বয়ন-পাপড়ি রহমান : অমিতাভ প্রহরাজ

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-উপন্যাস

গলায় দড়ি দিতে যাচ্ছিলুম… লকডাউন ২ এখানে, ওয়েভ ২, কোনও রাস্তা দেখছি না… রোজ মুখোশ পরে হাঁটা… রোজ ফিরে ডেটলে স্নান করা… বিছানায় শুয়ে নেটফ্লিক্সে ব্ল্যাকলিস্ট দেখা… অসহ্য লাগছিল জীবন… এভাবে বাঁচার মানে নেই… মহুলার একটা ওড়না পড়েছিলাম, রাণি নীল… পাকিয়ে ফাঁস বানালাম… আত্মহত্যা লাইট অফ করেই করা উচিত, যাতে অন্ধকারের মাকু মাছ হৃদ গেঁথে যায়… টুল নিয়ে উঠলাম… খেয়াল ছিলনা নাইট ল্যাম্প জ্বালা আছে… ফাঁস পরার মুহূর্তে ওড়নাটা দেখি সাতরঙা… ভিবজিওর… বেনিয়াসহকলা… চমকে গেলাম… আত্মহত্যা হল না… টুল থেকে নেমে ওড়নাটা দেখলাম, রাণি নীল, পাকালাম ফাঁস, রামধনু! এভাবেও শিল্পী ভেবেছেন বয়নের সময় ? মৃত্যুর সময় যাতে যমের বয়ন রামধনু হয়ে ওঠে ?  আশ্চর্য…

তখনি গম্ভীর মন্দ্র কন্ঠস্বরে কে বলল সুতা কাটুনির পূর্ণিমার কথা…

‘সম্পর্কে তোমার নেইগো হয় যারা আজকে তাঁদের কথা মনস্ক করিতে হয় (খবর্দার “করতে হয়” বলবে না, নেইগো নিয়ে বলতে গেলে সবসময় শ্রদ্ধাভাষায়, সবচেয়ে হোমরা-চোমরা শব্দ দিয়ে, নীচের দিকে আঙুল রেখে বলতে হয়)। এই সুতাকাটুনির ব্রত (নেইগো-পূজো) কি আজিকালকার কথা ?’

মনেই ছিল না আজকে সুতাকাটনি/সুতাকাটুনির পূর্ণিমা। আমি জানতাম, কিন্তু ইচ্ছে করেই বলিনি ওকে। আসলে আজকের দিনে বেশ খানিকটা দুঃখ করতে হয়। আমি ভেবেছিলাম ওর মনে না পড়লেই ভালো। যদিও শাস্ত্রে বলে আজকে দুঃখ করলে সম্পর্কের দেহখারাপ, যাকে বলে সন্ধ্যাসন্দেহ, তা হয় না আমি, জানাই না কাউকে লজ্জা হয়, এই সুতোকাটা পূর্ণিমার ব্রত পালন করি… ও বোধহয় পুরো মন্ত্র জানে না ভেবেছি অনেকবার, কিন্তু কর্তাঠাকুর হয়ে গিন্নিকে সুতোকাটার মন্ত্র শেখাব, তা হয় নাকি ও মহিলামহল জানে, ওকে নিশ্চিত শিখিয়ে দেবে…

এভাবেই বয়নে ঢুকি আমি… কোন এক সুতার চাঁদের আঁশের মতো… সবেদ আলি আমায় ধরে… চৌদ্দপুরুষের জোলা… জোলাও কি কম কথা ভাই ? শূন্য পয়েন্ট, এক পয়েন্ট, দু পয়েন্ট সুতো, ফাঁসের মাপ অনুযায়ী জাল… কিন্তু সবেদ আলি চায় মাকু… মহিষ শিং এর ওই অকাতর চলাচল… সেও গায় সুতাকাটুনির গান :

অতি সাবধানে ঘুরাই প্রেমের নাটা

যখন খেই যাবে ছিঁড়ে লব জুড়ে

সদা ইষ্ট প্রতি নিষ্ঠে রতি

আছে আমার মন আঁটা…

এ পূর্ণ দেহতত্ত্বের গান… রূপ সনাতনের রূপ গোঁসাই যখন বৃন্দাবনে মিরাবাই-এর কাছে কৃষ্ণতত্ত্ব বুঝতে গেলেন, মিরাবাই এলেন এক আশ্চর্য শাড়ি পরে… সব দেখা যায়, অথচ সব ঢাকা… নিজ দেহে ৬৪ অধিষ্ঠান দেখিয়েছিলেন মিরাবাই, ৫৩ এ এসে রূপের স্খলন হয়… তাতেই লেখেন রূপ সনাতনের কড়চা… দেহতত্ত্বের গোপনতম বই… বয়নশিল্পে যেন ওই সাহিত্য মিহিন হয়ে আছে…

ঢাকা শহর, বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলি বলে গেছেন বোধহয় মজনু শাহ… ভুল হতে পারে… পাপড়ি যখন লেখেন, এখন যেটা সোনার গাঁও সবেদ শাহ যানে তাকে একসময় পানামপুকুর বলা হত… সেখানে ডুব দিয়ে হাড্ডিগুড্ডি নখকোনা খুঁজত ওর বাজান… তখন মনে হয় পাপড়ি ওই বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলির রগ চিপে ধরেছেন…

এখনও বলা হয়নি, এটা আমি পাপড়ি রহমানের বয়ন উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া, সাহেবী ভাষায় রিভিউ লিখছি… আসলে প্রতিক্রিয়া তো ক্রিয়া থেকেই জন্মে গেছে…

পাপড়ি এতে বয়নকে কতরূপে এনেছেন আহা, যেন ক্রিয়াপদ এক ঈশ্বর… পয়রনবিবি মোষের শিঙে বানানো কণ্ডুল হাতে নিয়ে যা অবাক হয়, ওর অত বড় চাঁদের মতো বাঁকানো শিং কী করে পখির পালকের মতো হয় ? এই কৌতূহল যেন ইভ স্বয়ং এর চৌদ্দপুরুষের জোলাগিরির রক্ত আর সূক্ষ্ম বয়নের নেশা, এ এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিক সমস্যা যেন সবেদ আলির কাছে… আমি জানি, আমার মেজ কাকু জাল বুনত, ঘচাঘচ ঘচাঘচ… জাল বুনতে বুনতে হাঁটতো… একবার ওই সমুদ্রতটে সাইক্লোনের পরে নোনা জলে হাঁটতে গিয়ে পড়ে থাকা হাই টেনশান লাইনে কারেন্ট খায়, বেঁচে যায়… ডান পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়… অদ্ভুত পা নড়ে না, তাই হাতও নড়ত না… জাল হতো না… গামছাও পারত না বুনতে, ভারি ভালো বুনত… ওর ডান পা যেন পয়রনবিবি ছিল, আর শক আতিমুনি, যাকে সবেদ আলি কাস্তের মত বাঁকা কোমর দেখে এনেছিল ঘরে…

যেখানে পয়রনবিবির কোন জনমের ঘিয়ের স্বাদ জিভে উথাল পাথাল করে ওঠে, ঝুম্পাড়িকে বলে… আহা, ঘিয়ের স্বাদ মানে কী ? আর দিদিভাই, হিমঠাণ্ডা দেহ, ভাবতে পারছি না এ কোনওদিন আমার মাথায় হাত রাখবে না… তার মুখে ঘি মাখা অন্ন ঠুসে দিতে হয়, ঠুসে…

পাপড়ি লেখেন, বাঁশের সঙ্গে বাঁশ ঘষা খেয়ে যে শব্দ ওঠে তা পাখির পাখনার ঝাপটের মত… আহা আহা, আমি জাপটে ধরি এই ভাষা…

বা চরকায় হাতায় হাওয়া পাওয়া কাগজের চরকির মত কমলার হাতখানা দেখে মুল্লুকচানের জোলারক্তের সুর খলবলিয়ে ওঠে… উহহহ… সেই মাছের আছাড়ি পিছাড়ি যে এক পৃথিবীর শীৎকার…

বা সেই মুল্লুকচান যে পাড়ের নকশার ওঠানামা দেখে কুঁইডগা বা লাউডগা সাপ ভাবে… দৃশ্যে পাঁপড়ি এক তুলিকে পেনসিলের মতো চালানো শিল্পী…

যেমন চিলুমিনাকে পাওয়ার আকাক্সক্ষা নিয়ে লিখতে পাপড়ি লেখেন, তা সমুদ্দুরের জলে ভেসে যাওয়া কন্যা যায় বা কতদূর ? রাঘব বোয়াল হাঁ করে আসে। পেটে কিনা তার দশ উনানের আগুন।

পাপড়ি অদ্ভুত দক্ষতায় একের পর এক চরিত্র বোনেন… যেমন আতিমুনির পরের স্বামী আলাউদ্দিন, যে কামিনী গাছের তলায় বসে ছায়া পেতে চায়…. জজমিয়া আসে, মোহিতন আসে… যে মোহিতনকে পুট্টি সকালে জাগিয়ে জজমিয়ার বড় কষ্ট হয়…

মোহিতন সকালে আকাশ বাতাসের গলায় শোনে

আমার রঙ্গের কাপড়ে দাগ লাইগ্যাছে

কষ্ট হয় আমার মনে

দাগের কাপড়

রাগের ছুতায় ভিজাও সকালে

আহা, দাগের কাপড় রাগের ছুতায় ভিজাও সকালে… এই তো সুতাকাটুনির গান

মুল্লুকচানের ঠোঁট দুটো অদ্ভুতভাবে নড়ে ওঠে..

ভবের কাপড় তৈয়র

কইরল দীনবন্ধু কারিগর

মণিপুর কামিনী মিলে

সে কাপড় তৈয়র…

তারপর আসে আকাইল্যা… যে ভাবে মামুজান তাকে হজগীত কেন শেখাল না… সে ও বুনতে চায়, রেশম পারি করা, নলিতে ভরা, চাঁদবিবির মত জামদানি সেও বুনতে চায়…

পাপড়ি এক অসম্ভব, ভাষার আর চরিত্রের বয়ন একসঙ্গে কী অপূর্ব বয়ান লেখে, রোশনাকে আশমানে রেখে পয়রনবিবি ধীরে ধীরে ফিরে এসেছিল, পয়রনবিবি ফিরে এলেও তার মনপংখি কিছুতেই ফিরতে পারে নাই…

কোথায় যায় ধর্ম, কোথায় যায় ভেদাভেদ পাপড়ির এই অপূর্ব বয়নের কাছে ?

কখনও কী অদ্ভুত ব্যবসার কথা বলে পাপড়ি… শাড়ির ভাঁজে যার যত চমক যত ঠমক, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তারই পূর্ণ থাকে বেশি। ভাঁজ খুলে কোনও তাঁতি শাড়ি বিক্রী করে না। ভাঁজ খুলে কোনও মহাজন বা পাইকারকেও দেখায় না। ফলে ভাঁজ যার নিপুণ, তত তার লাভ।

লক্ষ্য করুন বাক্যটিকে, ভাঁজ যার নিপুণ তত তার লাভ।

এই পাপড়িই যখন লেখে, নিষ্ঠুর হাতের ফোঁড়ে দুটো পাখিকে আলাদা করে দেয় ঠিকই কিন্তু নিজের দেহ থেকে মনকে আলাদা করতে পারে না আতিমুনি… আমরা তখন তাঁতের টান দেখি… উত্তুঙ্গ টান…

হইরে বাড়ে

ঘাড়ে বাড়ে

প্যাচে বাড়ে

ঘাড়লেও কেও বাদে ঘাড়ে

প্যাচে হৈর

ঘাড়াল কেও বাদে ঘাড়ে

গানের গোড়া দিয়া হৈর…

এটা শিখতে হয় বয়নের আগে… আমি পাপড়ির জানা, জ্ঞানের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই… আকাইল্যাকে দেখি চোখের সামনে… দেখি চাঁদবিবিকে…

আতিমুনির যখন মনে হয় এই মাঘের রাতে আলাউদ্দিন মিয়ার কাছে না থেকে জয়তুনের মায়ের কাছে চলে যাক… আমার মনে পড়ে বৈষ্ণবী দিদির কথা, যিনি বলেছিলেন রসসাধনায় পুরুষ লাগে না সর্বদা…

পাপড়ি উপন্যাসে মুগরাকুল গ্রামকেও এক আশ্চর্য চরিত্র করে তুলেছে, সামান্য, অতিনিতান্ত বর্ণনাতেও সে যখন লেখে, ধুলোর সঙ্গে ফুল ফুল গন্ধ ঠেসে অদ্ভুত এক গন্ধের জন্ম দেয়। সে গন্ধ পেটে ঠেসে বাওকুড়ানি পাগলা ঘোড়ার মত দাবড়ে বেড়ায়। ঘোড়ার খুরের দাপটে মুগরাকুল আরও ধুলাময় হয়ে ওঠে… লক্ষ্য করুন ‘গন্ধ পেটে ঠাসার’ জায়গাটা… আজকে আমি যখন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছি কলকাতা নিকটবর্তী মফস্সলে, এক ধুলামলিন মাঠের পাশ দিয়ে, আকাশ মেঘে থম থম করছে… আমি তখনই পেলাম সেই গন্ধ আর এল সেই পাগলা ঘূরণচাক্কি বাতাস… পাতা ঢুকলো তার পেটে, কুটো ঢুকলো, ধুলো ঢুকলো… আমার নিজেকে তার পাশে দাঁড়িয়ে মুগরাকুল মনে হলো… আমি জানি না পাপড়ি কোথায় থাকে, কিন্তু সে-সময়ে আমি যেন তার সঙ্গে বয়ন মগ্ন…

এই হচ্ছে লেখা নামক কাজটির যুগ যুগ ধরে আন্দাজ, সে ইরশাদ না বলেই ম্যাজিক ঘটিয়ে ফেলে। দেখায় না, ঘটায়। আমি চিরকাল লেখাকে সপ্রাণ বা জীবিত বস্তু বিশ্বাস করেছি, আক্ষরিক, রূপালঙ্কার নয়। বয়ন পড়তে পড়তে সেই প্রাণস্পন্দ, ধুকপুকি বড়, বড় টের পাই। পাপড়ি যখন লেখে, ভাল্লুকের লোমের মত কালো কোমল অন্ধকারে আতিমুনি হোঁচট খেয়ে রক্তাক্ত হয়। পা কেটে যায়, নাক উলটে যায়। আতিমুনি তারপর আবিষ্কার করে তার পায়ের আঙুল নাই, পায়ের পাতা নাই, হাঁটু নাই, পা নাই, নিচে কাতলা মাছের মতো বিশাল লেজ… কিন্তু তার মধ্যে সর্বপ্রথম আতিমুনির মাথায় এক ম্যাজিকের মতো প্রশ্ন জন্মায় ‘এতসব নাই কখন হল ?’

আমারও মনে পড়ে, কনভালসানের রুগি আমি, গোদা বাংলায় ফিটের ব্যামো। দাঁত বসে কতবার জিভের ডগা কেটে বেরিয়ে গেছে। জ্ঞান ফিরে মনে হত প্রথম, যন্ত্রণারও আগে বা তার সঙ্গেই, আরে আমার জিভের ডগা নেই কখন হলো ? আতিমুনির তখন মাছকইন্যার কথা, আমার মনে পড়ত সর্পকন্যা উলুপির কথা… এসবই লেখার ম্যাজিক…

চরিত্রের মানস বর্ণনে পাপড়ি যেমন অনায়াসে হঠাৎ বাচ্য পরিবর্তন ক’রে এক অন্য মাত্রা এনে দেয় তার তুল্য নাই। ‘তবু মুল্লুকচান দেখার চেষ্টা করে। আর কিছু না হোক কমলাসুন্দরীর মুখখানা অন্তত দেখা দরকার। কমলাসুন্দরীর দুধের বোঁটার কেন পাথর কালো রঙ ধরল, তাও ভেবে দেখা দরকার।’

এই অদ্ভুত আসক্ত নিরাসক্ত বাচ্য পরিবর্তনে আমি থমকে যাই। আমি তো এভাবেই মাঝে মাঝে নিজেকে বলি, কেন এতগুলো চড়ুই একসঙ্গে উড়ে গেল কোনও শব্দ না হওয়া সত্ত্বেও ভেবে দেখা দরকার অমিতাভ, লিখে রাখা দরকার আকাশটা কেমন ঝুঁকে এসেছে হরিণীর মত।

বয়নের প্লট, কাহিনিবিন্যাস ইত্যাদি নিয়ে কিছুই লিখিনি। কারণ প্লটে বহুতল হয়, প্রকৃত লেখা নয়। এ লেখার আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর চরিত্র, ভাষার বিন্যাসে। ঝিমধরানো নেশা।

যেমন জোছনা পয়রনবিবিকে দেখতে এসে ভাবে, মায়ে কিমুন হাড্ডি হইয়া গেছে। কয়দিন বাদে এলে হয়ত হাড্ডি কয়খানও দেখতে পেত না… ঝিম ধরে না বলুন ? আমার মনে পড়ে আশির দশকের শেষ, নব্বই শুরু, পশ্চিমবাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম বড়কামারদায় আমার মামার বাড়ি। মায়ের সাথে গেছি। মায়ের ঠাকুমা, হাঁটু ভাঁজ করেই বসে থাকেন, হামানদিস্তায় পান থেঁতো করে খান… সেই থেঁতো পান মুখ থেকে বের করে এক অনাবিল হাসিসহ মায়ের হাতে দিয়ে আশীর্বাদ করেন। মাকে বলি, একি, এত এঁটো। মা বলে এর জন্যেই তো আসা, ক’দিন বাদে এই এঁটোটাও তো পাবো না!

আমি আবার থমকাই… পৃথিবী কোথায়, কোনদিকে, খেয়াল থাকে না… থাকে শুধু মুগরাকুল গ্রাম… জাদু আর বাস্তব এভাবে মিলমিশ খায় যেমন জজমিয়াদের বাড়িতে মরাকান্নার কারণে শীতলক্ষ্যার বাম এসে ঢোকে আর পয়রনবিবি খড়কুটার মত জোছনাকে আঁকড়ে ধরে…

পাপড়ি কী অনায়াসে লিখে ফেলে :

‘আয় বৃষ্টি ঝাঁইপা

ধান দিমু মাইপা

কিন্তু ধান চাউলের কথা বৃষ্টির কানে যায় না… বা নুর মোহম্মদ বা জজমিয়ার নকশার লড়াই ইর্ষার কথা বলতে গিয়ে হাটের বর্ণনা দেয় পাপড়ি… বলে দালাল, ফড়ে, পাইকারদের কথা… আর লেখে ‘কলাবৌ এর ঘোমটায় মুড়ে থাকে এই হাট’… চাঁদবিবির সৌন্দর্যের বর্ণনায় বলে, অনেক কালের পুরানা পুকুরের জলে রাজহংসী ভেসে আছে…

মুল্লুকচানের গান গুঞ্জনে মুগরাকুলের মানুষ গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। দিনমান পড়িঘরে খেও মেরে যাওয়া হাত এসময় বিশ্রাম পায়। এই বিশ্রাম ঘুমঘোরেও তারা ভাবে নতুন নকশার কথা। আমার মেজকাকু, যাকে বড়কাকু বলতাম, অতি উচ্চশিক্ষিত বামপন্থী পরিবারে বড়কাকু ছিল আক্ষরিক অপদার্থ, কিছু করত না, কিন্তু সবার আপদে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাই করতে গিয়েই মারা যায়। ব্রাহ্মণ বংশজাত বড়কাকু বড় ভালোবাসত জাল বুনতে, জোলাদের পায়ে বসে শিখেছিল জালবোনা, জালবোনা আর দুর্গাপূজার পূরোহিত হওয়ার মধ্যে কোন তফাৎ দেখত না। বয়নে চারুবালার প্রসঙ্গ যখন আসে আমার মনে পড়ে এসব। কত রকমের ফাঁস, এক নম্বর, দু নম্বর, তিন নম্বর দড়ি, ঘের, নাটা (এসব পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার শব্দগুলি বলছি), তাকে দেখেছি ঘুমঘোরে অমন হাত ভাঁজ করা…

এভাবেই লেখার ঘটন ঘটায় পাপড়ি…

পাপড়ি উপন্যাসে শব্দকে মাকুর মত চালায়…. খালি মাঝে মাঝে তথ্যাধিক্য এবং সংখ্যাধিক্য একটু পাঠঘোরে ব্যাঘাত ঘটায়… তবে তা সামান্য… আমি ডুবে যাই তাঁতে… আমার এক বন্ধু স্বপ্নতাঁত বলে একটি বই লিখে সকালবেলায় স্কুটারে করে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর সামনের মুদিখানার দোকানে নীল লাইলন দড়ি কিনে ঘরে ঢুকে ঝুলে পড়ে…

সে বোধহয় বয়নের আসল রহস্য টের পায়নি… সে ভেবেছিল ‘তাকে আজ হোক কাল হোক রূপসীতে ফিরতে হবেই’….

‘শাদি মুবারক’ লিখতে হবে, জানতে হবে মরাকান্নায় শীতলক্ষ্যার ঢেউ ফুলে ফেঁপে ওঠে…

এসব আজব জাদুতে পাপড়ি আমাদের অঘোর অবোধ করে তোলেন…

আশ্চর্য চরিত্র রমরম করে উপন্যাসজুড়ে আর সূক্ষ্ম শাড়ির, পাড়ের ধারে কুঁইডুগা বা লাউডগা সাপের চলনের নকশা বয়ন চলে, চলতেই থাকে… আমরা হাঁ হয়ে শুধু দেখি মাকুর চলাফেরা… ছোবল গিলে খাই

 লেখক : প্রাবন্ধিক, বিজ্ঞাপন নির্মাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares