহ। অমিয় চক্রবর্তীর পত্রাকারে লেখা স্মৃতিকথা বা আত্মচরিতের সঙ্গে রয়েছে নরেশ গুহকে লেখা আরও একাত্তরটি স্বতন্ত্র চিঠি। অমিয় চক্রবর্তী ও নরেশ গুহ, দুই কবির মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্ক ও তাঁদের পত্র-যোগাযোগের পূর্বাপর ভূঁইয়া ইকবাল তুলে ধরেছেন গ্রন্থটির বিশদ ভূঁমিকায়। সঙ্গে যথারীতি রয়েছে পাঠকের জন্য অতীব জরুরি বিস্তৃত ও সংহত টীকা-ভাষ্য। বইটিতে সংকলিত পত্রাবলির আবহ বুঝতে যেমন তা সহায়ক, তেমনি বাংলা সাহিত্যজগতের জটিল রাজনীতি ও অমিয় চক্রবর্তীর ব্যক্তিজীবন-লেখকজীবনের বহু ঘটনাকেও স্পষ্ট করে তোলে টীকাগুলো।

তাঁর পত্র-চর্চার সর্ব-সাম্প্রতিক নিদর্শন হিসেবে আমাদের হাতে এসেছে দুটি সংকলন। এর একটি, শঙ্খ ঘোষের মননপ্রভায় দীপ্ত পঁচিশটি দীর্ঘ চিঠির সংকলন শঙ্খ ঘোষ : অগ্রন্থিত পত্রাবলি (জার্নিম্যান বুকস, জুলাই ২০২১)। আরেকটিতে রয়েছে, স্বয়ং ভূঁইয়া ইকবালকেই লেখা তাঁর অতি প্রিয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, বহুদিনের সহকর্মী ও আমৃত্যু আজীবন সাহিত্যজগতের অগ্রজ সহযোদ্ধা আনিসুজ্জামানের চব্বিশটি চিঠি; যার শিরোনাম, আনিসুজ্জামান: অপ্রকাশিত পত্রাবলি (জার্নিম্যান বুকস, মার্চ ২০২১)।

শঙ্খ ঘোষের লেখা চিঠিগুলো এক বিশেষ সময়পর্বের। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে এই পত্রগুচ্ছ রচিত হয়েছিল আরেক মনীষী, গবেষক-বহুভাষাবিদ, দিল্লি বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশকে উদ্দেশ করে। শঙ্খ ঘোষের মতো একনিষ্ঠ সাহিত্যসাধক যখন তাঁর অনুজ আরেক মেধাবী সাহিত্য-গবেষককে লিখছেন, তখন সেই চিঠির ব্যক্তিগত মূল্যের পাশাপাশি বৌদ্ধিক গুরুত্ব যে কতটা―তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রয়াত কবির লেখা এই যুগপৎ হৃদয়গ্রাহী ও মগজমন্থী চিঠিগুলোর সন্ধান ভূঁইয়া ইকবাল কীভাবে পেয়েছিলেন, সেও এক আন্তরিকতামাখা আখ্যান। শঙ্খ ঘোষ : অগ্রন্থিত পত্রাবলি-তে তাঁর লেখা ভূমিকা থেকেই পড়ি :

‘… এই অপরিজ্ঞাত চিঠিগুলো পাওয়ার পেছনে একটি কাহিনি আছে। এক দশক আগে আইসিসিআরের একটি বৃত্তি নিয়ে ভারতে গিয়েছিলাম। লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রগবেষণা এবং বিস্মৃত আরেক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক শিশিরকুমার দাশের সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান। … শিশিরকুমার দাশের এক পুত্রের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করি। তাঁর কাছ থেকে তাঁর মা শ্রীমতি সুস্মিতা দাশের ফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করি। আমার কলকাতায় থাকার সময় শ্রীমতি দাশ কলকাতায় এলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাকে অধ্যাপক দাশের পারিবারিক কাগজপত্র দেখার জন্যে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান। … অধ্যাপকের কাগজপত্রের মধ্যে বেশ কয়েকজনের চিঠি সংরক্ষিত ছিল। … সবিস্ময়ে দেখি, সবচেয়ে বেশি চিঠি শঙ্খ ঘোষের। সুস্মিতাদির সৌজন্যে চিঠিগুলো ফটোকপি করার সুযোগ পাই। … দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরেই শঙ্খ ঘোষকে তাঁর এসব চিঠি উদ্ধারের কথা জানাই। তাঁর কাছ থেকে পত্রাবলি প্রকাশের অনুমতি পাই।…’ (পৃষ্ঠা ১৩)

উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলো। কিন্তু এখানে তা উপস্থাপন করলাম এই কারণে যে, এই বিবরণ থেকে একজন সত্যিকার গবেষকের ক্লান্তিহীন পরিশ্রম বা কর্ম-তৎপরতা, বিরল আন্তরিক সৌজন্যবোধ ও নিয়মনিষ্ঠার পরিচয় মেলে। যা কি না ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গবেষকদের প্রেরণা ও উৎসাহও জোগাতে পারে।

ভূঁইয়া ইকবালের সংকলিত-সম্পাদিত পত্র-সংকলনগুলোর মধ্যে আনিসুজ্জামান: অপ্রকাশিত পত্রাবলি একটি বিশেষ কারণে স্বতন্ত্র; কৌতূহলোদ্দীপকও বটে। সংকলিত পত্রগুচ্ছের প্রাপক তিনি নিজেই; এই প্রথম তাঁকে উদ্দেশ করে লেখা কারও পত্রের সংকলন ভূঁইয়া ইকবাল নিজেই সম্পাদনা করলেন। মোটমাট চব্বিশটি চিঠি লেখা হয়েছিল এক বিস্তৃত কালপর্বজুড়ে, ১৯৭৪ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে। চিঠিগুলো লেখাও হয়েছে পৃথিবীর চারটি শহর থেকে―লন্ডন, প্যারিস, ঢাকা ও চট্টগ্রাম। অবশ্য আনিসুজ্জামানের সঙ্গে ভূঁইয়া ইকবালের সম্মুখ আলাপ ও পত্র-যোগাযোগ ৭৪’-এরও বহু আগে, কিন্তু ‘তার আগের চিঠি রক্ষা করতে পারিনি’ (পৃ. ৭) বলে প্রাপক নিজেই বইটির ভূমিকায় জানিয়েছেন। সময়ের ঝাপটা বাঁচিয়ে যে পত্রগুচ্ছ পাঠকের সামনে এল, তা নিঃসন্দেহে মেধার ছটায় উজ্জ্বল ও প্রাণের স্পর্শে সজীব। প্রাজ্ঞ গুরু আনিসুজ্জামান ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য ভূঁইয়া ইকবাল―দুজনেরই কর্ম-সৃজনের নানা তৎপরতার চালচিত্র এই দুই ডজন চিঠিতে ফুটে উঠেছে। দেখনদারির নিদর্শন নয়, বরং কর্মযজ্ঞের সাদামাটা আন্তরিক বিবরণ হিসেবে। পড়তে পড়তে এর ভেতর থেকে দুই গুণীজনের প্রতিভা  ও পাণ্ডিত্যের ছবিটুকু পাঠকের সামনে উঠে আসে আপনাই, সহজিয়া ভঙ্গিতে। নমুনা হিসেবে লন্ডন থেকে আনিসুজ্জামানের লেখা ১৫.১০.৭৪ তারিখের চিঠিটির কিদয়ংশ পড়া যাক :

‘ইকবাল, পৌঁছবার খবর নিশ্চয়ই আগেই জেনেছো। অন্যান্য খবর হচ্ছে : বাসা পেয়েছি, বৃত্তির পরিমাণ ২২৫ পাউন্ড হয়েছে, কিন্তু সেইসঙ্গে এটার মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে; সংসারের প্রচণ্ড ঝামেলার আংশিক সামলে উঠেছি মাত্র, শুচিকে স্কুলে দিয়েছি, রুচিকে এখনও দিতে পারিনি সিটের অভাবে; আনন্দের দুষ্টুমীর মাত্রা চরমে উঠেছে; বিবিসিতে দুটো কবিতা রেকর্ড করেছি। … যেসব খবর জানবার জন্যে উদ্্গ্রীব হয়ে আছি, সেগুলো হলো : তোমার ইন্টারভিউ কবে; হেনা সাহেব কেমন আছেন, ‘পাণ্ডুলিপি’ চতুর্থ সংখ্যার কি অবস্থা; ‘চর্যাগীতির সমাজচিত্রে’র  ছাপা ফর্মা কবে পেতে পারব; সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ কবে হচ্ছে; কাইউম সাহেব-রাজিয়া-মনজুর মোরশেদদের ঢাকায় যাওয়া স্থির হল কি না; ঢাকায় সহকারী অধ্যাপকের পদে কে গেলেন; তোমার আব্বার শরীর এখন কেমন ? … বিদ্যাসাগরের কাজটা ফিরে গিয়ে শেষ কোরো। জোনাথান ডানকানের অনুবাদ থেকে আমি তাঁর আইনের পরিভাষা সংকলন করছি। ডানকানের অনুবাদ বেশ চিত্তাকর্ষক। কিন্তু এডমনস্টোন বাংলাকে একেবারে ফারসি বানিয়ে ছেড়েছেন। পড়েই মনে হলো, ভুল বিষয় নির্বাচন করেছি।…’ (পৃ. ২৯-৩০)

ভূঁইয়া ইকবালের প্রতি আনিসুজ্জামানের অপরিসীম স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশ প্রতিটি চিঠিতেই স্পষ্ট, কিন্তু কখনও তাতে মাত্রাছাড়া আবেগের প্রকাশ ঘটেনি। ‘শাসন করা সাজে তার, সোহাগ করে যে’―এই আপ্তবাক্য মাথায় রেখে কখনও কখনও চিঠিতে ছাত্রের যৌক্তিক সমালোচনাও করেছেন তিনি। ভূঁইয়া ইকবালের প্রস্তাবিত পিএইচডি গবেষণা-সন্দর্ভ ‘বাংলাদেশের উপন্যাসে সমাজচিত্র ১৯৪৭-১৯৭১’ (পরে ১৯৯১ সালে ঢাকার বাংলা একাডেমি থেকে অভিন্ন শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত) বিষয়ে লেখা চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে ১৯৮১-র ৩০ জানুয়ারি তারিখে লেখা পত্রে যেমন পাই : ‘ … তোমার কাজের বিষয়েও কিছু তিরষ্কার তোমার প্রাপ্য। সিনপ্সিস দেওয়ার সময়ে বিষয় সম্পর্কে তেমন ভাবোনি―শুধু অনুমতি পাওয়াই ছিল লক্ষ্য। এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়ের মধ্যে যদি ডুবে যেতে না পারো তাহলে কাজ জুতসই হবে না। … ’ (পৃ. ৫১) সমালোচনার ঠিক পরেই আবার মমতার সঙ্গে ছাত্রকে খুঁটিনাটি নির্দেশনা দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে এগোলে কাজটা ঠিকমতো হবে। ভূঁইয়া ইকবাল চাইলে কোমলে-কঠোরে মেশান আনিসুজ্জামানের পত্রটির কঠোর অংশটুকু বর্জন করেই ছাপিয়ে দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা করেননি। পত্রটি যেমন ছিল, ঠিক সেভাবেই প্রকাশ করেছেন। এ থেকে গবেষক ভূঁইয়া ইকবালের সততা, স্বাতন্ত্র্য ও ন্যায়ের প্রতি তাঁর দায়বোধের পরিচয় পুনর্বার মেলে।

২.

পত্র-চর্চার পাশাপাশি, ভূঁইয়া ইকবালের গবেষক-সত্তার আরেকটি বিশেষ দিকের দেখা মেলে তাঁর পাণ্ডুলিপি-চর্চায়। স্বনামখ্যাত বাঙালি লেখকদের অপ্রকাশিত রচনা বা পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি উদ্ধারপূর্বক প্রকাশ, পত্রিকায় প্রকাশিত অথচ অগ্রন্থিত রচনার একত্রীকরণ ও গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত রচনার সমন্বয়ে নতুনতর মাত্রায় সংকলন নির্মাণ―পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এই তিন ধরনের কাজ মুখ্যত তিনি করেছেন।

গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত রচনার সমন্বয়ে নতুন পাণ্ডুলিপি নির্মাণের অভিনব প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় তাঁর সংকলিত-সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা ১৮৯২-১৯২৬ (প্রথমা প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৬) ও প্রমথ চৌধুরীর আরো লেখা (বাংলা একাডেমি, জুন ২০১৮) গ্রন্থে। পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা-র ভূমিকায় সংকলন-সম্পাদক জানান, খোদ রবীন্দ্রনাথই তখনকার পূর্ববঙ্গ সফরের সময় দেওয়া তাঁর মৌখিক ও লিখিত বক্তৃতাগুলো একত্র করে পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা শিরোনামেই একটি গ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা মনে মনে ভেবেছিলেন। বক্তৃতাগুলো পত্রিকায় প্রকাশের পরপরই তিনি বসুমতী সাহিত্য মন্দিরকে বইটি প্রকাশের ভার দেন। কবির আশা ছিল, তা ১৯২৬-এর মার্চ বা এপ্রিলেই বেরিয়ে যাবে। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ও শান্তা দেবীকে লেখা তাঁর দুটি চিঠিতে বইটি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ও বিলম্বের কারণে উৎকণ্ঠার প্রকাশ দেখা যায়। ভূঁইয়া ইকবাল জানাচ্ছেন, ‘…বইয়ের প্রুফ দেখা ও ছাপার কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ আজতক বইটি প্রকাশ পায়নি।…’ (পৃ. ৭) স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের নিজের পরিকল্পিত অথচ প্রকাশনালয়ের গাফিলতি-ব্যর্থতায় প্রকাশ না-পাওয়া বই প্রায় নব্বই বছর পুনর্নির্মাণের পর যথাযথভাবে ছেপে বের করার এমন নমুনা খুব একটা সুলভ নয়। পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা ভূঁইয়া ইকবালের পাণ্ডুলিপি-চর্চার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নিদর্শন, এ কথা বললে তাই অত্যুক্তি হয় না। অপরদিকে, প্রমথ চৌধুরীর আপাতভাবে সহজলভ্য নয় এমন কিছু রচনা পাঠকের সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে ভূঁইয়া ইকবাল একটি ‘এন্থলজি’ ঘরানার সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন। লেখকের সার্ধশতজন্মবর্ষ উপলক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার সেই সংকলন আরো লেখা ছেপে বেরোয়। এ বই আক্ষরিক অর্থেই আকারে ও সংকলিত রচনাসমূহের অন্তর্গত ভাবের বিচারে ওজনদার। অতুলচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহে নেই এমন পঁয়ষট্টিটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ‘প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান’ ও ‘স্টোরি অফ বেঙ্গল লিটারেচার’ শীর্ষক দুটি পুস্তিকা, প্রমথ চৌধুরীর লেখা একশ আশিটি চিঠি ও তাঁকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ চিঠি―এই নিয়েই নির্মিত আরো লেখা-র ছিমছাম গোছান অবয়ব। পাণ্ডুলিপি-চর্চায় ভূঁইয়া ইকবাল যে সমগ্রতাপিয়াসীও ছিলেন, সে প্রমাণ বইটি থেকে পাই।

ভূঁইয়া ইকবাল একাধিক অপ্রকাশিত ও অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার বা সংগ্রহের পর তা সম্পাদনা করেছেন। ঔপনিবেশিক জামানায় ইংরেজ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ কবি নজরুলের অগ্নিগর্ভ সব কবিতা বাজেয়াপ্তির উদ্দেশ্যে তা নিজ উদ্যোগে ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়েছিল। নজরুলের কবিতার কলম রুদ্ধ করতে সরকারি তৎপরতার অংশ হিসেবে অনুবাদকৃত সেইসব কবিতা উদ্ধার করেন ভূঁইয়া ইকবাল। পরে তা নজরুলের কবিতা: বাজেয়াপ্তির জন্য অনুবাদ (নজরুল ইন্সটিটিউট, ১৯৯৫) শিরোনামে মূল কবিতাগুলোর সঙ্গে গ্রন্থাকারে ছাপা হয়। এ বই যেমন নজরুল জীবনী রচনার ক্ষেত্রে নতুন উপাদানের জোগান দিয়েছে, তেমনি ইংরেজ সরকারের গোয়েন্দা নজরদারির একটি ভিন্নতর নজিরও সামনে আনতে সাহায্য করেছে। শামসুর রাহমান তাঁর আত্মজীবনীতে এই বলে খেদ করেছিলেন যে, বাংলাদেশে পাশ্চাত্যের মতো কবি-সাহিত্যিকদের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেই। কবির সেই খেদ সত্য বটে, তবে তা কিঞ্চিৎ যেন নিরাময় হয় সেই উদ্দেশ্যে ভূঁইয়া ইকবাল প্রকাশ করেছিলেন শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি-চিত্র (জার্নিম্যান বুকস, ফেব্রুয়ারি ২০২০)। শামসুর রাহমান নিজেই তাঁর স্নেহভাজন ভূঁইয়া ইকবালকে নিজের কবিতার একটি খাতা উপহার দিয়েছিলেন; ১৯৮২-৮৫―এই কয় বছরে লেখা  বেশ কিছু কবিতা তাতে রয়েছে―‘প্রভাতী নামে একটি ছাত্র ব্যবহার্য ক্রাউন আকারের রুল-টানা খাতায় কবিতাগুলি লিখিত’। সেই খাতাটিই অবিকল (ফ্যাক্সিমিলি) মুদ্রণের মারফত সম্পাদক একালের পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। তিনি ভূমিকায় আরও জানিয়েছেন, ‘… এটা কবির কোনো পরিকল্পিত গ্রন্থ নয়। … এই সংকলনের ৭২টি ছোটো-বড়ো কবিতা বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে। কবিতাগুলো তাঁর নির্বাচিত নয়। …’ (পৃ. ৯)

আরও কয়েকটি নতুন সংকলনের পাণ্ডুলিপি নির্মাণের ভাবনা ছিল ভূঁইয়া ইকবালের। তাঁকে লেখা আনিুসজ্জামানের একটি চিঠি থেকে জানা যায়, তিনি যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের অকালপ্রয়াত অধ্যাপক ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের মেধাবী গবেষক সুবীর রায়চৌধুরীর বত্রিশটি নির্বাচিত গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত বাংলা-ইংরেজি রচনার সমন্বয়ে ভাষা থেকে সাহিত্য শীর্ষক একটি সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা করছিলেন। আরও দেখি, সাময়িকপত্র জিজ্ঞাসা-র বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮৯ সংখ্যায় প্রকাশিত অথচ অদ্যবধি অগ্রন্থিত আবু সয়ীদ আইয়ুবের প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতিসংকট না সংস্কৃতিসংঘাত ?―এবং প্রসঙ্গত’ তাঁর সংগ্রহ থেকে একটি ভূমিকাসমেত ছাপা হয়েছিল (কালি ও কলম, ফেব্রুয়ারি ২০২০); পূর্বোক্ত ভূমিকায় আইয়ুবের তাবৎ অগ্রন্থিত রচনার একটি তালিকাও তিনি দিয়েছিলেন সূত্রনির্দেশসহ। ধারণা করি, আবু সয়ীদ আইয়ুবের অগ্রন্থিত রচনাসমূহ এক মলাটে বেঁধে একটি সংকলন প্রকাশের ভাবনাও ভূঁইয়া ইকবালের ছিল। এছাড়া, তাঁর সংকলিত-সম্পাদিত আনিসুজ্জামানের অগ্রন্থিত রচনা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে―এমন খবর শুনেছি। কিন্তু হায়, ভূঁইয়া ইকবালের পরিকল্পিত কাজগুলো হাতে না পাবার খেদ কোনও দিনও যে মিটবার নয়।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares