‘আধুনিক মনোলোকে কাব্যের প্রকাশ-রহস্য’ : আশরাফ জুয়েল

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ

এটি পড়তে বসলে আমাকে বিষণ্নতা পেয়ে বসে, এমনই এক বিষণ্নতা, যা খুব সহজেই একটি সিদ্ধান্তের দিকে অনায়াসে গড়িয়ে যেতে থাকে। আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাই, বাধ্য হয়েই পড়া বন্ধ করি। আমার ঘ্রাণে তখন খেলা করে বৃষ্টি শেষের অস্তিত্বহীন কোনও এক সন্ধ্যা, যে সন্ধ্যা বিরামহীন তসবিহর দানার মতো আমাকে আটকে রাখে এক বিস্ময়াপন্ন বৃত্তের ভেতর, আমি সে বৃত্তের ভেতর নিজের আটকে যাওয়া অবস্থাকে উপভোগ করি, ঠিক তখনি পুনরায় এই না উপন্যাসনা কবিতা পড়ার ইচ্ছা সুতীব্র হয়, কিন্তু আমি পারি না, পারি না, সেই একই ভয়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে যা কি না আমাকে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। শেফালি কি জানে পড়লে আমার আত্মহত্যার সাধ জাগে।

আত্মহত্যার সাধকে আপাতত আমার প্রথম প্রেমিকা, আমার কলেজ শিক্ষিকা, যাকে কোনও দিনও আমার এই প্রেমে পড়ার কথা জানানোর ইচ্ছে জাগেনি, তাকে লেখা চিঠি, যাকে ভাঁজ করে চুরি করে আনা বইয়ের পাতার শরীরে লুকিয়ে রাখছি, রাখতে হচ্ছে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। আমাকে কিছুটা অসামাজিক কোনো রাতের ঝিমধরা অন্ধকারের মতো হয়ে যেতে হচ্ছে, বৈদ্যুতিক গোলযোগের কবলে হারিয়ে যাওয়া মফস্সলের সেই ভণিতাহীন ফসলের মাঠআমি যেন কোনও কিশোরের অবাধ্য ইচ্ছার ছুরিতে মাড়াই হওয়া ফসল।

শেফালি কি জানে, এটা কি সচেতনভাবে কলাকৌশল প্রয়োগ করে কোনওকিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা ? নাকি অভ্যাসকে অনুশীলনের নাটাইয়ে বেঁধে হেঁয়ালি বাতাসের ত্বকে ছড়িয়ে দেয়া চিন্তার কিছু গুঁড়ো ? অথবা ভাষাভাবনার সঙ্গতিকে অনুকরণের সুতোয় মেখে দেয়া মগজের কাচ!

‘আমার ছবি রচনা দেখি অচিন্তার অতল থেকে হঠাৎ ভেসে উঠে রেখার রূপ-সচিন্তমন মন তারপরে তাকে দখল করে বসে। আধুনিক মনোলোকে কাব্যের প্রকাশ রহস্য আমি বুঝবার চেষ্টা করছি-যেখানে তার আবির্ভাব কৃত্রিম নয় সেখানে তাকে স্বীকার করে নিতে হবেঅভ্যাসের বাধাকে একান্ত বলে মানলে ভুল হবে’-চিঠিপত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২৪

হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠিতে ইউক্যালিপটাস গাছে কোকিল ডাকার সংবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কোকিলটা বোধ হয় আধুনিক।’ কেন এসব আমার মনে পড়ে গেল ? হয়তো অভ্যাসের বাধা ? যেভাবে শেফালি স্ববিরোধ ধারার মধ্যে গেঁথে দিয়েছে অনপসরণীয় চিন্তার চুড়ি।

‘আমরা আসছি। আমরা আসছি মূলত আপনাকে আরেকটি মৌলিক গল্প শুনাব বলে। এই সমস্ত গল্পের শরীরে কেবল কাঁটা আর কাঁটা। তুমি গল্পের শরীর থেকে কাঁটা তোলো, আমরা আসছি। তোমার মৃত্যুর পর থেকেই এই গল্প প্রলম্বিত হতে শুরু করেছে। গল্পের গায়ে এখন তুমুল জ্বর। তুমি পানি ঢালো। যাই হোক, একটা ফাঁসির দড়ির প্রমাণ সাইজ কেমন হতে পারে ? আমি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। উত্তর দিতে না পারলে নীল ডাউন করে রাখে। জিরো ডিগ্রি এঙ্গেল থেকে চার ফিট উচ্চতার একটা বৃত্ত এঁকে দেখাও। আমরা তাও পারি না। এইবার পিঠের ওপর রাখা হয় থান ইট। ইট মানে পাথর। পৃথিবী নানা ধরনের পাথরের আকার। স্যার এবার আমাদের গান শোনাতে শুরু করেন, “পাথরের পৃথিবীতে কাচের দেয়াল।” স্যার এটা কি বার্লিন দেয়াল, নাকি ক্রেমলিন ? ক্রেমলিন তো সেই কবে ঝরঝর করে ভেঙে পড়েছে। স্যার বিষণ্ন হয়ে পড়েন। বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, ক্রেমলিন, তুমি বড় একা, আমি বড় একা।’-

শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত অংশটুকু কি ঐক্যহীনতার কথা বলে? জানি না। নাকি ‘সামান্য’ অথবা ‘বিশেষ’ কিছুর ইঙ্গিত করে। বস্তুসত্তা ? নাকি মুক্তচিন্তা ? টেক্সটগুলো ‘সাবস্ট্যান্স’ হয়ে উঠতে পেরেছে? হয়ে উঠতে পেরেছে ‘ইউনিভার্স্যাল’ ? ব্যাপারগুলো পুরোপুরি বুঝে উঠতে গেলে রূপ (ফর্ম) এবং বস্তুর (ম্যাটার) পার্থক্য ভালোভাবে আয়ত্তে আনতে হবে, যা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, তবু সাবস্ট্যান্সের সংজ্ঞা দিতে এরিস্টটল সম্ভবত এমন কিছু একটা বলেছিলেন, ‘The substance of each thing is that which is peculiar to it, which does not belong to anything else.’ অন্যায় রকমভাবে আমার মনে হচ্ছে, শেফালির কনটেন্ট সাবস্ট্যান্সের সংজ্ঞার সাথে সাযুজ্য রেখে অনিশ্চয়তার পায়ে পা রেখে হেঁটে গেছে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে সে মিলিত হতে পেরেছে নিরাপদ অনিশ্চয়তার সাথে; শেফালি হয়তো এ কারণেই আমার মতো পাঠকমনে আত্মহত্যার টেক্সট বুনে দিয়েছে অবলীলায়।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ-১৯৩৯ সালে প্রকাশ হয়, আধুনিক বাংলা কবিতা নামক একটি কবিতা সংকলন, এর সম্পাদনায় ছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। দুটি পৃথক ভূমিকায় সম্পাদকদ্বয় যতটা না আধুনিক বাংলা কবিতার চরিত্র নিরূপণে সচেষ্ট ছিলেন তার চেয়ে বেশি সচেষ্ট ছিলেন প্রকাশিত কবিতার ভেতর প্রকাশিত লক্ষণসমূহকে স্পষ্ট করে তোলার ব্যাপারে। আমরা নির্দ্বিধায় এখনও আবু সয়ীদ আইয়ুবের ঐ লেখাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেই ভাবি, অবশ্য ‘ল্যাক অব কম্যুনিকেশন’ এই সমস্যাকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন তখনও। শেফালি কী জানে-তে এই ‘ল্যাক অব কম্যুনিকেশন’ই হয়েছে যোগাযোগের অদৃশ্য সেতু। ১৯৫৩ সালে C. M Bowra Zuvi ‘Poetry in Europe’ নামক প্রবন্ধে দুইটি কাব্যধারার কথা উল্লেখ করেছিলেন, তার একটি ছিল Symbolist অন্যটি Anti-symbolist এবং অ্যান্টিসিম্বলিস্ট ধারাকেই পরবর্তীকালে মডার্নিস্ট, শেফালি কী অ্যান্টিসিম্বলিস্ট/মডার্নিস্ট-এর সর্বশেষ সংযোজন ? আমি বরং শেফালি সম্পর্কে আমার থিয়োলজিক্যাল বিশ্বাস ‘Faith seeking understanding’-এ স্থির থাকতে ইচ্ছুক।

‘হোয়াট ডু ইউ থিংক অ্যাবাউট হাফ সেক্স ? ইরান থেকে একবার সানা ইজালা নামের বান্ধবীর এমন একটি বার্তা আমাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। আরেকবার সে লিখেছিল, অর্গাজমের সময় তার ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা মনে পড়ে। এভাবে সে প্রতিদিন কোনো না কোনো টেক্সট পাঠাত। কিন্তু উত্তর দেয়ার পর আর কোনো রিপ্লাই আসত না। আরেক দিন একটা বৃষ্টির ছবি ইনবক্স করে লিখেছিল, ঈষৎ সন্ধ্যাকাল। এমন কঠিন বাংলা সে কিভাবে লিখেছিল ? তারপর অনেকদিন যোগাযোগ নেই। একদিন হঠাৎ টেক্সট আসে, তেহরানে বৃষ্টির সময় সেক্স করা পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। তার এরকম উস্কানিমূলক টেক্সট একদিন বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন তার আইডিতে গিয়ে ঘুরে আসতাম। নাহ, নতুন কোনো আপডেট নেই। আমার হতাশা বাড়তে থাকে। গতকাল রাতে পুরনো ডায়েরির পাতা উলটাতে গিয়ে একটি পৃষ্ঠায় গিয়ে আঁতকে উঠি। এক কোনায় লেখা আইডি : সানা ইজালা, পাসওয়ার্ড : …’

শেফালিকে পড়তে পড়তে আমি সহসা তার মধ্যে সানা ইজালাকে আমার পাশে বসে বৃষ্টি উপভোগ করতে দেখি, সানা তখন সম্পূর্ণ নিরাভরণ, সানা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমি সানার দিকে, বৃষ্টি শেষ হতেই আমি শেফালির উষ্ণ আলিঙ্গন অনুভব করি, দেখি শেফালি আমাকে এক উচ্চাকাক্সক্ষী নদীর ধারে নিয়ে গেছে, সে ইশারায় আমাকে নদীর স্রোতে ঝাঁপ দিতে বলে, এর পর আমরা সজাগ হই, আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম না, তবে কেন একে স্বপ্ন বলছি, এক অহংকারী ঘোর আমার চোখের পাতায় অসাড় হয়ে মরে পড়ে আছে, আমি দেখছি, সানা আর শেফালি পরস্পরকে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় আত্মহত্যার পেয়ালায় ডুব দিলো, আমি ফিরে এলাম, আমার আত্মহত্যার ইচ্ছে আরও সুতীব্র হলো।

এক অমোচনীয় মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম-

‘বিস্কিট রঙের দুপুরে সালমান শাহর মৃত্যু-ডাইনিং স্পেসটা হবে বিস্কিট রঙের শৈশবে বার্জারের এরকম একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে আমরা ব্যাপক আলোচনা করতাম। বিস্কিট রঙ আবার কেমন রঙ, এটা আমরা ভেবে উঠতে পারতাম না। আমরা শুয়ে শুয়ে বিস্কিট রঙ কল্পনা করতাম। কখনও আকাশির সাথে মিশিয়ে দিতাম ধূসর। আবার কখনও ইয়েলোকে হালকা করে তার গায়ে বসাতাম মেরুন। কিন্তু কখনো বিস্কিট রঙ খুঁজে পেতাম না। অথচ বিস্কিট রঙ খুঁজতে গিয়ে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম লেমন ইয়েলো। গাঢ় হতে হতে একসময় অরেঞ্জ। কেউ দূর থেকে ডাক দিয়ে বলত, “তোমরা পৃথিবীতে আবার ফিরে আসলে তখন কিন্তু ইয়েলো বলে কিছু থাকবে না, তখন সবকিছু অরেঞ্জ। এমনকি বৃষ্টির রঙও হবে গোল কমলালেবু।” আমি আর অরু এমন রঙের খোঁজে মেরিনার্স রোড আর নেভাল একাডেমি চষে বেড়াতাম। আমরা পেয়েছিলাম ডাইনোসরের হাড়। পরে অবশ্য জেনেছিলাম যেটিকে ডাইনোসরের হাড় ভেবেছিলাম, সেটি মূলত কোনো মৃত মানুষের কঙ্কাল। কেউ হয়তো প্রাগৈতিহাসিককালে খুন করে রেখে গেছে। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় এমন খুন কোনো ব্যাপার ছিল না। মাঝে মাঝেই এরকম দু-চারটা লাশ পাওয়া যেত। তাতে বড়দের মধ্যে তেমন মাথাব্যথা কখনোই ছিল না। যদিও কোথাও লাশ পাওয়া গেলে সেখানে কিছুদিন আমাদের আর যেতে দেওয়া হতো না। তখন আমরা হাতির লোম গুনে দিন কাটাতাম। অর্থাৎ কোনো কাজ না থাকলে যা করা আর কি! তখন কখনো কখনো মনে হতো বিদ্যাসাগরের মতো সাঁতরে বাড়ি চলে যাই। আমাদের বাড়ি ছিল কর্ণফুলীর ওপারে। এপারে দাঁড়িয়ে আমি কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। সমুদ্রের তীব্র গর্জন ছাপিয়ে আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আলাদাভাবে শোনা যেত।’-শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত।

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গগন ঠাকুরের সিঁড়ি উপন্যাসের এই কথাগুলো আমার খুব পছন্দের :

‘সভ্যতা ভূমিষ্ঠ হয়েছে মানুষের অপরিমেয় উচ্চাকাক্সক্ষার পাপে আর তার প্রায়শ্চিত্ত হবে অনিবার্য আত্মহননে।’

ফিরে আসি শেফালির কাছে, ‘বিস্কিট রঙের দুপুরে সালমান শাহের মৃত্যু’ এই বাক্যটি দিয়ে আরম্ভ হওয়া শেফালি স্মৃতিহন্তারক হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে যায় পুনরায়। মানুষের জীবন মিথের মতো উদ্দেশ্যহীন, সিসিফাসের মিথের মতোজীবন ঘটে যাওয়া অসংখ্য অসংলগ্ন কোলাজের সমন্বয়, এখানে পরাজয়গুলো শ্বাসের দরজায় শেকলের মতো হয়ে ঝুলে থাকে, যেভাবে আমার যৌবনের জানালায় ঝুলে আছেন সালমান শাহ, হয়তো লেখকেরও! হৃদয়মন্থনের বিষে লীন হয়েই কি আমরা মানে সালমান শাহ বেছে নিয়েছিলেন এই অনিবার্য সুরারিয়ালজম জীবন, আমাদের সিনেমাস্মৃতিকে ফসিল বানিয়ে ? কিন্তু শেফালির এসবে কী এসে যায় ? নাকি সে-ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ের নক্ষত্রঘাতে জর্জরিত ব্যক্তিত্বের করুণ বিজ্ঞাপন ? এক জাদুমাখানো জলতরঙ্গ ? শিখাহীন ফানুস ? আহা বিস্কিট রঙা দুপুর ? আহা আমাদের যৌনঅপচয়ের দুপুর ? ধ্বংসনামায় আমি, শেফালি, সানা আর সালমান শাহ! লেখকও ?

‘সলিচিউড পড়তে পড়তে পৃথিবী ধ্বংস, ইরানের রাজধানী তেহরান। তেহরান একটি সুন্দর শহর। শহরজুড়ে কেবল ফুলের বাগান। এই দেশে এগুলো কী ফুল! এগুলো কি কোনো ফুল হলো! ফুল দেখতে হলে তেহরান যাও। তেহরানের জাতীয় ফুল টিউলিপ। টিউলিপের বৈজ্ঞানিক নাম টিউলিপা। এটি একটি বসন্তকালীন ফুল। এটিও কিন্তু একটি গল্প। সবকিছুই গল্প। যেমন ম্যানচেস্টার অ্যারিনায় বোমা ফাটার পর একটা গল্প তৈরি হলো সেদিন। রক্ত ও মানুষের মৃত্যুতে সভ্যতার অনেক গল্প ইতিমধ্যে লেখা হয়েছে। মাশরুর স্যার প্রায়ই বলতেন, পৃথিবীর মৃত্যুর আগে তেহরানে বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। তার আগে অবশ্য আব্বাস কিয়েরোস্তামির মৃত্যু হবে। মানুষ ভুলে যাবে টিউলিপ নামে কোনো ফুল ছিল কিংবা টেস্ট অব চেরি নামে সিনেমা ছিল। এরপরও অবশ্য আরও একশ বছর পৃথিবী বেঁচে থাকবে। এর মাঝে মানুষ জানবে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে এবং কী কী সে আর কখনও ফিরে পাবে না! তারপর কোনও এক দুপুরে তুমুল বৃষ্টির মাঝে ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড পড়তে পড়তে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।’শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত।

রাষ্ট্র কি ভাষার অভিভাবক ? ঠিক জানি না, তবে এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেয়া যায় যে, গত এক শতাব্দীতে সাহিত্যিকরা শব্দসংকটে ভুগেছেন সবচেয়ে বেশি, একইরকমে চূড়ান্তভাবে চিত্রসংকটে ভুগেছেন শিল্পীরা। আমরা লক্ষ্য করি গগ্যঁর আঁকা নারীপুরুষেরা হাসতে জানে না, নাচতে জানে না, সমস্ত উজ্জ্বলতা তাদের মুখে পড়লেও তা সহসা ম্লানমুখ সন্ধ্যার চেহারা নিয়ে বসে থাকে একাকী। আচ্ছা, শেফালি কি পরিশীলিত সভ্যতা দ্বারা ঘর্ষিত ? শূন্যসৌন্দর্য ? সেও কি বেজে চলা ক্রমাগত নীরবক্রন্দনের এক উচ্ছিষ্ট সময়ের সঙ্গীত ? শেফালি কি জানে লেখার পেছনে লেখকের ‘Worthy purpose’ কী ছিল তা খুব জানতে ইচ্ছে করে, যদিও সেটা জানা আমার জন্য খুব বেশি জরুরি নয়, জানার প্রয়োজনও নেই আসলে। কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন, ‘The poet writes under one restriction only, namely, the necessity of giving immediate pleasure to a human being’ শেফালী কি শুধু এই উদ্দেশ্যেই লেখা ? হয়তো, অথবা অন্যকিছু। ‘poets are the unacknowledged legislators of the world’. বলেছিলেন শেলী, জানি না লেখক এ কথা মানেন কি না ?

‘শেফালির ভীষণ জ্বর, এই যে পাহাড়ে আগুন দিয়ে সেখান থেকে মানুষকে বের করে দেয়া হচ্ছে… এসব বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। আসুন অন্য কথা বলি। আমরা বরং ডিম লাইট বিষয়ক একটা ছোট্ট আলাপ পাড়তে পারি। চিটাগাং থেকে আসার পর আর কখনো ডিম লাইটে ঘুমানো হয় নাই। আমি একজনকে চিনি যে ডিম লাইটে ঘুমাতে পারে না। তার মনে হয় আশেপাশে ভূত আছে। আমার ডিম লাইটে ঘুমাতে ভালো লাগে। মনে হয় কবরে ঘুমাচ্ছি। যদিও কবরে কখনো ঘুমাই নাই, মাপ দেওয়ার জন্য একবার শুয়েছিলাম। রুমে একটা ডিম লাইট লাগানো দরকার। ঠিক আছে, ডিম লাইট কি তাহলে ভাস্কর্য ? নাহ। ডিম লাইট একটি অরাজনৈতিক বস্তু, যা ঘুমানোর সময় কাজে লাগে। আর পাহাড় ? পাহাড় একটি রাজনৈতিক বস্তু, ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা পুতিনের মতো। আচ্ছা, তাহলে পুতিন এবং ট্রাম্প হচ্ছে ভাস্কর্য ? হতে পারে। আর তাহলে মূর্তি কী ? থাক, এসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলাপ করা ঠিক না। অন্য আলাপ করি। আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাচ্ছি না তো ? মানুষ নিজেই হচ্ছে রাষ্ট্র, সে কখনো নিজের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তবে আপনি টমেটো নিয়ে আলাপ করতে পারেন না। কারণ টমেটো বস্তুত লাল এবং কৃষ্ণচূড়াও। এসবে রাষ্ট্রের আপত্তি আছে, কারণ লালে রাষ্ট্রের আপত্তি আছে। আর শেফালি ?’শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত।

লালে রাষ্ট্রের আপত্তি আছে ? লালে রাষ্ট্রের আপত্তি আছে! আছে ? নিশ্চয় আছে। কিন্তু রাজা যায় রাজা আসে, তাহলে কি সকল রাজার একই চরিত্র ? পুতিন বা ট্রাম্প ? আর অসহায় মানুষ, তাদের ভাগ্য যেন এক বিলম্বিত ট্রেন। চারু মজুমদারের কথা মনে আছে ? ‘আমি আরো খুশী হব যদি ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়-এই শ্রেণিকে আরো দূরে ঠেকে দেয়, বিশেষত পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধীজীবীদের।’ আলোচনাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবার ইচ্ছে নেই, বরং শেফালি কি জানের ‘Aesthetic pleasure’ নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। এরিস্টটলের মতে, ‘No less universal is the pleasure felt in things imitated.’ অবশ্য আনন্দের কারণ আরো আছে, তিনি আরও বলেন, অনুকৃত বস্তু দেখার আনন্দ, জ্ঞানের আনন্দ, এবং যেখানে জ্ঞাত বিষয়ের অনুকরণ থেকে আনন্দ না হয় সেখানে। তাহলে এই দাঁড়াল যে, সাহিত্যের শৈল্পিক আনন্দ জন্মে গঠননৈপুণ্যে, বর্ণযোজনা অথবা অনুরূপ অন্য কোনো কারণের ফলে। শেফালি আমাকে, ‘যেখানে জ্ঞাত বিষয়ের অনুকরণ থেকে আনন্দ না হয় সেখানে’ এই কারণে আনন্দ দেয় বা দিচ্ছে।

‘আত্মহত্যাকামী মানুষের গন্ধম ফল। পৃথিবীতে এতটা অসুখ আগে কখনো ভর করেনি। মানুষের সাথে মানুষের ভয়ঙ্কর যুদ্ধের সময় তখন। লাখ লাখ মানুষ তাদের ঠোঁটে অসুখ নিয়ে হেঁটে আসছে হাজার বছর ধরে। সেসব মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিষণ্ন মানুষটিকেই খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিয়ে আমাদের পৃথিবীতে আগমন। আমাদের প্রথম শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, শিং মাছের বেদনা বুঝতে পারার। আমাদের বলা হয়েছিল, সেই মানুষটির কোনো পাকস্থলী নেই, দেখতে হুবহু শিং মাছের মতো, তার নখের গায়ে ফুটে থাকে ছোট ছোট পাহাড়ি ফুল। সেইসব ফুল খুঁজে বের করাই ছিল আমাদের প্রথম কাজ।

এটা মূলত প্রারম্ভ ছিল। এরপর কী হতে পারে ? আমরা কি মানুষটাকে খুঁজে পাব অথবা সেইসব ছোট ছোট পাহাড়ি ফুল ? এসব জানার আগে আমাদের জানতে হবে, আগুনের প্রতি মানুষের ভালোবাসার কারণ কিংবা মানুষের আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা। ফুটনোট : আগুন আগুন তৈরি করা হয়েছে মূলত মানুষকে শিক্ষা দিতে। আরও সহজ করে বললে, মানুষকে ভয় দেখানোর প্রথম উপাদানের নাম আগুন। যা দিয়ে তাকে মৃত্যুর পর রোস্ট করা হবে। অতঃপর আমরা অন্য প্রাণীকে রোস্ট করে বুঝলাম, রোস্ট করা একটি উত্তম কাজ। যেকোনো মাংসল প্রাণীর রোস্ট করা মাংস সুস্বাদু। মানুষ রোস্ট করার লোভে প্রাণী পোষা শুরু করল। সেভাবে আগুনের প্রতি আমাদের ভয় কিছুটা কমে আসলো। বলা যায় বরং একটা বিপরীত ভালোবাসার তৈরি হলো। সেই সাথে নিজেদের রোস্ট হওয়া মাংসের প্রতিও তাদের লোভ বাড়তে থাকল।

আত্মহত্যা, আত্মহত্যা মূলত সুস্বাদু বিস্কুট। মূলত তার ভেতরের ক্রিমটাই বেশি মজার, যেটা চেটে খেতে হয়। আমরা উপরের দুই আস্তরণকে কখনোই বিশ্বাস করি না। আমাদের সব বিশ্বাস ক্রিমের ওপর। সেই ক্রিমের লোভে মানুষ আত্মহত্যা করে। যা বেঁচে থাকা মানুষের বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে এবং বেশিরভাগ মানুষ মূলত ভোরবেলা আত্মহত্যা করে। কারণ প্রত্যেকটা ভোরের রয়েছে আত্মহত্যার আলাদা আলাদা নিয়ম। আদ্দিওম যেমন আত্মহত্যার সময় হিসেবে বের করেছিল মধ্যরাত, যখন গভীর রাতের দিকে গড়াতে শুরু করে সে-সময়; যখন ঝুম বৃষ্টি নামবে। দামি আইপডে বাজতে থাকবে মেঘমল্লার কিংবা মালকোশ। তখনই পাইনঅ্যাপল বিস্কুটের ওপরের দুটি আস্তরণ সরিয়ে ক্রিম খেতে খেতে সে আত্মহত্যা করবে। আমরা অবাক হয়েছিলাম তাকে কথা রাখতে দেখে। এভাবে আদ্দিওম তার আত্মহত্যার উদাহরণ রেখে গিয়েছিল আমাদের জন্য। আদ্দিওমের মৃত্যুর পর তার কবরের ওপর আপেলের বিচি ফেলতে ফেলতে তার বাবা বলেছিল, এখান থেকেই জš§াবে আত্মহত্যাকামী মানুষের জন্য গন্ধম ফল।’শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত।

উপরোক্ত অংশে আমি হন্যে হয়ে মহাসাম্য খুঁজে ফিরি, কিন্তু বারবার ব্যর্থ হই, অথবা আমার ভেতরের ‘Sence of eternal justice’ থেকে আমি অন্তত এটা উন্মচন করার চেষ্টা করি যে, আত্মসমর্পণেই সমস্ত আনন্দ, কিন্তু তা কি হয় ? শেফালি কি তা করার অনুমতি দেয় ?

‘শেফালি কি জানে ? সম্পর্ক কেবল পাখিদের মধ্যে হয়ে থাকে। তারা জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা কয়। বন্ধুহীন পাখিরা এমনই। তারা কেবল একা একা নিজের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একটা বৃত্তের ভেতর বসে তারা ঘাস খায়। আর থাকে একটা হলুদ বাসের জন্য অপেক্ষা। তাদের ঘড়িগুলো অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। সেখানে তারা সময় দেখে আর মনে মনে শিস দিয়ে গান করে, এভাবে তারা নিজেদের ফেমাস ব্লু রেইনকোটের গল্প বলে। শেফালি এবং মিরনের গল্প বলে, সাথে মুফত হিসেবে আসে নওশাদও। যেন এক আরব্য রজনীর উপাখ্যান। পাখিরা সাধারণত যে সম্পর্কের জন্য উন্মুখ থাকে তাকে আমরা মাছ বলে জানি। আর পাখি ও মাছের কোলাজে থাকে মাছরাঙা। মাছরাঙা মূলত পাখিদের জারজ। তার সংসার তাই সব সময় জলে। সে কখনও জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা বলতে পারে না। সে কেবল জলের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে। তার মন বিষাদে ভরে ওঠে। মাছরাঙা তাই ভবিষ্যৎ বলতে পারে। যেভাবে সে বলেছিল শেফালি এবং মিরনের গল্প। তাদের সমূহ মিলন এবং বিচ্ছেদের গল্প। আজ মাছরাঙাদের শুক্রবার। তাই আজ আমাদের মাছরাঙাটি দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। তার ভবিষ্যৎ দেখার সময় পার হয়েছে আরও পঁচিশ মিনিট আগে। এর মাঝে মিরনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ডানাসহ উড়ে গেছে শেফালি। শেফালির পালকে লেগে আছে পাখিদের রক্ত ও ঘামের গল্প। অদ্ভুত এক সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। মানুষের উড়ে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। যেমন শেফালির উড়ে যাওয়ার মধ্যে আছে ব্রহ্মাণ্ডের গোপন সব রহস্য। মিরন সেই সব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে থাকে। আর ভাবতে থাকে ঘাম এবং নুনের সম্পর্কের কথা। যেমনটা বলেছিলেন রণজিৎ দাশ, “ঘামে যে রয়েছে নুন, তার অর্থ সমুদ্রে ছিলাম…।” পৃথিবীর এই সম্পর্কের কিছুই উদ্ধার করতে পারে না মিরন। ঘামের সাথে নুনের সম্পর্কের মতোই তার সাথে মিশে আছে শেফালি। এ কথা কি শেফালি জানে ?’শেফালি কি জানে থেকে উদ্ধৃত।

বারবার খোঁজার চেষ্টা করেই যাচ্ছি, কেন শেফালি আমাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিচ্ছে, উত্তর খুঁজে পাইনি তাই বারবার হয়তো তার কাছেই ফিরে আসা, যতক্ষণ না পাওয়া যায় অথবা হয় এ জীবনে কখনওই তা খুঁজে পাওয়া না।

আমার মনস্তত্ত্ব আমাকে কোনও সমাধানের পথের প্রতি ইঙ্গিত করেনি বিধায় আমি শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা দিয়ে, ‘এই প্রশ্ন আমার মনকে উদ্বেলিত করেছিলো যে, সাহিত্যে দুঃখকর কাহিনী কেন আনন্দ দেয়মনে উত্তর এল, চারিদিকের রসহীনতায় আমাদের চৈতন্যে যখন সাড়া থাকে না, তখন আত্মোপলব্ধি ম্লান। আমি যে আমি এইটে খুব করে যাতে উপলব্ধি করায় তাতেই আনন্দ। যখন সামনে বা চারিদিকে এমন কিছু থাকে যা সম্বন্ধে উদাসীন নই, যার উপলব্ধি আমার চৈতন্যকে উদ্বোধিত করে রাখে, তার আস্বাদনে আপনকে নিবিড় করে পাই। এইটার অভাবে অবসাদ। বস্তুত মন নাস্তিত্বের দিকে যতই যায় ততই তার দুঃখ। দুঃখের তীব্র উপলব্ধিও আনন্দকর, কেননা সেটা নিবিড় আস্মিতাসূচক; কেবল অনিষ্টের আশংকা এসে বাধা দেয়। সেই আশংকা না থাকলে দুঃখকে বলতুম সুন্দর। দুঃখ আমাদের স্পষ্ট করে তোলে, আপনার কাছে আপনাকে ঝাপসা হতে দেয় না।’

 লেখক : কবি ও গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares