মাহবুব বারী

জলবিম্ব

১.           একটি দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘদিন অত্যন্ত সংগোপনে রেখেছিলাম

              দুরন্ত এক বাতাস তাকে নিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে দিল।

২.          আমার বিপন্নতার কথা আর কী বলব বন্ধু

              ঈশ্বর আর আমার প্রেমিকার মধ্যে সেই পুরোনো লড়াই

              আমি কার হাতের পুতুল, কার কথায় নাচি।

৩.          কত ভাগ্যাহতদের দেখলাম,

              আমার সৌভাগ্য,

              তাদের কাফেলায় আমার নামও আছে।

৪            যারা পানপাত্রে বিভোর তাদের মূর্খতা দেখে

              আমার করুণা হয়, তারা তোমাকে দেখেনি।

৫.          কী করে আমার এই অস্থিরতা দূর করব, বলে দাও

              তোমাকে না পেয়ে যেমন অস্থির ছিলাম

              এখন পাওয়ার পরেও কমছে না অস্থিরতা।

৬.          প্রেমে মস্তক সমুন্নত রাখাই বড় সমস্যা

              শুধু প্রণতি প্রণতি প্রণতি।

৭.          জানি না কীসের আশায়

              দেবতারা সমুদ্র মন্থন করেছেন

              তাদের এই মূঢ়তার জবাব

              জানে শুধু নারীরা আর

              অভিজ্ঞ পুরুষেরাই জানে অমৃতের স্বাদ আছে

              তাদের দেহের পরতে পরতে আর অবিরাম মন্থনে।

৮.          যখন জ্বরা এসে ধরা দেয়

              তখনও এই হৃদয় প্রদীপের মতো জ¦লতে থাকে

              যদি হারানো এই পথে আবার ফিরে আসো।

৯.          আমার এই অদ্ভুত আচরণে আমিই স্তম্ভিত

              কখনও পুণ্যাত্মা হয়ে মসজিদে

              আবার কখনও শহরের নামকরা গলিতে।

১০.        আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন, কেমন সুখের কে জানে

              দেহের সঙ্গে দেহের মিলনই আমার কাছে অপার্থিব মনে হয়।

১১.         যে স্পর্শে জেগে ওঠে দেহ-মন-প্রাণ

              আজ সেই স্পর্শেই মৃত্যু।

১২.        হে হৃদয়, তুমি আর ঘর বেঁধো না

              তুমি তো পাখি, জানো তো

              বন্ধনে শুধু তিক্ততাই বাড়ে।

১৩.        তুমি কে বন্ধু

              ভালোবাসা দিয়ে আমার চোখ খুলে দিলে

              আর সেই ভালোবাসা দিয়েই

              আমাকে করেছ অন্ধ।

১৪.        আমার চোখ দুটি যদি শুধুই চোখ হতো

              তাহলে কতই না ভালো হতো

                                           কিন্তু তারা কেবলি ভ্রমর হতে চায়।

১৫.        কী করে আমার এই অস্থিরতা দূর করব, বলে দাও

              তোমাকে না পেয়ে যেমন অস্থির ছিলাম

              এখন পাওয়ার পরেও কমছে না অস্থিরতা।

১৬.       তার চোখ দেখে একদিন দৃষ্টি হারিয়েছিলাম

              এই অন্ধত্বই ভালো বন্ধু

              যদি দৃষ্টি ফিরে পেয়ে আবার অন্ধ হয়ে যাই।

১৭.        আমার বিপন্নতার কথা আর কী বলব বন্ধু

              ঈশ্বর আর আমার প্রেমিকার মধ্যে সেই পুরোনো লড়াই

              আমি কার হাতের পুতুল, কার কথায় নাচি।

১৮.        তোমার আড়ালে থাকার রহস্য

              এবার কিছুটা বুঝেছি আমি

              একদিন তোমার দর্শনে তুর পাহাড় ছাই হয়েছিল

              আর এদিকে দেখো, আরেক নূরে আমি ছাই।

১৯.        চিত্রকর নারীর নগ্নতার মধ্যে কী সৌন্দর্য খুঁজে পায়, জানি না

              আড়ালে আবৃত যৌবনের উঁকিÑওরা কি কখনও দেখেনি।

২০.       ঐ যে দূর থেকে ভেসে আসে

              আর্তনাদ আর বিষাদের সংগীত, তাই শুনে শুনে

              বুক ভেঙে যায়, যদি দেখতে কেমন করে বুক ভাঙে।

২১.        বাগানে বসে বসে সারা রাত কাটিয়ে দিলাম

              দেখি, কেমন করে কুসুমকলি পাপড়ি মেলে ধরে।

২২.       হৃদয় তো শুধু এক টুকরো মাংসপিণ্ড

              সে কেমন করে এত বাসনার কথা বলে!

২৩.       প্রশ্রয়ে আত্মহারা আমি, উপেক্ষাতেও আত্মহারা

              বন্ধু, আমার কি আর কোনও নিদান নেই।

২৪.       এই আলোকোজ্জ্বল জলসায়

              হাজার হাজার দর্শকের সামনে কেমন করে বলি!

              যখন সবাই একে একে চলে গেল

              কী আশ্চর্য, তখনও তো বলতে পারলাম না।

২৫.       কী অদ্ভুত স্বভাব তোমার

              একবার প্রকাশ্য হও, একবার রহস্যে অন্তর্লীন।

২৬.       একইভাবে ডেকে ডেকে কেন অস্থির হচ্ছ, হে হৃদয়

              ডাকার মধ্যে বৈচিত্র্য আনো

              দেখো, সে ফিরে তাকায় কি না।

২৭.       যার জন্য এই প্রাণ দিতে চাই, হে বন্ধু

              তার জন্যই তো বেঁচে থাকা প্রয়োজন।

২৮.       হে হৃদয়, বন্দি পাখির মতো তুমি এখন

              বসে বসে স্মৃতিচারণ করো, কারণ

              উড়ে বেড়াবার দিনগুলোতে তুমি তো

              বন্দিত্বই আশা করেছিলে।

২৯.       মিথ্যা আশ^াসে নিজেকে ভুলিয়ে রাখি সারাক্ষণ

              সে তো আসবেই, শুধু পথের দেরিটুকু অপেক্ষা।

৩০.       ‘মনে রেখো’ এই কথাটি কখনওই বলি না আমি

              মানুষের মন তো ভুলে যেতেই পারে।

৩১.        এই হৃদয়ে তো কোনও বাসনাই ছিল না

              তবু এত কষ্ট কীসের ? বন্ধু;

              বাসনাশূন্যতাই কি এর কারণ ?

৩২.       এত সুন্দর এত বিনম্র

              আর লতানো স্বভাব দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই―

              কিন্তু কী করে ভুলি, তুমিও ছোবল দিতে জানো।

৩৩.      এত তুচ্ছ আর সাধারণ জীবন বন্ধু

              মধ্যে মধ্যে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করি―

              যদি এমন কিছু ঘটে, আমি বিস্মিত হয়ে যাই।

৩৪.       নিশ্বাসের মতোই নিকটে ছিলে

              তবু তোমার কাছে পৌঁছতে গিয়ে

              কত সময়ের সমুদ্র পাড়ি দিলাম, জানি না

              কিন্তু কেন দিগন্তরেখার মতো দূরে সরে গেলে!

৩৫.       মাঝখানে অথই নদী―

              ওপারে মৃত্যু আর এপারে সংগীত

              চিরদুঃখের এই দেশে বন্ধু গোরস্তানের

              পাশেই প্রমোদশয্যা পাতা!

৩৬.      আমি তো তাকেই খুঁজে বেড়াই অহর্নিশ

              যার আঘাতে আমার এই হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যাবে

              আবার তারই শুশ্রুষায় নিরাময়।

৩৭.       সাধ হয় হাসি হয়ে তোমার অধরে ভাসি

              আর ভাব হয়ে তোমার ভাবনায়

                                                          ফিরে ফিরে আসি।

৩৮.      অঞ্জলি ভরে তোমাকেই তো পেতে চেয়েছিলাম আমি

              কিন্তু চঞ্চল হৃদয় তোমার,

              পারদের মতো সহস্র খণ্ড হয়ে কেন ঝরে পড়ো!

৩৯.       আনন্দের এই জলসাঘরে

              সকলেই চিনির বাটির চারপাশে উড়ে আসা মাছি

              তারা কেউ মৌমাছির মতো একই ফুলে আটকে থাকে না।

৪০.        এই বেঁচে থাকা কত যে দুঃসাধ্য যে জানে সে জানে

              তবু দেখো, আশার আলো নিরাশার আঁধারেই জ¦লছে।

৪১.        এত সুন্দর আর মনোরম প্রকৃতি

              যেন আমাকে সারাক্ষণ বিমোহিত করে রাখে

              কিন্তু তোমাকে ছাড়া অর্থহীন এ এক অরণ্য মাত্র!

৪২.       কীভাবে নেভাব হৃদয়ের আগুন

              যখন দহন তীব্র হয়ে যাবে, বন্ধু

              তখন তো আমার একমাত্র ভরসা―

                                                               এই চোখের পানি।

জাহিদ হায়দার

নদনদী ভাইবোন

৫.

যমুনা দেখতে যায়

আড়িয়াল খাঁর মুখ

সব নদী নারী নয়

সব নদ নয় পুরুষের স্রোত

ব্রহ্মপুত্র ঢেউয়ের পত্র পাঠায়

মধুমতীর ধমনিত পইঠায়

কত যে অধিকার-প্লাবন

এ-পাড়ে

ও-পাড়ে

রাত্রির দু’জন চর

নাব্যতা খোঁজে নিরন্তর

৬.

সব নদী ধর্মনিরপেক্ষ

জানে

              কতদূর যেতে পারে মানবসন্তান

অদূরে শ্মশান

পুড়ছে মানুষ

পূজার ফুল ভাসায় তরুণী

অদূরে অজু করে ধার্মিক

আন্তরিক ঘুমে পারমিতা

স্বপ্ন দ্যাখে

              বালির নগরে

দুধকুমার প্রফুল্ল চরণে হাঁটে

৭.

কারও হৃদে নেই বর্ণবাদী জল

পাশাপাশি পড়শিকল্যাণে ভেসে

মানুষের মতো করে না দঙ্গল

নদীনদী

নদ আর নদে

কখনও করে না বিয়ে

মোহনায় সংঘাত নেই

অতলের, প্রকাশের গ্রহণমৈত্রীতে বাস

প্রবাহিত নন্দনের কোনও বর্ণমালা

আমরা পড়িনি আজও

কিছুদিন মোহনার পাঠশালে

আবাসিক ছাত্র হলে

সংঘাত হবে না কখনও

শপথ

শপথ

শপথ

৮.

মীমাংসা চাইতেই পারি

কেন বলা হয়

বর্ষায় নদী অষ্টাদশী

              শীতের সমাজে বিগতযৌবনা

প্রশ্ন তুলতেই পারি

রমনীরত্ন কেন বিশেষ যমুনা

কোনও নারীবাদী

বলেনি আমাকে

এই অপরাধ পুরুষতান্ত্রিক

বলেছি বিচারকথা

নদীকদম্ব সকাশে

শুনেছি

নদী ও রমণী

জীবনের সত্য প্রবহমানতা

৯.

নৌকাভ্রমণে ডোবে না

ধাবমান মেঘের পল্লিতে

উপ-ভাড়াটিয়া চাঁদ

জলরূপসী লীলাবতীদের সঙ্গে

নদীদস্যুদের রাধাভাব আছে

মাঝে মাঝে খবর পাই

নদীতীরে দখল ভাঙার

হাঁটাপথ হবে

কুসুমবাগান হবে

সৈকালিক আর সান্ধ্যভ্রমণে

কেউ যাবে শরীর-উদ্ধারে

কেউ বুঝতে যাবে

হৃদয়ের জলবায়ুধারা

নদীমেলায় আসে না নদী

কলেজের মাঠে কবিতা পাঠ

‘নদীর এ-পাড় ভাঙে

ও-পাড় গড়ে’ গানে

মরা তিস্তা সাঁতরায়

নদীদস্যুর সঙ্গে বসে

জলদস্যু হাত তালি দেয়

১০.

প্রবাহ কি ভালোবাসে

তাকে নিয়ে বলা বিবিধ দর্শন

যদিও মানুষ সম্মুখের দাস

নিরন্তর যাবার ক্লান্তি

বিতৃষ্ণা

ভাঙনকে কী বলে

‘পার করো প্রভু’

শুনে হাসে

জলের বিরক্তি

বালিতে মুখগোঁজা নৌকা

কাছিমের খোলের কালচে চাঁদ

তীর থেকে তীরে

চাষবাসের শস্য নেবে কে

‘তখন পালে বাতাস পাইয়াছে …

নদীকূলে শ্মশান দেখা দিয়াছে …

পৃথিবীতে কে কাহার’

‘হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয় !’

কেঁদেছে রতন

১১.

মনে হয়

এইখানে

কবোতাক্ষে মধু সাঁতার কেটেছিলেন

মনে হয়

              এইখানে পদ্মার শাখা ইছামতী ছিল

              রবীন্দ্রনাথ বজরা থেকে নেমে

              হৈমন্তিক মফস্সল পাবনায় গিয়ে

‘বঙ্গভঙ্গ’র বছর তিনেক পরে

বলেছিলেন,

‘আমরা হিন্দু ও মুসলমান

একই দেশমাতার দুই জানুর উপর বসিয়া

একই স্নেহ উপভোগ করিতেছি,

তথাপি আজও আমাদের মিলনে বিঘ্ন ঘটিতেছে।’

‘এইখানে’

আর

‘মনে হয়’

শুনে শুনে

বালির বসতে ডুবে গেছে

কবোতাক্ষ’র ‘মধু’-মাতাল দিন

ইছামতী’র মৃদু কল্লোল

১২.

কিছুটা বিকাশ হয়ে

অতঃপর ভাঙা পাড়

কিছুটা সাহস হয়ে

অতঃপর দাঁড়ান আবার

অনেক সাঁতার ছিল

বুঝিনি পরম্পরা সুবর্ণ সাঁতারের

নদী প্রেমের শিক্ষিকা

বিরহেরও

নাম মনে নেই

অকৃতজ্ঞ

তৃষিত নিঃশ^াস

ঢেউ

উৎপাদিকা সম্মুখের

১৩.

জানি তোমার স্বার্থপ্রবাহ

কোন প্রতিশোধে

আমার নদীনদে দাও বিষ

ইলিশের সমবায়ী চলা

ঝিনুকের ঘুম

শুশুকের পিঠ দেখান সাঁতার

চলে গেছে কুলব্রত ভেঙে

তীর ধরে তৃষিত মানুষ হাঁটে

উষর ভূমিতে আনে সেচবিধি

শস্য আর পানি

পানি আর বীজ

মানুষের নিঃশ্বাসের প্রতিনিধি

বৃষ্টির শলার ঝাঁটা ক্লান্ত

ঝাড়ু দিচ্ছে ঢেউ

আমাকে তুমি আর পাবে না পলিজ কোণে

১৪.

ফেলছ জাল

উঠছে

পাথর

মৃত শামুকের খোল

দুর্গার চোখহীন গলিত মুখ

লোহার রাক্ষস

উগরায় কাদাভরা জল

কাশবনের শাদা

ডুবন্ত নৌকার ভাঙা মাস্তুল

কলঙ্কে কাতর

খননের বিষাদ শেষে

বালির বন্দরে ঘুমায় ড্রেজার

জলের অরণ্য ফিরিয়ে দাও

জলকাকের সঙ্গে 

বাঁধি আমার অন্বেষণ

ঘাসী নৌকা ডুবো চরে কাঁদে


জুয়েল মাজহার

গালকাটা সোলেমানের গলি

এক.

কলোনির ভেতরে ঘুম এসে রোজকার মতন আজও তার ভেল্কি দেখাল

সে ঢুকে পড়তে লাগল একের পর এক ঝুপড়িঘরে

ঘেউবাজ কুকুরগুলো কিছুই টের পেল না

প্রতিটি খাটিয়ার পাশে সে গিয়ে দাঁড়াল আর

দু’-পাটি দাঁতে ঝলসে উঠল নীরব হাসি;

নেপলসের তুলা ব্যবসায়ীর তন্বী স্ত্রীধনটির মুখে

দ্য ভিঞ্চি যেরকম হাসি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, এ-হাসি সেরকম

ঘুম যেন মেসোপটেমিয়ায় পথে-পথে নিশিপোশাকে ঘুরতে থাকা

নিঃশব্দচরণ, প্রজাবৎসল খলিফা হারুনার রশিদ

যেন সে বেড়ালের কাছ থেকে পেয়ে গেছে একজোড়া গদিআঁটা পা;

দুই.

এই কুমানুষের গলিতে যখন-তখন লাশ পড়ে

বেবুশ্যে মাতাল চোর আর মাগীর দালাল ছাড়া রাতনিশিথে

‘গালকাটা সুলেমানের গলি’-র পথ কেউ মাড়ায় না

কিন্তু ঘুম এসবের তোয়াক্কা করে না

বাসিন্দাদের চোখে সে মেখে দিতে থাকে

মায়া, বাৎসল্য আর কল্পনিদালিচূর্ণ মেশানো এক আশ্চর্য মলম;

ধীর এক নেশাঘোরে সকলেই ঢুলু-ঢুলু, কাত হ’য়ে পড়ে

ঘড়িটার দিকে তাকাবার মতন কোনো চোখ আর জাগর থাকে না

অসীম ক্লান্তির ভার ঝরাতে চেয়ে নিজেরই বৃত্তের বাইরে পালিয়ে গেল সময়;

হঠাৎই এক চুপ-ঘোড়ার পিঠে এক লাফে চড়ে বসল সে;

আর সে চলে গেল অনুমান-অসম্ভব দূরে;

তখনও ঘড়ির তিনটে কাঁটা অভ্যাসমতো টিক্ টিক্ করে চলছে।

তিন.

ঘড়ি আসলে এক  ছদ্মবেশী আয়না, এর পেটের ভেতরে আছে কত

ঝোপঝাড় জলাভূমি, টিলা আর বহু-বহু আবছায়া অরণ্য পাহাড়

ভ্রম-মরীচিকা দিয়ে ঘেরা কত না তাতল বালুর মরুভূমি;

আরও আছে জমাট বরফে ঢাকা, দুধশাদা সমুদ্রকফিন

তিনজন সিসিফাস উড়ন্ত সসার থেকে নেমে

সময়ের স্মৃতিভার কাঁধে তুলে হেঁটে চলে যায়;

… কিছুই বলে না, শুধু হাঁটে

হুকুমদাতার নাম তাদের অজানা;

তারা কেউ জানতে পারে না কী তাদের মোক্ষ আর

কী তাদের কেবলা আর কী তাদের দিলের নিশানা;

আঁধার টানেল ধরে রাতভর তারা চলে হেঁটে

মরুপথ ধরে তারা অবিরাম ছোটায় কাফেলা

অচেনা দেশেতে গিয়ে জঙ্গ লড়ে অপরের হয়ে

কথা বলে উচ্চৈঃস্বরে নানারূপ বিদেশি ভাষায়

তারপর অচেনা ঝোরায় নেমে আঁজলা ভরে পান করে জল

সাঁতরায়, স্নান করে, পোশাকের রক্ত ধুয়ে নেয়

চার.

ঘোড়া ও খচ্চরের  পিঠে মালবোঝাই করে ভিনদেশের অলীক শহরে তারা ঘুরে এসেছে কতো না সরাইখানা; গতরাত্রির ভেতরে-ছিল-যে-বর্তমান, যে ঘটমান কাল মেলে ধরেছিল তার পেখম আর হাপর ফুলিয়েছিল বাতাসে, সেটি চুপসে গেছে আর ভেসে গেছে স্রোতের টানে; 

বিগত-বর্তমানের লাল অ্যারিনায় অচেনা লোকেদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিশিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছিল তারা;  অনেক মার খেয়েছিল তারা; আর মার দিয়েওছিল অনেক। তাদের শরীরজুড়ে দগদগ করছিল কালো জখম। বেগতিক দেখে রণেভঙ্গ দিয়ে তারা পালিয়ে গেছে ঘোড়া ও মাল-সামান রেখে।  নদীর খাঁড়ি ধরে, তীর ধরে হেঁটে, পাঁচিল ডিঙিয়ে, গা-ছমছম গোপাট-জাঙ্গাল আর কাঁটাঝোপ পার হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে তারা কেবল ছুটেছে আর ছুটেছে।

তারপর আবার তারা নিজেদের দেখতে পেল ‘গালকাটা সোলেমানের গলি’-তে;

মেসবাড়ির তেলচিটচিটে মশারির ভেতরে,

সস্তাদরে কেনা কেরোসিনকাঠের নড়বড়ে খাটিয়ায়

ঘড়িটিও দম নিয়ে জেগে উঠেছে আবার

এক তেজি লাল ঘোড়ার জ্বলন্ত কেশরের পাশে

ইত্যবসরে বাগদাদের খলিফার মতন মুখে নীরব হাসি ঝুলিয়ে

ঘুমও হাঁটা দিয়েছে নিজের পথে

পাঁচ.

গতরাতে যা ছিল বর্তমান,  তা আজ হয়ে গেছে স্মৃতি ও অতীত;

নব-বর্তমানের কোলাহল নিয়ে এখন ট্রেন ছুটে চলেছে কমলাপুর থেকে জারিয়া-জাঞ্জাইলের পথে; ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া আর সিলেটের দিকে

——-কু-ঝিক ঝিক্ ! —– কু-ঝিক্  ঝিক্ !

নব-বর্তমানের কুহুতে ভরে উঠেছে বসন্তের কান;

হাওর থেকে হাওরে উড়ে চলেছে কামকাতর জালালি কৈতর

ছয়.

ওগো, ক্ষীণকটি আয়তলোচনা

এই রতি-সম্ভাবনাময় মেসবাড়ির চিলেকোঠায়

একপা-ভাঙা পরিত্যক্ত কাঠের কেদারাটিতে

তুমি নরম হয়ে, আরাম করে বসো

কোনও সংকোচ করো না

পলেস্তরাখসা ম্লান মেসবাড়িটিকে দ্যাখো মায়ার চোখে

এর অতীত-পৃষ্ঠাগুলি খুলে-খুলে পড়ো

শুয়ে পড়ো চির-অবিবাহিতের কেরোসিন কাঠের বিছানায়

অক্টোপাসিনীর মতো দু-বাহুতে পেঁচিয়ে

তার বুকেতে বসিয়ে দাও দাঁত

দাও তার অণ্ড থেঁতলে

দাও ক্ষিপ্র বাঘিনী-কামড়

শীৎকারে, বাৎসল্যে আর গুরুভার ঊরুর প্রহারে

তার ডরম্যান্ট শরীর জাগাও

আছড়ে মারো, কামড়ে দাও

লালা-রক্তে জন্ম দাও

অফুরন্ত তীব্র-তীব্র নবরক্ত, নব-বর্তমান

তোমার ঘোটকীপিঠে তুলে নিয়ে তাকে

চুমু দিয়ে নগ্ন করে

দাঁতে-নখে খুন করে

জন্ম দাও নীল সিসিফাস


মাহবুবা চৌধুরী

বৈদিক হৃদয়

ধূসর প্রার্থনাগুলো মিশে আছে ধুলোর আকারে

তোমার সমাধি পাশে আলো বন্দি কফিনে কফিনে

দু’দণ্ড দাঁড়াব, সিক্ত আশ্রু জলে বিনম্র সন্ধ্যায়,

অনুভবে তুলে রাখা স্বপ্নচ্যুত বিপুল নিঃশ্বাস

রেখে দেব বেদিতে তোমার মন্ত্র উপচার বৈদিক হৃদয়।

ভালোবাসার কিছুতো দায় আছে দিতে হয় মরণের পরে,

যে যার কান্নায় রচে যায় দিগন্তরেখায় কত বেলাভূমি

সমুদ্র তরঙ্গ শীর্ষে জেগে ওঠে যে বেদনার প্রতিফলন

তার রূপ কি এক হয়েছিল কি এক কখনও ?

সমস্ত  কান্নার জল জড়ো হয়ে আছড়ে পড়ে এই বিমূর্ত বেলাভূমিতে।


সৌমনা দাশগুপ্ত

মেঘের বেগুনি থেকে

১.

নিষেক রক্তাক্ত  হল, ছোঁ মেরে তুলছে মাছ বাজপাখি

২.

জিভ থেকে অবিরল ঘুণপোকা

৩.

মায়ের শীতের শব্দ

ছদ্ম নভোযানে ভেসে যাচ্ছে রাহুকাল

৪.

ঋতুচোর ধারাপাত

শীতকাল ঢেকে আছে পাখি ও কঙ্কালে

৫.

বলো বলো এই তবে ঝড়

উতলা হয়েছে মরুগাছ

৬.

খুলে যাচ্ছে সবকটি পাতা

মরচে রঙের জল

ঠোঁটে জিভে তরল আশ্বাস

৭.

পদ্মটি শিথিল, পদ্ম হরষিত

আগুন ছুঁয়েছে তাকে, পদ্ম চমকিত

৮.

লোহা গলে লোহা গলে

মেঘের বেগুনি থেকে উড়ে আসে অভিমান

৯.

সে এক বেড়াল এসে আঁচড় কাটছে

আমার লোধ্রগাছে গুঁড়ো গুঁড়ো

লোভ আর স্পৃহা আর জিভের ইচ্ছেরা

মোচার স্তবক যেন খুলে খুলে যায়


কাজী জহিরুল ইসলাম

সাবওয়ে স্টেশন

মধ্যরাত, এপাশ-ওপাশ। ইনসোমনিয়ার দখলে বিছানা।

কানের ভেতরে শেষ বিকেলের সাবওয়ে স্টেশন

ভিড়, হৈ-হুল্লোড়, ঘরমুখো মানুষের অস্থিরতা।

তুমুল ড্রামের উত্তেজনার ভেতর

চারজন হেইশিয়ান যুবকের অ্যাক্রোব্যাট-লাফালাফি,

একদল বৃদ্ধ এবং নতুন ইমিগ্র্যান্টদের কৌতূহল-বৃত্ত।

একটু দূরে চায়নিজ শিশু,

স্টেশনের ফ্লোরে কালো হ্যাট উল্টো করে রেখে পিয়ানো বাজায়;

শিশুর শিকারি চোখ এস্কেলেটরের চোখগুলো স্ক্যান করছে, দ্রুত।

ওর আঙুলে তখন বিটোফেনের তরঙ্গ।

দুটি এস্কেলেটর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, স্টেশনের পেটের ভেতর

থেকে অবিরাম টেনে বের করে মানুষের স্রোত, 

কিছুতেই শেষ হচ্ছে না যদিও

কিন্তু আমরা জানি

মানুষের মুখের ভেতর থেকে টেনে বের করা

জাদুকরের রঙিন ফিতেও এক সময় শেষ হয়ে যায়;

দ্রৌপদীর বস্ত্র কেন শেষ হলো না সে গোপন বোঝেনি শুধু দুঃশাসন।

প্লাটফর্মে এসে লাল ঢ মার্কের ক্ষিপ্রতা নিয়ে দাঁড়ায় সেভেন ট্রেন,

পেটমোটা গায়ানিজ ড্রাইভার অহেতুক হর্ন বাজায়,

ইনসোমনিয়া চাঙ্গা হয় আরও খানিকটা।

এই ট্রেনে ওঠা যাবে না, এটা সেভেন্টি-ফোরে থামবে না,

আমাকে সবুজ রঙের ঙ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

কী আশ্চর্য! সেভেন ট্রেনের প্লাটফর্ম পার হয়ে

কবেই না ঋ ট্রেনে উঠে গেছি,

কে আমাকে সেভেন-ট্রেনে তোলার জন্য নিয়ে এল

এই গ্র্যান্ড-সেন্ট্রাল স্টেশনে ?

কে ? কে ? কে করছে এইসব ?


অতনু তিয়াস

মনে রেখো পরম

যেদিন কণ্ঠ আমার চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে

সেদিন কি আমাকে মনে রাখবে পরম ?

হাওয়ার ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়াব

ধুলোময় সিসাময় শহরের আনাচে কানাচে

আমার চোখের সামনে পুঁতিগন্ধময়

গুমোট গলিঘুপচিতে দম আটকে মরে যাবে

                 শ্বাসকষ্টের রোগী।

পুরোনো পলিথিন, ত্রস্ত ছেঁড়া শার্ট পড়ে থাকবে

                স্যুয়ারেজের পাশে।

ইটের জঙ্গলে একচিলতে আকাশ উঁকি দিয়ে

বলবে না-ভালো আছ তো ?

যেদিন কণ্ঠ আমার চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে

আমাকে কি ভালোবাসবে পরম ?

সেদিন মধ্যরাতে ঘরে ফেরার পথে মহল্লার কুকুরটা

বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ বাঁচিয়ে

আমাকে কি পৌঁছে দেবে আপন গন্তব্যে ?

নাকি সবাই ভুলে যাবে

বিস্মরণের তীরে আছড়ে পড়া

একটা ঢেউ যেমন আরেকটা ঢেউকে মুছে দেয় …

আমি আর কে ?

যেন আমি কোনওদিন ছিলামই না

এই মহাজগতের সময়ের জীবনের ভিড়ে!

তবুও আকুতি এই―

যেদিন কণ্ঠ আমার চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে

আমাকে মনে রেখো পরম!


মিলু শামস

মালতী মাসি

আশ্বিনের নরম রাতে

স্মৃতিগুলো স্থির দাঁড়িয়ে থাকে―

এক কাপ কফি যেভাবে ধীরে ধীরে

নিঃশেষ হয়েও রেখে যায়

শেষ চুমুকের রেশ

মগজে ও দেহে

তেমনই এক মৃদু পেলবতা

শরতের শিউলি হয়ে ফুটে থাকে;

দূর কৈশোর থেকে উঠে আসে মালতী মাসি

কোঁচড়ে গাঁদা ফুল, বেলপাতা

হ্যারিকেনে কেরোসিন ভরে

ঘরে ঘরে আলো দেয়া শেষ হলে সন্ধ্যায়

আমাদের পড়ার ঘরে এসে জ্বেলে দিয়ে ধূপ

আঁচলে পেঁচিয়ে নিবিড়, ফুল বেলপাতা

ছোঁয়াতো কপালে―‘ভালো করে পড়,

মা দু¹া এলে এবার কি চাইবো জানিস?

তোকে যেন করে দেয় জজ-ব্যারিস্টার’

আমার গায়ে মালতী মাসির ধূপগন্ধী

                                              আঁচলের ছায়া।

আশ্বিন এলে কৈশোর থেকে উঠে আসে

নিঃসন্তান মালতী মাসি, আমাদের অসচ্ছল প্রতিবেশী

কোনও এক ঢাক বাজা কাক ভোর আশ্বিনে

চৌধুরীদের পুজোর প্যান্ডেলে

প্রতিমার ভাঙা টুকরোর সঙ্গে পড়েছিল

মালতী মাসির নিথর শরীর।


আশরাফ জুয়েল

সম্পর্কের বিছানা

পাশ ফিরে শোয়ার সময়গুলো

পেছনে ফেলে যে সব রাত

এগিয়ে গেছে ম্যাচুরিটির দিকে;

সেখানে একটি পাখি,

সেখানে দুইটি পাখি।

তারপর কিচির মিচির,

তারপর কিচির মিচির।

মধ্যবয়স্ক শ্বাসের সম্মুখে

বহুবিদ নদী―

আগলে রাখে পাখিদের,

আগলে রাখে কিচির মিচির।

ঝড়ে পড়ার পূর্বে

শ্বাসে-নদীতে শখ্য।

ঝরে পড়ার আগে নদীতে-শ্বাসে

পরস্পরের নির্ভরতা।

পাশ ফেরা!

মুখোমুখি ওম ভাগ করো

পাখিদের উড়ে যাওয়া অবধি, নতুন

কিচির মিচিরে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান

হয়ে না পড়া অবধি।

রাসেল রায়হান

ঘুঘু

পাখিদের মধ্যে তুমি ঘুঘু ভালোবাসতে। বলতে, কী মিহি তুষারদানা ছড়িয়ে থাকে!

পরের জন্মে তোমার বুকের মাঝে ঘুঘু হয়ে বসে থাকব। আর তোমাদের ভিটের কাছে উড়ে এসে বসতে বসতে মনে হবে, গেরস্থের বাড়ি ঘুঘু চড়া ভালো নয়।

পরজন্মেও আর তোমার কাছে আসা হবে না।

ফখরুল হাসান

ব্ল্যাক রেইনের বর্ষণ

ভেজা ঠোঁটের চুম্বনের কাছে আমি ক্রীতদাস

তোরা ঘরে রক্ষিতা রেখে লিপস্টিক ঠোঁটের দাস

ঘরের সমস্ত শরীরে আগুন। ঘর এখন বিধ্বস্ত

হিরোশিমা। পারমাণবিক বোমার অবহেলিত ছাই

বিশুদ্ধ প্রেমের জন্য মধ্যবয়সী স্ত্রীরা কাঙাল

সমস্ত চাহিদাগুলো আঁধারে জোনাকপোকা হয়ে …

তাদের হদয়ে কেবল ব্ল্যাক রেইনের বর্ষণ।

আর তোরা ডুবে থাকিস লালপানির জলসায়।

তবু ঘরের লোভী রক্ষিতারা হাওয়াই জাহাজে ভেসে

জানিয়ে দেয় সুখের মাতাল স্বর্গে তাদের বসবাস!

হা হা হা রক্ষিতা জীবনে ডুপ্লেক্স বা রাজকীয় বাড়ি

শয্যাশূন্য বছরের পর বছর, কেউ কেউ হয়তো দেহসুখ …

অথচ আমাদের কামনাগুলো ঘাম হয়ে ভিজিয়ে দেয়

নিম্নবিত্ত খাটের অতি সাধারণ চাদর, ক্লান্ত দেহ

বিশুদ্ধ প্রেমে লেপ্টে থাকে ঘামে ভেজা দুটি শরীর।

হাসনাত শোয়েব

সেইসব পঙ্ক্তিগুলো-

তুমি নিরস্ত্র হয়ে ফিরে এসো। দানিয়েলের উচ্চারিত কিছু শ্লোক পুচ্ছে ধারণ করে ফিরে এসো কোমল গান্ধর্বে। এখানে ঘাসের ওপর কিছু চা পাতা বুনে দিও অথবা কিছু ধান। মানুষের মৃত্যু হলে তার আত্মার মাপে একটা মুখোশ বানিয়ে নিও। চা পাতায় মুড়ানো জুডাসের মুখোশ। আর আছে ক্যাসিয়াসের পরকীয়াবশত পাওয়া সন্তান। পাশাপাশি শুকরের খামারে তোমাদের শেষ রাতের আহার। খাওয়ার সময় শব্দ করো না কিন্তু। পৃথিবীতে একটু পর বৃষ্টির সাথে কিছু হরিণের মৃত্যু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares