ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

পঞ্চম পর্ব

আমি কি লেখক হতে চেয়েছিলাম ? কখনও কি এমন কল্পনা আমার হয়েছে যে আমি লেখক হব ? গল্প উপন্যাস লিখব, বইয়ের পর বই বেরোবে ? বাংলাভাষার পাঠকেরা একটু আধটু চিনবেন আমাকে :

এমন ভাবনা আমার মাথায় কখনও আসেনি। কল্পনা করিনি বা স্বপ্নও দেখিনি। আমি হতে চেয়েছিলাম ইঞ্জিনিয়ার। আব্বা মিউনিসিপেলিটিতে চাকরি করতেন। লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক থেকে ধীরে ধীরে হেডক্লার্ক হয়েছিলেন। মাঝখানে দু’বার চাকরি চলে গেছে। সেই চাকরি দু’বারই আবার ফিরে পেয়েছেন। আব্বার মুখে তাঁর অফিসের ইঞ্জিনিয়ার সাহেবদের খুব গল্প শুনতাম। এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার। ওভারসিয়ারদের গল্প শুনতাম। এমন সমীহ করে আব্বা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবদের গল্প করতেন, শুনে সেই ছেলেবেলায় আমার মনে হতো ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে বড় মানুষ, ক্ষমতাবান মানুষ, টাকাওয়ালা মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাঁদের ব্যক্তিত্বের কথা শুনতাম, প্রভাব প্রতিপত্তির কথা শুনতাম। আব্বা ছিলেন আমার নায়ক। তাঁর মুখে যে মানুষদের এত প্রশংসা, আমি তেমন হতে চেয়েছিলাম।

ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হলো না। হয়ে উঠলাম সামান্য একজন লেখক। এখন পিছনে ফেলে আসা ছেলেবেলার জীবনটির দিকে তাকালে লেখক হয়ে ওঠার পিছনের দু’চারটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। বোধহয় সেইসব ঘটনার ভিতর লেখক হয়ে ওঠার বা হওয়ার চেষ্টা করার বা গল্প উপন্যাস লেখার কিছুটা কারণ নিহিত ছিল।

মেদিনীমণ্ডলের জীবনটা ছিল নির্জনে বড় হয়ে ওঠা এক শিশুর জীবন। অত বড় একটা ঘরে বুজি কিংবা আম্মার বুকের কাছে শুয়ে থাকা। বর্ষাকালের বৃষ্টি, পড়ছে তো পড়ছেই। উঠান পালান ছাপিয়ে ঘরে ঢোকার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছে বর্ষার জল। বৃষ্টি থামেই না। দিন ভরে আছে মেঘের ছায়ায়। মন খারাপের দিন। শেষ বিকেলের আগেই সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভিতর ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। টিনের চালায় আর বর্ষার জলে বৃষ্টি পতনের শব্দ। ঝুমঝুম ঝুমঝুম! পড়ছে তো পড়ছেই। দুপুরের রান্না করা ভাত তরকারি রাতেও খেতে হচ্ছে। আলগা চুলায় তরকারি একটু হয়তো গরম করেছেন বুজি বা আম্মা। সন্ধ্যা হতে না হতেই রাতের খাবার। সারাদিন ঘরবন্দি। রাতে তো বন্দিই। সময় কী করে কাটে ? ঘুম আসতেই চায় না। কেবিনের দরজা জানালা বন্ধ। কাড়ে ওঠার সিঁড়ির কাছে টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। বুজি আর আম্মার মাঝখানে শুয়ে আছি। একবার আম্মার দিকে ঘুরে যাই, একবার বুজির দিকে। ‘বুজি, একটা কিচ্ছা কন।’

বুজি বললেন, ‘আমি পরে কমু নে। ওই পুনি, তুই আগে কিচ্ছা হোনা মিলু রে।’

কিচ্ছা মানে গল্প। কিচ্ছা মানে কাহিনি।

আম্মা শুরু করলেন কিচ্ছা। রূপকথার বইতে পড়া কোনও গল্প হয়তো। তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন। হয়তো কোনও বই থেকেই গল্প শোনাচ্ছেন বোনপোকে। হয়তো ঠাকু’মার ঝুলি থেকে বলে যাচ্ছেন ডালিম কুমারের গল্প। শুনতে শুনতে আমি চলে যাচ্ছি রূপকথার রাজ্যে, কল্পনার রাজ্যে। নিজেই হয়ে উঠছি ডালিম কুমার। গল্প শুনি আর কল্পনার রাজ্যটা বড় হয়। কত নদী সমুদ্র পেরিয়ে যায় মন। কত সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে যায়, তার ইয়ত্তা নেই। মন চলে যায় তেপান্তরের মাঠে। সমুদ্রের চেয়েও বড় সেই মাঠ। দিনের পর দিন হাঁটলেও ফুরায় না। নিজেকে মনে হয় ছোট্ট রাজকুমার। রাজপোশাকে আর পাগড়িতে, পায়ের নাগরা জুতোয় রাজকুমার মিলুকর্তা টগবগে ঘোড়া ছুটিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছেন তেপান্তরের মাঠ। কোমরে কৃপাণের ভিতরে আছে ঝকঝকে তলোয়ার। সামনে যে দৈত্যরা পড়বে তলোয়ারের কোপে কোপে তাদের বধ করবেন।

ছেলেবেলার বহু বহু বছর পর একটি খুব নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অনুরোধে তাদের ফোর বা ফাইভের ছেলেমেয়েদের জন্য দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার রচিত ঠাকু’মার ঝুলি থেকে চারটা গল্প নিজের মতো করে লিখে দিয়েছিলাম। সুন্দর করে বই প্রকাশিত হয়। ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা সরল বাংলায় গল্পগুলো পড়তে পারে। কাজটা করার সময় সেইসব ফেলে আসা নিঝুম বর্ষারাতের স্মৃতি খুব মনে আসত। আম্মা গল্প বলে যাচ্ছেন আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছি। গভীর বৃষ্টির রাত মুছে গেছে চেতনা থেকে। মেদিনীমণ্ডল গ্রাম আর সারেংবাড়ির বড়ঘর মুছে গেছে। ঝিঁঝিঁর ডাক কানে আসে না। কল্পনায় আমি পেরিয়ে যাচ্ছি সাত সমুদ্র তের নদী, তেপান্তরের মাঠ। কত বন, কত পাহাড়। কত মরুভূমি!

আম্মার গল্প শেষ হলে ঘুরে যাই বুজির দিকে। বুজিও কিচ্ছা বলে। সেইসব কিচ্ছা ঠিক বইয়ে পড়া গল্প নয়। লোকমুখে শোনা বিক্রমপুর অঞ্চলের নানারকম প্রচলিত কাহিনি। লোককথা। ভূতের গল্প, চোর-ডাকাতের গল্প, বুদ্ধিমান কিংবা বোকা গৃহস্থের গল্প। সেইসব গল্পও আমাকে মুগ্ধ করে। মনের ভিতরে অনেকখানি জায়গা দখল করে নেয় গল্পকাহিনি। বানেছা পরির গল্প বলেছিলেন বুজি নাকি আম্মা! সেই গল্প এমন করে মনে দাগ কাটল, মন থেকে বানেছা পরিকে আর মুছতেই পারি না। কেমন করে পরিস্থান থেকে এসে মানুষের কাছে ধরা পড়ল বানেছা। প্রেম ভালোবাসা হলো তাদের। পরিস্থানে গিয়ে বানেছাকে উদ্ধার করে আনলো সেই মানুষ বা রাজপুত্র। গভীর আবেগ আর ভালোবাসায় মাখামাখি বানেছা পরির কিচ্ছা।

মনে থেকে যায় সব গল্পকথা। একটুও ভুলি না কিছু। বাড়ির চারদিকে চার শরিকের ঘর। সাদা উঠান চলে গেছে জলের দখলে। বাগান ভেসে গেছে আগেই। এখন ধীরে ধীরে ভাসছে উঠান। বুজি আর আম্মা রান্নাঘরে। দুপুরের রান্নার আয়োজন চলছে। ফাতির মা আছে তাদের সঙ্গে। সকাল হয়তো দশটা বা এগারোটা বাজে। একা অতবড় ঘরটায় আমি কী করি ? দক্ষিণের দুয়ারে দাঁড়িয়ে কঞ্চির ডগায় বাধা ছোট্ট বড়শিতে একটা করে শক্ত ভাত গেঁথে পানিতে ফেললেই ছোট পুুঁটি বা টেংরা মাছ ধরছে। সেই মাছ ধরলাম অনেকক্ষণ। মাছ রাখার মাটির পাত্রটাকে বলে ‘ঘোপা’। পুঁটি টেংরা পড়ে আছে ঘোপার তলানিতে। বড়শি বাইতে আমার আর ভাল্লাগে না। সেই দরজা থেকেই চিৎকার করে বুজিকে বলি, ‘ও বুজি, আমি একটু ছানাদাগ ঘরে গেলাম।’

রান্নাঘর থেকে বুজি বললেন, ‘যাও মিয়াভাই।’

বড়শি আর ঘোপা পড়ে রইল। বারান্দার দিককার দরজা দিয়ে উঠানের পানিতে নামলাম আমি। পরনে ‘দোয়াল’ লাগান বিস্কুট রংয়ের হাফপ্যান্ট আর সাদা পুরোনো একটা স্যান্ডগেঞ্জি।

ছানাদাদের ঘর মানে হাফেজ মামার ঘর। ছানাদা আর সেন্টুদাকে নিয়ে হাফেজ মামা বিলে গেছেন গরুর জন্য ঘাস বা কচুরির ডগা কেটে আনতে। ঘরে মিন্টু আছে। মাখম আছে। মামার ছোট ছেলে দুটো মনে হয় তখনও হয়নি। একমাত্র মেয়েটি মাটিতে হামাগুড়ি দেয়। তাকে আমরা শিলি বলে ডাকি। কেউ কেউ শিলিমও বলে।

হাফেজ মামার রান্নাঘর বর্ষার পানিতে ডুবে গেছে। আলগা চুলায় থাকার ঘরের এককোণে রান্নার আয়োজন করছেন মামি। হাঁটুপানি ভেঙে আমি গেছি সেই ঘরে। মামি আমাকে আদর করেন। আমাকে দেখলেই মুখটা হাসিহাসি হয়।  কথায় কথায় বানেছা পরির কথা বলি। মামি খুব আগ্রহ করে গল্পটা শুনতে চাইলেন। বাইরে রোদ নেই, বৃষ্টিও নেই। আকাশে পাতিকাকের মতো উড়ছে মেঘ। মেঘের ছায়ার চারদিকে আবছা অন্ধকার। গাছপালা জবুথবু। বাড়ির প্রত্যেক ঘরেই চলছে রান্নার আয়োজন। ছোটনানি কি একটা ‘বাগাড়’ দিয়েছেন। তেল আর হলুদ মরিচের একটুখানি ঝাঁঝাল গন্ধ ভেসে এল। খাবারের আশায় একটা কাক হাফেজ মামার ঘরের দুয়ারে নেমে এসেছে। মিন্টু দু’তিনবার হুস হুস করে সেটাকে  তাড়াল। আলগা চুলায় ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে ধুন্দল কুটতে বসেছেন মামি। সেই অবস্থায় বললেন, ‘বানেছা পরির কিচ্ছাটা ক মিলু। হুনতে হুনতে রান্নাবাড়ি শেষ করি।’

চৌকির উপর বসে বেশ বড়দের কায়দায় বানেছা পরির কিচ্ছা শুরু করি। বুজি বা আম্মার মুখে যতখানি শুনেছি তার সঙ্গে নিজে যোগ করি বহুকিছু। অর্থাৎ গল্পের ভিতর গেঁথে দিচ্ছি নিজের চিন্তা আর কল্পনা। গল্পের শরীর লম্বা করছি। তরকারি কুটতে কুটতে মামি মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। মিন্টু আর মাখমও শুনছে।

ওই যে ওই বয়সে বুজি আর আম্মার মুখে শোনা কিচ্ছা নিজের মতো করে অন্যদের শোনাতাম, এই ঘটনার ভিতর কি লেখক হওয়ার বীজমন্ত্র লুকিয়ে ছিল ?

সেই বয়সে কিচ্ছা শোনার বেদম নেশা ছিল আমার। সন্ধ্যার পর যারাই আমাদের ঘরে আসত তাদের কাছেই ঘ্যানঘ্যান করতাম কিচ্ছা শোনার জন্য। ছানাদা সেন্টুদা কিচ্ছা কইতেন। হাজাম বাড়ির মজিদ আসত। সে এক কিচ্ছার ওস্তাদ। রব হাফিজদ্দিও ভালোই কিচ্ছা কয়। কিচ্ছা শোনা আমার নেশা হয়ে গিয়েছিল। সেইসব বর্ষা কিংবা শীতের রাতে, খরালিকালের গরম রাতে আমার প্রধান আনন্দই ছিল কিচ্ছা শোনা। এই কিচ্ছাই বোধহয় ধীরে ধীরে ঠেলে দিয়েছে লেখক জীবনের দিকে। আমি কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠি। কল্পনার এক অলৌকিক রাজ্য তৈরি হয় মনের ভিতর।

বই জিনিসটার প্রতি গভীর মমতা তৈরি হয়েছিল সেই বয়সেই। কেবিনের ছোট আলমারিটায় কয়েকটা বই ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তর, মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু, শরৎচন্দ্রের বড়দিদি, রামের সুমতি আর অরক্ষণীয়া। নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন নামে এক লেখকের তিনটা না চারটা বই যেন ছিল। আনোয়ারা, মনোয়ারা আরেকটি বইয়ের নাম প্রেমের সমাধি। বর্ষাকালে বইগুলো স্যাঁতসেঁতে হত। শীতকালে সেই সব বই বের করে বাগানে একটা ছালা বিছিয়ে রোদে দিতেন বুজি। আমি হয়তো বইগুলোর পাশে বসে আছি রোদে। একটা একটা করে বই নেড়েচেড়ে দেখছি। পুরোনো বইয়ের পাতা থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ উঠে আসত। সেই গন্ধে মাথার ভিতরটা কেমন করে, মনের ভিতরটা কেমন করে! এখনও আমি যেন হঠাৎ হঠাৎ সেই গন্ধটা পাই। বহু বহুকাল অতিক্রম করে মনের কোনও অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা বইয়ের গন্ধটা যেন হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসে। নাকি মগজের কোনও কোষে লুকিয়ে আছে গন্ধটা! সেখান থেকে আসা। মানুষের মনও কি আসলে মগজের কোষেই থাকে ? মন কিংবা মগজ যেখান থেকেই আসুক, কী অর্থ এই গন্ধ পাওয়ার ? আজও আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

ছেলেবেলা পেরিয়ে আসার বহু বহু বছর পর এক দুপুরে আবার পেলাম সেই গন্ধ। বোধহয় ’৭৬ সাল। আমার বন্ধু ফিরোজ সারোয়ার ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা বিভাগে পড়ে। কী যেন কী কারণে তাকে আমরা সবাই ‘চাচা’ ডাকি। বন্ধুদের মধ্যে কে যে প্রথম তাকে চাচা ডাকল সে কথা মনে নেই। ওই যে একবার শুরু হলো তারপর থেকে সারোয়ারের নামই ভুলে গেল অনেকে। যেন তার নামই চাচা। রোগা পাতলা টিংটিংয়ে চেহারা। অসামান্য রসবোধের অধিকারী। তার ঠাট্টার কোনও তুলনা হয় না। হঠাৎ হঠাৎ মজাদার কথা বলার তুলনা হয় না। কথায় কথায় ছড়া মিলানোর স্বভাব। আমি জার্মানিতে চলে যাচ্ছি শুনে মুখে মুখে ছড়া বানাল ‘যার আছে সম্মান, সে যায় জার্মান’।

সারোয়ারকে আমি খুব কম সময়ই দুঃখিত হতে দেখেছি। সব সময় হাসি আনন্দে থাকা মানুষ। ফুকফুক করে সিগরেট টানছে আর রসের কথা বলছে। আসর মাতিয়ে রাখতে তার তুলনা সে নিজে। দুঃখ বেদনা যে জীবনে তার ছিল না তা নয়। তবে তা চেপে রাখার অসামান্য ক্ষমতা ছিল। দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় ছড়া লিখত। পরে গল্প উপন্যাসও লিখেছে। দৈনিক সংবাদ-র সাহিত্য পাতায় খুব ভালো একটা গল্প লিখেছিল একবার। গল্পের নাম ‘একা’। সারোয়ারের নেতৃত্বে আমরা চারবন্ধু মিলে একটি প্রকাশন সংস্থা করেছিলাম। কাজী হাসান হাবিব, সিরাজুল ইসলাম, ফিরোজ সারোয়ার আর আমি। সংস্থার নাম দিয়েছিলাম আমি ‘চারদিক’। চারদিকের অসামান্য লোগো করেছিলেন কাজী হাসান হাবিব। আমার সারাবেলা বইটি চারদিক থেকে বেরিয়েছিল। বেশ কয়েক বছর চারদিক চলেছে। পরে সারোয়ার বাংলা একাডেমিতে গিয়ে জয়েন করে। চারদিক বিক্রি হয়ে যায়।

’৭৬ সালের সেই দুপুরে সারোয়ার আমাকে নিয়ে গেছে পাবলিক লাইব্রেরিতে। আমি পড়ি জগন্নাথে। আড্ডা দিতে যাই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। লেখালেখির জগতে ঢোকার ফলে উঠতি কবি লেখক অনেকেই বন্ধু হয়েছে। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিই। ধুমছে সিগারেট টানি আর ফুরুক ফুরুক করে চা খাই।

সারোয়ারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মুহম্মদ জুবায়ের। জুবায়ের পড়ত ইংরেজি বিভাগে। নায়কোচিত চেহারা। শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান। লেখার হাত ছিল দুর্দান্ত। কতগুলো ভালো গল্প লিখেছিল। অসম্পূর্ণ নামে উপন্যাস লিখেছিল রোববার পত্রিকায়। বড় কবি লেখকেরা অনেকেই উপন্যাসের প্রশংসা করেছিলেন। পরে সব ছেড়েছুড়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিল জুবায়ের। সে ছিল বগুড়ার ছেলে। ডালাসের অ্যালেন এলাকায় সুন্দর বাড়ি করেছিল। আমি একবার গিয়ে দিন পনেরো তার ওখানে ছিলাম। আমার দুই প্রিয় বন্ধুকে ক্যান্সার কেড়ে নিয়েছে : কাজী হাসান হাবিব আর মুহম্মদ জুবায়ের।

তো সেই দুপুরে সারোয়ারের সঙ্গে গেছি পাবলিক লাইব্রেরিতে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘুরে ঘুরে বই দেখলাম দুজনে। বেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছি শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনের দিকে। খিদা লেগেছে। একটাকা না দেড়টাকায় যেন শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে একপ্লেট তেহারি পাওয়া যায়। জামতলার ছায়ার সেই ক্যান্টিনে একপ্লেটেই পেট ভরে যায়। তারপর এককাপ চা আর সিগারেট। হাঁটতে হাঁটতে আমি লক্ষ্য করি, সারোয়ারের তলপেটের কাছটা উঁচু হয়ে আছে। খুবই আগ্রহ নিয়ে জায়গাটায় হাত দিতে গেছি, সারোয়ার বলল, রাখেন চাচা, দেখাইতাছি।

সারোয়ারকে আমরা যেমন চাচা বলি সেও আমাদের চাচা বলে। চাচা তারপর শার্ট সরিয়ে জিনিসটা বের করল। ক্রাউন সাইজের মোটা একটা বই। আমার হাতে দিয়ে বলল, দেখেন কী জিনিস। দিছি মাইরা। 

সেই বই হাতে নিয়ে দেখি অদৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম। মূল প্রচ্ছদ নেই। লাইব্রেরির বইগুলো সাধারণত যা হয়, নতুন করে বাইন্ডিং করা হয়েছে। কিন্তু বইটি হচ্ছে তিতাস একটি নদীর নামের ফার্স্ট এডিশন। সেই বই হাতে নিয়ে আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। পাতা ওল্টাই আর ভেসে আসে সেই যে ছেলেবেলায় মগজে ঢুকেছিল স্নায়ু উত্তেজিত করা পুরোনো বইয়ের গন্ধ, ঠিক সেই গন্ধটা পাই। পাতা ওল্টাই আর দিশেহারা হই। চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে, চেহারা অন্যরকম হয়ে গেছে যেন।

ব্যাপারটা খেয়াল করলো সারোয়ার। কী হইছে চাচা ? এমুন করতাছেন ক্যান ?

বইটা বুকের কাছে ধরে ঘটনা বললাম সারোয়ারকে। তীক্ষè অনুভূতির ছেলে। অপলক চোখে আমার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল। তারপর মায়াবী গলায় বলল, এই অনুভূতির ব্যাখ্যা হয় না চাচা। বইটা আমি আপনেরে দিয়া দিলাম।

তিতাস একটি নদীর নাম প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর। ‘তিতাস’ পাণ্ডুলিপি অধ্যাপক সুবোধ চৌধুরীর হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন অদ্বৈত। সুবোধ চৌধুরী ছিলেন তাঁর বন্ধু। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি বন্ধুকে দিয়েছিলেন। অদ্বৈতর মৃত্যুর পর ‘তিতাস’ কাটছাঁট করে, যতটা কম খরচে সম্ভব বইটি প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন সুবোধ চৌধুরী। ‘পুঁথিঘর প্রাইভেট লিমিটেড’, কলকাতা থেকে প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হলো।

মাত্র ৩৭ বছরের জীবন ছিল অদ্বৈত মল্লবর্মণের। ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি এই মহান ঔপন্যাসিক জন্মগ্রহণ করেন তখনকার কুমিল্লা জেলার গোকর্ণঘাট গ্রামে। তিতাস নদী-তীরের গোকর্ণঘাট গ্রামটি এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় পড়েছে। বাবা অধরচন্দ্র মল্লবর্মণ। মায়ের নাম জানা যায়নি। অদ্বৈত-র পরিবার ছিল মৎস্যজীবী। তাঁর তিতাস একটি নদীর নাম তিতাস-তীরের মৎস্যজীবী সম্প্রদায় মালোদের জীবনযাত্রা নিয়ে লেখা। এই নদী আশ্রয় করেই বেঁচে ছিল মালোরা। নদীতে চর জেগে ওঠার পর মালো সম্প্রদায় নিরুপায় হয়ে ওঠে। বেঁচে থাকার তাগিদে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এইসব মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার মহাকাব্য তিতাস একটি নদীর নাম।

অদ্বৈতরা ছিলেন তিন ভাই এক বোন। শৈশবেই মা বাবাকে হারান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা এইচ ই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৩৩ সালে। প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। তারপর কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তিও হয়েছিলেন। আইএ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি টাকার অভাবে। চলে যান কলকাতায়।  কর্মজীবন শুরু করেন ত্রিপুরা পত্রিকায়। তারপর একের পর এক চাকরি বদল। মাসিক মোহাম্মদী, নবযুগ, আজাদ, কৃষক এইসব পত্রিকা ঘুরে আসেন ‘আনন্দবাজার গোষ্ঠী’র সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায়। মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন আবুল কালাম সামসুদ্দিনের সহকারী হিসেবে। ১৯৪৬ সালে তিতাস একটি নদীর নাম সাত কিস্তিতে ছাপা হয় মোহাম্মদীতে। ওই সাত কিস্তি ছিল উপন্যাসটির প্রাথমিক খসড়া।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ একটি প্রকাশনা সংস্থাও খুলেছিলেন বন্ধুদের নিয়ে। ১৯৩৯ সালের কথা। প্রকাশনীর নাম ‘চয়নিকা’। চয়নিকা থেকে বেরিয়েছিল তাঁর ভারতের চিঠি : পার্ল বাককে। ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত এই বই জীবদ্দশায় অদ্বৈত-র একমাত্র প্রকাশিত গ্রন্থ। দেশ পত্রিকার কিংবদন্তি সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অদ্বৈতকে নিয়ে এসেছিলেন দেশ পত্রিকায়। বেতন আগের চাকরিগুলোর তুলনায় ভালো। তারপরও বাড়তি রোজগারের আশায় বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগে পার্টটাইম চাকরি করতেন। অদ্বৈত ছিলেন অকৃতদার। যা রোজগার করতেন তার প্রায় সবই দুস্থ আত্মীয়দের জন্য ব্যয় করতেন।

গল্প কবিতা প্রবন্ধ নিবন্ধ আলোচনা চিঠিপত্র সবই লিখেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। উপন্যাস লিখেছেন তিনটি। তিতাস একটি নদীর নাম, রাঙামাটি আর সাদা হাওয়া। আমেরিকান ঔপন্যাসিক আরভিং স্টোনের উপন্যাস লাস্ট ফর লাইফ অনুবাদ করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল পৃথিবীবিখ্যাত ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গোগের জীবন নিয়ে। অদ্বৈত বাংলায় উপন্যাসটির নামকরণ করেছিলেন জীবন-তৃষা। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় ৬২ কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল সেই অনুবাদকর্ম।

১৯৪৮ সালে প্রথম যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। কিছুদিন হাসপাতালে কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হন ১৯৫০ সালে। এবারও হাসপাতালে নেওয়া হলো। কিন্তু তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেলেন। ১৯৫১ সালে ১৬ এপ্রিল প্রয়াত হন এই মহান ঔপন্যাসিক।

জিন্দাবাহার থার্ড লেনের একটা বাসায় আমরা থাকি। আমরা মানে আব্বা মা অন্য ভাইবোনেরা। আমি আর দাদা মাঝেমাঝে এসে থাকি। মণিও কিছুদিন মেদিনীমণ্ডলে, কিছুদিন জিন্দাবাহারে থাকে। দাদা আর আমি কাজীর পাগলা এ টি ইনস্টিটিউশনে পড়ি। ’৬৩ সালের কথা। আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে। বয়স কাটায় কাটায় আট বছর। ঢাকায় এসেছি। কয়েকদিন থেকে ফিরে যাচ্ছি একা একা। সকালবেলা আব্বা আমাকে লঞ্চে চড়িয়ে দিতে গেছেন। আট বছরের ছেলেটি সদরঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে শ্রীনগর গিয়ে নামবে। সেখান থেকে পাঁচ মাইল দূরের গ্রাম মেদিনীমণ্ডল। ওদিককার লোকজনের সঙ্গে হেঁটে চলে যাবে সেই গ্রামে। লঞ্চে সময় লাগবে চার সাড়েচার ঘণ্টা। তখনও টার্মিনাল হয়নি সদরঘাটে। তবে সব সময়কার মতোই জমজমাট এলাকা। ওই অত ভোরেই সাগরকলা বিক্রি হচ্ছে, পাউরুটি বিক্রি হচ্ছে, বনরুটি কেক বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। রেস্টুরেন্টগুলোতে নাশতা খাওয়া চলছে। লঞ্চ যাত্রীদের ব্যস্ততা। হুড়োহুড়ি। ফলের দোকানে ভ্যানভ্যান করছে মাছি। ফুটপাতে বই সাজিয়ে বসেছে এক হকার। সেখান থেকে দুআনা দিয়ে আব্বা আমাকে একটা বই কিনে দিলেন। সিন্দাবাদের সাত অভিযান। জীবনের প্রথম ‘আউট বই’ মানে পাঠ্যবইয়ের বাইরের একটি বই আমি পেলাম। লঞ্চে সারাটাক্ষণ পড়ে গেলাম সেই বই। সহস্র এক আরব্যরজনী থেকে শুধু সিন্দাবাদের সাতটি অভিযান আলাদা করে ছোটদের উপযোগী ভাষায় লেখা হয়েছে। কী যে উত্তেজনা সেই লেখার ছত্রে ছত্রে! গা শিউরে ওঠা, দমবন্ধ হয়ে আসা উত্তেজনা। সিন্দাবাদের কোনও অভিযানে তাদের বাণিজ্যতরী ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য পায়ের থাবায় পাথর নিয়ে উড়ে আসছে রকপাখি। ফেলছে ঠিক বাণিজ্যতরীর উপর। কোথাও দৈত্যের কবলে পড়েছে সিন্দাবাদ। হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে গিয়ে পড়েছে মহাবিপদে। সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে থাকা দ্বীপ মনে করে নেমেছে তিমির পিঠে। রান্না চড়িয়েছে। পুড়ে লাল টকটকে হওয়া এক টুকরো কয়লা পড়েছে তিমির পিঠে। সেইটুকু আগুনে কেঁপে উঠল অতিকায় তিমি। ডুবে গেল। এরকম বিস্ময়কর সাত অভিযান। সেই বই তারপর থেকে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। পড়তে পড়তে মুখস্থ করে ফেলেছি প্রত্যেকটি গল্প। তারপরও আবার পড়ি। আবার পড়ি। এরকম গল্প হতে পারে! বিস্ময়ের ঘোর কাটে না।

লেখক জীবনের বছর দশেক পেরিয়ে যাওয়ার পর হাতে এল সহস্র এক আরব্যরজনীর পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ। বিশাল বই। ছোট ছোট টাইপে ঠাসা। পড়তে লাগলাম সেই বই। এমন বইও হয়! প্রতিটি লাইনে লাইনে যেন গল্প। গল্প আর গল্প। এক গল্পের ভিতর কত গল্প। যেন বিশাল এক বৃক্ষের শত শত, হাজার হাজার ডালপালা। এদিকে ছড়িয়ে গেছে, ওদিকে ছড়িয়ে গেছে। বই রেখে ওঠাই যায় না। অলৌকিকত্ব, জিনপরি, দৈত্যদানব, জীবজন্তু আর নানা দেশের মানুষ। রাজা, মহারাজা, রানি কিংবা জেলে, রাজকন্যা, রাজপুত্র কী নেই এই মহাগ্রন্থে। গল্প তৈরির কৌশল শিখবার জন্য এই গ্রন্থের কোনও তুলনা হয় না। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ যেন সহস্র এক আরব্যরজনী।

সহস্র এক আরব্যরজনী রচিত হয়েছিল আরবি ভাষায়। মূল গ্রন্থের নাম আলিফ-লায়লা। পৃথিবীর প্রায় সব বড় ভাষায় বইটি অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ড. জে সি মারদ্রুস। মারদ্রুসের অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন ক্ষিতীশ সরকার। পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ। ১৯৮২ সালে কলকাতার ‘মৌসুমী প্রকাশনী’ থেকে সহস্র এক আরব্যরজনী প্রকাশিত হয়। অখণ্ড পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ। শুরুর দিককার পৃষ্ঠায় লেখা আছে ‘কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’। বিশাল সাইজের, গুটি গুটি অক্ষরে প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বই। পাতায় পাতায় ড্রয়িং। অসামান্য প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন সত্য চক্রবর্তী। দাম মাত্র ৬৫ রুপি। এখন এই বই প্রকাশ করতে গেলে কমপক্ষে দেড় হাজার রুপি দাম হবে।

‘মৌসুমী প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী ছিলেন দেবকুমার বসু। তিনি সমরেশ বসুর ছেলে। যাঁর নামে প্রকাশনী, মৌসুমী, সমরেশ বসুর মেয়ে। মৌসুমীর আরেক নাম বুলবুল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মুখে মৌসুমীর কথা আমি অনেক শুনেছি। শান্তি নিকেতনে পড়াশোনা করতেন মৌসুমী। গান করতেন। এই প্রকাশনী থেকে দুই খণ্ডে বেরিয়েছিল কালকুট সমগ্র। সুন্দর বক্সে সহস্র এক আরব্যরজনী সাইজের দুটি খণ্ড অতি চমৎকারভাবে বেরিয়েছিল। সমরেশ বসুর ছোট ছোট কিছু উপন্যাসও ছেপেছিল এই প্রকাশন সংস্থা। বেশ কয়েকবছর চলার পর বোধহয় ‘মৌসুমী প্রকাশনী’ বন্ধ হয়ে যায়।

সমরেশ বসুর আরেক ছেলে নবকুমার বসু। খুব ভালো লেখক। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তাঁর উপন্যাস ছাপা হয়েছে। উপন্যাসের নাম চিরসখা। সমরেশ বসুকে নিয়ে, অর্থাৎ বাবাকে উপন্যাস লিখল ছেলে নবকুমার। ব্যক্তিজীবনে ডাক্তার। থাকে লন্ডনে। সেখানে তার নিজস্ব ক্লিনিক আছে। নবকুমার পেয়েছে বাবার চরিত্র। ডাক্তারির পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করছে। গল্প উপন্যাস মিলিয়ে অনেক বই তার। নবকুমার আমার বিশেষ বন্ধু। আনন্দ পাবলিশার্সে তার সঙ্গে বসে আড্ডা দিয়েছি। অক্সফোর্ড বুকসের সাহিত্য সম্মেলনে দুজনেই আমরা অতিথি ছিলাম একবার। লন্ডন থেকে মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে। ওর ওখানে গিয়ে বেড়িয়ে আসতে বলে। আমার যাওয়াই হয় না।

সমরেশ বসু বিক্রমপুরের লোক। ছেলেবেলার খরালিকালে সদরঘাট থেকে ছোট লঞ্চে করে আমরা গিয়ে নামতাম শ্রীনগরে। সৈয়দপুর ছাড়িয়ে নদী থেকে লঞ্চ ঢুকত বড় খালে। কত লঞ্চঘাট সেই পথে। কুচিয়ামোড়া জায়গাটিকে আমরা বলতাম ‘কুইচ্চামারা’। তারপর রাজানগর, শেখরনগর, আলমপুর, ষোলঘর। এই ‘রাজানগর’ গ্রামে জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র সমরেশ বসু।

সমরেশ বসুর প্রসঙ্গ ধরে আমার মন চলে যায় বিক্রমপুরে। পিছনে ফেলে আসা সেইসব দিনে। মেদিনীমণ্ডল গ্রামে। 

পুরান বাড়ি মানে নোয়াব আলী নানার বাড়ি। উত্তর দক্ষিণে লম্বা। বেশ কয়েক শরিক বাড়িতে। ঘরের পর ঘর। মানুষও অনেক। বাড়িতে গাছপালা কম। চোখে পড়ার মতো তোতা মামাদের তালগাছটি। বাবুই পাখির বাসায় বাসায় তালের ডগা আর পাতা যেন চোখেই পড়ে না। দিনমান বাবুই পাখির কিচিরমিচির। উত্তরের শরিকের ওদিকটায় একটা বকুল গাছ ছিল।

নোয়াব আলী নানার ঘরগুলো বাড়ির উত্তর পশ্চিমে। বারবাড়ির দিকের ঘরটি বাংলা ঘর। সেই ঘরে নানার ছেলেরা পড়াশোনা করে। তাদের বন্ধুবান্ধবরা এসে আড্ডা দেয়। নানার বড়ছেলে খবির মামা, তারপর দবির মামা। গায়ের রং টকটকে ফর্সা এক একজনের। নানার রংটা পেয়েছে। খবির মামা একটু গম্ভীর ধরনের। দবির মামা খুবই প্রাণবন্ত। তারপর কালু মামা সৈয়দ মামা। নানার দুই মেয়ের বড়জনের বিয়ে হয়েছে জলিল মামার সঙ্গে। জলিল মামা আমার মায়ের ফুফাতো ভাই। নোয়াব আলী নানার ছোট মেয়েটির নাম সুরাইয়া। আমার চেয়ে বয়সে ছোট। খুবই প্রাণবন্ত আর চঞ্চল সুরাইয়া খালা। আমরা তাকে ‘সুরি’ বলে ডাকতাম।

সময় পেলেই চলে যাই খবির মামাদের বাংলা ঘরে। খুবই আদর করেন তারা আমাকে। ঘরের পশ্চিম পাশে একটা পুরোনো বড়ই গাছ। এত ছোট ছোট বড়ই ধরে! অত ছোট বড়ই আমি এই জীবনে আর দেখিনি। বেতফলের সমান হবে একেকটা। তারপর একটা লম্বা ধরনের ডোবা। এই ধরনের ডোবাকে আমরা বলি ‘গড়’। তার পশ্চিমপাশে খেলার মাঠ। খানবাড়ির দিক থেকে সড়ক এসে চলে গেছে কালীরখিলে। সড়কের ওপাশে বিল। নোয়াব আলী নানার বাড়ির দক্ষিণের পুকুরটি বড়। মাছ পড়ার জন্য বর্ষার শেষ দিকে ঝাকা ফেলা হত পুকুরে। কিছু কচুরি আর ধঞ্চের মতো এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ থাকতো। সেই উদ্ভিদটাকে গ্রামের লোকে বলে ‘খাইল্লা’। কচুরিও থাকত অনেক। প্রচুর মাছ পড়ত পুকুরটায়। পুরান বাড়ির মানুষজন ছাড়া অন্যকেউ সেই মাছ ধরতে পারত না। জেলে ডাকিয়ে বছরে একবার মাছ ধরাবার নিয়মটা তো ছিলই। একবার আমরাও মাছ ধরবার সুযোগ পেয়েছিলাম সেই পুকুরে। সকাল থেকেই অনেকে মাছ ধরছিল। আমি গিয়েছিলাম দুপুরের পর। মনে আছে, ঘন কচুরির তলায় ডুব দিয়ে সাদা সাদা গোলশা মাছ ধরেছিলাম বেশ কয়েকটা। মাছগুলো কেমন জানি একটু নির্জীব ছিল। কারণটা জানা হয়নি।

বাঁধান পুকুরের দক্ষিণে পাশাপাশি দুতিনটা জমি। দক্ষিণ পশ্চিম কোণের বাড়িটা হাওলাদার বাড়ি। পুবের বাড়িটা ইন্নত আলীর বাড়ি। তারপর ‘চদরি বাড়ি’। নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়িটা পুকুরের পুবপাড়ে। সেই বাড়ির পর ছমেদ খাঁ নানার বাড়ি। ছমেদ খাঁ নানার পুকুরের পুব পাড়ের বাড়িটা আমার নানা বাড়ি।

হাওলাদার বাড়ি মানে মন্নাফ মামাদের বাড়ি। তারা তিনভাই। মন্নাফ মামা, সাত্তার মামা আর জলিল মামা। একজন না  দুজন বোনও আছে তাদের। একবোন দুলালের মা। দুলালকে নিয়ে বিধবা হয়ে ভাইদের সংসারে থাকেন। মন্নাফ মামারা তিনভাই দেখতে তিনরকম। মন্নাফ মামার গায়ের রং কালো। মাঝারি মাপের একজন মানুষ। গ্রামের মেম্বার। সাত্তার মামাও কালো, মোটাসোটা শরীরের। জলিল মামা টকটকে ফর্সা লম্বা রাজপুত্রের মতো।

এই বাড়িতে ‘মেজবানি’ হচ্ছে। ‘মেজবানি’ আর ‘জিয়াফত’ এই দুটো শব্দ খুব শুনতাম তখনকার দিনে। বিভিন্ন কারণে সচ্ছল বাড়িতে মেজবানি হত। গরু খাসি জবাই হত। ডাল রান্না হত অনেক। আর হত ঘন দুধের ফিরনি। ফিরনিকে আমরা বলতাম ‘ফিন্নি’।

মন্নাফ মামাদের বাড়িতে মেজবানি হচ্ছে। কোন উপলক্ষে মনে নেই। অতিথিদেরকে মেহমান বলি না আমরা। বলি ‘মেজবান’। মেজবান থেকে মেজবানি। সেই মেজবানিতে বড় বড় ডেগে ভাত রান্না হয়েছে। খাসির মাংস রান্না হয়েছে। ডাল আর ফিন্নি রান্না হয়েছে। ঠাটা রোদের মধ্যে উঠানে বসে খাওয়া দাওয়া হবে। রান্নার লোকগুলো গরমে ঘামে অস্থির। ফিন্নি রান্না হয়ে গেছে। ফিন্নির ডেগে ঢাকনা দেওয়া। ঢাকনা সরিয়ে দেওয়া হলো ঠাণ্ডা করার জন্য। অত গরম ফিন্নি মেজবানরা খেতে পারবে না। পশ্চিম ভিটির ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। একটা মুরগি ছুটতে ছুটতে এল। কে একজন হুশ হুশ করে মুরগিটাকে তাড়া করল। সেই মুরগি এমন ভয় পেল, এমন দিশেহারা হলো, প্রথমে দিল দৌড় তারপর দিল উড়াল। উড়াল দিয়ে বেশিদূর যেতে পারল না। গিয়ে পড়ল ঢাকনা খোলা ফিন্নির ডেগে। মেজবানি বাড়িতে বিরাট কোলাহল শুরু হলো। তীব্র গরম ফিন্নিতে পড়ে সেই মুরগির পালকটালক মুহূর্তে মিশে গেল ফিন্নির সঙ্গে। পালককে আমরা বলি ‘ফইর’। ফইরগুলো ছাড়া মুরগিটা সিদ্ধ হয়ে গেল। সেই ফিন্নি পরে কী করা হয়েছিল জানি না।

হাওলাদার বাড়ির কথা ভাবলেই এই ঘটনা মনে পড়ে।

পাড়ার এবাড়ি ও বাড়ির প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কোনও না কোনওভাবে আত্মীয়। লতাপাতায় প্রত্যেকে জড়িয়ে আছে প্রত্যেকের সঙ্গে।

মন্নাফ মামারা পরে এবাড়ি ছেড়ে চলে যান চন্দ্রেরবাড়িতে। চন্দ্রেরবাড়ির পশ্চিমপাশে বহ্নিছাড়া। বহ্নিছাড়া হয় সুরাইয়া খালার বাড়ি।

ছাড়াবাড়িগুলো ছিল হিন্দুবাড়ি। চন্দ্রেরবাড়িতে বড় বড় ‘বাকসা’ ঘাস হত বর্ষাকালে। গ্রামের লোকজন ‘বরকি’ আর বাছুর নৌকায় করে নিয়ে ওই বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে  আসত। সারাদিন ঘাস খেয়ে পেট ভারী করত বরকি বাছুর। বিকেলে আবার গৃহস্থলোক নৌকায় করে তাদের ফিরিয়ে আনতো। বড় গরু তো আর ওইভাবে নৌকায় করে নেওয়া যায় না। সেইসব গরু পুরো বর্ষাকাল বাধা থাকত আথালে।

অনেক চিনাজোঁক ছিল চন্দ্রেরবাড়িতে। বরকি বাছুরগুলোর রক্ত চুষে খেত। বাড়ির উত্তর দিকে কতগুলো জংলি বরই গাছ ছিল। এত বিস্বাদ সেই বরই, মুখে দেওয়া যেত না। আলমগীর মামার সঙ্গে গিয়ে দুয়েকবার আমি খেয়ে দেখেছি।

বর্ষাকালে এই বাড়িতে হাডুডু খেলা হতো। আমরা দেখতে যেতাম। হাডুডু খেলাটির অন্য দুটো নাম এলাকায়। ‘কপাটি’ আর ‘ধরাছি’। ঠাকুরবাড়িতেও খেলাটা হতো। হাজামবাড়ির গাবতলায় হত। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভাল প্লেয়ার হায়ার করে আনা হতো। দাদা একবার একটা দল করল। কান্দিপাড়ার ওদিক থেকে কিশোর বয়সি প্লেয়ার হায়ার করে আনল। দুপুরবেলা পোলাও মোরগ রান্না করে বুজি আর আম্মা তাদের খাওয়ালেন। বিকেলবেলা খেলা হলো হাজামাবাড়ির গাবতলায়। দাদার দল জিতে গেল। ছোট একটা কাপও পেল। সেই কাপ নিয়ে কী যে উচ্ছ্বাস আমাদের।

ইন্নত আলীও আমাদের মামা হোন। ওই যে বললাম লতায় পাতায় সম্পর্ক। তিনি নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াত করতেন। কলকাতা থেকে বর্ডার ক্রস করে মাল নিয়ে আসতেন এপারে, বিক্রি করতেন। এটাই ছিল তার পেশা। গ্রামে দেখা যেত খুব কমই। আমি তাকে দুচারবারের বেশি দেখিনি। লুঙ্গি আর ফুলহাতা শার্ট পরতেন। গ্রামের কারও সঙ্গে তেমন উঠবস ছিল কি না জানি না। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষ। বাড়িতে বৃদ্ধা মা আর স্ত্রী। বড়ছেলের নাম মকবুল। বয়সে আমার চেয়ে ছোট। বাড়িতে অন্যান্য শরিকও ছিল। তাদের কথা আমার মনে নেই।

ইন্নত মামার মা ছিলেন রোগা পাতলা মহিলা। তার গলায় বেশ জোর ছিল। ইন্নত মামার বড়ঘরের পুবপাশটায় একটা নালা ছিল। খরালিকালে নালা আর ভরা বর্ষায় চল্লিশ পঞ্চাশ হাত চওড়া একটা জায়গা। থই থই পানিতে খাল হয়ে যেত। এই নালার পুবপাশে চদরি বাড়ির গাবগাছ আর বাঁশঝাড়।

ইন্নত মামাদের বড়ঘরের লাগোয়া ঝাপড়ানো একটা পেয়ারা গাছ। পেয়ারাকে আমরা বলি ‘গয়া’। গয়া গাছটা ঝুকে আছে নালার দিকে। বর্ষাকালে প্রচুর গয়া ধরে। সাইজে ছোট। উপর থেকে বোঝা যায় না কিন্তু ভেতরটা টকটকে লাল। পেঁকে নরম হয়ে থাকে। দারুণ মিষ্টি। ইন্নত মামার মায়ের জন্য গয়া গাছে কেউ হাত দিতে পারে না। পাড়ার ছেলেমেয়ে ওদিকটায় গেলে লম্বা কঞ্চি হাতে তেড়ে আসেন। বুড়ি যেন সারাক্ষণ গয়া গাছটা পাহারাই দিচ্ছেন।

আলমগীর মামা ওই অবস্থাতেই বুড়ির চোখ ফাঁকি দিয়ে দুয়েকবার গয়া চুরি করেছে। ধরা পড়ে বেদম গালাগাল খেয়েছে। তারপরও সাধ মেটেনি। বর্ষাকালের একদিন দুপুরের পর মেজো নানা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে আছেন। সেদিন বৃষ্টি ছিল না। শ্রাবণ শেষের ঝকঝকে রোদ। আলমগীর মামা এসে বলল, ল মামু, যাই এক জাগায়।

আমি অবাক! কই ?

আরে বেডা ল আমার লগে।

কেমনে যাবি ?

কোষা লইয়া যামু।

বোঝলাম নানার ঘুমের সুযোগটা আলমগীর নিচ্ছে। গেলাম তার সঙ্গে। কোষা নাওয়ের আগা পাছায় বসেছি দুজনে। হাতে বৈঠা। চদরি বাড়ির গাবগাছের ওদিকটা দিয়ে অতি সাবধানে কোষা নাও ইন্নত মামাদের গয়া গাছটার তলায় নিয়ে এল আলমগীর। ফিসফিস করে বলল, গয়া চুরি করুম।

ইন্নত মামার মাকে সে বলে কাকি। বলল, আমি হুনছি, কাকির জ্বর। ঘর থিকা বাইর অয় না।

এদিকটায় আসার পর থেকেই আমার বুক কাঁপছে। ধরা পড়লে নিশ্চয় বুজির কাছে বিচার যাবে। দুষ্টু ছেলে হিসেবে সেই বয়সেই আলমগীরের খুব নামডাক। কিন্তু আমি তো নিরীহ গোবেচারা। সাহস বলতে গেলে নেই। তারপরও এসে যখন পড়েছি আর তো কিছু করার নেই। জবুথবু হয়ে বৈঠা নিয়ে বসে রইলাম। গয়া গাছটা এত ঝাপড়ান আর পানির দিকে এমনভাবে ঝুঁকে আছে, গাছটার ডালপালার তলায় গেলে ছোট কোষা নাও সহজে কারও চোখে পড়বে না। আলমগীর মামা পটাপট গয়া ছিঁড়তে লাগল। পেকে সাদা হয়ে আছে কোনও কোনও গয়া। ছিঁড়ছে আর নৌকার ‘ডরায়’ অর্থাৎ নৌকার তলার দিকে রাখছে। কামড়ে কামড়ে খাচ্ছেও। আমাকেও ইশারায় খেতে বলছে। একটা গয়া নিয়ে আমি মাত্র কামড় দেবো, তখনই পাটাতন ঘর থেকে কঞ্চি নিয়ে লাফ দিয়ে নেমে এল বুড়ি। কোন গোলামের পোয় রে, গয়া চুরি করে ? খাড়া!

বুড়িকে দেখে আমার আর গয়ায় কামড় দেওয়া হলো না। ওই বয়সে আলমগীর মামা বিরাট পাকনা। গয়া গাছের ডালে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে কোষা নাও বের করে আনল খোলা জায়গায়। আমরা দুজন নৌকা বাইচ দেওয়ার ভঙ্গিতে বৈঠা চালাতে লাগলাম। বুড়ি আমাদের চিনতে পারল না। নৌকা নিয়ে চলে এলাম নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ির পুবদিকটায়। আলমগীর মামা তখন হাসছে। ধরা পড়ি নাই মামু। খা, গয়া খা।

তুই না কলি বুড়ির জ্বর!

হুনছিলাম তো জ্বর।

তয় ?

তয় আর কী ? জ্বর মনে অয় ভালো অইয়া গেছে। গয়া খা।

দুজনে বসে বসে মনের আনন্দে গয়া খেলাম। যেখানটায় বসেছিলাম তার পশ্চিমপাশে নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ি। পুবপাশে ছমেদ খাঁ নানার বাড়ির উত্তরের শরিকের সীমানা। বিধবা বয়স্কা মহিলার একটা মাত্র বড় টিনের ঘর। তার মেয়ের নাম বেগম। আমাদের বাড়ির লোকেরা তাকে ডাকে ‘বেগির মা’ বলে। তার ছেলের নাম হাশেম। হাশেমের মা বলে কেউ ডাকে না। তার উঠোনের দক্ষিণপাশে বড় একটা কৎবেল গাছ ছিল। প্রচুর কৎবেল ধরতো গাছটায়। তবে সেই কৎবেলে কেউ হাত দিতে পারতো না। ইন্নত মামার মা যেভাবে আগলে রাখতো তার গয়া গাছ। বেগির মাও ঠিক সেইভাবে আগলে রাখতো তার কৎবেল গাছ। এত কৎবেল দিয়ে কী করত জানি না!

নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়িটা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। প্রচুর আমগাছ বাড়িটায়। এত মিষ্টি এক এক গাছের আম, কী বলব। তবে ওই বাড়িতে আমরা আম কুড়াতে যেতে পারতাম না। কালু মামা, সৈয়দ মামা আর সুরাইয়া খালা আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই নিজেদের ছাড়াবাড়িতে গিয়ে গাছতলায় পড়ে থাকা আম কুড়িয়ে নিত। আমের দিনে সারাদিনই কেউ না কেউ বাড়িটা পাহারা দিত। বাড়ির পুবদক্ষিণ কোণে ডিঙ্গি নৌকার মতো বাঁকা হয়ে আছে একটা খেজুর গাছ। বহু পুরোনো গাছ। খেজুর ধরত না গাছটায়। রসও হত না। খরালিকালে দুপুরের দিকে ওই গাছটায় পা ঝুলিয়ে বসে আমরা আড্ডা দিতাম। একটা মান্দার গাছ ছিল পাশেই। ফাল্গুন চৈত্র মাসে টকটকে লাল মান্দার ফুলে গাছটা ঝলমল ঝলমল করত। ভারী সুন্দর লাগত দেখতে।

হাজামবাড়ির মজিদের কথা আমি অনেকবার লিখেছি। খুবই প্রাণবন্ত উচ্ছল আর গল্পবাজ যুবক ছিল। মনীন্দ্র ঠাকুরের ‘গোমস্তা’ হিসেবে কাজ করত। গোমস্তা শব্দের অন্য অর্থ আছে। জমিদারদের কাছারি সংশ্লিষ্ট এক ধরনের কর্মচারিকে গোমস্তা বলা হতো। তারা মূলত জমিদারদের খাজনা আদায়ের কাজ করত। কিন্তু বিক্রমপুরে কোনও কোনও এলাকায় বাড়ির কাজের লোক বা চাকরকে গোমস্তা বলা হয়। বর্ষাকালে গ্রাম গ্রামান্তরে ঠাকুরের ছইওয়ালা নৌকা বেয়ে যেত মজিদ। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা মনীন্দ্র ঠাকুর নৌকার ভিতর দেবদূতের মতো বসে থাকতেন। ফিরতে সন্ধ্যা বা রাত্র হয়ে গেলে, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে মজিদকে নিয়ে ঠাকুর সেইসব বাড়িতে থেকেও যেতেন। হিন্দু মুসলমান বলে কথা নেই। চারপাশের সব গ্রামের, সব বাড়িতেই ঠাকুরের ছিল অবাধ যাতায়াত। তাঁকে ব্যাপক সম্মান করত সবাই।

খরালিকালে মনীন্দ্র ঠাকুরের ডাক্তারি ব্যাগটা বহন করত মজিদ। বর্ষার শুরুতে পাথালি কোলে করে ঠাকুরকে কখনও কখনও অল্প পানির খালও পার করাত। হিন্দু ব্রাহ্মণ চড়ছে প্রায় অচ্ছুত হাজাম যুবকের কোলে। এই নিয়ে মনীন্দ্র ঠাকুরের কোনও মাথাব্যথা ছিল না।

আমার অধিবাস উপন্যাসটি মনীন্দ্র ঠাকুরকে নিয়ে লেখা। দেশভাগের পর কেমন করে বদলে গিয়েছিল এলাকার মুসলমানদের মনোভাব। চারপাশের অতিচেনা মানুষগুলো রাতারাতি কী রকম বদলে গিয়েছিল। এসব নিয়েই লিখেছিলাম অধিবাস। মজিদও সেই উপন্যাসের এক চরিত্র।

সন্ধ্যার দিকে প্রায় রোজই মজিদ আমাদের বাড়িতে আসত। অন্য কোনও শরিকের ঘরে তেমন যাতায়াত নেই। এসে বসত আমাদের বড় ঘরের বারান্দায়। তারপর হাসি মজায় মাতিয়ে রাখত আর কিচ্ছা কইত। কত রকমের যে কিচ্ছা। গা ছমছমে ভূতের গল্প। আব্বার দেওয়া সিন্দাবাদের সেই বইটি প্রায়ই আমাকে পড়তে দেখে মজিদ। ঠাকুরকে সে ডাকে কর্তা। একদিন আমাকে বলল, কর্তার কাছে অনেক মজার মজার বই আছে। ম্যালা ভূতের গল্পের বই। কলে না গেলে দোফরবেলা কর্তায় শুইয়া শুইয়া অইসব বই পড়ে। তুই একদিন অই টাইমে আয় মিলু। গল্পের বই চাইলে কর্তায় তরে পড়তে দিব।

শুনে আমার আনন্দ আর ধরে না। দুদিন ওই সময় গেলাম ঠাকুরবাড়িতে। গিয়ে ঠাকুরকে পেলাম না। তাঁর ফিরতে ফিরতে বিকেল হবে। তৃতীয় দিন পেলাম। ‘মইজ্জাদা’ শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে বই চাইতে হবে। পশ্চিম দিকে মাথা দিয়ে চৌকিতে শুয়ে আছেন ঠাকুর। সাদা ধুতি আর কোরা রংয়ের কনুই পর্যন্ত হাতাওয়ালা গেঞ্জি পরা। চিৎ হয়ে শুয়ে বই পড়ছেন। পইতা ঝুলে হয়ে পড়েছে গলার একপাশে। আমি গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম। আদাব দেওয়ার নিয়ম শিখিয়েছিলেন বুজি। আদাব দিলাম। তিনি বই সরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কী রে মিলু, খবর কী?

কথায় কথায় ‘নিকি’ শব্দটা বলতেন ঠাকুর। মূল শব্দটা হচ্ছে ‘তাই নাকি’। বললাম, আমারে একটা গল্পের বই দেন, দাদা।

চমকে বিছানায় উঠে বসলেন ঠাকুর। তুই এতডু পোলা, গল্পের বইয়ের বোজচ কী ?

হ আমি গল্পের বই পড়ি। আব্বায় একটা সিন্দাবাদের বই কিন্না দিছে।

ঠাকুর অবাক! নিকি ?

হ। পড়তে পড়তে বইটা আমি মুখস্থ কইরা ফালাইছি।

কস কী ? এইডা তো খুব ভাল কথা। বই পড়ন খুব ভাল। খুশি হইলাম শুইন্না।

তারপরেই মজিদকে ডাকলেন তিনি। ওই মইজ্জা, এই ঘরে আয়।

মইজ্জাদা ছিল রান্নাঘরে। সেখান থেকে ছুটে এল। ঠাকুর উৎফুল্ল―গলায় বললেন, মিলু তো গল্পের বই চায়রে। দিমু নিকি ?

মইজ্জাদা বলল, দিতে পারেন।

নিকি ? বই নষ্ট করব না তো ?

মইজ্জাদা কথা বলবার আগেই আমি বললাম, না না, বই নষ্ট হইব না। আমার ইস্কুলের বইও কোনটা নষ্ট হয় না।

নিকি ? তুই পড়স কোন ক্লাসে ?

ক্লাস থ্রিতে।

ঠাকুর খুব খুশি। মইজ্জাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, মিলুরে অই ভূতের বইডা দে।

মইজ্জাদা লেখাপড়া জানে না। কিন্তু ঠাকুরের বইগুলো চেনে। কোনটা ভূতের বই জানা আছে তার।

ঠাকুরের বইগুলো থাক থাক করে রাখা থাকে ওষুধের আলমারির নিচের দিকে। সেখান থেকে চটপটে হাতে একটা বই বের করল মইজ্জাদা। আমার হাতে দিল। ঠাকুর বললেন, যা, এই বইডা পড় গা। ভালো বই।

সেই বইয়ের নাম এখনও আমার মনে আছে। ভূতের মুখে রাম নাম। বাচ্চাদের ছবির বইয়ের মতো বড় সাইজের বই। তেমন মোটা না। প্রচ্ছদে অদ্ভুত কিছু ছবি আঁকা। গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে নাক লম্বা ভূত। হাত পা তেলাপোকার পায়ের মতো। তবে অনেক লম্বা। নখগুলো বাঁকা ও লম্বা লম্বা। এই ধরনের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ। বুকের কাছে ধরে সেই বই নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। তারপর আমার আর হুশজ্ঞান নাই কয়েকদিন। সারাক্ষণ ভূতের মুখে রাম নাম পড়ছি। সন্ধ্যার দিকে মইজ্জাদা এসে খবর নেয় কয়টা গল্প পড়লাম। মইজ্জাদার সঙ্গে বুজি আর আম্মাও শুনতে চায় বইয়ের গল্পগুলো। পড়া গল্পগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে গুছিয়ে আমি ‘কিচ্ছা কওয়ার’ ভঙ্গিতে বলে যাই। খাটালে টিম টিম করে জ্বলছে হারিকেন। বারান্দার দিকটায় আবছা আলো আঁধারি। ঘরের বাইরে তো ঝিঁঝিঁ ডাকছেই, ঘরের ভেতরও ডাকছে। সেইসব গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে আমি লক্ষ করি, চারপাশে কী রকম একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। গল্প বলতে বলতে নিজেই ভয় পাচ্ছি।

সেই ছেলেবেলার ভূতের ভয় এই জীবনে আমার আর কাটল না। এখনও একা ঘরে থাকতে আমার ভয় লাগে। ঘুমের ভিতর মনে হয় পায়ের পাতায় কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছে বা মুখের কাছে যেন শ্বাস ফেলে গেল অশরীরী কেউ। একা রুমে থাকতে হলে লাইট জ্বালিয়ে রাখি সারারাত। বিদেশ গিয়ে যখন হোটেলে থেকেছি তখনও লাইট জ্বালিয়ে রেখেছি রুমে। সুইডেনে গিয়েছিলাম ‘পেন ইন্টারন্যাশনাল’ এর আমন্ত্রণে। গোটেনবার্গে ছিল মূল অনুষ্ঠান। আন্তর্জাতিক বইমেলাটিও ছিল। প্রথমে গিয়েছিলাম নরওয়ের অসলোতে। সেখান থেকে গোটেনবার্গ। আমার একটা রূপকথার বই সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। প্রকাশক ‘মালমো’ শহরের। তার খুব ইচ্ছা আমাকে তার শহরে নিয়ে যাওয়া। তার বইয়ের দোকানটা দেখাবে। গেলাম মালমোতে। আমার সঙ্গে দুজন প্রকাশকও আছেন বাংলাদেশের। ‘অনন্যা প্রকাশনী’র মনির আর ‘সময় প্রকাশনী’র ফরিদ। স্টেশনের কাছেই গার্ডেন হোটেলে উঠেছিলাম। মনির, ফরিদ আর আমি সমুদ্রতীরে অসাধারণ একটা দুপুর কাটিয়েছিলাম একদিন। ফরিদের জীবনের অনেক গল্প শুনেছিলাম। আর গোটেনবার্গ থেকে ট্রেনে করে যাওয়ার সময় শুনেছিলাম এক বেদনাদায়ক সংবাদ। ফরিদের ফোনে বাংলাদেশ থেকে কেউ একজন জানাল, আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক চলে গেছেন।

কিছু কিছু স্মরণীয় দিন আসে জীবনে। মালমোর সমুদ্রতীরে বসে ওই যে এক দুঘণ্টা সময় কাটান আর হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরে আসা, তেমন এক স্মরণীয় দিন আমার জীবনে।

ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ভেবে দুপুরবেলা মনির আর ফরিদকে নিয়ে গার্ডেন হোটেলের কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকেছি। খাবারের অর্ডার দিতে যাবো। ভেতর থেকে ঝকঝকে এক যুবক বেরিয়ে এসে বলল, আরে মিলন ভাই, আপনি ? কবে আসছেন মালমোতে ?

বাংলাদেশের ছেলে। ঢাকার ছেলে। আমার লেখা পড়েছে। চেহারাটাও চেনা। মন ভরে বাঙালি খাবার খেলাম। কিন্তু যুবক কিছুতেই টাকা নেবে না। মালমোতে গিয়ে রেস্টুরেন্ট করেছে। দেশে টাকা পাঠাচ্ছে। দেশের মানুষ পেলেই প্রাণখুলে আপ্যায়ন করছে। বাঙালির এই অতিথিপরায়ণতা বা দেশের মানুষ পেলে আপ্লুত হওয়া পৃথিবীর বহু শহরে আমি দেখেছি। নিউইয়র্ক, লসএঞ্জেলেসে দেখেছি, ফ্লোরিডা, আটলান্টা আর ডালাসে দেখেছি। জাপানের টোকিও ওসাকা হিরোশিমা আর সেন্দাই শহরে দেখেছি। রোম আর মিলানোতে দেখেছি, ভ্যানিসে দেখেছি। লন্ডনে তো দেখেছিই। প্যারিসে দেখেছি, সিঙ্গাপুর আর মালয়েশিয়াতে দেখেছি। ব্যাংকক আর পাতায়াতে দেখেছি। একটু পরিচিত মুখ পেলে কী যে সমাদর বাঙালি ভাই বন্ধুরা করেন, বলে শেষ করা যাবে না।

মালমোর গার্ডেন হোটেলের ছাদটা বড় অদ্ভুত ছিল। পুরো ছাদ মানে বিশাল এক বাগান। আঙুরের মাচান বেশ কয়েকটা। থোকায় থোকায় সবুজ আর কালো আঙুর ঝুলছে। আপেল গাছগুলো ভর্তি আপেলে। নাশপাতি গাছগুলো ভর্তি। গাছতলায় গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো ঘাস। সেখানে পড়ে পড়ে পচছে আপেল নাশপাতি আর কিছু অচেনা ফল। খাওয়ার লোক নেই। একদুপুরে সেই ছাদে আমরা তিনজন অনেকক্ষণ বসেছিলাম। রাতেরবেলা সহজে আমার আর ঘুম আসছিল না। শুধু ওই ছাদবাগানটার কথা মনে হয়। বাইরে থেকে খেয়ে আসার পর মনির আর ফরিদ চলে গেল ওদের রুমের দিকে। আমি এলাম আমার রুমে। লক খুলতে গিয়ে মনে হল খুলেই দেখব অচেনা এক সুইডিশ বৃদ্ধ বসে আছেন আমার রুমে। কোনও মানে নেই এই ভাবনার। কিন্তু মনে হল। গা ছমছম করল। ঘুমের ভিতর একবার পায়ের উপর দিয়ে মনে হলো তেলাপোকা হেঁটে যাচ্ছে। আরেকবার মনে হল চোখের উপর কে যেন ফুঁ দিয়ে গেল। এসব কথা মনির আর ফরিদকে বলা হয়নি। গোটেনবার্গে ফিরে এসে কয়েকটি সাহিত্যের অনুষ্ঠান করলাম। একটা অনুষ্ঠান হলো বড় একটি বইয়ের দোকানে। আমার সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ হওয়া রূপকথার বইটি থেকে ভারী সুন্দর ভঙ্গিতে এক কবি একটি গল্প পড়লেন। কিছু মানুষ শুনল। ঘুরে ঘুরে বইয়ের দোকান দেখলাম। কত রকমের বই যে সাজান!

তারপরের অনুষ্ঠান ছিল স্টকহোমে। সেখানকার সাহিত্য একাডেমির হলরুমে আয়োজন। স্থানীয় কিছু কবি লেখক সমবেত হয়েছেন। আর সুইডেনে শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন সুইডেন প্রবাসী বাঙালি তরুণ কবি ও গদ্যলেখক, পেন ইন্টারন্যাশনালের বেশ প্রভাবশালী কর্মী আনিসুর রহমান। আনিস ছোটখাটো মানুষ কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী ও তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন। লেখেনও খুব ভালো। যা বলতে চান নির্দ্বিধায় বলেন। তার কথায় কে মনঃক্ষুণ্ন হল বা ব্যথা পেল ওসব ভাবেন না। নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করে তুলে ধরেন। আনিসকে বুঝতে আমার একটু সময় লেগেছিল।

স্টকহোমের সেই সাহিত্য অনুষ্ঠানে নূরজাহান উপন্যাসের শেষ প্যারাটি আমি পড়লাম। আনিস আমার পাঠ শুনে একটু যেন বিস্মিত হল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে খানিক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বইটি আমার হাত থেকে নিয়ে ওই অংশটুকু সুইডিশ ভাষায় মুখে মুখে অনুবাদ করল। তার অনুবাদ শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ।

ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রায়ই দেশে আসে আনিস। ‘অনন্যা প্রকাশনী’তে এসে বসে। ভালো আড্ডা হয়। একবার কলকাতা বইমেলাতেও তার সঙ্গে দেখা হল। সঙ্গে ছিল আমার সেই সুইডিশ প্রকাশক যুবক। প্রথমে আনিসকে আমি দেখতেই পাইনি। আমার প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎই দেখি পাশে দাঁড়িয়ে আছে আনিস। কারণ, সুইডিশ যুবক ছয়ফিটের ওপর লম্বা, গ্রিক দেবতার মতো দেখতে। আর আনিস ছোটখাটো বাঙালি।

মালমোর গার্ডেন হোটেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিশোর উপযোগী গল্প লিখেছিলাম ‘রুম নম্বর ৩১৭’। পুজোসংখ্যা কিশোর ভারতীতে ছাপা হয়েছিল। কিশোর ভারতীর সম্পাদক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় আমার বিশেষ বন্ধু। পরে এই গল্প কলাপাতা ও লাল জবাফুল বইটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মালমোর কথা মনে হলেই গার্ডেন হোটেলের ছাদবাগান, সেই অদ্ভুত অনুভূতির রাত আর ঝকমকে রোদে ভেসে যাওয়া সমুদ্রতীরের পাথরের ওপর বসা একজন বাঙালি লেখক আর দু’জন প্রকাশকের আনন্দভরা দুপুরবেলাটি চোখে ভাসতে থাকে। নীল সমুদ্রের জল তোলপাড় করে ওপারের দিকে ছুটে যাচ্ছে দুয়েকটি স্পিডবোট। আর বহুদূরে এসে সমুদ্র ছুঁয়েছে আকাশ। হু হু করা হাওয়ায় প্রকৃতি ও জীবন একাকার হয়ে যাচ্ছে।

[চলবে]

লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares