এরেন্দিরা থেকে আরিমাতানো- একজন মাহবুব ময়ূখ রিশাদের যাত্রারম্ভ : রাজীব নূর

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-তরুণ কথাসাহিত্যিকের উপন্যাস

উপন্যাস সংকেতের মাধ্যমে, পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের ধাঁধার মাধ্যমে বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসে যে বাস্তবতা নিয়ে কাজ করেছেন, তা জীবনের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন―যদিও তা জীবনের বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। স্বপ্ন সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য।’ : গাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেস

যিশুর পুনরুত্থানের গল্পটা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের তো বটেই, মুসলমানদের কাছেও গল্পের একাংশ বাস্তবের চেয়ে বাস্তব। এই বাস্তবতার অন্তরালে যে জাদুর অন্তর্জাল রয়েছে, তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কথাখেলাপি হয়ে যেতে পারে আমার। যদিও এই প্রশ্ন নতুন নয়―ক্রুশে আদৌ যিশুর মৃত্যু হয়েছিল কিনা, বহুবার বহুভাবে আলোচিত হয়েছে তা, তবু এই প্রশ্নের পুনরুত্থাপনে আহত হতে পারেন বিশ^াসীরা। যিশু যিনি মুসলমানদের কাছে হযরত ঈসা (আ.), ইসলাম ও খ্রিস্ট উভয় ধর্মাবলম্বীই―তাঁর পিতৃহীন জন্মে যে জাদুময়-বিস্ময় রয়েছে―তা নিয়ে বিস্মিত হন না, বরং এটাই চরম সত্য বলে বিশ^াস করেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বেশিরভাগ তাঁর পুনরাবির্ভাবও বিস্ময়কর হবে বলে মনে করলেও তাঁরা বিশ^াস করেন, ঈসাকে হত্যা করা হয়নি, তিনি ক্রুশবিদ্ধও হননি; কিন্তু এইরূপ বিভ্রম হয়েছিল হত্যাকারী বলে দাবিদারদের। আল্লাহ তাঁকে অক্ষত অবস্থায় তুলে নিয়েছেন নিজের দিকে। বলা হয়েছে, ঈসা (আ.) চতুর্থ আসমানে রয়েছেন। কিয়ামতের আগে তিনি দুনিয়ায় আসবেন হযরত মুহাম্মাদ (স.)-এর উম্মত হয়ে; অতঃপর তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজার পাশেই তাঁর দাফন হবে।

কাউকে আহত করা এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয় এবং এখানে সেই কূটতর্কের প্রয়োজনও নেই। বরং যীশুর পুনরুত্থানের গল্পটা বলব, মাহবুব ময়ূখ রিশাদের আরিমাতানো উপন্যাসের আরিমাতানো কফিনের ভেতরে শুয়ে যে গল্প শোনায়, সেই গল্পের জাদুকে বাস্তব বলে প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে। জাদু কি আদৌ বাস্তব, মার্কেস কি বলেন―‘আমরা যে বাস্তবকে দেখি, তার পেছনে যে ধারণাটা আছে সেটাই জাদুবাস্তবতা।’ তাহলে জাদুকে বাস্তবের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া খুব জরুরি নয়, বরং বাস্তবের নিরিখে জাদুকে ব্যাখ্যা করা গেলেই তা আর জাদুবাস্তব থাকে না। মার্কেসও বলেছিলেন, ‘ওরা যদি বাইবেলে বিশ^াস করে, তাহলে আমার গল্প বিশ^াস না করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।’

ধরা যাক, মৃত্যুর তিন দিন পর যিশু পুনরুত্থিত হয়েছিলেন, যদি সত্যিই এটা ঘটে থাকে, তাহলে মৃত্যু  অজেয় বলে কিছু নয়, বরং এমন এক শত্রু যাকে পরাজিত করা যায়, অন্তত যিশু তা করেছিলেন। যিশু জগতের সবার পাপের দায় নিয়ে ক্রুশে প্রাণ দিলেন। বাইবেলের নতুন নিয়মে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, রোমানরা যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার পরে, তার দেহে মলম লাগানো হয়। জোসেফ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে একটি নতুন সমাধিতে সমাহিত করেন। কিন্তু ঈশ^র তাকে মৃত অবস্থা থেকে পুনরুত্থিত করেন। পুনরুত্থান লাভের পর ৪০ দিন ধরে যিশু তাঁর শিষ্যদের দেখা দেন। ৪০ দিন পর তিনি স্বর্গারোহন করে ঈশ^রের দক্ষিণ হস্তের পাশে অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন।

২. সর্বজ্ঞ কথক

আরিমাতানো কি করে ? উপন্যাসের অধ্যায় এক, যে অধ্যায়ের নাম ‘সায়নাইড ফুল’ বর্ণনা অনুযায়ী, সে মৃত্যুবরণ করেছে। তার জন্মও রহস্যাবৃত। সে জন্মেছে মা-বাবার মৃত্যুর পরে। কেমন করে হয় এমন জন্ম এবং মৃত্যুর পর উত্থান। বলে রাখা দরকার রিশাদের লেখা আরিমাতানো উপন্যাসটির ‘এক’ দিয়ে চিহ্নিত করা অধ্যায়ের আগেও একটি অধ্যায় রয়েছে, যে অধ্যায়ের নাম ‘গল্প শুরুর আগে’। শুরুর আগে একজন সর্বজ্ঞ কথক রয়েছে, যার পুরো গল্পটিই জানা আছে, কিন্তু সে কফিনের ভেতরে আটকাপড়া, অথবা মৃত্যুর পর কফিনের ভেতরে পুনরুত্থিত হওয়া, অথবা যিশুর মতো আদৌ মৃত্যু বরণ না করা আরিমাতানোর জীবনের সবটা আরিমাতানোর চেয়ে বেশি জানে, কিন্তু বলতে নারাজ। তাই আরিমাতানোকেই বলতে হয়, ‘চোখের পলক ফেলা মুহূর্তের ভেতরেই জীবনটা থেমে গেল স্থবিরতায়। আমি কি পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম, আমাকে কেউ কি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল, নাকি নিজেই স্বেচ্ছাপতনকে বেছে নিয়েছিলাম ? উত্তরটা বদলে দেবে না কিছুই।’ প্রকৃতপক্ষে কিছুই বদলায় না, এমন কি পুনরুত্থানের পর কাটানো যিশুর ৪০ দিনকে বাতিল করলেও। সুসমাচারের বিবরণগুলোতে শূন্য কবর ও পুনরুত্থানের পর যিশুর দেখা দেওয়ার বিষয়ে যে বর্ণনা আছে সেগুলো একেবারেই মনগড়া কেচ্ছা-কাহিনি এমনটাই মনে করা হয়। যিশু মারা যাবার অনেক অনেক বছর পরে এগুলো লেখা হয়েছে যাতে তাঁর স্বর্গীয় ক্ষমতা প্রমাণ করা যায়।

যিশুকে নিয়ে প্রচলিত এই সব বিশ^াস বাতিলকারীদের সংকটে পড়তে হবে, তবে আরিমাতানোকে পাঠক শতভাগ বানানো চরিত্র বলে বাতিল করে দিলে কেউ ক্ষুব্ধ হবে না। তবু তাকেই বিশ^াস করতে বলছি, সেই আরিমাতানোকে, যে বলছে : ‘কফিনের ওপরের ডালার সঙ্গে আমার মুখের ব্যবধান সর্বোচ্চ তিন থেকে চার আঙুল। শুরুতে অন্ধকার আমাকে বানিয়ে রেখেছিল অন্ধ। এখন অন্ধকার সয়ে এসেছে অনেকটাই। দৃষ্টিও ফিরেছে।

কফিনের ডালায় একটা ফুলের ছবি স্পষ্ট দেখতে পারছি। এমন নকশাদার কফিন ওরা কোথায় পেল দাফনের জন্য ? কফিনে দাফন করার ট্র্যাডিশন আবার আমাদের দেশে নেই। সত্যি কি তাহলে দাফন করা হয়েছে আমাকে ? এমন একটা সন্দেহ এলে বিবর্ণ ফুলটির দিকে আরও বিপন্ন বোধ করি। ফুলটিও হয়তো মৃত। আমাকে দেখে ফুলটি ভাবছে, এমন একটা মানুষ ওরা কোথায় পেল দাফনের জন্য।’ (পৃষ্ঠা ০৯)

আরিমাতানো অধ্যায় এক, যে অধ্যায়ের নাম ‘সায়ানাইড ফুল’ থেকে নেওয়া এই কথাগুলো পেরিয়েই আমরা পাই, মার্কেসের কথা : লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা অথবা কলেরার দিনগুলোতে প্রেম উপন্যাসে মার্কেস বলেছিলেন সায়ানাইডের গন্ধ কটু কাঠবাদামের মতো। তাহলে এটা সায়ানাইড ফুল। আমি অবশ্য শুঁকে দেখিনি। ফুল না চেনার মতো করে গন্ধ সম্পর্কেও আমি অজ্ঞ ভীষণ। আর মার্কেস যেহেতু বলেছিল আমি জানি আমার মনে হওয়াটা ভুল নয়।’ (পৃষ্ঠা ১০)

‘সায়নাইড ফুল’ অধ্যায়টি নিয়ে আবার কথা বলা যাবে, বলা দরকার হবে, কেননা, আরিমাতানোর আদৌ মৃত্যু হয়েছে কিনা, হলে সামান্য জ¦রের কথা আসছে কেন, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে হবে। তার আগে পাঠক হিসেবে লেখক মাহবুব ময়ূখ রিশাদের সঙ্গে আমার পরিচয়ের গল্পটা বলে নেওয়া দরকার। অবশ্যই পাঠককে এটাও বলে নিতে চাই, এটা কোন প্রবন্ধ নয়, এমন কি কোন উপন্যাস আলোচনাও নয়, বরং একজন পাঠকের উপন্যাস পাঠের প্রতিক্রিয়া। তবে শুধু উপন্যাস নিয়ে নয়, আমি ওঁর কিছু গল্প নিয়েও কথা বলব। সঙ্গে ঔপন্যাসিককের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে অবান্তর আলাপচারিতাও করব একটুও। আপাতত সেই অবান্তর আলাপই শুরু করি।

৩. জাদুবাস্তবতার গাথা

তখন আমি ইত্তেফাকে কাজ করি। সাহিত্য পাতা দেখি। একদিন একটা গল্প এল আমার হাতে, সেই গল্পটির লেখক ‘আরিমাতানো’ উপন্যাসের ঔপন্যাসিক মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। ওই গল্পের আখ্যানটা ভালো করে মনে করতে পারছিলাম না বলে রিশাদের কাছে বললাম, ‘তুমি কি আমাকে ওই গল্পটার একটা কপি পাঠাতে পার ?’ রিশাদের মতো একজন বড় লেখককে আমি তুমি করেই ডাকি। এই লেখাতেও তাই ডাকব। আগেই তো বলে নিয়েছি, এটা কোনো প্রবন্ধ নয়। রিশাদ গল্পটি পাঠানোর আগেই মনে করার চেষ্টা করেছিলাম, এরেন্দিরা নাকি ইব্রাহীম কে গল্পটির প্রধান চরিত্র ? সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। নতুন করে পড়বার পর নিশ্চিত হয়েছি, ইব্রাহীমই প্রধান চরিত্র। ইব্রাহীম কল্পনা করে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সরলা এরেন্দিরার এরেন্দিরা স্বয়ং ঢুকে পড়ে রিশাদের গল্পে, ইব্রাহীমের জীবনে। এরেন্দিরা এসেছে ঢাকা শহরে খোদ তার স্রষ্টা মার্কেস এবং প্রেমিক ইউলিসিসকে খুঁজতে, রিশাদ এবং আমিও যে শহরে থাকি, নিজের পরিচিতিতে যে শহরটি সম্পর্কে রিশাদ লিখেছে ‘বর্তমানে বসবাস এক মৃত শহরে যার নাম ঢাকা’, সেই ঢাকা শহরের ধানমন্ডি এলাকায় এরেন্দিরার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ভূতের গলির ইব্রাহীমের। ভূতের গলি প্রসঙ্গ শহীদুল জহিরকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পড়তে গিয়ে দেখি গল্পকারের ভাষাটাও শহীদুল জহিরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

গেল জুলাইয়ের শেষ দিককার এক সন্ধ্যার আড্ডায় রিশাদ নিজেও তা স্বীকার করল। ও বলল, ‘ভূতের গলির এরেন্দিরা’ লেখার কিছুকাল আগে ওর পরিচয় শহীদুল জহিরের লেখার সঙ্গে। তবে তার আগেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়া হয়ে গেছে তার। রিশাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহে। স্কুলজীবনে তিন গোয়েন্দাজাতীয় বইয়ের মধ্যেই সীমিত ছিল ওর পৃথিবী। আর লেখালেখি ? সারা দিন কি করেছে তাই লিখে জানাত এক বান্ধবীকে। ‘প্রেম হয়েছিল কিনা’ হেসে বলল, ‘না, হতে পারত। পারতও না।’ পুত্রসম কারও সঙ্গে ওর বালকবেলার প্রেম নিয়ে এর বেশি গল্প করা কঠিন।

তার চেয়ে বরং ২০১২ সালের দিকে ইত্তেফাক সাময়িকীর ই-মেইলে পাওয়া গল্পটির কথা বলি। ওই গল্পের লেখক অবশ্য তিন গোয়েন্দার ভুবন পেছনে রেখে শহীদুল জহির হয়ে মার্কেসের পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছে। তাই ওর গল্পের নাম ‘ভূতের গলির এরেন্দিরা’। গল্পের নামই আমাকে আটকে ফেলে। মার্কেস খুব বেশি পড়েছি এমন দাবি করব না। যতটা পড়েছি, তারও প্রায় বেশির ভাগটা ছিল মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদনির্ভর। অবশ্য মার্কেসের পৃথিবীতে, লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতার গাথায় আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন আলম খোরশেদ তাঁর সম্পাদিত ‘জাদুবাস্তবতার গাথা : লাতিন আমেরিকার গল্প’ দিয়ে। জি এইচ হাবীব আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন। আলম খোরশেদ থেকে অবশ্য যাত্রা করি মানবেন্দ্রের অনুবাদে ‘সরলা এরেন্দিরা ও তার নিদয়া ঠাকুমার করুণ কাহিনি’র দিকে। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি। থাকি চট্টগ্রাম শহরে। নিজের পড়াশোনার খরচ সংগ্রহের জন্য খণ্ডকালীন সাংবাদিকতা করি। এইরকম দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচয় হয় ডাক্তার মোহিত কামালের সঙ্গে। তখনও তিনি লেখালেখি করতেন। তবে লেখকের চেয়ে ডাক্তার হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। মার্কেসকে ভূতের গলিতে এরেন্দিরার খুঁজতে আসার যে গল্প মাহবুব ময়ূখ রিশাদ ইত্তেফাক সাময়িকীর জন্য পাঠিয়েছিলেন তার সঙ্গে এই সব সাতসতেরোর সম্পর্ক নেই। তবে ওই গল্পটির গল্পকার মাহবুব ময়ূখ রিশাদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক রয়েছে, আছে আরিমাতানো উপন্যাসের আরিমাতানোর সঙ্গেও। আরিমাতানো যে মেডিকেল কলেজটিতে ছাত্র হিসেবে পড়তে গিয়েছিল, কোথাও তার নাম না বলা হলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না এটা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। আমার সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচয় নিবিড় করে দিয়েছিলেন যে মোহিত কামাল, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ তাঁর ছেলে। রিশাদের গল্পটি যখন আমি ইত্তেফাকে ছাপানোর জন্য পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গল্পকারকে নিমন্ত্রণ করি, তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তখনও জানতাম না ওর বাবা আমার একান্ত ঘনিষ্ঠজন। একটু আগেই বলেছি চট্টগ্রাম জীবনেও মোহিত ভাই লেখালেখি করতেন। পরে তিনি ঢাকায় এলেন। আমিও পেশাগত কারণে ঢাকায় থিতু হই। মোহিত কামাল লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এ ঢাকাতেই। তাঁরই ছেলে একদিন একটি গল্প পাঠিয়ে আমাকে এতটা মুগ্ধ করে ফেলল, আমি ভাবলাম এই ছেলেটার সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা জরুরি। সে এল, দীর্ঘ আড্ডা দিয়ে গেল, একবারের জন্যও জানাল না তার বাবার নাম মোহিত কামাল। অথচ ওর জানা ছিল আমার সঙ্গে তার বাবার সম্পর্কটা অনেক নিবিড়। পিতাপুত্রের সম্পর্কটা জানা হলো এক সন্ধ্যায় ওদের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পর। মোহিত ভাই বললেন, ‘তোমার একজন লেখক আমার বাসায় আছেন।’ স্বভাবতই কৌতূহলী হলাম এবং মোহিত ভাই ‘রিশাদ’ বলে ডাকতে ভেতর থেকে বসার ঘরে এল মাহবুব ময়ূখ রিশাদ।

৪. অন্তর্গত রক্তের ভেতর

বাবার পরিচয় আড়াল করতে চাওয়ার মধ্যে কি কোনও বিরাগ লুকানো আছে ? না, তা যে নেই রিশাদের সঙ্গে জুলাইয়ের শেষ দিককার আড্ডায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারও আগে ডাক্তারদের কারও কারও সঙ্গে এক-আধটু আলাপে বুঝতে পারি, রিশাদ পেশাগত জগতেও বাবার পরিচয় আড়াল করেই রাখে। অথচ এই পরিচয় ওর চলাকে আরেকটু সহজ করে দিতে পারত। রিশাদ ডাক্তার হয়েছে। লেখকও। তবে কোনও ক্ষেত্রেই বাবার মতো হতে চায়নি, চায় না। বাবার লেখা ওর পড়া হয়েছে ছোটবেলাতেই। ওর মা-বাবা দুজনই ডাক্তার এবং সরকারি চাকুরে হওয়ার কারণে ছোটবেলায় ওর ডাক্তারির প্রতি বিরূপতা ছিল। একটু বড় হয়ে টেকনাফ বেড়াতে গিয়ে মত পাল্টে গেল রিশাদের। দেখল, বেশ কয়েকজন নারীপুরুষ নিজেদের ছেলেমেয়েদের এনে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন ওর মায়ের সঙ্গে। কেউ বলছেন, ‘আপনার নামে আমার মেয়ের নাম রেখেছি মিলি।’ কেউ আবার পরিচয় দিচ্ছে, ‘এই যে আমার ছেলে মোহিত।’

এ তো গেল রিশাদের ডাক্তার হওয়ার গল্প। কিন্তু গল্প-উপন্যাস লেখা ? এটা বোধ হয় ওর অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করত। বাবার লেখালেখি অল্পবিস্তর পড়েছে ছোটবেলা থেকে। তবে লেখক হওয়ার বাসনা তীব্র করে তুলেছেন শহীদুল জহির এবং অবশ্যই গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস।

৫. জাদুকর মার্কেস

‘সরলা এরেন্দিরা ও তার নিদয়া ঠাকুমার করুণ কাহিনি’ থেকে বেরিয়ে আসা চরিত্র এরেন্দিরাকে নিয়ে গল্প লিখলেন রিশাদ। এরেন্দিরা চরিত্রটা জাদুবাস্তবতার জাদুকর মার্কেসের চরিত্র হলেও রিশাদ তখন পর্যন্ত বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে যুক্তিবিন্যাস করার চেষ্টায় ছিল। তাই এরেন্দিরার দেখা পাওয়ার জন্য ইব্রাহীমকে নির্মাণ করতে গাঁজায় আসক্ত বলে। আদৌ ইব্রাহীমের দেখা হয়েছিল নাকি গঞ্জিকা-বিভ্রান্ত ইব্রাহীম কল্পনা করে নিয়েছিল চরিত্রটি ? কল্পনাতে এরেন্দিরার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল, এমনটা নিশ্চিত করার জন্য  ইব্রাহীমকে নির্মাণ করা হয়েছে, ‘ইব্রাহীম যখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন সবাই তাকে চিনতে শুরু করল। পাগলা কোন বাড়িতে থাকে তা নিয়ে মানুষের মাঝে বিস্তর আগ্রহ তৈরি হলো। এই সুযোগে এলাকার কিছু লাফাঙ্গা, বখাটে ছেলের কদর কিছুটা বেড়ে গেল। কারণ তারা ইব্রাহীমের সঙ্গে একটু হলেও মেলামেশা করেছে। অন্যরা ইব্রাহীম সম্পর্কে জানার জন্য গেলে তারা উৎসাহের সঙ্গে নানা কথা বানিয়ে বলতে শুরু করল।’

বানিয়ে-বলা লাফাঙ্গা, বখাটে ছেলেদের সঙ্গে ইব্রাহীম এরেন্দিরার সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প বলতে শুরু করেছিল নিশ্চয়ই, কেউ এরেন্দিরাকে দেখেনি, ‘ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে সবাই জেনে যায় ইব্রাহীম অসুস্থ হয়েছে এরেন্দিরার জন্য। বুড়ো মানুষ যাদের দাঁত পড়ে গেছে, তারা ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না―বলে এরেদিরা, ছোটরা যাদের দাঁত এখনও আলো দেখেনি তারা বলে―এলেদিলা আর প্রাপ্তবয়স্করা বলে ‘মাগী’। এরেন্দিরা অথবা শুধু মাগী এবং মাগী শব্দটা ব্যবহার করতে পেরে তাদের চোখেমুখে এক ধরনের আনন্দ খেলা করে যায়, যদিও এরেন্দিরাকে এই বিষয়ে তাদের কোন ধার না নেই, ছিল না।’

গল্পের এই সব মানুষের এরেন্দিরা সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলেও ইব্রাহীমের তা ছিল বলে গল্পের সর্বজ্ঞ কথক আমাদের জানিয়ে দেন, ‘রেজাল্ট যাই হোক না কেন, ইব্রাহীম বই পড়তে পছন্দ করে। ঘরকুনো স্বভাবের―তাই বই পড়ার অবসর পায় সে। যদিও তার জানা ছিল না যে, এই বই পড়ার অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তার জীবনে কিছুক্ষণ পর একটি আনন্দদায়ক কিংবা বেদনাদায়ক একটি ঘটনা ঘটবে, যার কারণে পরবর্তী সময়ে সবাই তাকে পাগল ঠাওরাবে।’

কেমন করে সেই ঘটনা ঘটল ? গল্পকথক বলে, ‘ভূতের গলি থেকে বের হয়ে, হাঁটতে হাঁটতে ধানমন্ডি লেকের কাছে চলে আসে সে। নিজের জীবনের হিসেবগুলো মেলানো আছে কিনা এটা ভাবতে ভাবতে হোঁচট খেয়ে থেমে যায়। কোনও পাথর কিংবা অমসৃণ পথ না বরং এক তরুণীকে কাঁদতে দেখে থেমে যায় ইব্রাহীম।’

এই তরুণীটি এরেন্দিরা। যার উচ্চারণ বাঙালিদের মতো নয়, যার কথা শুনে মনে হয়, বিদেশি কেউ বাংলা শিখছে। সদ্যশেখা বাংলাতেই এরেন্দিরা জানায়, সে তার স্রষ্টা মার্কেস আর ইউলিসিসকে খুঁজতে এসেছে। এই এরেন্দিরাই গল্পের শেষে মোহনাতে একাকার হয়ে যায়। ফলে ‘এটা অবশ্য সম্পূর্ণ কাকতালীয় যে, এরেন্দিরা তার সৃষ্টিকর্তা মার্কেসকে এবং মোহনা মানুষের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে খুঁজতে থাকে―তাদের এই চাওয়া পূরণ হয় কিনা জানার আগেই ইব্রাহিম অসুস্থ হয়ে যায় এবং মানুষ তাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে।’

৬. ভূতের গলির এরেন্দিরা

যদিও গল্পটির নাম ‘ভূতের গলির এরেন্দিরা’, গল্প শেষে আমরা দেখি এটা আসলে ইব্রাহীম নামে ভূতের গলির এক তরুণের গল্প, যে ছোটবেলায় মোহনার প্রেমে পড়েছিল। অন্যভাবে বললে, মোহনাও ইব্রাহীমের প্রেমে পড়েছিল। গল্পটা অনেকখানিই ‘অথবা/হয়তো/ কিংবা/বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক যে ব্যবহার শহীদুল জহিরে পাওয়া যায়, তা দিয়ে প্রভাবিত। ওই গল্প থেকে ক্রমান্বয়ে উত্তরণ হয়েছে, তবু আরিমাতানোর আগপর্যন্ত ওর যাত্রাটা ওকে ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’র সবচেয়ে শক্তিশালী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এই ধারাটা কেমন ? ‘শহীদুল জহিরের প্রবণতা ও স্বকীয়তা’ শীর্ষক প্রবন্ধে মোজাফফর হোসেন বলছেন, ‘শহীদুল জহির যখন লিখতে এসেছেন তখন বিশ্বে সাহিত্যজগতের বড় তারকা হলো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। মূলত তিনি ওয়ালীউল্লাহ এবং মার্কেসকে বেটে তৃতীয় একটা কম্পোনেন্ট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। আরেকটু বিশদভাবে বললে, কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও ইলিয়াসের প্রভাবও তাঁর ভেতর আছে। তবে এইসব প্রভাবকে ছাপিয়ে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই গল্প বলার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা আমরা কেবল শহীদুল জহিরীয় ধারা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।’

রিশাদের গল্পের বই তর্কশয্যায় মৃত্যু পর্যন্ত শহীদুল জহিরীয় ধারার বিস্তার দেখতে পাওয়া যায়। তবে ভাষায় যতটা না, তারও বেশি গল্প বলায়। ‘অথবা/হয়তো/কিংবা/বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক যে ব্যবহার শহীদুল জহিরে পাওয়া যায়, তার পুনরাবৃত্তি দেখি ‘তর্কশয্যায় মৃত্যু’র প্রথম গল্প ‘দাগের গায়ে চাঁদ’ থেকে। গল্পটা শুরু হচ্ছে―‘কুয়াশা এলেই কি…. কম্বল রোদে দিতে পারছিলা ?’ (পৃষ্ঠা ৯)

বইটির ছয়টি গল্পেই নানান ধরনের দূরারোগ্য ব্যাধির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন গল্প রোগ-বালাইয়ের গল্প নয়। বরং ভূতের গলির রিশাদ ঢাকা শহরজুড়ে হাঁটতে শুরু করে। ‘দাগের গায়ে চাঁদ’ গল্পটির কথাই ধরি, মনসুর আর মনসুরা থাকে ১৩/বি মনসুরাবাদে। গল্পে এ তথ্যটি জানবার আগে আমাদের জানতে হয়, মনসুরাবাদের আকাশে এক দল পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। যে পাখিগুলো ক্ষণে ক্ষণে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বৃষ্টি নামে এবং মনসুর আর মনসুরা তাদের প্রেমের দিনগুলোতে ফিরে যায়। সেখানে অবশ্য বেশিক্ষণ থাকতে হয় না। মনসুর আর মনসুরা দম্পত্তির একটা পুত্রসন্তান হলো এবং পুত্রের  নাম রাখা হলো মুগ্ধ। সন্তান অবশ্য এর আগেও একটি আছে তাদের, সেটি মেয়ে এবং তার নাম মুমু। এই যে একের পর এক ‘ম’ সেটা গল্পের বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বলা হয়ে থাকে গল্পকে বাস্তবের চেয়েও বাস্তব হতে হবে। জীবনে হঠাৎ একদিন ট্রামের তলায় ঝাঁপ দিতে পারেন একজন জীবনানন্দ দাশ। ওই ঘটনা দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে বহুকাল। উপন্যাসে কোন জীবনানন্দ আত্মহত্যা করলে, এমন কী আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা গেলেও তার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করতে হয়। কাজেই মনসুর আর মনসুরার ছেলে মেয়ের নাম মুমুু আর মুগ্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক হলেও মনসুরাবাদে একজন মনসুর একদিন একজন মনসুরাকে পেয়ে গেলে একটু অস্বাভাবিক লাগে। এরেন্দিরার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য যে গল্পকার ইব্রাহিমকে মানসিক ভারসাম্য হারানো চরিত্রে পরিণত করে, সেই গল্পকারই মনসুরাবাদে মনসুর এবং মনসুরাকে খুঁজে পেয়ে যায়। শুধু তাই নয়, তাদের প্রণয় এবং পরিণয় ঘটিয়ে দেয় অবলীলায়। তাদের দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর মনসুর দেখতে পায়, ‘ভূগর্ভ ফুঁড়ে কোথা থেকে একটা হরিণ এসে…কিন্তু তার সুযোগ নেই।’ (পৃষ্ঠা ১১)

‘মৌরিতানিয়ার বাবা’র প্রতিস্থাপিত কিডনি ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে রেললাইনে হরিণ ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো রূপকার্থ নেই। ‘কার্তিকের কাশি’ যখন এইডস বলে প্রমাণিত হয় তখন নিখিলের সঙ্গে তিন ভাই এসে দাঁড়ায় হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষার লাইনে। ‘কার্তিকের কাশি’ গল্পের চেয়ে ‘লিয়ন্তিকা’ অনেক বেশি লোকশ্রুতি আশ্রিত। তবে ভবিষ্যবাচ্যে বলা এই গল্প প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ মনে করিয়ে দিলেও ‘লিয়ন্তিকা’ও শহীদুল জহিরীয় ধারার সম্প্রসারণ।

তবে ঘটনাপ্রবাহে শহীদুল জহির যেমন একের পর এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়ে এগোতেন রিশাদের গল্পে এত দেয়াল নেই। শহীদুল জহিরের এমন গল্প আছে, যা পাঠক হিসেবে গোগ্রাসে গেলা শেষ করার পর মনে হয়েছে, গল্পটির লাগামছাড়া বাস্তবতার নাগাল পাওয়া গেল না। রিশাদ গল্পের লাগাম ছেড়ে দিয়েই লাগাম টেনে ধরতে জানে। ফলে পাঠকের পক্ষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয় না। তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেওয়ার সচেতন চেষ্টা জাদুবাস্তবতার জাদুর পাখিটার পাখা ঝাপটানোকে বিঘ্নিতও করে, তা দেখব রিশাদের উপন্যাস আরিমাতানো পাঠে।

৭. সায়ানাইড ফুল

শুরুতেই বলেছিলাম ‘সায়ানাইড ফুল’ অধ্যায়টি নিয়ে আবার কথা বলা যাবে। আসলে কথা বলতে হবে। রিশাদের আরিমাতানো উপন্যাসের আরিমাতানো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘মার্কেস’ বলেছিলেন সায়নাইডের গন্ধ কটু কাঠবাদামের মতো। আরিমাতানো কী আত্মহত্যা করেছে ? আরিমাতানোকে কী প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীরা ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরেছে ? শুধু হ্যাঁ, শুধু না দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। শুনেছি, আমাদের পাহাড়ি বনেই দুই ধরনের কাঠবাদাম পাওয়া যায়, একটা মিষ্টি, অন্যটি তেতো। তেতোটায় প্রচুর হাইড্রোজেন সায়ানাইড থাকে। গোটা দশেক তেতো বাদাম কাঁচা খেলে প্রাপ্তবয়ষ্কদেরও মৃত্যু হতে পারে। আত্মহত্যা কিংবা আত্মহত্যা কোনটাই ঘটেনি বলে আমরা সংশয়ও করতে পারি, ভাবতে পারি. জ¦রের ঘোরে পুরো গল্পটা বলছে আরিমাতানো, ওর জবানিতে শুনি―‘অথচ সামান্য জ¦রেই আমার বোধশক্তিহীন শরীরের এত তোলপাড় ? পুরো জীবনটা ফাস্ট ফরোয়ার্ডে ছোটাছুটি করছে মনের ভেতর। এত ড্রিবলিং পাওয়ার কোথায় পেল ওরা ?’ (পৃষ্ঠা ১১)

৮. আমার হৃদয়ের মধ্যেই ছিল

অধ্যায় ‘দুই’ যার শিরোনাম ‘ক্যাম্পাসে প্রথম পা’ নিরেট বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছে। আগেই  বলেছি, যে ক্যাম্পাসটার কথা বলা হয়েছে, তা আমার পরিচিত। ওই ক্যাম্পাসে যখন রিশাদ নিজে এবং তার চরিত্র আরিমাতানো পা রাখে―‘তখন রাজনৈতিক অবস্থা ছিল মাতাল। ক্ষমতায় থাকা সরকারি দল নির্বাচনের আগে শুরু করেছে নানা ইতংবিতং। রাজনীতি সম্পর্কে আমি ছিলাম উদাসীন। তবে নিজে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছি এমন ভাবতে ভালো লাগত ছোট থেকেই।’ (পৃষ্ঠা ১২)

‘ইতংবিতং’ জাতীয় অব্যবহৃত এবং জনজীবনে বহুল প্রচলিত অনেক শব্দই রিশাদের গল্পে এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাসটিতে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই সব শব্দ-বাক্য নিয়েও আলাপ করা যায়। তবে আপাতত আমরা আরিমাতানো যে রাজনৈতিক মাতাল অবস্থার কথা বলছে, তা নিয়ে আলাপ করব, তার আগে একটু গালিব উদ্ধৃত করে যাই―‘দেখো তার বাক্যের চমৎকারিতা, সে যা বলে―/ আমার মনে হয় এ-ও যেন, আমার হৃদয়ের মধ্যেই ছিলো॥’ (গালিবের গজল থেকে―আবু সয়ীদ আইয়ুব)

নির্বাচনের আগে যে সরকারি দলের নানা ইতংবিতং নিয়ে বলা হয়েছে, সেটা বিএনপি সরকারের কথা এবং এরপরের কথা তো বলে দেওয়া লাগে না―২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আরিমাতানো উপন্যাসে একবারও সময়কালটি বলা হয়নি। বলা হয়নি ওই মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংগঠন তিনটি ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। অথচ রিশাদের সুযোগ ছিল, আরিমাতানো এবং ওর বন্ধু মাহবুব, ময়ূখ ও রিশাদসহ অন্যদের অভিজ্ঞতার সীমানাকে বাড়িয়ে দিয়ে পুরো বাংলাদেশটাকে তুলে আনার। আরিমাতানো উপন্যাসের অনেক চরিত্রের মধ্যে তিনটি হলো মাহবুব, ময়ূখ ও রিশাদ। আমার মনে হয়, চরিত্রের নাম খোঁজায় রিশাদের আলস্য আছে। অন্তত এ তিনটি নামে তাই মনে হয়। তবে পাঠক হিসেবে এটাও মজা তৈরি করে, যেমনটা পাই ‘দাগের গায়ে চাঁদ’ গল্পে যেখানে মনসুরাবাদে মনসুর থাকে মনসুরের প্রেম হয় মনসুরার সঙ্গে। তাদের ছেলেমেয়েদের নাম রাখা হয় মুমু ও মুগ্ধ।

আমিও একটু প্রসঙ্গান্তরিত হচ্ছি, বরং আরিমাতানোর ক্যাম্পাস-জীবন এবং বাংলাদেশের সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীরতা  নিয়েও সংযুক্তির সুযোগ ছিলো। রিশাদ সুযোগটা নিতে পারেনি। এমনকি, ছোট্ট ক্যাম্পাসের রাজনীতি নিয়েও দ্বিধান্বিত মনে হয়েছে ওকে। অথচ এই একটি গল্পের দ্বিধাথরথর চূড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী। রিশাদের এই না-পারা যে ঔপন্যাসিক হিসেবে ওর একজন পাঠক হিসেবে আমাকে হতাশ করেছে, এটা আমি বলতে বাধ্য। লুইপা’র কালসাপ উপন্যাসের ঔপন্যাসিকের ওপর প্রকাশকের চাপ থাকে। আরিমাতানোর ঔপন্যাসিকের ওপর তো চাপ নেই। চাপ যখন আসবে তখন প্রকাশে ব্যাকুল না হওয়ার শিক্ষা তো ওর সামনে রেখে গেছেন ওরই প্রিয় লেখক শহীদুল জহির।

 ৯. সাত অমরাবতী

রাজনীতির সাত-অমরাবতী দেখাতে না পারলেও গল্পের সাত-অমরাবতী দেখিয়েছে, রিশাদের আরিমাতানো উপন্যাস। আরিমাতানো যে আরিফ ও মিতার সন্তান, যার জন্ম হয় মা-বাবার মৃত্যুর পর। হয় কি এমন ? বাংলার রূপকথায় এমন অসম্ভব গল্প তো দুর্লভ নয়। সাত ভাই চম্পা ফুল হয়ে ঝুলে থাকে, বড় হয়ে কখন তাদের ডাকবে পারুল বোন।

আরিফ আর মিতার ছেলের নাম আরিমাতানো। এই নামকরণটা এমন যে, আরিমাতানো যখন ক্যাম্পাসে যাওয়ার পরে ওকে ‘বিপ্লব’ নামে যে ছাত্রনেতা আশ্রয় দেয়। সেই প্রথম প্রশ্ন করে, তুমি তো আরিফ। আরিমাতানোকে জানাতে হয়, তার বাবার নাম। সে আরিমাতানো।

আরিমাতানোর নাম আরিমাতানো হতেই পারে। উপন্যাস আমাদের সেটা বিশ^াস করিয়ে দেয়। মা-বাবার মৃত্যুর পর যে শিশুর জন্ম সেই আরিমাতানো বিশ^াসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আরও বিশ^স্ত করে―‘দাদির সাথে, দাদার সাথে এই বিষয়ে…. কিন্তু তারা বলত না।’ (পৃষ্ঠা ১৫)

আরিমাতানো বড় হয় দাদা-দাদির কাছে। উপন্যাসের এখানে এসে কিছু মনে পড়ে ? আমার মনে পড়েছে, কিশোর মার্কেস তাঁর দাদির কাছ থেকে পৃথিবীর রহস্যময়তা সম্পর্কে জেনেছিলেন। নানার কাছ থেকে শিখেছিলেন যুক্তি। এ দুই নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় মার্কেসের মনে। আমরা―মার্কেস দাবি করেছেন, তাঁর উপন্যাসের প্রতিটি লাইন বাস্তবতায় প্রোথিত এবং নিজেই বলেছেন ‘জার্মান ভাষায় কাফকা অবিকল আমার দিদিমার ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন, তাঁর মেটামরফোসিস গল্পটি ১৭ বছর বয়সে পড়ে মনে হয়েছিল যে, আমিও লেখক হতে পারি।’ আমরা দেখি আরিমাতানোর সঙ্গে আয়নাঘরে আরও একজনের দেখা হয়, যাকে সে ‘দাদাদী’ বলে ডাকে। আরিমাতানোর বয়ানে―‘দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন দাদাদী। মৃত্যুর পরও সম্ভবত অনেকটা কাল তিনি বেঁচে ছিলেন আয়নার ভেতরে।’ আয়নাঘর থেকে অজস্র জাদুর গল্প পাই উপন্যাসে, যা বাস্তবের বিনির্মাণ, সাক্ষাৎকারে মার্কেস যেমন বলেন, ‘উপন্যাস সংকেতের মাধ্যমে, পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের ধাঁধার মাধ্যমে বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসে যে বাস্তবতা নিয়ে কাজ করেছেন, তা জীবনের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন―যদিও তা জীবনের বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। স্বপ্ন সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য।’

১০. যাত্রাপথ খোলা রেখ

রিশাদ আমাদের জুলাই মাসের আড্ডায় আমার এক বন্ধু, যে কিনা লেখক হিসেবে যথেষ্ট নন্দিত এবং পুরষ্কৃতও, তার কথা উল্লেখ করে বলছিল, ‘আমাকে বেশ কয়েকজন বলেছে আমি কেন ফ্যান্টাসির অংশটুকু রেখেছি। কেন এটার মূল গল্পটাকে বিস্তৃত করি নাই। পাঠকের মতামত। তাই উত্তর দিতে চাওয়াটা শোভন দেখায় না।’ আমি রিশাদকে বলতে প্ররোচিত করেছি, কেননা, আমিও মনে করি, গল্পটার আরও বিস্তার প্রয়োজন ছিল। অমিয়ভূষণ মজুমদারের মহিষকুড়ার উপকথার মতো ছোট্ট উপন্যাস পড়ার পর আমার মধ্যে একটা মহাকাব্যিক উপন্যাস পাঠের অনুভূতি হয়েছিল সেটাও রিশাদকে বলেছি। কিন্তু ওর উপন্যাসের ফ্যান্টাসি নিয়ে কিছুই বলিনি, তবু এ নিয়েও বলতে বলেছি। সে আমাকে বলল, ‘আমি মনে করি, ফ্যান্টাসির অংশটুকু ফেলে দিলে গল্পের যে খুব ক্ষতি হবে এমন নয়। আমি রেখেছি কারণ ফেলে দিলে যে গল্পটা হতো সেটা আমার গল্প হতো না। আমার গল্পগুলো একটু বিচিত্রভাবেই আমার কাছে আসে।’

ফ্যান্টাসিটা নিয়ে নিশ্চয়ই রিশাদ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের আড্ডায় ওকে আমি বলিনি, ফ্যান্টাসিটা ওর সাদামাটা একটা ক্যাম্পাস-রাজনীতির গল্পকে ভিন্নতর উচ্চতা দিয়েছে এবং আমাকে দিয়ে এত কথা বলিয়ে নিচ্ছে। গল্প ওর কাছে আসে―আমার খুব মনে ধরেছে রিশাদের এই কথাটা। রিশাদ, গল্পের ‘আসা’ অথবা যাত্রা মাঝপথে থামিয়ে দিও না। যাত্রাপথ খোলা রেখ। পত্রপুষ্পে পল্লবিত হতে দিও, ভুলে যেও না, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি―ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’

 লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares