সহজিয়া পন্থার কাব্যিক যাত্রা : মুম রহমান

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-অনুবাদগ্রন্থ

কথা বলা যাক, তাও তে চিং (Tao te ching) বা দাও দে জিং (Dao de jing) নামক মধ্যযুগের একটি চীনা পাণ্ডুলিপি নিয়ে। প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো লাওৎ সে রচিত এই পাণ্ডুলিপি বিশ্বের কত দেশে কত ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, সে এক গবেষণাযোগ্য বিষয়। এই মুহূর্তে আমার সংগ্রহেই ১৪টি ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে। চিন্তার কথাটি হলো, দু’চারখানা অনুবাদ একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলেও বোঝা যাবে যে তাও তে চিং-এর সঠিক অনুবাদ পাওয়া কত কঠিন। অথচ প্রায় প্রত্যেকটি অনুবাদই ভালো। অনুবাদ, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় যেতে গিয়ে কতটা বদলে যায় তাও তে চিং দিয়েই তা প্রমাণ করা সম্ভব। আদতে আড়াই হাজার বছরের পুরনো চীনা ভাষার শব্দ ধরে ধরে অনুবাদ যথেষ্ট জটিল। বোঝার সুবিধার জন্য আমরা বাংলা ভাষার প্রথম পাণ্ডুলিপি ‘চর্যাপদ’-এর কথা উল্লেখ করতে পারি। প্রাচীন সেই বাংলা ভাষারীতি আজ বিলুপ্ত। নানা গবেষক অনুবাদক সে ভাষার পাঠ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কাউকেই আমরা চূড়ান্ত বলে ধরতে পারি না এবং আবার কাউকেই বাতিল করতে পারিনি। বিলুপ্ত বা অপ্রচলিত একটি ভাষার পাঠ উদ্ধার যথার্থ জটিল। অন্যত্র, ‘তাও তে চিং’ লেখা হয়েছে কোন রকম বিরাম চিহ্ন ছাড়া, অপিচ এর ভাষারীতি কাব্যিক। যতিচিহ্ন বা বিরাম চিহ্নের কারণে যে অর্থ বদলে যায় তা তো আমাদের জানা এবং কাব্যিক পাঠের যে একাধিক অর্থ তৈরি করা যায় সেটাও অজানা নয়। ফলে তাও তে চিং অনুবাদের সমস্যা ও সংকট কম নয়।

এটা আনন্দের কথা যে, আমাদের কালের কবি সরকার আমিন ‘তাও তে চিং’ অনুবাদ করেছেন আমাদের প্রচলিত ভাষাতেই। তার পদ্য ও গদ্য পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন, তার ভাষা সমকালীন, সরস ও কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর। তার লেখা এবং যতটুকু ব্যক্তি-সরকার আমিনকে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি (দূর থেকেই) তাতে ধারণা করেছি, তিনি চলতি পথে চলেন না। আমাদের এই নাগরিক জীবনযাত্রার একঘেয়েমি, অস্থিরতার বাইরে জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে দেখার একটা দার্শনিক অভীক্ষা তার মধ্যে রয়েছে। ফলত এমন ধারণাই করা যায় : তার অনুবাদ করা তাও তে চিং কাব্যিক, সরস এবং সমকালীন পাঠ হয়ে উঠবে। প্রথমত তার অনুবাদের শিরোনামে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। প্রচ্ছদে উপশিরোনাম লেখা আছে : ‘আড়াই হাজার বছরেরও পুরনো চীনা দর্শন-কাব্য’। এই উপশিরোনাম সাধারণ পাঠককেও আকৃষ্ট করবে, পৃথিবীর অন্যতম একটি প্রাচীন দর্শন কিংবা কাব্যগ্রন্থ পাঠের। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাও তে চিং একই সঙ্গে কাব্যিক এবং দার্শনিক। তাও তে চিং নামক গ্রন্থের তাওবাদকে কেন্দ্র করে তাও-ধর্ম প্রতিষ্ঠিত। কাজেই ধর্মগ্রন্থ, দর্শনগ্রন্থ এবং কাব্যগ্রন্থ পাঠের যুগপৎ আনন্দ রয়েছে তাও তে চিং-এ। সরকার আমিনের অনুবাদ করা তাও তে চিং গ্রন্থের মূল শিরোনাম হলো তাও তে চিং সহজিয়া পথ। শিরোনামের এই ‘সহজিয়া পথ’ লালন-হাসন প্রেমী এই সহজিয়া মানুষকে আকৃষ্ট করে।

এটা আমার জন্য দুঃখের এবং বেদনার বিষয় যে, বহুদিন পর আমার হাতে এই বই এল। সরকার আমিন অনূদিত তাও তে চিং সহজিয়া পথ প্রকাশিত হয়েছিলো ২০০৭ সালে। অনুতাপের বিষয় যে তা আমার চোখে পড়েনি। ২০২০ এ বাংলা একাডেমি থেকে দ্বিতীয় সংস্করণের পর তা আমার হাতে এলো। ইতোমধ্যেই আমি এই গ্রন্থের অন্তত পনেরখানি অনুবাদ (ইংরেজি) পড়েছি। কিন্তু মা আর মায়ের ভাষার মতো সুখ কোথায়! সরকার আমিনের কল্যাণে নিজের ভাষায় তাও তে চিং পড়লাম। এ এক বাড়তি আনন্দ। সরকার আমিনের ‘তাও কথা’ নামক পূর্বকথনের সূত্র ধরে জানলাম ১৯৬০ সালে অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ তাও তে চিং : লাও-ৎস কথিত জীবনবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। আবার অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে আরও আগেই (১৩১৭ বঙ্গাব্দে) বিখ্যাত ছড়াকার সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাও তে চিং-এর ‘আংশিক বাংলা অনুবাদ করেছিলেন’। যা হোক, সে দুটো হাতে নেই। তাই তুলনা করার সুযোগও নেই। কিন্তু বিনা তুলনায় একটা কথা দিয়ে শুরু করি, তা হলো সরকার আমিনের অনুবাদখানি সুপাঠ্য।

তাওবাদ আদতে জীবনে ও কর্মে সহজ, সরল হতে বলে আর ভাবনায় হতে বলে গভীর। সেই সহজ, সরলতার পাশাপাশি গভীরতা আমি অন্তত খুঁজে পেয়েছি সরকার আমিনের অনুবাদে। তবে এই খুঁজে পাওয়ায় আমি যে খুব তৃপ্ত তা বলব না। সরকার সাহেবের প্রতি অনুযোগ রয়েই গেল। এ লেখার সূত্রে জানিয়ে রাখি ‘তাও-কথা’ নামের যে প্রাককথা তিনি লিখেছেন তা বড়ই ছোট, আকারে মাত্র চার পৃষ্ঠা। এই চার পৃষ্ঠা পড়ার পর ক্ষুধা কমে না, বেড়ে যায়। আরেকটি অনুযোগ কিংবা আব্দারের কথা জানিয়ে রাখি, আমি অনেকগুলো ইংরেজি অনুবাদ দেখেছি যেখানে বিস্তৃত টীকা, ব্যাখ্যা রয়েছে। আমিন মহোদয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল কিছু টীকা, ব্যাখ্যা সংযোজন করা। তাতে সাধারণ পাঠক তাওবাদের আরও গভীরে যেতে পারত। এ ক্ষেত্রে টেক্সটের অনুবাদ শুধু ক্ষুধাই বাড়িয়েছে। ক্ষমা করবেন সরকার আমিন মহাশয়, আমি যে বড় ক্ষুধার্ত। কিন্তু আপনাকে ভালোবাসা। মূলত এই অনুবাদখানির জন্য এই অধমের ভালোবাসা ও প্রেম আপনি পেতেই পারেন। বাকিটা যা অভিযোগ- অনুযোগ-অভিমান তা ক্ষুধা থেকেই। কাজেই এমন প্রেমপিয়াসির জন্য আপনি পরবর্তী সংস্করণে আরও দু-চার কথা যোগ করবেন সে আব্দার জানিয়ে রাখি। হু।

কবি সরকার আমিনের অনুবাদের গহনে প্রবেশের আগে আমি একটু পণ্ডিতি করার সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। একটি বিষয়ে ডজনখানেক বই পড়লে দু’চার কথা বলার অধিকার বা সুযোগ সন্ধান করাই যায়। কিন্তু সেই পাঠ-অভিজ্ঞতা থেকে নয়, পুরনো আশিক হিসেবেই একটু কথা বলে নিতে চাই। আশা করি তাওবাদ নিয়ে সাধারণের আগ্রহ ও কৌতূহল বাড়বে আমার দুয়েকটা কথায়। প্রথমেই আমি যেটা বুঝেছি, মানুষ আর প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের কথা বলে তাওবাদ। আজকের দিনে এই কারণেই তাওবাদ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। পরিবেশবাদী নয়, সাধারণ মানুষও আজ সামান্য বিবেচনা বোধ ব্যবহার করলেই বুঝতে পারবেন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা ছাড়া মানুষের কথিত আধুনিকতা ও উন্নয়ন অর্থহীন। যে কথিত গতিশীল আর প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে আমরা এখন আছি, সেখানে ধ্যানের অবসর কোথায়, সেখানে ভালোবাসার জায়গা কোথায়? আমরা কি হৃদয়বান, নিরাহংকারী, বিনয়ী হতে পেরেছি ? জগত আর প্রকৃতির সঙ্গে নিঃস্বের মতো চলতে শিখেছি ? পৃথিবীকে অনুসরণ করা, প্রকৃতির সঙ্গে ঐকতান সৃষ্টি করা তাওবাদের অন্যতম দিক। তাওবাদের মূল শিক্ষাই হলো, সহানুভূতি, সহৃদয়তা আর ভালোবাসা। জীবনধারণে একজন তাওবাদী মিতাচার, সরলতা, নিঃস্বতায় বিশ^াসী, আচরণে সে নিরহংকারী, বিনয়ী। এমন তাওবাদ আমাদের সবারই আরাধ্য হওয়া উচিত।

কিন্তু এই তাও ব্যপারটা কি ? তাওবাদের প্রবক্তা চীনা সাধু ও পণ্ডিত মহাত্মা লাওৎ সে (সরকার আমি লিখেছেন লাও ৎস, কিন্তু সেটা উচ্চারণে আরাম পাচ্ছি না বলেই আমি অনেক ইংরেজি উচ্চারণের মতো করে লাওৎ সে লিখছি); অথচ মহান লাওৎ সে তার পাণ্ডুলিপির প্রথম লাইনেই লিখেছেন ‘তাও হচ্ছে তা যাকে শব্দে বাঁধা যায় না’ (১)। অথচ আমরা তো শব্দের জগতের লোক, শব্দের অধরা তাওকে তবে কেমন করে ধরব! কিন্তু ধরতেই হবে না কেন! অধরা ঈশ^রের মতো, অধরা মাধুরির মতো ‘তাও’ এক অধরা সত্তা। ধারণা করা যায়, তাও ধরবার জিনিস নয়, কেননা সে কোন জিনিস নয়, ব্যক্তি নয়। তাও হয়তো সত্তা, হয়তো পরম সত্তা, হয়তো চূড়ান্ত মোক্ষ :

‘তাও যেন এক ঝরণা

সতত দানশীল, কখনও ফুরায় না

তাও যেন এক অনন্ত শূন্যতা

ভরে আছে অসীম সম্ভাবনায়’

‘তাও জন্ম দেয় ভালো আর মন্দ

              কোন পক্ষই নেয় না’(৪)

‘তাও এক মহান মা’ (৬)

‘তাও অসীম অনন্ত’ (৭)

‘যতই সহজ হবে তুমি ফিরে পাবে ধৈর্য

যতই নির্মোহ হবে ফিরে পাবে উপকারী মন

              রাজর্ষি মহার্ঘে দীপ্ত হবে হৃদয় তোমার

হৃদয়কেই তখন মনে হবে তাও’ (১৬)

‘তাওকে ধরা যায় না

কে পারে ধারণ করতে তাওকে হৃদয়ের মাঝখানে?

অদৃশ্যে কে পারে সঁপে দিতে দেহ ও মন” (২১)

‘তাও তখনো বর্তমান

সে ‘ছিল’ বা ‘ছিলনা’-র অতীত’ (২১)

‘গ্রহণ যদি কর হৃদয়ে তাও

তবে যাও

কাজ করো আর ভুলে যাও’ (২৪)

‘তাও অনুসরণ করে নিজেকে’ (২৫)

‘তাওকে ধরা যায় না

তাও ইলেকট্রনের চেয়েও ছোট

এর মধ্যে মিশে আছে অগণিত গ্যালাক্সি’ (৩২)

‘হৃদয়ে যদি রোপণ কর তাও

কার সাধ্য তোমাকে উপড়ে ফেলে?’(৫৪)

‘তাও সব সময় আছে সহজতার সাথে’ (৭৩)

প্রিয় পাঠক আরও উদ্ধৃতি দেয়া যেত। লাওৎ সে তার তাও তে চিং নামক পাণ্ডুলিপিতে ‘তাও’ সম্পর্কে অনেক কথাই বলেছেন। তার ৮১টি সূত্রে বা বয়ানে বা পদ্যে তাও এসেছে নানা ব্যাখ্যায়। কিন্তু একটা কথা স্পষ্টই যে তাও ব্যখ্যাতীত। আমাদের প্রচলিত বোধ থেকে ধরে নিতে পারি, তাও আমাদের ধারণাতীত পরম সত্তা। এই তাওকে পেতে হলে ‘সহজ মানুষ খুঁজে দেখ না রে মন দিব্য জ্ঞানে।’ তাওকে আমি লালনে পাই, রবীন্দ্রনাথে পাই। তাও ঈশ^রের মতো কোন কিছু ? কিন্তু লাওৎ সে বলছেন, ‘তাও ঈশ^রের চেয়েও প্রবীণ।’ ব্যাপারটা বোঝাই যাচ্ছে ধাঁধাময়, জটিল, অথচ আমরা জানি যে তাওবাদ সহজিয়া এবং সে সরলতার কথা বলে। আমার ক্ষুদ্রজ্ঞান থেকে এটুকু বুঝেছি যে মানুষের অধীত জ্ঞানও সীমাবদ্ধ। আপনি-আমি কয়টা বই পড়েছি, এই মহাজগতের কতটুকু দেখেছি, বুঝেছি তা হয়তো বলতে পারব কিন্তু কয়টা বই পড়িনি, মহাজগত কতটুকু দেখিনি তা ধারণাও করতে পারব না। ‘তাও’ এমনই বৃহৎ, মহৎ কোন ধারণা যা আমাদের ধারণারও অতীত। আমরা প্রত্যেকেই নিজের সীমিত পরিসরে সব কিছুকে মাপতে যাই, এমনকি ঈশ^রকেও। যে তাওবাদ ঈশ^রের অধিক তাকে সীমিত জ্ঞানে না-মেপে উপলব্ধি দিয়ে বুঝতে হবে, প্রসঙ্গত আমার অনুবাদে একটা জেন গল্প পাঠ করা যাক :

বুদ্ধ তার শিষ্যদের সঙ্গে এক সকালে বসে আছেন।

একজন লোক এল।

জিজ্ঞেস করলো, ‘ভগবান বলে কারও অস্তিত্ব আছে?’

‘তিনি আছেন’, বুদ্ধ বললেন, মৃদু হাস্যে।

দুপুরের দিকে আরেক লোক এল। এবার সেই লোকটি বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করল একই প্রশ্ন, ‘ভগবান বলে কিছু কি আছে?’

বুদ্ধ বললেন, ‘না, তার কোন অস্তিত্ব নেই।’

সেই লোকটি চলে গেল। দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এল প্রায়।

আবার আরেকজন এসে সেই একই প্রশ্ন, ‘ভগবান আছেন?’

বুদ্ধ এবার উত্তর দিলেন, ‘সেটা তোমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

লোকটি চলে গেল। বুদ্ধের শিষ্যদের একজন এবার খানিকটা উত্তেজিত হলেন। তিনি বিরক্তি নিয়ে বললেন, এটা তো অসম্ভব কথা প্রভূ! আপনি কেমন করে একই প্রশ্নের এমন ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিলেন!’

বুদ্ধ হাসলেন।

বললেন, ‘ওরা তো সবাই ভিন্ন ভিন্ন লোক। প্রথম জন আমি যা বললাম তাই বিশ^াস করবে। দ্বিতীয় জন আমি যা বললাম তা ভুল প্রমাণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে। আর তৃতীয় জন কেবল সেটাই বিশ^াস করবেন যা তার বিশ^াস করার কথা।’

আসলে ভালোবাসা, প্রেমের যেমন কোন সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা, ধারণা দেওয়া যায় না ‘তাও’ তেমনই। শাব্দিকভাবে ‘তাও’ অর্থ পথ, রাস্তা বা পন্থা। ‘তাও তে চিং’ এর অর্থ হলো ‘অখণ্ডতার পন্থা’ বা ‘বিশুদ্ধতার পথ’। এই পথ কোন গন্তব্য নয়। এ পথই অভীষ্ট। বস্তুজগতের হিসেবের জীবন দিয়ে এই পথ চেনা যায় না। কেননা যে তাও-এর কথা বলি তা চিরন্তন তাও নয়। অপিচ, চিরন্তন তাওকে শব্দে ধরা যায় না। এ কেবল উপলব্ধির জগত, ধ্যানের জগত। সাধনার পথ, ধ্যানের পথ হলো তাও।

এখন প্রশ্নটা অনিবার্য হয়ে যায়, তবে কিসের ধ্যান করব ? উত্তরটি শুনতে সহজ, কিন্তু মানা কঠিন। তাও হলো শূন্যতার সাধনা। নিজেকে একটা শূন্য পাত্রের মতো করে ভাবতে হবে। তাওবাদ যে শূন্যতার কথা বলে তা পূর্ণতার দিকেই ধাবিত। কারণ পাত্র শূন্য না হলে ধারণ করব কোথায়, পূর্ণ করব কি! একটি তাওবাদী গল্পে আমরা পাই যে একজন শিষ্য এসেছেন প্রাচীন গুরুর কাছে শিক্ষা নিতে। গুরু তাকে একটি পাত্রে জল ঢালতে দিলেন। শিষ্য জল ঢেলে যাচ্ছে। পাত্র উপচিয়ে জল পড়ছে। গুরু বললেন, ‘ভরা পাত্রে কি জল ঢালা যায় ? ভরা পাত্র কেবল উপচিয়ে যায়। পাত্র শূন্য করো তারপরই সেখানে জল ধরবে।’  ‘তাও তে চিং’ বলছে :

‘যদি পাত্র ভরে যায় বেশি

উপচে পড়বে’ (৯)

তাওবাদীরা জানেন, জল কত শক্তিশালী আর বৈচিত্রময়। জল থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে অনেক কিছু। জলের কাছ থেকে প্রথম যে পাঠ আমরা নিতে পারি তা হলো তার অবতরণ গুণ। সোজা কথায় জল কখনও উচ্চাকাক্সক্ষী নয়, জল নিম্নমুখি, আরোহণ নয়, অবরোহণই তার ধর্ম। নিচুতে নেমে যায় সে। এই নিচুতে নামতে পারার শিক্ষা মানব জীবনে সুখ শান্তির অনেক বড় শিক্ষা। আমরা কেবল টপকে যেতে চাই, শীর্ষে উঠতে চাই, গর্বিত মস্তক উপরে তুলতে চাই। কিন্তু একজন যথার্থ জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ লোক বরাবরই অবনত, বিনীত। ফলবতী গাছের মতোই সাধক নুয়ে আসে। সত্যিকারের মানুষকে নত হতে শিখতে হয়। সে শিক্ষা জলের কাছে আছে বলেই তাও তে চিং-এ বারবার জলের উদাহরণ এসেছে।

‘সর্বোচ্চ ভালো যেন জল

সহজেই কাজে লাগে সকলের

নিম্নভূমিতে জড়ো হয় জল

যেন সে তাও, স্বচ্ছ অবিরল’ (৮)

শুধু কি নত হওয়া ? জল সবার জন্যই সমান। এই যে নদীর জল, বৃষ্টির জল, ঝর্নার জল, সমুদ্রের জল―সে কোন ভেদাভেদ জানে না। রাজা আর ফকির সবার সঙ্গেই তার সমান আচরণ। সবার কাজে লাগে জল। যে এসে আঁজলা ভরে নিতে চায়, যে এসে অবগাহন করতে চায়, সবার কাছেই জল নিজেকে সমানভাবে বিলিয়ে দেয়। জলের মায়া, মমতা সবার জন্যই সমান। কোন বিচার-আচার, নির্বাচন সে করে না। সেই যে পাহাড় থেকে নেমে আসে জল, গাছ, পাথর, প্রাণী, মানুষ সবার জন্যই সে অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। আর এইসবই করে সে অকাতরে। কারও প্রশংসা, পুরস্কারের আশায় জল তো বসে থাকে না। সে বয়ে যায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে দিতে। আমরাও তো এমন হতে পারি ? কোন প্রত্যাশা, পুরস্কার ছাড়াই এগিয়ে যেতে পারি, নিজেদের কর্মকে বিলিয়ে দিতে পারি, মানুষ, প্রকৃতি ও পৃথিবীর জন্য। আর সবার জন্য সমান আচরণ করা শিখতে পারি : 

‘সকল স্রোতধারা প্রবাহিত হয় সাগরে

কারণ সাগর নিম্ন স্থানে

নমনীয়তা তাকে শক্তি দেয়’ (৬৬)

‘পৃথিবীতে কিছুই নেই জলের মতো এত সহজ আর স্বচ্ছ

কাঠিন্য আর অনমনীয়কেÑ

জলের মতো আর কিছু পারে না নরম করে দিতে’ (৭৮)

শান্ত জল দেখেছেন কখনও ? হয়তো আপনার গ্লাসেই একগ্লাস শান্ত জল রয়েছে। দেখুন, কী স্বচ্ছ, যথার্থ, নিশ্চল। তার কাছে কোন মিথ্যাচার নেই, নেই কোন আড়াল। আয়নার মতো সে তুলে ধরে সত্যকে। প্রতিফলিত করে সরল সত্যকে। এই স্বচ্ছতা, সরলতা, সততা অর্জন করতে পারলে আমরা তো সবার শ্রদ্ধেয় হতে পারি।

এই জলই কিন্তু রূপান্তরিত হয়। পৃথিবী, প্রকৃতি, সময় এমনকি পাত্র ভেদে সে নিজেকে বদলে নেয়। অভিযোজনের আদর্শ উদাহরণ জল। কখনও সে বাষ্প, কখনও সে বরফ, কখনও সে তরল, কখনও কঠিন। যুগ যুগ ধরে তৈরি হয়েছে এই পৃথিবী। মানুষ ও প্রাণীকুলের বসবাসের অযোগ্য এই পৃথিবী আজ যে সুফলা, বাসযোগ্য তার মূল কারণ জল। জলই কখনও বাষ্প হয়ে, কখনও তরল হয়ে, কখনও কঠিন বরফ হয়ে রক্ষা করেছে প্রাণের স্পন্দন। প্রাণের বিকাশ আর অস্তিত্ব মানেই তো জল।

প্রবহমান, আপাত আকারহীন, সহজ, সরল জল কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে। সে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে যোগ্য আচরণ করে। সময়জ্ঞান আর স্থান-কাল-পাত্র ভেদ তার মতো করে কেইবা বোঝে। শীতে বৃষ্টি হয় না, গরমে বরফ জমে না। অস্থির মানুষকে জলই শেখাতে পারে, সব কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়, প্রতিটি ঘটনা ও অভিঘাতের নির্দিষ্ট সময় আছে। শীতের ফুল বর্ষায় ফোঁটে না, বসন্তের পাখি শরতে আসে না। জলই প্রকৃতি ও প্রাণকে দিয়েছে সময়বোধের শিক্ষা।     

কিন্তু এই যে অভিযোজন ক্ষমতা, সরলতা, আকৃতিহীন, বিনীত জল তাকে তুচ্ছ করার সাধ্যই বা কার! আপাত কোমল, নরম জল চাইলেই বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাস আনতে পারে, জোয়ার ভাটার টানে ঘুরিয়ে দিতে পারে প্রবাহ ধারা। এই জলের শক্তিও তো কম নয়! অসীম শক্তিশালী বলেই জল এত বিনীত, দরকারি আর আদরণীয়। আর গভীরতার কথাও তো জলের কাছেই শিখতে পারি আমরা। জল তার গভীরতাকে আড়াল করে রাখে। প্রথম দেখায় হয়তো বোঝাই যায় না এ জল কত গভীর। সত্যিকারের জ্ঞানী লোক, মহৎ লোকও নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মহত্ত্বকে গভীরে লুকিয়ে রাখে। যত জ্ঞান তত গভীরতা। যত গভীরতা তা স্থিরতা, শান্তি। যারা সমুদ্রের গভীরে, নিদেন পক্ষে নদী বা পুকুরের গহীনে ডুব দিয়েছেন তারা জানেন গভীরতার মাধুর্য। সত্যিকারের মানুষের মধ্যে এই জলের গভীরতা থাকে। তলায় লুকিয়ে থাকে কত সম্পদ! মজার বিষয় হলো আমাদের সবার গভীরেই সম্পদ আছে, আমরা তা অনুসন্ধান করি না। নিজেদের গভীরতা নিজেরাই আবিষ্কার করি না। ‘তাও’ বা পথকে খুঁজে পেতে হলে জলের মতো বয়ে যেতে হবে।

ফিরে আসি, অনুবাদের কথায়। অবশ্য আমরা সরকার আমিনের অনুবাদেই ছিলাম। কেননা যা কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি তা তো তার কাব্যিক অনুবাদ থেকেই দিচ্ছি। তাও তে চিং মূল পাণ্ডুলিপির অন্যতম শক্তি এর কাব্যগুণ, সেই কাব্যগুণ যথার্থ বজায় রেখেছেন সরকার আমিন। সেই যে প্রথম লাইন ‘তাও হচ্ছে তা যাকে শব্দে বাঁধা যায় না’―এই প্রথম লাইনটিই তো একটি কাব্য, ‘তা’, ‘না’ ‘যা’, ‘ধা’ ইত্যাকার অনুপ্রাস লাইনটিকে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’-এর মতো একটা ধ্রুপদী দোলা ও গভীরতা দেয়। এই প্রথম পদেই সরকার আমিন লিখছেন, ‘রহস্য আর প্রকাশ্য উৎস তো এক’। আমি মুগ্ধ হয়েছি এই সহজিয়া বাক্য গঠন, শব্দের দ্যোতনা আর অনুপ্রাসের দোলায়। এই প্রথম পদের শেষে এসে পাই :

‘অন্ধকারের ভেতর অন্ধকার

মূলমন্ত্র সবকিছুকে বোঝার’ (১)

সরকার আমিন তার তাও তে চিং সহজিয়া পথ গ্রন্থটি অনুবাদ করতে গিয়ে স্টিফেন মিশেল কৃত অনুবাদটি অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি স্বাধীনতাও নিয়েছেন যথেষ্ট। আমার বিবেচনায় মূল ভাব থেকে না-সরে অনুবাদক যদি স্ব-ভাষায় মূল পাণ্ডুলিপিকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে খানিকটা স্বাধীনতা নেন তবে অনুবাদটি আঁটোসাটো বা জড়োসড়ো মনে হয় না। অনুবাদকে পড়তে গিয়ে মৌলিক মনে হয়। কতটুকু অনুসরণ করব শব্দ শব্দ ধরে আর কতটুকু স্বাধীনতা নিব ভাবের ঘরে―এই দুইয়ের মিল ও ফারাকের মধ্যেই আছে অনুবাদের নির্যাস।

সরকার আমিনের অনুবাদের স্বাধীনতা ও স্বাদুতার একটা উদাহরণ অন্তত দেয়া যাক। পাশাপাশি স্টিফেন মিশেল ও সরকার আমিনের অনুবাদ পড়ে দেখি :

Governing a large country

is like frying a small fish

you spoil it with too much poking

একটি বড় দেশ শাসন করো

একটি ছোট মাছ ভাজার মতো দক্ষতায়

বেশি তাপ দিলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় মাছ

poking-শব্দের অর্থ হতে পারে ‘খোঁচানো’, ‘ঠেলা’; হয়তো স্টিফেন মিশেলের লাইনটির আক্ষরিক অনুবাদ হতে পারত, ‘বেশি খোঁচাখুচি করলে তুমি এটিকে নষ্ট করবে’। এই আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে সরকার আমিন কৃত  ‘বেশি তাপ দিলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় মাছ’ অনেক বেশি শৈল্পিক এবং কাব্যিক। আবার এ অনুবাদ যে মূলভাব থেকে সরে গেছে তাও কিন্তু নয়। উত্তম অনুবাদ দূরে গিয়ে কাছে টানে, কাছে টেনেও স্বাধীন রাখে―আমি এমনটা বিবেচনা করি। আমার বিবেচনায় অনুবাদক সরকার আমিন সার্থক এবং আমিও সার্থক তার এই অনুবাদ গ্রন্থ পাঠে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares