গল্পের বয়ানে বঙ্গবন্ধু : স্বপন রুদ্র

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-গল্পগ্রন্থ

ল্প, সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন ও রূপায়ণের প্রয়াস লক্ষণীয়। একইসাথে উত্তরাধিকারের দায় থেকেও শ্রদ্ধা জানাতে। বাঙালি সাধারণ মানুষ ও শিল্পীর ক্ষেত্রে এর কোনও বিকল্প নেই। যেক্ষেত্রে অস্তিত্বের সংযোগ। কথাসাহিত্যে যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করেছেন লেখকেরা। এর মধ্যে অন্যতম সেলিনা হোসেন সম্পাদিত নির্বাচিত গল্পে বঙ্গবন্ধু (২০২০) সংকলন। বস্তুত, এ সংকলনে গৃহীত গল্প বাছাই ও সম্পাদনায় শিল্পরুচি লক্ষণীয়। এ গ্রন্থে মোট ৪৩টি গল্প সংকলিত হয়েছে। সংকলনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো : অধিকাংশ গল্পই নতুন। প্রবীণ থেকে শুরু করে এ প্রজন্মের লেখক পর্যন্ত স্থান দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে খেয়াল রাখা হয়েছে গল্পের বিষয়বৈচিত্র্য। ফলত, সংকলিত গল্পগুলো থেকে সময়, সমাজ ও দৃষ্টিকোণের পরিচয় উপলব্ধি করা সম্ভব। বঙ্গবন্ধুকে জানা ও কথাসাহিত্যে আগ্রহী পাঠকের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সংকলন। যেক্ষেত্রে আবেগ, এবং এর চেয়ে বেশি ইতিহাস ও ঘটনার যৌক্তিক উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন গল্পের প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিত্ব, মানবতাবোধ, আন্দোলন, কারাজীবন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও ’৭৫ পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা, সামাজিক পরিস্থিতি, মানুষের মনোজগৎ অবলোকনের প্রয়াস রয়েছে। সারার্থে আমরা পাঠক হিসেবে সত্য ও বাস্তবতার মুখোমুখি হই, এবং নিজের জন্য প্রশ্ন তৈরি করি। সংকলনের পটভূমি সম্পর্কে সম্পাদক বলেছেন ভূমিকায়। যেক্ষেত্রে সাহিত্য, জীবন ও সমাজ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাষণের কিছু কথা উদ্ধৃত করেছেন। ‘যারা সাহিত্য সাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাঁদেরকে দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হতে হবে। দেশের জনগণের চিন্তা-ভাবনা এবং সামগ্রিক তথ্যে তাঁদের জীবনপ্রবাহ আমাদের সাহিত্যে ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সাহিত্যে-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এ দেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা।’ [পৃ ৯] এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেলিনা হোসেন বলেছেন তাঁর অনুভব ও প্রত্যাশার কথা। যেমন : ‘এদেশের শিল্প-সাহিত্যেও ছায়া ফেলেছেন বঙ্গবন্ধু। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে তাঁর ভূমিকা, নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য, আঁকা হয়েছে ছবি; রচিত হয়েছে ছড়া-গান-কবিতা। একাধিক উপন্যাস ছাড়াও বহু গল্পও লেখা হয়েছে। গল্পের সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। এই গল্পসংকলনটি এক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে―এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।’ [পৃ ৯]

গ্রন্থিত গল্পগুলোতে বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। একইসঙ্গে, স্মরণ, শ্রদ্ধা নিবেদনও রয়েছে। চমৎকারভাবে অঙ্কিত হয়েছে, মানুষের মনোজগতে চিরায়ত হওয়া বঙ্গবন্ধুর নির্মাণ। যাঁর নাম ও কর্ম মুছে ফেলার অপচেষ্টা ও ব্যর্থপ্রয়াস। সকলেই জানেন, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা কম হয়নি। ’৭৫-এর পর পাঠ্যবই থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের এমন কোনও কার্যক্রম নেই, যেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ পড়েনি। এমন সময়ও আমরা অতিক্রম করেছি, যে সময়ে কোথাও এ নামটি ছিল না। বাংলাদেশে এমন বিরোধীপক্ষ তৈরি হতে পারে, বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে দেবে না এমন ব্যক্তি, গোষ্ঠী থাকবে, তা ভাবাই যায় না। বাস্তবে তা হলো, এবং তারা সগৌরবে অস্বীকার, হত্যা, মুুছে ফেলার সংস্কৃতি চালু করল। তবে শেষরক্ষা হয়নি। বাস্তবতা, সত্য সবই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু হলো। অনেক গল্পে অনুষঙ্গে এসেছে এই বাস্তবতা ও সমাজমনস্তত্ত্ব। উচ্চকিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে মনে প্রাণে ধারণ করা সাধারণ মানুষের জীবন। এসব মানুষ নিজের দায় থেকে ধারণ করেছে, শ্রদ্ধায় প্রাণের কুঠুরিতে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরজাগরুক রেখেছে। এই সত্য প্রমাণিত এখন, এবং গল্পের প্রতিবেদনে প্রকাশিত―শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব  অভিন্ন প্রক্রিয়া মাত্র। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী বিভিন্নক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে ঠিকই; কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করার চেষ্টা তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়। এ পরাজয় থেকে তারা বিবিধ অপপ্রচার তৈরি করেছে ও করছে। এ বার্তাটিও আমাদের সাহিত্য, শিল্পকলায় উঠে এসেছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে সারাদেশে স্তব্ধতা নেমে আসে। এ নীরবতা, স্তব্ধতা কি প্রকাশ করে ? বাহ্যিকভাবে আমরা শক্তিপ্রয়োগকারী কতক লোকের প্রচার, প্রকাশে হয়তো মনে করি―সবই শেষ। মিথ্যের বয়ানই শক্তিশালী ও সত্য। কিন্তু নিরস্ত্র মানুষের ভাষা আমরা বুঝতে চেষ্টা করিনি। শোকে মুহ্যমান জাতির মধ্যেও প্রতিবাদ ছিল, ঘরে, অন্তরে। ঘৃণার প্রকাশ ছিল ভিন্ন। অসংগঠিত প্রকাশ বা স্তব্ধতার ইংগিত আমরা বুঝিনি। সেই দুঃখ, বেদনা, যন্ত্রণা, ক্রোধ ও দ্রোহের ভাষাই তুলে ধরা হয়েছে কয়েকটি গল্পের প্রতিবেদনে। এসব গল্প সংশ্লিষ্ট লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতির সাথে অঙ্গীভূত হয়েছে প্রান্তীয় মানুষের আবেগ ও উপলব্ধি। যেখানে এ গল্পগুলোর সার্থকতা, ও শিল্পবীজ অঙ্কুরিত হয়েছে।

সংকলিত গল্পগুলোর অধিকাংশতে সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থাকায় শ্রেণিকরণ করা মুশকিল। কোনও লেখক হয়তো একটি বিষয়কে ধরে আগ্রহী ছিলেন গল্পের আখ্যান তৈরিতে। অবশেষে দেখা গেল অনেক ঘটনা ও বিষয় হয়েছে অনুষঙ্গী। গল্পের নির্ধারিত ক্যানভাসে বিচিত্র রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে, গল্পের বার্তা স্পষ্ট ও শানিত হয়েছে। স্পষ্টত, গল্পগুলোর সারাংশ এককথায় টানা যায় না। তবুও আমরা একটা সাধারণ শ্রেণিকরণের চেষ্টা যেভাবে করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রোহ ও প্রতিবাদ প্রতিফলিত হয়েছে রাজপথে, শিল্প-সাহিত্যে। এ গ্রন্থে ’৭৫ এর হত্যা ও প্রতিক্রিয়াসংশ্লিষ্ট গল্প হলো : আবুল ফজলের মৃতের আত্মহত্যা, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের স্বপ্নচারী স্মৃতিময়, আবু ইসহাকের মৃত্যু-সংবাদ, জুলফিকার মতিনের ভোররাত্রির হত্যাকাণ্ড, ইমদাদুল হক মিলনের নেতা যে রাতে নিহত হলেন, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের তিনপুরুষ, ইমতিয়ার শামীমের মেঘমুখর রক্তমুখর, আনিসুল হকের কালো ভোর, মাজহারুল ইসলামের জালাল মাস্টারের সংসার, অনীলা পারভীনের বঙ্গবন্ধুর চোখ।

এ সংকলনের প্রথম গল্প―মৃতের আত্মহত্যা। এ গল্পে অসামান্য শিল্পিত বয়ানে নির্মিত প্রতিবাদ ও দ্রোহ। সাধারণের মতো খুনিদের গোষ্ঠী ও সমাজ রয়েছে। আদিকাল থেকে এর আলাদা বৈশিষ্ট্যও খুঁজে পাওয়া যায়। একটি কথা বলে রাখা ভালো―খুনিদের মাঝে রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অস্তিত্ব । যারা সরাসরি ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে, আর পেছনে বসে ব্যক্তি বা দল পরিকল্পনা করে এবং সমর্থন জোগায়। আবার আরেক ধাপে রয়েছে―অপরাধ বা একটি ঘটনাকে ছড়িয়ে দিতে, বৈধতা আরোপে কিংবা এটার পক্ষে সমর্থন আদায়ে তৎপর থাকে। এভাবে নানাগোষ্ঠীর ক্রিয়াকর্ম আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের ঘটনাবলিতে পর্যবেক্ষণ করেছি। খুনিপক্ষ প্রচার করত এবং এখনও করে―বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কোনও প্রতিবাদ হয়নি। মানুষের মনে কোনও দুঃখবোধ ছিল না, ইত্যাদি। এমন মিথ্যের বিবরণ শুনতে শুনতে আমরা অভ্যস্ত। এসব কথার পক্ষে সম্মতিও তারা উৎপাদন করে। তবে এসব মিথ্যে প্রচারই শেষ কথা নয়। ঐতিহাসিক সত্য হলো―প্রতিবাদ, ও বিদ্রোহ হয়েছে। নির্বিচার হত্যা ও ফাঁসি দেওয়া হয়েছে অনেক বিদ্রোহীকে। অনেকের স্বজনেরা জানেই না, কখন কীভাবে কে মারা গেছে, বা হারিয়ে গেছে। নির্যাতন, নিবর্তনে অনেক মানুষ হারিয়েছে তাদের অস্তিত্ব। সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তাপ চাপা ছিল দীর্ঘ সময়। আমরা জানি, প্রতিবাদ ও দ্রোহের নানা ধরন আছে। সে সময় অস্ত্রের মুখে, স্তব্ধতার দেয়াল ভেদ করে হয়তো গণবিক্ষোভ হয়নি। এর মধ্যেও সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছে। অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন। কারাগার বরণ করেছেন।

মৃতের আত্মহত্যা গল্পের কথক সোহেলী একদিন জানতে পারে তার স্বামী য়ুনুস বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত। স্বভাবতই সে তা মেনে নিতে পারেনি। তার গর্ভস্থ সন্তান খুনিপিতার সন্তান হিসেবে পরিচিত হোক, তা সে চায়নি। সব জানার পর সোহেলী মেজর স্বামীর সঙ্গে যৌনমিলনে বিরক্তিবোধ করে। সে ভাবতে থাকে ‘একটা খুনির সন্তানকে কী করে সে পেটে ধরবে, কী করে বহন করবে, কী করে করবে প্রসব ? এখন থেকে প্রতিমুহূর্তে তার কাছে অসহ্য, দুর্বহ হয়ে উঠেছে জীবন।’ অতঃপর সোহেলী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে―এ জীবন আর রাখবে না। তার প্রথম সন্তান বকুলকে দেশে মা-বাবার কাছে পাঠানোর বিষয়টিও ইঙ্গিতময়। একদিন সকালে মেজর য়ুনুস দেখে : ‘রান্নাঘরের পাশের ফালতু কুঠুরিটায় হঠাৎ দেখতে পেল ছাদের বিমের সঙ্গে সোহেলীর দেহটা ঝুলছে, গলায় গিঁট দিয়ে জড়ানো তার বিয়ের বেনারসি শাড়ির আঁচল।’ [ পৃ ৩২] 

মৃত্যু-সংবাদ গল্পে মৃত্যুকে ভিন্নমাত্রায় দেখিয়েছেন লেখক। আদর্শিক মৃত্যু লেখকের কাছে অনেক বড় হয়ে ওঠে। আফতাব, বন্ধু তাসাদ্দুকের জীবন ও তার চলাফেরা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কখন কীভাবে মৃত্যু হয়, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতেন। কিন্তু সত্যি এ মৃত্যুর শঙ্কা বাস্তবে আফতাব দেখেন যখন তাসাদ্দুক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, খুনিদের সমবায়ে গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছে, সেদিনই আসলে তাসাদ্দুকের সত্যি মৃত্যু হলো।

একইভাবে নেতা যে রাতে নিহত হলেন গল্পের রতন অসাধারণ এক চরিত্র। অতি সরল ভাষায় লিখিত একটি গল্প। কিন্তু এর বক্তব্য পাঠকের মনোজগতে নাড়া দিতে সক্ষম। রতন গ্রাম থেকে অচেনা ঢাকা শহরে আসে তার প্রিয় নেতাকে দেখতে। অথচ, সে নেতার বাড়ি, ঘর পথ ঘাট কিছুই চিনে না। ভালোবাসার সাহসে রতন প্রিয় নেতার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। নিজের হাতে চাষ করা কালিজিরা ধানের চিড়া নিয়ে আসে নেতার জন্য। এ নেতা হলেন সকলের প্রিয়―বঙ্গবন্ধু। রতন পথে পথে জিজ্ঞাসা করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে চলে আসে। পুলিশ রতনকে সন্দেহ করে থানায় নিয়ে যায়। বাড়ি থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা চিড়া পাঠানো হয় পরীক্ষার জন্য। এ গল্পে শ্লেষ আছে, একইসঙ্গে আছে সমাজবাস্তবতা। সারাদেশে যে সামাজিক অবিচার ও অনাচার তৈরি করেছিল মতলববাজরা, এমন চিত্র আমরা এ গল্পে পেয়ে থাকি। একসময় দেখা গেল সরল, সহজ রতন নির্দোষ, তার চিড়া গিলে খাছে পুলিশ। তখন আদেশ হয় রতনকে ছেড়ে দেওয়ার। কিন্তু সে সময় ও সুযোগ রতনের জন্য আর আসেনি। তাকে ছেড়ে দেওয়ার সময় অফিসার জানায়, ‘নেতা কাল রাতে নিহত হয়েছেন। আমরা খবর পেয়েছি। তার খুব ঘনিষ্ঠ লোকজন, নেতার আদর্শে বিশ^াসী, একই রাজনীতি দীর্ঘদিন করেছে এমন কেউ কেউ ষড়যন্ত্র করে নেতাকে হত্যা করেছে। তোমার ওপর আমি অবিচার করেছি ভাই। যাও, বাড়ি যাও!’ [পৃ ১৫৪] রতন পূর্বাপর লোভী অফিসার ও তার সহকর্মীদের আচরণ লক্ষ করছিল। সে গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক সন্তান, তাকে আটকানো হয়েছে―নেতার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু খুনিদের তারা আটকাতে পারেনি। বিক্ষুব্ধ মন নিয়ে রতন বলল―‘আমাকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না সাহেব, আমাকে হাজতেই রাখুন। ছেড়ে দিলে নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেব আমি।’ [পৃ ১৫৪]

ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটলো আগস্ট মাসে। এ ছাড়া আগস্ট-ট্র্যাজেডির প্রতিবাদ, বিদ্রোহে নানামুখি তৎপরতা ছিল। রাজপথে শুধু যে লড়াই হয়, তা নয়। যুদ্ধ হতে পারে বিভিন্নভাবে, তা-ই হয়েছে। মূল কথা হলো, মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল। মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সে লড়াই চলমান এখনও। পাঠকমাত্রেই জানেন, লেখকরা শুধু বহির্বাস্তবতা লিখেন না, অন্তর্বাস্তবতাকে রূপায়ণ করেন। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখিত কথাসাহিত্যে আমরা লক্ষ করি এমনই শিল্পিত প্রতিধ্বনি। যেমন, তিনপুরুষ গল্পে ঘৃণা প্রকাশের ধরন আমরা অবলোকন করি। খুনিদের দিকে, তাদের বাড়িতে, ফটকে জুতা ছুড়ে মারা হয়। জুতা-স্যান্ডেল ঝুলিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখি। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও। লেখক চমৎকৃত করেছেন গল্পে অঙ্কিত চরিত্রের নামসহ ঘটনার উপস্থাপনে। সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়ার অনুষঙ্গে কালিক ও স্থানিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপনে এ গল্পের আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। পাঠকের সংবেদনস্তরে পৌঁছানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। একটি ঘটনা, বিষয়, বা চরিত্রকে কীভাবে সমকালীন পাঠকের স্নায়ুকে আন্দোলিত করা যায়, এখানে সেই কৌশল অবলম্বন করেছেন লেখক। লেখকের প্রতিবেদন থেকে একটি অংশ এখানে উল্লেখ করা যায়। ‘মুজিব দাদার কথা ভাবে, বাবার গল্প মনে করে আরও সাহসী হয়ে  মোবাইলে ফেইসবুকে লাইভ শুরু করে―“আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীর বাসার সামনে।” … তিন মিনিটের মতো লাইভ শেষ করে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে মুজিব। মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় লাইভ শো!… একটা লোহার গেট। গেটের ফাঁক দিয়ে বাগানের ফুলগাছ দেখা যায়। গেটের সঙ্গে একটা মাঝারি মেপলগাছ। গাছের ছায়ায় মুজিব দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাঁধের ব্যাগ থেকে বের করে একটা জুতোর ফিতে দিয়ে আরেকটা স্যাান্ডেল গেরো দেয়। একবার ভাবে বিল্ডিয়ের ভেতরে গিয়ে খুনির ফ্ল্যাটের সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু গেট তো খোলার উপায় নেই, আর নিরাপত্তার প্রশ্নটিও আছে। তাই গাছে ঝুলিয়ে দিতে গিয়ে থেমে যায়। এক কদম এগিয়ে লোহার গেটে ঝুলিয়ে দেয় ঘৃণার প্রতীক জুতো-স্যান্ডেল। সেই দৃশ্য ধারণ করতে করতে মুজিব বলে ওঠে, জয়বাংলা! খুনির বাসার গেটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকার মতো ঝুলতে থাকে ঝুলন্ত জুতো-স্যান্ডেল!’ [পৃ ১৬৯]

সমূহ সংকট, বিভ্রান্তি, অপপ্রচার মুছেফেলার উদ্যোগ ইত্যাদির মধ্যেও সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করেছে। তবে একইসঙ্গে লক্ষ্য করি, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির বাংলাদেশ ভিন্ন এক ভূমি। যেখানে মুুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার চেতনাকে মুখে বলা হয়েছে, শব্দগুলো বাণিজ্যে ব্যবহার করা হয়েছে; আদৌ চেতনা বলে কিছু ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা হতো না। শহিদ মুক্তিযোদ্ধা বা এখনও বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হতো। নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধাদের কোনও সম্মান ছিল না। বঙ্গবন্ধু ছাড়াই যেন দেশ স্বাধীন হয়েছে; এমন ভাবনা প্রচার করা হতো। মুজিবনগর সরকার, দেশে বিদেশে স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠন, আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, ইতিহাস, আত্মদান, শরণার্থীজনের দুঃখ ধাপে ধাপে ভুলিয়ে দেওয়া হলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন ও ইতিহাসের এক পরম্পরা আছে, তা আর কেউ বলত না। সবমিলিয়ে ইতিহাস ও ব্যক্তিমানসের নিরিখে দেখার বিবেচনা বর্ণিত হয়েছে নানা গল্পে। একাধারে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও তাঁর মানবিক সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে গল্প হলো : রাহাত খানের ‘দীর্ঘ অশ্রুপাত’, পূরবী বসুর ‘স্নেহময় পিতা’, রশীদ হায়দারের ‘পর্বত’, হুমায়ুন আজাদের ‘জাদুকরের মৃত্যু’, হরিশংকর জলদাসের ‘গগন সাপুই’, মঈনুদ্দিন কাজলের ‘জনকের রক্তাক্ত ছবি’, বিশ^জিৎ ঘোষের ‘তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে’, মোহিত কামালের ‘স্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’, বিশ^জিৎ চৌধুরীর ‘পাথরের মূর্তির মতো’, মামুন হুসাইনের ‘গোলাম মওলার হৃদয় ও সাধন-বাসনা’,  ধ্রুব এষের ‘চিরদিন তোমার আকাশ’, মনি হায়দারের ‘শিথানে শেখ সাব’, আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘সমাধিক্ষেত্র’, মহিবুল আলমের ‘বাবার কড়ে আঙুল’, অদিতি ফাল্গুনীর ‘জুলিয়াস সিজারের মঞ্চায়ন’, আশান উজ জামানের ‘দৃষ্টিজুড়ে পিতার মুখ’। পাঠকসমাজ জানেন বাংলা ছোটগল্পের বাঁকনির্মিতেতে একটি নাম মামুন হুসাইন। পাঠক হিসেবে আমরা ‘গোলাম মওলার হৃদয় ও সাধন-বাসনা’ গল্পটি ভিন্ন একটি বিন্দুতে রাখতে ইচ্ছুক। এটি একজন লেখক, বা বিশেষ লেখার প্রতি কোনো আলাদা নেতিয়ে পড়ার মতো কিছু নয়। গল্পের বার্তা ও বয়ন সে ভাবনা তৈরি করতে সক্ষম যেখানে। বাঙালির জাতিসত্তার ভেতর ব্যর্থ, দরিদ্র গোলাম মওলাই মাথা-মগজে কিছুটা আলগা অস্তিত্ব বজায় রেখে চলে। আর সব পরতে পরতে আত্মসমর্পণ করে। মওলা সারাজীবন ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারেনি। জীবন যেখানে ব্যর্থতায় মালাবদল করে অসুস্থ সামাজিকতার সাথে। গোলাম মওলা সকলের অজান্তে সুগারমিলের খণ্ডকালীন চাকরি থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অস্থায়ী গাইডের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার কাজের পরিধিও সে বুঝে নেয় এবং ‘মৃত্যু-ট্যুরিজম’ এর আয়োজনে সামিল হয়। এমন শব্দগুচ্ছ আমাদের চিন্তা-ভাবনার শূন্যতাকে চিহ্নিত করে। তবে দায়িত্বের অংশ হিসেবে মওলা গাইড হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে স্পষ্ট করতে চায়, কিন্তু আমাদের পরাজিত ইচ্ছা ও কামনা-বাসনার কাছে তার সাধ-বাসনা একীভূত হয়ে যায়। এ গল্পের প্রতিটি শব্দ, বাক্য বিশেষ চিন্তা ও চিহ্নের দ্যোতক। দ্বিবাচনিকতার উৎসমুখ। অনেককিছু সামলে সংযমী হয়ে উপান্তে বলেন, ‘কোনও একটি স্মৃতিখণ্ড নড়ে উঠলেই অতীত থেকে অনর্গল ছায়া খসে পড়ছে আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো। অব্যবহৃত বাক্যরাশি ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। আর খেয়াল করুন, প্রিয় পাঠক-প্রাচীন কোলাহলময় একটি জনপদের ভ্রমণবৃত্তান্ত মৃত-বাতিস্তম্ভের মতো দিকচিহ্নহীন হয়ে যাচ্ছে ছদ্মবেশী-মার্কিন-জাতিসংঘের নিশিপাওয়া উড়োজাহাজের কাছে―যখন অস্থায়ী চাকুরে জনাব গোলাম মওলা কাউকে মেয়েপুতুল, পাতিহাঁসের বাচ্চা, ভিজেকাঠ, ফেসবুক, অজ্ঞাতবাস এবং মৃত্যুর শোভন সম্মিলনে একটি ট্রাভেলগ অথবা বিপথগামী আর্তরব রচনায় সংক্ষিপ্ত সম্মতি জ্ঞাপন করে। গোলাম মওলার শাস্ত্র ও নিরাসক্ত মন চূড়ান্ত অপচয় হওয়ার আগে এবার আমাদের অবনত শির দেখে… সাধু বেড়াল সমাচার ও আমাদের সম্মিলিত বেড়াল তপস্যা!’ [ পৃ ২২৮-২২৯]

এত নেতির মধ্যেও আমরা বঙ্গবন্ধুকে আগলে রাখি আমাদের প্রতিদিনের ক্রিয়াকর্ম, হৃদয়, ও মাথার কোষে। তাঁর অজেয় কণ্ঠ নিনাদিত হয়, ঝড় তোলে, সমৃদ্ধ জীবনের সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে। শুধু জন্মমাটির সমাধিসৌধে নয়, বাংলাদেশের মাটি, জল, প্রকৃতিতে এই নাম ধ্বনিত-প্রতিধব্বনিত হচ্ছে। বারবার প্রশ্ন বা অস্বীকারের হুজুগ এলেও শক্তি ও প্রণোদিত জাগরণ থাকে আমাদের ভাবনার স্তর থেকে স্তরে। এমন কথাই বলেছেন মোহিত কামাল ‘স্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ গল্পে। প্রত্যয়ের সঙ্গে এ ধ্বনি শোনা যায় কবিতা, গান, মানুষের বিচিত্র উচ্চারণে :

‘রক্তরঞ্জিত সিঁড়ির ধাপগুলো আবার কেঁপে কেঁপে উঠল। আবার তারা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিল। এবার পূর্ণভাবে উড়ল পুরো পতাকা। জিদনি বিস্ময় নিয়ে দেখল পতাকা কেবল বত্রিশ নম্বর বাড়িতে নয়, একযোগে উড়তে লাগল বাংলাদেশের পুরো মানচিত্রজুুড়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে বত্রিশ নম্বর বাড়ির কার্নিশে বসে থাকা একঝাঁক সাদা কবুতর উড়াল দিল। ওদের স্বর খুলে গেছে।’ [পৃ ১৮৬]

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সমগ্র কর্মজীবনের বিবিধ বিষয় নিয়ে রচিত কয়েকটি গল্প গ্রন্থিত হয়েছে। এসব গল্পও পাঠকহৃদয় আন্দোলিত করতে সক্ষম। আগেই বলেছি প্রতিটি গল্পই আলাদাভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। বিচিত্র বৈভবে সমৃদ্ধ গ্রন্থিত গল্পের ভুবন। যেমন শওকত ওসমানের ‘দুই সঙ্গী’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘কেয়ামতকে নিয়ে গল্প’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘তাঁর ঘরে ফেরা’, বুলবন ওসমানের ‘শেকড়’, বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘পারুল ফুল ও ১০ জানুয়ারি’, আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘রেণুর কাছে ফেরা’, সেলিনা হোসেনের ‘জেলখানার লুদু’, ইকবাল হোসেনের ‘চন্দ্রমল্লিকার উৎসব’, ঝর্ণা রহমানের ‘প্রাচীরের পাখি’, পারভেজ হোসেনের ‘যে আঁধার আলোর আলোর অধিক’, নাসরিন জাহানের ‘রক্তাক্ত অগ্নি’, মোস্তফা কামালের ‘রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল’, শাখাওয়াৎ নয়নের ‘ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়’, লুৎফুন্নাহার পিকির ‘সূর্যসন্তান’, রঞ্জনা বিশ^াসের ‘রাজার গল্প’, পিয়াস মজিদের ‘বিদ্রোহফুল, নজরুল, মুজিবুর’, সাদাত হোসাইনের ‘শব্দভুক’। ‘ইতিহাস মানে যেহেতু অজস্র অন্তর্বয়নের সমাবেশ, সাহিত্যের অন্তর্বস্তু ও প্রকরণ জুড়ে থাকে কেবল মানুষের বহুস্বরিক চেতনার জটিল বুনট। অন্যভাবে বলা যায়, বহু উৎসজাত আরও অনেক পাঠকৃতির সমবেত প্রেরণা শুষে নিয়ে খানিকটা গ্রহণ, খানিকটা বর্জন আর খানিকটা পরিমার্জন আর খানিকটা সংযোজন করে গড়ে ওঠে সাহিত্যের নিজস্ব সন্দর্ভ।’ এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোর আলোকে আমরা যদি শওকত ওসমানের দুই সঙ্গী গল্পের প্রতিবেদনকে বিবেচনা করি। স্মরণীয়, বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা এ গল্প। বঙ্গবন্ধু নৌকায় যাচ্ছেন গোপালগঞ্জ থেকে মাদারিপুরে। এ নৌকা অনুসরণ করছিল জলদস্যু। যখন দস্যুরা জানতে পারে অনুসরণকৃত নৌকার যাত্রী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, তখন দস্যুতা আনত হয় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কাছে। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, সমর্থন যা-ই বলি, এককথায় বঙ্গবন্ধুর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তোলার অবকাশে থাকে কী! 

অথবা, এই বক্তব্যের আলোকে যদি দেখি জুলফিকার মতিনের গল্পটি। এক নৌকায় উঠেছিল গরিব দাদি ও নাতনি। নৌকায় দেখতে পেল এক লাশ। যে লাশ তৈরি করেছে একদল দুর্বৃত্ত। গল্প নির্মাণে অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন লেখক। অসামান্য কাব্যিক ভাষা এ-গল্পের। অনিশ্চিত নৌকাযাত্রার অনুষঙ্গে যোজন করেন বাঙালির ঐতিহাসিক চরিত্র ও মিথ। অবশেষে মনে হয় এসব উপাদান হলো নৌকাযাত্রার প্রবহমানতা নির্দেশক। মূলত, এসব উপকরণেই বাঙালির নির্মাণ। নৌকাযাত্রায় কতকিছু সামিল হতে থাকে একে এক। একটি মৃত্যু সবকিছুকে অমূলক করে দেয়। বাস্তবতাও তা-ই। অল্পাংশ এখানে উল্লেখযোগ্য,

‘… নৌকা থামে না। নদীপথ বেয়ে এগোতে থাকে ধীরগতিতে। দুপাশে জনপদ। নদীর তীরে নারী-পুরুষের মেলা। … চাঁদ বণিক সপ্তডিঙ্গাতে পসরা সাজিয়ে যাত্রা করেছে বিকিকিনি করবে বলে। কী দুর্জয় পুরুষ! পুত্রদের একে একে খেয়ে ফেলছে মনসা কানি, তবু দেবে না তাকে পূজা। আবার এক জায়গায় দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আবালবৃদ্ধবণিতা। কোনও কথা নেই তাদের মুখে। বিষ্ণুপ্রিয়ার মুখ ভার। চোখ অশ্রসিক্ত। সন্ন্যাস নিয়ে নিমাই ঠাকুর যাত্রা করেছে অজানা গন্তব্যে। জনপদ-বিস্তৃত মানুষের এই মিলনপ্রবাহের মেলায় একসময় দেখা গেল আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে। স্বাধীন সুলতান। দিল্লির সম্রাটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুদ্রা চালু করেছে নিজের নামে। তারই পিছু পিছু এল শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। শাহ-ই-বাঙাল উপাধি খচিত তার মুকুটে। কিছুই তার করতে পারেনি ফিরোজ শাহ তুঘলক। তারা দ্রুতপদে উঠে আসে নৌকায়। দাদি ও নাতনি কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনুপ্রবিষ্ট হয় নৌকার পাটাতনের ওপর শুয়ে থাকা মৃতদেহটির ভেতর।’ [পৃ ৯৭]

মূল বিষয় তিনটি, তবে অনুষঙ্গী বাংলাদেশের ইতিহাসের বিবিধ প্রসঙ্গ। অবশ্যই স্বীকার্য ও আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ঋণস্বীকার, শ্রদ্ধা জানানোর তাগিদে সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যম সমৃদ্ধ হয়েছে। সংকলিত সকল গল্পই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও পরিচর্যায় উৎকৃষ্ট। আবার বঙ্গবন্ধু প্রতিবেদনের কেন্দ্র হলেও সমাজমানসের বিভিন্ন চারিত্র্য, সংস্কৃতিও গল্পগুলোর অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। 

ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টির গল্প হওয়ায় গ্রন্থনকে একরৈখিক মনে হয় না। এক্ষেত্রে সম্পাদন রুচির জন্য সেলিনা হোসেনকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও ইতিহাসের ঘটনাবলি ভাবনার কেন্দ্রে রেখে গল্পগুলো বাছাই করেছেন, তা বোঝাই যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস ও ইতিহাসভিত্তিক পাঠ একাকার হয়ে ওঠে। এখানে প্রশ্ন হতে পারে ইতিহাসের প্রতিফলনে বস্তুনিরপেক্ষতা নিয়ে। সেক্ষেত্রে গ্রন্থিত গল্পগুলো উৎরে গেছে প্রশ্নের মাত্রা। ফলত, পাঠক খানিকটা উপকৃত হবেন। শুধু সাহিত্য পাঠে নন, বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন, ইতিহাসের উপলব্ধি ও উপাদান আস্বাদনে। উপস্থাপিত প্রতিবেদন থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেককিছু জানা হয়ে যায়। যদিও গল্প, তবু কতদূর লেখক ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে দূরে যেতে পারেন, অথবা কল্পনায় কোনও ঘটনা নিয়ে আসতে পারেন ? খুব বেশি নয়। মনে রাখতে হয়―বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের নির্মাতা। অতএব বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয়। বস্তুত, সংকলিত গল্পগুলোতে শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, বাঙালির ইতিহাস, সমাজচিত্রও পরিণত দৃষ্টিতে লেখা হয়েছে। যেক্ষেত্রে অন্বিত শিল্প, ব্যক্তি ও ইতিহাসের সমন্বিত দৃষ্টি। ফলে, ‘আমরা এমনটা আশাবাদ ব্যক্ত করতেই পারি―এ সংকলন পাঠে বঙ্গবন্ধুকে না-দেখার আক্ষেপ আমাদের অনেকটাই ঘুচবে, অনেকাংশে জানব আমরা না-জানা মানব-হিমালয়কে।’ কৈফিয়ৎ দেওয়া সমীচীন হবে―প্রতিটি গল্পের আলাদা মূল্যায়ন সম্ভব হলো না। এ পরিসরের জন্য থেকে গেল অসম্পূর্ণ। কথাসাহিত্যে এক মহাজীবনের রূপায়ণ, এর শৈল্পিক মূল্য অনস্বীকার্য। সেলিনা হোসেনের মেধার স্বাক্ষর রয়েছে গ্রন্থ সম্পাদন ও গল্প নির্বাচনে।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares