শোকাঞ্জলি : শুধু লক্ষ্মী নয়, সময়েরও ব্যবচ্ছেদ : হামিদ কায়সার

লেখক-প্রকৃতি স্বভাবে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোথায় যেন দারুণ মিল আছে বুলবুল চৌধুরীর। ঠিক কোথায় ? শিল্প যেমন খানিকটা নিগূঢ় রহস্য―রোমাঞ্চে মোড়ান; চকিতেই ঠাহর পাওনটা মুশকিল ভিতরের অন্তর্মূল ধর্তব্যে; তেমনি এ-দুজন জাত ভ্যাগাবন্ড খানিকটা ছন্নছাড়া কালপুরুষের চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যের সাজুয্য নির্ণয়ও চট করে অসম্ভব! তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে দুজনই ছিলেন আইলসা, দুনিয়ার আইলসা। প্রাপ্ত প্রতিভা হাল নাগাদে বুলবুল  চৌধুরীর কাজের পরিমাণ তত নয়, যথেষ্ট কম। তুলনায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি অসামান্য ছোট-বড় উপন্যাস লিখে জনপ্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করেছেন, হয়ে আছেন কালজয়ী। তবে শরৎ-এর কাছ থেকে উপন্যাসগুলো লিখিয়ে নিয়েছিলেন বিচিত্রা সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। সবই যে উপেন্দ্রনাথ লিখিয়ে নিয়েছেন এমনও নয়, আরও-আরও সম্পাদকেরও জোরজবরদস্তি আছে। বুলবুল চৌধুরীর দুর্ভাগ্য যে, আমাদের দেশে উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সাগরময় ঘোষের মতো সম্পাদক জন্মাননি, কেউ তাকে একগাদা টাকা হাতে তুলে দিয়ে বলেননি, লেংটার মেলা ঘুরে এসে তুমি আমাদেরকে একটা উপন্যাস নামিয়ে দাও। ধারাবাহিক ছাপাব …

শরৎচন্দ্রের মতোই বুলবুল চৌধুরী ছিলেন খামখেয়ালিপনা স্বভাবের, বাউন্ডুলে বা ভ্রামণিক, সংসারধর্মে তেমন মন ছিল না, তবে সারা জীবন সংসারের পায়েই ছিল বেড়িবাঁধা। দু’জনই সমাজের ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাগণ কে কী বলবেন না-বলবেন, তার ধার ধারতেন না। নিজের খেয়ালখুশিমতো চলতেন। মিশতেন ভাগ্য বঞ্চিতাদের সঙ্গে অনায়াসে! তারই ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে রাজলক্ষ্মীর মতো অমর চরিত্র, আর বুলবুল চৌধুরী উপহার দিয়েছেন কোনও এক ঘরের ‘লক্ষ্মী’কে। হ্যাঁ, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে নামে দারুণ এক শিল্পসফল উপন্যাসে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন এমন এক নারীকে, যে ক্ষণকালের জন্য আমাদেরকে স্তব্ধ করে দেয়। ভাবায় জীবন ও যৌবন সম্পর্কে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে; ভদ্র-সজ্জন নামক আমাদেরকে বসিয়ে রাখে নিষিদ্ধ পল্লীর অবরুদ্ধ ঘরে!

গোয়ালন্দ নিষিদ্ধ পল্লীর এ-লক্ষ্মীর কাছে কিন্তু বুলবুল চৌধুরী একদিনে পৌঁছাননি। লক্ষ্মীর কাছে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই যখন তিনি পুরান ঢাকার কেএল জুবিলী স্কুলে পড়তেন, সেই তখন থেকে। বুলবুল চৌধুরী নিজেই অকপটে লিখে গেছেন সেসব কথা তার অতলের কথকতা নামের স্মৃতিনির্ভর বইতে। নিজের সম্পর্কে এমন অকপট উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যের খুব কম লেখকের কাছ থেকেই শুনেছি। এই ব্যতিক্রমের মধ্যে শরৎচন্দ্রও থাকবেন।

জুবিলী স্কুলে ক্লাস থ্রি থেকেই বুলবুল বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন আরেক কথাশিল্পী কায়েস আহমেদকে। ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগেনি। দু’জন অদলবদল করেছেন বই, হেঁটে বেড়িয়েছেন পুরান ঢাকার চারদিকের চৌহদ্দি। তো, কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়ার পর, যখন স্বপ্নের পসরা ভরা রঙিন যৌবন এল, তারই এক রোদজ্বলা বিকেলে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে … তারপর না-হয় বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতিকথা থেকেই জেনে নেওয়া যাক :

‘নবাববাড়ি হাতের ডানে ফেলে বাকল্যান্ড বাঁধ ধরে এগুতে এগুতে আমরা পৌঁছেছিলাম বাবুবাজারে। ডান পাশের চালের আড়তে টানান কিছু সাইনবোর্ড পড়ে জায়গাটার নাম আমরা জেনেছিলাম। কিন্তু কি আন্দাজে ছিল, একটু সামনেই মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত বেশ্যালয়টি আজও হতভঙ্গ টিকে আছে! কায়েস এবং আমি ডান দিকের ক-টা কলার দোকান পেরিয়ে গলির খানিকটা সুমুখে যেতেই ঘটনা অন্য রকম ঠেকল। এ যে দুদিকে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি মেয়েমানুষ। তাদের কেউ-কেউ দু’বালকের উপস্থিতিতে কেমন যেন আওয়াজ করে উঠেছিল। মুহূর্তেই হিমশিম খেয়ে পালাতে গিয়ে কায়েসকে পাশে পাইনি। সেইসঙ্গে আমি আত্মরক্ষা করতেও ব্যর্থ হই। কেননা, কে জানে কী ভেবে ইয়া মোটা এক বেশ্যা, বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরে, তেমন করে আমাকে লুফে নিয়েছিল ওর হাতের বেষ্টনীতে।’

এরপর দুজনের জন্য যেন নির্ধারিত হয়ে গেল দুটি পথ। কায়েস আহমেদ পালাতে সক্ষম হলেন এমন স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার জীবনের ঘেরাটোপ থেকে, আর বুলবুল চৌধুরী ব্যর্থ হলেন নিজেকে আত্মরক্ষা করতে! সেই যে ইঁদুরের মতো বেষ্টনীতে বাঁধা পড়লেন গণিকার, তার ঘের গিয়ে ঠেকেছে  ভৈরববাজার থেকে বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত বেশ্যালয়ে। এর প্রতিফলনও পড়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার। পরমানুষ, ডিম গল্প-দুটো তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেই ধারাবাহিকতারই পূর্ণাঙ্গ ও পরিণত রূপ উপন্যাস এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে!

২.

এই মাটির পৃথিবীতে এসে কেউ হয় রাজা কেউ হয় প্রজা, কেউ হয় সাধু কেউ হয় শয়তান, কেউ হয় পুলিশ কেউ হয় চোর, কেউ হয় বেশ্যা কেউ হয় সতী―কিন্তু এই যে হয়, কীভাবে হয় ? কেউ কি তাদের বানায়, নাকি স্বেচ্ছায় তারা এক একটা পরিচয় একেকজন নিজেদের সত্তার সঙ্গে নিজেই বেঁধে নেয়, ঝুলিয়ে রাখে নিজের গলে ?

ধর্ম বলে, সবই নিয়তি, পূর্ব নির্ধারিত। কে কী হবে না হবে সব আগেই ঠিক করা! যুক্তি বা বিজ্ঞান বা বস্তুবাদ বলে, মানুষের ভেতরে রয়েছে অসীম সম্ভাবনা, শক্তির আঁধার সে! যদি একজন মানুষ গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার অদম্য প্রাণশক্তি,  প্রচণ্ড ইচ্ছার জোর নিয়ে নিরন্তর সাধনা আর নিরলস পরিশ্রম করে চলে, তাহলে সে অবশ্যই তার কাঙ্খিত লক্ষ্যকে স্পর্শ করতে পারে―সে যা হতে চায়, অবশ্যই হয়! হ্যাঁ, সত্যি! মানুষ তার আপনাপন সাধনা আর কর্ম-জোরে যা হতে চায়, নিশ্চিত হতে পারে, বদলাতে পারে ভাগ্যের ফের, নিজেকে নিয়ে যেতে পারে সেই অনন্য উচ্চতায়, যে সীমা নির্ধারণ করে রেখেছে তার নিয়তি তার জন্য!

আবার সেই নিয়তির কাছেই আমাদের ফেরত আসতে হচ্ছে। হ্যাঁ, খুব সত্য, বিধির বিধান না যায় খণ্ডন! চরম ভাগ্যের বঞ্চনায় লক্ষ্মী নামের যে ছোট্ট শিশুটি নিশিপুর রেল স্টেশনে বাবা-মাকে হারিয়ে হিতেশ আচার্য-র পা ধরে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছিল এই পৃথিবীর ’পরে, সব রকম আশ্রয়ের পরম সত্তা লাভ করেও, তাকে আবার সেই নিয়তির কূটকচালেই ফিরে আসতে হলো পথে, হ্যাঁ যৌনপল্লী তো পথই, পথ-বেপথের মানুষেরই তো শেষ আশ্রয় গণিকালয়।

এই যে, যে-খেলাটা ঔপন্যাসিক খেললেন, পথে হারান লক্ষ্মীকে নতুন করে খুঁজে দিলেন পালিত বাবা-মা হিতেশ আচার্য আর যশোদা দেবীকে, দিলেন কৃত্তিকা দেবী-মিনতি দেবী-ধীমান ভট্টাচার্যের মতো উচ্চ শিক্ষিত তিন ভাইবোন, দিলেন পড়ালেখা করার সুযোগ, করালেন বিএ পাস, বিয়েও দিয়ে দিলেন এক বিত্তবানের কাছে; তারপর যেহেতু লক্ষ্মীর স্বামী বিভাস আচার্য অক্ষম পুরুষ, খানিকটা নপংসুক, যে কি না আবার হররোজ ফেনসিডিল গিলে―ফলে লক্ষ¥ী অতৃপ্ত থেকে যায় যৌনমিলনে, শেষে সেই অতৃপ্ত লক্ষ্মী পরিপূর্ণ এক সঙ্গমের ভেতর-তাড়নায় জড়িয়ে পড়ে স্বামী-বাড়িতে বেড়াতে আসা শ্বশুরের বন্ধু গৌরকিশোর মহলানবিশের সঙ্গে এবং ঠিকই পায় স্বর্গস্বাদ; তারপর আবার সেই নিষিদ্ধ ফল খাওয়াতেই পরিত্যক্ত হয় স্বামীর সংসারে, শিকার হয় দু’দুবার চরম শারীরিক নিপীড়নের এবং জীবন বাঁচাতেই শেষে পলায়ন স্বামীর ভিটে থেকে―এই যে ঔপন্যাসিক লক্ষ্মীকে স্বর্গের আনন্দনগর থেকে এক নিমিষেই দুর্বিষহ বিভীষিকাবাজারে হাজির করলেন, পাঠিয়ে দিলেন দৌলতদিয়া যৌন পল্লীতে―এসব তো বিধাতারই করার কথা। তিনিই তো জন্ম দেন মানুষের, তিনিই তো গড়ে দেন ভাগ্য, সেই ভাগ্য নিয়ে করেন ছিনিমিনি খেলা! সত্তাকে করেন বিম্বিত। তাহলে ঔপন্যাসিকের ঠিক দায়টা কোথায় ? তিনি কী মনে করে রচনা করতে এসেছেন উপন্যাস, কী অভিপ্রায়ে সত্তার অস্তিত্ব নিয়ে খেলছেন এমন নিঠুরতম খেলা ?

ঔপন্যাসিক আসলে বিধাতার গড়া জীবনচক্রকেই দৃশ্যমান করেছেন এ উপন্যাসে, সেই জীবনের ভেতর যারা যাপিত, তাদের অনুভূতি নিয়ে করেছেন খেলাধুলা, সেভাবেই জীবনটাকে সাজিয়ে নিয়ে একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তার প্রজ্ঞা তাকে পথ নির্দেশ করেছে।

যার প্রজ্ঞা যত শানিত ও তীক্ষè সে তত বেশি সত্তাকে যুক্তিগ্রাহ্য করে পাঠকের সামনে তুলে আনতে পারেন। সজ্জিত করতে পারেন শিল্পদক্ষতার অসামান্য বুননে! তারপর যেন ঔপন্যাসিক পাঠকের উদ্দেশে অদৃশ্য একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারেন, দেখো এবার জীবনকে তোমার টেবিলের ওপর ফেলে, পারলে কাঁটাছেঁড়া করো অথবা নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নাও। না, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে-র লক্ষ্মীর সাথে নিজের জীবনকে কেউ মিলিয়ে দেখতে চাইবে না! সে যে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছায়, নিয়তি নির্ধারিত চক্করে বেছে নিয়েছে যৌনপল্লীর জীবন, পতিতার তালিকায় লিখিয়েছে নিজের নাম!

আচ্ছা, ইচ্ছে করলেই কি এই ঘিনঘিনে জীবনবৃত্তে আসাটা এড়াতে পারত না লক্ষ্মী ? না পারত না, কেননা বিধাতা যে আগেই লক্ষ্মীকে পতিতালয়ে পাঠিয়ে বসে আছেন। বুলবুল চৌধুরী শুধু সেই জীবনটিকে অনুসরণ করেছেন। এখানে বলাটা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, তার এ উপন্যাসের চরিত্রটির দেখা পেয়েছিলেন দৌলতদিয়া ঘাট পতিতা পল্লীতে। আর লক্ষ্মীকে পাওয়ার চেয়েও বড় তাৎপূর্যপূর্ণ ছিল লক্ষ্মীর দরোজায় ওর হস্তাক্ষর খুঁজে পাওয়া। যেখানে লক্ষ্মী লিখে রেখেছিল, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’। মূলত এ লেখাটাই যে বুলবুল চৌধুরীকে উপন্যাসটি লিখতে তাড়িত করেছে, তা তিনি একাধিক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। ‘প্রতিবেশী আমিনুল হক অদ্ভুত খবর শুনিয়েছিল আমাকে। সে জানিয়েছিল যে, বেশ্যা লক্ষ্মীর সঙ্গে তার খাতির জমেছে। পুরুষকে ও সুখ দিতে জানে। তার চেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, ওর ঘরের দুয়ারে আলতা দিয়ে “এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে” কথাটা লেখা রয়েছে। তা পড়েই নাকি সে ওদিকটায় উঁকি দিয়েছিল। ভাবলাম এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে নাম দিয়ে একখানা গল্প বা উপন্যাস লিখি না কেন! শেখ আবদুল হাকিমকে জানালাম মনের ভাব। তিনি জবাব দিলেন, বুলবুল, বইয়ের এরকম নামের দামই তো কোটি টাকা হওয়া উচিত। তাঁর উক্তি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলল। তবে ব্যাপার হচ্ছে, বইয়ের নামের সঙ্গে বিষয়টার বিশেষ সঙ্গতি পাওয়া চাই। সেটাই যে জানা নাই। তাই সূত্র পেতে পৌঁছেছিলাম দৌলতদিয়ার বেশ্যা লক্ষ্মীর ঘরে। খেয়াল করলাম, ওর ঘরের দরজায় আলতা দিয়ে লেখা, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে। হরফগুলোর রং মরে এলেও অনায়াসে পড়া যায়।’

তবে উপন্যাসটি কিন্তু শুধু লক্ষ্মী-জীবনের ঘটনা নয়, আরও একজনের জীবনকে ওর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন বুলবুল চৌধুরী। আরেক হতভাগী নারীকে তার স্বামী নামের নিষ্ঠুর প্রাণীটি মেরে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে ছুরি বসিয়ে হাতের রগ কেটে দিয়েছিল, মুখের মধ্যে ঢেলে দিয়েছিল বিষ। ভাগ্যগুণে মেয়েটি বেঁচে যায়, তবে সে স্বামীর সংসারে আর ফিরে যায়নি। পথে পথে ঘুরেছে, বেঁচে থেকে বয়ে বেড়িয়েছে জীবনের গ্লানি। এই মেয়েটির জীবনও বুলবুল চৌধুরী গভীরভাবে দেখেছেন। সেটা অবশ্য দৌলতদিয়ায় নয়, পুরান ঢাকারই গলিঘুপচিতে!

এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে উপন্যাসটি বুলবুল চৌধুরী বয়ন করেছেন লক্ষ্মীর জবানিতে। লক্ষ্মী নিজের আত্মকথা লিখে পাঠককে পড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বোধ হয় পরোক্ষ থেকে নটী বিনোদিনী বুলবুল চৌধুরীর ওপর ভূমিকা রেখেছে। তিনি এক সময় নটী বিনোদিনীর জীবনের প্রতি মুগ্ধপাঠ নিয়েছেন। এ সম্পর্কে বিশদ লিখেছেনও।

উপন্যাসটির পাঠ নিতে গিয়ে মাঝে মধ্যে পাঠকের মনে হতে পারে, কোথাও কোথাও পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তখনই যদি পাঠক খেয়াল করেন, এটা সরাসরি লেখকের বিশ্লেষণ বা বর্ণনা নয়। লক্ষ্মীর জবানি। ওর জবানির ভেতর দিয়ে কাহিনি শিল্পসার্থকতা লাভ করে ক্রমপরিণতির দিকে আগাচ্ছে। আর একজন লেখক নয়, পতিতার জীবনকাহিনি যখন আপনি তার কাছ থেকে শুনতে থাকবেন, পুনরাবৃত্তি আসাটাই তো স্বাভাবিক, খানিকটা যদি বর্ণনায় শিথিলতাও থাকে, সেটাও উপন্যাসের একটি শিল্পসৌন্দর্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে! 

এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে-র সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, এ লক্ষ্মীর পাঁচালী হলেও এর মূল ভাবটি শুধু লক্ষ্মী জীবনকেন্দ্রিক থাকেনি। উপন্যাসের কুশলী শিল্প বিন্যস্ত হাতে যেভাবে উপন্যাসটিকে সাজিয়েছেন এবং হিতেশ আচার্য ও যশোদা দেবীসহ তাদের পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের ভিতর-বাহির চিত্রিত করেছেন এবং বিভাস আচার্যের পারিবারিক পটভূমিকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে এনেছেন; সর্বোপরি বিলনা অঞ্চলকে ঘিরে বাংলাদেশের একটা প্রাকৃতিক ছবির রূপরস ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও জড়ো করেছেন এবং পতিতা পল্লীর পরিবেশকেও এনেছেন খানিকটা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে … সব মিলিয়ে এই ঘরে লক্ষ¥ী থাকে উপন্যাস পাঠের পর আমাদেরকে বৃহত্তর একটি ভাবনা বুক মুচড়ে দেয়; জীবন আসলে শেষাবধি আমাদেরকে কী দেয় ?

আজ করোনা প্রেক্ষাপটে আমরা যখন উপন্যাসটি পড়ব, তা আরও তাৎপর্যবাহী হবে। লক্ষ্মী যখন স্বামীর অত্যাচারে বাড়ি থেকে পালাল, তখন আর তার যাওয়ার মতো কোনও জায়গা নেই। পালিত পিতা-মাতা হিতেশ আচার্য ও যশোদা দেবী দু’জনই মারা গিয়েছেন। ধীমান তো পড়তে গিয়ে দেশেই এল না, বাবা-মার মনে আঘাত দিয়ে ভিন্ন দেশের এক মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই থিতু হলো। কৃত্তিকাও নিজ বিবরে নিমজ্জমান স্বপ্নভাঙা বিয়ে ও কর্মময় জীবনের ব্যস্ততা নিয়ে। আর যৌবনে বহু প্রেমিকখেলান মিনতি দেবী তো আগেই ঘরছাড়া। লক্ষ্মী কার আশ্রয়ে যাবে। যার দ্বারা জীবনের এত বড় সর্বনাশটা হলো সেই গৌরকিশোর মহলানবিশও দায়িত্ব এড়িয়ে শুধু দার্শনিকতা ফলাল …‘সবই ভবিতব্য রে মা, ভবিতব্য!’ তাহলে লক্ষ্মীর ঠাঁই হবে কোথায় ? সেই ট্রেন স্টেশনেই বিপন্নতার ভেতর যে ওকে প্রথম আশ্রয়ের ঠিকানা দিল, তার কাছেই সঁপে দিত চাইল আপন সত্তাকে। এই যে নিঃসংশয়িতভাবে সে গণিকা পল্লীর কাছে সঁপে দিল নিজেকে, একটুও কাঁপেনি ওর হৃদয়, কেননা যা অনিবার্য, তাকে কে থামায়! ঈশ্বরের প্রতি অভিমানেও কি নিজের জীবনকে এভাবে বিলিয়ে দিল পরপুরুষের ভোগে ? যে ঈশ্বর জন্মের পরেই আপন বাবা-মায়ের কাছ থেকে ওকে করেছিল বিচ্ছিন্ন! এমনকি সারাজীবন জানলও না কে তার বাবা-মা!  

এ রকম অনেক এবং বিবিধ প্রশ্নের সম্মুখেই পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিতে সমর্থ এই ঘরের লক্ষ্মী থাকে নামের উপন্যাসটি। সর্বোপরি একজন আধুনিক মানুষের সংকটকে এভাবে চিহ্নিত করে, শেষাবধি তার আশ্রয়ের কোনও ঠিকানা থাকে না। নিয়তির ফেরে হোক আর আপন কর্মদোষে, মানুষ তার চিবুকের মতোই একা নিঃসঙ্গ। বুক হাহাকার করা এ উপলব্ধি দিয়ে এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে উপন্যাস পাঠককে একটা ঝাঁকুনি দিতে সমর্থ হয়। এই যে আশ্রয়হীনতা―এর মুখোমুখি বুঝি প্রতিটি আধুনিক মানুষকেই দাঁড়াতে হয়। কারও অভাব ঘরের, কারওর অভাব মানুষের! একজন মানুষকে আঁকড়ে ধরে যে লতার মতো বাড়বাড়ন্ত হবে―তেমন বৃক্ষ নেই! নেই ছায়া, ডালপালা! এই রিক্ত হাহাকার উপন্যাসটি পাঠকের ভেতর ছড়িয়ে দেয়। 

৩.

খুব বেশি উপন্যাস বুলবুল চৌধুরী লেখেননি। ছোটগল্প দিয়েই শুরু হয়েছিল তার সাহিত্যিকী-যাত্রা। সৃষ্টি করেছেন টুকা কাহিনী-র মতো অসাধারণ এক গল্প। সর্বার্থেই প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ টুকা কাহিনী বাংলা সাহিত্যের সেই অমূল্য গ্রন্থ, যার প্রতিটি গল্প বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক বিশ্বস্ত রূপায়ণ। বাংলাদেশের গ্রামকে এমন আমূল নাড়িসুদ্ধ দেখাতে কম লেখকই পেরেছেন! এরপর লিখেছেন আরও দুটো গল্পের বই, পরমানুষ এবং মাছের রাত।

নিজের খামখেয়ালিপনা স্বভাব ও জীবন-জীবিকার টানাপড়েনে তার লেখক জীবন বারবারই বিঘ্নিত হয়েছে। এই সংকট নিয়েই তিনি যাই বলে একটি উপন্যাস লিখে সাহিত্য-চর্চা থেকে বিদায়ই নিয়ে বসেছিলেন। যাই-এ ছিল সাহিত্য ছাড়ার নেপথ্য কারণও। পরে যাই তিনি বাজার থেকে উঠিয়ে কোথায় যে আত্মসাৎ করে রেখেছেন, সে বইয়ের হদিস আর কারও পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। আর লেখালেখিতে ফিরে এসেছেন কহ কামিনী উপন্যাসের মাধ্যমে। তারপর, আমাদের সাহিত্যজগৎ তাকে বরণ করে নিলেও তিনি তার আপন স্বভাব ধর্মেই লেখালেখি করেছেন ধীর লয়ে। তারপরও বাংলাদেশের কথাশিল্পের জগৎ তার পাপপুণ্যি, ইতু বৌদির ঘর, ঘাটের বাঁও, তিয়াসের লেখন, মরম বাখানি, ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান, পাখিটি ছাড়িল কে, জলটুঙ্গির মতো উপন্যাস পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। যেসব রচনা তার নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও শৈলীকে তুলে ধরে।

বুলবুল চৌধুরীর মনোযোগ কিছুটা শিশুসাহিত্যেও ছিল। লিখেছেন গাঁও গেরামের গল্পকথা, প্রাচীন গীতিকার গল্প। তার কলাম মানুষের মুখ একটি সমাদৃত বই। অতলের কথা আর জীবনের আঁকিবুকি বই দুটিতে ছড়িয়ে আছে জীবনের অনেক স্মৃতিকথা।

 লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares