সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা : অন্ত্যজ মানুষের উপাখ্যানের বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল : সালমা আক্তার

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-উপন্যাস

নলিনী বেরা-র জন্ম অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোঁয়াড় গ্রামে, কুম্ভকার (কুম্হার) সম্প্রদায়ের ত্রিশ সদস্যর এক পরিবারে। তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ছোটবেলা থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করেন। সুবর্ণরেখার ধারে বাছুরখোঁয়াড় গ্রামে ছেলেবেলায় তাঁকে খিদের জ্বালায় শুকনো তেঁতুল আর মহুলবিচি সেদ্ধ খেতে হতো। অথচ পরে রাজ্যের খাদ্য সরবরাহ দফতরে পদস্থ আধিকারিক হিসেবে নিযুক্ত হন। নলিনী বেরা জীবনের স্রোত বেয়ে বিভিন্ন বাঁকে এগিয়েছেন। কবিতা লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু। একবার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে নকশাল আন্দোলন হয়। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প ‘বাবার চিঠি’ দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীর প্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্য রচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাস : শবরচরিত, কুসুমতলা, দুই ভুবন, চোদ্দমাদল, হরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চায় তিনি অজস্র ছোটগল্প লিখেছেন।

১৯৫৮ সালে প্রবর্তিত ‘আনন্দ পুরস্কার’ প্রাপ্ত, নলিনী বেরা বিষয়বৈচিত্র্যে ব্যতিক্রমী। তাঁর আগে বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, প্রমথনাথ বিশী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল বাশার, জয় গোস্বামী, আনিসুজ্জামান প্রমুখ লেখক সম্মানিত হয়েছেন আনন্দ পুরস্কারে। এই তালিকায় নলিনী বেরা-র নাম আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকবে বাংলার প্রান্তিক নদী ‘সুবর্ণরেখা’ ও সেই নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার জন্য।

আনন্দ পুরস্কার ১৪২৫-এর জন্য মনোনীত হয়েছিল তিনটি বই: দীপেশ চক্রবর্তীর মনোরথের ঠিকানা, সম্মাত্রানন্দের নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা এবং নলিনী বেরা-র সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা। অবশেষে ১৪২৫ সালের আনন্দ পুরস্কার পেয়েছে কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরার নদীস্পর্শী মানুষ ও জনপদের শিল্পিত পরিব্রাজন সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাস। সেই ঐতিহ্যের স্রোত বেয়ে এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে যেন লেখকের চর্চিত সমস্ত অন্ত্যজ, অপাঙক্তেয় মানুষ জয়যুক্ত হয়েছে। লেখক তাঁর গ্রামের এক সাঁওতাল মেজদিকে খালি পায়ে হাঁটতে কষ্ট পাচ্ছেন দেখে এক জোড়া চটি কিনে দিয়েছিলেন। অনেকদিন পরে দিদির পুঁটলি থেকে বেরিয়েছিল সেই চটি। দিদিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘চটিজুতা কি ছিঁড়ে গেছে মেজদি!’ দিদির উত্তর ছিল, ‘তোর দেওয়া চটিজুতো আমি কি পায়ে দিতে পারি রে!’ যে ভাষার কবি এক দিন ‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য’ উচ্চারণ করেছিলেন, সেই ভাষার সাহিত্য পুরষ্কারে সম্মানিত লেখক এই আনন্দ পুরষ্কার সাঁওতাল মেজদির মতো সমস্ত অনার্য রমণীকে উৎসর্গ করেছেন। আর পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত দশ লক্ষ টাকা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দান করেন। এছাড়া ২০০৮ সালে তিনি বঙ্কিম পুরষ্কার পান তাঁর শবরচরিত উপন্যাসের জন্য।

প্রায় চার-দশক ধরে নলিনী বেরা সাহিত্যের আঙিনায় পা রাখলেও তেমন করে তিনি সকলের নজরে হয়তো আসেননি। কিন্তু সাম্প্রতিক ‘আনন্দ-তিলক’ই যেন তাঁর অনান্য সাহিত্যকর্মের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিল আমাদের।

বাংলাকে একসময় বলা হতো পাণ্ডববর্জিত দেশ। কিন্তু এখন পশ্চিবঙ্গ যেন ঠিক তার উল্টোটা। ব্রাহ্মণ্যবাদের সর্বব্যাপী আধিপত্যে ভূমিপুত্র অনার্যরাই এখানে অপাঙক্তেয়। নাগরিক শিল্প-সাহিত্যে তথাকথিত কৌলিন্যের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। যদিও লোকসংস্কৃতিকে এখনও কিছুটা নিম্নবর্গের কালচার হিসেবেই ধরা হয়। এমন একটি প্রেক্ষাপটে নলিনী বেরা ২০০৮ সালে শবরচরিত এর জন্য বঙ্কিম পুরস্কার পান। ২০১৯ সালে আনন্দ পুরস্কার পান সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য। এটা অনিস্বীকার্য যে তাঁর মতো এক প্রান্তিকের পুরষ্কার প্রাপ্তি একটি বড় ঘটনা।  ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ এতদিন ভাবতেই পারত না যে ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ বাদে বঙ্গে কারও মননশীলতা আছে বা অপাঙক্তেয় পদবীধারীরা সাহিত্য রচনা করতে পারেন! নলিনী বেরার উত্তরণ সেই আধিপত্যবাদী বৃত্তের প্রথম ভাঙ্গন। সাহিত্যের যে মৌলিক উপাদান, শক্তি এবং প্রাণরস দরকার তা নলিনী বেরা-র মতো প্রান্তিকতা নিয়ে কাজ করা সাহিত্যিকদের কলমেও আছে। নলিনী নামের অর্থ যে স্থানে পদ্ম জন্মে। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনেও নলিনী এক পদ্ম রূপেই ধরা দেয়।

উপন্যাসটির মুখবন্ধে আনন্দ-পুরস্কারের সাম্মানিক ভাষণে নলিনী বেরা অকপটে তাঁর সাহিত্যকৃতির উৎস-সন্ধানে ঋণ স্বীকারের তালিকায় P.K DeSarkar এর ইংরেজি গ্রামার এর সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখ করেন গ্রামের পটভূমিকায় ‘বাৎস্যায়ণের কামশাস্ত্র’ বা ‘জীবন-যৌবন’ এর কথা। অন্ত্যজ, অপাঙক্তেয় ও ‘সাব-অলটার্ন’ মানুষদের নিয়ে এই লেখা। তাই তিনি এ উপন্যাসটি সে-সব অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদেরকে উৎসর্গ করেছেন। এ উপন্যাসটিতে মানবজীবনের মেলবন্ধনে অনেকটা নদীর উপাখ্যান উন্মোচিত করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের  প্রকাশনা সংস্থা প্রবর্তিত ‘আনন্দ পুরস্কার ১৪২৫’ পেয়েছে নলিনী বেরা রচিত উপন্যাস সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা। বইটির প্রকাশক―দে’জ পাবলিকেশন। উপন্যাসের প্রকাশক সুহৃদ শ্রীসুধাংশুশেখর দে, বাবুদা ওরফে সুভাষচন্দ্র দে ও অপু ওরফে শুভঙ্কর দে। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শিল্পী―দেবাশিস সাহা। বইটির পরিচ্ছেদ সংখ্যা-আঠারো। পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৮০। মূল্য: ৩৫০ টাকা।

উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত, ওড়িশা থেকে বঙ্গে বিস্তৃত নদীর তীরে গড়ে ওঠা বহু গ্রাম, পাহাড় ও জনগোষ্ঠীর জীবনালেখ্য বুঝিয়ে দেয় যে, মানুষের আটপৌরে ইতিহাস ওই নদীর মতোই প্রাচীন। এরই একপ্রান্তে গড়ে উঠেছে রাজু, তেলি, সদগোপ, করণ, কৈবর্ত প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবাস। যারা ছাঁচভাঙা ‘হাটুয়া’ বাংলায় সংলাপে লিপ্ত হয়। ওদের সুখ, দুঃখ ও পীড়নের কাহিনিতে বাক্সময় হয়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যধারা। তাই সংস্কৃতি ও ভাষায়ও ঘটেছে সংমিশ্রণ, শহরের নব্য জীবনেও এসেছে আমূল পরিবর্তন।

নদী এবং মানুষ অনেকটা হাত ধরাধরি করে পথ চলে সমান্তরালে, সামনের পানে। তাদের এই যুগলযাত্রাই আবার স্থান করে নেয় ইতিহাসের পাতায়। যেমন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহু লেখায় ‘সুবর্ণরেখা’ নদী অমর হয়ে রয়েছে। মানুষের ইতিবৃত্তে তাই নদীর আখ্যান বড়ই প্রাসঙ্গিক। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সভ্যতা বা জনপদের মতো কিছু নদী-কেন্দ্রিক উপন্যাসও বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতী, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, সমরেশ বসুর গঙ্গা, দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত এমন অনেক উপন্যাস আছে যা নদীবাহিত মানুষেরই উপাখ্যান। নদীর কালস্রোতের ধারাবাহিকতায় যেন তাঁরা বিবৃত করে গেছেন নিজের এবং মানবজীবনের আখ্যান। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সমরেশ বসুর উপন্যাসে তেমন আত্মজৈবনিক উপাদান নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার অনুজ লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘উপন্যাস লেখার আগে মাঝিদের সঙ্গে জাল ফেলতেও যাইনি। দু’এক দিন বিড়িটিড়ি খেয়েছি মাত্র।’

কিন্তু নিম্নবর্ণের মালোসন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস এই সুবর্ণরেখার মতোই। গঙ্গা বা পদ্মার মতো ব্যাপ্তি না থাকলেও নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা জনজীবন নিয়ে লেখা সেই উপন্যাস আজও বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য, অসাধারণ এবং অনবদ্য নিদর্শন। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সভ্যতা বা জনপদের মতো এসব নদী-কেন্দ্রিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে যেমনি অমর হয়ে রয়েছে, তেমনি সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা আপন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর এক নুতন সংযোজনা।

নলিনী বেরা-র বাড়ির চালে আজও বাঁধা রয়েছে মাটির বড় জালা, সেখানে পায়রা ঝাঁক বেঁধে থাকে। তাঁর জবানিতে, ‘আমাদের গ্রামে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ বিশেষ ছিল না। কিন্তু অন্ত্যজ পরিবারগুলিও জাতপাত থেকে রেহাই পায়নি।’ লেখক ছেলেবেলায় এক বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্নে গিয়েছিলেন। খাওয়ার পর বন্ধুর মা বলেছিলেন, তোর থালাটা মেজে দিয়ে যাস। সেদিন চোখে জল নিয়ে তিনি পুকুরপাড়ে গিয়েছিলেন ।

সুবর্ণরেখা নামে একটি অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন স্মরণীয় পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। ছবির মূল উপজীব্য ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল মানুষের মর্মন্তুদ আর্তি। শেকড়-ছেঁড়া উন্মূল মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামী আর্তনাদ শোনা গেছে শিল্পিত সিনেমাটিতে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ছুঁয়ে যাওয়া বৃহৎ বঙ্গের প্রান্তিক নদী ‘সুবর্ণরেখা’ নিয়ে গবেষণা বা আখ্যান রচিত হয়েছে খুব কমই। তালসারি নামক স্থানে বঙ্গোপসাগরে পতিত নদীটির নামের মধ্যেই রয়েছে স্বর্ণের স্পর্শ। সোনার মতো চকচক করে এই নদীর বালি, যা ছেঁকে পাওয়া যায় স্বর্ণালী উপাদান।

মানুষ পরিব্রাজক। নদীর মতো মানুষও জীবনের অন্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যায় তা সে নিজেও জানে না। উৎস থেকে মোহনায় এসে সম্মুখে শান্তি পারাবার দেখে তার মনে পড়ে শেকড়ের কথা। শেকড়ের খোঁজে সে ফিরতে চায় স্মৃতি-বিস্মৃতির পথ বেয়ে তার প্রত্ন-ইতিহাসে। যে ইতিহাস চর্চা থেকে উঠে আসে প্রান্তিক জনপদের কাহিনি, সাম্প্রতিককালে যা সাব-অলটার্ন ইতিহাস।  অসংখ্য জাতি, উপজাতি বসবাস করে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে। সোনা সংগ্রহ, মৎস্য আহরণ তাদের একমাত্র উপজীবিকা। রাঁচির কাছে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র  হুডু বা হুড্রু জলপ্রপাত অবস্থিত। এখানে প্রতিবছর বহু পর্যটক আসেন জলপ্রপাতটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এছাড়াও তামার খনি শহর ও স্বাস্থ্যকর নিবাসের জন্য খ্যাত ঘাটশিলা অঞ্চল সুবর্ণরেখার তীরে অবস্থিত। সুবর্ণরেখার তীর ঘেঁষে আরও রয়েছে গ্রামীণ ও আদিবাসী জনপদের অকৃত্রিম বহুবিচিত্র সংস্কৃতি।

অন্ত্যজ ও প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির অন্বেষণে নৃবিজ্ঞান এ পথে চলছে আজকাল, নলিনী বেরা সে পথেই ‘সুবর্ণরেখা’ নদী ধরে খুঁজেছেন মূল স্রোতের বাইরে অবস্থিত মানবগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের যাবতীয় উপাদান ও পরিচিতি। ‘সুবর্ণরেখা’ নদীটিকে কেন্দ্র করে উন্মোচিত হয়েছে এক অজানা জনপদ ও জনজীবনের ভাষ্য। সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত কত জনপদ, জনজীবন আর কত শত পরিবার। এমনই এক পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, বিবর্ধিত ও আলোড়িত এক আশ্চর্য আখ্যান নলিনী বেরা-র সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসটি।

Tradional and Complementary Medicine চিকিৎসা কম-বেশি পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে। অধ্যাপক ইমদাদুল হক তাঁর এক প্রবন্ধে বাংলাদেশের প্রথাগত চিকিৎসাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন :

১) ধর্মীয় প্রথাগত চিকিৎসা। যেমন : কালামি, বান্ধাই, আধ্যাত্মিক চিকিৎসা। ২) অধর্মীয় প্রথাগত চিকিৎসা। যেমন : জাদু-টোনা, কবিরাজি, গ্রাম্য-চিকিৎসা। এর মধ্যে কবিরাজি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত চিকিৎসা, বিশেষত গ্রাম-বাংলায়। সাধারণত যারা এধরনের চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন, তারা দরিদ্র বা অতি-দরিদ্র শ্রেণির। ভাগ বা বিভাজন যাই থাকুক না কেন, যারাই এদেশে প্রথাগত চিকিৎসা দেন তারাই ‘কবিরাজ’ হিসেবে পরিচিত।

অনেকে মনে করেন, আধুনিক চিকিৎসা সেবার অনেক আগেই কবিরাজি চিকিৎসার উদ্ভব হয়েছে, অতি প্রাচীন কাল থেকেই এই চিকিৎসা চলে এসেছে। তাই আধুনিক চিকিৎসায় সকল সমস্যার সমাধান নেই। এরকম প্রথাগত চিকিৎসা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত চীনদেশে। বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি ‘জনসন অ্যান্ড জনসন’ বিরাট অঙ্কের এক গবেষণা বাজেট দিয়ে প্রায় ১০ বছর নিরন্তর গবেষণা করে এর ভালো কোনো ফল পায়নি। তাই অতিপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসলেও বর্তমানে তা গ্রহণযোগ্য নয় ।

অভিজ্ঞতাই কবিরাজি চিকিৎসার সারবস্তু। যুগ যুগ ধরে পারিবারিক কিংবা বংশানুক্রমে কবিরাজরা চিকিৎসা দেন।  বাপ-দাদার ব্যবসা বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বংশ পরম্পরায় এ ব্যবসা চলতে থাকে। কবিরাজি পেশার অভিজ্ঞতা ও সেবার মানদণ্ড শুধুমাত্র বিশ্বাস ও স্তুতির উপর নির্ভরশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে (২০১৩) দেখা যায়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথাগত (Complementary Medicine) চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন।

নলিনী বেরা-র সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের কাহিনির শুরুই হয়েছে এমনই এক কবিরাজি চিকিৎসার দৃশ্যপটের মাধ্যমে। আঠারোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এ উপন্যাসের কথক একজন কিশোর। নাম ললিন। ললিনের মেজোকাকা এলাকার নামকরা একজন কবিরাজ। তিনি বহুকাল ধরে এ পেশায় নিযুক্ত। পদ্মল ঘা,মানে ক্যান্সার, এমনকি সাপে কাটা রোগীরও চিকিৎসা করেন তিনি। এসবে তার যেন কোনও ক্লান্তি নেই। রোগীর অবস্থা বুঝে এবং রোগের নাম বললেই তিনি নানা গাছ-গাছালির ওষুধ দিতেন।

সাপে কাটা রোগী যখন চিকিৎসা পেয়ে চোখ খোলে তখনও তিনি বিমর্ষ হতেন। মা কাকিমারা তার কোনও কূলকিনারা খুঁজে পায় না। আসলে তিনি মনে মনে ভাবতে থাকেন, তিনি যদি মারা যান তাহলে তার অবর্তমানে এই কবিরাজগিরি কে করবে ? কে বংশ-পরম্পরার ভার বহন করবে ? এমন একটা চিন্তা বা অস্তিত্বসংকট থেকেই যায়। এমতাবস্থায় অনেকেই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ললিনকে উত্তরসূরি হিসেবে পাঠিয়ে দেন। মেজোকাকা তাকে সাপের বিষঝাড়ার দু’চারটে মন্ত্র মুখস্থ করান এবং কিছু ঔষধিও চেনান।

তার মেজোকাকা ফিসফিস করে সাপের মন্ত্র আউড়ে চলেন―‘মেঘ কন্ কন্ আধাঁররাতি সাপে মারল ঘা। হেন কালে বিপদ হৈল স্মরণ করব কা।’ (পৃ: ১৭, প্রথম অধ্যায়) এটা বিষ নামানোর মন্ত্র হলেও এই মন্ত্র পড়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিলাসী’ গল্পে সাপ ধরার মন্ত্রের কথা মনে পড়ে যায় :

‘ওরে কেউটে তুই মনসার বাহন-

মনসা দেবী আমার মা-

ওলটপালট পাতাল-ফোঁড়-

ঢোঁড়ার বিষ তুই নে, তোর বিষ ঢোঁড়ারে দে-

-দুধরাজ, মণিরাজ।

কার আজ্ঞা-বিষহরির আজ্ঞা।’

যদিও সাপের ভয়ে শেষ অবধি তার আর কবিরাজি শেখা হয়ে ওঠেনি। আর তাছাড়া কবিরাজি নয়, যাত্রা দল তাকে টানত। তল্লাটের সবচেয়ে নামকরা নাচুয়া অনন্ত দত্তও চেয়েছিলেন তালিম দিয়ে তাকে যাত্রাদলে চড়িয়া-চড়িয়ানি সাজাবেন, কিন্তু তাও হয় না মায়ের আপত্তিতে। মা তার পড়াশোনা আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ালেন।

‘সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা, আশা তার একমাত্র ভেলা’ অর্থাৎ জীবন সংসারে প্রচণ্ড ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুঃখ, কষ্ট থাকলেও আশা মানুষকে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়। একমাত্র আশা মানুষকে সঞ্জীবনী শক্তিতে অবিচল রাখে। মানুষ তার অবস্থার পরিবর্তন চায়। অবস্থানের পরিবর্তন চায়। প্রকৃতপক্ষে চায় তার দুরবস্থার পরিবর্তন, দুরবস্থানের পরিবর্তন। শৈশবে দাদা-দাদি, নানা-নানির মুখ থেকে শোনা ঠাকুমার ঝুলি, রূপকথা মনের গহিনে লালন করে চলে। বাস্তব যখন হতাশা বঞ্চনায় বিষিয়ে যায় তখন অবচেতন মন চায় রূপকথার সোনার কাঠি, রূপার কাঠি তার অবস্থা, অবস্থানের পরিবর্তন করে দিক রাতারাতি স্বপ্নের মতো। ললিনও  তাই চেয়েছে।

এ গ্রামে নাকি আকাশে জয়পাখি উড়ে যায়। উপন্যাসের নায়ক ছোট্ট ললিন তাই ‘জয়ের জন্য একটা পালক দাও না’ (পৃ. ১৯, প্রথম অধ্যায়) বলতে বলতে ছোটে। এই জয়পাখিরই তো আর এক নাম নীলকণ্ঠ। পাঠকেরও মনের গহিনে যেন ধরা দেয়  দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলার আর এক বালক সোনা।

তার জেঠামশাই উন্মাদ মণীন্দ্রনাথের মনে হয়, আকাশে তার পোষা হাজার হাজার নীলকণ্ঠ পাখি হারিয়ে গিয়েছে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ব্রাহ্মণ পূর্বজ এবং রুক্ষ ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর থেকে উঠে আসা কুম্ভকার অনুজও সাহিত্যের আকাশে নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেন, এখানেই আধুনিক বাংলা উপন্যাসের চলমান চমৎকৃতি।

ললিনের স্কুলযাত্রার ভেতর দিয়ে কাহিনি আরও সামনের দিকে অগ্রসর হয়। গ্রামের উত্তরে সুবর্ণরেখা নদী। তারপর বেশ কিছুটা পথ পেরোলে ডুলুং নদী। তারও খানিক পরে ললিনের রোহিণী চৌধুরানি রুক্সিমণী দেবী হাই স্কুল। স্কুলকে ঘিরেই কাহিনি এগিয়ে যায় সুবর্ণরেখার তীরে। অজস্র ভিনদেশি গাছ সেখানে। কথিত আছে এই ‘জাহাজকানার জঙ্গলে’ দূর অতীতে একটা মসলাপাতি, না তার বিদেশি কিসের বীজে ভরা জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। তখন জাহাজ ডোবার জল ছিল সুবর্ণরেখায়। এখন সে গভীরতা নেই কিন্তু জলের উৎসব আছে। কীর্তনীয়ার দল ও হংসী নাউড়ীয়ার নৌকাটিকে ফুল-চন্দনে সাজিয়ে পাঁচ গাঁয়ের মানুষ নৌকাবিলাসে বেরোন। তাদের কপালে তিলক, গলায় কাঠমালা, গায়ে লাউফুলের মতো সাদা গেঞ্জি, গলায় গামছা, পরনে ধুতি। জলের উপর পড়া সূর্যকিরণের খানিক লাল প্রতিফলন পড়ে তাদের গায়েও। ললিনকেও তারা সঙ্গে নেন, কারণ নাউড়ীয়ার সঙ্গে নৌকাবিহারে তার মহা উৎসাহ। ললিনের খুব ইচ্ছে করে কলম্বাসের মতো দ্বীপ আবিষ্কারের।

নলিনী বেরা বাস্তবের নদীর সঙ্গে মিথ, পুরাণ, প্রকৃতি, উৎসব এবং খানিক নিজের কৈশোরকে জড়িয়ে নিয়ে প্রথম অধ্যায়েই উপন্যাসের স্বরটি বেঁধে নেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই, ললিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কখনও কখনও জানতে চায়, নদী কোথা থেকে এসেছে ? তার অস্তিত্বই বা কোথায় ? ঠিক যেন নদী জিজ্ঞাসা হেমন্তের গানের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে নদীকে প্রশ্ন করেছিল, ‘নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ?’ (পৃ. ২৭, দ্বিতীয় অধ্যায়) তার ধারণা, সে যেমন জয়ের জন্য একটা পালক চেয়েছিল তেমনি একটা ব্ড়ুবুড়ি ঝর্না থেকেই যেন নদীর উৎপত্তি। প্রাসঙ্গিকভাবেই এ অধ্যায়ে বিভিন্ন প্রাচীন মালভূমি, নদ-নদী এবং গ্রামের নামও উঠে এসেছে।

নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ নদীর নাম এবং উৎপত্তি নিয়ে তেমন কোনও মাথা ঘামায় না। তারপরও অনেকে মনে করেন, পুত্র কামনায় নদীর জলে সোনার থালা ভাসানোতে নদীর নাম হয়েছে সুবর্ণরেখা। কখনও কখনও ললিনের মনে সংশয় জাগে তাও আবার হয় নাকি! আবার কখনও ভাবে হতেও পারে। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে বেহারাঘর গ্রামের ললিন অবশ্য ব্যাখ্যা করছেন নদীর নামকরণের লৌকিক রহস্য।

 ‘সোউ যে বেহারাঘর দেখুটু ললিন, বেহারাবুড়ার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা তার ঠাকুর্দার তার ঠাকুর্দা পুত্র কামনায় নদীজলে সোনার থালা ভাসাই থিলা বলি না নদীর নাম হেলা সুবর্ণরেখা!’ (পৃ: ২৯, দ্বিতীয় অধ্যায়)

বাংলা বিহার ওড়িশা সংলগ্ন সীমান্ত এলাকার নদী এই ‘সুবর্ণরেখা’। ঝাড়খণ্ডের রাঁচি থেকে শুরু হয়ে গোপীবল্লভপুর, সাঁকরাইল, নয়াগ্রাম হয়ে বলেশ্বরে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতক থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত বালেশ্বরের কাছে সুবর্ণরেখার একটি সমুদ্র বন্দর ছিলো ‘পিপলি’। এই নদীর নামটি আর্যীকরণের দান বলে মনে করতেন ড. বঙ্কিমচন্দ্র মাইতি। নদীটি মোট ৩৯৫ কি.মি. দীর্ঘ। এরমধ্যে ঝাড়খণ্ডে ২৩৩ কি.মি. এবং পশ্চিমবঙ্গে ৮৩ কি.মি. ও ওড়িশা মোহনায় ৭৯ কি.মি. রয়েছে।

সুবর্ণরেখার অনেক নাম। যেমন : সুবন্নখা, শবর নেকা, শবর রাখা, শবর নেখা, সাবর নেকা ইত্যাদি। শাবরী ভাষায় ‘নেকা’ হোলো নদী বাচক। এই নদীর উৎসমুখে একটি গ্রামের নাম ‘সোনাহাতু’। সাঁওতালি ভাষায় ‘সামানখ’ হোলো স্বর্ণজ্ঞাপক শব্দ। কোলীয় ভাষাভাষীদের কাছে ‘সোনা’ শব্দের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। যেমন, সনামুখী, সনামুই, সোনাকোনিয়া ইত্যাদি। তেমনি সুবর্ণরেখা। ‘সুবর্ণ’ অর্থে তো ‘সোনা’। যেন সোনার মতো দামি এই নদীর চলাচল। ড. বঙ্কিমচন্দ্র মাইতির কথায়, ‘সুবর্ণরেখা হিরণ্যগর্ভা। তার বালুদেহে অভ্র স্বর্ণকণার ঝিকিমিকি। সে মানুষকে উদাসী বাউল করে না। মানুষী প্রেমের রক্তরাগ ছড়িয়ে কাছে টানে। তার বালুশয্যায় আছে দেহ মিলনের আহ্বান, রোমান্টিক মুগ্ধতার গুঞ্জরণ। আবাহন ও আত্মীকরণ, গ্রহণ ও স্বীকরণ, পরবাসী পরজনের কুটুম্বীকরণ সুবর্ণরেখা নদীতটের চিত্তসত্তা।’

হংসী নাউড়ীয়া শুধু নৌকা পারাপারের কাজই করে না তাদের অনেক জমিও আছে। সেইসঙ্গে আছে গরু-মোষ, হাঁস-মুরগি, ছাগল ও ভেড়া। এ উপন্যাসে নদী পারাপারের দৃশ্যে অভিনবত্ব দেখা যায়। জমিদারদের খাজনা আদায়ের মতো মাস শেষে নাওড়ীয়ার নদী পারাপারের জন্য টাকা আদায় ছিল রাজকীয় ভঙ্গিতে।

 এছাড়া হাটুয়া বধূ আর মেয়েদের লাজুকতার চিত্রও সুস্পষ্ট। তবে কখনও মনে হয়েছে, আঙুরবালার মনে কি ললিনের প্রতি ভালোলাগা ছিল ? সে আঙুরবালার কোলে দু-তিন বছরের একটি শিশুকে দেখতে পেয়ে যখন জিজ্ঞেস করে, ‘আঙুর,এই তোর ছেলে ?’… (পৃ. ৩৪,তৃতীয় অধ্যায়) একথা শুনেই আঙুর তাকে উদারডাঙার কাঁকুরে রাস্তায় কিল পাকিয়ে তাকে প্রায় মারতে গিয়েছিল। কারণ আঙুরবালার তখনও বিয়ে হয়নি।

সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে কখনও কখনও মনে হয়েছে এটি লেখকের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। সেই আত্মজৈবনিক গন্ধেই জানতে পারি ‘মনে মনে কত কী হতে চেয়েছিলাম মেজোকাকার মতো কোব্রেজ, নাটুয়াদলে নবীনের মতো ‘নাচুয়া’, হা-ঘরে যাযাবরীর সঙ্গে ঘর-ছাড়া, অ্যামেরিকো ভেস্পুচ্চী কিংবা ভাস্কো দা গামার মতো দেশ আবিষ্কারক, শেষমেষ কীনা নদীনালায় খালে-বিলে মাছ মারা ? মাছ ধরা ?’ … (পৃ-৩৮, তৃতীয় অধ্যায়) এই মাছ-মারা মাছ-ধরা বা এককথায় হংসী নাউড়ীয়ার সঙ্গে নৌকা-বিহারের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আছে বইটির পাতায় পাতায়।

নলিনী বেরা-র শুদ্ধ বাংলাভাষার চেয়েও ভূমিজ ভাষার ওপরে দক্ষতা অনেক বেশি। আর তাঁর এ  ভাষার দক্ষতা অসাধারণত্ব এনে দিয়েছে উপন্যাসকে। গ্রামের উলঙ্গ শিশুর দলকে তিনি সস্নেহ ও মমতায় নামাঙ্কিত করেন ‘ন্যাঙটা-ভুটুঙ-সাধের কুটুমরা’ বলে। (পৃ. ৪০, তৃতীয় অধ্যায়)

বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যে বিভিন্ন শিল্পকর্মে জগদীশচন্দ্র বসুর ছিল অবাধ বিচরণ। তাঁর প্রকাশিত অব্যক্ত গ্রন্থটি এই প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে তাঁর একটি অনবদ্য রচনা। এই লেখাটি ১৮৯৫ সালে দাসী পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ভাগীরথীর উৎস সন্ধান পাঠে প্রীত হন এবং জগদীশচন্দ্রকে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। ভাগীরথী গঙ্গা নদীর একটি ধারা। গঙ্গা নদী হিমালয় পর্বতশ্রেণির নন্দদেবী গিরিশৃঙ্গের হিমশৈলে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রম করে ভাগীরথী ধারা বেয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। জগদীশচন্দ্র বসু নদীর উৎপত্তি, তার গতিপথ, সাগরে পতন এবং তারপরেও জলের নৈমিত্তিক কাজ অতীব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। ভূগোল ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে তিনি তাঁর রচনায় সুসংহত করেছেন, ছন্দবদ্ধ করেছেন। তাঁর সাবলীল লেখা নদীর স্রোতের মতই গতিময়। এই গতিময়তায় অবগাহন করলে সমুদ্রস্নানের স্বাদ মেলে। যেখানে আছে ‘নদী, আজ বহুকাল অবধি তোমার সহিত আমার সখ্য। পুরাতনের মধ্যে কেবল তুমি! বাল্যকাল হইতে এ পর্যন্ত তুমি আমার জীবন বেষ্টন করিয়া আছ, আমার জীবনের এক অংশ হইয়া গিয়াছ; তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ, জানি না। আমি তোমার প্রবাহ অবলম্বন করিয়া তোমার উৎপত্তি স্থান দেখিয়া আসিব।’ (পৃ. ৪১, তৃতীয় অধ্যায়) ললিন যেন সেই ভাগীরথীর উৎস সন্ধানের মতো নিজের সঙ্গে সুবর্ণরেখার সখ্য অনুভব করে।

সে মমতার মন্ত্রবলে রূপান্তরিত হয়ে যায় সম্ভ্রমে ও শ্রদ্ধায়, সুবর্ণরেখা নদীর উদ্দেশে। অভিমানী বিস্ময়ে ললিন জিজ্ঞেস করে হংসী মাঝিকে ‘নাউড়ীয়ার পো, এই যে হাতমুঠোয় জল নিয়ে মাথায় ছিটিয়ে সুবর্ণরেখায় দাঁড়িয়েও “ওঁ গঙ্গা” “ওঁ গঙ্গা” বলে উচ্চারণ করলেন, কই “ওঁ সুবর্ণরেখা” “ওঁ সুবর্ণরেখা” তো বললেন না ? এখানে আর গঙ্গা কোথায় ?’… (পৃ. ৪১  তৃতীয় অধ্যায়) আপাত-নিরক্ষর অথচ প্রাজ্ঞ মানুষটির মুখে শুনি অমোঘ এক বিচার-নিদান  ‘আসলে কী জানল ললিন, ‘সবু নদী গঙ্গা, সবু নদীর জল গঙ্গাজল।’…(পৃ. ৪১, তৃতীয় অধ্যায়) কী বিশাল ব্যাপ্তি এই উক্তিটির!

উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই, বর্ষাকবলিত গ্রাম এবং দুর্দশার চিত্র। বৃষ্টি থামানোর জন্য  বাবা-কাকাদের মা অবিরাম বলেই চলতেন, ‘যা না রে বিজু, গোবরগাদায় পুঁতে আয়!’ (পৃ. ৪৫, চতুর্থ অধ্যায়) তার ছোট ছেলে বিজয় ল্যাংটো হয়ে হালের লাঙলটা গোবরগাদায় পুঁতে এলে তবেই নাকি বৃষ্টি থামবে। তিরিশ সদস্যর পরিবার ছিল তাদের। এমন দিনে পরিবারের ‘ল্যাঙটা ভুটুঙ সাধের কুটুম’রা মা-কাকিমাদের কাছ থেকে কাহিনি শুনত। সেসময় গঁগা বাটভিখারির গ্রামে গ্রামে চাল তোলার দৃশ্যও দেখতে পায়।

সুবর্ণরেখার ধারে সেই নিস্তরঙ্গ গ্রাম্য জীবনেও নীরবে নানা ঘটনার স্রোতে মিশে গিয়েছিল! গ্রামে ছেলেবেলার জীবনে তার প্রথম সাহিত্যপাঠ চার বন্ধু চতুর্দ্বীপ। লেখকের নাম মনে নেই। কারণ বইয়ের পাতায় চিত্রসহ মুদ্রিত গল্পগুলির চেয়ে গ্রামেই নানা জ্যান্ত গল্প তৈরি হচ্ছিল। সদ্যবিবাহিত এক দাদা এক দিন কয়েক আঁটি কলমি শাক আর পুঁটলিতে  বাঁধা জীবন যৌবন বইটি নিয়ে ঘরে ফিরলেন। তারপর সেই বই নিয়ে কয়েক মাস গ্রাম জুড়ে কাড়াকাড়ি, গুঞ্জন। গান―‘এ ব্যথা কী যে ব্যথা বুঝে কি আনজনে’―। (পৃ:৪৮, চতুর্থ অধ্যায়) ঠিক এমন সময়েই সত্যরঞ্জনের বড় বৌদি একদিন ললিনের সামনেই তার নিত্য সহচর ন্যাঙটা ভুটঙ সত্যরঞ্জনের ঐ ঐ জিনিসটা নেড়ে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘কী গো দেওড়, রস যে গড়িয়ে পড়ছে!’… (পৃ. ৪৮, চতুর্থ অধ্যায়) ততদিনে একে একে তাদের জীবনে এসেছে  ‘পি. কে. দে সরকার’ এর ইংরেজি গ্রামার ও ট্রানস্লেশান। ট্রানস্লেশনের বাংলার ঐ টুকরো-টাকরাই মোক্ষম ঘা মেরে যেত তার অন্তরের ব্রহ্মাণ্ড এবং ভেতরের কলকব্জাকে। এছাড়াও দেখতে পাই কী অসাধারণ কথাংশ―’ সন্ন্যাসী ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিলেন, ‘মৃত্যুঞ্জয়, কি চাও ?’ সে বলিয়া উঠিল, ‘আমি আর কিছুই চাই না―আমি এই সুড়ঙ্গ হইতে অন্ধকার হইতে, এই সোনার গারদ হইতে বাহির হইতে চাই। আমি আলোক চাই, মুক্তি চাই, আকাশ চাই।’ (পৃ. ৪৮, চতুর্থ অধ্যায়) ঠিক এ বিষয়টি লেখকের মুখবন্ধেও উঠে এসেছে।

অন্ত্যজ ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের শালুই পোকা খাওয়ার দৃশ্যও আমরা দেখতে পাই। বিভূতিদের বাড়িতে ভাদু গাছের ভূতের কাহিনি সম্পর্কেও জানতে পারি।

একবার বর্ষাকালে প্রফুল্লর বোন চাপার রুপার নাকফুল বর্ষার পানিতে হারিয়ে যায়। যাকে দেখে এক সময়ে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠত, ‘আজ কেন সই নিধুবনে।  রাধাকৃষ্ণ একাসনে।’ (পৃ. ৫২, পঞ্চম অধ্যায় )

এখানে বাক্য গঠন, ভাব প্রকাশে ও বর্ণনা-রীতিতে কিছুটা নাটকীয়তা দেখতে পাই। চাপার নাকফুল খুঁজে দেওয়ার সময় ললিন খেয়াল করে, জলে ভেজা সপ্ সপে শাড়ি নামমাত্র লটকে আছে চাপার শরীরে। তা দেখে একধরনের তীব্র আকর্ষণ অনুভূত হয়ে ললিনের কামবাসনা জাগ্রত হয়। চাপা অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে  টুরিব্যাঙের মতো টুপ্ করে জলের ভেতরে ডুব দিয়ে মুখ লুকায়।

এ উপন্যাসে আমরা এমন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের জীবন সম্পর্কে জানতে পারি, যারা গম কী জিনিস এবং কীভাবে খেতে হয় তা জানতই না। তাই তারা গম বেঁধে রিলিফের কাজে যাওয়া শুরু করলেন। একবার ললিন দূরবর্তী কুলটিকরীর বাজারে ‘খাটুয়া পুস্তকালয়ে’ কয়েকটা পাঠ্যপুস্তক ও ‘আধুনিক পৃথিবীর মানচিত্র’ কিনে হাট-ফিরতি বড়োডাঙ্গার বিশোই ঘরের মনা বিশোইয়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল তখন মাথার উপর চড়া রোদ ছিল ছাতাটা তার মাথায় ধরে সে বলে ওঠে, ‘ছাতাটা একা তোর মাথায় ধরি থা ললিন। মোর মাথার চেয়ে তোর মাথার দাম অনেক বেশি। অউ খরায় তোর মাথার ঘিলু যদি শুকিয়ে যায়!’ (পৃ. ৬১, সপ্তম অধ্যায়) এরপর থেকেই ললিনের ছাতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ।

এছাড়া আমরা দেখতে পাই, ললিনের বাবার অবর্তমানে তার মেজোকাকা পরিবারের প্রধান ভূমিকা পালন করেন। সে মেজোকাকাকে ঝাঁকড়া গাছের সঙ্গে তুলনা করে। আর নিজেকে সে গিরগিটি কী বড়জোর শুঁয়োপোকার সঙ্গে তুলনা করে বলে, ‘আমি সেই একটা ছোটখাটো গিরগিটি কী বড়জোর শুঁয়োপোকা-টোকা হব। আমার থেকে বছর চারেকের ছোট গুজরী আবার অতবড় হবার ক্ষমতা রাখে না―আমার আন্দাজ সে ওই উইপোকা গোছের একটা কিছু হবে।’ (পৃ. ৬৫, অষ্টম অধ্যায়) এছাড়াও আমরা দেখতে পাই, উপন্যাসে কিছু কুসংস্কার বা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ। হয়তো দৈবক্রমে কখনও কখনও তাদের ভাবনা সত্য হয়েছে, তাই সে ভাবনাগুলোই একসময় পাকাপোক্তভাবে তাদের মনে আসন গেড়েছে। তাদের ধারণা মতে, লক্ষ্মীপেঁচা শুভ বার্তা আর কালপেঁচা বয়ে আনে অশুভ বার্তা। আর তাই যখন ললিনের মেজোকাকা কালপেঁচা দেখতে পেলেন তখন থেকেই তিনি এবং পরিবারের অন্যরাও চিন্তিত হলেন। তাদের মতে কালপেঁচা দেখায় পরিবারে জীবনহানির ঘটনা ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, প্রথমে মহিষ মারা গেল এরপর তার ন কাকার ছেলে গাঙান সেও মারা যায়। যেহেতু কালপেঁচা দেখেছিলেন মেজোকাকা তাই ন-কাকী তাকেই দোষারোপ করতে লাগল। ‘কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে সন্তানহারা গান্ধারী যেমন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে ভৎর্সনা করে বলেছিলেন, “এ দুর্ভোগের জন্য দায়ী একমাত্র তুমি, তু-মি!” তেমনি আমাদের গাঙানহারা ন-কাকী পরের দিন চেপে ধরলেন আমাদের মেজোকাকাকে। আলুলায়তি কুন্তল, একটা হাত একটা আঙুল সামনে প্রসারিত,  উদ্দিষ্ট-অবিকল গান্ধারীর ভঙ্গিমায়  ন-কাকী একধারছে ঠুকে যাচ্ছেন, ঠুকে যাচ্ছেন।’ (পৃ. ৭৭, অষ্টম অধ্যায়) পরে বিপদমুক্ত হওয়ার জন্য যজ্ঞের ব্যবস্থা করে।

পৃথিবীর সব নদী সুন্দর হলেও সর্বগ্রাসী নদীকেই মানুষ আপন ভেবে নদীর তীরে গড়ে তোলে নিজেদের আবাস। সুবর্ণরেখা নদীটি ঠিক তেমনই এক নদী এবং ভারতবর্ষের নদীগুলোর মাঝে বিখ্যাতও। সুবর্ণরেখা নদীর বিষয়ে মেদিনীপুরের ইতিহাস বইয়ে এভাবেই উল্লেখ আছে :

‘বাঙ্গালার শেষ নবাবদিগের আমলে সুবর্ণরেখা নদী উড়িষ্যার উত্তরসীমা বলিয়া নির্দিষ্ট হইত। সে সময় মহারাষ্ট্রীয়গণ সুবর্ণরেখা নদী পর্যন্ত ভূমিখণ্ডকে উড়িষ্যার অন্তর্গত বলিয়া অধিকার করিত; কিন্তু সুবর্ণরেখা রূপনারায়ণের মধ্যবর্তী মেদিনীপুর প্রদেশটি তখনও কাগজে-কলমে উড়িষ্যারাজ্য বলিয়াই পরিচিত হইত। কোম্পানির অধিকারের প্রারম্ভেও সুবর্ণরেখা ও রূপনারায়ণ নদীর মধ্যবর্তী চাক্লী মেদিনীপুর বিভাগটি উড়িষ্যার অন্তর্গত ছিল; পরবর্তীকালে ঐ বিভাগ বঙ্গদেশের অন্তর্ভূত হইয়াছে।’

এছাড়া পাণ্ডবদের পিতৃতর্পণের স্মৃতিতে সুবর্ণরেখা তীরে বালিযাত্রা মেলা বসতে দেখা যায়। সুবর্ণরেখা নদী যেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশায় ঢুকেছে সেই সব স্থান থেকে ৬০-৬২ কিলোমিটার দূরে করবনিয়ার মূল বালিযাত্রার স্থানে সকলে আসতে পারেন না বলে, নদীর তীরে নানা স্থানে ছোট ছোট বালিযাত্রা মেলা হয়। দাঁতনের গরতপুর, সোনাকানিয়া এবং বেলমূলাতে, কেশিয়াড়ির ভসরাঘাটে এবং ওড়িশার জলেশ্বরের রাজঘাট ও মাকড়িয়ায় সুবর্ণরেখা নদীর তীরে চৈত্র সংক্রান্তির দিনেই বালিযাত্রা মেলা বসতে দেখা যায়।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষে ললিন একদিকে মরচে-ধরা টিনের ট্রাঙ্ক, ডোরাকাটা ময়লা শতরঞ্জি মোড়া একসেট বিছানা, একটা হেরিকেন, মশারি খাটানোর চার-চারটে বাঁশের বাতা এগুলো নিয়ে আবার হোস্টেলে ফিরে যায়। হোস্টেলে গিয়ে দিনকতক তার ভালো লাগে না। তবে মাঝেমধ্যে একটা-দুটো ছুতো পেলেই ছাত্রাবাস সরগরম হয়ে ওঠে। ফুটবল খেলায় রোহিণী রুক্সিনী দেবী হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল কুলটিকরী হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলকে হারিয়ে দিয়েছে। সেজন্য তারা বিজয়োৎসব করছে। কালীপদ বলে, ‘নে পুনিয়া, এবার তোর ঝুমুর শুরু কর।’ (পৃ. ১১৮, দ্বাদশ অধ্যায়)

‘অমনি বিপুল উদ্যমে ঝুমুর শুরু করে, ‘শালগাছে শালপঙ্্ড়া খেজুরগাছে ঝুরি হে। বঁধার গায়ে লালগামছা চটক দেখে মরি হে।’ (পৃ. ১১৮, দ্বাদশ অধ্যায়)

তবে হোস্টেলে শুধু উৎসবমুখর ছাত্রদেরই দেখতে পাওয়া যায় না, সেখানে পড়ুয়া কিছু ছাত্রের সন্ধানও পাওয়া যায়। কেউ হয়তো চিৎকার করে ভুল ইংরাজি পড়ে চলেছে Mr. Roy “মিস্টার ফুলস্টপ রায়!” আবার কেউ কেউ সেই সন্ধ্যেবেলা থেকে ধূপধুনা দিয়ে নমস্কার করে দুলতে দুলতে শুরু করেছিল―‘দার্শনিক মিল বলেছেন… মিল বলেছেন―ব্যস্, ওইটুকুই! মিল যে কী বলেছেন তা আজ আর জানা যাবে না।’ (পৃ: ১১৮, দ্বাদশ অধ্যায়) মূলত তাদের পড়ার ধরন উপন্যাসের এজায়গাটায় অনেকটা হাস্যরস সৃষ্টি করেছে।

 উপন্যাসে চাল চুরির ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যেহেতু হোস্টেলের মনিটর ললিন তাই হোস্টেল সুপার তাকে চোর ধরার দায়িত্ব দেয়। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার লোধা-ভুঁইঞা-ভূমিজ-কাম্হার -কুম্হার-সাঁওতাল অধ্যুষিত অখ্যাত গ্রাম বাছুরখোঁয়াড়-এ কুম্ভকার (কুম্হার) সম্প্রদায়ের এক পরিবারে ললিনের জন্ম। অনার্য প্রধান গ্রামের মানুষজন মূলত প্রান্তিক শ্রেণির। ললিনের স্কুল রোহিণী রুক্সিমণী দেবী হাই স্কুলের হোস্টেলের ছাত্রদের নামের তালিকায় ভিড় করে : টুডু, হেমব্রম, হাঁসদা, মুর্মু, সোরেন, সিং, বাউড়ি, বিশুই, মুণ্ডা, ভুঁইয়া, মাঝি, পানি, বেহেরা, বেরা, রাণা, হাটুই, পৈড়্যা, দঁড়পাট, পালুই, পাতর, কাপড়ী, জানা, মাইতিদের মতো অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পদবিসমূহ। যারা উপজাতির শ্রেণিভুক্ত এবং শিক্ষাঙ্গনে এসেছে তাদের প্রথম প্রজন্মের সন্তানরা। যারা ভারতীয় সমাজে শাস্ত্রে এবং শিখায় ব্রাত্যজন ছিল বৈদিক অনুশাসনে। তবে এ অঞ্চল বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবমুক্ত নয়। শ্রীচৈতন্য নীলাচলে যাওয়ার পথে এই অঞ্চলে শুনিয়েছেন, হরি নামে চণ্ডালও ব্রাহ্মণ হতে পারে। ললিনও সেই আঞ্চলিক অনার্য সমাজের প্রথম প্রজন্মের সন্তান যার মেধা আছে।

সামাজিক স্তরভেদ আঙুল দেখিয়ে দেয় বর্ণ প্রথার শূন্যগর্ভতার দিকে। আর এই শূন্যগর্ভতাই আরও প্রকট হয়ে ওঠে হোস্টেলের রান্নার টুনি ঠাকুরের ঘটনায়। হাতা-খুন্তি-ডেকচি ধরা এই মানুষটি পাঁচ টাকা দরে রাখীপূর্ণিমার পৈতা বেচেন। নকল বামনাই-এর ভেক ধরতে। রাখালকে ললিন পৈতা কিনে দিতে চাইলে টুনিঠাকুর প্রায় ছড়া বলে টিপ্পনি কেটে বলেন, ‘আজ নগদ কাল ধার, ধারের পায়ে নমস্কার―আর উধারে পৈতা বেচমু ? গেলা বছরের পৈসা তুইও ত আজতক দিলুনি ললিন!’ পৃ. ১২২, দ্বাদশ অধ্যায়) একথা বলে সে রাখালের বউয়ের সামনেই ললিনকে অপমান করে। অনেকটা দাপুটে চরিত্র এই টুনিঠাকুর।

রান্নার কাজ ছাড়া সে যজমানের ঘরে পুরুতগিরি করেন। এমন বর্ণময় দাপুটে চরিত্রটি যখন গভীররাতে চালের বস্তা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় ললিনের হাতে ধরা পড়েন, তখন তার কাতর অনুনয় আর্তনাদের মতো শোনায়―‘মোকে ছাড়ি দে বাপা!’ (পৃ. ১৩২, দ্বাদশ অধ্যায়) ‘তুই তো জানু ললিন, মোর কেতে অভাব রে, ঘরে মোর একগণ্ডা বালবাচ্চা, তার উপর তোর বউদি।’ (পৃ. ১৩২, দ্বাদশ অধ্যায়)

যদিও বর্ণবাদী সমাজ ললিনকে আত্মীকরণ (সংস্কৃত্যায়ন) করতে চায়―‘মুহূর্তে কে যেন আমার কানের কাছে কালের মন্দিরাধ্বনি বাজিয়ে দিল! কংসাবতী শিলাবতী ময়ূরাক্ষী দ্বারকেশ্বর টটককুমারী রাঢ়ু-কঁকর ডুলুঙ সুবর্ণরেখা নদীবিধৌত ঝারিখণ্ডের জইড় বঢ় বহড়া শাল পিয়াশাল ধ আসন কুচলা কইম করম শিমুল মঙ্গল জঙ্গলাকীর্ণ জঙ্গলমহালের আসনবনি কুড়চিবনি জামবনি শালবনি কেঁদ্ বনি বনকাটি মুঢ়াকাটি আমডিহা নিমডিহা বাঘমারি ভালুকঘরা ল্যাকড়াগুড়ি বাঘুয়াশোল বাছুরখোঁয়াড় গ্রাম অধ্যুষিত কোনো এক গ্রামে ভূমিজ মুণ্ডা কুম্ভার মাল সাঁওতাল হাড়ি বাউড়ি জনগোষ্ঠীর কোনো এক গোষ্ঠীতে আমার জন্ম, আমি জাতিতে বোধকরি আদিবাসী শূদ্রই হব। কিন্তু উৎকল-ব্রাহ্মণ টুনিঠাকুর আজ আমার কানে ফুঁ দিয়ে যেন বলছেন, ‘তুই আদিবাসী শূদ্র নোস ললিন, তুই “ব্রাহ্মণ” “ব্রাহ্মণ”…।’  (পৃ. ১৩২, দ্বাদশ অধ্যায়)

এ অঞ্চলে আসা ব্রাহ্মণ-গোস্বামীরা একসময় সামন্ত রাজাদের রাতারাতি  ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় হিসেবে বংশলতিকা বানিয়ে প্রভূত ভূসম্পত্তি অর্জন করত। সেই ধারা এখনও বহমান। ললিনের অঞ্চলে একটা প্রবাদ আছে, ‘ঘৈতা আর পৈতা কখনো হাতছাড়া করতে নেই, সব সময় কাছে কাছে রাখতে হয়।’ ‘ঘৈতা’ হলো স্বামী।’  (পৃ. ১৩৩, দ্বাদশ অধ্যায়)  ঠিক ট্র্যাজেডি আসে তখন, যখন ললিন আবিস্কার করে যে টুনি ঠাকুরের উদোম গায়ে পৈতা নেই। পৈতা ছিঁড়েই তিনি চোরাই চালের বস্তা বেঁধেছেন! পেটে ভাত না থাকলে ধর্ম হয় না। চাল চুরির ঘটনা গোপন রাখার শর্তে ললিনের পাঁচ টাকা ধার মউকুফ করে আজীবন বিনামূল্যে পৈতার আশ্বাস দিয়ে যান টুনিঠাকুর। কিন্তু ললিন তা প্রত্যাখান করে।

ললিন কিন্তু থেকে যায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত ভূমিপুত্র শূদ্রদের দলে। কুমোর জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থান, হাড়ি, বাগধি, ডোম, সাঁওতাল, মুণ্ডাদের থেকে সামান্য ভালো হলেও বৃহত্তর অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর ভাষা-ই ললিনের ভাষা। সামাজিক স্তরভেদের একটি সংকীর্ণতর অথচ গভীরতর খণ্ডদর্শন পাওয়া যায়, অনেকটা গল্পকথার ঢঙে, যদিও খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক―যেখানে বড়দার বিয়েবাড়ির বিবরণের মধ্যে হঠাৎ করে বাল্যস্মৃতির এক ঘটনা উঠে আসে। চারটে বিড়ালের বাচ্চার নাম রাখা হয়েছিল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।

প্রতিটি ঘটনায় লেখকের বর্ণনা কৌশল অসাধারণ! এমনকি ললিনের ঠাকুমা মারা যাওয়ার ঘটনা বর্ণনায় দেখি―‘উড়ে আসা একটা কাক পড়ে-থাকা-টিনের শূন্যবাটি ঠোঁটে করে উড়ে যাবার ফিকির খুঁজছে। আচমকা বুড়িঠাকুমা হেঁচকি তুলে ঢলে পড়লেন। কাক আর নেই, পাঠ্যপুস্তকের খোলাপাতা খোলা-ই রইল। টিনের বাটি যেমনকার তেমন।’ (পৃ. ১৩৬, ত্রয়োদশ অধ্যায়)

চতুর্দশ অধ্যায়ে ললিন আবার হংসী মাঝির নৌকোতে পাড়ি জমায়। মাঝির ভবঘুরে মনের সঙ্গে নিজের মনেরও মিল খুঁজে পায় সে। ‘যদহরেব বিরজেৎ তদহরেব প্রব্রজেৎ।’ অর্থাৎ মন যখনই চেয়েছে, তখনই বেরিয়ে পড়, বেরিয়ে পড়। ভবঘুরে মানুষের স্বভাবই তো এই, ভবঘুরে শাস্ত্রের বিধানই তো এই।’ (পৃ. ১৪০, চতুর্দশ অধ্যায়)

আত্মজৈবনিক এ উপন্যাসে শবরচরিত-র মতোই প্রেক্ষাপট এক আঞ্চলিক প্রাকৃতিক সমাজ। কিন্তু আগে যেখানে লেখকের কথোপকথনগুলো ছিল বর্তমানের সঙ্গে কিন্তু সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা-তে তিনি একইসঙ্গে কথা বলেছেন এগিয়ে যাওয়া অতীত এবং অনাগত ভবিষ্যতের সঙ্গে। কখনও কখনও মনে হয়েছে কাহিনিতে তিনি নিজেই উপস্থিত। ললিনের পরিবার থেকে কাহিনির শুরু। ঘটনাবলীও এগিয়েছে তার পরিবারকেই ঘিরে। বহুভাষিক এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ আলাদা উৎস থেকে আসা বিভিন্ন ভাষা স্থাপনে লেখক  স্বতন্ত্রতার পরিচয় দিয়েছেন। সাঁওতালি বাখুলকে আত্মস্থ করতে স্থানীয় উড়িয়া-বাংলার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা হাটুয়া ভাষার অসুবিধা হয়নি, বরং তা অধিকতর বাক্সময় এবং শ্রুতিমধুর হয়েছে। ললিনের কথায়, ‘এ তল্লাটে বাংলা তো কেউ বলে না, কেউই না। বলে, বাংলা-উড়িয়া মেশামেশি। বলে দোকানদারেরা, বলে কোনও কোনও “হাল-ধরা” হিন্দুরা। একেই বলে “হাটুয়া ভাষা”। উদাহরণ  “আইলা বাম্্হন মাইলা তালি, ঘিনি পালেইলা চাউলথালি।” মানে, বামুন এল হাততালি মারল, চালের থালা নিয়ে পালাল।’   পৃ. ১৪১, চতুর্দশ অধ্যায় ) ‘কিংবা ছুটি গেনে হাতনু শর, চিন্্হে নি সে আপন-পর।’ মানে হাত থেকে  তীর ছুটে গেলে সে আপন-পর চেনে না।’ (পৃ. ১৪১, চতুর্দশ অধ্যায়) আবার হাটুয়া ভাষারও আছে নানা রূপ, কোথাও উড়িয়ার ভাগ বেশি, বাংলা কম, কোথাও উল্টোটা। হাটুয়া ভাষাই এখানকার জন সংযোগের ভাষা এবং  সম্পর্কের এক প্রধান বুনিয়াদ।

ডুলুংয়ের কাতাধার বরাবর গ্রাম―সদ্গোপ, বোষ্টম, কৈবর্ত, দু-চারঘর ব্রাহ্মণ আর ‘গোড়িয়া’ কুমোরদের বাস। ললিন সেখানে বহুবার গিয়েছে কিন্তু তার মন সর্বদা আবিষ্কারকের মন নিয়ে ‘সতত সঞ্চরমান’। এদিক ওদিক থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছে  নতুনত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ভাঙামন্দির, ভাঙামূর্তি, পাথরের টুকরো, একটাও তামা কী পাথরের কুড়ুল, তাম্র-প্রস্তর কী নব্যপ্রস্তর যুগের যেকোনো নিদর্শন, নিদেনপক্ষে পুরোনো পুঁথি-টুথিও পায় যদি। এভাবে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তালপাতায়-খেঁজুরপাতায় আমাদেরও তো কতরকম পুঁথি ছিল―শীতলামঙ্গল, মনসামঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, রসিকমঙ্গল, অত্রিমঙ্গল, সারদামঙ্গল। এসবই ললিন ভাবে হংসী নাউড়ীয়ার নৌকায় ভ্রমণে।

এছাড়া উপন্যাসের এ অধ্যায়ে নীলচাষের বিষয়টিও উল্লেখ আছে। সুদূরবিস্তারী সুবর্ণরেখা ও ডুলুং নদী, অরণ্য, জঙ্গলমহাল ও কৃষিভূমি ইত্যাদি মিলে যে বিস্তৃত ক্ষেত্র সেখানে বর্গি ও মোগল হানা দিয়েছে। নীল চাষের পর্বে অত্যাচার চালিয়েছে সাহেবরাও।

ভারতবর্ষের বিশিষ্টতায় সমাজ ও অর্থব্যবস্থা, ক্ষমতা ও সামাজিক বিভাজন, যে জটিল বাঁধনে অচ্ছেদ্য বলে মনে হয়, যে বাঁধন না কেটে দেশ প্রকৃত দেশত্ব অর্জন করতে পারে না, সেই জটিল বিন্যাস পরতে পরতে উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ললিনও যেন হংশী নাউড়ীয়ার  নৌকায় অনাগত এক কালের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়।

হংসী নাউড়ীয়ার সঙ্গে নৌকা-বিহারের আনন্দ-কণা ইতস্তত ছড়িয়ে আছে বইটির পাতায় পাতায়। যে বহুমাত্রিক বাসনার বৈচিত্র্য আমাদের বিস্মিত করে, তাই যেন গড়ে দেয় লেখকের সামগ্রিক সাহিত্য-মানস।

এ উপন্যাসের ভৌগোলিক অবস্থানটি অদ্ভুত। এখানে নদী তীরে বছরের শেষ দিনে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার মানুষেরা বালিজাৎ উৎসব পালন করেন। মহাভারতের কালে অজ্ঞাতবাস পর্বে এখানে বারিতর্পণ করেছিলেন যুধিষ্ঠির। এ উৎসব তারই স্মৃতিতে। সে স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে থাকে বাংলা, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার বর্তমানও। মানচিত্রের নতুন রেখায় এ অঞ্চল ওড়িশাতে ঢুকে পড়ে আবার বেরিয়েও আসে। কিন্তু জীবন তো মানচিত্রকে ছাপিয়ে যায়। তাই ললিনের জামাইবাবু আসেন ওড়িশা থেকে, বিহার মুলুক থেকে ছেলের নাচনি বউ মেলে আর ললিনের কৈশোরের কাম ও কামনা জড়িত রসনাবালা ভিন রাজ্যে চলে যায়। সেই সঙ্গে নানান মিশ্রণে ভাষাও নতুন রূপ নেয়। হাটুয়া ভাষা তৈরি হয়। উঠোনে বসে ছোটরা পড়ে―‘There is a frog, দেয়ার ইজ এ ফ্রগো, সেঠিরে গুট্যে ব্যাঙো।’  (পৃ. ১৫৪, পঞ্চদশ অধ্যায়) নতুন চর জাগলে তার দখল নিয়েও মারামারি, খুনজখম, থানাপুলিশ, কোর্টকাছারি। তা থেকে তৈরি হয় প্রবাদ, লেখা হয় গান। যেমন বৈশাখীর চর নিয়ে চালু হয়―‘বিধি যাহা লেখি আছে কপালে―বৈশাখীপালে গো বৈশাখীপালে’―‘কথাটির অর্থ হল, ঈশ্বর যার কপালে যেমনটি লিখে রেখেছেন তেমনটিই ঘটে গিয়েছে বৈশাখীর জেগে-ওঠা পালে বা চরে।’  (পৃ. ১৫৫, পঞ্চদশ অধ্যায়)

বর্তমানের হাত ধরেই আসে ইতিহাস। স্কুলে পড়ার প্রয়োজনে ললিনকে এসে থাকতে হয় নদীর অন্যপাড়ে রোহিণীগড়ে। সেই রোহিণীগড়, যার সামন্ত যুবরাজের শবরীবালার প্রতি আকর্ষণ ছিল। মনে আসে দার্শনিক চিন্তাভাবনায় মনকে উদ্বেল করার মতো কতসব বাণী, ‘সাবু উড়ি গেলা, আউ কিছু নাই’। (পৃ. ১৬৮, পঞ্চদশ অধ্যায়)  আবার দেখি, ‘গড়বাড়ির সঙ্গে ‘ভ্রমরগড়’, ‘ভ্রমর’ ‘বরোজিয়া পল্লী’, প্রেমোন্মাদ  রাজকুমারকে জড়িয়ে কতসব প্রচলিত কিংবদন্তি!’ (পৃ.১৬৮, পঞ্চদশ অধ্যায়) এছাড়া ললিন আবিষ্কার করে, ‘এহেন ‘বাবুঘরের’ও একদা একদল পোষা লাঠিয়াল ছিল, আর ছিল ইয়া লম্বা মোচওয়ালা কালী বাগদী,তার ডান হাতে ছ-ছটা আঙুল ছিল।’ (পৃ.১৬৮, পঞ্চদশ অধ্যায়)

পরবর্তী কাহিনিবিন্যাসে আসে ভূ-সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের কাহিনি, আর গ্রীষ্মের সুবর্ণরেখার প্রায় অদৃশ্য স্রোতের মতো বয়ে চলে সামাজিক সম্পর্কে অতীতের বিপুল ভারের কথা। এছাড়া দেখতে পাই, শৈলবালার স্বামী বাবু নাগেন মহাপাত্র উন্মাদ হয়ে গেলে সম্পত্তি দেখাশোনার এবং রক্ষার জন্য সে এক ম্যানেজার খুঁজতে শুরু করে। ‘হয়তো দূরদর্শিনী শৈলবালা মনে মনে দেখতে পাচ্ছিলেন, ঐ যে বিলেবাতানে নেংটি-পরা কালো কালো ডেঁয়ো পিঁপড়ের দল এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা ক্রমশ বড় হবে, বড় হচ্ছিল, এখনই শক্তহাতে না ধরলে কুরে কুরে একদিন সমস্ত জমির আল কেটে ঝাঁঝরা করে দেবে, এমন কী মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে গড়বাড়ির  অন্দরমহলেও ঢুকে পড়বে।’ (পৃ. ১৭৩- ১৭৪, পঞ্চদশ অধ্যায়)

কাহিনির হাত ধরে আসে নানা কাহিনি―বহিরাগত শাসকের সঙ্গে স্থানীয় লোকগোষ্ঠীর সঙ্ঘাত, বর্গীদের আক্রমণ, এলাকাভিত্তিক যুদ্ধ।  বৈশাখীপাল দখল করার যুদ্ধে নতুন পার্টি গয়া দত্তের হার হয়েছে। ললিনের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র যেমন ভীষ্মের নিধনবার্তা শ্রবণে নিতান্ত কাতর হয়ে সঞ্জয়কে পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসা করতেন, ‘হে সঞ্জয়! তিনি যুদ্ধযাত্রা করিলে কাহারা তাঁহার অনুগমন করিয়াছিল, কাহারা পূর্ববর্তী ছিল, কাহারা তাঁহার নিকট অবস্থান করিয়াছিল, কাহারা তাঁহার নিকট হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়াছিল, কোন্ সকল বীর তাঁহাকে বেষ্টন করিয়াছিল… ইত্যাদি ইত্যাদি জানতে চাইতেন, তেমনি শৈলবালাও কি আর জানতে আগ্রহ প্রকাশ করতেন না, কালিদহ, উমেশ দে-র দলে কারা কারা আর গয়া দত্তের দলেই বা কারা কারা যোগ দিয়েছিলেন, আর কীভাবে যুদ্ধ করেছিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি ?’ (পৃ. ১৭৬, ষোড়শ অধ্যায়)

আবার দেখতে পাই, কবিয়াল সন্তোষ দাস লিখেছেন, ‘আবার পুরাতনপার্টি তীর ছাড়িলা। নতুনপার্টি তেরপল দেই ঘিরি ফেলিলা।’ অর্থাৎ সেই ব্যূহ রচনা, সেই নাগবান মারলে গরুড়বান দিয়ে প্রতিহত করা। (পৃ. ১৭৭, ষোড়শ অধ্যায় )

বৈশাখীপালের যুদ্ধে কালি জানা আর জলধর দাস মারা গেলে নতুন পার্টির টিম লিডার গয়া দত্তসহ ২১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। তখন তারা পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বাড়িতে মেয়ে মানুষের পোশাক পরে থাকেন। মাঝে মাঝে তারা বউয়ের শাড়ি-সেমিজ পরে কাঁখে কলসি নিয়ে পুলিশের সামনে দিয়ে বাইরে বের হলে পুলিশ তাদের ধরতে নদীতে পর্যন্ত লাফ দেন। গ্রামের মানুষ জাল দিয়ে ছেঁকে তুলতেন।  এ দৃশ্যে আমরা একটু হাস্যরস দেখতে পাই।

এমন সব রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপড়েনের ভেতর হংসী নাউড়ীয়ার বোনের শুকনো চোখে জলের ধারা নামে। ললিনের মনোরোগী পিসির সন্ধানে দু’ভাইপো দূর পথ পাড়ি দেয়। রাত্রিযাপনের জন্য তারা স্টেশনে থাকলে সেখানে এক লোক ললিনের হাত ধরে জোরে করে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকলে সে কপালকুণ্ডলার নবকুমার আর কাপালিকের ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পায়। ‘কাপালিক নবকুমারের হস্ত ধারণ করিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। মানুষঘাতী করস্পর্শে নবকুমারের শোণিত ধমনীমধ্যে শতগুণ বেগে প্রধাবিত হইল―লুপ্ত সাহস পুনর্বার আসিল। কহিলেন, ‘হস্ত ত্যাগ করুন।’ কাপালিক উত্তর করিল না। নবকুমার পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আমায় কোথায় লইয়া যাইতেছেন ?’ কাপালিক কহিল, ‘পূজার স্থানে।’ নবকুমার কহিলেন, ‘কেন ?’ কাপালিক কহিল, ‘বধার্থ।’ অতি তীরবেগে নবকুমার নিজহস্ত টানিলেন। যে বলে তিনি হস্ত আকর্ষিত করিয়াছিলেন, তাহাতে সামান্য লোকে তাঁহার হাত ধরিয়া থাকিলে হস্তরক্ষা করা দূরে থাকুক―বেগে ভূপতিত হইত। কিন্তু কাপালিকের অঙ্গমাত্রও হেলিল না; নবকুমারের প্রকোষ্ঠ তাহার হস্তমধ্যেই রহিল।…’  [(সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা পৃ. ২৪১-২৪২, সপ্তদশ অধ্যায় ), (কপাল কুণ্ডলা পৃ. ৪৪, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : কাপালিক সঙ্গে)]

এদিকে ছাগল-চরানি সরলার সঙ্গে ললিনের বড়দার বিয়ে ঠিক হয়। সরলা সেজেগুজে তাই বিয়ের পিঁড়িতে বসে। আর অন্য দিকে ললিন ঘুরে বেড়ায় ঝোপে ঝাড়ে, ধানজমিতে, বিয়েবাড়ির ছাদনাতলা ছামড়ায়। উপন্যাসে লেখক একই সঙ্গে এনে হাজির করেন ডোমদের আবহমান কাল ধরে প্রজন্ম-প্রশিক্ষিত বাজনা ও মাইকে হেমন্ত-মান্না মানবেন্দ্র-সতীনাথ-পূর্ণদাস, সন্ধ্যা শ্যামল-লতার গান।

একজন কিশোরের বেড়ে ওঠার কাহিনিতে বয়ঃসন্ধিকালে যৌনতার ছোঁয়া থাকবে না, তা হয় না বলেই কাঁদরি, চাঁপা, কালিন্দী, কুসুম, রসনার প্রসঙ্গ আসে। লেখক ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই ফ্রয়েড্রীয় তত্ত্বানুযায়ী ছুঁয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে যান।

কয়েকটি টুকরো ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে পাই: সাঁওতাল দিদির গল্প, রোহিণী হাইস্কুলে, হোস্টেলে নানান মজাদার ও ভৌতিক বা রহস্যময় অভিজ্ঞতা, বাড়িতে কালপেঁচা এসে বসা ও তৎপরবর্তী ঘটনা ও দুর্ঘটনা চক্র, বৈশাখী পালের চর-সংক্রান্ত ইতিবৃত্ত, ব্যাঙকে নিয়ে বলা গল্প, ছোটপিসিমার মস্তিষ্কবিকৃতি ও নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, অভিসেনার আরবীয় সাইকোথেরাপি, বড়দা শ্রীকান্তর বিয়ে, ছোট বড় আরও অনেক ঘটনা ।

সুবর্ণরেখা নদীর চলার পথে আশেপাশের গাছপালা-পশুপাখি এবং মানুষদেরকে নিয়ে স্বর্ণসন্ধানী সাহিত্যিক রচনা করেছেন একটি ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস। বিদ্যাসাগর ‘সংস্কৃতভাষা ও সংস্কৃতসাহিত্য’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘পূর্বকালীন লোকদিগের আচার, ব্যবহার, রীতি, নীতি, ধর্ম, উপাসনা ও বুদ্ধির গতি প্রভৃতি বিষয়সকল মনুষ্যমাত্রের অবশ্যজ্ঞেয়…’। নলিনী বেরা-র উপন্যাস শেষ হয়েছে গত সহস্রাব্দের সাতের দশকে। সে দিক দিয়ে তিনি আমাদের পূর্বকালীন লোকেদের কথা শোনাচ্ছেন। কিন্তু, সেই সঙ্গে তিনি বাংলা-র এক প্রায় অজানিত, অ-দৃশ্য, অ-শ্রুত লোককে পাঠকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন। ভূমিজ উপকরণের প্রাচুর্য বা প্রান্তিক শব্দ-বন্ধের ব্যবহারও দেখা যায়।

লেখকের গদ্যভাষা মনে করিয়ে দেয় আরণ্যক এর আত্মগত পটচিত্রকে বা তার স্রষ্টা নিসর্গপ্রেমী বিভূতিভূষণকে। এ উপন্যাসে ‘পথই পথিকের আশ্রয়’ শুধু এটুকু বোঝাতেই দু’জন লেখকের লেখার মাঝে মৌলিক কাঠামোতে আশ্চর্য মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়। তাদের সময়কালের মাঝে প্রায় ৮০-৯০ বছরের ব্যবধান রয়েছে :

(ক) পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন―মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায় ? … পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে … দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে…মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায় … পথ আমার তখনও ফুরোয় না … চলে … চলে … চলে .. এগিয়েই চলে…’ (পথের পাঁচালী : ১৬৬ পৃ. পঞ্চত্রিংশ পরিচ্ছেদ )

(খ) কতদিন ভেবেছি ঐ যারা পশ্চিমে যায় তাদের পিছু পিছু আমিও যদি যাই, যদি চলতেই থাকি, চলতেই থাকি, তারা হয়তো যেতে যেতে ডাইনে-বাঁয়ে এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে পাশের গাঁয়ে তার পাশের গাঁয়ে, পাতিনা তালডাঙরা, ফুলবনী মালতাবনী কী দাঁড়িয়াবান্ধি খাড়বান্ধি রগড়া পদিমা কাঠুয়াপাল চর্চিতায় যে যার ঘরে, কুটুমঘরে ঢুকে যাবে—আমার পথচলা তখনও কিন্তু থামবে না। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। চলতেই থাকবে…’ (সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা  পৃ. ২৬, প্রথম অধ্যায় )

এ উপন্যাসে লেখকের ব্যবহৃত নানান উদ্ধৃতি এত প্রাসঙ্গিক, এত পরিচিত, এত নিখুঁত যে বাঙালি পাঠক সহজেই একাত্ম হতে পারেন ঐ সব ঘটনার সঙ্গে। এছাড়াও পুরো কাহিনির সঙ্গেই কখনও শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, রবীন্দ্রনাথ, নীহার রঞ্জন, জীবনানন্দ, নজরুলের নাম এসেছে। আর অভ্র-কণার মতো ছড়িয়ে আছে নানা ছড়া, কবিতা, প্রবাদ-প্রবচন, হাটুয়া ভাষার এবং বাংলা পুরোনো দিনের গানের ছোট ছোট লাইন। যে সব গান আর কবিতা দশকের পর দশক ধরে বাঙালিকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে।

ছড়া বা কবিতা: 

‘পিপীলিকা পিপীলিকা দলবল ছাড়ি একা কোথা যাও যাও ভাই বলি।’ ‘শীতের সঞ্চয় চাই খাদ্য খুঁজিতেছি তাই ছয় পায় পিল পিল্ চলি।’ (পৃ. ৬৩, সপ্তম অধ্যায়)

‘কোথায় ফলে সোনার ফসল/ সোনার কমল ফোটে রে, সে আমাদের বাঙলাদেশ/ আমাদেরি বাঙলা রে!’ (পৃ. ৭৬, অষ্টম অধ্যায়)

‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো বর্গী এল দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে।।’  (পৃ. ৮০, নবম অধ্যায়)

‘বল বীর চির উন্নত মম শির ঐ শির নেহারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির’  (পৃ. ৮৮, দশম অধ্যায়)

‘ঘরের ধারে নিমগাছটি নিম ঝড়্্ঝড়্ করে। সদা সতীনের বিটি নিৎ নিয়াই করে।’ (পৃ. ১৩৪, ত্রয়োদশ অধ্যায়)

‘যত চাও তত লও তরণী-পারে। আর আছে ? -আর নাই, দিয়েছি ভরে। এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলই দিলাম তুলে থরে বিথরে- এখন আমারে লহো করুণা করে।’ (পৃ. ১৪৪, চতুর্দশ অধ্যায়)

‘খোকা গেল মাছ ধরতে ক্ষীরনদীর কূলে, ছিপ নিয়ে গেল কোলাব্যাঙে মাছ নিয়ে গেল চিলে।’ (পৃ. ১৮৯, ষোড়শ অধ্যায়)

‘স্পন্দিত নদীজল ঝিলিমিলি করে/ জ্যোৎস্নার ঝিকিমিকি বালুকার চরে। নৌকা ডাঙায় বাঁধা, কাণ্ডারি জাগে/পূর্ণিমা রাত্রের মত্ততা লাগে।’ (পৃ. ১৯১, ষোড়শ অধ্যায়)

‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর ? মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর।’ (পৃ. ১৯৫, ষোড়শ অধ্যায়)

 ‘ভোর হল দোর খোল খুকুমণি ওঠ রে’ (পৃ. ২০৯, সপ্তদশ অধ্যায়)

প্রবাদ-প্রবচন

‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’ (পৃ. ১০১, একাদশ অধ্যায়)

‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, আজ রে ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ।’ (পৃ. ১২০, দ্বাদশ অধ্যায়)

‘অতি বড় সুন্দরী না পায় বর। অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর।’  (পৃ. ১৪৮, চতুর্দশ অধ্যায়)

‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’  (পৃ. ১৬১, পঞ্চদশ অধ্যায়)… এছাড়া পুরো উপন্যাস জুড়ে অসংখ্য

প্রবাদ-প্রবচন আছে।

গান

‘ও শিমুল ও পলাশ’ (পৃ. ৬২, সপ্তম অধ্যায়)

‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়-’ (পৃ. ৮৩, নবম অধ্যায়)

‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।’ (পৃ. ৮৮, দশম অধ্যায়) ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ এই গানটির গীতিকার মোহিনী চৌধুরী এবং সুরকার কৃষ্ণ চন্দ্র দে।

‘সব সখীকে পার করিতে লব আনা আনা। আর,  রাধিকাকে পার করিতে লব কানের সোনা।’ (পৃ. ১৪০, চতুর্দশ অধ্যায়)

‘মধুমালতী ডাকে আয় ফুল ফাগুনের এ বেলায়’  (পৃ. ১৬৩, পঞ্চদশ অধ্যায়)

‘সাতভাই চম্পা গো রাজার কুমার কোথায় পক্ষীরাজ ঘোড়া তার ঢাল তলোয়ার’ (পৃ. ১৬৫, পঞ্চদশ অধ্যায়)

‘ও নদী রে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’ (পৃ. ১৯৩, ষোড়শ অধ্যায়)

‘জীবনে যদি দ্বীপ জ্বালাতে নাহি পারো সমাধি’পরে মোর জ্বেলে দিও।’ (পৃ. ২০৪, সপ্তদশ অধ্যায়

‘পাথরে লেখ নাম সে নাম মুছে যাবে, হৃদয়ে লেখ নাম-’ (পৃ. ২১৮, সপ্তদশ অধ্যায়)

‘ঘুমঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত’ (পৃ. ২৩৫, সপ্তদশ অধ্যায়)

‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়’ (পৃ. ২৪৩, অষ্টাদশ অধ্যায়)

‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো- হারিয়ে যাবো আমি তোমার সাথে, (পৃ. ২৫৯, অষ্টাদশ অধ্যায় )

‘এ শুধু গানের দিন এ লগন গান শোনাবার

এ তিথি শুধু গো যেন দখিন হাওয়ার-’ (পৃ. ২৭৭, অষ্টাদশ অধ্যায়)

কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু মাটির কাছাকাছি গান, গীত বা গাথা এবং ছড়াও রয়েছে।

‘শালগাছে শালপঙ্্ড়া খেজুরগাছে ঝুরি হে। বঁধার গায়ে লালগামছা চটক দেখে মরি হে।।’ (পৃ. ১১৮, দ্বাদশ অধ্যায়)

‘আহা ছুঁইও না ছুঁইও না বঁধু-।’ (পৃ. ১২০, দ্বাদশ অধ্যায়)

‘বিধি যাহা লেখি আছে কপালে- বৈশাখীপালে গো বৈশাখীপালে।’ (পৃ. ১৫৫, পঞ্চদশ অধ্যায়)

‘বারিপদা শহরে গাড়ি চলে রগড়ে। দাদা গো দিদি গো, চল যাব টাটা নগরে।।’  (পৃ. ১৮৩, ষোড়শ অধ্যায়)

‘জমআবন ঞুইআবন রাইস্কারেবন তাঁহে না। নওয়া হাসা হড়ম বার সিঞ লাগিৎ।।’ (পৃ. ২০৩, সপ্তদশ অধ্যায় )

‘মেনকা মাথায় দে লো ঘোমটা।’ (পৃ. ২৫৫, অষ্টাদশ অধ্যায়)

এছাড়াও পুরো উপন্যাসে গ্রাম্য কবি সন্তোষ দাসের লেখা পালাগানের পঙক্তি ও কাহিনির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

আমরা জানি, কীর্তনে আখর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গাওয়া হয়। এছাড়া উর্দু শায়েরি শোনার সময় দেখেছি কবিরা এক একটি পংক্তিকে অন্তত দুইবার করে পড়েন। শ্রোতার রসাস্বাদন যাতে নিবিড় হয়। নলিনী বেরার এই ব্যতিক্রমী উপন্যাসেও এক একটি ছোট ছোট বাক্যবন্ধকে অত্যন্ত সচেতনভাবে লেখক প্রায়ই দ্বিত্বে ব্যবহার করেছেন। যা লেখাটির কাব্যগুণ কিম্বা গীতিময়তা বাড়িয়েছে বহুগুণে । যেমন :

কারোর দিকেও না, এমনি মিছামিছি। মিছামিছি, মিছামিছি। (পৃ. ২০, প্রথম অধ্যায়)

নদীর নাম সুবর্বণরেখা। সুবর্বণরেখা সুবর্বণরেখা। (পৃ. ২৮, দ্বিতীয় অধ্যায়)

সে-ধোঁয়া রাগী বিড়ালের ল্যাজের মতোই ক্রমশঃ ফুলতে থাকে। ফুলতে থাকে, ফুলতে থাকে। (পৃ. ৩৫, তৃতীয় অধ্যায়)

ততদিনে মন থেকে গান্ধীর প্রতি আমার অশ্রদ্ধাটাও উধাও। উধাও, উধাও। (পৃ. ৪৯, চতুর্থ অধ্যায়)

আমার জীবনে যেমন একটা নদী―তেমনি একটা দখিনসোলের সোঁতা। দখিনসোলের সোঁতা, দখিনসোলের সোঁতা। (পৃ. ৫১, পঞ্চম অধ্যায়)

কখন পগারপার―কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কেবল দাঁড়িয়ে আছি আমি। দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়ে আছি। (পৃ. ৫৭, ষষ্ঠ অধ্যায়)

বইটার কী নাম, লেখক কে―আজ আর মনে নেই। মনে নেই, মনে নেই। (পৃ. ৬৪, সপ্তম অধ্যায়)

 আমার গায়ে-পিঠে ছাপ লেগে গেল ‘সালুয়া’। সালুয়া, সালুয়া। (পৃ. ৮৭, দশম অধ্যায়)

তার খুব সহজ উত্তর ছিল―‘সোমনাথ’। সোমনাথ, সোমনাথ। (পৃ. ১০৪, একাদশ অধ্যায়)

 ‘কালী দাস তো নন, লোকে বলে ‘কালী দহ’। কালীদহ, কালীদহ।’   (পৃ. ১৬৯, পঞ্চদশ অধ্যায়)

‘তার মানে কোনো ভুল নেই ‘যুদ্ধ আসছে।’ যুদ্ধ আসছে, যুদ্ধ আসছে।’  (পৃ. ১৭০, পঞ্চদশ অধ্যায়)

‘আজ তাই সালুয়ার নাড়ীনক্ষত্র ময় রেলগাড়ির ছিটে-ফোঁটা যন্ত্রাংশও আবিষ্কারের চেষ্টায় বিস্ফারিত চক্ষে চারধারটা দেখে যাচ্ছি। দেখে যাচ্ছি, দেখে যাচ্ছি।’  (পৃ. ২২৩, সপ্তদশ অধ্যায়)

আমার ঘুরে-ফিরে কেবলই মনে হচ্ছে―আছেন, আছেন। আমাদের ছোটপিসিমা এখানেই আছেন। (পৃ. ২৩৬, সপ্তদশ অধ্যায়)

ধ্বনাত্মক ও দ্বিত্ব শব্দেরও কমবেশি ব্যবহার দেখি। ‘হুমদুম’ করে আমাদের অন্তর কি ‘হুদহুদ’ করে কখনও ?  ‘রদবদিয়ে’ গাছ বাড়া, ‘ভদভদিয়ে’ পায়রা ওড়া, ঝুনঝুনিটা বাজাচ্ছিল ‘ঝুন্ ঝুন্’ করে, ‘দুম্ দুম্’,   অথবা ‘নির্ধূম সে’ নাচি ? বা ‘রুম্রুম্ বসি’ ? রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পসল্প’-খ্যাত বাচস্পতি মশায়ের তত্ত্ব-অনুযায়ী ধ্বনিচরিত্র থেকে দৃশ্যমানতা জন্ম নেয়, বিশেষ কোন অসুবিধা হয় না।

রোহিণী শব্দের ব্যুৎপত্তি  জানতে পারি, ‘রউণি > রয়ণী > রোহিণী’। এছাড়া বৈষ্ণব পদাবলীর পদ দেখতে পাই। ‘রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যথা। বসিয়া বিরলে থাকয়ে একালে না শুনে কাহারো কথা…।।’  (পৃ. ১২৪, দ্বাদশ অধ্যায়)

তবে বিভিন্ন পশুপাখির ডাকের বিশ্লেষণ আর তার প্রত্যয় নিরূপণে লেখকের পাণ্ডিত্য ও রসবোধের যুগল-মিলন পাঠককে অনাবিল আনন্দ দেয়।

চিলের ডাক : ‘কুড়র্ র্-র্-’ ( পৃ. ৫৫, ষষ্ঠ অধ্যায় )

কালপেঁচার ডাক: ‘ট্র্যাঁ – ট্র্যাঁ’ (পৃ. ৬৬, অষ্টম অধ্যায় )

মোষের ডাক বা আর্তনাদ : ‘অঁয় – অঁয়’ ( পৃ. ৭২, অষ্টম অধ্যায় )

মাছের আওয়াজ : ‘কব্’ (পৃ. ৯১, দশম অধ্যায়)

কুকুরের সমবেত ডাক: ‘ভুক্্ভুকানি’  ( পৃ. ৯৮, দশম অধ্যায় )

কোকিলের ডাক: ‘কু-হু-উ’ (পৃ. ১৫৫, পঞ্চদশ অধ্যায়)

ব্যাঙের ডাক: ‘ঘ্যাঁ-ঘুঁ’, ‘ঘ্যাঁ-ঘুঁ’! আরেকটা ডাক ‘কোয়াক ঘঙ্ কো-য়া-ক ঘঙ্!’ (পৃ. ১৮৭, ষোড়শ অধ্যায়) এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ-অন্বেষণে লেখক নিপুণ দক্ষতায় ব্যাঙের ডাককে মিলিয়ে দিয়েছেন ‘গালিভার ট্রাভেল্্স্্-এ লিলিপুটদের শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে। যেমন―‘ঘ্যাঁ-ঘুঁ’, ‘কো-য়া-ক ঘ-ঙ্’ ‘কুঁ-উ-র কঙ্’! (পৃ. ১৮৭, ষোড়শ অধ্যায়)

ফিঙে পাখির ডাক: ‘ভু-ই-চু-ঙ’ ‘ভু-ই-চু-ঙ’ (পৃ. ২৭৭, অষ্টাদশ অধ্যায়)

সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসটিকে সম্পূর্ণরূপে আস্বাদন করতে হলে এর শেষাংশে এষড়ংংধৎ বা ব্যবহৃত লোকায়ত শব্দসমূহের অর্থ-তালিকাটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তথাকথিত অপরিচিত শব্দাবলির প্রচলিত বাংলা অর্থ অধ্যায়ানুযায়ী সাজানো আছে। যেমন :

পদ্মল ঘা―শতদল বা ক্যান্সার (প্রথম অধ্যায় )

দেড়ইয়া―সঙ্গম করতে দেওয়া (প্রথম অধ্যায়)

কুঁহরাচ্ছে―ডাকছে (তৃতীয় অধ্যায়)

গাড়িয়া―ছোট পুকুর  (তৃতীয় অধ্যায়)

বুড়ে যাওয়া―ডুবে যাওয়া (পঞ্চম অধ্যায়)

মেঘপাতালে―আকাশে (ষষ্ঠ অধ্যায়)

বিঁড়োল বাও―ছোট ছোট ঘূর্ণিঝড় (ষষ্ঠ অধ্যায়)

কুল্্হ―িগ্রামের ভিতর বালিরাস্তা (ষোড়শ অধ্যায়)

ফুড়গুণি―আলোর ঝিলিক (সপ্তদশ  অধ্যায়)

বাহাঘর―বিয়ে বাড়ি (অষ্টাদশ অধ্যায়)

কষিকুসুম―ফুলের কুঁড়ি (অষ্টাদশ অধ্যায় )

পুরো বইতে হয়তো প্রিন্টিং এর ভুলের কারণে বেশকিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। সেখান থেকে কিছু ভুল বানান তুলে ধরলাম, যেমন :

প্রচন্ড  (পৃ. ২৫, প্রথম অধ্যায়)  হবে প্রচণ্ড।

 দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ, ঠান্ডা (পৃ. ৩২ ও ৩৪, তৃতীয় অধ্যায়)  হবে দোর্দন্ড প্রতাপ, ঠাণ্ডা।

 বাঁধে  (পৃ. ৬১, সপ্তম অধ্যায়) হবে বেঁধে।

যওয়া, দরুন, এক (পৃ. ৬৫ ও ৬৬, অষ্টম অধ্যায়) হবে যাওয়া, দরুণ, একা।

দার্শেিকর (পৃ. ১০৪, একাদশ অধ্যায়) হবে দর্শনের।

 সেকেন্ডারী, ইতিমধ্যে, একগণ্ডা, বাছুরখোয়ার   (পৃ. ১১৮ ও ১৩৩, ১৩১ ও ১৩২ , দ্বাদশ অধ্যায়) হবে সেকেন্ডারি, ইতোমধ্যে, একগণ্ডা, বাছুরখোঁয়ার।

চর্তুদশ  (পৃ. ১৩৮, চতুর্দশ অধ্যায়) হবে চতুর্দশ।

 কিংবদন্তী, কড়ায় গণ্ডায়, পূরোবর্তী, খণ্ড খণ্ড, খণ্ডাংশ (পৃ: ১৬৮, ১৬৯, ১৭৬, ১৭৭ ও ১৭৮,পঞ্চদশ অধ্যায়) হবে কিংবদন্তি, কড়ায় গণ্ডায়, পূর্ববর্তী, খণ্ড খণ্ড, খণ্ডাংশ।… পুরো উপন্যাস জুড়ে এমন ছোট ছোট আরও বেশকিছু বানান ভুল চোখে পড়ে।

লেখক এ উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলেন সুবর্ণরেখা নদীতীরবর্তী ওড়িশা সংলগ্ন লোধা-ভূঁইঞা-ভূমিজ- কাম্হার-কুম্হার-সাঁওতাল অধ্যুষিত একটা গ্রাম থেকে। যেহেতু গ্রামটি সুবর্ণরেখার তীরে উড়িষ্যা সংলগ্ন তাই এর ভাষাটাও পুরোপুরি বাংলা নয়, কিছুটা হাফ-ওড়িয়া, হাফ-বাংলার সংমিশ্রণ রয়েছে। এই বাংলা আসলে মান্য ব্যাকরণের নিগড়ে বাঁধা অনড় কিছু শব্দসমষ্টি নয়। মান্য বাংলাটাই সেখানে দিকু বা বিদেশিদের ভাষা। বহতা সুবর্ণরেখা নদীর মতো বহু সংস্কৃতির ধারায় পুষ্ট সে। লেখক তাঁদের সুবর্ণরেখা অঞ্চলের রাজু, তেলি, সদগোপ, করণ, কৈবর্ত, খণ্ডায়েৎ-অধ্যুষিত জনপদের কথা বলছিলেন, যা হাটুয়া লোকজনের কথ্যভাষা।

সেই ভাষাকে ব্যবহার করে নলিনী বেরা সাহিত্যের ঊষর মরুভূমিতে প্রাণরস সঞ্চিভূত করলেন। স্বাভাবিকভাবেই সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখার লেখক নলিনী বেরাকে শৈশব থেকেই পাঠ্যভাষা থেকে ক্রমান্বয়ে বাংলা চলিত ভাষা শিখতে হয়েছে। কুম্ভকার (কুম্হার) সম্প্রদায়ের লেখককে শুধু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার বিরুদ্ধেই লড়তে হয়নি, তাঁর জীবন সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ভাষাগত প্রান্তিকতা দিয়েও।

শ্রী নলিনী বেরা-র ভাষার ওপর রয়েছে অসামান্য দক্ষতা। ভূমিজ বা আদিবাসী জনজাতির ব্যবহৃত ভাষা যেমন অবলীলাক্রমে তিনি ব্যবহার করেছেন, তেমনি শুদ্ধ সংস্কৃত বা তৎসম শব্দকেও সম্পূর্ণ সচেতনভাবে বসিয়েছেন আপন অভিরুচি অনুসারে। কারণ যাঁরা সংস্কৃত বলতে পারেন, তাঁরা আর্য। যাঁরা পারেন না, অনার্য। আদিতে আর্য-অনার্য তো কখনও নৃতাত্ত্বিক বা গোষ্ঠীগত বিভাজন ছিল না। তাই নদীর জলে ‘সমভিব্যাহারে’ নেমে আসা নোংরা-জবরা, শিশির-দুষ্ট শতদলের ক্রীড়াবনত পাপড়িনিচয়ে টুসকি মেরে ঝেড়ে পুঁছে দেখা, বহির্জগত বিবর্জিত খড়ের ওমসংযুক্ত অন্ধকার প্রদেশে কৌশল্যার শরীর খুলে আহ্বান, ক্রীড়ারত চ্যাঙনা-মাঙনাদের নাচ―একটুও গুরুচণ্ডালী দোষ মনে হয়নি। ভাষার জোর এই আনাগোনার বহতা সংস্কৃতিতেই বিদ্যমান। ঐতিহ্য তো ভাষার এই বহুত্ববাদই! কালিদাস, ভবভূতির নাটকেও কত ভাষা মিশে গিয়েছিল। নায়ক-নায়িকারা যদি বলতেন সংস্কৃত, প্রজাবর্গ বলতেন প্রাকৃত।

উপন্যাসের বিষয়বিন্যাসে তাঁর স্বাতন্ত্র্য : প্রান্তিক ও অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের সমকালীন বাস্তবতা, সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিতি, ছোট ছোট নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে আসা-যাওয়া, উপন্যাসের বিষয় নিম্ন-শ্রেণির, প্রান্তিক, অন্ত্যজ ও অপাঙক্তেয় মানুষ, উপন্যাসে একটি শক্তিশালী কমিটমেন্ট আছে,  ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের শ্রেণিবৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসার নিবিড় তপস্যা, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান।

নির্মিতির প্রশ্নে তাঁর স্বাতন্ত্র্য উপস্থাপনায় নির্মাণকৌশল যেভাবে ধরা দেয় :

শব্দচয়নে পূর্ণ স্বাধীনতা, কাব্যরূপময় বাক্যের সন্নিবেশ এবং ইঙ্গিতময় বাক্য যা রূপকধর্মী, ছড়া, কবিতা, গান, প্রবাদ-প্রবচন এর ব্যবহার, হাটুয়া লোকজনের কথ্যভাষার ব্যবহার।

সাহিত্য মানবমনের শিল্পভাষ্য। এই শিল্পভাষ্যে মানবমনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রতিবিম্বিত হয়। সাহিত্যের নামকরণও একটি শিল্প। নামকরণের সাফল্য শিল্পসাফল্যের একটি বিশেষ দিক। বিষয়বস্তু, ভাবসম্ভার, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, চরিত্র এবং লেখকের জীবনোপলব্ধির বাহক হিসেবে সাহিত্য-শিল্পের নামকরণ হয়ে থাকে। যেহেতু উপন্যাসটি ‘সুবর্ণরেখা’ নদী এবং তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার আশেপাশের প্রকৃতি, প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-সুধা পান করা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের জীবনভাষ্যের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তাই উপন্যাসের নামকরণ সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে।

স্বীকৃতির মানদণ্ডে বিচার করলে দলিত সাহিত্যের বিশিষ্টতা সম্বন্ধে একটা সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নলিনী বেরা এর আগে বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে মুন্সিয়ানার জন্যে প্রদত্ত এই পুরস্কার প্রখ্যাত দলিত লেখক অনিল ঘড়াইকেও দেওয়া হয়েছে। বেরিয়েছে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের উপন্যাস উজানতরির উপকথা। দেবেশ রায় সম্পাদিত মারাঠি, কন্নড় ও গুজরাটি দলিত সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ সঙ্কলন ‘দলিত’ প্রকাশ পায় সাহিত্য আকাদেমি থেকে। পাশাপাশি ঠিক একই সময় দলিত সাহিত্যের জন্য একটা স্বতন্ত্র ঘরানার দাবিদার বাংলা প্রাত্যহিকী ‘চতুর্থ দুনিয়া’ তাদের গল্পসংগ্রহ বই আকারে প্রকাশ করেছে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ যখন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দলিত নিপীড়নের কাহিনি তিতাস একটি নদীর নাম লিখলেন, অনেকেই মনে করেছিলেন যে, কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে কাজ অনায়াস দক্ষতায় করেছেন পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে। অদ্বৈত কি সেভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন ? সকলের সংশয় নিরসন করে তিতাস একটি নদীর নাম আজ কালজয়ী একটি উপন্যাস।

আসলে বাংলা সাহিত্যে দলিত রচনা সংবর্ধনা লাভের পর অনেকেই মনে করতে আরম্ভ করেন যে, বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরার একটা রীতি মূলধারার লেখকদের উপজীব্য ছিল বরাবরই। মানিকবাবুর মতো শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী এবং ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের কল্লোল ও কালিকলম গোষ্ঠীর প্রগতিশীল লেখকদের অনেকেই এই কাজ করে গেছেন। সুতরাং আজ যাকে দলিত সাহিত্য বলা হচ্ছে, তা আসলে মূলস্রোতের বাংলা সাহিত্যের একটি প্রক্ষেপ মাত্র। প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য।

কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরা মেদিনীপুর জেলায় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন ও মধ্যযুগ পরবর্তী শিক্ষাঙ্গনে একটি অনেক বড় নাম। ‘গ্রাম দিয়ে নগরায়নকে আটকিয়ে’ দেওয়ার যে স্লোগান ষাটের দশক পরবর্তী সময়ে উঠেছিল সেই প্রেক্ষাপটে গ্রামের প্রকৃতিকে গায়ে মেখে গ্রাম্য সুবাস নিয়েই হাজির হয়েছিলেন এক ঝাঁক লেখক সেই সময়কালে। তাঁদের  মাঝে একজন হলেন কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরা। একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের মাটি থেকে তাঁর এই যে উড়ান তা কেবল তাঁর এক প্রকার প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সময়কালে শহরের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলে কেউই ওড়ার সাহস দেখাতে পারেন না। কেবল ইচ্ছে-ডানায় ভর করেই এ সময়ের একজন অন্যতম কথাসাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন এই নলিনী বেরা। তিনি আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৯ সালে সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য। বাংলা কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এই উপন্যাস।

অনেকেই মনে করেন নলিনী বেরা-র লেখায় বেশ কিছু পুনরাবৃত্তি থাকে। কিন্তু এমন মনে করা যৌক্তিকতাহীন। কারণ তিনি এমন অচর্চিত এবং অপাঙক্তেয় সমাজের চর্চা করেন যা নাগরিক সমাজ প্রায় জানেনই না, চেনেনও না। নলিনী বেরা-র মতো অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে উঠে আসা লেখকদের এখানে আসতে লম্বা পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। লক্ষণীয়, মঙ্গলকাব্যে বিক্ষিপ্তভাবে প্রান্তজনের কথা এসেছে। যেমন : মঙ্গলকাব্যের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর লিখলেন ‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ পরবর্তীকালে সাহিত্য-আঙিনায় নিম্নবর্গীয়দের প্রবেশ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বহু শতাব্দী। তাই এই অপাঙক্তেয় অন্ত্যজশ্রেণির ভাষা বা কথামালা নাগরিক সমাজকে চেনাতে এবং বোঝাতে হলে কিছু কথা, শব্দ বা ঘটনার পুনঃপুন ব্যবহার প্রায় অনিবার্য।

এ উপন্যাসের নির্দিষ্ট কোন প্লট নেই, অথচ আছে অগণিত ছোট-বড় টুকরো কাহিনির সমাহার। দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করে বড় হয়ে ওঠা পথের দু’ধার থেকেই সংগ্রহ করেছেন তাঁর লেখার রসদ। প্রকৃতির চেয়ে বড় শিল্পী আর কেউ নেই। তার সত্তাই শিল্পসত্তা, সৃষ্টিই তার শিল্প। তাকে নতুন করে শিখতে হয় না শিল্পের নির্মাণ বিনির্মাণ ভাবনা।

তবে এ উপন্যাসে এক আকর্ষণীয় কোলাজ আছে, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে ‘নলিন’ ওরফে ললিন: কিন্তু আদৌ উচ্চকিত নয় তাঁর উপস্থিতি। লেখক এবং উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাই সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা বইটিকে আমার কাছে পুরোপুরি উপন্যাস মনে হয়নি। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে লেখকের আত্মজীবনী পড়ছি। তবে এটা আত্মজীবনী নয়, উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক ললিন আর লেখক নলিনী বেরা এক কিনা সেই তর্ক ভিত্তিহীন। দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক জে এম কোয়েটজি লিখেছিলেন, ‘অল রাইটিং ইজ অটোবায়োগ্রাফি।’ মানে, প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিক। কিন্তু এ উপন্যাসটি আত্মজীবনী নয়, সেই অর্থে উপন্যাসও নয়, অথচ দু’য়ের মৌলিক উপাদানই সুস্পষ্ট! উপন্যাসে আত্ম-উপাদান তো নিশ্চয়ই আছে। যেমন কখনও নায়কের সঙ্গেই তিনি নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছেন। কখনও মেয়ের চরিত্রে নিজেকে মিলিয়ে দিয়েছেন। কারণ এই সব চরিত্রের প্রতি তাঁর একটা আবেগ বা সংবেদনশীলতা রয়েছে। প্রতিটি লেখকই তাঁর সময় দেশকালের পরিস্থিতি যেমন ছিল সেগুলো ধারণ করে উপন্যাসে ব্যবহার করেন। সেই সঙ্গে তাঁর অবচেতন মনের মাঝে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করেন। যে জগতে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে এবং যেন তাঁরই জীবনের প্রতিরূপ। তাই না চাইলেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লেখকের জীবন তাতে জড়িয়ে থাকে। উৎস-সন্ধানে বিরত হলেও পাঠক রসাস্বাদনে বঞ্চিত হবেন না, এটা নিশ্চিত।

উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এত অসাধারণ উপন্যাস লেখক লিখলেন কী করে! তাঁর জানার এবং জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত এবং উচ্চমার্গীয়। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রী রামায়ণ, মহাভারত, চৈতন্যদেব, পঞ্চপাণ্ডব পাশাপাশি বেশকিছু জ্ঞান ও তথ্যসমৃদ্ধ বইয়ের নামও উঠে এসেছে উপন্যাসের পরতে পরতে। যেমন : ব্যাকরণ কৌমুদী, ভগীরথীর উৎস সন্ধানে, চার বন্ধু চতুর্দ্বীপ, নৈশ অভিযান, শ্রীকান্ত, পথের পাঁচালী, কপলকুণ্ডলা, কালিন্দী, ইত্যাদি। এই বইয়ের মাধুর্য্য বা চমৎকারিত্ব সেখানেই, প্রতিপদেই এই বইটিতে রয়েছে মাটির গন্ধ। আর এর পাশে বয়ে চলে সুবর্ণরেখা! তবে এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় অন্যরকম মাদকতা আছে। একধরনের মুগ্ধতা আছে! ঘোরের মতো টেনে নিয়ে যায়। এছাড়া বাক্যগঠনেও রয়েছে চমৎকারিত্ব! দক্ষতার দারুণ মুন্সিয়ানা আর কাব্যিক সব কারুকাজ। রয়েছে নাটকীয়তাও। উপমা, অলংকার, চিত্রকল্প, বর্ণনাভঙ্গিতে শব্দের গাঁথুনি এবং মেলবন্ধন এককথায় অসাধারণ, অনবদ্য! কাহিনি-পরিকল্পনা, ভাষার ব্যবহার, চরিত্র সৃজনের দক্ষতা ও শিল্প নির্মাণের চমৎকারিত্বে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে অন্ত্যজ বা প্রান্তিক শ্রেণির মানুষদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক, জীবনঘনিষ্ঠ এক অনন্য রচনা। যা সাহিত্যের বিষয়-বাস্তবতা থেকে আহৃত হয়। যা শিল্পসত্তার নৈপুণ্যের পরিচায়ক। শিল্পকৌশল, সৃজনশীলতা, শৈল্পিক নিজস্বতা ও ব্যক্তি-স্বতন্ত্রতার যথেষ্ট ছাপ রয়েছে উপন্যাসটিতে।

 লেখক : প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares