শোকাঞ্জলি : সংগীতের বরপুত্র ফকির আলমগীর : গোলাম কুদ্দুছ

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফকির আলমগীর। তার একাত্তর বছরের জীবনকে তিনি রাঙিয়ে তুলেছিলেন মানুষের প্রতি গভীর মমতা আর দেশকে ভালোবেসে। কত বৈচিত্র্য আর বহুমাত্রিকতায় হৃদ্য তার জীবন। কি অভিধায় অভিষিক্ত করব তাঁকে ? একজন মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার বটবৃক্ষ, লেখক, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আপসহীন ব্যক্তিত্ব ? যাপিত জীবনের কষ্ট-বেদনাকে বাণী আর সুরের মায়াজালে শৃঙ্খল ভাঙার মায়াহীন শক্তিতে পরিণত করার অতুলনীয় ক্ষমতা, বিরুদ্ধ ও পারিপার্শ্বিকতাকে হতচকিয়ে দিয়ে নিজের উপস্থিতিকে জানিয়ে দেবার উজ্জ্বল ক্ষমতা ফকির আলমগীরকে এক ভিন্ন মাত্রায় অধিষ্ঠিত করেছে। সংগীতের বিভিন্ন ধারায় অবগাহন করলেও গণসংগীতই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান আর জীবনের চালিকাশক্তি।

বাঙালির আপনজন, গণসঙ্গীতের বরপুত্র, বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ফকির আলমগীর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৩ জুলাই ২০২১ এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সুঠাম দেহের অধিকারী চির তরুণ ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে হতবাক দেশবাসী। দেশে-বিদেশে লক্ষ-কোটি ভক্তের হৃদয়ে হয়েছে রক্তক্ষরণ। প্রিয়জন হারানোর ব্যথা অনুভব করেছে প্রতিটি মানুষ। অর্থ-বিত্ত ক্ষমতার দম্ভ দিয়ে যা পাওয়া যায় না ফকির আলমগীর তাই পেয়েছেন শুধুমাত্র নিঃশঙ্কচিত্তে মানুষকে ভালোবেসে।

আমরা এবার সংক্ষেপে জেনে নিতে চাই ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃদা গ্রামে জন্ম নেয়া আলমগীর কীভাবে আজকের ফকির আলমগীরে পরিণত হলেন। ফকির আলমগীরের বাবার নাম হাসান উদ্দিন ফকির। মাতা―হাবিবুন্নেছা। ভাইয়েরা পাঁচজন। তারা হলেন―ফকির আব্দুল কাদের, ফকির আব্দুল জলিল, ফকির জাহাঙ্গীর, ফকির আলমগীর ও ফকির সিরাজ। স্ত্রী সুরাইয়া আলমগীর, ডাকনাম বনলক্ষ্মী। তাদের ভালোবাসার বিয়ে ছিল প্রকৃত শান্তির নীড়। তিন ছেলে―রানা, রাজিব ও রাহুল।

ছাত্র রাজনীতি

ফকির আলমগীর ভাঙ্গা থানার কালামৃদা গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ১৯৬৬ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। গান বাজনার সাথে বাঁশী তার নিত্যসঙ্গী হলেও এখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন। এসময় দীপ্ত কণ্ঠে স্লোগান দেন―

‘তোমার আমার ঠিকানা―পদ্মা মেঘনা যমুনা’

‘তুমি কে আমি কে―বাঙালি বাঙালি’

‘জেলের তালা ভাঙব―শেখ মুজিবকে আনব’

‘ছাত্রদের ১১ দফা―মানতে হবে মানতে হবে’

এ সময় থেকে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন ফকির আলমগীর।

নির্বাচিত হন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা নগর কমিটির সভাপতি। একাত্তরের উত্তাল সময়ে রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ফকির আলমগীর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে একজন শব্দসৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করা এবং সাধারণ মানুষের মনোবল অক্ষুণ্ন রাখায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল সঞ্জীবনী সুধার মতো। ফকির আলমগীরের ছাত্র জীবন একভাবে চলেনি। ঐ যে ছাত্র রাজনীতি, সংগীত, বংশীবাদনে তার স্বভাবসুলভ ব্যস্ততা-নিমগ্নতা। ফলাফল― উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল। থাকতেন খিলগাঁওয়ে বড় ভাইয়ের বাসায়। ক্ষেপে গিয়ে তিনি বললেন―তোমার আর এখানে থাকা চলবে না। ফিরে গেলেন বাড়ি। বাবা এবং বড় ভাইয়েরা বললেন, গ্রামে থেকে কোনও কাজ নেই―তুমি বরং ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনায় মন দাও। পুনরায় ফিরে এলেন ঢাকায়। অভিমানী ফকির আলমগীর বড় ভাইয়ের বাসায় এবার না-উঠে এখানে ওখানে থাকতে লাগলেন। কিছুদিন থাকলেন তোপখানা রোডে ভাসানী ন্যাপের অফিসে। এরপর শান্তিবাগে ওয়ার্ক ক্যাম্প অ্যাসোসিয়েশনের লাইব্রেরিতে একটি পার্টটাইম চাকরি নিলেন। বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা। মাসিক বেতন ৫০ টাকা। থাকার ব্যবস্থা হলো এখানে। এরপর বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের দেলোয়ার হোসেন পারভেজ তাকে খিলগাঁও পল্লীমা সংসদ-এর কাছে এক মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। জগন্নাথ কলেজ ঢাকার এক সময়ের সর্ববৃহৎ কলেজ। ঢাকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর পুরোনো ঢাকার এই কলেজটি বড় ভূমিকা পালন করত। স্বাধীনতা লাভের পর ফকির আলমগীর উঠলেন রথখোলায় অবস্থিত জগন্নাথ কলেজের হোস্টেল এস আর হলে। তার রুমে ছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আখতারুজ্জামান। ১৯৭৪ সালে ছাত্রনেতা ফকির আলমগীর বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি অবশ্য সে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। জগন্নাথ কলেজ থেকে বি. কম. পাস করে ফকির আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র―এখান থেকে তিনি সাংবাদিকতায় মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাংস্কৃতিক জীবন

ফকির আলমগীরের শিল্পীজীবনের মূলে রয়েছে মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। অসাম্প্রদায়িক সমাজ চেতনা, প্রগতি এবং শোষণমুক্তি ছিল তার শিল্পভাবনার অন্দরমহলের বৈঠকখানা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা, নানা ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আয়োজন, সঙ্গীতে তার নিজস্ব ধরন ও প্রয়োগ―সবকিছু মিলিয়ে ফকির আলমগীর একটা গতিপথ নির্মাণ করেছিলেন। এ পথে তিনি দুরন্ত গতিতে হেঁটেছেন―সহযোদ্ধা এবং অনুজদের অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৬৭ সালের শুরুর দিকে ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী আমানুল হকের মতানুযায়ী ১৯৬৭ সালের ২১, ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার হাসান পারভেজ। সহ-সভাপতি ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, খান আতাউর রহমান ও আব্দুল লতিফ প্রমুখ। সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন―অজিত রায়, শুভ রহমান, মহসিন শস্ত্রপাণি, পিনাকি দাস ও অন্যান্য। ফকির আলমগীর ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে এ সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। সাংগঠনিকভাবে সংস্কৃতিচর্চার তখন থেকেই শুরু। বিশ্ববরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে এসে নিজেকে পরিশীলিত করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও শোষণ মুক্তির চেতনায় নিজেকে যুক্ত করার অঙ্গীকারাবদ্ধ হন। ছাত্র রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন দুই ক্ষেত্রেই সমানভাবে এগিয়ে যেতে থাকলেন। এল ৭১―অগ্নিঝরা দিন। বাঙালির মুক্তি আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিলেন ফকির আলমগীর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে রাখলেন জাতির জন্য অসামান্য অবদান। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাঙালির বিজয় অর্জিত হবার পর ফিরে এলেন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পুরোজাতি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা সর্বত্র। ফকির আলমগীর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্পী―এ সময় তার করণীয় কি ? হাজার বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতি লালন ও বিকাশে নিজেকে সঁপে দিলেন। এ সময় পাশ্চাত্যের পপ সঙ্গীতের ঢেউ এসে দোলা দিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেও। তারুণ্যের আগ্রহ আর উন্মাদনাকে সবসময় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ-এর মত অনুযায়ী―স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘স্পন্দন’ গঠিত হয়। রিনা, নিপু, অপু―তিন ভাইবোন এবং ফিরোজ সাঁই এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী। পরবর্তী ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ, আজম খান এবং ফকির আলমগীর এই সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালের শেষদিকে আজম খানের উদ্যোগে ‘উচ্চারণ’ নামের একটি সংগঠন গঠিত হয়। ফকির আলমগীর কিছুদিন এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর নিজেই প্রতিষ্ঠা করলেন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। শিল্পীদের স্মৃতিতে-হৃদয়ে তখনও মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তস্রোত প্রবহমান। গানের বাণী আর সুরের জাদুতে তার বহুমাত্রিক প্রকাশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যের সুরের সাথে বাংলা লোকসংগীতের মেলবন্ধনে তৈরি হতে থাকে কালজয়ী এক একটি গান। জৈবিক উন্মাদনা সৃষ্টি নয়, মানবিক আবেদন এবং নিষ্পাপ ভালোবাসায় অবগাহন করার সুযোগ পেল তারুণ্য। সময়ের বাস্তবতায় ১৯৭৬ সালে ফকির আলমগীর এর ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী প্রথমদিকে ব্যান্ড দল হিসেবে পরিচিতি পেলেও শিগগিরই ফকির আলমগীরের মানোজগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। তিনি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন ভারতীয় গণনাট্য সংস্থা সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বাংলাদেশের শেখ লুৎফর রহমান, আব্দুল লতিফ এর বিপ্লবী সত্তাকে। তাদের বিখ্যাত জনপ্রিয় সংগীত-এর পাশাপাশি অসংখ্য নতুন গান দর্শক শ্রোতাদের উপহার দিতে লাগলেন। খেটে খাওয়া গরিব-দুখী মেহনতী মানুষের জীবন কথা তাঁর কণ্ঠে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী ফকির আলমগীর সমকালীন বিষয়কে নিয়েও অসংখ্য গান পরিবেশন করেছেন। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে শুধু ব্যাপক পরিচিতি নয় উন্মাতাল ভালোবাসায়ও সিঞ্চিত করেছে।

ফকির আলমগীর বিশ্বাস করতেন, নিজের অস্তিত্বকে অবজ্ঞা অবহেলা করে কখনও আধুনিক-আন্তর্জাতিক হওয়া যায় না। শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১৯৮৩ সাল থেকে রমনায় শিশুপার্কের সামনে নারকেল বিথী চত্বরে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ সকালবেলা আয়োজন করতেন বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ১৯৮৪ সালে গঠিত হওয়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের শুরু থেকেই নিজেকে যুক্ত করে নিলেন এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে। মৃত্যু অবধি ফকির আলমগীর ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি। জোটের সংগ্রাম―সৃজনের সকল কার্যক্রমে তার উপস্থিতি আমাদের অনুপ্রাণিত করত। মুখের উপর সত্য বলার সাহস তাকে এনে দিয়েছে আলাদা সম্মান। তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কেউ এমনিতেই অধিকার দেয় না তা আদায় করে নিতে হয়।

বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণসঙ্গীতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর সে তাগিদ থেকেই আমরা কিছু মানুষ ফকির আলমগীরকে সামনে রেখে ২০০৭ সালে গঠন করি বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ। এই পরিষদের সভাপতি ফকির আলমগীর এবং আরেক মুক্তিযোদ্ধা গণসঙ্গীতশিল্পী মাহাবুবুল হায়দার মোহন সাধারণ সম্পাদক। ২০১২ সালের ২৩ মার্চ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন মাহবুবুল হায়দার মোহন। গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ ঝিমিয়ে পড়া গণসঙ্গীতের ধারাকে বেগবান-উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে নিঃসন্দেহে। সারাদেশের গণসংগীতের দলগুলোকে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ এবং নতুন নতুন শিল্পী ও সংগঠন গড়ে তোলায় প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জনপ্রিয় এবং জনবান্ধবশিল্পী হিসেবে ফকির আলমগীর গণসঙ্গীত উৎসব আয়োজন এবং সফল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশব্যাপী আয়োজিত এ উৎসবে প্রায় আড়াইশ’ গণসঙ্গীতের দল এবং তিন হাজারের অধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করে। তাকে সামনে রেখেই ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় জাতীয় গণসঙ্গীত উৎসব। এ উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গণসঙ্গীতের দল এবং একক শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় দিবসসমূহ, মে দিবস এবং অন্য শিল্পীদের স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের দায় শোধ এবং নিজেদের হৃদ্য করার নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে ফকির আলমগীরের নেতৃত্বে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ। একজন শিল্পী সংগঠক হিসেবে ফকির আলমগীর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন, গণজাগরণ মঞ্চ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও শ্রেণি-পেশার আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন।

চিরায়ত বাংলার লোকসুর ফকির আলমগীরের সঙ্গীতকে এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছে। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনাকে তিনি গানের উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখানে তার গাওয়া কালজয়ী কয়েকটি গানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। ‘সখিনা’ তার গানের এক বড় অংশজুড়ে রয়েছে। তাঁর গানের এই সখিনা বাংলার বঞ্চিত লাঞ্ছিত লাখো নারীর প্রতীক হয়ে উঠেছে। শুধু সখিনাকে নিয়ে তার গাওয়া গানের ছয়টি সিডি রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখ করতে চাই―‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ এই গানটির কথা।

ফকির আলমগীরের কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে :

‘মায়ের একধার দুধের দাম’

‘মানুষের মাঝে বসবাস করি’

‘মুজিব আমার স্বপ্ন সাহস মুজিব জাতির পিতা’

‘নাম তার ছিল জন হেনরি’

‘কালো কালো মানুষের দেশে’

‘মানুষ ও বানাইয়া খেলছ যারে লইয়া’

‘দুই পাহাড়ের মাঝে মাওলা মসজিদ বানাইছে’

জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ফকির আলমগীর তাৎক্ষণিকভাবে গান গেয়েছেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বহু গান ফকির আলমগীর তার কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ফকির আলমগীর গেয়েছেন :

‘আসাদ জোহা আর শত শহীদের

রক্ত নিশান দেখেছি

তাই তো মোরা সবকিছু ভুলে

এক মিছিলে মিলেছি’।

প্রায় একই সময়ে সাধন ঘোষ এর লেখা আরেকটি বিখ্যাত গান ফকির আলমগীরের কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে :

‘বাংলার কমরেড বন্ধু

এইবার তুলে নাও হাতিয়ার’।

১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে রাস্তায় মিছিলে এসেছিলেন যুবক নূর হোসেন। পুলিশের গুলিতে শহিদ হলো তরতাজা নূর হোসেন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনায় ফকির আলমগীর গাইলেন :

‘নূর হোসেনের রক্তে লেখা

আন্দোলন এর নাম’।

মুষলধারে বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ায় ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি ভবন ধসে ৪০ জন ছাত্রের মৃত্যু হয়। সেই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আরেকটি বিখ্যাত গান ফকির আলমগীরের কণ্ঠে শুনতে পাই :

‘কষ্টের কথা বলতে গেলে

তোমরা বলো রাজনীতি

ছাদ ধসিয়া ছাত্র মরে

এইটা দেশের কোন নীতি’।

নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে নিহত কিশোরী শবমেহেরের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং ষড়যন্ত্র নিয়ে ফকির আলমগীর গাইলেন রুদ্রের লেখায় :

‘শবমেহেরকে যে বানাইছে

সেই মাইরাছে তারে

সেই দাঁড়াইছে

আন্দোলনের প্রথম কাতারে।’

১৯৮৮ সালে মহাপ্লাবনে বাংলাদেশের এক বড় অংশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকায় এ সময় নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। মানুষের কষ্টের কোনও সীমা-পরিসীমা ছিল না। এ সময় ফকির আলমগীর গাইলেন :

‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে কইমুনা তো আর

এমন পানি দিলা তুমি ভাসলো ঘর দুয়ার।’

২০১৬ সালে কুমিল্লার ময়নামতিতে ধর্ষণের শিকার নিহত নাট্য ও আবৃত্তিশিল্পী তনু হত্যার বিচার দাবি করে ফকির আলমগীর গাইলেন :

‘প্রায় প্রতিদিন কত তনুই হচ্ছে দেখো লাঞ্ছিত

আমাদের ভাই-ভগ্নি মরে কত যে ভাই রক্ত ঝরে

ওরে মরছে রাজন মরছে তনু

মরছে কত মায়ের ধন।’

সাভারে রানা প্লাজা বিধ্বস্ত হয়ে মারা যায় অসংখ্য গার্মেন্ট শ্রমিক। মালিকের খামখেয়ালিপনা আর অর্থলোভের শিকার হয়ে শত শত শ্রমিক পঙ্গুত্ব বরণ করে। রানা প্লাজার এই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে শ্রমিকের বন্ধু মানবতার ফেরিওয়ালা ফকির আলমগীর গাইলেন :

‘জন্মিলে মরিতে হবে আছে সবার জানা

কে জানি তো এমনি মরণ আবার দেবে হানা।

চোখ বুজিলে সামনে আসে স্বজন হারার মুখ

হায়রে বিধি মেললি কেন এমন দুঃখের ডানা

কে জানি তো এমনি মরণ আবার দেবে হানা।

সাভার এখন থমকে আছে বইছে মৃত্যু ভার

রানা প্লাজায় খুনের দৃশ্য সহ্য হয় বা কার।’

সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। এসময় ফকির আলমগীর গাইলেন―

‘ওরে ভাসাইলিরে ডুবাইলিরে

মনপুরা সন্দ্বীপ উড়ির চরেরে।’

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নাম গোত্রহীন শিশু―যাদের শিল্পী রফিকুননবী নাম দিয়েছেন ‘টোকাই’। সেই টোকাইদের নিয়ে ফকির আলমগীর গাইলেন :

‘আমার নাম আছে ঠিকানা নাই

বাঁইচা আছি জীবন নাই

ও হো আমি যে টোকাই।’

শোষক নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফকির আলমগীরের ঘৃণা চিরদিনের। তিনি তা রেখে ঢেকে রাখতেও চাননি কখনও―কারণ আপস তার চরিত্র বিরুদ্ধ। আর তাই তিনি গাইলেন―

‘মানুষের মতো দেখতে হলেও মানুষ তোমরা নও

দানবের মত ব্যবহার দিয়ে মানুষ হতে চাও।’

জাতীয় কবিতা উৎসবের শুরু থেকেই ফকির আলমগীর যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ঢাকায় আয়োজিত প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসবের স্লোগান ছিল ‘শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা।’ প্রথম কবিতা উৎসব থেকে সর্বশেষ কবিতা উৎসব পর্যন্ত এর অধিকাংশ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গীত গীত হয়েছে ফকির আলমগীরের নেতৃত্বে।

সরকারি-বেসরকারিভাবে আমন্ত্রিত হয়ে পৃথিবীর বহু দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন ফকির আলমগীর। নিজের জনপ্রিয় গান এবং আমাদের লোকসঙ্গীতকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না কখনও।

লেখক ফকির আলমগীর

শুধু সঙ্গীত নয় একজন লেখক হিসেবেও ফকির আলমগীর তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর লেখার বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য মনোমুগ্ধকর। সঙ্গীত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, বরেণ্য ব্যক্তিদের স্মৃতি, একজন পরিব্রাজকের দৃষ্টিতে বিশ্ব দেখা―তাঁর লেখনীর পরতে পরতে পাঠককে দোলা দিয়ে যায়। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো―মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের গান, গণসঙ্গীত ও মুক্তিযুদ্ধ, গণসঙ্গীতের অতীত ও বর্তমান, বাংলার লোকসঙ্গীত, পপ গানের সেকাল একাল, স্মৃতি আলাপনে মুক্তিযুদ্ধ, ইউরোপের পথে পথে, স্মৃতি কাব্যে প্রিয় মুখ, সুরমা নদীর গাংচিল, মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুরা, চেনা চীন, যারা আছে হৃদয়পটে, নির্বাচিত প্রবন্ধ, এহরাম থেকে আরাফাত এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আমার কথা।

প্রকাশিতব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে―

সংস্কৃতিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশ দেশান্তর, লাল সবুজের মুক্তি সংগ্রাম এবং মায়ের মুখ।

ফকির আলমগীরের চিন্তা এবং কর্ম ছিল প্রসারিত। শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনও বরেণ্য ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাৎক্ষণিকভাবে ফকির আলমগীর তাকে নিয়ে লেখা তৈরি করে পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতেন। পাঠকেরা তাঁর লেখা পড়ে অনেক সময় প্রয়াত মানুষটি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারতেন। জন্মদিন-মৃত্যুদিন নিয়েও তার লেখার কোনও কার্পণ্য ছিল না। প্রয়াত বরেণ্য ব্যক্তিদের মনের স্মৃতি কোঠায় রেখে দেয়ার তাঁর এ প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তার খিলগাঁওয়ের বাসাটি যেন একটি আর্কাইভ। বাসার নিচতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে যতই উপরে উঠবেন আপনার পদ-যুগল ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াবে। দেশ-বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তি এবং ঘটনার কত হাজার ছবি যে তার সংগ্রহে আছে তা কল্পনাও করা যায় না। পুরো বাসার দেয়াল-সিঁড়ি জুড়ে ইতিহাসের সেই মুহূর্তগুলোকে তিনি পরম যত্নে বাঁধিয়ে রেখেছেন। আজ তিনি নেই―কিন্তু এই ঐতিহাসিক দলিলগুলোর কী হবে ? ফকির আলমগীর সংগ্রহে রাখলেও এগুলো জাতীয় সম্পদের অংশ। আমি মনে করি, ইতিহাসের এই স্মারকগুলো সংগ্রহে রাখার ব্যাপারে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। শুধু আবেগ দিয়ে অবৈজ্ঞানিকভাবে এসব ছবি এবং ডকুমেন্টগুলো বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। আমি মনে করি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের উচিত হবে পরিবারের সাথে আলোচনা করে এ বিষয়টির একটি সুন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

সম্মাননা

ফকির আলমগীর ১৯৯৯ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংগঠন তাকে অসংখ্যবার সম্মাননা বা পদকে ভূষিত করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো―ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত ‘মহা সম্মাননা পদক।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- এর হাত থেকে ফকির আলমগীর এ পদক গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি শেরে বাংলা পদক, ভাসানী পদক, মাওলানা তর্কবাগীশ পদক, কবি জসীমউদদীন পদক। ত্রিপুরা রাজ্য সরকার প্রদত্ত ‘ত্রিপুরা সংস্কৃতির সমন্বয় পুরস্কার’ গ্রহণ করেন। আরও পেয়েছেন ‘সিকোয়েন্স এওয়ার্ড অফ অনার’, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘ঢালিউড এওয়ার্র্ড’ চ্যানেল আই ‘মিউজিক এওয়ার্ড’।

ফকির আলোমগীর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা পেয়েছেন মানুষের কাছ থেকে। জীবিত এবং মৃত দুই অবস্থায় মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় অবগাহন করেছেন-সিক্ত হয়েছেন।

তাঁর চিরচেনা ‘তালতলা কবরস্থানে’ অনন্তকালের জন্য তাঁকে শুইয়ে দেয়া হয়। কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর হলেন বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান।

স্বদেশপ্রেম-অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, শোষণমুক্তি আর চিরায়ত বাংলার লোকমানসের পতাকাবাহী ফকির আলমগীর যুগ যুগ ধরে তরুণ প্রজন্মের অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

লেখক : গবেষক ও

সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares