অর্থ ও নিহিতার্থের জাদুকরী ক্যামুফ্লাজ : ফিরোজ এহতেশাম

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-কাব্যগ্রন্থ

‘তাঁর কবিতা আমাকে দেয় বীভৎস রস, কালো জাদু, বঙ্কিম সৌন্দর্য চেতনা, প্রচলিত নন্দনের বিপরীতে এক নতুন নন্দন।’

অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে, জুয়েল মাজহারের কোনও একটা কবিতা পড়ে আমি বেশ কিছুকাল আগে প্রায় এ ধরনের মন্তব্য করেছিলাম। ওই বাক্যটা থেকে যেসব অনুভূতি উৎসারিত হয়, সেসব অনুভূতিই যেন আরও বিস্তারিত আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম তাঁর কবিতার বই রাত্রি ও বাঘিনী পড়ে। কবিতাগুলোর রচনাকাল ২০১৭ থেকে ২০১৯। প্রচ্ছদ অনাড়ম্বর ও সুন্দর।

ভূমিকা বা উৎসর্গপত্রের মতো রাত্রি ও বাঘিনী কবিতাটা পড়েই নড়েচড়ে বসতে হয়। এটা বাঘিনীর অতিরিক্ত রতি-আক্রমণের শিকার এক অসহায় অতি ছোট জীবের কবিতা। অথচ আপনার মনে হবে প্রতীক ও রূপকের আড়ালে তিনি আসলে অন্য কিছু বলছেন। ফলে সেই বাঘিনীর ওপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করতে হয়তো আপনার তেমন দ্বিধা হবে না। আপনি যে ব্যতিক্রমী এক ভাববিশ্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন এই কবিতাটা যেন আপনাকে সেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

শব্দের মূল বা সাধারণ অর্থ ও নিহিতার্থ নিয়ে যেমন জুয়েলের খেলা হরহামেশাই, তেমনি পুরো একটা কবিতার ক্ষেত্রেও অনেক সময় তিনি এই কর্মকাণ্ড জারি রাখেন। সেসব কবিতা পড়তে পড়তে পাঠকের প্রাথমিকভাবে যে ধারণা জন্মাতে থাকবে বা যে অর্থ তিনি গড়ে তুলতে থাকবেন নিজের ভেতর-পাঠ শেষে হয়তো তা রূপান্তরিত হয়ে ভিন্ন অর্থ নিয়ে উদিত হবে তার সামনে। অর্থ ও ভাবের এ যেন এক জাদুকরী ক্যামুফ্লাজ । তাঁর কবিতার ফাঁদে কাম খুব সাবলীলভাবে ধরা দেয়, নাকি তাঁর কবিতা কামের ফাঁদে পড়তে উদগ্রীব থাকে, আমি তা জানি না। আমি সাধারণ পাঠকমাত্র, এসব লীলার মর্ম কী প্রকারে জানব ? তবে বড় সন্দেহ হয় তারা হরিহর আত্মা, তারা পরিপূরক। ‘রাত্রি ও বাঘিনী’ ও ‘সিঁড়িঘর’ কবিতা দুটি এর উৎকৃষ্ট নমুনা। আতঙ্ক, ভয়, শিহরণ আর গা ছমছমে আধিভৌতিক অনুভূতি কিংবা বীভৎসরসও যে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে তার উদাহরণ দেখি জুয়েল মাজহারের কিছু কবিতায়। ‘নিজের প্রেতের সঙ্গে’ তেমনই একটা কবিতা। এসব কবিতা আপনাকে শুধু ভয়ের অনুভূতিই দেয় না, অভিনব দৃশ্যকল্প ও ভাবনার সৌন্দর্যের জন্য তা আপনার ভালোও লাগে। অর্থাৎ জুয়েল আপনাকে এত সুন্দর করে ভয় দেখান যে আপনি ভয়ের প্রেমে পড়ে যান, তা আপনাকে আকৃষ্ট ও প্রলুব্ধ করতে থাকে।

তাঁর কবিতায় ভূত, প্রেত, ডাইনি, দৈত্য, পিশাচ, দানব, শয়তানের মতো চরিত্রগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল যাতায়াত। এমনকি কখনও কখনও তারা তাদের প্রচলিত নেতিবাচক ভাবমূর্তির বিপরীতে ইতিবাচক হয়ে ধরা দেয়। ‘প্রতিবেশী’ কবিতায় মাঠের ওপারে এক গ্রামে ভূতে ও মানুষে মিলে বসবাস করে। তারা সৎ প্রতিবেশী হিসেবে মিলেমিশে থাকে। ভূতের বাড়িতে মানুষ নিমন্ত্রণ পায়। ভূতের লাজনম্র সোমত্ত মেয়েরা তাদের মৃদু হেসে আপ্যায়ন করে। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, প্রেমের সম্পর্ক। আমাদের অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের ভিতর গড়ে ওঠা আরেকটা সমান্তরাল অদৃশ্য জগত, যা আমরা অনেকেই নিরেট বাস্তব জগতের পাশাপাশি বহন করে চলি, তারই প্রতিসরিত তীর্যক রূপের বাস্তবায়ন দেখি এই কবিতায়। অনুষঙ্গ চেনা কিন্তু উপস্থাপন বঙ্কিম। অর্থাৎ পরিচিত উপাদান দিয়ে গড়া অথচ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ভাসিত একটা গল্প পাই কবিতায়। অনেক কবিতার জমিনে তিনি এভাবে গল্প বুনে দেন। বিপরীতধর্মী ভাব ও অনুভূতির ঐক্য, উল্লিখন ও তার পুননির্মাণ, নতুন নতুন চিত্রকল্প, নিসর্গের বহুরৈখিক উন্মীলন, দেশজ ও বৈশ্বিক ঐতিহ্য, নিজস্ব দর্শন, সময় ও ইতিহাস চেতনা, রাজনীতি, মিথ-পুরাণের বিনির্মাণ, বক্রোক্তি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা স্যাটায়ার, তুরীয় বিস্ময় প্রভৃতি তাঁর কবিতায় সাবলীল দক্ষতায় তিনি ফুটিয়ে তোলেন।

তাঁর ভাষা সহজ অথচ বহুস্তর। কখনও প্রহেলিকাময়। তবে তা পাঠকের সাথে যোগাযোগের প্রশ্নে অনেক বেশি সক্ষম। ছন্দে স্বচ্ছন্দ, প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষায় দক্ষ, আঙ্গিক সচেতন এই কবি ভাষা নিয়ে নানা নিরীক্ষাও করেন। যেমন ‘খোমা’, ‘রাইতের নীল ডহরে’, ‘ফিরে আয় কালাচান’, ‘চিরাং বাজারে কান্দে চান্দ সদাগর’ বা ‘বিলজিবাব’ এর মতো কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বইয়ের মধ্যে ভিন্নরকম ধ্বনিমাধুর্য ও স্বাদ যুক্ত করে। তাঁর ভাষার ক্যাজুয়ালিটি ও ভাবের বহুমাত্রিকতার কন্ট্রাস্ট সম্ভব করে তোলে এক নতুন ধরনের রসায়ন। পাশাপাশি ‘ফিরে আয় কালাচান’-এ মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ৭/৭-এর চাল কবিতাকে দান করে অদ্ভুত সুষমা। কবিতাটি গ্রাম থেকে নগরজীবনে আসা মানুষকে স্মৃতিকাতর করে তুলতে পারে। সম্ভবত আত্মজৈবনিক এই কবিতায় (যদিও এক অর্থে সব কবিতাই আত্মজৈবনিক) কবির শৈশবের গ্রাম তার নানা অনুষঙ্গসহ ছোট ছোট গল্প বা গল্পের ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। সেই শৈশবের দৃশ্যগুলো দেখবার লোভে সেখানে ফিরে যাওয়ার আকুতির পাশাপাশি সেসব দৃশ্য বর্তমানে আর না থাকার হাহাকার নৈর্ব্যক্তিক ও সার্বজনীন বেদনা হয়ে পাঠক-হৃদয়ে অনুরণন তুলতে থাকে।

সঙ্গত কারণেই রাত্রি ও বাঘিনী-র ২৫ কবিতার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা ‘ফিরে আয় কালাচান’। পড়তে পড়তে ক্লান্তিবোধ তো হয়ই না বরং মনে হয় আরও একটু দীর্ঘ যদি হতো কবিতাটা তবে পাঠের আনন্দটা আরও প্রলম্বিত হতো। তবে জুয়েল জানেন কতখানি প্রকাশ আর কতটা উহ্য রাখতে হবে, কোন স্থানে অশ্ব ছুটিয়ে কোন জায়গায় থামতে হবে। কোথা রতি আর কোথায়-বা বিরতি। এই পরিমিতিবোধ তাঁর কবিতাকে সুসংগঠিত, সংহত ও ঘনবদ্ধ হতে সাহায্য করে। বই এর কোনও কবিতাই ছন্দছাড়া নয়। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত―প্রতিটি ছন্দেই কবিতা লিখেছেন তিনি। অক্ষরবৃত্তেই বেশি। আছে অক্ষরবৃত্তের মহাপয়ারে লেখা ‘সিঁড়িঘর’, ‘অতিরিক্ত প্রহরের মোম’। মাত্রাবৃত্তের ৬-৬-২-এ লেখা ‘নিশিডাক’, ৫-৫-৫-২-এ ‘লাল মেঘের ইশতেহার’। স্বরবৃত্তের ২/১-৪-এ ‘পিগমি হেন এই টরসো আমার’। আছে মুক্ত ছন্দও, যেমন ‘গোলাপের জন্ম’, ‘খোমা’, ‘রাইতের নীল ডহরে’, ‘দ্য মুন টেস্টামেন্ট’। মাঝে মাঝে এসব মুক্ত ছন্দেও এসে পড়ে অক্ষরবৃত্তের চোরাটান। কখনও-বা কবিতার প্রয়োজনে ভেঙেছেন ছন্দের প্রচলিত চাল। যার মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে নতুনতর দ্যোতনা ও ব্যঞ্জনা। কবিতার আঙ্গিক ও প্রকরণ নিয়েও তিনি নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত ও স্বতঃসিদ্ধ ভাবনা কিংবা দর্শন প্রক্রিয়ার শৃঙ্খলকে ভেঙে তিনি পুনরায় এমনভাবে জোড়া দেন যেন তা ভিন্ন মাত্রাযুক্ত নতুন কোন বন্ধনের জন্ম দেয়। কবি আল মাহমুদ স্মরণে ‘গোলাপের জন্ম’ কবিতাটি যেমন বাস্তব ও পরাবস্তব জগতের মধ্যে এক অনির্বচনীয় অনুভূতি নিয়ে দুলতে থাকে পেন্ডুলামের মতো―। আর এভাবেই তিনি নির্মাণ করে তোলেন এক নবতর কাব্য-পরিমণ্ডল। এসব কৃৎকৌশল আর অন্তর্নিহিত সূক্ষ্ম কারুকাজের সুষম বিন্যাসের মধ্য দিয়ে জুয়েল মাজহারের কবিতাকে, কবিতার শক্তিকে আলাদা করে শনাক্ত করা যায়।

আবার নিত্য জীবনযাপনের অনুষঙ্গ থেকে কিভাবে ছেনে আনা যায়, চয়ন করা যায় কবিতাকে তার একটা উদাহরণ ‘ব্যক্তিগত গরল, অমৃত’। স্রেফ মদ্যপানের বর্ণনা দিতে গিয়ে তা কীভাবে কবিতা হয়ে ওঠে সেটা লক্ষ্য করার মতো একটা ঘটনা। তখন বোঝা যায় জুয়েলের কবিসত্তা যেন একটা প্রিজম, যার মধ্য দিয়ে বিচ্ছুরিত হতে থাকে তার যাপিত জীবন ও মনোজগতের নানা রং।

রাত্রি ও বাঘিনী-র শেষ কবিতা ‘ঘুঘুদের স্বর চুরি করে’। কবিতা শুরুর আগে ছোট একটা ভূমিকা লিখেছেন তিনি। বহুদিন কিছু লেখা না হওয়ার অস্থিরতার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও বহির্জগতের বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাত কিভাবে একজন কবিকে প্রকাশ-ব্যাকুল করে তোলে এবং প্রায় আর্তনাদ করে ওঠা চিন্তারাশি যখন ভাষা খুঁজে পায় তখন তা কতটা স্বস্তি ও আনন্দ দেয় কবিকে তার একটা চকিত ও জীবন্ত বিবৃতি পাই ভূমিকায়। এ কবিতায় ছড়িয়ে আছে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের হিংস্রতা, যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, লাশ, সুচি ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ, ব্যক্তির আনন্দ-বেদনা, জীবনের নানা অনুষঙ্গ ও সিদ্ধান্ত। নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং সময় ও সভ্যতার নানা রূপ, নানান লীলা অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি এই কবিতায়।

কবিতার বই নিয়ে আলোচনায় বিচ্ছিন্নভাবে কোনও পংক্তি তুলে দেওয়ার পক্ষপাতী নই আমি। কেননা, একটা পংক্তি একটা কবিতার ভেতরে থেকে যে অর্থ বা ব্যঞ্জনা বহন করে, বিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করা হলে সেই অর্থের বিকৃতির আশঙ্কা থাকে। তাই বই এর অনেক উদ্ধৃতিযোগ্য পংক্তি তুলে দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে হলো। বরং পাঠক তাঁর একেকটি পূর্ণাঙ্গ কবিতার রসাস্বাদন করুন আর বিস্মিত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। সার্থক কবিতার কলস্বরও বিদ্যুৎ।

এই ছিপছিপে তন্বী অথচ বহুবর্ণিল কবিতার বইয়ের জন্য আট এর দশকের উল্লেখযোগ্য কবি জুয়েল মাজহারকে সাধুবাদ।

 লেখক : কবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares