মোমেনশাহী উপাখ্যান : বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-উপন্যাস

মোমেনশাহী উপাখ্যান―এই নামের অনুষঙ্গে স্বভাবতই মনে আসে মৈমনসিংহ গীতিকা এবং পূর্ববঙ্গ গীতিকাগুলোর কথা। গীতিকার সেই লোকায়ত প্রেম-আখ্যানগুলির কথা। কিন্তু অমর মিত্র (জন্ম-১৯৫১)-এর মোমেনশাহী উপাখ্যান (২০১৯)-এ গীতিকার প্রেম-আখ্যান নেই। আছে ময়মনসিংহের আনাচে-কানাচে, গিরিগুহা কন্দরে, প্রকৃতির অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস-মিথ-কিংবদন্তি-লোকগাথা। আর তারই সূত্রে লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন প্রাচীন ময়মনসিংহ, গারো পাহাড় অঞ্চলের মানুষদের সামগ্রিক জীবনযাপন। লড়াকু মানুষদের প্রাকৃত কথকতা।

এই উপাখ্যানে গীতিকা প্রসঙ্গও আছে। বিচ্ছিন্নভাবে গীতিকার টুকরো প্রসঙ্গ এসেছে, গীতিকার শ্লোকও হুবহু তুলে ধরেছেন লেখক। কখনও-বা গীতিকার অনুসরণে নিজেই রচনা করেছেন দু-কলি শ্লোক। এভাবে সেই সময়ের একটা আবহ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু গীতিকার শ্লোক-কাহিনি সব কিছুকে ছাড়িয়ে অমরের উপাখ্যানে উদগ্র হয়ে আছে হাজং সম্প্রদায়ের লড়াকু মানুষদের প্রাত্যহিকতা। কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম। গারো পাহাড়ের দেশের জীবনের মহাকাব্য। এখানে গীতিকার আখ্যান সামান্য সূত্র হয়ে এসেছে। ‘গীতিকার বাইরে যে জীবন মহিমময় করেছে ওই ভূখণ্ডকে’ তার কথাই লিখেছেন লেখক। সব মিলিয়ে এই উপাখ্যান ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের। এই উপাখ্যান ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ভূগোলের। কোনও ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের নয়।   

একটা বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিন্যস্ত হয়েছে তিন পর্বের আখ্যান। প্রথম পর্ব ‘পাতাল-আন্ধার বৃত্তান্ত’, দ্বিতীয় পর্ব ‘লীলাবতী খবরিয়া ও আয়নাবিবির বৃত্তান্ত’ এবং তৃতীয় পর্বের নাম ‘বুনো হাঁসের উড়াল’। তিনটি পর্বে প্রায় সাত-আটশ বছরের বৃত্তান্ত। উপন্যাসের শেষে লেখক ‘কালানুক্রম’ উল্লেখ করেছেন। সেখানে ১২৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ঘটনাক্রমের উল্লেখ আছে। শুরু হয়েছে ১২৮০ সালে কনৌজি ব্রাহ্মণ সোমেশ্বর পাঠকের গারো রাজ্য দখলের ঘটনায়। শেষ হয়েছে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহকুমা স্বতন্ত্র একটি জেলার মর্যাদা পাওয়ার ঘটনায়।   

আখ্যানের শুরু হয়েছে কলকাতার সোমেশ্বরী উপনিবেশে। দমদম- বেলগাছিয়া-টালা পার্কের কাছে এই অঞ্চলে মূলত পূর্ববঙ্গের মানুষেরা বসবাস করেন। ১৯৪৭-এ তাঁরা দেশভাগের সময় সব ছেড়ে চলে এসেছেন উত্তর কলকাতার এই সোমেশ্বরী উপনিবেশে। ‘সেই কোথায় গারো পাহাড়, সাবেক ময়মনসিংহ জেলা, এখন জেলা নেত্রকোণা, কংস নদী, সুসঙ্গ দুর্গাপুর, সিমসাং-সোমেশ্বরী নদী, হাজং উপজাতি, হাতিখেদার গল্প, টঙ্ক আন্দোলন, কমরেড মণি সিংহ, দিঘি, বাগান, সব রেখে এসেছে ওপারে।’ এখন এখানে এক চিলতে ফ্ল্যাটে সংসার।

সুধীন্দ্র সোম এবং তাঁর স্ত্রী কুমুদিনীও থাকেন এখানে। তাঁদের একমাত্র ছেলে থাকে বিদেশে, অ্যামেরিকায়। প্রতিদিন সকালে ফোন করে। সুধীন্দ্র তাঁর জ্ঞাতি ভাই বিপুলকে বলেন―‘আমি যখন সকালে ফোন ধরি, ওরা তখন আগের দিনের রাতে আছে, মনে হয় যেন অতীত কথা বলছে, ওরা কোনওদিন বর্তমানে ফিরতে পারবে না, ওরা অতীতেই থেকে যাবে, পাস্ট ইজ পাস্ট।’ আগের দিনের রাতের সঙ্গে পরের দিন সকালের কথা হয়। সুধীন্দ্র স্ত্রীকে নিয়ে তৈরি করেন তাঁর পাণ্ডুলিপি। সেখানে তিনি লেখেন তাঁদের পূর্বপুরুষ রাজা সোমেশ্বর পাঠকের কথা। আর এভাবেই বর্তমান থেকে কাহিনি চলে যায় সাতশ বছরের আগের সময়ে। আসে রাজা জানকীনাথের কথা। রানি কমলা সুন্দরীর কথা। কমলা সায়র তৈরির বৃত্তান্ত। রানির অনুরোধে রাজা নির্মাণ করেছিলেন বিশালাকার কমলা সায়র। কিছুতেই জল উঠছিল না সুগভীর সায়রে। শেষ পর্যন্ত রানি প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন জলের জন্য।

এসেছে বানেশ্বর খবরিয়ার প্রসঙ্গ। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে খবর বয়ে বেড়ানোই ছিল তার পেশা। ময়মনসিংহের গাঙ পাড়ে, পাহাড়তলীতে, গারো পাহাড় পেরিয়ে দূর গ্রামে খবর ফেরি করে সে। খবর তৈরিও করে। আর তার খবরের সূত্রে সুধীন্দ্র রচনা করেন তাঁর পাণ্ডুলিপি। সেই পাণ্ডুলিপিতে খবরিয়ার কথা যেমন আছে, তেমনি আছে কবি অধরচন্দ্রের কথা। কোনও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বানেশ্বর খবরিয়া পছন্দ মতো খবর বানিয়ে তোলে। কখনও খবর বানাতে বানাতে তার মাথার ঠিক থাকে না। সে জটিল করে তোলে। সেই খবর থেকে মনের মাধুরী মিশিয়ে ময়মনসিংহের গ্রামীণ কবি অধরচন্দ্র লেখেন তাঁর পালাগান। আবার কখনও পালাগানের সূত্র ধরে খবরিয়া তৈরি করে খবর। আর সেই খবর এবং পালা নিয়ে সুধীন্দ্র রচনা করেন তাঁর সাহিত্য। ‘তাহলে আরম্ভ হোক অধরচন্দ্রের সেই গীতিকাহিনি। কবি অধরচন্দ্র, কবির বাস কোথায় তা বলবে খবরিয়া। কবি তো লিখে খালাস, তাঁর কথা বলে বেড়াবে খবরিয়া। যা জানবে না সে, বানাবে। যা বানাবে তা জুড়ে দেবে অধরচন্দ্রের পালাগানের সঙ্গে।’ কিছু বাস্তব, কিছু কল্পনা। প্রাচীন সময়ের গীতি কবি অধরচন্দ্র আর সমসময়ের সুধীন্দ্র একাকার হয়ে গেছেন। পরে অতীন বিপুলকে শুনিয়েছেন তাঁর পিতৃভূমির আখ্যান। আর বানেশ্বর খবরিয়া, কবি অধরচন্দ্র, সুধীন্দ্র সোম, অতীন নির্মিত খবর/পালা/আখ্যান/কাব্যের ভিত্তিতে সাহিত্যিক অমর মিত্র রচনা করেন তাঁর অমর আখ্যান মোমেনশাহী উপাখ্যান। কীভাবে খবর তৈরি হয়, কীভাবে সাহিত্য রচিত হয়, কীভাবে তার প্রচার হয়―আখ্যানের পাতায় পাতায় তারই চিহ্ন ছড়ানো। সৃষ্টি করলেই শুধু হয় না। তা পাঁচজনের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। সেদিক থেকে বানেশ্বর খবরিয়া প্রচারক এবং প্রকাশকও বটে।

সাতটি দিঘি কেটে তার মাটি দিয়ে বিল ভরাট করে উত্তর কলকাতার সোমেশ্বর কলোনির পত্তন হয়েছিল। দুটি দিঘি আগেই বুজিয়ে বাড়ি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কমলা সায়র, রানির দিঘিও ভরাট করা শুরু হয়ে গেল। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে প্রতিদিন লরি এসে আবর্জনা ফেলে যাচ্ছে। দূষিত করছে পাঁচ বিঘার এই পুকুর। দিঘি ভরাট করে ডেভলপমেন্ট হচ্ছে। ওয়াটার বডি ধ্বংসের বিরুদ্ধে একা লড়াই করেছেন সুধীন্দ্র। বিভিন্ন জায়গায় চিঠি লিখেছেন। প্রখর রোদে মেয়রের কাছে গেছেন। লাভ হয়নি কিছুই। কিছুটা নির্ভার হয়েছেন রিকশাঅলাকে তাঁর কথাগুলি বলে। ময়লা ফেলে পুকুর ভরাট যে অন্যায় সে কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয় রিকশাঅলাকে । তার নামও বানেশ্বর। আজকের খবরিয়া সে। কবি অধরচন্দ্রের পালা প্রচার করেছিল বানেশ্বর খবরিয়া। আর সুধীন্দ্রর পুকুর দূষণের বিরুদ্ধে লেখা পিটিশনের খবর প্রচার করে রিকশাঅলাকে বানেশ্বর। অধরচন্দ্র লিখেছিলেন কমলা সায়রের জন্মকথা। সুধীন্দ্র লিখলেন সোমেশ্বর কলোনির কমলা সায়রের মৃত্যুর বৃত্তান্ত। এভাবে সেই সময়ের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে এই সময়। পরিবেশ সচেতন লেখকের পরিবেশবাদী বয়ান কমলা সায়র ধ্বংসের এই ঘটনা। সেদিক থেকে দেখলে উপন্যাসটির একটি পরিবেশবাদী মূল্যও রয়েছে। 

স্ত্রী কুমুদিনীর মৃত্যুর পর সুধীন্দ্র সোম নিরুদ্দেশ হয়ে যান। হয়তো তিনি চলে গেছেন তাঁর পিতৃভূমিতে। নেত্রকোণা হয়ে সুসঙ্গ দুর্গাপুরে। তাঁর টন দিয়ে গিয়েছিলেন বিপুলকে। বিপুল সেই পাণ্ডুলিপি নিয়ে সুধীন্দ্রের খোঁজে রওনা হলেন ময়মনসিংহে। বিমানবন্দরে দেখা হয়ে যায় বানেশ্বর খবরিয়ার উত্তরপুরুষ খবরিয়া ইমতিয়াজ চন্দ্রকুমারের সঙ্গে। সাংবাদিক সে। তার কাগজের নাম নেত্রকোণা টাইমস। মনে পড়ে গীতিকা-সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে-র কথা। ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন অজস্র গাথা। দীনেশচন্দ্র সেন সেই সংগ্রহ থেকেই সংকলিত করেছিলেন তাঁর অসামান্য গ্রন্থ মৈমনসিংহ গীতিকা। ইমতিয়াজ চন্দ্রকুমার, চাঁদু খবরিয়াও তো আখ্যান সংগ্রহ করে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করে। কলকাতা এসেছিল সে খবর সংগ্রহের জন্য। বিপুল তারই সঙ্গে পৌঁছে গিয়েছেন ময়মনসিংহ জেলায়। সোমেশ্বরী নদী, গারো পাহাড়ের দেশে। কত কাহিনি, কত কিসসা, কত গীতিকা ছড়িয়ে আছে সেই মাটিতে। ময়মনসিংহ গীতিকায় যে সব কথা নেই, তাদের কথা বিপুল এসে শুনলেন অতীনের কাছে। পিতৃভূমির সব ইতিহাস। গীতিকার বাইরের কাহিনি যা ঘটেছিল এই মাটিতে। হাতিখেদা, হাজং বিদ্রোহ, টঙ্ক বিদ্রোহ, কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন সব। তখন রাজরোষের ভয়ে লেখা হয়নি বিদ্রোহের যে কাহিনি, পরে লেখা হয়েছে। লেখা হবে আরও। প্রবহমানকাল ধরে রচনা হবে ময়মনসিংহের আখ্যান। অস্থির মিঞা বলেছিল―‘মুদের ইদেশে তো কবি আর পালাকারের অভাব নাই, কাজ নাই তো কিসসা লেখ, যত কিসসা, তার চেয়ে বেশি কিসসাদার, কবি, একই কিসসা কতরকমে লিখা হইসে, আর হইসে বলেই জানা গেল।’ কবি অধরচন্দ্রের উত্তরসুরী ছড়িয়ে রয়েছেন এখানে। কেউ একজন শুরু করেছিলেন। অতীন এখন সেই কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ছিল দশ হাজার শ্লোক, হয়ে যাচ্ছে এক লক্ষ। তাঁর পরে আরও কেউ লিখবেন। এটাই ময়মনসিংহের মাটির গুণ। এটাই মোমেনশাহী উপাখ্যান-এর বৈশিষ্ট্য। অমর তিনটি পর্বে তাঁর সময়কাল পর্যন্ত আখ্যান শুনিয়েছেন। পরে আরও কোনো কিসসাদার কবি পালাকার লিখবেন ময়মনসিংহের আরও আরও আখ্যান। অমরের মোমেনশাহী উপাখ্যান শেষ হয়নি। শেষ হওয়ারও নয়। যতদিন ময়মনসিংহ থাকবে, যতদিন এখানকার আকাশ-বাতাসে ধ্বনিত হবে বিচিত্র সব কিসসা, ততদিন রচিত হয়ে চলবে এর গীতল কাহিনি। অমর মিত্রের আখ্যানে সেই বহমানতার সুরই মূর্ত হয়ে আছে। 

জমিদারদের নৃশংস অত্যাচারের কাহিনি যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে ইংরেজদের ভয়াবহ অত্যাচারের কথাও। শুধু অত্যাচার সয়ে যাওয়া নয়। এখানকার মানুষেরা প্রতিবাদীও। এই মাটিতে কত কত বিদ্রোহের জন্ম হয়েছে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হাজংদের বিদ্রোহ। হাতি ধরার জন্য পাহাড়ের ওদিক থেকে ডেকে আনা হয়েছিল হাজংদের। বিনা খাজনায় এখানে বসবাসের অনুমতি পেয়েছিল তারা। বিনিময়ে বিনা পারিশ্রমিকে রাজার নির্দেশে হাজংদের হাতি-খেদা করতে হত। তাদের কাজ ছিল হাতি খেদায় ফেলা। খেদা দুর্গের মতো। বনের ভেতর বন। হাতিদের খেদিয়ে এনে সেই বনের খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজ করত তিন-চারশ হাজং। সেই হাতি বিক্রি করতেন রাজা। মনা সর্দার রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। হাতি-খেদা করবে না বলেছিল―‘সব্বোজনে মিলি দাবী তুলো, ক্ষেতি করব, হস্তী খেদাইব না।’ যুবক অথৈচন্দ্র বলেছিল, ‘সকলে মিলা রাজার কাছে যাই, আর বলি আমরা ক্ষেতি করব, হস্তী খেদাইব না।’ বাকিরা সাড়া না দিলেও মনে মনে সবাই বলেছিল―‘হস্তী খেদাইব না। হাতি খেদানো মহাপাপ। কেন পাপ ? হাতি খেদাইলে গারো পাহাড়ের বুকে ব্যথা লাগে। হাতি তো গারো পাহাড়ের গা থেকে জন্মায়। বনের প্রাণী।’ রাজার নির্দেশে হাতি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল মনা সর্দারকে। অথৈচন্দ্র হাজং পালিয়ে বেঁচেছিল।    

হাতিখেদা বন্ধ হলে গোমস্তারা রাজার মাথায় ঢুকিয়েছিল টঙ্ক। টঙ্ক প্রথায় জমি বিলি করে লাখ টাকার হাতির চেয়েও বেশি আয় করার উপায় খুঁজে পেয়েছিল রাজা। টঙ্ক হল ধানের পরিবর্তে তার দাম। ধান কড়ারি খাজনা। চাষের খাজনা দিতে হবে ফসলে। জমির ধান খরা বন্যায় মরুক টঙ্ক দিতেই হবে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল কৃষকরা। তার নেতৃত্বে ছিল মণি সিং। ১৯৪৫-এ মণি সিংহের ডাকে হাজং, গারো চাষারা, মুসলমান চাষারা, নমঃশূদ্র চাষারা নেত্রকোণা আসে। টঙ্ক আন্দোলন পরে পরিবর্তিত হয়ে যায় তেভাগা আন্দোলনে।

এই মাটি যেমন বিদ্রোহের, তেমনি প্রেমেরও। এই আখ্যান যেমন বিদ্রোহের ধারক, তেমনি প্রেমেরও বাহক। দুরন্ত হাজং যুবক বিদ্রোহী অথৈচন্দ্রের প্রেমিকা লীলাবতীকে বিয়ে করে নিয়ে চলে গিয়েছিল ত্রিলোচন গণৎকার। বৃদ্ধের তৃতীয় স্ত্রী ছিল লীলাবতী। গারো পাহাড়ের মেয়ে লীলাবতীর মা কংস নদীর ধারের এক বামুনের পোলার হাত ধরে নেমে এসেছিল। তার ভেতরে ছিল পাহাড়। অস্থির মিঞা বিপুলকে শুনিয়েছিল সেই প্রেমের আখ্যান। লীলাবতী অথৈচন্দ্রের প্রেম পূর্ণতা পায়নি। পূর্ণতা পায়নি জানকীনাথ-কমলা সুন্দরীর প্রেমও। 

আখ্যানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে নারীরা। প্রথম পর্বে রানি কমলা আত্মোৎসর্গ করেছিলেন, খননের পরে দিঘিতে জল ওঠেনি বলে। শুকনো পুকুরে নেমে হাত জোড় করে বলেছিলেন―‘মুই ধম্মো রক্ষা করৎ, সায়রে পানি আনিবার এইছি, ই দিঘি পানি ভরা হউক, মুর সোয়ামীর পিতৃকুল রক্ষা পাউক, হে পাতালবাসী দেবকুল, পাতালের পানি ছাড়িয়া দেও, পাতাল ফাটিয়া বইন্যা আসুক, দিঘি পানিতে ভরুক…। জল দাও জল দাও, হে তেত্রিশ কোটি দেবতা জল দাও, জল দিয়ে সোয়ামীর কুলকে নরকবাস থেকে রক্ষা কর।’ জল এনেছিলেন প্রাণের বিনিময়ে। একইভাবে তৃতীয় পর্বে এসেছে শহীদ-মাতা রাশিমনির প্রাণ বিসর্জনের কথা। টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম শহিদ মাতা রাশিমনি কুমুদিনীকে রক্ষা করতে গিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। রানি কমলার প্রাণ বিসর্জনের কাহিনি দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল বানেশ্বর খবরিয়া। শহিদ মা রাশিমনি এবং সুরেন্দ্র হাজং-এর খবরও ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। টঙ্ক নেত্রী কলাবতী হাজং ব্যস্টিন বাহিনীর অত্যাচারের বিরোধিতা করেছিল। গারো পাহাড়ের নারী কলাবতী সমস্ত অত্যাচারিত নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

মাঝে মাঝে সাল-তারিখ এবং ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় পর্বে। কমিউনিস্ট আন্দোলনের কথা এসেছে। মুক্তাগাছায় অনুষ্ঠিত অবিভক্ত ভারতের কৃষক-সভার শেষ সম্মেলনের কথা এসেছে। এসেছে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতি বসুদের কথাও। এসেছে ব্যাস্টিন সাহেবের কথা। আসলে এই কাহিনি যে শুধু কাল্পনিক নয়, এই আখ্যানেরও যে একটা গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে তার প্রমাণ এই ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ। মোমেনশাহী উপাখ্যান দাঁড়িয়ে আছে একটা ঐতিহাসিক জমির ওপর। এই ইতিহাসও প্রবহমান।

ইতিহাসের সঙ্গে লেখক সুনিপুণ দক্ষতায় মিলিয়েছেন কল্পনাকে। এই কল্পনাও ময়মনসিংহের মাটির গুণ। মৈমনসিংহ গীতিকা-র মতো এই উপন্যাসের আখ্যানেও ফ্যান্টাসির চমৎকার মিশেল রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের মনের গহনে গেঁথে থাকা বিশ্বাস থেকেই লেখক তুলে এনেছেন অজস্র লোকজ গল্প, লোকায়ত কাহিনি। গারো পাহাড় মাঝে মাঝে সরে যায়। এগোয়-পেছোয়। পাহাড়ও একটি হস্তী। আর হাজংরা পাহাড়ের সন্তান। অতীন শুনিয়েছেন বিচিত্র সেই কাহিনি―‘বিনি পয়সায় হাতি খেদার ভেতরে ঢুকিয়ে ধরতে খুব কষ্ট, পেটের ভাত জুটত না, তখন হাতিদের নিয়ে পাহাড় পিছিয়ে যেতে থাকে।’

শুধু গারো পাহাড়ের এগিয়ে-পিছিয়ে যাওয়া নয়, আরও কত কত ফ্যান্টাসি। বানেশ্বর খবরিয়ার খবরের মধ্যেও তো আছে সেই ফ্যান্টাসি। তার বউ হলুদ পঙ্খী খবর বয়ে বেড়ায়। ‘কার ঘরৎ কোন কইন্যা কার সাথে পলাইল, কোন বুড়া বিবাহ করল যুবতী কইন্যা, ইয়ারে কি খবর কহ, শুনলি গা ঘিনঘিন করে না ?’ সঠিক খবর নিয়ে উড়ে যায় প্রতিবেশীদের বাড়ি। টঙ্ক না-দেওয়ার কথা বলে। রাজাকে ভয় পায় না সে। তার স্বামী যে খবর গোপন করে, সেই খবর ছড়িয়ে দেয় পঙ্খী। রুমি, ঝুমি―দুই বোনের কাহিনিও উল্লেখ্য এই প্রসঙ্গে। সারারাত জেগে পিঠে তৈরি করে প্রবুদ্ধ-সুবুদ্ধ দুই ভাইয়ের জন্য। পুতুল খেলতে খেলতে তারা পিঠা বানায়, বিরিয়ানি বানায়। কিন্তু দুই ভাই আসে না। তারা কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। অতীনের কাছে গল্প শুনতে শুনতে বিপুলের মনে হয়―প্রবুদ্ধ সুবুদ্ধ নামে দুই ভাই পাণ্ডুলিপির ভিতরে আছে। তারা হাঁটু মুড়ে বসে আছে কুয়াশার ভেতরে কোনো গাছতলায়। কবি-কল্পনায় এমনি হয়। কবির দেশে এমনি হয়। নেত্রকোণায় এমনই ঘটে। সুসঙ্গ দুর্গাপুরে, সোমেশ্বরী বা সিমসাং নদীর ধারে এমনি দেখা যায়। খুঁজলে একশ-দেড়শ-দুশো বছরের মানুষ পাওয়া যাবে এখানে। অনেক অনেক বয়স নিয়ে হাঁটছে নদীর ধারে। বা বসে আছে গাছতলায়।

‘একশ দুশো তিনশো বছরের মানুষ! মানে একশো, দুশো, তিনশো বছরের স্মৃতি। ইতিহাস কিংবা ইতিহাসের কল্পনা। মানুষ তো নিজেই স্মৃতিপুঞ্জ। স্মৃতিই মানুষের জীবন গড়ে তোলে। সুবুদ্ধ প্রবুদ্ধ বলে কেউ যদি এই সন্ধ্যায় এসে থাকে তবে তা আসলে স্মৃতিপুঞ্জেরই এক বিন্দু যা অতীন আহরণ করেছেন এতটা জীবন এই কবির ভূমিতে বসবাসের সূত্রে। কিন্তু এতো বিপুলের যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা। আসলে এই কবির ভূমিতে এমনই ঘটে থাকে। যে মানুষটি মহুয়া, মলুয়া কিংবা কমলা সায়রের কথা বলছে পথেঘাটে, যে মানুষটি চায়ের দোকান করে বসে আছে বেল চা নিয়ে, যে মাঝি নৌকো নিয়ে পারাপারের জন্য বসে আছে কংস নদীর ঘাটে, যে লোকটি গাছতলায় বসে আছে নিঝুম হয়ে, তারা সকলেই দেড়শো দুশো বছরের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের বয়স রামায়ণ মহাভারতের যুগের মানুষের মতো, কবির দেশে এমনি হয়। তাদের বয়স গারো পাহাড়ের বৃক্ষের মতো। গারো পাহাড়ের দেশে এমনি হয়।’

এই আখ্যানে এভাবেই একাকার হয়ে গেছে ইতিহাস এবং ইতিহাসের কল্পনা। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে বিভ্রম তৈরি হলেও অবিশ্বাস জন্মে না। এটাই লেখকের মুন্সিয়ানা। গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের আখ্যানশৈলী। এই দেশজ আখ্যান লেখক বয়ন করেছেন দেশজ ধাঁচে। কথকতার ঢঙে―‘তাহলে আরম্ভ হোক অধরচন্দ্রের সেই গীতিকাহিনি… রাজা জানকীনাথ আর রানি কমলার কথা শুনাই এবার।’ ‘আরম্ভ হোক’, ‘শুনাই এবার’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার বারবার এসেছে আখ্যান বর্ণনায়। এ তো আমাদের কাহিনি বর্ণনার নিজস্ব আঙ্গিক। ছড়া-প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার এই আঙ্গিককে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।  

মহাকাব্যের মতো অজস্র উপকাহিনি, শাখা-কাহিনি এর। সময়ের আশ্চর্য চলমানতা আখ্যানটিকে মহাকাব্যিকতায় উত্তীর্ণ করেছে। মনা সর্দারেরই যেন উত্তরাধিকার মণি সিং। যেমন বানেশ্বর খবরিয়ার উত্তরসূরি চন্দ্রকুমার। সেযুগের বানেশ্বরের সঙ্গে যায়নি ত্রিলোচন ঠাকুরের স্ত্রী লীলাবতী। কিন্তু আজকের চন্দ্রকুমারের সঙ্গে লীলাবতীর উত্তরসূরি আয়নাবিবি চলে গেছে। একইভাবে অথৈচন্দ্র হাজং, লীলাবতীর প্রেমিক আজকের অস্থিরচন্দ্র চাঅলা। এভাবে অমর অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন করেছেন। একই সময়ের বহমানতা, একই আখ্যানের বহমানতাকে ব্যঞ্জনাময় করতে চেয়েছেন।

এই আখ্যান সময়ের সীমারেখা মুছে দিয়ে হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ভাষ্য। সাতশ’ বছরের প্রাচীন আখ্যানও এই সময়ের কথা ভাবাচ্ছে। হয়ে উঠেছে সমকালীন। উপন্যাসটির গুরুত্ব এই সমকালীনতায়। এই আখ্যান মহাকাব্যের মতোই চিরকালীন হয়েও সমকালীন―(All time Contemporary)।

 লেখক : প্রাবন্ধিক   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares