ধারাবাহিক উপন্যাস : ফসলের ডাক : মঈন শেখ

পঞ্চম পর্ব

[মঈন শেখ। জন্ম : ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহির তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোট কাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার।

মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে কুসুমকথা বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে। ‘ফসলের ডাক’ মঈন শেখের দ্বিতীয় উপন্যাস। কুসুমকথা আপাদমস্তক নিটল প্রেমের উপন্যাস। ‘ফসলের ডাক’ও তাই। তবে এই প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা প্রেম। এ প্রেম ধানের প্রেম, ফসলের প্রেম। ফসল ফলানোর কষ্ট এবং আনন্দ যাদের বুঝবার কথা তারা বুঝতে না পারলেও ফসল কিন্তু তা ঠিকই বুঝতে পারে। কৃষকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং তা ক্রমে ক্রমে পুঞ্জিভূত হওয়া ও তার বিস্ফোরণই এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।]

॥ দশ ॥

সমস্ত মিডিয়াজুড়ে এখন প্রধান শিরোনাম একটাই। তাসু আর কৃষকের খবর। জনসভার খবর, বোমা ফেলার খবর আর গ্রেফতারের খবর। সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, সবখানে একই খবর। যে যার মতো ব্যস্ত বিষয় আর বিশ্লেষণে।

পুলিশের পক্ষ থেকে রাতেই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। বলা হলো―‘বড় ধরনের এক জঙ্গি হামলার হাত থেকে বেঁচে গেছে দেশ। সেদিনের জনসভায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারায় তা আর ঘটতে পারল না। বেঁচে গেছে হাজারও প্রাণ। জঙ্গিদের গ্রেফতার করা না গেলেও শিগগিরই তাদের ধরা হবে। তাসু মাস্টারেরা কৃষি-সভা করার অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক জনসভা করছিল। তাই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।’ যদিও মিনহাজসহ আরও দু’জন ছাত্রকে রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল থানা থেকে। সরকারের মাথা ঠান্ডা ছিল। তারা বুঝেছে, বিশ্ববিদ্যালয় এই সময় গরম করলে সাজানো গুটি সব উল্টে যাবে। মন্ত্রী, সৈন্য, গজ আর কিস্তি যতই থাকুক, রাজা নির্ঘাত চেক হবে।

পরদিন সকালে এমন খবরই ছাপল সমস্ত প্রিন্ট মিডিয়া। তবে একটি পত্রিকা ছাপল ভিন্ন খবর। ছাপল জনসভার ছবি, প্রেস ব্রিফিংয়ের ছবি, এবং ছাপল সেদিনের জনসভায় বোমা ছোড়ার ছবি। আর এ ছবিটাই লজ্জায় ডুবালো সমস্ত জাতিকে। এ যে শিয়ালের পাঠশালায় কুমিরের বাচ্চা। বোমা কিংবা পটকা ছুড়ছে দলীয় কিছু ক্যাডার। যারা বাইরে থেকে আসা। পিছনে পুলিশের পাহারা।

ভিমরুলের বাসায় ঢিল ছোড়া হলো যেন। তবে বেশি হইচই পড়ল উত্তরের জেলাতে। তাসুর জেলা থেকে আরও উত্তরে। নওগাঁ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁসহ আশপাশের জেলাতে। একবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মধ্য আকাশে এখন একটাই সূর্য। কৃষক-সূর্য। কৃষক যে এমন আলো ছড়াবে সবার মনে, সকল কোণে, তা ভাবনায় আসেনি উপরের কারও। সবার কপালে ভাঁজ। গ্রামের অশিক্ষিত, আধা-শিক্ষত মানুষগুলো করল কী এটা? অঘটন ঘটিয়ে চলে একের পর এক। ছিটিয়ে চলে চিন্তার বীজ। ঝিমধরা চিন্তকেরাও আত্মস্থ করে বিষয়গুলো। জোর করে জাবর কাটে নিজেকে সচল রাখতে। সবার ভিতরে এখন আর একটা ভাবনা যোগ হয়েছে। যদিও তা ক্যামেরার পেছনে, ঘরোয়া আড্ডায়, বড়জোর চায়ের দোকানেই সীমাবদ্ধ থাকছে ভাবনাটা, কথাটা। সবার ভাবনা কতকটা এক হয়েছে এই ক্ষেত্রে। সবাই বলছে এই চাষাদের পেছনে তৃতীয় কোনও শক্তির জোগান আছে। শুধু সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলই তাদের পেছনে নেই। বড় কোনও শক্তি আছে তাদের সাথে।

মানুষ ক্রমশ ফুঁসে উঠছে। আলোচনা, সমালোচনার মানুষ। তাসু জেলে থাকলেও লাটাই এখনও হাতছাড়া হয়নি। সেখান থেকেই দিব্যি ওড়ায় ঘুড়ি। গরম বাতাসে ঘুড়িগুলো ঠিক আকাশ ছুঁয়েছে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে সবাই। আশাবাদী হতাশাবাদী, সবাই।

অনুষঙ্গ বাড়ছে একের পর এক। ধানকাটা শেষ। কৃষকের খৈলানে ধান, গোলাতে ধান। উঠানে ধান, বারান্দায় ধান, শোবার ঘরে ধান। শীতের পোশাকে ধান, উলে ধান, ঘন চুলের মধ্যে বিলিকেটে ঢুকে আছে ধান। চোখে ধান, বুকের পশমে ধান। ধান নেই শুধু মনে। মনে এখন ধোঁয়া, হতাশার ধোঁয়া। হাটে নিতে মন চায় না। দাম নেই। ধান বেচে  চাষের খরচ ওঠে না। উত্তরের কয়েকটি জেলাতে রাস্তায় ধান ঢেলে তাতে আগুন দিয়েছে খ্যাপা কৃষক। চোখের সামনে, ক্যামেরার সামনে ধান তুবড়ির ঢঙে ফুটে; খই ছাই হয়। জ্বালা ধরায় কৃষকের বুকে। যেন ধান নয়, কেরোসিন ঢেলে নিজের শরীরে নিজেই আগুন দিয়েছে। অথবা নিজের সন্তানের শরীরে আগুন দিয়ে বুক ভরে টানে শোক-পবন। বুক ভরে ওঠে চিটচিটে আঠালো অন্ধকারে।

ডাকাডাকি

ঝিমুচ্ছে দেশ। ঝিমুচ্ছে সবাই। সাধারণ মানুষ ভাবছে। ছোট-বড়-পাতি, সব নেতারা ভাবছে।  ভাবছে চিন্তক শ্রেণি। কেউ ভাবছে হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। কেউ ভাবছে কপালে চোখ তুলে, বাতাস-শূন্য বুকে। কেউ ভাবছে হাতে কলম তুলে অন্যহাতে চুল খামছে ধরে। ভাবছে সবাই। ঝিমুচ্ছে দেশ।

নির্বাচন একটা হয়ে গেল। থাকল নগদরাই। অধিকাংশ আসনই তাদের। তবে মানুষ যা ভেবেছিল তা হলো না। মানুষ ভেবেছিল নগদরা জেতার পর জোর ক্ষেপে যাবে। চড়াও হবে আন্দোলনকারীদের ওপর। তা হলো না। তারাও যেন ঝিমুচ্ছে। হিসাব মেলাতে চায়। যোগ-বিয়োগ। সহজ হিসাব। তবু মেলাতে ব্যর্থ হয় বারবার। গ্রামের বোকা বোকা মানুষগুলো এটা করল কী ? তারাও যে ভদ্র থাপ্পর মারতে পারে, ভদ্র গলা ধাক্কা দিতে পারে, তা কেউ বিশ্বাস করেনি। তাই তো চিন্তকেরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সুর বদলিয়ে বলছে, চলমান নষ্ট রাজনীতিকে গ্রামের চাষারা চপেটাঘাত করেছে; অর্ধচন্দ্র দিয়েছে।

ঝিমুচ্ছে সবাই। নতুনত্ব থাকলেও একে ঝিমানিই বলা চলে। শুধু ঝিমায়নি একটা গ্রুপ। বিএফআর গ্রুপ। তাদের পাল, পলকা বাতাসে টানটান। এখন হালটা শক্ত করে ধরে রাখবার পালা। নৌকা ঠিকই গন্তব্য খুঁজে পাবে। তবে তারাও এখন ঝিমানোর ঢঙে চুপ মেরে আছে। সময় নিচ্ছে সময়কে বুঝবার। তাদের বিএফআর-এর পাতায় লেখালেখি এখন বন্ধ। লেখা বন্ধ ফেসবুকের অন্যান্য পাতাতেও। এখন যা একটু আলোচনা, তা নিজেদের মধ্যে; ক্যাম্পাসের খোলা মাঠে গোল হয়ে বসে। পরিকল্পনা হয় আগামী দিনগুলোর জন্যে।

আজও বসেছে তারা। মতিহার চত্বরের এক কোণে। মিনহাজ, সেঁজুতিসহ দশ-পনেরোজন। গ্রাম থেকে এসেছে রেজা ও উপেন। তারাও আছে। তাদের মধ্যে কয়েকটি জাতীয় দৈনিক। যে যার মতো দেখছে সেগুলো। পড়ছে না। দেখছে। ভোটকেন্দ্রের ছবিই বলে দেয় শিরোনামের নিচে কী লেখা আছে। দেশের এক বড় কাগজে অর্ধেক পাতাজুড়ে ছাপা হয়েছে এক ছবি। ছবিটা তাসুর এলাকার। মিনহাজ যে কেন্দ্রের ভোটার, সেখানকার। ছবিটা খবর হবার সময় মিনহাজও সেখানে উপস্থিত ছিল। ভোটকেন্দ্রের স্কুলমাঠ ফাঁকা। সাজগোছে কমতি নেই। সুতলি দড়ি দিয়ে আইনের সীমানা ঘেরা। সকাল দশটার ছবি। মিনহাজ দেখছে ছবিটা। দেখছে ভোটকেন্দ্র। যেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ফাঁকা বুঝে একটা লোম-ওঠা কুকুর আইন ভেঙে ঢুকে পড়েছে সীমানার মধ্যে। সেটাও না হয় অল্প শাস্তির ব্যাপার ছিল। ছোটখাটো ধারাতে ফেলা যেত। সে একেবারে ঢুকে পড়েছে বুথের মধ্যে। তার এই কাণ্ড দেখে মিনহাজের তখন মনে হয়েছিল, অবশ্য পরে অনেক বুদ্ধিজীবীও এমন কথা বলেছে। কুকুরটার ভাঁড়ার মারার অভ্যেস আছে। কেন্দ্রের সাজগোছ আর লোক সমাগম দেখে তার নির্ঘাত ধারণা হয়েছিল, এটা কোন খানাবাড়ি। খাবার লোকজন আসেনি, কিন্তু ভাড়ার পূর্ণ আছে তখনও। ফাঁকা বুঝে ঝুপ করে নেড়ি ঢুকে পড়েছে বুথের মধ্যে। খাবার না থাকলেও পোলিং এজেন্টরা ছিল ঠিকই। তারাই হইহই করে উঠল। প্রিজাইডিং অফিসার ছুটে এলেন। দৌড়ে এলেন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। ভোটারশূন্য কেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই করতে এল কে? নিরাশ হলো ছুটে আসা সবাই। কুকুর। লোম ওঠা নেড়ি। সব দোষ পড়ল আনসার বাহিনীর ওপর। চাকরি থাকে কি যায়। তারাই এখন তিন ফিট লাঠি দিয়ে যৌথ বাহিনীর দায়িত্ব পালন করছে। সমানে পেটাচ্ছে নেড়িকে। যদিও অর্ধেক বাড়ি পড়ছে মাটিতে। কুকুরের আস্ত বলতে যা টিকে আছে, তা সামনের চকচকে দাঁত। সেটাই মাড়িসুদ্ধ বের করে খ্যাঁকখ্যাঁক করতে করতে দৌড়ায় মরণপণ। লোমহীন, মাংসহীন কুকুরটার দাঁতের আর খেঁকানির দাপট ভয় ধরায় সবাইকে। আনসার, তার লাঠির পিটানি, নেড়ির দাঁতের ঝিলিক, কেন্দ্র; পুরো ছবিটা ধরেছে ক্যামেরাম্যান। দক্ষ বটে। দক্ষ রিপোর্টারও। ঠিক এভাবেই পেড়েছে সংবাদটা। ঐ ছবিটাই দেখছে সবাই। তবে মিনহাজের দেখাটা সবার থেকে আলাদা। ছবি ও ছবির কথাগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী মিনহাজ।

আর এক পত্রিকায় অন্য ছবি। ছবিটা ভিন্ন মাত্রার। রেজা হামলে পড়ে সেটাই দেখছে অনেকক্ষণ। ছবিটা যখন তোলা হয় তখন রেজা সেই জমির আ’লে দাঁড়িয়ে ছিল। ভোটের দিন সে একটা নতুন কাজ পেয়েছিল। বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে এলাকার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দেখে বেড়ানোর কাজ। প্রয়োজনে মোবাইলে ছবি বা ভিডিও ধরা। রেজাও জমির আলে সেদিন থমকে গিয়েছিল, ভোটের দিনে তিন চাষার লাঙল বাওয়া আর গান শুনে। গলা ছেড়ে এমন ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি গাওয়া সবার মন কেড়েছিল। দূর থেকেও কেউ কেউ শুনছিল তাদের গান। রেজা একদম জমির আলে গিয়ে দেখছিল আর শুনছিল। এমন দিনে গরু-টানা লাঙল এলাকাতে নেই বললেই চলে। সবখানে কলের লাঙল। তারপরেও তারা তিন তিনটি লাঙল জোগাড় করেছে। জুড়েছে এক সাথে। জমিতে তখনও বতর১২ আসেনি। যথেষ্ট কচাল১৩। নরম কাদাটে মাটিকে যেন জোর করে ফাঁড়ছে তিন পালোয়ান। লাঙলের ভাঁওড়১৪ চিনতে অসুবিধা না হলেও, কচাল জমিনে লাঙলের শাসন বেমানান। এই বেমানানকে মানান দেবার চেষ্টা করছে তাদের গান।

বন্ধু আইল ভাটিবেলা, কই গেলি গো সই

একলা আমি বন্ধুর সনে ক্যামনে কথা কই .. ..।

ছবিটা তাসু মাস্টারের পাশের গ্রামের। ভিন্ন ওয়ার্ডের। তবে ভোটকেন্দ্রের আইন সীমানার প্রায় লাগোয়া ছবি। তিনজন চাষা সারবেঁধে লাঙল বাইছে। ছবিটা তোলা হয়েছে বেশ কায়দা করে। মূল ছবির সাথে দূরে ভোটকেন্দ্রও দেখা যায়। এতে কোনটা উদ্দেশ্য আর কোনটা বিধেয়, বোঝা মুশকিল। দুটোই উদ্দেশ্য দুটোই বিধেয়। তিনজন চাষা, তিন জোড়া বলদ আর তিনটি লাঙল। জমিতে মাত্র তিনটি প্রাণী সরব থাকলেও তাদের  হাঁকডাক আর গলা ছেড়ে একসাথে গাওয়াতে ভোটকেন্দ্র থেকে এই ভুঁইয়ের শোরগোলই বেশি। এই ছবির থেকে রিপোর্ট আরও বেশি কথা বলে। যেন রিপোর্ট নয়, একটা গল্প। সময়ের গল্প। যতটা সংবাদ ততটা সাহিত্য। গল্পের ঢঙেই সাজিয়েছে কথাগুলো। রেজা পুলকিত হয় মনে মনে। সে যেন এখনও সেই জমির আ’লে ঠিক দাঁড়িয়ে। ভালোলাগাতে হারিয়ে যায় রেজা। কথোপকথনের ঢঙে লেখা। যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা দু’টি চরিত্র কথা বলছে। বিখ্যাত গল্পের চরিত্র এরা। লেখাতে কিছুটা খানতি থাকলেও রেজা নিজেই তা সারিয়ে নেয়। রেজার দেখা আর শোনা কথাগুলো বসিয়ে দেয় ফাঁকফোকর বুঝে। সাংবাদিক এক চাষাকে জিজ্ঞাসা করছে―‘কি গো ভাই, আজ তো জাতীয় নির্বাচন, আপনারা জমি চাষ করতে ব্যস্ত কেন ?’

‘ক্যান তুমি চাইষা দিবেন নাকি ?’ তিনজনের পেছনে থাকা বয়সে বড় আলাচাঁদ উত্তর দিল। নাম আলউদ্দিন হলেও এখন তারা নাম আলাচাঁদ। কোন এক সময় নাকি গুনাইবিবি যাত্রাপালার আলাচাঁদ চরিত্রে অভিনয় করেছিল। লোক হাসিয়ে বুকে-পিঠে খিল ধরিয়ে দিত। তার গাওয়া ‘গঙ্গাই তরঙ্গা ঢেউ খেলে লো বুবুজান’ গানটা অনেকদিন মানুষের মুখে মুখে ছিল। সেই থেকে আলাচাঁদ।

‘কী চাষ করবেন চাচা ?’ জো না পেয়ে সাদামাটা প্রশ্ন করল সাংবাদিক।

‘করমু কিজু একটা। তবে ধান লয় বাছা। ভাতের কুরকুরি নাকি যৌবনের কুরকুরি; সেডাই মারমু এবার।’ আলাচাঁদ শেষের রাগটা কার ওপর ঝাড়ল বোঝা গেল না। তবে সাংবাদিক আর প্রশ্ন করল না। শুধু যাবার সময় বলল- ‘আপনাদের গানের গলা কিন্তু বেশ সুন্দর।’

মেজচাষা সাংবাদিকের কথাকে প্রশংসা না মেনে অপমানই বোধহয় বুঝল। আলাচাঁদকে থামিয়ে সে-ই বলল―‘হামারে গলা যে কত সুন্দর তা হামরাই জানি। তাছাড়া এমন উৎসবের দিনে গলা ছেড়ে যেডাই করি না কেন, সে তো গানই হোবে।’ মুঠোতে লাঙল চেপে থাকলেও, তার কথাগুলো চাষার মতো শোনাল না। এর বোধহয় জোর করে আজ চাষা সাজা। সাংবাদিক কথাগুলো শুনেছে ঠিকই। বরং আরও ভালো করে শুনেছে। তবে না শোনার ভান করল। তার মনে হলো চাষা কথাটা গুছিয়ে বলতে পারল না অথবা বলল না। সাংবাদিক নিজেই মনে মনে গোছাল কথাটা। কথাটা বিছাল মনের মধ্যে―‘কান্নাও যখন নিষিদ্ধ হয়, তখন গলা ছেড়ে গান ধরে মানুষ; সুরে বা বেসুরে।’ আরও ভাবল সাতপাঁচ। রিপোর্টের লাইনগুলো একের পর এক সাজাতে সাজাতে জমির আল থেকে রোডে উঠল সাংবাদিক ক’জন।  গান ধরল চাষা―

আমার সুখের নৌকা এত ভারী গো

কাদা চিরে যায়

তাই তো আমি পাল উড়িয়ে

উজানি গান গাই।

সেই ছবিটাই দেখছে রেজা। দেখছে সবাই। তবে রেজা দেখছে ভিন্নভাবে। সে ঐ ছবির সাক্ষী। খবরের সাক্ষী। ইচ্ছা করলে সে নিজেও ঐ ছবিতে থাকতে পারত। এর জন্য কিছুটা আফসোসও হচ্ছে নিজের মধ্যে। ছবির বা খবরের ব্যাখ্যা করছে যে-যার মতো। দেখছে সারাদেশ। বিভিন্ন টকশোতে, বেসরকারি টিভি চ্যানেলের খবরে, বিবিসি বাংলা থেকেও প্রচার হয়েছে এই খবর। উত্তরবঙ্গের কেন্দ্রগুলোতে ভোট পড়েছে একেবারেই কম। তাসুর উপজেলায় ভোট পড়েছে শতকরা দশ ভাগ। উত্তরের জেলাগুলোতে পনেরো থেকে বিশ ভাগ। সারাদেশে গড়ে পঁয়ত্রিশ। এটা বেসরকারি জরিপে প্রকাশ। প্রতিটি কাগজে এখন এই খবর। নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হলো, তিন দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে ভোটের সম্পূর্ণ চিত্র সম্পর্কে।

‘শোন এখন আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। অনেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইবে। আন্দোলনকে বেগবান করার কথা বলবে, তারা সামনের সারিতেও থাকতে চাইবে, কিন্তু সাবধান। অন্তত সপ্তাহ খানেক পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’ সবাই মিনহাজের দিকে তাকাল। মাঠে বসা কয়েকজনের মধ্যে নেতা দেখাল তাকে। অবশ্য অন্যরা তাকে তেমনটাই ভাবতে শুরু করেছে। মিনহাজের আরও কিছু কথা তারা শুনতে চায়। সেভাবেই তাকিয়ে আছে তারা। মিনহাজ আবার শুরু করল―‘আগামী দশ-পনেরো দিন অন্তত তাসু দাদার জামিন পাওয়া যাবে না। এরমধ্যে তাকে দেখতে যাব আমরা। তবে একসাথে নয়। ভাগ ভাগ হয়ে। আর এরমধ্যে যাদের বাড়ি যাওয়া সম্ভব হবে তারা বাড়ি যাব। পরিকল্পনা মতো কাজ করব। তবে খুব সাবধানে। মনে রাখতে হবে, আমরা মৌচাকে ঢিল মেরেছি। যতই আমরা শরীর ঢেকে রাখি, তাদের হুল ঠিক তাক করা আছে।’ মিনহাজ থামতেই উপেন বলল―‘হামি কিন্তুক ইটেই থাকমু। তুরে সাথে দাদাক দেকতে যামু।’

‘না তুই আর রেজা কালকেই বাড়ি যা। গিয়ে তাসু দাদার বাড়ি যাবি। দাদির কাছে কাছে থাকবি। দাদির কথা শোনার চেষ্টা করবি।’ রেজা আর উপেন কথা বাড়াল না, বরং বাধ্য ছেলের মতো মাথা হেলাল। তবে এরপর কথা বলল এক এক করে সবাই। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোছাল কথা বলল, মহব্বত মিলন। বেশ পাতলা রোগাটে আর মোটা কাচের চশমা পরা ছেলেটা যে এমন করে হঠাৎ নেতা হয়ে উঠবে, কেউ তা ভাবতে পারেনি। সে একাই এখন পাঁচজনের দায়িত্ব পালন করছে। গান পাগলা এই ছেলেটার এই গুণ কারও জানা ছিল না। গানের গলা আহামরি তেমন না হলেও, গান লেখার হাত বেশ। এই আন্দোলনকে নিয়ে, তাসু মাস্টারকে নিয়ে সে বেশকিছু গান এরমধ্যেই লিখে ফেলেছে। সুরও দিয়েছে ইচ্ছামতো।

কথা বলল অনেকেই। কথা অল্পই, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে গেলে শেষ লাইন টানতে সময় লাগবে। যে যার দায়িত্বগুলো ঝালিয়ে নিল আর একবার। মিনহাজ শেষে শুধু একটা কথা বলল―‘তোমরা আমার সাথে ফোনে বেশি কথা বলবে না।’

॥ দুই ॥

ও মোর গাছুয়া বন্ধুরে

গাছ লাগাইলে তুমি চুঙ্গি ঠুকলে না.. ..।

গানের কথাগুলো অনেক দূর পৌঁছাল। মন কাড়ল শ্রোতার। যারা স্টলে বসে ছিল চায়ের কাপ ধরে, তারা থামল কাপ ঠোঁটে না ঠেকিয়ে। থমকালো হাটুরে বা ব্যাগ হাতে নিয়ে ছোটা হন্তদন্ত মানুষগুলো। কান গেল সবার। মঙ্গলবার। গোল্লাপাড়ার হাট। শিব নদের ধারে আর বিলকুমারী বিলের কোলে বসা এই হাট। হাটটার নাম আছে দেশজুড়ে। প্রথম নাম হয় ৭৩ সালে। এমএলপন্থি সাম্যবাদীদের প্রায় অর্ধশত বিপ্লবীকে ঢালাও কবর দেওয়া হয়েছিল এই গোল্লাপাড়ার বুকে। তখন জায়গাটার নাম জেনেছিল সারাদেশ। দেশের বাইরেও গিয়েছিল নামটা। তবে এখনও খ্যাতি কম নেই। খ্যাতি এখন হাটের জন্য। হাটের উত্তর ধারে ফুটবল মাঠ। সেখানেই মজমাটা বসিয়েছে তারা। হাট হতে খানিকটা আলগা থেকে নদী লাগোয়া হয়ে মাঠের পূর্ব ধারে বসেছে। বিলকুমারীর বাতাস লাগে গায়ে। কুমারী বাতাস। এই বিলের নাকি কোনওদিন বিয়ে হয়নি। একবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল প্রায় পাঁচ মাইল পূর্বের কসবা বিল। এতে ভিলেন হয়ে দাঁড়ায় দুই বিলের মাঝের হিলনা বিল। তারও ইচ্ছা বিলকুমারীকে বিয়ে করবে। অবশ্য বিলকুমারী রাজি হয়েছিল কসবা বিলের প্রস্তাবে। তবে শর্তও দিয়েছিল একটা। সে বলেছিল, কসবা যদি তার একটা ঢেউয়ের তোড় সহ্য করতে পারে তবে সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। তাতেই রাজি হয় কসবা। কিন্তু বেচারি বিলকুমারীর ঢেউ সহ্য করতে পারেনি। বিয়ে আর করা হলো না কসবার। কুমারীত্ব ভাঙল না বিলকুমারীর। চিরকুমারীই থেকে গেল এই বিল। বিলকুমারী। এমনই গল্প ছড়িয়ে আছে এলাকার দাদি নানি বা দাদুদের কাছে। তবে এখনও সুনাম আছে বিলটার। বিলের নামে ছোট কাগজ বের হয়। সরকারিভাবে ডাক হয়। নাম আছে পাখির জন্য, মাছের জন্য আর কিংবদন্তির জন্য।

একটা মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছে তারা। সেখান থেকে ভেসে আসছে গান।

একে তো খেজুরে গাছ

অসময়ে তুমি দিলে চাঁছ ॥

রসের বানে অঙ্গ ভিজে যায়

ও মোর গাছুয়া বন্ধুরে .. .. ।

মেয়ে কণ্ঠ। অপরিচিত আর মিষ্টি। মাইক্রোবাস নিয়ে আসা প্রায় প্রতি হাটের সেই হকারের শিল্পীর কণ্ঠ নয় এটা। এ কণ্ঠ বেশ বাধানো। সুর বসানো গলা। অনেকে এখন সেদিকেই যাচ্ছে। যারা হকারের কাছে নিয়মিত যায় কোমর ব্যথার ক্যাপসুল কিনতে, মনে ফুর্তি ধরা মদক কিনতে কিংবা হাততালি দিতে, তারা গেল সবাই। আজকে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো অন্যরাও। গান ধরেছে মিনতি হাসদা। মজমার দক্ষিণে সরকারি খাদ্যগুদাম। পশ্চিমে জেলা পরিষদের রাস্তা। উত্তরে কুঠিপাড়া আর পূর্বে বিলকুমারী। বর্তমান গাতক দল যেখানে দাঁড়িয়ে, তাদের ঠিক পিঠ লাগোয়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক স্মৃতিফলক। কাস্তে হাতুড়ির ওপর সটান হয়ে বসে আছে ৪৪ জন সংগ্রামী। এরাদ আলী, মুন্টু মাস্টার … এমাজ মণ্ডল। এক এক করে লেখা আছে ৪৪ জন সমতাবাদী সংগ্রামীর নাম। ফলকটার নিচের গণকবরে শুয়ে আছে তারা।

গান চলছে। বেড়েছে লোক সমাগম। লোকজন ফাঁড়ি দিয়ে মজমার ভিতরে প্রবেশ করল পাতলা টিনটিনে ছেলেটা। মহব্বত মিলন। মোটা কাচের চশমা তার চোখে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। উঁচু চোয়াল কিছুটা আড়াল হয়েছে এতে। সে এসে ইশারাই বাদ্য থামিয়ে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে শুরু করল।―‘প্রিয় উপস্থিতি; মুসলমান ভাইদের প্রতি আমার সালাম, হিন্দু ভাইদের প্রতি নমস্কার আর অন্যদের প্রতি রইল আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।―হক রাব্বানা, আলী হায়দার, ইয়া হু..।’ মিলন এমন একটা ভঙ্গিমা করল, যেন মুখ থেকে কিছু একটা উগড়াবে। এর আগে যারা হকার কালু পাগলাকে চৌবাড়িয়া বা গোল্লাপাড়া হাটে ডুগডুগি বাজিয়ে লোক জমিয়ে তাবিজ উগড়াতে দেখেছে, তারা ঠিক ভাবল এই পাগলাও তাবিজ উগড়াবে। এই পাগলাও এখন বিক্রি করবে সকল রোগের মহৌষধ অল ইন ওয়ান তাবিজ। কিন্তু সকল ভাবনার মুখে পেরেক ঠুকে পাগল বলল অন্য কথা।―‘না ভাইজান, আমি তাবিজ বেচতে আসিনি। শিকড়-বাকড়ও নয়। কোনও মদকও আনিনি। বলব না, ভাই খেলে ভাবি খুশিতে শাড়ি পরে, হাতে রেশমি চুড়ি তোলে। বলব না, এই মদক দাদা খেলে দাদি মাঝরাতে পান সাজাতে বসবে। আমি দেখাব না লখিন্দরকে কাটা সেই সুতানলি সাপ। জাদুও জানি না। তবে বলব কিছু একটা। তার আগে একটা গান শোনেন। ধর সুইটি মন উজাড় করে একটা গান ধর। এই শিব নদের শুকনা তলানিতে জোয়ার আন। তোর গান শুনে বিলকুমারীও গেয়ে উঠুক। সে বলুক, আমি বিয়ের সাজে সাজব; আর কুমারী থাকব না। গলা ছেড়ে গান ধর।’ এমন অঙ্গভঙ্গিমায় মিলন কথাগুলো বলল, যেন সে পাকা বাজিগর, পাকা হকার আর পাকা অভিনেতা। সুইটির হাতে মাইক্রোফোন দিতেই সে গান ধরল―

আয়রে চাষা ভাই জলদি ছুটে আয়

ডাক দিয়েছে তাসু দাদা থাকুক গায়ে লেগে কাদা

তবু ছুটে আয় বেলা বয়ে যায় ॥

এতক্ষণে মানুষের ভাবনাগুলো যেন পৌঁছাল গন্তব্যে। যারা জাদু কিংবা সাপখেলা দেখতে কিংবা তাবিজ কিনতে এসেছিল, তারা নিরাশ হলো। ফিরে গেল তারা। ফিরে গেল হাততালি দেনেওয়ালারাও। এতে হাততালির বদলে হাত ধরবার লোকের জায়গা হলো। আসতেই আছে লোকজন। এখন তারা জেনে গেছে, এ মজমা কার। তারা দ্রুতই জেনে গেল, এ মজমা তাদের।

মানুষ এখন উপচে পড়ছে। এতে ছুট-লোক এখন আর নেই। তাবিজ কেনা, মদক কেনা বা সাপ-খেলা বা জাদু দেখনেওয়ালারা আর নেই। যারা আছে তারা শুনলেওয়ালা। সাহস দেনেওয়ালা। মিনহাজ এখানে আসেনি। এটাও পরিকল্পনার অংশ। এমন আয়োজনে নিজ এলাকাতে কেউ যাবে না। থাকবে অন্য জেলায়। মিনহাজ গেছে নওগাঁতে। নিজ নিজ এলাকার কিছু ভলেন্টিয়ার নিয়োজিত আছে প্রতিটি দলের সাথে। এখানে আছে রেজা, উপেনসহ আরও কয়েকজন। এরাই এখন লিফলেট বিলি করছে উপস্থিতির মধ্যে। মাঝারি লিফলেট। মাঝারি হলেও ওজনে হার মানায় বড়কে। এই আন্দোলনকে সার্থক করবার টনিক বলা যেতে পারে একে। লিফলেটের ওপর দিকে বড় করে লেখা―কৃষি পরিবার এক হও। সবাই হাত পেতে নেয়। হকারের কিংবা কলকাতা হারবালের লিফলেট, কোচিং সেন্টারের কিংবা ভোট প্রার্থীর নির্বাচনী লিফলেট যেমন নেবার জন্যই শুধু নেয়, দাতা সরলেই ফেলে দেবার জন্য; রাস্তা নোংরা করবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই যেভাবে নেয় সৌজন্যের হাসি হেসে। এ ক্ষেত্রে তা হলো না। দাতা ও গ্রহিতা উভয়ের মধ্যেই ছিল গুরুত্বের ছাপ। হাতে পেয়ে কেউ তাৎক্ষণিক কিছুটা পড়ল, কেউ ভাঁজ করে পকেটে ঢুকাল পরে পড়বে বলে। লিফলেটে লেখা আছে আগামী দিনের কথা। সোনালি স্বপ্নের কথা। লেখা আছে ফসল ফলানোর পদ্ধতির কথা। শস্যাবর্তনের কথা।

গান তখনও চলছে―

সময় এখন কথা কবার, ভয় কেন আর তবে ?

বাংলার কৃষক জেগেছে ভাই, হবেই তো জয় হবে ॥

তাকিয়ে দেখ তাসুর রথে ঠাঁই বুঝি আর নাই …

‘বন্ধুগণ’। মহব্বত মিলন আবার মাইক্রোফোন হাতে নিল।―‘আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমরা কী করছি এগুলো। এতে আমাদের কী লাভ। কিন্তু মনে রাখবেন, আমরাও কৃষকের সন্তান। আমাদের বাবা ধান, গম, পাট ইত্যাদি বিক্রি করেই পড়াশোনার খরচ দেন। আজ আপনারা যেভাবে আমাদের পাশে গান শুনতে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি সারাদেশের হাজারও কৃষক, মধ্যবিত্ত গেরস্থ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ছায়া দিতে। আজকে সারাদেশের রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছেন তাসু মাস্টার। তিনি আজ জেলে। আমরা নিয়মিত তার সাথে দেখা করছি। তিনি ভালো আছেন। সুস্থ আছেন। তিনি বলেছেন, তাকে নিয়ে না ভাবতে। জেলের মধ্যেও তার অনেক ভক্ত জন্মেছে।’ তাসুকে এখন সবাই ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলে। অন্তত কারও কাছে তাসুর সম্পর্কে বলতে গেলে তো বটেই। ‘আপনারা ভাবছেন, আমরা এত শক্তি কোথা থেকে পাচ্ছি। অর্থের জোগানই বা দিচ্ছে কারা। অনেকে এর মধ্যেই ভেবে বসেছেন, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল আমাদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে। কাঠি নাড়ছে পেছনে থেকে। না বন্ধুগণ। তাদের শক্তি আর কতটুকুই। কৃষকের শক্তি কৃষক নিজেই। দেশের আশি ভাগ জনগোষ্ঠী আমাদের পাশে আছেন। আপনারা পাশে আছেন। আমাদের অর্থ, আমাদের শক্তি কোনওটারই অভাব হবে না কোনওদিন। জয় আমাদের হবেই হবে।’ মাইকে এক সাথে কয়েকজন বলে উঠল―‘জয় কৃষকের জয়’। বেজে উঠল বাদ্যযন্ত্র। হাততালি দিয়ে উঠল উপস্থিতি। শব্দটা মিলাবার আগেই একজন হাত তুলে দাঁড়াল।- ‘ভাই হামার একটা কদা ছিল।’

‘কী কথা ?’ মিলন লোকটার কাছে এগিয়ে গেল।

‘হামি আজ বাজার করমু বুল্যা ১০০ টাকা আনিজুনু। মা লতুন আলু আর দেশি আমবাগুন১৫ কিনতে বুলিজোলো। আজ কিনমু না। আর হাটে কিনমু। টাকাডা আপনারোক দিতে চাই।’

‘মাফ করবেন দাদা। টাকাটা নিতে পারব না। বরং নতুন আলু আর দেশি টমেটো মায়ের জন্য নিয়ে যান। আমরা খুশি হব। মা যেন আমাদের জন্য দোয়া করেন শুধু।’

‘আল্লার কসম লাগে ভাই, হামি আপনারোক খুশি করবার জন্য দ্যাওজি না। একটা ভালো কাজে দ্যাওজি। এতে হামার ছোয়াব হবে। আর বিশ^াস করেন, হামার মাওক এ কদা বুললে সে আরও বেশি খুশি হোবে।’

 ‘আপনি কী করেন ?’

‘দিনমজুুর। কামলা খাটি।’

‘ধানের দাম বাড়লে এতে আপনার লাভ কী ? বরং ক্ষতি।’

‘না ভাই, ধানের দাম বেশি থাকলে গিরস্থের মুখ ফর্সা থাকে। মজুরি বেশি দিতেও তাদের আপত্তি থাকে নাগো। তাছাড়া লাব-লসের কদা বুলোজেন ? ধানের দাম কম হলেও হামাদের লাভ কী ? লাব হোবে মিল মালিকের। চাউলের দাম তো কমে না। ঠিকই ৬০ ট্যাকা কেজি কিনতে হয়।’

মিলন এই মজুরের কথা শুনে অবাক হয়। একদম লেখাপড়া করা মানুষের মতো কথা বলছে। মিলন ভাবে, তাদের এই আন্দোলন মানুষকে কথা বলা শিখিয়েছে। সে হাত পেতে টাকাটা নিল। আর জোড়হাত করল সবার উদ্দেশ্যে―‘দয়া করে আপনারা কেউ আর পকেটে হাত ঢুকাবেন না। এখানে কেউ টাকা পয়সা দিবেন না। আজ টাকা নিব না। বিশ^াস করুন, আমাদেরকে অনেক পক্ষই লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে এগিয়ে আসছে। আমরা তা নিতে চাই না। কোনও পক্ষের টাকা নিয়ে পক্ষের লোক হতে চাই না। আমরা আপনাদের সাথেই থাকতে চাই। আপনাদের ভালোবাসা আর ছায়াতলে থেকেই বিজয়ের সূর্যটাকে সেই ছায়ার নিচে আনতে চাই। এই যে আমাদের পেছনে দশ হাত দূরে একটা লাল রঙের নাম-ফলক আছে। তাতে সাদা রঙে লেখা ৪৪ জন শহিদ কমরেডের নাম। ফলকের শুরুতেই লেখা আছে মহান বাণী―‘জনগণের জন্য যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের মৃত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী।’ আমরা মৃত্যুবরণ করে পাহাড়ের চেয়ে ভারী হতে চাই না। আমরা নুড়ি হয়েই বেঁচে থাকতে চাই। তবে তা যোগ্য অধিকার আর সম্মানের সাথে। ঐ ফলকে লেখা আছে―মহান ১১ ডিসেম্বর বিপ্লবী শহীদ দিবস অমর হোক।’ জানি না দিবসটা অমর হয়ে আছে কি না। তবে আগে যে সমস্ত কেন্দ্রীয় নেতারা ঐ ১১ তারিখে ফুল দিতে আসত, শুনেছি এখন আর তারা আসেন না। তারাও এখন মিলিঝুলি। বন্ধুগণ, কেউ আসলে বিপ্লব করবার জন্য ক্ষমতা দখল করে না, ক্ষমতা দখলের জন্যই বিপ্লব করে। আমরা পথে নেমেছি প্রাণকে প্রতিষ্ঠা দেবার জন্য। কৃষকের মাঝে সদা জাগ্রত থাকুক প্রাণ-বীজ। ক্ষণে ক্ষণে তা অঙ্কুরিত হোক সুন্দর আগামীর বীজতলায়।’

বাদ্যযন্ত্র ও কয়েকটি কণ্ঠ সমস্বরে বলে উঠল―‘জয় কৃষকের জয়’। বলে উঠল সবাই। হাততালি দিল শব্দ যতটা করা যায় তার প্রতিযোগিতায় নেমে।

‘বন্ধুগণ―আপনারা হতাশ হবেন না। সুদিন আসবেই। পরিবর্তন আনুন চিন্তায়, ফসলে, জমির আলে। বারবার ধান নয়, বরং পরিবর্তন আনুন ফসল ফলানোতে। রসুন, পেঁয়াজ, গম, পাট ইত্যাদি ফলাতে লাগুন। দেখবেন ধানের দাম এমনিতেই উঠে যাবে। আমরা এমন ভূখণ্ডে বাস করি, যার উর্বরতা পৃথিবীর যে কোনও দেশের থেকে ভালো। এ মাটির ছোঁয়া যে কোনও বীজ পেলেই খলখল করে হেসে ওঠে। জমিন ফসলি অলঙ্কারে সজ্জিত করে নিজেকে। দেখবেন সরকার নিজেই একদিন কৃষকের হাতে পায়ে ধরে বলবে ধান ফলানোর জন্য। জয় কৃষকের জয়।’ হাটে যেন মানুষ নেই। সব এই মাঠে। কুঠিপাড়ায় দাঁড়ানো মোবাইল ফোনের টাওয়ারে দু’টি বাজপাখি ঝিম মেরে বসে আছে। তারাও বুঝি তরজমা করে মিলনের কথার, সুইটির গানের। আকাশে তুলোর মতো ভাসা মেঘগুলো এখন অনেক নিচে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা নীল, এখন আরও নীল। তারা সৌন্দর্য বাড়ায় এই মাঠের, এই পরিবেশের। দু’দশজন উঠেছে খাদ্যগুদামের ছাদে। দু’জন ছেলে উঠেছে শহিদ বিপ্লবীদের স্মৃতি-ফলকের মাথায়। দাঁড়াতে কষ্ট হলেও একপায়া শালিকের মতো দু’জন দু’জনকে আঁকড়ে সামনে দেখবার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। কে একজন ছুটে গিয়ে তাদের দু’থাপ্পড় দিয়ে টেনে নামাল।- ‘দেখ্যাছো সাহস, কার উপরে উঠ্যাছে গো। বেজন্মা কুনঠেকার।’ আরও কয়েকটা গালি দিয়ে কয়েকবার সালাম করল ফলকটাকে। ৪৪ জনের ৮৮ পায়েই যেন হাত ঠেকল তার।

এখন আর বক্তব্য নেই। ভিন্ন গান শুরু হয়েছে। কোরাস গান।

তাসু তুমি জেলের ভিতর আমরা আছি বাইরে

তোমার বাধা সুরেই আজ আমরা গান গাইরে ॥ …

এক এক করে কয়েকটি গান হলো। শেষে হলো গম্ভিরা। নানা, নাতি আর দোহারিরা মাতিয়ে তুলল শিব নদের ধার। বিলকুমারীর কুমারীত্ব। মধ্যবিত্ত সমাজের কৃষক নানাকে শহরে পড়ুয়া নাতি বুঝিয়ে চলে বর্তমান আন্দোলনের কথা; এগিয়ে চলার কথা, শস্যাবর্তনের কথা। মুহুর্মুহ হাততালি আর স্লোগানে মুখরিত সারা মাঠ। এখন দোহারি মাঠের সবাই।

॥ তিন ॥

আজ বিশেষ সতর্কতা আদালত চত্বরে। গত কয়েকদিন ধরে একই খবর ভাসছে ঘুরেফিরে। প্রথম ধাপে উত্তরবঙ্গের ষোলোটি জেলায় জেলা প্রশাসকের কাছে কৃষকের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। সেই সাথে সামনে ফেলা হবে পাঁচশ থেকে হাজার মন ধান। একশ মন করে ধান আসবে প্রতিটি উপজেলা থেকে। ডিসির কার্যালয়ের সামনেই ঢালা হবে সমস্ত ধান। খবরটা বেশ জোরেশোরে প্রচার করল বিএফআর গ্রুপ। ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে, ইউটিউবে, টুইটারে, লিফলেটে, সবখানে। পত্রিকায়ও খবর হয়েছে এ বিষয়ে। তবে বিষয়টাতে হেসেছে সরকার পক্ষ। হেসেছে প্রশাসনের কর্তারা। বোকা ভেবেছে আন্দোলনকারীদের। বোকা ভেবেছে ফলাও করে তাদের প্রচার করা দেখে। প্রশাসন বা সরকার পক্ষ এতদিন ভেবেছিল কোনও চিকন মাথা তাদের বুদ্ধি দিচ্ছে। তাদের পরিকল্পনার ছক আসছে অন্যত্র থেকে। তাই তাদের প্রতিটি পরিকল্পনা সাকসেস। কিন্তু আজ তাদের সকল ভাবনায় জল ঢালল আন্দোলনকারীরা। যেন বিশ^াসই হতে চায় না, তারা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়নি। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়নি ওপর মহলেরও। এমন একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিল তারা। গলা টেপার এটাই সুযোগ। যথেষ্ট হুলুস্থূল ফেলা যাবে। জনস্বার্থের মামলা করা যাবে একাধিক। বাঘা বাঘা কয়েকজনকে ভরলেই চলবে। পুলিশ একের জায়গায় দশ মোতায়েন করা হলো। দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন রাখা হলো পুলিশ-লাইনে। বিএফআর গ্রুপ উত্তরের ষোলোটি জেলাতে স্মারকলিপি ও ধানলিপি দেবার কথা জোর দিয়ে বললেও প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই। তবে সারাদেশে কম হলেও উত্তরের জেলাগুলোতে নিñিদ্র নিরাপত্তা। তাদের ধারণা, আন্দোলনকারীরা সকাল ১০টার কথা বললেও তারা আগের দিন রাতেই ধানলিপি দেবার কাজটা সেরে ফেলবে। স্মারকলিপি  হয়তো ডিসি’র হাতে দেবেই না। ধানের ওপর রেখে যাবে গণ্ডায় গণ্ডায় স্মারকলিপি।

চাঁদনি রাত। পূর্ণিমার আগের দিন। চাঁদ তখন মাথার ওপরে। পুলিশগুলো বসে আছে অগোছালভাবে। বসন্তকাল শুরু হলেও শীতের ভাব তখনও কাটেনি। শিরশিরানির ভাব আছে। কোর্ট চত্বরের একটা চায়ের দোকানকে বলতে গেলে জোর করেই তারা জ¦ালিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে চা নিয়ে খাচ্ছে যে যার মতো। কয়েকজন দামি ফোনে সুখ মেটায় ইউটিউবে ঢুকে। ঝিমধরা দু’একজন গালি দেয় বিএফআর গ্রুপকে।―‘শালারা, পারে না; খালি মাঠ গরম করে। যত্ত সব হিজড়ার দল।’ তিন যুব-পুলিশ লাইটপোস্টের বিপরীতে বসে হুমড়ি খেয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে পড়ে আছে। নতুন আর শরীর গরম করা কী যেন এসেছে। সেটাই দেখছে একে অপরকে চিমটি কেটে। দূর থেকে কিছুক্ষণ ধরে সেটাই দেখছে মাঝারি দরের এক বস। তাদের সাথে বসতে পারলে ভালো হতো। পারছে না। র‌্যাংকে মিলে না। তার হাতে এখন বোতামওয়ালা মোবাইল ফোন। দু’দিন হলো আইফোনটা ভেঙে ফেলেছে আছাড় মেরে। বউ তার আইডিতে ঢুকে পড়েছিল সেদিন। বউয়ের দীর্ঘদিনের সন্দেহটা প্রমাণসহ সত্য হয়েছিল, মোবাইল ফোনের সাক্ষ্য থেকে। তার বোকামির শাস্তি পেল মোবাইল। যেন নিজে থেকেই লক হওয়া উচিত ছিল ফোনটার। এখন সে তাকিয়ে আছে তিন যুব-পুলিশের দিকে; যারা মোবাইল ফোনে শখ মেটাতে ব্যস্ত। ঠোঁটের চামড়া খেতে লাগল সিনিয়র। অবশেষে না থামতে পেরে চিল্লিয়ে উঠল―‘এই শালারা, আন্ধারের মধ্যে কী কর ?’

‘স্যার, ওয়াজ শুনি।’ তিনের একজন মোবাইল ফোনে চোখ রেখেই গলা উঁচিয়ে বলল।

‘হ বুঝতাছি তো, ওয়াজই শুনতাচো। তয় দেশি না বিদেশি ?’ ও পক্ষ থেকে সিনিয়রের প্রশ্নের কোনও উত্তর এল না। তবে তিনজনের একজন বলল―‘স্যার শুনবেন নাকি ওয়াজ ?’

‘সমুন্দি কয় কী ?’ ঘাবড়ে গেল তিনজন। তিনজনই মাথা তুলল সিনিয়রের দিকে। বস তাদের দিকে তেড়ে আসে নাকি সেই জন্য। বস এল না। একটা হাই তুলে মুখ চাপড়ালো বাম হাত দিয়ে। হাই শেষ হলে দর্শক তিনজনকে উদ্দেশ করে বলল; ইচ্ছা নেই তবু বলার জন্যেই বলা, এই ঢঙে―‘তোদের দেখা হইলে ফোনটা না হয় একবার দিয়া যাস।’ সিনিয়র খানিকটা সরে এসে সিগারেটে আগুন দিল।

ডিসি-অফিসের মূল গেট থেকে একটু দূরে বসে আছে তরুণ আর দুই পুলিশ। যার একজন এই শহরে এসে বেশিদিন হয়নি। সে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, চাঁদের দিকে। বাড়ি রংপুর। মামুন। অন্যজন মোবাইল চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত। তার এই শহরে আসা দুই বছর হলো। যেমন সাহসী, তেমন বদমেজাজী। চাঁদপুর বাড়ি। মুনতাজ। মামুন তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। চাঁদটা যেমন বড় তেমন কাছে। ডিসি বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে লম্বা লগি দিয়ে ছোঁয়া যাবে। ফাল্গুনের চাঁদ যে এত সুন্দর আর মায়াবী হয়, এর আগে খেয়াল করেনি এভাবে। চাঁদ নেমে এসে তাদের যেন পাহারা দিচ্ছে। অথবা ধুয়ে দিচ্ছে সব। পবিত্র করে দেয় সমস্ত কোর্ট চত্বর। কিন্তু এই ধুয়ে দেয়া কার জন্য ? নিশ্চয় তাদের জন্য নয়। এ বুঝি আন্দোলনকারীদের জন্য। যারা এক হাজার মন ধান ঢালবে এই চত্বরে। রাজশাহীতে দশটি থানা। হাজার মণ ধান। এমনই  এলোমেলো আজব ভাবনাগুলো রংপুরীর মাথায় খেলতে লাগল। সে আরও একটা আজব প্রশ্ন করল চাঁদপুরীকে― ‘এই মুনতাজ ভাই, একটা কথা কন দেখি। এই খানোত এক হাজার মন ধান ঢাললে কতকোনা উঁচ্যা হইবে ? দুইতলা পর্যন্ত উঠি যাইবে মুনে হয়, তাই নোয়ায় ?’

‘কী কয়তাচস? হালার পুত কয় কী ? তুই তো আজব লোক। ঘরের শত্রু বিভীষণ। তুই আছস হ্যাগোর ঠেকাতে, নাকি সাহায্য করতে ? আসলে তুমি তো শালা রংপুইরা, ঢোলের দু’পিঠেই বাড়ি পাড়।’

‘মুই কনু কী আর আপনি শোননেন কী ? মনের মদ্দত কথাটা আসিল সে জন্যে কনু। অবশ্য ধানটান আপনি বুঝবেন না। চাঁদপুইর‌্যা তো,  ইলিশ হইলে কবার পাইনেন, এক হাজার মনে কতকোনা উঁচ্যা হইবে।’

‘দেখতাচো শালার উসকানি মারা। ও ধানের দ্যাশের মানুষ, তা ইস্তফা দিয়া চইল্যা যাওনা। ওগোর লগে যোগ দ্যাও।’ মামুন আর কথা বাড়াল না। সে জানে, মুনতাজকে খোঁচালে পেরে ওঠা যাবে না। ছুটলে কথা থামায় কে ? তবে লোকটা ভালো। বাইরে আর ভেতর সম্পূর্ণ আলাদা। পাকা বেলের মতো।

চাঁদের দিকে আবার তাকালো মামুন। চাঁদটা হিলতে শুরু করেছে পশ্চিমে। ডিসি বিল্ডিং-এর আড়াল হবে খানিক বাদে। পূর্বদিক থেকে মনে হলো ছাদের পশ্চিম অংশের সাথে চাঁদ ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলছে। ছাদে উঠতে ইচ্ছা করল মামুনের। কিন্তু গেল না। ভাবল, ছাদে উঠলেই রাতচোরা পাখি হয়ে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিবে। পালাবে দূর আকাশে। বরং এখান থেকেই দেখা ভালো। বেশ বিলিকেটে দেখা যাচ্ছে। চাঁদের বুকের কালো দাগগুলো আরও স্পষ্ট। কেমন যেন লাগছে মামুনকে। বুকে, মাথায় যত সব আউলা-ঝাউলা চিন্তা। কেউ কাছে থাকলে হয়তো হাত দিয়ে দেখতে বলত, তার জ¦র এসেছে কি না। চাঁদের কালো দাগ দেখে ছেলেবেলা ফিরে আসবার কথা। মনে পড়বার কথা চরকাকাটা বুড়ির কথা। কিন্তু ঐ দাগের মধ্যে হঠাৎ ভেসে উঠল বাপের চিন্তা-কাতর মুখ। বাপ চাঁদের মধ্যিখানে হাঁটুতে থুঁতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। চারদিক ভাসছে চাঁদের আলোয়। চাঁদের মধ্যে বাপের মুখটাতে শুধু অন্ধকার। ছেলের সরকারি চাকরি, বাড়িতে নতুন ছেলে-বউ। বাড়ি এখন চাঁদের হাট। অথচ হাটের বিভা নেই বাপের মনে, মুখে। নামাজে বসলে সহজে উঠতে চায় না। নামাজ শেষ করেও বসে থাকে অনেকক্ষণ। পেছন থেকে কেউ দেখে ভাববে, বাপ নামাজ শেষে তসবিহ্ গুনছে। দোয়া পড়ছে মনে মনে। কিন্তু মা ঠিকই জানে, বাপ কী করছে। বাপ দেনার খাতা খুলে ধরে মনে মনে। এখন মনের জপ একটাই, কতদিনে শোধ হবে দেনা। ছেলের চাকরির সময় দুই বিঘা ফসলি জমি নগদ হারাতে হয়েছে। এছাড়া দেনা হয়েছে আরও কয়েক লাখ টাকা। ধীরে ধীরে শোধ করছে বাপ। ধান যা পায়, হাটে নিতে মন চায় না। দাম নেই। এমন সময় মামুনের ফোনটা বেজে উঠল। চমকে উঠল ফোন হাতে নিয়ে। ধক্ করে উঠল ভেতরটা। নিঃশ^াস পড়তে লাগল ঘন ঘন। ভাবতেই পারল না, এত রাতে বাপের নাম্বার থেকে ফোন কেন। চাঁদের দিকে চোখ গেলেও সে চাঁদকে দেখতে পেল না। চাঁদটা কি ধপ করে বিল্ডিং-এর নিচে নেমে গেল; নাকি সে নিজেই একধাপ বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে গেল ? বুঝতে পারল না। ফোন ধরতে সাহস পায় না মামুন। সংবাদটা সামাল দিতে পারবে তো ? জোর করে রিসিভারে টিপ দিল। কাঁপা হাতে কানে ধরল ফোনটা। ওপাশ থেকে বাপের কণ্ঠ ভেসে এলো- ‘কিরে বাপ, ফোন ধরেন না ক্যান ? ব্যস্ত নাকি ?’

‘না আব্বা, ব্যস্ত নোয়ায়। এত রাইতে ফোন দেখি ঘাবড়ে গেছনো। তোমরা ভালো আছেন; মাও ভালো আছে, তোমার বউমা ?’

‘হ্যাঁ বাপ, হামরা সবায় ভালো আছি। টেনশন করেন না। তোমরা কী করোছেন ? কোর্টের বারান্দা পাহারা দেয়ছেন ? ভলো করি পাহারা দেও বাজান।’ বাপের আন্দাজ করে কথা বলাতে অবাক হয়নি মামুন। বাপ আগে থেকেই জানে, তার ছেলের আজ কী ডিউটি।

‘আব্বা কী জন্যে ফোন দেছনেন ? সেটা তো কইনেন না ?’

‘না, এমনিতেই দিছনু। ভাবনু কী করোছেন এখন।’

‘এত রাতে তোমরা কী করোছেন ? কারবা যেন কথা শোনা যাওছে। তোমরা কি বাইরোত ?’

‘হ্যাঁ রে বাজান বাইরোত, পিকনিক করুছি। এখন থাউক। সকালে কথা হইবে।’

‘পিকনিক করোছেন মানে ? এটা আবার কেমন কথা! তোমাক তো কখনও পিকনিক কইরবার দেখি নাই। বরং আমি কইরবার চাইলে বাধা দেছেন।’

‘সউগদিন কি সমান যায়রে বাজান? আচ্ছা, থাউক উগলা কথা। এখন থুই।’ বাপ যেন জোর করেই রেখে দিল। অবাক হলো মামুন। বাপের হলো কী? রাত দু’টোর সময় কাদের সাথে আছে বাপ? তাহলে কি বাপও আন্দোলনকারী কৃষকদের সাথে আছে? সেও কি রংপুর ডিসি অফিসে যাত্রা করবে। রাত জেগে প্রস্তুতি নিচ্ছে ওদের সাথে। বাবার মতো ভীতু মানুষ হঠাৎ সাহসী হলো কী করে? হাজারও হিসাব মিলাতে চায়, কিন্তু পারে না। এমন সময় আরও দুই ভ্যান পুলিশ এলো। দাঙ্গা পুলিশ। ছড়ানো ছিটানো পুলিশ এখন এক জায়গায়।

মাঝরাত ভোর হলো। ভোর সকাল আর সকাল দুপুর হলো। কোর্ট চত্বরে এখন মানুষের থেকে পুলিশের সংখ্যাই বেশি। দুপুর বিকাল হলো এক সময়। কিছুই ঘটল না ডিসি বিল্ডিং-এর সামনে, কোর্ট চত্বরে। দেশের কোনও ডিসি অফিসের সামনেই কিছু হলো না। কিন্তু যা হবার তা রাতেই হয়ে গেছে। চাঁদের আলোকে ফাঁকি দিয়ে, প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে হয়ে গেছে রাতেই। হইচই পড়ল দেশজুড়ে। এ কেমন প্রতিবাদ!

উত্তরের প্রায় প্রতিটি শহরমুখী পাকা রাস্তায় ধান বিছানো। তবে ধানের এই যাত্রা শহরের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত। মাইলের পর মাইলজুড়ে ধান আর ধান। ধান-বন্যায় ভাসছে পিচঢালা পথ। গাদা গাদা করে ঢালা আছে এমন নয়। আছে ছিটানোর ঢঙে। জমি হলে মানুষ ভাবত আউশের ধান বুনেছে; কিঞ্চিৎ ঘন হয়েছে এই যা। আবার কেউ বাইরে থেকে এসে হঠাৎ দেখলে ভাববে, ধান নিয়ে যাওয়া কোনও গাড়ির বস্তা ফেটে সারা রাস্তা ধান ঝরেছে। নিশ্চয় ভাড়ার গাড়ি ছিল। ধান পড়লে ধানওয়ালার পড়েছে; এতে বওনেওয়ালার কী।

কাণ্ড আর একটা যা ঘটেছে, তা আরও বিস্ময়কর। শহরমুখী রাস্তার দু’ধারের প্রতিটি গাছে ধান ঝুলছে। শহরের ভেতর রাস্তায় ধান নেই ঠিকই, তবে গাছে আছে। থোকা থোকা ঝুলছে ধান। রং-বেরঙের কাপড়ে পুঁটলি করা ধান। পিয়ারা বা পিয়ারার পাতার মতো পাতাওয়ালা গাছ হলে পথিক ভাববে পিয়ারা বাঁধা আছে। মালটার পাতার মতো পাতাওয়ালা গাছ হলে ভাববে কাপড় দিয়ে মালটা বাঁধা আছে। আবার গাছ আন্দাজ না করতে পারলে সে ভাবতে পারে, এ গাছ নিশ্চয় ধান-পীরের দরগা। মানতের উদ্দেশ্য অব্যর্থ হওয়া দরগা। তাই দলে দলে মানুষ লাইন ধরে বেঁধে গেছে ধানের পুঁটলিগুলো। আবার ভিনদেশ থেকে আসা লোক ভাববে, এ ধান একদিনে বাঁধা নয়।

হইচই এখন সারাদেশজুড়ে। সমস্ত বেসরকারি টিভিতে, রেডিওতে একই খবর। প্রতিবাদের ভাষা ধান। প্রতিবাদের ভাষা ধান-মিছিল। কোনও মিছিল নেই, মিটিং নেই, জান-মালের ক্ষতি বা প্রতিবন্ধকতা নেই। অথচ বেশ সরব প্রতিবাদ। জাগ্রত প্রতিবাদ। প্রতিবাদকারীরা এখন নীরব। সরব সারাদেশ। পরদিন সকল দৈনিকের প্রধান শিরোনাম এই প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের তরজমা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলা হলো সব। এমন কি এই প্রতিবাদকারীরা যে পরিবেশবান্ধব, সেটিও বাদ পড়ল না সাংবাদিকের খবরে। তারা বলল, কেউ পলিথিনে ধান বাঁধেনি। বেঁধেছে কাপড়ে। শহরে ধান ছিটায়নি, ছিটিয়েছে শহরের বাইরে। ধানে আগুনও দেয়নি। বরং আগুন যা দিয়েছে তা সরকার-পুষ্ট সুবিধাভোগীদের মনে।

॥ চার ॥

আব্বের হুড়মুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকল। একটা টুল ছিল বারান্দায়। সেটি নামিয়ে উঠানে বসল। বারান্দায় বসলেই পারত, কিন্তু উল্টো উঠানে বসল। বউ রুপালি গোয়াল পরিষ্কার করছিল। একবার আড়চোখে দেখল স্বামীর দিকে। দেখাতে স্বামীর সাড়া মিলল না। সন্দেহ হলো। লোকটা ঝিম ধরে বসে গেল কেন ?। মাঝপথে এসে কোনও হেরফের হলো না তো। ডাক্তার বলেছে একবার বড়ি খাওয়া বাদ পড়লে পরেরগুলো খাওয়া না খাওয়া সমান কথা। আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। বারবার মনের মধ্যে আওড়ায়, বাদ পড়ল কখন। ছয় মাস ওষুধ খেতে হবে, তিন মাস হয়েছে। আবারও ভাবে। না, বাদ পড়েনি।

আব্বেরের যক্ষ্মা ধরা পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যক্ষ্মাকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছে। তবে ভয় অতটা পায়নি আব্বের। সে জানে, যক্ষ্মা আর মরণব্যাধি নয়। শুধু গুনে গুনে ছয় মাস চিকিৎসা নিতে হবে। ভয় পায়নি রুপালিও। তার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে ঘটনাটি। সে যেন আগে থেকেই জানত, এমনটি হবে। হেন নেশাদ্রব্য নেই যা আব্বের খায় না। বিড়ি, গাঁজা, তাড়ি; সব। তবে অসুখটা যেন অসুখ নয়; আল্লার আশীর্বাদ হয়ে এল আব্বেরের ঘরে। অন্তত রুপালি তাই ভাবল। আব্বের সব ছেড়ে দিল। অবাক হয়েছে রুপালি। অবাক হয়েছে পাড়া প্রতিবেশীও । যে লোকটা বিড়ির আগুনে বিড়ি ধরায়, সে কি না সব ছেড়ে দিল। অনেকের ধারণা, যক্ষ্মাতে না মরলেও নেশা হঠাৎ ছেড়ে দেবার জন্য সে মরবে। নির্ঘাত মরবে। তবে ফুর্তি এসেছে বউয়ের মনে। সে বাড়িতে একাই দশজনের কাজ করে। তিনবার রান্না করে। গরম খাবার তুলে দেয় স্বামীর মুখে। মুরগি হাঁসের ডিম জোর করে খাওয়ায়। গাভীর বাঁট শুকিয়ে এলেও ঝুল্লু পেড়ে দুধ নামায়। বাছুর বড় হয়েছে, গাভী গাভিন হয়েছে; তবুও দুধ নামায়। এক কাপ নামুক, তাই খাওয়াবে আব্বেরকে। যক্ষ্মার ওষুধ বলে কথা। খুব কড়া। শুকিয়ে কাঠ করবে শরীর। লোকটা এমনিতেই কাঠের চ্যালা। একা একা অনেক বুদ্ধি পাকায় রুপালি। বদ্যি সাজে। মাঝে মাঝে মুরগির বাচ্চা, কবুতরের বাচ্চার ঝোল করে দেয়। থালা-বাসন, বিছানা-চাদর যতটা আলাদা করেছে, ততটাই মনে মনে কাছের করেছে আব্বেরকে।

আগে প্রায় দিনই ঝগড়া লেগে থাকত এই ঘরে। আব্বের রাতে নেশা করে টালমাটাল হয়ে বাড়ি ফিরত। তুলকালাম বাধত প্রায়ই। হাত তুলত বউয়ের গায়ে। ঘুম ভাঙত প্রতিবেশীর। তাদের ঝগড়া-মারামারিতে প্রতিবেশীরা এতদিন বিরক্ত হলেও এখন অবাক হয় না হওয়াতে। তাদের ঝগড়া-ঝাটি দিনে দিনে তাদের যে বিনোদনের বস্তুতে পরিণত হয়ে উঠেছিল, এখন তা বোঝে। কিছু একটা নাই নাই লাগে।

হাতের ঝাটাটা ফেলে উঠানে নেমে এল রুপালি। নিশ্চয় মোড়ের স্টলে কিছু একটা হয়েছে। পাড়াতে চারটি মুদি দোকান। সারাদিন মুদি দোকান হয়ে থাকলেও সন্ধ্যাতে যোগ হয় চা। দিনে মাঠে কাজ করারা সন্ধ্যায় ভিড় করে দোকানে। চায় খায়, সিগারেট টানে, টিভি দেখে আর প্রাণ খুলে গল্প করে। পাড়ার শেষ মাথার মোড়ের দোকানটায় চা হয় সকাল সাঁঝে। সেখানে সকালেও লোকের কমতি হয় না। তাছাড়া এখন মাঠে কাজ নেই। আলু উঠে গেছে। জমিতে বোরো ধান। কাজের চাপ না থাকলেও আলোচনার চাপ আছে সবার মনে। সবার মনে কৃষি-আন্দোলনের কথা। বলতে অথবা শুনতে; সুযোগ পেলেই মানুষ বসে যায় স্টলে। যার বড় মোবাইল নেই সে অন্যের মোবাইলে দেখে আন্দোলনের খবর। বিএফআর গ্রুপের কার্যক্রম। আব্বেরও গিয়ে বসে ঐ স্টলে। অবশ্য চা সে খেতে পায় না। তাকে দেওয়া হয় না। অন্য কাস্টমারের নিষেধাজ্ঞা আছে। তাকে চা দিলে তারা স্টল ছাড়বে। যক্ষ্মা বলে কথা। চা দেয় না দোকানদার। তবু সে যায়। একটু তফাতে বসে। মানুষের কথা শোনে। সুযোগ পেলে ফাঁক-ফোকরে দু’একটি কথাও বলে। যক্ষ্মা চাপা বুক পাতলা হয়। মাঝে মধ্যে রাগারাগিও হয়। রোগটা ধরা পড়বার পর থেকে আব্বেরের রাগ বেড়েছে। একটুতেই রেগে যায়। রুপালির সন্দেহ হলো, আজকেও নির্ঘাত কিছু একটা হয়েছে।

কোমরের ফাঁসারটা খুলে আব্বেরের সামনে এসে দাঁড়াল। কোমরে হাত রেখে ঝটকা মেরে বলল―‘আজক্যাও কিজু হইজে। লিশ্চয় চা খাইতে চাইজো। এত মানা করি মুড়োত যাইও না, যাইও না। কে শুনে কার কদা। এত বুলি বাড়িত থাক বাড়িত থাক, টিবি দ্যাগ. হামিই চা কইর‌্যা দ্যাওজি। না, তা লয়। ঢেমনিরে কাজে না গেলে বুক পাতলা হয় না। ক্যা এগম মুগোত ঘুঁইষা দিলো। হাপুস হইয়্যা বইসা থাকলু ক্যান। যা নাঙ্গেরে কাজে।’ কোমরে হাত রেখেই দম নিতে লাগল রুপালি। বাঁধানো শরীর। টুকটুকে রং। ঘামে আর রাগে তা এখন ভেজা। রুপালি নাম না রেখে সোনালি রাখলে ভালো হতো। রং এখন অবশ্য হলুদী। রোদে তাপে রং আর একটু পাকা হয়ে হলুদী। গড়নে রঙে সবার মনকাড়া। পাতলা ঠোঁটের নিচে আর থুঁতনির ওপরে মাঝারি তিলটা জ্বলজ্বল করে জ্বলে। সিগন্যাল বাতি যেন। চোখ পড়লে থমকাতেই হবে। কাঁপন তোলে মনে। এ গ্রামের কারও মনে রুপালি কাঁপন যে তোলেনি, তা নয়। পাত্তা পায়নি কেউ। দামি দামি চার ফেলেছে, অপেক্ষা করেছে দিনের পর দিন, কিন্তু ফাতনা নড়েনি। খ্যাচ মারা হয়ে ওঠেনি। বরং জান নিয়ে পালাতে হয়েছে। যতটা না আব্বের, তার অধিক শানানো রুপালি। এই রুপালি যদি কোনও বড় বাড়ির মেয়ে হতো, তবে দশ গ্রামে নাম ছাড়িয়ে থাকত। না তেমন ঘরের বেটি, না তেমন ঘরের বউ। এখন আবার যক্ষ্মা রোগীর বউ। বিয়ে হয়ে দশ বছর গত হয়েছে।  সন্তান হয়নি। প্রথম দিকে হা-পিত্যেস ছিল দু’জনেরই। রুপালির বেশি। এর ওর ছেলেকে জোর করে কোলে নিত। আদর করত। জোর করে চেপে ধরত বুকে। ছেলে ডুকরে কাঁদলেও সে ছাড়ত না। ছেলের গা তার কাছে শেতলপাটি মনে হতো। ঠান্ডা হয় কলিজা। এ দেখে কেউ হাসে, কেউ রুপালির কষ্টটা বুঝে ওপরে তাকায়, আল্লার কাছে নালিশ দেয়। কেউ আবার আদিখ্যেতা বলে ছেলেকে কেড়ে নেয় রুপালির কোল থেকে। তবে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে দু’জনেই। এখন খাও দাও ফুর্তি কর। ফুর্তি করবার মতো সম্পত্তি না থাকলেও ফুর্তিতে থাকবার মতো মন আছে দু’জনের। তাছাড়া সম্পদ যতটুকু আছে তাতেই তারা সন্তষ্ট। ধানী জমি যা আছে, ভাতের অভাব হয় না। বউ রুপালি একাই দশ বিঘা। হাঁস, মুরগি, গরু, সিম, লাউ, কুমড়া, কমতি নেই কিছুর। কয়েকজোড়া কবুতরও লাগিয়েছে। সকাল সাঁঝ তারাই মাতিয়ে তোলে বাড়ি। ঝগড়া করে কবুতর, রুপালি আর আব্বের তা শোনে আর হাসে। বাড়িতে দু’জন মানুষ। উঠান, বারান্দা, রান্নাঘর; সবই তাদের একান্ত ঘর। শোবার ঘর। বাহির দরজাতে খিল থাকলেই হলো। আজ রাগল রুপালি। চুপ আছে হাঁস, মুরগি, কবুতর। গাভীটাও মাথা তুলে কী যেন বলছে। রুপালি এখনও ফোঁপায়। অন্য পাশের জোগান না পাওয়াতে রাগ আরও বাড়ে। ফুঁসে উঠে বলে―‘কদা বুলোজেন না ক্যান। হামি কিন্তুক মুড়োত যামু এবার। বার জাইতারে কলিজাত ধান দিয়া কচলামু। তারা ক্যান ব্যারামা মানুষটার সাথে মরে ?’

‘তুই থামবু এবার। দ্যাশোত কী ঘইটা যাওজে, সেদিকে খিয়াল আজে ?’

‘কার ঘরোত কে ঢুকোজে যে তুমাক তা আটকান লাগবে। হামার ঘর হামার ঘর। এডা ঠিক থাকলেই হলো।’

‘মাগীর খালি বেতালা কদা। সারা দ্যাশের কিষক এক হওজে। তার সাথে তামানে যোগ দ্যাওজে; খালি হামরা ছাড়া। সেদিকে খেয়াল আজে তুর ?’

‘তা থাকুক তারা। হামরা তো রাস্তা আটকায়নি। হামরাও তাদের সাথে আজি।’

‘খালি মুগে বুললেই হলো। সবাই ট্যাকা পয়সা দিয়া আগাইয়া যাওজে।’

‘তা যাক। ওরে জমি-জিরাত ম্যালা আজে, যাওজে। হামারে তো ম্যালা নাই।’

‘এডা একটা কদা বুললু। একাব্বার, কবিরের কত বিঘা আজে শুনি ? তারাও তো দ্যাওজে।’

‘ও বুজিজি, মিনসার এই কারণে মুন খারাপ। তা যাও গরুডা বেচা দ্যাও। দিয়া আইস তারক।’

‘ভালো কইর‌্যা কদা বুলা কেউ শিগাইনি তুক, তাই লয় ?

ক’দিন থেকে স্টলে সবাই বাহাদুরি দেখাতে ব্যস্ত। কৃষক আন্দোলনের সাথে তারা যোগ দিয়েছে। বুক ফুলিয়ে নিজের দাম বাড়ায়, কে কত টাকা দিয়েছে বলে। কেউ হাঁস বেচে, কেউ মুরগি। কেউ আবার ধান। দশ টাকা হলেও দিয়ে শরিক হয়েছে। তারা ধরেই নিয়েছে, জয় কৃষকের হবেই। সময় বুঝে তখন বলতে পারবে, তাদেরও অংশীদারিত্ব ছিল সেই আন্দোলনে। কিন্তু আব্বের কিছু বলতে পারবে না। সে শুধু কথাগুলো শোনে, কিছু বলতে পারে না। আজকে স্টলে এই আলোচনা মাত্রা ছাড়ানো। আব্বেরের মনে হয়েছে, তাকেই যেন শুনিয়ে বলছে কথাগুলো। অবশেষে বসে থাকতে না পেরে গোমরা মুখে এসেছে বাড়িতে। একাব্বর পারলে, কবির পারলে সে পারবে না কোন দুঃখে। তাদের থেকে সে কম কিসে ?

‘হ্যাঁরে কইতরের কয়ডা বাচ্চা উডিজে ?’ আব্বের টুল থেকে উঠে প্রশ্ন করল।

‘ক্যান কইতরের বাচ্চা দিয়া কী করবেন ? আজক্যা মুরগির বাচ্চা রানমু।’

‘তা ঠিক আজে, তুক যা বুলোজি তাই বুল।’

‘দুই জুড়া উডিজে। এক জুড়া খাবার মুতন হইয়া উডিজে। কালক্যা একটা জবাই করমুনি।’ রুপালি কিছুটা নরম হয়। তার মনে হলো, লোকটার বুঝি ইচ্ছা হয়েছে কবুতরের বাচ্চা খেতে। মনে মনে খুশি হলো, আব্বেরের মুখে রুচি ফিরেছে বলে। এসব ভাবনার মধ্যেই আব্বের গোয়াল ঘরের চালে ঠেস দেওয়া মইটা নিয়ে কবুতরের টঙের গায়ে ভেড়াল। তার মই লাগান দেখে চিল্লিয়ে ওঠে রুপালি। কোনও কথাই আব্বেরের কানে পৌঁছায় না। সে বাচ্চা দু’টি নামিয়ে আনল। রুপালির সাথে মা কবুতরও চিল্লায়।―‘হামি তো বুলনুই ক্যালক্যা একটা জবাই করমুনি। আজকাই তুমার হকলল্লিত দেওয়া লাগবে। জিবা এতই খারাপ হইজে।’ আরও হাজার কথা বলে চলে রুপালি। আব্বের কথা বলে না। সে তার কাজ করে চলে। ততক্ষণে মাছ ধরার খলইটার মধ্যে বাচ্চা দু’টো পুরে মুখে গামছা চাপা দিয়েছে। গায়ে জামাটা দিতে দিতে কিছুটা ভেংচি কাটার ঢঙে বলল―‘বাচ্চা দুইডা আজ বেচমু, বুঝলু। যা ট্যাকা হয় আজকাই তারক দিমু। এই দ্যাখ বিকাশ নম্বর লিয়া আসিজি।’ কথাটা বলে পকেট থেকে একটা ছোট কাগজ বের করে দেখাল।

‘ও আল্লা, কী সব্বনাশে কদা গো। লিজের শরিল চলে না আর মিনসা দ্যাশ উদ্ধারে যাওজে। লিজে আগে বাঁচেক।’

‘শুনেক রুপালি, রাগ করিস না। দশ যিটে খোদা সিটে। দ্যাশের সবার ভালো হোলে হামারও হোবে।’

‘আগে তুর শরিল ভালো করেক মরা। ঝাটু মুণ্ডলের বেটার বউ দুইদিন আইসা ঘুরে গেল। তার কাছে বেচনু না। তুক খাওয়ামু বুল্যা। জামা খুইলা নিজের শরিলডা একবার আয়নাতে দ্যাগ। কঙ্কাল দেগা নিজেই ভয় পাবু।’

‘তুর মুতন রুপালি যার আজে, তার কবিতর লাগবে না। হামি কদিন পর এমনিতেই তাগড়া হমু। দেগিস, এগন যেমন যক্ষ্মার ভয়ে দুই বিছনাত থাকিস, তগন হামার ভয়ে থাকপু।’

রুপালি মনে করেছিল খলইটা কেড়ে নিবে। আব্বেরকে এক ঝটকায় ফেলে দিয়ে খলই কেড়ে নিবে। সে শক্তি তার আছে। কিন্তু খলইয়ের কাছে গেল না। ডিম পেড়ে ওঠা মুরগির মতো খানিকক্ষণ করকর করল শুধু। তবে এই করকরানি রাগের নয়, অন্য কারণে। অবশ্য আব্বেরকে তা বুঝতে দিল না। তা আড়াল করল রাগের ঢঙে। খানিক পরে সে নিজেই নিজেকে সান্ত¦না দিল। যাক, এতেও যদি লোকটা মন থেকে শান্তি পায়। মোড়ে অন্তত বুক ফুলিয়ে বসতে পারবে। বলতে পারবে তারও শরিকানা আছে। আব্বের আর কথা বাড়াল না। সে জানে, কথা বাড়ালে রুপালির সাথে পারা তার কর্ম নয়। যেমন মুখের জোর তেমনি শরীরের। বিচার দিয়ে বিচারে হারা বাদীর মতো সুড়সুড় করে বাড়ির বাইর হলো। রুপালি স্বামীর দিকে তাকাল না। ভিন্ন দিকে তাকিয়ে মনের মধ্যে হাসল শুধু। লোকটা রোগে বাইরে শুকালেও ভেতরটা আগের মতোই আছে।

আব্বের রাস্তায় উঠতেই দেখল গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পিয়ন তোতা মিয়া এক ভ্যান লাউ নিয়ে হাটে যাচ্ছে। সে আব্বেরকে ডাক দিল―‘আব্বের ভাই হাটোত যাওজেন মুনে হয়। আইস ভ্যানোত উডো।’ এই তোতা নাকি গ্রামে বেহুলার গানের দিন রুপালিকে বাদাম কিনে দিয়েছিল। আরও কয়েকদিন ঘুরেছে, কলতলায়, পুকুর ঘাটে। পাত্তা পায়নি। রুপালির ঝাঁটা তাকে ভিড়তে দেয়নি। আব্বের সব জানে। তোতার ওপর রাগটা এখনও মিলিয়ে যায়নি। আজ তবে রাগল না। আপত্তি না করে মুচকি হেসে তোতার উল্টোদিকে ছোট ফাঁকা জায়গাটাতে বসল। বসতেই তোতা বলল―‘শুনো আব্বের ভাই, ম্যালাই ইনকাম করনু বুঝলা, আজকার কদুগুলান বেচা সব ট্যাকা দিমু বিএফআর গ্রুপের ফান্ডে মানে কৃষক আন্দোলনের  ফান্ডে। সরকার এবার কাবু হইজে। কিজু একটা হোবেই।’

আব্বের কিছুই বলল না। মনে মনে হাসল। খানিক দূরে দেখতে পেল সাহাদত সরকার কয়েক আঁটি শজনে ডাঁটা নিয়ে হনফন করে হাঁটছে। তারও গন্তব্য হাটের দিকে। তাদের ভ্যানটা সাহাদতকে কাটিয়ে উঠতেই সে ডাঁটাগুলো ওপরে তুলে কী যেন ইশারা করল। তোতাও উল্টো একটা ইশারা করল লাউগুলো দেখিয়ে। দুজনের ইশারা দু’জনেই বুঝল। হয়তো বুঝল আব্বেরও। তবে তিনজনের বোঝা তিনজনের কাছেই থাকল। আব্বের জানতে চাইল না কিছু। ভ্যানে জায়গা থাকলে সাহাদতকে হয়তো ডেকে নিত। তার উপায় নেই। সে বরং খলইয়ের মুখের গামছা সরিয়ে বাচ্চা দু’টো গুনতে লাগল- এক দুই, এক দুই। যদিও গনবার প্রয়োজন ছিল না।

 (চলবে)

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares