ত্রাতিনা : বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির এক মানবিক উপাখ্যান : দীপু মাহমুদ

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস

ত্রাতিনা  উপন্যাসের কাহিনির শুরু

মহাকাশ থেকে একটি গ্রহকণা সরাসরি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। যদি সেটাকে থামানো না যায়, সেটি আটচল্লিশ ঘণ্টা পর পৃথিবীতে আঘাত করবে। পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে এরকম একটি গ্রহকণা পৃথিবীকে আঘাত করেছিল। পৃথিবীর বুক থেকে তখন ডাইনোসর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। যদি এই গ্রহকণাটি পৃথিবীকে আঘাত করে, তাহলে মানবপ্রজাতি ডাইনোসরের মতো পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

পৃথিবীকে বাঁচাতে বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য রিহা গভীর রাতে সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিলের জরুরি সভা ডেকেছেন। সভায় সকলে উপস্থিত হলে মহামান্য রিহা সংকট ব্যাখ্যা করে জানালেন, ‘তোমাদের সবাইকে এই গভীর রাতে ডেকে আনতে হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে পৃথিবী এর আগে এত বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে মনে হয় না।’

তারপর তিনি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহকণার আঘাতে আটচল্লিশ ঘণ্টার ভেতর পৃথিবী একটি প্রাণহীন গ্রহ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ব্যাখ্যা করলেন। এই মহাসংকট থেকে পৃথিবী রক্ষায় কী করা যেতে পারে সে ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সদস্যদের অনুরোধ জানালেন।

জীববিজ্ঞানী লিয়া বললেন, ‘যদি আমাদের পরিকল্পনা কাজ না করে, তাহলে পৃথিবীটা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে। শেষবার যখন এটা হয়েছিল, তখন ডাইনোসর ধ্বংস হয়ে স্তন্যপায়ী প্রাণী পৃথিবীতে বংশবিস্তার শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্ম নিতে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর সময় লেগেছিল। আমি মনে করি, এবারে সেটা হতে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমি কয়েক হাজার নারী-পুরুষ এবং কয়েক লক্ষ মানব ভ্রুণ সংরক্ষণের পক্ষপাতী। পাহাড়ের গভীরে টানেল খুঁড়ে সেখানে হিমঘরে আমরা এভাবে মানব প্রজাতিকে রক্ষা করব। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার কয়েক বছর পর যখন আবার সেটা মানুষের বসবাসের উপযুক্ত হবে, পৃথিবীর মানুষ তখন আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে। নতুন করে মানবসভ্যতার জন্ম হবে।’

পদার্থবিজ্ঞানী রিশি বললেন, ‘আমার ধারণা, আমরা এইবার পৃথিবী রক্ষা করতে পারব না।’

এইবার কেন পৃথিবী রক্ষা করা সম্ভব হবে না তিনি তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন। তারপর বললেন, ‘কোনো একটি বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে যেভাবে এর একটা পরিবর্তন এনেছিল, এখন আবার সেই পরিবর্তন আনতে চাইছে। কাজেই আমার ধারণা, আমরা এটি থামাতে পারব না।’

মহামান্য রিহা তখন ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘সম্ভবত তোমার সন্দেহ সত্যি। সম্ভবত কোন একটি বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলার প্রস্তুতি হিসেবে এই গ্রহকণাটিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কিন্তু আমি সেজন্যে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব না। আমি পৃথিবীকে রক্ষা করার চেষ্টা করব। সেটি কীভাবে করা যায়, আমি তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব শুনতে চাই।’

বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য রিহার এই কথার পর সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা এমন গভীর সংকট থেকে পৃথিবীকে কেমন করে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন।

পরিবেশ বিজ্ঞানী নিহা বললেন, ‘গ্রহকণাটির কক্ষপথে পরিবর্তন আনতে হবে যেন সেটি পৃথিবীতে আছড়ে না পড়ে। এটি যেন পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।’

কীভাবে তা করা যেতে পারে সে ব্যাপারে জানতে চাইলেন প্রযুক্তিবিদ কিরি।

পরিবেশ বিজ্ঞানী নিহা তার সমাধান দিয়ে জানালেন, ‘আমাদের হাতে দু’টি ভিন্ন পথ খোলা আছে। আমার মনে হয়, আমাদের একই সাথে দু’টি পথেই চেষ্টা করতে হবে। একটি হচ্ছে, পৃথিবী থেকে মিসাইল দিয়ে গ্রহকণাটিকে আঘাত করার চেষ্টা করা। যদি আঘাত করে ধ্বংস করে দিতে পারি, আমাদের বিপদ কেটে যাবে। কিন্তু আমি শুধু এটুকুর উপর ভরসা করতে চাই না। গ্রহকণাটির আকার বিদঘুটে এবং সেটি খুবই বিচিত্রভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে আসছে। মিসাইলটি গ্রহকণাটিকে ঠিকভাবে আঘাত করতে পারবে কী না, আমি সে বিষয়ে তত নিশ্চিত নই। আমার মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় আরেকটা পথে কাজ করতে হবে।’

দ্বিতীয় পথটি হচ্ছে, ‘একটা টিমকে নিউক্লিয়ার বোমাসহ মহাকাশযানে করে পাঠাতে হবে। তারা এই গ্রহণকণার উপর নামবে। সেখানে বোমাটি বসাবে এবং বিস্ফোরণ ঘটাবে। এই কাজটি অসম্ভব কঠিন, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবে কাজ করবে।’

পৃথিবীকে রক্ষায় পরিবেশ বিজ্ঞানী নিহার সমাধানটি সকলের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হলো। তবে পৃথিবী রক্ষার এই অভিযানে যারা যাবে তারা কেউ আর বেঁচে ফিরে আসতে পারবে না। যেটুকু সময় আছে, সেই সময়ে তারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারবে না। যারা যাবে তাদের পৃথিবীর মানুষের কাছ থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে যেতে হবে।

পৃথিবীকে আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার এটি একমাত্র উপায় বিবেচনা করে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হলো। একটা টিম নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে গিয়ে গ্রহকণার উপর নামবে এবং সেখানে বোমা বি¯েফারণ ঘটাবে। তাতে গ্রহকণাটি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পৃথিবী ধ্বংস থেকে রক্ষা পাবে। সকলে মেনে নিল, যারা নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে মহাকাশে যাবে তারা কেউ বেঁচে পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। গ্রহকণাটি ধ্বংসের সময় বোমার আঘাতে তারাও মারা যাবে। এর মানে হচ্ছে এটা একটি সুইসাইড মিশন। এখান থেকে ত্রাতিনা উপন্যাসের কাহিনি শুরু।

পৃথিবীকে বাঁচানোর প্রত্যয়

সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিল কমান্ডার লিকে দায়িত্ব দিয়েছে একটা টিম তৈরি করতে, যে টিম গ্রহকণাটিকে ধ্বংস করতে যাবে।

কমান্ডার লি কুড়িজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারীর মধ্য থেকে গ্রহাণুটিকে ধ্বংস করতে যাওয়ার জন্য একটি টিম করতে বসলেন। তখন সেই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজনের একজন বললেন, ‘আমি এই মিশনে দায়িত্ব নিতে চাই।’

যিনি বললেন তার নাম রায়িনা। তিনি এই মিশনে যেতে চান একা। যুক্তি হিসেবে বললেন, ‘আমি একা গেলে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে পারব। আমাকে তাহলে অন্যের কাজকর্ম নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। অন্যের কাজকর্মের উপর নির্ভর করতে হবে না।’

হাতে থাকা সংক্ষিপ্ত সময় বিবেচনা করে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হলো রায়িনা একা যাবে এই মিশনে।

রায়িনা তার দুই বছর বয়সের কন্যা ত্রাতিনাকে একটি অনাথ আশ্রমে রেখে ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষার মিশনে চলে গেলেন।

রায়িনা যখন গ্রহকণাটির ওপর নামলেন তখন তিনি বুঝতে পারলেন, সেটি আদতে গ্রহকণা নয়―একটি মহাকাশযান। যেটি সত্যি পৃথিবী ধ্বংসের জন্য পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রায়িনা  সেখানে আবিষ্কার করলেন অন্য কোন গ্রহের প্রাণী যারা রায়িনার মস্তিষ্ক থেকে তথ্য নিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল।

খানিক সময়ের মধ্যে একশ কিলোটন থার্মো নিউক্লিয়ার বোমার প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মুহূর্তে মহাকাশযান ভস্মীভূত হয়ে যায় এবং সেইসাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যান রায়িনা।

বেঁচে থাক স্নেহ ভালোবাসা

ত্রাতিনা উপন্যাসের ঘটনার এ পর্যন্ত এসে আমরা দেখি রায়িনা কেবল ভয়াবহ ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষকে রক্ষা করতে চেয়েছেন তাই না, তিনি তার আদরের কন্যা ত্রাতিনাকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

মিশনে যাওয়ার আগে রায়িনা অনাথ আশ্রমে এসেছেন কন্যা ত্রাতিনাকে সেখানে রাখতে। তিনি জানেন, পৃথিবী রক্ষার এই মিশন শেষে তার আর পৃথিবীতে ফেরা হবে না।

উপন্যাসে এখানে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘রায়িনা শান্ত গলায় বলল, “আমি মায়ের দায়িত্ব পালনে কোন অবহেলা করিনি। পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে আনন্দময় সময় ছিল ত্রাতিনার সাথে কাটানো সময়টুকু।” রায়িনা হঠাৎ করে থেমে গেল। রায়িনার ইস্পাতের মতো শক্ত নার্ভ, কিন্তু সে আবিষ্কার করল, সে আর কথা বলতে পারছে না। তার চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে পড়ছে।’

এরপর দেখা যায় উপন্যাসে লেখা আছে, রায়িনা অনাথ আশ্রমের ডিরেক্টর ক্লারাকে একটা ক্রিস্টাল দিয়ে বলে, ‘আমি জানি প্রথম প্রথম ত্রাতিনা আমাকে খুঁজবে, আমার জন্যে কাঁদবে। তারপর সে আস্তে আস্তে আমাকে ভুলে যাবে। বহুদিন পর সে যখন বড় হবে, সে জানতে চাইবে সে কোথা থেকে এসেছে। তার মা কে, বাবা কে, তার পরিচয় কী। তখন তুমি এই ক্রিস্টালটি ত্রাতিনার হাতে দিও। এখানে আমি তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছি। আমার ধারণা, সে যদি এটা শোনে, তাহলে হয়তো তার মাকে সে ক্ষমা করে দেবে।’

 ষোল বছর পর, ত্রাতিনা যখন বড় তখন উপন্যাসে একদিন আমরা দেখতে পাই, ‘ত্রাতিনা ক্রিস্টালটি হাতে নিয়ে বসে আছে। তার হাতে থ্রিডি গগলস। ক্রিস্টালটি ঢুকিয়ে গগলসটি চোখে লাগাতেই সে তার মাকে দেখতে পাবে। মাকে দেখার জন্যে একই সাথে সে নিজের ভেতরে এক ধরনের ব্যাকুলতা এবং পাশাপাশি বিচিত্র এক ধরনের ভীতি অনুভব করছে। কী দেখবে সে ? সে কি সহ্য করতে পারবে ? নাকি ভেঙে পড়বে ?’

শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে সে কাঁপা হাতে ক্রিস্টালটি থ্রিডি গগলসের ছোট স্লটটিতে ঢুকিয়ে ক্লিপটা টেনে দিল। তারপর গগলসটি চোখের উপর লাগিয়ে ত্রাতিনা ট্রেনের সিটে মাথা রাখল। প্রথমে একটা নীল আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। মৃদু একটা যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেল। তারপর হঠাৎ করে সে মাকে দেখতে পেল।

ছোট করে কাটা কুচকুচে কালো চুল। গভীর কালো চোখ, সেই চোখে তীব্র একটা দৃষ্টি। মনে হয়, সেই দৃষ্টি দিয়ে তার মা সবকিছু ঝলসে দেবে। ত্রাতিনা কেঁপে উঠল। দেখল, তার মা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। এটি তার সত্যিকারের মা নয়, এটি তার মায়ের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। তবু ত্রাতিনার মনে হলো সত্যিকারের মা তার দিকে তাকিয়ে আছে। ত্রাতিনা দেখল তার মায়ের ঠোঁট নড়ে উঠেছে। সে তখন তার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, স্পষ্ট গলায় তার মা বলল, ‘ত্রাতিনা, মা আমার। তুই এখন আমার কথা শুনছিস, তার মানে তুই আর আমার ছোট শিশুটি নেই। তুই বড় হয়েছিস। ভালো আছিস মা ?’

ত্রাতিনা জানে, এটি তার সত্যিকারের মা নয়। শুধুমাত্র তার মায়ের প্রতিচ্ছবি। তারপরও সে ফিসফিস করে বলল, ‘হ্যাঁ মা। ভালো আছি। খুব ভালো আছি।’

‘ত্রাতিনা মা, তুই নিশ্চয় আমার উপর অনেক অভিমান করে আছিস। তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস, আমি কেমন করে তোকে একটা অনাথ আশ্রমে রেখে চলে গেলাম। মা হয়ে কেমন করে সন্তানকে ছেড়ে গেলাম! তাই না ?’

‘কিন্তু মা আমার, সোনা আমার! বিশ^াস কর, তোকে এই পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আমি গিয়েছি। পৃথিবীটা কত সুন্দর, তুই এখনও দেখিসনি মা, আমি দেখেছি। মহাকাশে আমি রাতের পর রাত মুগ্ধ হয়ে নীল পৃথিবীটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই পৃথিবীটাতে তুই যেন বেঁচে থাকতে পারিস, তোর মতো আরও লক্ষ কোটি মানুষ যেন বেঁচে থাকতে পারে সে জন্যে আমি গিয়েছি। আমার উপর রাগ করে থাকিস না মা। দোহাই তোর।’

ত্রাতিনা ফিসফিস করে বলল, ‘না, মা। আমি তোমার উপর রাগ করি নাই।’

‘ত্রাতিনা মা আমার, আমার হাতে সময় নেই। একেবারে সময় নেই। আমার এখনই তোকে নিয়ে অনাথ আশ্রমে যেতে হবে। আমি নিজে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি। আমি জানি, সেখানে অনেক ভাইবোনকে নিয়ে বড় হওয়া যায়। সবাই মিলে বিশাল একটা পরিবার হয়, সেখানে সবাই সবার আপনজন। তুই নিশ্চয়ই আপনজনদের নিয়ে বড় হয়েছিস, তাই না মা ?’

ত্রাতিনা মাথা নাড়ল। ফিসফিস করে বলল, ‘হ্যাঁ মা। আমি আপনজনদের মাঝে বড় হয়েছি।’

‘তুই এখন বড় হয়েছিস―কতটুকু বড় হয়েছিস, সেটা তো জানি না। তোর মাথায় কি ঘন কালো চুল। তোর চোখগুলো কি গভীর কালো ? তোর কোন বিষয় পড়তে ভালো লাগে ? বিজ্ঞান ? গণিত ? সাহিত্য ? গান শুনিস তুই ? কার গান শুনতে ভালো লাগে তোর ?’

ত্রাতিনা দেখল, তার মা হঠাৎ থেমে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘আমার এখন যেতে হবে মা। আমি যাই ? তোকে কি একটিবার আমার বুকে চেপে ধরতে পারব ? শক্ত করে চেপে ধরে রাখব, যেন তুই চলে যেতে না পারিস…’

ত্রাতিনা দেখল, তার মা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকে, কোনভাবে সে নিজেকে সামলাতে পারে না।

হঠাৎ সে অনুভব করল, কেউ তার মাথায় হাত রেখেছে। ত্রাতিনা চোখ থেকে গগলস খুলে তাকাল। সামনের সিটে বসে থাকা বয়স্ক মহিলাটি তার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ‘সোনামনি মনে হচ্ছে কোনও কিছু দেখে তুমি খুব বিচলিত হয়েছ। আমি কি কোনভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি ?’

ত্রাতিনা মাথা নাড়ল। বলল, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে কেউ সাহায্য করতে পারবে না। কেউ না।’

বয়স্ক মহিলা গভীর স্নেহে ত্রাতিনার হাতটি ধরে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

বিবর্তনের জটিল রূপ মানুষ

ত্রাতিনা উপন্যাস পাঁচটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বের ষোল বছর পর দ্বিতীয় পর্বের শুরু। তার চার বছর পর তৃতীয় পর্ব। আরও দশ বছর পর চতুর্থ পর্ব আর তার বারো বছর পর শেষ পর্ব।

কুড়ি বছর আগে বিজ্ঞান একাডেমি জেনেছিল, পৃথিবী ধ্বংসের জন্য যে গ্রহকণাটি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছিল সেটি ছিল মহাজাগতিক কোন এক প্রাণীর মহাকাশযান―রায়িনা নিজের জীবন দিয়ে যে মহাকাশযান ধ্বংস করে পৃথিবী বাঁচিয়েছিল। তারপর বিজ্ঞান একাডেমি সেই মহাজাগতিক প্রাণীর অস্তিত্ব অনুসন্ধান করেছে। তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে।

কুড়ি বছর পর বিজ্ঞান একাডেমি পৃথিবীর মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সেই মহাজাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমবারের মতো পৃথিবীর মানুষ যাবে মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য এক অনিশ্চিত অভিযানে। সেটা হতে পারে সাধারণ যোগাযোগ, আবার সেখানে সংঘর্ষও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা বিজ্ঞান একাডেমি জানে না।

 সেই অভিযানে যাচ্ছে একমাত্র মানুষ ত্রাতিনা। তার সাথে থাকবে দুজন এনড্রয়েড, রুখ আর গিসা। যারা দেখতে হুবহু মানুষের মতো তবে মানুষ না, যন্ত্র। তাপ-চাপ, রেডিয়েশন কিংবা পরিবেশের তারতম্য হলে মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু এনড্রয়েড কিংবা সাইবর্গ অত্যন্ত কঠোর পরিবেশেও টিকে থাকতে পারবে।

অভিযানে যেতে সময় লাগবে বারো বছর। অভিযান শেষ করে ফিরে আসতে সময় লাগবে আরও বারো বছর। চব্বিশ বছরের এক অসম্ভব অভিযানে মহাকাশযান পেপিরাতে করে রওনা হলো ত্রাতিনা দুজন এন্ড্রয়েডকে সাথে নিয়ে।

একসময় তারা মহাজাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হলো এবং তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করল। তখন হঠাৎ পুরো মহাকাশযান অন্ধকার হয়ে গেল। মহাকাশযানের ইঞ্জিন থেমে গেল। সুনসান নীরবতা নেমে এসেছে মহাকাশযানে। ত্রাতিনা বুঝতে পারল, মহাজাগতিক প্রাণী তাদের সাথে যোগাযোগ করছে।

মহাজাগতিক প্রাণী যোগাযোগের শুরুতেই মহাকাশযানের প্রত্যেকটা যন্ত্র অচল করে দিয়েছে। তাতে সঙ্গে আনা দু’জন এনড্রয়েড অচল হয়ে গেছে।

খানিকবাদে ত্রাতিনা অনুভব করল, কেউ একজন তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তারপর অনুভব করল, শরীরের ভেতর কিছু একটা ঢুকে গেছে এবং সেটি নড়ছে। হঠাৎ করে শরীরের একটা অংশ কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে, তারপর আবার হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠছে। অনুভূতিটি নিচ থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকল। ত্রাতিনার আচমকা মাথা ঘুরে উঠল। তার অসংখ্য স্মৃতি মাথার ভেতর ভেসে উঠল।

ত্রাতিনা বুঝতে পারল, মহাজাগতিক প্রাণী তার মস্তিষ্ক নিয়ে খেলছে। সে ভয় না পেয়ে নিজেকে শক্ত রাখতে চাইল। শক্ত রাখতে পারল না। এক ধরনের আতঙ্কে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। ত্রাতিনা ঘুটঘুটে অন্ধকারে একবিন্দু আলোর জন্য হাহাকার করতে করতে জ্ঞান হারাল।

তখন মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে ত্রাতিনার কথা হলো। তারা ত্রাতিনার মস্তিষ্কে ঢুকে সমস্ত তথ্য নিয়েছে। ত্রাতিনা বলল, ‘তাহলে আমরা পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারি ?’

কোন উত্তর নেই। ত্রাতিনা চিৎকার করে বলল, ‘তাহলে আমরা কি পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারি ?’

এবারও কোনও উত্তর নেই। ত্রাতিনা চিৎকার করে বলল, ‘কথা বল। ফিরে যেতে পারি ?’

‘যখন সময় হবে।’

‘কখন সময় হবে ?’

কোন উত্তর নেই। ত্রাতিনা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কখন সময় হবে ?’ এবারও কোনও উত্তর নেই।

ত্রাতিনা আবার গভীর শূন্যতায় ডুবে গেল। হাত দিয়ে কিছু একটা ছোঁয়ার চেষ্টা করল। স্পর্শ করার কিছু নেই।

একসময় ত্রাতিনার জ্ঞান ফিরল। সে টলতে টলতে লাউঞ্জের দিকে হেঁটে গেল। লাউঞ্জের ভেতরে ঢুকে আর্ত চিৎকার দিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকল। ত্রাতিনা দেখল, লাউঞ্জের মেঝেতে তার মৃতদেহ পড়ে আছে। নিখুঁতভাবে তৈরি দেহ। শুধু মাথায় কোন মস্তিষ্ক নেই।

ত্রাতিনা অনুমান করল, মহাজাগতিক প্রাণীর মানুষ দরকার, যন্ত্র নয়। যে কোনও বুদ্ধিমান প্রাণী হচ্ছে কৌতূহলী। বুদ্ধিমান প্রাণী সবকিছু জানতে চায়। মহাজাগতিক প্রাণী মহাকাশযানের সবকিছু জেনে গেছে। তার কাছে এখন যন্ত্রপাতি তুচ্ছ। তাই সে মহাকাশযানের সব যন্ত্র অচল করে দিয়েছে, আবার সচল করেছে। যন্ত্র নিয়ে তাদের কোন কৌতূহল নেই। তাদের কৌতূহল মানুষ নিয়ে।

মহাজাগতিক প্রাণী মানুষের মস্তিষ্ক চায়। সেটা বিশ্লেষণ করতে চায়। তারা মানুষ তৈরি করার চেষ্টা করেছে। ত্রাতিনাকে নিখুঁতভাবে বানিয়েছে। দেহের খুঁটিনাটি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করেছে। শুধু মস্তিষ্ক বানাতে পারেনি। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে জটিল যন্ত্র। এখানে একশ বিলিয়ন নিউরন আছে। একটি নিউরন অন্য দশ হাজার নিউরনের সাথে যুক্ত থাকে। প্রতি মুহূর্তে সিনাপ্স সংযোগ হচ্ছে।

অটুট থাক মানবিকতা

ত্রাতিনা উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মানবিকতা। উপন্যাসের তৃতীয় পর্বে এসে দেখা যায়, ত্রাতিনাকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। একটা স্কাউটশিপ মহাকাশযান পেপিরাকে ধরার চেষ্টা করছে বলে জানায় রুখ আর গিসা।

ত্রাতিনা কন্ট্রোল প্যানেলে গিয়ে দেখে একটা স্কাউটশিপ বা অদ্ভুত ধরনের মহাকাশযান পেপিরার দিকে ছুটে আসছে। সেটাকে ঠিক মহাকাশযান বলা যায় না। বিচিত্র কিছু যন্ত্রপাতি জুড়ে দিয়ে কিছু একটা দাঁড় করানো হয়েছে। ত্রাতিনার মনে হলো, এই মহাকাশযান যেভাবে আসছে তাতে সে সরাসরি পেপিরার সাথে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাতে মহাকাশযান পেপিরার যেটুকু ক্ষতি হবে, সেটা সারিয়ে নেওয়া যাবে কিন্তু ওই মহাকাশযানের রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় থাকবে না।

এনড্রয়েড রুখ আর গিসা এটাকে মহাজাগতিক জঞ্জাল বলে ধ্বংস করে দিতে চাইল। ত্রাতিনা খেয়াল করেছে, ওই মহাকাশযানটির অংশ খানিকটা করে ভেঙে ফেলে দিয়ে তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মানে মহাকাশযানের ইঞ্জিন কাজ করছে না। সেটা এক ভয়াবহ বিপদে পড়েছে। সেটা এখন পেপিরার সমান্তরালে যাচ্ছে।

ত্রাতিনা সিদ্ধান্ত নেয়, সে ওই ধ্বংসপ্রাপ্ত মহাকাশযানটিকে পেপিরার ভেতরে ঢুকিয়ে নেবে। রুখ আর গিসা তাতে বাধা দিয়ে বলে, ‘কী বলছ তুমি! এটা দ্বিতীয় মাত্রার বিপজ্জনক পরিস্থিতি।’

ত্রাতিনা বলল, ‘না। এটা একেবারে প্রথম মাত্রার বিপজ্জনক পরিস্থিতি। এই বিচিত্র মহাকাশযানটার ভেতরে একজন মানুষ রয়েছে। আমাদের তাকে উদ্ধার করতে হবে। যে কোনও মূল্যে―’

মানুষের ৯৮ ভাগ গুণাবলী দিয়ে তৈরি এনড্রয়েড রুখ আর গিসা। তারা আর দুইভাগ মানবিক গুণাবলী পূরণ করে এতদিন নিজেদের পুরোপুরি মানুষ বানানোর চেষ্টা করেছে। রুখ আর গিসা বলল, ‘কিন্তু!’

ত্রাতিনা হাসল। বলল, ‘তোমরা পুরোপুরি মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছ। পুরোপুরি মানুষ হওয়ার এটা প্রথম শর্ত ―অন্য একজন মানুষকে বাঁচাতে হয়। যে কোন মূল্যে। যাও, তোমরা পেপিরার লোডিং ডক খুলে দাও। আমি কন্ট্রোল প্যানেলে আছি।’

ত্রাতিনা তার মহাকাশচারী জীবনের পুরো অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বিচিত্র মহাকাশযানটিকে পেপিরার ভেতরে নিয়ে এলো। দেখল, মহাকাশযানের ভেতরে ছিন্নভিন্ন পোশাকে একজন মানুষ যন্ত্রপাতির নিচে চাপা পড়ে আছে। ত্রাতিনা তাকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া মহাকাশযান থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করল। সেই মানুষটির নাম গ্রাহা। সে একজন প্রথম শ্রেণীর মহাকাশচারী। তিন বছর আগে বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদ ইউরোপাতে একটি অভিযানে এসেছিল। দুর্ঘটনাক্রমে একটা উল্কার আঘাতে তাদের মহাকাশযানের মূল ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়া তারা জরুরি ভিত্তিতে ইউরোপাতে নেমে পড়ে। মহাকাশযানের কেউ বাঁচেনি। অদ্ভুতভাবে গ্রাহা বেঁচে আছে।

মহাকাশযানের মূল যোগাযোগ মডিউল নষ্ট হয়ে গেছে বলে পৃথিবীর সাথে আর যোগাযোগ করতে পারেনি গ্রাহা। বিশাল উপগ্রহে একাকী বাকি জীবন কাটানোর দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সে বিধ্বস্ত মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগিয়ে এই মহাকাশযানটি বানিয়ে ফেলে। যা নিয়ে মহাকাশে ওড়া মানে নিজ মৃত্যুকে মেনে নেওয়া।

ত্রাতিনা তার অভিযানের কথা জানাল। এটা একটা অনিশ্চিত যাত্রা তা গ্রাহা বুঝতে পারল। গ্রাহা কীভাবে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারে ত্রাতিনা আলোচনা করল। পৃথিবীতে গ্রাহার স্ত্রী আর কন্যা আছে। গ্রাহা যখন এই অভিযানে রওনা হয়েছে তখন তার কন্যার বয়স ছিল একবছর।

ত্রাতিনা বলল, ‘আমাদের এই মহাকাশযান পেপিরার ভবিষ্যৎ কী, কেউ জানে না। আমি পৃথিবীতে প্রাণে বেঁচে ফিরে যেতে পারব কিনা জানি না। যদি প্রাণে বেঁচে ফিরে যেতেও পারি, তাহলে সেটি হবে আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর পর। বাইশ বছর অনেক দীর্ঘ একটি সময়। কাজেই তোমাকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানোর জন্যে এখনই আমাদের কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।’

গ্রাহা রাজি হয় না। সে মহাজাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার অভিযানে ত্রাতিনার সঙ্গে থাকতে চায় এবং থেকে যায়।

মহাকাশযান পেপিরা যখন সত্যিকারেই মহাজাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হয় তখন বোঝা যায়, তারা মানুষের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে দেখতে চায়। সেজন্য তাদের একজন মানুষ দরকার। ত্রাতিনা তখন গ্রাহাকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে বলে। সে বলল, ‘একটা ক্যাপসুলে ঢুকিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে মহাকাশযান থেকে বাইরে ছুঁড়ে দিও। আমি নিশ্চিত, তাহলে মহাজাগতিক প্রাণী পেপিরাকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে দেবে।’

গ্রাহা কিছু বলল না। ত্রাতিনা বলল, ‘আমার মা পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্যে প্রাণ দিয়েছে। এবারে আমার পালা। আমার মা যে কাজটি শুরু করেছিল, আমি সেটি শেষ করব।’

গ্রাহা জানাল, যে পানীয় সে ত্রাতিনাকে খেতে দিয়েছে তার ভেতর রিটিলিন মিশিয়েছে। এতে ত্রাতিনা কিছুক্ষণের ভেতর পুরোপুরি অবসন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। তখন গ্রাহাকে একটি ক্যাপসুলে ঢুকিয়ে মহাকাশে ছেড়ে দিতে আর মহাকাশযান পেপিরার মুখ পৃথিবীর দিকে করে নিতে হবে। মহাজাগতিক প্রাণী যখন পেপিরাকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে দেয় তখন যেন তারা পৃৃথিবীতে ফিরে যায়।

ত্রাতিনার দিকে তাকিয়ে গ্রাহা বলল, ‘আমি জানি তুমি পেপিরার কমান্ডার হিসেবে নিজেকে মহাজাগতিক প্রাণীর হাতে তুলে দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠাবে। তাই আমাকে এইটুকু অপরাধ করতে হলো। মহাকাশযানের কমান্ডারকে গোপনে রিটিলিন খাইয়ে অবচেতন করা অনেক বড় অপরাধ, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আমি সেই অপরাধটুকু করেছি। জেনে শুনে করেছি। এটি না করে তোমাকে আমি পৃথিবীতে ফেরত পাঠাতে পারতাম না। তুমি কিছুতেই এটা করতে দিবে না। তুমি তোমার মায়ের মতোই একজন আপাদমস্তক মহাকাশচারী।’

উপন্যাসের এখানে দেখা যায় দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। মানবিকতার এমন উপস্থাপন আমাদের মুগ্ধ করে। নিজেকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রবল ইচ্ছা নিজের ভেতর তৈরি হয়।

এর সাথে গ্রাহা বলে, ‘আমি জানি তুমি চাইছ আমি যেন প্রথিবীতে গিয়ে আমার মেয়ের সাথে মিলিত হই। তাকে দেখি, তার সাথে কথা বলে সময় কাটাই। ত্রাতিনা, আমি আমার মেয়ের সাথে মিলিত হয়েছি। দেখা করেছি, তার সাথে কথা বলেছি, কারণ তুমি হচ্ছ আমার সেই মেয়ে। পৃথিবীতে আমার আরও একটি মেয়ে আছে। ক্লিয়া। সম্ভব হলে তুমি ক্লিয়ার সাথে দেখা করো। সেই মেয়েটিকে আমার হয়ে আলিঙ্গন করো। তাকে বলো, আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সৌর জগতের শেষ প্রান্তে একটি ক্রোমিয়াম ক্যাপসুলের ভেতর থেকে আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। তাকিয়ে থাকব।’

সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসার এক অনিন্দ্য সুন্দর ছবি আমরা ত্রাতিনা উপন্যাসে দেখতে পাই। যা আমাদের স্নেহের অটুট বন্ধনে বেঁধে রাখতে উৎসাহ দেয়। আমাদের ভেতর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে। 

ত্রাতিনা যখন ঘুমে অচেতন হয়ে আসে তখন গ্রাহা ত্রাতিনার মাথায় হাত বুলিয়ে গভীর মমতায় বলে, ‘পৃথিবীতে ফিরে যাও মা, মহাকাশের জগতে তোমার প্রয়োজন নেই। ত্রাতিনা মা আমার, তোমার প্রয়োজন পৃথিবীতে।’

শেষ পর্ব

ত্রাতিনা উপন্যাসের শেষ পর্বে এসে আমরা অসাধারণ দায়িত্ববোধের দেখা পাই এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে দেখি। এখানে ত্রাতিনা উপন্যাসের ‘শেষ পর্ব’ হুবহু তুলে দেওয়া হলো।

বাইভার্বাল থেকে নেমে ত্রাতিনা মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে ছোট বাসাটার দিকে এগিয়ে যায়। গাছপালা ঢাকা মেঠো পথ, গাছগুলোতে পাখি কিচিরমিচির করছে।

ত্রাতিনা সিঁড়ি বেয়ে উঠে বাসার দরজায় শব্দ করল। কয়েক মুহূর্ত পরে দরজাটি খুলে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটি মেয়ে বের হয়ে এলো। মেয়েটি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ত্রাতিনার দিকে তাকায়। ত্রাতিনা নরম গলায় বলে, ‘আমার নাম ত্রাতিনা। তুমি নিশ্চয়ই ক্লিয়া ?’

মেয়েটি মাথা নাড়ল। বলল, ‘হ্যাঁ।’

ত্রাতিনা বলল, ‘তোমার বাবা গ্রাহা একজন খুব দুঃসাহসী মহাকাশচারী ছিল।’

ক্লিয়া একটু অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কেমন করে জান ?’

‘আমি জানি, কারণ আমিও একজন মহাকাশচারী। তোমার বাবার সাথে আমার একটি মহাকাশযানে সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল।’

ক্লিয়া ত্রাতিনার হাত ধরে বলল, ‘তুমি কি একটু ভেতরে আসবে ? আমার বাবার কথা একটু বলবে ?’

‘হ্যাঁ বলব। আমি সেজন্যেই এসেছি। তার আগে আমি কি তোমাকে একবার আলিঙ্গন করতে পারি ? তোমার বাবা তার জীবনের শেষ মুহূর্তটিতে আমাকে বলেছিল, আমি যেন তোমাকে তার হয়ে একবার আলিঙ্গন করি।’

ক্লিয়া কোন কথা না বলে ত্রাতিনাকে জড়িয়ে ধরল। ত্রাতিনা ফিসফিস করে বলল, ‘আমি যেন পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারি, সেজন্যে তোমার বাবা তার জীবন দিয়েছিল। তুমি যেরকম তোমার বাবার সন্তান, আমি ঠিক সেরকম তার আরেকজন সন্তান।’

ঘরের দরজায় দুইটি তরুণী একে অপরকে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে থাকে। দুইজন এর আগে কখনও একজন আরেকজনকে দেখেনি। কিন্তু দুইজনই হঠাৎ করে বুঝতে পারে, তারা একজন আরেকজনের খুব আপনজন।

ত্রাতিনা উপন্যাস সম্পর্কে চূড়ান্ত মত

ত্রাতিনা উপন্যাস পাঠককে যেমন দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে তেমনি এখানে মানবিকতার এক প্রতিফলন পাওয়া যায়। ত্রাতিনা উপন্যাস পাঠের পর পাঠক নিজেকে একজন আপাদমস্তক মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাড়না অনুভব করে। এখানে ভালোবাসার আবেগকে অনেক যত্ন করে তুলে ধরা হয়েছে। যা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়।

আমরা দেখি, মহাকাশযান পেপিরাতে গ্রাহা আসার পর ত্রাতিনা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করে গ্রাহার কন্যা ক্লিয়ার ছবি সংগ্রহ করেছে। গ্রাহা অপলক দৃষ্টিতে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। হলোগ্রাফিক ছবি স্পর্শ করা যায় না জেনেও গ্রাহা ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় হলোগ্রাফিক ছবির দিকে কন্যাকে স্পর্শ করবে বলে। ছবির ভেতর দিয়ে তার হাত বের হয়ে আসে। চোখে পানি জমে গ্রাহার। সেই পানি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে গালে।

ত্রাতিনা বলে, ‘গ্রাহা! আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি তোমাকে আমি তোমার মেয়ের কাছে পৌঁছে দেব। হলোগ্রাফিক ছবি নয়, তুমি তোমার রক্ত মাংসের মেয়ের মাথায় হাত বুলাবে।’

উপন্যাসে লেখক অসাধারণভাবে এই ভালোবাসার জায়গাটি তুলে এনেছেন। গ্রাহা ত্রাতিনাকে নিজের আরেকজন মেয়ে বলে মেনে নেয়। ত্রাতিনাকে সে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তাকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানোর আগে গ্রাহা গভীর মমতায় ত্রাতিনার মাথায় হাত বুলায়। পিতা তার সন্তানকে আদর করে। লেখক এখানে সন্তানের স্নেহকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যা অন্যের প্রতি আমাদের সহনশীল ও স্নেহশীল করে তোলে।

ত্রাতিনা উপন্যাস আমাদের ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহস জোগায়, আমাদের আত্মবিশ^াসী ও আত্মমর্যাদাশীল হয়ে উঠতে সাহায্য করে―যে উপন্যাস মানুষের মর্যাদাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

ত্রাতিনা উপন্যাসের লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে অভিনন্দন এমন উপন্যাস লেখার জন্য যা প্রজন্মকে নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তোলে। পৃথিবীর প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহ দেয়।

লেখক : বিজ্ঞান লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares