বইকথা : মঈন শেখ-এর প্রথম উপন্যাস কুসুমকথা : খুরশীদ আলম বাবু

আজকাল কোনও উপন্যাস পাঠ করার সময় কেন জানি বারবার আমার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস পুতুল নাচের ইতিকথার কথা মনে পড়ে। প্রয়াত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ এই উপন্যাসের নায়িকা কুসুমের কথাও ভুলতে পারেননি। তিনি লিখেছেন―অনেক সময় তিনি তার স্ত্রীকে কুসুম বলে ডাকতেন। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নায়কের নাম ব্যবহার করার পথিকৃৎ প্রয়াত ঔপন্যাসিক শ্রদ্ধেয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কুবেরের বিষয় (প্রথম প্রকাশ মে ১৯৬৭) উপন্যাসেই দেখিয়ে দিয়েছেন। এবার তার পথই অনুসরণ করলেন আমাদের তরুণ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি মঈন শেখ। সদ্য প্রকাশিত তার নভেলা (প্রকরণে উপন্যাস) সেই ধারাবাহিকতার ফসল কি না, প্রজ্ঞাবান সমালোচকরা সেটা নির্ধারণ করবেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, মঈন শেখ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প, উপন্যাসের একজন ভক্ত পাঠক। সুতরাং উপন্যাসের নামকরণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব একেবারে নেই, তাও বলা যায় না। পাশাপাশি এটা ঠিক যে, মঈন শেখ মানিক যুগে বসবাসকারী লেখক নন। সুতরাং তার উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা শুধু আলাদা গোত্রেরই নয়, আলাদা অঞ্চলেরও। রাজশাহী জেলার বরেন্দ্রভূমি তানোর অঞ্চলকে উপপাদ্য করে এই উপন্যাসের ভিত্তিভূমি রচিত হয়েছে। উপন্যাস শুরু হয়েছে এক খরাক্রান্ত অঞ্চলে বৃষ্টির আগমনকে কেন্দ্র করে। গুনে গুনে চার মাস পার হয়ে গেছে তবু সেখানে বৃষ্টির আনাগোনা নেই। আসলে তারা এত লম্বা সময় টানা খরার মধ্যে পড়েনি। ঠিক এমন খরানি দিনে বৃষ্টি নামল হুড়মুড়িয়ে। গ্রামের সবাই যখন বৃষ্টিকে বরণ করার জন্য ব্যস্ত, সেই সময় একদল গ্রামবাসী শুনতে পেল মকসেদকে পাওয়া গেছে। যারা শুনল―তাদের সামনে ততক্ষণে এক কৌতূহলের দরজা খুলে গেছে। সাথে এক অশনি সংকেত। এর পরেই ঔপন্যাসিক মঈন আমাদের  প্রবেশ করিয়ে দেন এক ত্রিমুখী ভালোবাসার উঠোনে। মকসেদ ভালোবেসেছিল কুসুমকে। কুসুম শুধু বয়সেই ছোট নয়, তার বোন শরিফার সতিনের মেয়ে। এই ভালোবাসা মকসেদের পিতা-মাতা সঙ্গত কারণেই মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু মকসেদের একই কথা, সে কুসুমকেই বিয়ে করবে। মকসেদের মতো ভাগ্যবরণ করতে হলো কুসুমকে। তারও আত্মীয়-স্বজন মকসেদের মতো মারপিট করল। এক সময় পাশের গ্রামের রফিকের সাথে কুসুমের বিয়ে হয়ে যায়। অবশ্য কুসুমকে রফিক বরাবরই পছন্দ করত। এর আগে তার দুইবার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল কুসুমের পিতা। ঔপন্যাসিক এই বিষয় কয়েকটি রেখাচিত্রের মাধ্যমেই শেষ করেছেন। এরপরেই ঘটতে থাকে এমন সব ঘটনা, যা এক কথায় বলা যায় অভাবনীয়। বলা বাহুল্য এই ধরনের ঘটনা চলমান উপন্যাস-সাহিত্যে সচরাচর চোখে পড়ে না। আসলে রফিকের সঙ্গে বিয়েতে এক ধরনের কৌশল করেছিল কুসুম। কারণ সে প্রথম ভালোবাসার পাত্র মকসেদের কথা ভুলতে পারেনি। এরপরেই এক সময় কুসুম রফিকের বাড়ি থেকে উধাও হয়। অবশ্য কয়েকদিন পরেই মকসেদের বাবা সিরাজ আবিষ্কার করে, মকসেদের সাথে তারই চাতাল-ঘরে কুসুম সংসার করছে। মকসেদের পিতা সিরাজ নিজেই গ্রামের মানুষকে ডেকে সালিশের ব্যবস্থা করে। এই সালিশে সিদ্ধান্ত হয়―রফিক তার বউ কুসুমকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাবে। আর মকসেদকে হতে হবে নিরুদ্দেশ। কারণ এলাকায় তাদের  ছায়া দেখা হারাম ঘোষণা করল বিচারক।

কুসুম রফিকের সাথে ঘর সংসার করলেও তার মন পড়ে আছে মকসেদের দিকে। বলা বাহুল্য এই দ্বৈত প্রেমের কবলে পড়ে কুসুম পড়ল এক যন্ত্রণার জাঁতাকলে।  কুসুম জানতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা। মকসেদ ও রফিক দু’জনেই মনে করতে থাকে আসন্ন সন্তানের পিতা তারাই হবে। তবে মকসেদের মনে এক ধরনের অনুতপ্ততা ছিল। কারণ এক সময় তারও বোধোদয় হয়, রফিকের বৈধ স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করাটা ঠিক হয়নি। তার মধ্যে সদা কাজ করেছে একটা পাপবোধ। এই বোধ থেকে সব সময় কুসুমের খোঁজ-খবর রেখেছে। এক সময় অতি গোপনে বোরখা পরে  কুসুমের সাথে দেখা করে। অনুরোধ করে নিজের শরীর ও সন্তানের যত্ন নেবার। ইতোমধ্যে রফিক আর মকসেদের মধ্যে যে বিরোধ ছিল সেটাও কমে আসতে থাকে ক্রমশ। সন্তান প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে কুসুম ততই জড়িয়ে পড়ে দীপ্র বিবেকের তাড়নায়। এই তাড়নায় রফিকের কাছে এক সময় স্বীকার করে, মকসেদের সাথে পালিয়ে যাওয়াটা তার অন্যায় হয়েছিল। শেষাবধি কুসুম সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেলেও পেটের সন্তান পুষ্প বেঁচে যায়। বলা বাহুল্য : কুসুমের মৃত্যুর সময় দুই প্রেমিক রফিক ও মকসেদ উপস্থিত ছিল। কুসুমকে দাফনের পর দু’জন সিদ্ধান্ত নেয়, পুষ্পকে তারা দু’জন মিলেই মানুষ করবে। এক্ষেত্রে এই ত্রিভুজ প্রেম ও তাদের সন্তানকে নিয়ে একটি উদ্ধৃতির কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। গ্রন্থটির দ্বিতীয় মলাটে কোনও এক লেখক এক চমৎকার মন্তব্য করেছেন। প্রকাশক মন্তব্যকারকের নাম উল্লেখ করেননি। করলে আমাদের সুবিধে হতো। তবে তাঁর মন্তব্য পাঠে বোঝা যায়, তিনি এতটুকুও অত্যুক্তি করেননি। তিনি লিখেছেন―‘সন্তানের জন্ম দিয়ে মৃত কুসুম তার দুই প্রেমিককে অভিন্ন আবেগগ্রন্থিতে বেঁধে দেয়। অবিচল প্রেমের নিষ্পাপ আবেগে মাঠ-ভরা ধানের মতো সুঘ্রাণ ছড়ায় এই উপন্যাসজুড়ে।’

অবশ্য উপন্যাসের সংক্ষিপ্তসার এইভাবে তুলে ধরে তার মাহাত্ম্য বোঝা যাবে না। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা দরকার দেশ শারদীয়া সংখ্যায় (১৪২৬ ব.) কুসুমকথা প্রকাশিত হবার পর ঔপন্যাসিককে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। আনন্দ পাবলিশার্স তা বই আকারে প্রকাশ করবার পর এই প্রথম আমার পুরোপুরি পড়বার সৌভাগ্য হলো। উপন্যাসটি পড়ার পর আমার বারবার মনে হয়েছে, এই রকম ঘটনা আমাদের বাস্তব জীবনে ঘটে কি না। ঔপন্যাসিক সব সময় বাস্তবতার দাসত্ব করবেন এই রকম আশা করা ঠিক নয়। এই প্রসঙ্গে সমালোচক Arnold Bennett তার এক উপন্যাসকেন্দ্রিক আলোচনায় সরাসরি জানিয়ে দিয়ে আমাদের  সতর্ক করেছেন এইভাবে―

The novelist is he who, Having  seen life, and being so excited by it that he absolutely must transmit his vision to others, chooses narrative fiction as the livelist vehicle for the relief of his feelings. [Elizabeth Drew: THE NOVEL, A mordern guide to fifteen English masterpieces. Radha Publishing House, Calcutta-1995.]

একই বিষয়ে বলতে গিয়ে আর এক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও সমালোচক Jane Austen তাঁর এক লেখায় বলেছেন―It is… only some work which the greatest powers of the mind are displayed, in which the most thorough knowledge of human nature, the happiest delineation of its varieties, the liveliest effusions of wit and humour, are conveyed to the world in the best-chosen language.  [পূর্বোক্ত গ্রন্থ থেকে]

এই দু’জন বিখ্যাত সমালোচকের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেবার আর একটি কারণ হলো, মঈনের উপন্যাসজুড়ে আমরা দেখতে পাই ঐ কথাগুলোরই ছায়াপাত। মঈন আসলে সেই গোত্রেরই কথাকার। তাহলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, ঔপন্যাসিক মঈন তার হৃদয়-কন্দরে যে ভাব-ভাবনা ধারণ করেছিলেন―তার অনুভূতির দীপ্র বহিঃপ্রকাশ এই উপন্যাসে করেছেন। এটাই তো একজন ঔপন্যাসিকের অন্যতম কাজ।

এখন দেখা যাক―মঈন সেই কাজটি কতটা সততার সাথে সম্পাদন করেছেন। যদিও আমার মতো অনেক মনোযোগী পাঠকের দৃষ্টিতে কুসুমকথা একটি নির্ভেজাল প্রেমের উপন্যাস। কিন্তু উপন্যাস শুরু হয়েছে একটি খরাক্রান্ত অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক বর্ণনা দিয়ে, যার শুরুতেই পাঠক চমকে যায় তার বর্ণনায়। শোনা যাক সেই বর্ণনা :

ওহেদ আলী দাওয়ানকে এই অসময়ে মসজিদের বারান্দায় দেখে কেউ অবাক হয়নি। অবাক হয়নি তার ওজু করে টুপি পরা দেখে। কারণ এমন কর্ম এখন গোটা গ্রামজুড়েই হচ্ছে। হিন্দুপাড়া থেকে শঙ্খধ্বনিও ভেসে আসছে বারবার। ওহেদ শুকরিয়া আদায়ের জন্য দুই রাকাত নামাজ পড়বে। পশ্চিমপাড়া থেকেও এল দুইজন। আজ আকাশে মেঘ দেখা গেছে।

এই বর্ণনাকে খুব একটা রোমান্টিক বলা যাবে না। বরং এর মধ্যে জড়িয়ে আছে এক ধরনের বাস্তববাদী চেতনা। সেই হিসেবে ঔপন্যাসিক মঈন শেখ দুই চেতনাকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন উপন্যাসের ভেতরদেশে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা উপন্যাসের এই প্রথমাংশ সবচেয়ে শিল্পোৎকর্ষময় জায়গা। এখানে এমন অনেক বর্ণনা আছে যা বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। উপন্যাসে বর্ণিত তানোর অঞ্চলকে এইভাবে আমাদের আর কোনও ঔপন্যাসিক এত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন বলে আমার জানা নেই। এ যেন আমেরিকান ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারকে মনে করিয়ে দেয়। আবার কোনও কোনও সময় সতীনাথ ভাদুড়ীকে।

১০২ পৃষ্ঠার মধ্যে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে। যদিও প্রকাশক মহোদয় একে নভেলা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবুও এক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য হলো কুসুমকথা আদতে একটি নির্ভেজাল উপন্যাস। আসলে উপন্যাস কত পৃষ্ঠার মধ্যে হতে হবে এর কোনও কড়াকড়ি নিয়ম নেই। অনেক আগেই আমাদের নজরে এসেছে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের পুরস্কারপ্রাপ্ত ৯২ পৃষ্ঠার দি ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সীর মতো উপন্যাস।

মঈনের এই উপন্যাস পড়ে আমার শেষাবধি মনে হলো―আসলে প্রেমের আবডালে এক ধরনের অনুতাপবোধের মহৎ কাহিনি। কারণ কুসুম কোনও সময় ভুলতে পারেনি তার প্রথম প্রেমিক মকসেদকে। আবার সে রফিকের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও প্রথম প্রেমিকের সাথে কয়েকদিন চাতালে বসবাস করার ঘটনা তার মন থেকে কখনও মুছে যায়নি। বলা বাহুল্য তার অনুতপ্ততা এতটাই প্রবল ছিল, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সেই ঘটনা বারবার তাকে আঘাত করেছে। মঈন শেখ এই অনুতাপবোধ এত প্রবলভাবে তুলে ধরেছেন, যা কোনওভাবেই ভোলা যায় না। এই বেদনাবোধ পাঠক-হৃদয়ে শেল হয়ে গেঁথে যায়। বলা বাহুল্য এটাই হলো এই উপন্যাসের অন্যতম Turning point।  ঔপন্যাসিক আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন চিরায়ত মুসলিম বাঙালি রমণী কুসুমের মনোবেদনার কথা। যা আমাদের মনেও আঘাত করে। বেদনার রিনরিনে স্রোত উন্যাসের পাঠ শেষে অনেকক্ষণ থেকে যায়। স্বাভাবিক কাজে ফিরে আসতে কষ্ট হয়। শোনা যাক এর একাংশ :

এবার কুসুমের কষ্টটা দেখা যায় না। তবে রফিকের কষ্ট পড়া যায়। দু’জনার কষ্ট দুইভাবে গ্রাস করল ঘরটাকে। কিন্তু শেষ রক্ষা আর কুসুমের হলো না। পারল না অবশেষে। আবার হঠাৎ কী মনে হয়ে কুসুম লাফ দিয়ে উঠল। শক্তি পেল ওঠার। উঠল রফিকও। রফিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুসুম গড়মড়িয়ে রফিকের পা জড়িয়ে ধরল। ডুকরে কেঁদে উঠল―রফিক আমাকে মাফ করে দিও। আমি তোমার প্রতি অনেক অবিচার করেছি। আমি কোনওদিনই তোমার যোগ্য ছিলাম না। আমি নাপাক, বড় নাপাক। কুসুম হামলে পড়ল রফিকের পায়ে। ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলল।

 এখানে পাঠক হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন এটা তো প্রেমের উপন্যাস নয়, প্রেম এখানে উপলক্ষ্য মাত্র। হয়তো তাই।

এদিকে দু’জনার ঘর সংসার করা কুসুম রেখে যায় মেয়ে পুষ্পকে। দুজনেই আঙ্গুল গুনে হিসাব করে সন্তানটা কার হলো। এই রকম অভাবিত ঘটনাবলি  দিয়ে এই রকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এ যাবৎ সৃজন হয়েছে বলে এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে ভয় হচ্ছিল মঈন শেখ শেষ পর্যন্ত এর কূল রক্ষা করতে পারবেন তো! রুদ্ধশ্বাস পাঠ শেষে মনে হলো―ঔপন্যাসিক দ্বিধাহীনভাবে পৌঁছে গেছেন সফলতার দ্বারপ্রান্তে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একবার সমরেশ বসু’র কয়েকটি গল্প পড়ে মন্তব্য করেছিলেন― এগুলো ঈশ্বরের হাত দিয়ে লেখা হয়েছে। সেই রকম মন্তব্য করলে অনেকে হয়তো ঔপন্যাসিকের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলতে পারেন। ব্যাপারটা মোটেও সেই রকম নয়। এই উপন্যাস পড়ে আমাদের  মনে হয় না, এটা মঈন শেখের প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসের ঘটনা পরম্পর এমনভাবে সাজিয়েছেন, তাতে করে আমাদের চাওয়া পাওয়ার প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে যেন অনেকদিন পরে আমাদের উপন্যাস সাহিত্যে একজন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেলাম। উপন্যাসের কুশীলবদের চরিত্র অল্প বর্ণনায় চমৎকারভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন। মূলত কুসুমকে কেন্দ্রায়িত করে গল্প এগিয়ে গেলেও―মকসেদ ও রফিকের চরিত্র চিত্রণেও ঔপন্যাসিক পিছিয়ে থাকেননি। তারাও স্বতন্ত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একেই বলে ঔপন্যাসিকের নিরপেক্ষতার চমৎকার উৎসারণ। তবে মকসেদের ভাগ্য বিপর্যয় আমাদেরকে দুঃখবোধে আক্রান্ত করে ছাড়ে। আর তার জন্য এক দুঃখবোধ-তুল্য ভালোবাসা আমাদের হৃদয়-কন্দরে ছড়িয়ে যায়। শেষাবধি কুসুমও হয়ে ওঠে উপন্যাসের অন্যতম কুশীলব। দ্বৈত প্রেমের কবলে পড়ে মানসিক বেদনাবোধ তাকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর এখানে পাঠক হিসেবে বারবার একটি প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে―এই উপন্যাসে কুসুমের মৃত্যু অপরিহার্য ছিল কি না ? অনেক ভাবনাচিন্তার পর আমার মনে হয়েছে―ঔপন্যাসিক এমন এক জটিল পর্যায়ে উপন্যাসের শেষাংশে নিয়ে গেলেন, যার ফলে উপন্যাসের শেষ হতে হয়তো দেরি হতো। কারণ, যেখানে দুই প্রেমিক ভাবছে সদ্যোজাত শিশুর বাবা তারাই। শিশুটিকে দেখতে এসে অনেকেই অনেক কথা বলছে। কেউ আবার বলে, ছেলে কার মতো হয়েছে। তখন চমকে ওঠে মকসেদ। চমকে ওঠে রফিক। অবশ্য সুখী খালা (পেশায় দাই মা) রেহাই দিলেন তাদের। খালা ঐ শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন―মুখটা পেয়েছে অবিকল কুসুমের মতো। ঔপন্যাসিকের ভাষায় :

মকসেদ আঙুলের গিট গোনে। নয় মাস পার হয়েছে। রফিকও আঙুল গোনে। আট মাস পার হয়েছে। এক মেয়ে পুষ্পের দিকে খানিকটা হিলে বলল―খালা, কার মতন হয়েছে, মা না বাপের মতন ? প্রশ্নটা শোনামাত্র থমকে গেল রফিক, থমকালো মকসেদ। তাদের সকল চিন্তাতেই ছেদ ঘটল। তাই তো, কার মতন হয়েছে ? পরক্ষণেই তারা যেন বিপদ থেকে রক্ষা পেল। পাথর নামল বুক থেকে। রক্ষা করল সুখী খালা।―না রে, এই ছুঁড়ি ঠিক মায়ের মতন হয়েছে। কুসুমের মুখটা একেবারে কেটে নিয়েছে। দেখিস, বড় হলে একে মানুষে কুসুম ভেবে ভুল করবে। দু’জনেই কাঁধ ঘুরিয়ে দেখল পুষ্পের দিকে।

আর এইখানেই ঔপন্যাসিকের দক্ষতা আমাদের মুগ্ধ করে। আগেই বলেছি তার সৃজনশীলতা আমাদের প্রত্যাশাকে রীতিমতো অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আলোচানার এই পর্যায়ে ভাষার বিষয়ে আলোচনা না করলে মনে হচ্ছে আলোচনায় খামতি থেকে যাবে। কারণ, উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সাথে তার ভাষা একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কাহিনির পাশাপাশি আঞ্চলিক উপভাষার চমৎকার গাঁথুনিও আরেক সম্পদ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সঙ্গত কারণে এর ব্যাপক আলোচনা করা গেল না। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমার এও মনে হয়েছে, উপন্যাসের ভাষা এত বেশি দ্রুততর হয়েছে যে, ফলশ্রুতিতে পূর্বের ঘটনাবলি খানিকটা সময় আমাদের ভুলিয়ে দেয়। অবশ্য আমি এটাকে কোনওভাবে দোষণীয় মনে করি না। তবে উপন্যাসের প্রথম পর্বে ভাষার যে ঘনবদ্ধতায় আমি জড়িয়ে গিয়েছিলাম, তা হয়তো এর শেষাংশে তার অপ্রাপ্তি থেকে গেছে। আবার আমি খুশি এই কারণে যে, তিনি কাহিনিসমৃদ্ধ উপন্যাসটিকে চমৎকার একটি বোধের মধ্যে সমাপ্তি টানতে পেরেছেন। কেননা এর বাইরে  যাবার তার কোনও উপায় ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে―ঔপন্যাসিক মঈন শেখ আমাদের একটি উপেক্ষিত অপরিচিত অঞ্চলের এক অস্বাভাবিক কাহিনি শোনাতে চেয়েছেন। উপন্যাসের স্বাভাবিক ধর্ম অনুয়ায়ী নায়ক নায়িকাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক থাকবেই। এখানেও রয়েছে। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ঘটনাবলিকে দক্ষতার সাথে সামলে নিয়ে গ্রন্থিত করেছেন―বিপন্নতার প্রতিচিত্রায়নের মধ্য দিয়ে। ঔপন্যাসিক আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন―কুসুম মারা গেলেও পুষ্প নামে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, সেটাকে নিয়ে মকসেদ স্বপ্ন দেখছে। যার বিবরণ লেখক দিয়েছেন এইভাবে :

এখন তুমুল বৃষ্টি। কুঁজো নিমগাছটা যেন আরও হেলে গেছে। মকসেদ ভিজে একাকার। রফিক গলা ফাটিয়ে ডাকছে কিন্তু মকসেদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। লম্বা করে বিজলি চমকাল। সেই শব্দে বাস্তবে এল মকসেদ। উঠল না। ভিজতে ভালো লাগছে। আজকে যেন মরতেও ভালো লাগবে। ভাবনাটা মোড় নিল। ভাবনা মোড় নিয়ে এল পুষ্পের কাছে। পুষ্প, তার পুষ্প। কুসুমের পুষ্প, রফিকের পুষ্প। পুষ্প তিনজনের। দু’জন আছে একজন নেই। কুসুমের ভাগ মকসেদ নিল। পুষ্প এক, রক্ষাকারী দুই। না, তিন। রফিক এক, মকসেদ দুই। এভাবেই সমস্ত ভাবনাজুড়ে পুষ্প এল। আর এর মাঝেই আরও একবার বিকট শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোতে মকসেদ দেখতে পেল অনেক দূর। তাদের পুষ্পের শরীরে কোনও নামি-দামি বিদ্যালয়ের পোশাক। মাথার দু’পাশে বেনি ঝুলছে। লাফাতে লাফাতে বের হচ্ছে বিদ্যালয় থেকে। বাইরে বসে আছে মকসেদ। বসে আছে রফিক। একদিন রফিক, একদিন মকসেদ। আবার কোনওদিন দু’জনেই।

আমি যে লাইনগুলো তুলে আনলাম―সেটা আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের একেবারে শেষ বাক্যমালা। এই সমাপ্তিসূচক লাইনগুলো পড়ে মনে হলো, মঈন শেখকে আমাদের মত পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে ‘পুষ্পকথা’ নামে আরও একটি উপন্যাস লিখতে হবে। যেভাবে শ্রদ্ধেয় ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পথের পাঁচালী লিখে ক্ষান্ত হননি। পরবর্তী পর্যায়ে লিখলেন তার অসামান্য স্মরণীয় উপন্যাস অপরাজিত। যেখানে পেলাম আরেক উজ্জ্বল চরিত্র অপুর ছেলে কাজলকে। আশা করি ঔপন্যাসিক মঈন শেখ এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব লিখে আমাদের উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবেন।

আলোচনার শেষাশেষিতে এসে আর একটি বিষয় উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। সেটা  হলো ঔপন্যাসিকের কথোপকথন নির্মাণের ক্ষমতা। এর ডায়ালগ এতটাই যথাযথ হয়েছে, তার প্রশংসা আমাকে করতেই হবে। মাঝে মাঝে নাটকীয়তা সৃষ্টির নেপথ্যে এই ডায়ালগ এমনভাবে জড়িয়ে গেছে―যেটা রীতিমতো বিস্ময়কর। আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় রবি ঠাকুরের অমর কবিতা―‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণি।’ ডায়ালগ থেকে একটি উদ্ধৃতি এখানে দেওয়া যেতেই পারে। অন্তঃসত্ত্বা কুসুম আর রফিক শুয়ে হাজারও ভাবনা ভাবছে। অনেক কথার মাঝে এক সময় কুসুম রফিককে বলে :

‘ছেলেমেয়ের নাম কিন্তু আমি রাখব।’ কুসুমের কথাতে কাতরতা।

‘ঠিক আছে রাখবে। কিন্তু কী রাখবে। ভেবেছ কিছু ?’

‘ভেবেছি, কিন্তু তোমার পছন্দ হবে কি না জানি না।’

‘নির্ঘাত হবে, বলো।’

‘মেয়ে হলে নাম দিব পুষ্প। তোমার পছন্দ হয়েছে ?’

‘বাহ! চমৎকার। কুসুমের মেয়ে পুষ্প। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এটাই ফাইনাল। ছেলের নাম কী রাখবে ?’

‘ছেলের নাম পলাশ। এটা কেমন হলো ?’

‘এটাও সুন্দর। দুটোই ফুল। না না, তিনটাই ফুল। তুমি ফুল, তোমার ছেলে ফুল, তোমার মেয়ে ফুল। আমার ঘর হবে ফুলের বাগান। আর আমি হব মালী। এত সুখ রাখব কোথায় কুসুম ?’ একটা মৃদু ধাক্কা দিল কুসুমকে।

‘আচ্ছা হয়েছে, এবার ঘুমাও।’

‘পলাশ নামটা সুন্দর। ফুলটাও আমাকে ভালো লাগে। কিন্তু গন্ধ নেই।’

‘অত গন্ধ থাকা লাগবে না। সুন্দর হলেই চলবে।’

‘কেন গো কুসুম, তোমর তো খুব গন্ধ।’ কুসুমের বুকের কাছে নাকটা নিয়ে বুক ভরে শ^াস নিল রফিক। কুসুমও রফিককে মৃদু ধাক্কা দিল।

‘আচ্ছা কুসুম, তুমি কী ফুল বললে না তো। তুমি গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা নাকি গোলাপ।’

‘আমি ধুতুরা ফুল।’

‘ছিঃ ধুতুরা হবে কেন ? খবরদার অমন কথা আর বলবে না। তুমি আমার সূর্যমুখী, গোলাপ, গন্ধরাজ, শিউলি, শাপলা, সব।’

সমস্ত উপন্যাসজুড়েই রয়েছে এমন অনেক কথোপকথন, যা এই উপন্যাসের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। পাঠককে গতি দিয়েছে পাঠে।

কুসুমকথা মঈন শেখের প্রথম উপন্যাস হলেও এই উপন্যাসটিকে সমালোচকেরা তাদের প্রয়োজনে বারবার আলোচনায় আনবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে। কারণ এই উপন্যাসে রয়েছে মানব-মানবীর চিরায়ত অপ্রাপ্তি বেদনাবোধের কণ্ঠস্বর। আর এ ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক রেখেছেন শক্তিময়তার স্বাক্ষর। কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেছেন। মুদ্রণ প্রমাদ নেই বললেই চলে। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন প্রসেনজিৎ নাথ। মূল্য রেখেছেন ভারতীয় রুপি দুইশত টাকা। আমি উপন্যাসটির বহুল প্রচার কামনা করি।

 লেখক : কবি ও গল্পকার 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares