বিশ্বজিৎ ঘোষের অশেষ রবীন্দ্রনাথ : রবীন্দ্র চেতনার সমুদ্রমন্থন : জাকিয়া রহমান

যে ৭ রাশির জাতকদের সৌভাগ্যের যোগ রয়েছে প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-প্রবন্ধ : গবেষণাগ্রন্থ

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সিংহভাগ যে দার্শনিক-লেখকের কলমে উৎকর্ষমণ্ডিত হয়েছিল তিনি বিশ্বকবি―বিশ্বমানবতার কল্যাণকামী লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর বহুমুখী বিরলপ্রজ প্রতিভা ও মননশীলতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেছে। দর্শন-চিন্তা প্রসূত প্রবন্ধের পাশাপাশি নাটক, গান, কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস রচনায় আজও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথপ্রদর্শক। ছোটগল্পের অবয়ব নির্মাণ ও উপন্যাসের নব-রূপায়ণে রবীন্দ্রনাথের অবদান চির-ভাস্বর। লেখনীর সুপ্ত ভাঁজে প্রকাশিত হয় তাঁর সমাজ, সমাজসংস্কার, দেশ-কাল, শিক্ষা-সংস্কৃতি, নগরায়ন-বিশ্বায়ন চেতনা, নারীত্বের মূল্যায়ন, নারীর স্বাধিকার চেতনা, অস্তিত্ববোধসহ সার্বিক ভাবনা। একবিংশ শতকের প্রবহমানতার প্রতিটি স্তরে যে বিষয়গুলি অতীব জরুরি এবং নগরায়ন-বিশ্বায়ন তথা সভ্যতার বিচারের মানদণ্ড স্বরূপ; রবীন্দ্র-মানসের প্রগাঢ় চিন্তাশীলতা ও সুতীক্ষè বোধের গভীরতা তাঁর সৃষ্টিশীলতায় সংযুক্ত করেছে বাস্তবধর্মিতা ও জীবনবাদিতা। রবীন্দ্রচিন্তার সমুদ্রপ্রতিম গভীরতার অতল স্পর্শ করে বাংলা সাহিত্যের গবেষকগণ গবেষণালব্ধ বহুমাত্রিক তথ্য উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রসাহিত্য, জীবন ও মানসলোকের সূক্ষèাতিসূক্ষè পর্যালোচনায় গবেষক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ অশেষ রবীন্দ্রনাথ―নামক যে গবেষণা গ্রন্থ বাঙালির মুক্তির মানসে উপহার দিলেন, তা বোধের স্বতন্ত্রতা ও গভীরতায় রবীন্দ্রচেতনার সমুদ্র মন্থন শেষে যেন এক অমৃত উপহার।

অশেষ রবীন্দ্রনাথ―গ্রন্থের সূচনা প্রবন্ধ, ‘কে রবীন্দ্রনাথ কেন রবীন্দ্রনাথ’। আলোচ্য প্রবন্ধের নামকরণে যে সংকেত তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয়পর্বকে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিকের অভিপ্রায়কে পরিপূর্ণভাবে ব্যক্ত করে। এ প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষের পরিশুদ্ধ বিবেচনায় বাঙালির জাতীয় জীবনের মহীরুহ রূপে পরিচিতি পায়। প্রকৃত অর্থে রবির কিরণ সর্বব্যাপী মানব কল্যাণমুখী। এ বিষয়টি অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রচর্চা ও উপলব্ধির প্রসঙ্গে অপর্যাপ্ত বোধ, পাঠের পরিসর ও প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের প্রত্যক্ষ সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকাশে পূর্ণতা পায়নি। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার কড়িকাষ্ঠে রবীন্দ্রপ্রতিভা প্রতিমুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ‘কে রবীন্দ্রনাথ কেন রবীন্দ্রনাথ’―প্রবন্ধে রবীন্দ্রসত্তার অন্তর্ভাবনা ও দূরদর্শিতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানব চেতনার বিষয়টি মুখ্যরূপ পেয়েছে। মানবকল্যাণ ও মানবমুক্তির প্রয়াস কবিগুরুকে করেছে সমাজ উন্নয়নের চেতনাবাহী। এ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সমাজ সংস্কার, মানবতাবাদী চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য জাগরণে অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সচেষ্ট এক দৃঢ়তার নাম। রবীন্দ্রবিশ্ববীক্ষণে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা ও সার্বিক মানবকল্যাণ অভিমুখী রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।

‘রবীন্দ্রনাথের বিশ্বায়নচেতনা’― শীর্ষক প্রবন্ধে বিশ্বজিৎ ঘোষ সমাজ বিনির্মাণে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার দার্শনিকতা দেখিয়েছেন। প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে আবির্ভূত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-চেতনায় রয়েছে বিস্ময় জাগানিয়া আধুনিকতা। একবিংশ শতকের কুহেলিকায় যে বিশ্বায়নচেতনা পূর্ণ প্রতিভাত নয়, সে চেতনাকে বাস্তবায়িত করার প্রথম প্রয়াস রবীন্দ্রমানসেই পরিলক্ষিত হয়। গল্প, উপন্যাস, ছড়া, নাটক, প্রবন্ধ রচনাতে শুধু নয়, রবীন্দ্র চেতনায় গণ্ডি ভাঙ্গার অভিপ্রায় এবং গোষ্ঠীবদ্ধ চেতনাকে সার্বজনীন করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যেন সে প্রচেষ্টার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গোরা-উপন্যাসে গোরার সংকীর্ণতা মুক্তির মধ্যেই কালোত্তীর্ণ, যুগোত্তীর্ণ বিশ্বায়নচেতনার পুরোধা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রগতিশীল মানস পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বিশ্বজিৎ ঘোষের এ প্রবন্ধে উজ্জ্বল হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদের বিশ্বায়নে বিশ্বাসী ছিলেন। রবীন্দ্র চেতনায় বর্তমান বিশ্বে পণ্যের বিশ্বায়ন নয়, প্রকৃতপক্ষে মানবতাবাদই সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম রসদ হিসেবে স্বীকৃত।

‘রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন-ভাবনা : পল্লিশিক্ষা’―প্রবন্ধের নামকরণেই বিষয়-ভাবনাকে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ পাঠক সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে একই সঙ্গে ভাবয়িত্রী এবং কারয়িত্রী গুণের উল্লেখ করেছেন। ভাবকল্পনা বিলাসী রবীন্দ্রনাথের কর্মযজ্ঞ তথা জীবনপ্রবাহে চৈতন্যের জাগরণ ছিল বিবিধ ধারায় প্রবাহিত। এই ভাবয়িত্রী ও কারয়িত্রী গুণের অন্যতম গ্রামোন্নয়ন ভাবনা ও সে ভাবনার সফল কার্যকারিতায় তিনি পল্লির শিশুশিক্ষা, বয়স্কশিক্ষা, নারীশিক্ষা ও লোকশিক্ষার প্রসারে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা বলতে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র আক্ষরিক জ্ঞানকেই নির্দেশ করেননি। পল্লির সাধারণ সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের যথার্থ মানুষ করে তোলার যাতনাবোধই রবীন্দ্রনাথের পল্লিশিক্ষা ভাবনার সহায়ক। সম্পৃক্ত বিষয়ে ১৯০১ সালে তিনি ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পল্লিশিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেন। গ্রামোন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম শিক্ষা বিস্তারে রবীন্দ্রচেতনায় যে চতুর্মুখী ভাবনার পরিচয় মেলে, সেখানে শিশুশিক্ষার প্রয়োজনে তিনি আশ্রমধর্মী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। পরবর্তীকালে মুক্ত আকাশ ও প্রকৃতির মাঝে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠিত হয়। বয়স্কশিক্ষার কারিকুলামে বয়স্কদের অক্ষরজ্ঞানের পাশাপাশি মুখে মুখে দেশ-বিদেশের ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কৃষি, বন্যা-নিয়ন্ত্রণ, অগ্নি-নিয়ন্ত্রণ ও অঙ্কশাস্ত্রের শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে নারীকে সুগৃহিণী ও শিক্ষিত জননী গড়ে তোলা এবং সাংসারিক সূচিকর্মে পারদর্শী করে তোলার বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সে লক্ষ্যেই শান্তিনিকেতনে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোকশিক্ষাকেও রবীন্দ্রনাথ অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। যাত্রা, কথকতা, কীর্তন ও পালা-পার্বণের অনুষ্ঠানকে লোকশিক্ষার সহায়ক বলেছেন। বিশ্বজিৎ ঘোষ এ প্রবন্ধের মাধ্যমে দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামচেতনা ও পল্লি উন্নয়নে যে পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন তা পরবর্তীকালে ব্যাপকতা পেয়েছে। সুষ্ঠু গবেষণার মাধ্যমে সুগঠিত প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনাকে অধিক পরিস্ফুট করে তোলে।

‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ফ্যাসিবাদ- বিরোধিতা’ ―প্রবন্ধে রবীন্দ্র চেতনার মানবিক বিশ্ববীক্ষা, মানবতাবাদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে জার্মানি-ইতালি-স্পেন ও জাপানের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র শাসনব্যবস্থার আগ্রাসনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তীব্র প্রতিবাদী। লেখনীর মাধ্যমে তিনি অমানবিক সাম্রাজ্যবাদ ও মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের এ আন্দোলন ছিল সাহিত্যিক আন্দোলন। ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে সোচ্চার লেখনি রবীন্দ্রসাহিত্যে তথা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিল। চেতনায়, মননে জীবন বিশ্বাসী, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাসে মানবতার জয়পতাকা একাগ্র নির্ভীকচিত্তে উড্ডীয়মান হয়েছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ফ্যাসিবাদী তাণ্ডব-হত্যাযজ্ঞ স্পেন প্রজাতন্ত্র রক্ষার মানসে রোঁম্যা রোঁল্যা ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আবেদন করলে রবীন্দ্রনাথ সে আবেদনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ শোষণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে মানবতার ঘোষণা সমৃদ্ধ লেখনি ধারণ করলেন। রবীন্দ্রনাথের ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানবতাবাদী লেখনির প্রভাবে অন্যান্য লেখকদেরও স্বচ্ছন্দ অংশগ্রহণে গড়ে উঠল ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। এ সময় শুধু সাহিত্য রচনা নয়, ছবি এবং কার্টুন এঁকেও রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশক।

‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ এবং রবীন্দ্রনাথ’-শীর্ষক প্রবন্ধে ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অর্থাৎ এ লেখক সঙ্ঘ গঠনের পটভূমি, উদ্দেশ্য, সফলতা, কার্যবিবরণী, কর্মপরিকল্পনা, অনুসারী সদস্যদের তথ্যসহ সকল বিষয় সুসমন্বিত, সুগঠিত ভাষায় বিশ্বজিৎ ঘোষ উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্র চেতনার সূত্রানুসন্ধান ও সাহিত্যিক বিচরণ সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপনে অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি তথ্যে-উপাত্তে ঋদ্ধ এক অনন্য গবেষণাগ্রন্থ।

‘ব্রিটিশ সংবাদপত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ’―প্রবন্ধে প্রাচ্যের সম্পদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্চাত্যের সংবাদপত্রে মহামূল্যবান শিরোনাম হয়ে উঠেছিলেন, সে বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের তৃতীয়বার বিলেত যাত্রার কারণ ছিল ভ্রমণ আকাক্সক্ষা। ভ্রমণের জন্য তৃতীয়বার বিলেত যাত্রায় রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবনবোধ ও সাহিত্য সাধনায় নবচেতনার দ্বারটি উন্মুক্ত হয়েছিল। সে সময় থেকে ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদপত্রে রবীন্দ্র বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ প্রচার হতে থাকে। পরবর্তীকালে প্রায় চার দশক ইংল্যান্ডের নানা পত্রিকা ও সাময়িকীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম তথা গান, নাটক, ছড়া, ছোটগল্প, প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। গীতাঞ্জলির কবিতাগুলো এ সময়েই ভাষান্তরিত করার কাজটি শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনায় ফ্যাসিজম এর তীব্র বিরোধিতা ইংল্যান্ডের পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তার হ্রাস ঘটায়। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেন―‘তাঁর মৃত্যুর পর “প্রেস-কভারেজে”র স্বল্পতাই একথার প্রমাণ বহন করে। রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বের তুলনায় তাঁর মৃত্যুসংবাদ ইংল্যান্ড তথা গোটা ইউরোপেই কম “প্রেস-কভারেজ” পেয়েছে।’ (পৃ. ৭০)

‘রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথের নোবেল’―প্রবন্ধ পাঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি সংক্রান্ত পাঠকের সমূহ মনোজিজ্ঞাসার সমাধানে তৃপ্তিযোগ অবশ্যম্ভাবী। অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধগ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধের মতো উল্লিখিত প্রবন্ধটিও গীতাঞ্জলি ও Gitanjali-এর সার্বিক পরিচিতি ও অবস্থান সম্পর্কে পাঠককে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তি বাঙালির জন্য যতটা গর্বের বিষয় নোবেলপ্রাপ্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা বা আগ্রহ ততটা প্রবল নয়। গর্বিত বাঙালি হিসেবে কবিগুরুর নোবেল প্রাপ্তির অনুপুঙ্খ ইতিহাস সম্পর্কে অনুসন্ধান কর্মটি নিতান্ত সহজ না হওয়াও যেন এরূপ বিড়ম্বনার জন্য দায়ী। এ প্রসঙ্গে অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের আলোচ্য প্রবন্ধে সংকলিত তথ্য-জিজ্ঞাসু, জ্ঞানপিপাসু, পাঠক তথা বাংলা সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞান-শূন্যতা পূরণে অদ্বিতীয় একটি গবেষণালব্ধ উপস্থাপনা। এ প্রবন্ধ বাঙালির অজ্ঞানতাজনিত বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে গ্রথিত চিরপ্রচলিত ভুলকে শুধরে দেয়। বাঙালির বিশ্বাস গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘এখন যে গীতাঞ্জলির শতবর্ষের কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে ইংরেজি Gitanjali- র শতবর্ষ। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলান কোম্পানি ১৯১৩ সালে প্রকাশ করেছিল রবীন্দ্রনাথের Gitanjali। গীতাঞ্জলি শব্দটি বাংলাভাষী ভিন্ন অন্যরা বুঝতে পারবে না বলে বইয়ের প্রচ্ছদে Gitanjali- র নিচে উপশিরোনামায় লেখা হয়েছিল  Song Offerings’।’ (পৃ: ৭২) এ প্রবন্ধের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলা গীতাঞ্জলির ১৫৭টি কবিতার মধ্য থেকে ৫৩টি কবিতা ইংরেজি Gitanjali-তে অনূদিত অবস্থায় স্থান পেয়েছিল। Gitanjali ১০৩টি কবিতার সংকলন হওয়ায় বলা যায় বাংলা গীতাঞ্জলি ও ইংরেজি Gitanjali এক কাব্যগ্রন্থ নয়। Gitanjali-র বাকি ৫০টি কবিতার উৎস রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কাব্য ও নাটক। অসুস্থ শরীরে সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচনাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে শুরু করেন। এই অনুবাদকৃত রূপই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত এরঃধহলধষর।  বিশ্বজিৎ ঘোষ এ প্রবন্ধে বলেছেন―‘ইংরেজি অনুবাদের পাণ্ডুলিপি ইংল্যান্ডের পাতাল রেলে অসাবধানতাবশত হারিয়ে যায়, পরে ‘লস্ট প্রপার্টি’র অফিস থেকে রবীন্দ্রনাথ পাণ্ডুলিপিটি ফেরত পান।’ (পৃ: ৭৩) জনশ্রুতি যা-ই হোক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে Gitanjali-র অনুবাদক। এ বিষয়ে পাঠকের দ্বিমত এ প্রবন্ধ পাঠে দূরীভূত হবে বলেই বিশ্বাস রাখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর Gitanjali-বন্ধু রোদেনস্টাইনকে উৎসর্গ করেছেন এবং ম্যাকমিলান কোম্পানি থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ইয়েটসের মতে Gitanjali-প্রকাশের পরে ইউরোপ জুড়ে রবীন্দ্রনাথের কাব্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ইংরেজ কবি স্টার্জ মুর সুইডিশ নোবেল কমিটির কাছে Gitanjali উপস্থাপন করেন। নোবেল পুরস্কারের জন্য রবীন্দ্রনাথসহ ২৮ জনের নামে সুপারিশ করা হয়েছিল। ২৮ জনের মধ্য থেকে নোবেল কমিটি ১৯১৩ সালে বাঙালির গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেন।

‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পাঠের ভূমিকা’, ‘রবীন্দ্র ছোটগল্পে নিম্নবর্গ’, ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে উপনিবেশিত বাংলা’ ও ‘রবীন্দ্র-ছোটগল্পের নাট্যচারিত্র্য’-শীর্ষক চারটি প্রবন্ধ যেন বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীর পিপাসার্ত হৃদয়ের ছোটগল্পকেন্দ্রিক ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটায়। অসাধারণ তথ্যবহুল গবেষণাসমৃদ্ধ সুশৃংখল পদবিন্যাসে বিন্যস্ত করে ছোটগল্পের আঙ্গিক গঠনকে সুস্পষ্ট করে তুলেছেন। প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পাঠের ভূমিকা’ নামক প্রবন্ধে বলেন―‘পুঁজিবাদী সভ্যতার অভ্যন্তর-সীমাবদ্ধতার চাপে, সময়ের শাসনে মানুষ যতই যান্ত্রিক হয়েছে, ছোটগল্প-সাহিত্যের বিকাশ ততই হয়েছে ঋদ্ধ। পূর্ণ জীবন নয়, বরং বৈরি পৃথিবীতে জীবনের খণ্ডাংশই মানুষের কাছে প্রাধান্য পেল। এ অবস্থায় উপন্যাসের পরিবর্তে ছোটগল্প উঠে এলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কেননা, একক অনুষঙ্গের আধারেই ছোটগল্পে ফুটে উঠল পূর্ণ জীবনের ব্যঞ্জনা―পদ্মপাতার শিশিরে যেমন হেসে ওঠে প্রভাতে সম্পূর্ণ সূর্য।’ (পৃ. ৭৯) প্রকৃতপক্ষে ঊনিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলা ছোটগল্পের যে শুভ যাত্রার সূচনা তার পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে ছোটগল্পের যে উজ্জ্বল উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল তার স্বরূপ অনুসন্ধানে অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ গ্রন্থের ছোটগল্প ও ছোটগল্পের আঙ্গিক সম্পর্কিত প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের গবেষণালব্ধ অভিমত ব্যক্ত হয়েছে। লেখকের মতে :

‘ঔপনিবেশিক শাসনের এক বিশেষ পর্যায়ে বাংলার পল্লিগ্রাম যে অর্থনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে এবং বুর্জোয়া মানবতাবাদের প্রভাবে বাংলায় দেখা দেয় যে নবতর জীবনবোধ, বস্তুত, এই দ্বৈত প্রবণতাই সম্ভব করেছিল ছোটগাল্পিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল আবির্ভাব।’ (পৃ: ৮০)

রবীন্দ্র ছোটগল্পের উৎকর্ষের উৎস সন্ধানে অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থ এক সুপরিকল্পিত দিকনির্দেশনার স্মারক স্বরূপ। ছোটগল্পের বিষয় বা কাহিনির মুলভাব ও চরিত্রের বহুমাত্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র ছোটগল্পকে সময়কালের ওপর ভিত্তি করে প্রাবন্ধিক তিনটি শ্রেণিতে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। প্রথম ভাগের সময়সীমা নির্দেশ করেছেন ১৮৯১-১৯০০ খ্রি. । দ্বিতীয় পর্বের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯০১-১৯১৩ খ্রি. পর্যন্ত লিখিত গল্প। তৃতীয় বা শেষ পর্যায়ে গল্পগুলো ১৯১৪-১৯৩৩ খ্রি. সময়কালের মধ্যে লিখিত হয়েছে। অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ গ্রন্থে গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ গল্পের শ্রেণিকরণ ও বিষয়বিন্যাস করা হয়েছে।

‘রবীন্দ্র ছোটগল্পে নিম্নবর্গ’―প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক নিম্নশ্রেণি তথা অপর বা other সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক চেতনায় কীভাবে মানব হৃদয়ে বিচ্ছিন্নতার সূচনা, খণ্ডিত মূল্যবোধ, ব্যক্তি জীবনবোধ, জীবনচেতনা প্রাধান্য পেয়েছে তার সুচারু বর্ণনায় পাঠক অনায়াসে ঋদ্ধ হয়। সমাজের নিম্নশ্রেণি অর্থাৎ সে শ্রেণি শুধু গরিব নয় গরিবেরও গরিব, তলেরও তলে গভীর অতলে যাদের সামাজিক অবস্থান সেই অপরদের (other) কথা উল্লেখ করেছেন। তবে রবীন্দ্র ছোটগল্পের নিম্নবর্গ দ্বিমাত্রিক দৃষ্টিকোণে পর্যবেক্ষণযোগ্য। নিম্নবর্গের বা ভদ্র সমাজ বহির্ভূত অপর শ্রেণির মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি বিবেচ্য হলেও রবীন্দ্র ছোটগল্পের বর্ণপ্রথা তথা জাতিবর্ণের ভেদাভেদেও নিম্নবর্গ বা ‘অপর’ নির্দেশিত হয়েছে।

‘রবীন্দ্র ছোটগল্পে উপনিবেশিত বাংলা’―প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা-রাজনীতিতে উপনিবেশবাদ বা উত্তর-উপনিবেশবাদের ভয়াল প্রভাব। আগ্রাসী উপনিবেশবাদ ও উত্তর উপনিবেশবাদ ব্যক্তিচেতনায় স্থান নিয়ে গ্রাস করেছে তাঁর সামাজিকীকরণ ক্ষমতা। ব্যক্তি-উপলব্ধিতে জাগ্রত হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবোধ। সাহিত্যের তথা ছোটগল্পের কাহিনিতে স্থান পেয়েছে যুগ্ম বৈপরীত্য সূচক সম্পর্ক। কাহিনিতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে ব্যক্তির আমিত্ব বা আমি সত্তা। কেন্দ্রীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক দূরত্ব শ্রেণিবৈষম্য ও বৈপরীত্য এ পর্যায়ে এসে নব চিন্তন প্রক্রিয়ায় আত্মপ্রকাশ করেছে। এ ধারার উৎকৃষ্ট ছোটগল্প রূপে ‘পোস্ট্মাস্টার’, ‘একরাত্রি’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের শিল্পসার্থকতা বিশ্লেষণে গবেষক প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষের কলমে যা উপস্থাপিত হয়েছে তা পাঠককে শুধু বিমোহিতই করে না, বিস্ময়ের ঘোর-মগ্নতায় নব নব উপলব্ধি ও আবিষ্কারের চেতনাকে সমৃদ্ধ এবং পরিপুষ্ট করে তোলে। ব্যক্তির পরিচয় বা আমির আমিত্বকে প্রকাশ করার অভিপ্রায়ে রবীন্দ্রনাথ ‘পোস্ট্মাস্টার’ গল্পের নায়কের নাম উল্লেখের প্রয়োজন মনে করেননি। ‘একরাত্রি’ গল্পের ‘আমি’ ও ‘আমার’ চেতনাবোধ চরিত্রে রূপ নিয়েছে। ‘পোস্ট্মাস্টার’ গল্পের ‘পোস্ট্মাস্টার’ ও ‘একরাত্রি’ গল্পের ‘আমি’ উপনিবেশবাদের বিচ্ছিন্নতা ও খণ্ডতার প্রতীক। ব্যক্তিসত্তার খণ্ডতা ও বিচ্ছিন্নতা শ্রেণিবৈষম্যকে প্রকট করেছে। খণ্ড জীবনযাপনে ব্যক্তিক বিচ্ছিন্নতা ও নেটিভ পরিচয় তথা অপাঙক্তেয় ‘অপর’ (ড়ঃযবৎ) পরিচয় কলকাতার নাগরিক জীবনে এক ভয়াবহ সঙ্কটের সৃষ্টি করেছিল। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পটির বিশ্লেষণে কলকাতার ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের দাসত্ব ও তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নেটিভদের জয়লাভের সংকেত কাহিনির প্রবহমানতায় পরিস্ফুট হয়েছে। উপনিবেশবাদের প্রভাবযুক্ত গল্পের বিশ্লেষণে প্রাবন্ধিক বারবার মেকলে-সৃষ্ট মেকি ভদ্রলোক সত্তার অস্তিত্ব পেয়েছেন কলকাতার অধিবাসী পোস্ট্মাস্টার এবং ‘একরাত্রি’ গল্পের আমি সত্তায়। লেখকের ভাষায়―‘উপনিবেশিত সমাজে কেউ যে কারো নয়, সর্বত্রই যে বিচ্ছিন্নতা খণ্ডতা আর প্রবঞ্চনার উন্মাদনা, তাতো “আমি” আর সুরবালার গল্প “একরাত্রি”তেও দেখা যায়।’ (পৃ. ১০৫)

‘রবীন্দ্র-ছোটগল্পের নাট্য-চারিত্র্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিশ্বজিৎ ঘোষ ছোটগল্পের দৃশ্যগুণ সম্পর্কে অর্থাৎ রবীন্দ্র ছোটগল্পের বহুমাত্রিক ও বহুবর্ণিল আলোকচ্ছটার অন্তরালে নাট্যগুণ ও নাট্য-চরিত্রের উপস্থিতির বিশ্লেষণাত্মক বিবরণী প্রদান করেছেন। তার মতে―‘কেবল ছবি নয়, রবীন্দ্র-গল্পে শব্দকল্পের নিপুণ নির্মাণও নাট্য-চারিত্র্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাস্তব প্রতিবেশ নির্মাণের জন্য প্রতিবেশের যথাযথ শব্দ-সংযোজন নাটকের অনিবার্য শর্ত।’ (পৃ. ১১৫) নাটকের অনিবার্য শর্তের উল্লেখে যথাযথ যুক্তি ও শর্ত সাপেক্ষে ‘পোস্ট্মাস্টার’, ‘একরাত্রি,’ ‘শাস্তি’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘সুভা’, ‘হৈমন্তী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘নষ্টনীড়’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পের নাট্যগুণকে স্বীকার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে নাটক দৃশ্যকাব্যের অন্তর্গত। রবীন্দ্র ছোটগল্পে প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং সমাজের যে বর্ণনা তা পাঠকমনে দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি করে। নাটকীয়তার নানা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রবীন্দ্র ছোটগল্পে দৃশ্যকল্প ছাড়াও যে বিষয়ের দিকে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ সুতীক্ষè দৃষ্টিপাত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে পরিবেশনের উপযোগী নাট্য মুহূর্ত, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বৈচিত্র্য, নতুনত্বের ব্যঞ্জনা, পাঠকের কৌতুক জাগিয়ে রাখার ক্ষমতা, গল্পের কাহিনিতে নাটকের অনুরূপ পরিচ্ছেদ বিভাজন, সুগঠিত সংলাপের ব্যবহার, সংলাপে রয়েছে দ্বান্দ্বিকতার উপস্থিতি এবং সিমেট্রির শৈল্পিক ব্যঞ্জনাসহ গীতিময়তার নানা মাত্রা সংযোজনে ছোটগল্পের বিস্তৃতিও যেন নাট্যসাহিত্যের সমৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণে রবীন্দ্র ছোটগল্প প্রকৃতার্থে ছোটগল্প হলেও সেগুলো বাংলা সাহিত্যের নাট্যাঙ্গনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে। প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ রবীন্দ্র ছোটগল্পে নাট্যিকবৈশিষ্ট্যের উপস্থিতির যুক্তির অন্বেষণে বলেছেন :

‘শত শত বছর পূর্বে এ দেশে প্রচলিত সাহিত্যিক ঐতিহ্যে নাচ-গান-কবিতা- কথা-সঙ্গীত-বর্ণনার যে যুগপৎ মিলন ঘটেছিল―সেকথা আমাদের অজানা নয়, অজানা ছিল না রবীন্দ্রনাথেরও। এ কারণেই তাঁর রচনায় কবিতা-গান- নাটক-চিত্র-বর্ণনা-কথা একাকার হয়ে গেছে।’ (পৃ: ১২১)

‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে বাংলাদেশের জীবন ও প্রকৃতি’―নামক প্রবন্ধে ছোটগল্পের কাহিনির অন্তঃগভীরে উপলব্ধ বাংলাদেশের মানুষ, তাদের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের রূপায়ণ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। জমিদারি পরিচালনার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে অবস্থানকালে ঊনবিংশ শতকীয় চেতনালব্ধ প্রথম পর্যায়ের গল্পগুলো রচনা করেছেন। বিশ্বজিৎ ঘোষ এর মতে, ‘উনিশ শতকের গল্পে জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির যে নিবিড় সংযোগ, বিশ শতকের গল্পে তা ক্রমশ অপসৃত; এ পর্বে রবীন্দ্রনাথ কলকাতা নগরজীবনের মধ্যবিত্তমানসের নানামাত্রিক জটিলতা আর অসঙ্গতি আর অনন্বয় নিয়ে গল্প নির্মাণ করেছেন।’ (পৃ: ১২২) অর্থাৎ বাংলাদেশকেন্দ্রিক ছোটগল্পের আখ্যানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার নগরকেন্দ্রিক জীবনচিত্র অভিনিবেশিত করেননি।

এ পর্যায়ের রবীন্দ্র ছোটগল্পে পূর্ববঙ্গের তথা বাংলাদেশের সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গে বিশেষ সংযোগ রয়েছে। নদীবিধৌত বাংলাদেশে জমিদারি পরিচালনায় এসে একরাশ মুগ্ধতার সমন্বয়ে বাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে ছোটগল্পের কাহিনির অন্তঃস্থলে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। আপন মনে প্রকৃতির বহুমাত্রিক রূপ-চিত্র অঙ্কন করলেন। রবীন্দ্র ছোটগল্পে নিম্নশ্রেণির নানা পেশাজীবী স্থান পেলেও বাংলার কৃষক শ্রেণি অনুপস্থিত। বুঝি বা কৃষক সমাজের সংস্পর্শ থেকে রবীন্দ্রনাথের দূরে থাকাই এর মূল কারণ। এ পর্যায়ের ছোটগল্পে জমিদারদের প্রজাপীড়ন, বিকৃত নির্যাতনসহ অনেক ইতিবাচক দিক ফুটে উঠেছে। ব্যবসায়িক শ্রেণি, মধ্যবিত্ত শ্রেণিসহ বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ তথা ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, জেলে, তাঁতি, কুমোর, গৃহভৃত্য, ছোট চাকুরে, গৃহপরিচালিকা, ডোম শ্রেণির চরিত্র রয়েছে।

 রবীন্দ্র ছোটগল্পে আঠারোটি মুসলিম চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটলেও বাংলাদেশে অবস্থানকালে রচিত গল্পগুলোর মধ্যে মাত্র একটি গল্পে মুসলিম চরিত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘খাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ‘শাস্তি’, ‘সমাপ্তি’, ‘সমস্যাপূরণ’, ‘অনধিকার প্রবেশ’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’ পূর্ববঙ্গে রচিত গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। পল্লিবাংলার অপাঙক্তেয় চরিত্র বালিকা রতন (পোস্টমাস্টার), গিরিবালা (মেঘ ও রৌদ্র), ফটিক (ছুটি), তারাপদ (অতিথি) এর মত গ্রাম্য বালক-বালিকার মনস্তত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসাধারণ সব গল্প রচনা করেছেন। নারী মনস্তত্ত্বের রূপায়ণে ও নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে প্রকটায়িত করতে ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরা চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন যা বাংলা সাহিত্যের এক বিরল সৃষ্টি। চন্দরা চরিত্রটি রবীন্দ্র ছোটগল্পে সৃষ্ট নারী চরিত্রের মধ্যে উজ্জ্বলতম নারী চরিত্র। পল্লিবাংলার তথা পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি ও মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা, মনস্তত্ত্ব ঊনিশ শতকীয় বা রবীন্দ্র ছোটগল্পের প্রথম পর্যায়ের গল্পগুলোর আখ্যান হয়ে উঠেছে।

‘ছোটগল্পের শিল্পরূপ: শাস্তি’―প্রবন্ধটি অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রবন্ধ। ‘শাস্তি’ গল্পের শিল্পরূপ বিশ্লেষণে অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ দৃষ্টিগোচর হলেও আলোচ্য প্রবন্ধটি বিশ্বজিৎ ঘোষের গবেষণার সূক্ষ্মবিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনন্য পর্যায়ে উন্নীত। ‘শাস্তি’ গল্পের শিরা-উপশিরার ব্যবচ্ছেদ যেন সম্পন্ন হয়েছে প্রাবন্ধিকের গভীর নিবিষ্ট অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে। প্রাবন্ধিক এখানে গল্পের আঙ্গিকে ব্যবহৃত প্রতিটি পদের শাব্দিক অর্থ ও ভাবার্থ অনুসন্ধান করেছেন। এমনকি যতিচিহ্নের ভাবার্থকেও তিনি এড়িয়ে যাননি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ যতিচিহ্ন ব্যবহার করেও বলে গিয়েছেন নানা অব্যক্ত কথা। বিশ্বজিৎ ঘোষ এ পর্যায়ে এসে সেই ভাবসত্যের দ্বার উন্মোচন করলেন। ‘শাস্তি’ গল্পের যথার্থ শিল্পমূল্য বিচারে নানা কৌণিক বিন্দু থেকে প্রাবন্ধিক গল্পের প্রেক্ষাপট, কাহিনি ও চরিত্রে পর্যবেক্ষণতুল্য বহুবর্ণিল বিচিত্র আলো নিক্ষেপ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বিশালতা ও গভীরতাকে সত্য ও জীবন্ত করে তুলেছেন। উল্লেখ্য ‘স্বামীরাক্ষস’ শব্দ, গল্পের শেষে ব্যবহৃত ড্যাশ (―) চিহ্ন, ছিদামের চরিত্র বিশ্লেষণে ‘তবু ছিদাম তাহার যুবতী স্ত্রীকে একটু বিশেষ ভালোবাসিত’―বাক্যের ‘তবু’, ‘যুবতী’ এবং ‘বিশেষ’ শব্দকে চিহ্নিত করে বিশ্বজিৎ ঘোষ ছিদাম চরিত্রকে যেন কোষমুক্ত করলেন। ভাবার্থের গভীরে অন্তর্নিহিত চিরসত্য যা সাধারণ পাঠকের আপাতদৃষ্টিতে দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রাবন্ধিক যেন সে অসম্ভবকে সম্ভব করে উপস্থাপন করলেন। জমিদারি প্রথায় নিম্নবর্গের জীবনচেতনা, রাইয়ত প্রজার দুর্বিষহ জীবন, অত্যাচার-নির্যাতন, শোষণ, ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা, অপাঙক্তেয় ‘অপর’ (ড়ঃযবৎ) নিচু জাতের নারীর প্রতি মধ্যস্বত্বভোগী রামলোচনের তুচ্ছার্থে ‘মাগি’ সম্বোধন, গল্পের শেষে চন্দরার অনুচ্চারিত কথার বিপুল শব্দরাজির অন্তর্নিহিত গূঢ় ভাববস্তুকে সাধারণ পাঠকের বোধগম্যতায় যেন সরল ভাষায় অনুবাদ করে উপস্থাপন করলেন। চন্দরা ঊনিশ শতকীয় গ্রাম্য নারীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল পরিপূর্ণ এক চরিত্র। গল্পের শেষ শব্দ ‘মরণ’। ‘মরণ’ শব্দটির পরে ড্যাস (―) চিহ্নের ব্যবহারে প্রাবন্ধিক চন্দরার অনুচ্চারিত ক্ষোভ তথা অসংখ্য অব্যক্ত কথার ইঙ্গিত প্রমাণ করেছেন। বিশ্বজিৎ ঘোষের মননশীল সূক্ষ্ম-পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় ‘শাস্তি’ গল্পের শিল্পমূল্য বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটির সমৃদ্ধ রূপের বিশেষ পরিচয় প্রদান করে।

‘রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য: গদ্যরীতি’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের গদ্যরীতির প্রবাহ, গতিশীলতা, বাক পরিবর্তন ও ভাব প্রকাশে ভাষার বৈদগ্ধ বিবর্তন এর দিকে অধিক দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। রবীন্দ্রসাহিত্য সাধনার বহুমাত্রিক প্রতিভা যথা গল্প-উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, জীবনস্মৃতি, চিঠিপত্র, আত্মজীবনী রচনায় তিনি বিচিত্র গদ্যভাষার ব্যবহার করেছেন। এমনকি কবিতার মধ্যেও গদ্যভাষার প্রভাব দেখিয়েছেন। ঊনিশ শতকীয় সমাজ সভ্যতার বিবর্তনে যে গদ্য সাহিত্যের ঊন্মেষ ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিরল প্রতিভার সংস্পর্শে সে গদ্য সাহিত্য পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রপ্রতিভা কবিতা ও গদ্যের ভাষায় উভয় ক্ষেত্রেই যে শিল্পসার্থক ধ্বনিব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেও বিরল। ভাষার প্রতি ছিল কবিগুরুর প্রবল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। কবিতা রচনায় তাই তিনি কাব্যভাষা এবং প্রয়োজনে গদ্যভাষারও সুনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ সাধন করেছেন। অনুরূপভাবে গদ্যভাষাতেও পরিমিতরূপে কাব্যময়তা পরিবেশন করেছেন যা অনবদ্য সৃষ্টি। গীতিকবিতার ছন্দময়তা পরিমিতরূপে রবীন্দ্রগদ্যে ধ্বনিত হলেও তা যথার্থ সুলালিত্যময় প্রাঞ্জল গদ্যভাষা হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ ঘোষের মন্তব্য―‘রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের গল্পের ভাষা কাব্যধর্মী ও কবিতাস্পর্শী। কেবল প্রথম পর্বের গল্প নয়, একথা রবীন্দ্রনাথের সমগ্র গদ্যরচনা সম্পর্কেই প্রযোজ্য।’ (পৃ: ১৫৮) রবীন্দ্র প্রতিভার স্বরূপ উন্মোচনে ভাষার প্রশ্নে বিশ্বজিৎ ঘোষ এ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যটি উপস্থাপন করেছেন। বুদ্ধদেব বসুর মতে―‘… বিশ্বসাহিত্যে আমরা আর-কোনও লেখকের কথা জানি না যিনি একই সঙ্গে বিরাট কবি এবং মহৎ গল্পলেখক, শুধুমাত্র এই কারণে আমরা যেন ধরেই নিই যে একসঙ্গে ও-দুটো হওয়া যায় না, এবং এই সূত্র অনুসারে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে একটু তলার দিকে ঠেলে দেবার ঝোঁক হয় আমাদের।’ (পৃ: ১৫৮) প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য ভাষায় যে কাব্যময়তার উপস্থিতি তা বাংলা গদ্যের প্রবহমানতায় এক স্বতন্ত্র ভাবধারা সমন্বিত গদ্যভাষাকে উপস্থাপন করে। আলোচ্য প্রবন্ধে ছোটগল্পের অনুরূপভাবে বিশ্বজিৎ ঘোষ রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষার সাহিত্যকে তিনটি শ্রেণিতে শ্রেণিকরণ বা পর্ব-বিভাজন করেছেন। তাঁর মতে―

‘ক. আদিপর্ব: উনবিংশ শতাব্দীর কথাসাহিত্য;

 খ. মধ্য পর্ব: বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত;

 গ. অন্ত্য পর্ব: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৪০ খ্রি. পর্যন্ত।’ (পৃ: ১৫৬)

আদিপর্ব, মধ্যপর্ব এবং অন্ত্যপর্ব বিভাজন, বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত আলোচনায় এ পর্যায়ে লিখিত গদ্য সাহিত্যের অবয়বে নানা কৌণিক বিন্দু থেকে আলো ফেলে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ তা বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশন করেছেন। অভিনব এ উপস্থাপন বিশেষ নৈপুণ্য যা বোদ্ধা পাঠক ও সমালোচককে বিস্ময়াবিষ্ট করে। আদি পর্বের ৬১ টি ছোটগল্প ও ০৩ টি উপন্যাস, মধ্যপর্বের ১৬ টি ছোটগল্প ও ০৩ টি উপন্যাস এবং অন্ত্যপর্বের ২৯ টি ছোটগল্প ও ০৭ টি উপন্যাস-এর সামগ্রিক ভাষা, বিষয়ভাবনা ও চরিত্রনির্মাণ সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের প্রাজ্ঞ চেতনাময় বিশ্লেষণটি পরিবেশিত হয়েছে। প্রতি পর্বের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প ও উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলোর বিশেষ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আলোচ্য প্রবন্ধের অন্তর্নিহিত বিষয় হয়েছে। প্রথম পর্বের রচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পল্লির প্রকৃতি ও চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক সমীক্ষণ এবং প্রকৃতির সাথে মানবমনের একাত্মতার আবেগঘন রহস্যের ব্যঞ্জনাকে পরিস্ফুট করে তুলতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বের কথাসাহিত্যে প্রকটায়িত হয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক নগর সভ্যতার ছোঁয়া এবং আত্মবিশ্লেষণ। রবীন্দ্রগদ্যের এ পর্বেই ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা, আমি-সত্তার উন্মেষ ও বিকাশের সূচনা। বিশ্বজিৎ ঘোষ এর মতে―‘ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্কের কারণে মধ্যপর্বের কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষা প্রথম পর্ব থেকে সম্পূর্ণ নতুন পথে বাঁক পরিবর্তন করেছে।’ (পৃ: ১৬৫) অন্ত্যপর্বের কথাসাহিত্যের স্পষ্ট স্বরূপ সন্ধানে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘অন্ত্যপর্বের রবীন্দ্রগল্পে প্রাধান্য পেয়েছে ব্যক্তির সঙ্গে প্রথা ও সমষ্টির সংঘর্ষ এবং সকল সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।’ (পৃ: ১৬৮) অন্ত্যপর্বের গদ্যরীতির বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করতে তিনি আরও বলেন―‘অন্ত্যপর্বের অধিকাংশ রচনাই আত্মকথনমূলক বা নিজ-জবানিতে লেখা। উত্তম পুরুষেরা নিজ জবানিতে কোনো কিছু বর্ণনা করতে গেলে স্বভাবতই সেখানে প্রাধান্য পায় কথ্যরীতি।’ (পৃ: ১৭০)

‘রবীন্দ্র কবিতায় শৈব-পুরাণ’ নামক প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় পৌরাণিক চরিত্র শিব ও শিবের সত্য-সুন্দর ও মঙ্গলময় চিরায়ত রূপকে আশ্রয় করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা রচনায় মনোনিবেশ প্রসঙ্গ। আলোচ্য প্রবন্ধে এ সম্পর্কে বিস্তারিত সুশৃংখল আলোচনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। নটরাজ বা শিব চরিত্র কল্পনার মধ্যে রবীন্দ্রকাব্য চিন্তনে বিশ্বসৃষ্টির বৈচিত্র্য ধরা দেয়। এক্ষেত্রে শিবের রূদ্ররূপ নয়―সত্য, সুন্দর মঙ্গলময় রূপটি প্রাধান্য পেয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাতেও শিবের রুদ্ররূপ প্রাধান্য লাভ করেছিল। রূদ্রের ভয়ংকর মূর্তি নয়, মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথও যেন কবিতা পর্বে মানবতাবাদী কর্তব্য পালনের আহ্বান করেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক এর মন্তব্য―‘শিব রবীন্দ্রনাথের কাছে মহাকালের সৃষ্টিশীল রাখাল সত্তায় আবির্ভূত হয়েছেন মানবের কল্যাণ আর মঙ্গলের জন্য।’ (পৃ: ১৭৭)। রবীন্দ্রনাথের কালের রাখাল বা মৃত্যু রাখাল ইত্যাদি কবিতা এবং বীথিকা কাব্যের মেঘমালা কবিতায় শিবের রূপায়ণটি বহুমাত্রিকতায় ধরা দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ শিবের ধ্যানমগ্ন, আত্মমগ্ন, তপস্বী ও প্রেমিক রূপকে আশ্রয় করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মানুষ সমাজের নানা বিশৃঙ্খলা থেকে পরিত্রাণে কবিগুরু শিবের আগমন প্রত্যাশা করেছেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মানবপ্রেমের চেতনায় যেন শিবও একাত্মতা ঘোষণা করেছেন।

‘রবীন্দ্র-কবিতায় গৌতম বুদ্ধ : একটি ভিন্নমাত্রিক অনুষঙ্গ’ নামক প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের মানুষের স্বার্থপর হিংস্রতার স্বরূপটি নির্ণয় করার অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে। জাপানের অহিংস নেতা গৌতম বুদ্ধের আত্মমত নির্বাণলাভকে কীভাবে জাপানিরা ব্যবহার করেছে সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিক্ষিপ্ত মনে ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক কবিতা রচনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদী হিংস্রতা ও ভয়াবহতায় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী জাপানি জনগোষ্ঠী গৌতম বুদ্ধের সামনে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য প্রার্থনায় সমাহিত হয়। সে সময় অন্তরঙ্গ জাপানি বন্ধু কবি নেগুচিও ফ্যাসিস্টদের সমর্থনে অর্থাৎ তাদের স্বজন ও ভাইদের সমর্থনে কবিতা লিখেন। ব্যথিত হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপলব্ধি হয় ধর্ম-বিশ্বাস এখানে স্বার্থ পূরণের হাতিয়ার মাত্র। বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, বুদ্ধ ভক্তি এবং বুদ্ধ ও যুদ্ধ (পরবর্তীকালে এটি শিরোনামহীন ছড়া হিসেবে গ্রন্থভুক্ত হয়) নামক তিনটি কবিতা রচনা করেন। এ পর্বে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় জাপানি ফ্যাসিস্টদের ভণ্ডামি ও প্রতারণার মুখোশটি উন্মোচিত হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক সর্বশেষ লাইনে বলেন―‘এই ব্যঙ্গ রচনাত্রয় রবীন্দ্রনাথের প্রগতি ও প্রতিবাদীচেতনার ভিন্ন এক প্রকাশ রবীন্দ্র-সৃষ্টিশীলতার উজ্জ্বল ও স্মরণীয় এক প্রান্ত।’ (পৃ: ১৮৮)

কালান্তর-এ রবীন্দ্রনাথ : রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুচিন্তাপ্রসূত সাহিত্যপ্রতিভার অন্যতম নিদর্শন প্রবন্ধের অন্তর্গভীরে গ্রথিত তত্ত্বকথার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সমগ্র রবীন্দ্র রচনায় ‘কালান্তর’ এক বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। ৩২ টি প্রবন্ধের সংকলন কালান্তর গ্রন্থের লেখার অন্তর্ছেদে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতার বহুমাত্রিক পরিচয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। ‘কালান্তর’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে ১৫ টি লেখা প্রকাশিত হলেও দ্বিতীয় (১৯৪৮) ও তৃতীয় (১৯৬০) সংস্করণে যথাক্রমে ১১ টি ও ০৬ টি প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছে। ‘কালান্তর’ প্রবন্ধ গ্রন্থের ৩২ টি প্রবন্ধের মধ্যে ‘কালান্তর’ প্রবন্ধে সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ নামক প্রবন্ধে মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিলুপ্ত উন্নত সমাজ ও সভ্যতার স্মৃতিচারণ করেছেন। ‘লোকহিত’ প্রবন্ধটি সমাজচিন্তা বিষয়ক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রবীন্দ্রনাথ সমাজ ও মানুষের সার্বিক কল্যাণের অন্যতম উপায় বলে বিবেচিত করেছেন। ‘লড়াইয়ের মূল’ নামক প্রবন্ধে ভারতীয়দের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা লড়াইয়ের মূল কারণ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে তার স্বরূপটি পরিবর্তিত হওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ আলোচ্য প্রবন্ধে ‘কালান্তর’ প্রবন্ধ গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের সারকথাও সাধারণ পাঠকের পাঠোপযোগী প্রাঞ্জল ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘কালান্তর গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধসমূহ রবীন্দ্রনাথ ওজোধর্মী সংহত পেশিময় ক্লাসিক গদ্যে নির্মাণ করেছেন। নির্মেদ এই গদ্য গভীর বক্তব্যের ভার বহনের সামর্থ্যরে পরিচয়বাহী।’ (পৃ. ২০২)

‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা’ প্রবন্ধে সাহিত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও মনোভাবনার সনিষ্ঠ বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রারম্ভেই প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষের চিন্তাপ্রসূত মন্তব্যটি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন―‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের মতো তাঁর সাহিত্যচিন্তারও মূল বৈশিষ্ট্য মানবকল্যাণ চেতনা। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্যের মৌল বিষয় হচ্ছে মানবহৃদয় ও মানবচরিত্র। ভাবীকালের মানুষকে সন্দীপিত করে তোলাই সাহিত্যের প্রধান কাজ। রবীন্দ্রসাহিত্যে মানবপ্রেম, সত্যনিষ্ঠা, সৌন্দর্যানুভূতি, আন্তর্জাতিক চেতনা এবং কল্যাণবোধের যে সুগভীর প্রকাশ ঘটেছে, তাঁর সাহিত্যচিন্তারও কেন্দ্রীয় লক্ষণ ওইসব প্রবণতা।’ (পৃ: ২০৩) রবীন্দ্র সাহিত্য ভাবনার স্বাতন্ত্র্যকে উপস্থাপনের প্রয়োজনে প্রাবন্ধিক প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪), অক্ষয় কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) এর সাহিত্যভাবনা অর্থাৎ সাহিত্য দর্শন বা সাহিত্যাদর্শের সারকথাকে প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অক্ষয় কুমার দত্তের সাহিত্যাদর্শ; বিজ্ঞান ধর্মকে উপজীব্য করে তিনি মানুষকে সাহিত্য পরিবেশন করতে চেয়েছেন। বিদ্যাসাগরের সাহিত্য ছিল সংস্কারবাদী। সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের মানবিকতার ঘুমন্ত সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বঙ্কিমের সাহিত্যভাবনার মূলে ছিল নীতিবাদিতা এবং মানবচিত্তের পরিশুদ্ধির প্রয়াস। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসাহিত্য-ভাবনায় স্থান পেয়েছে মানবপ্রেম, সৌন্দর্যানুভূতি, সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক চেতনা। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনায় যে নবচেতনার উদ্ভব তা রবীন্দ্র সাহিত্যাদর্শে বহুমাত্রিক ধারায় বিকশিত হয়েছে। রবীন্দ্র সাহিত্যভাবনা কেন্দ্রিক আধুনিক সাহিত্য (১৩১৪), সাহিত্য (১৩১৪) ও সাহিত্যের স্বরূপ (১৩৫০) নামক তিনটি গ্রন্থ রয়েছে। তিনটি গ্রন্থের বিষয়ের আলোচনা আলোচ্য প্রবন্ধকে করেছে বিষয়নিষ্ঠ, সুসংহত ও সমৃদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রসাহিত্য ভাবনার গ্রন্থি-উন্মোচনে এবং বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতির স্বরূপ সন্ধানে বিশ্বজিৎ ঘোষের ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা’ নামক প্রবন্ধ আলোকিত এক তথ্যভাণ্ডার স্বরূপ। রবীন্দ্রনাথের মতে, মানব-হৃদয় ও মানুষের বৈচিত্র্যময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই সাহিত্যের প্রধান শিল্প-উপাদান। সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান দান নয়, ভাবকে পূর্ণরূপে চেতনার রঙে রঞ্জিত করে সফল উপস্থাপনাই সাহিত্য। সাহিত্যপাঠের সঙ্গে মানবের উপলব্ধিজাত আনন্দ সম্পর্কিত। সাহিত্য ইতিহাসের সত্য প্রকাশের মাধ্যম নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইতিহাস জানার জন্য সাহিত্য নয় ইতিহাস গ্রন্থ পাঠ করতে বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে সৃজনের কোন উদ্দেশ্য নাই অর্থাৎ সাহিত্যের কোনো উদ্দেশ্য নাই। সাহিত্যিকের শিল্পভাবনার প্রকাশ মাত্রই সাহিত্য। তবে সরাসরি কোন উদ্দেশ্য না থাকলেও মানুষের বোধিসত্তা তথা অনুভূতির অতল স্পর্শ করাই সাহিত্যের মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথের মতে বুদ্ধি, বাসনা, হৃদয় এবং অভিজ্ঞতার ঐক্যে উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি হয়। সাহিত্যের রস প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন রস সৃষ্টি সাহিত্যের মৌল উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রসাহিত্য ভাবনার সারকথা প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেন―‘সাহিত্যবিচারে ব্যক্তিগত উপলব্ধিই প্রধান। তবে তাঁর মতে ব্যক্তি কোনো একক মানুষ নয়, বরং যা স্বকীয় বিশেষত্বের মধ্যে ব্যক্ত হয়ে ওঠে―তাই ব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যবিচারে শ্রেণির পরিচয় নয়, ব্যক্তির পরিচয়কেই বড় করে বিবেচনা করেছেন।’ (পৃ. ২১০) সাহিত্য চিরন্তন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং মানব সম্মিলনের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র অর্থাৎ সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে নানা প্রয়োজনে, নানা দৃষ্টিকোণে মিলিত হয়। জাতিভেদ বা সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা একমাত্র সাহিত্যের অঙ্গনে দূরীভূত হয়ে মিলনের অবশ্যম্ভাবী রূপকে উপস্থাপন করে। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন এবং মানবসত্তায় মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটানো। আলোচ্য প্রবন্ধে সাহিত্যের কাঠামো বা স্বরূপ সম্বন্ধে ধারণা প্রদানই নয়, সমালোচনা সাহিত্য ধারায় সমালোচকের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমতও ব্যক্ত হয়েছে। সাহিত্যের ভালো বা মন্দ উভয় দিক বিবেচনায় রেখে সাহিত্য সমালোচনায় মনোনিবেশ করা যাবে। শুধু নিন্দা বা প্রশংসার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ সমালোচককে কলম ধরতে নিষেধ করেছেন। এছাড়াও মহৎ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান হিসেবে দুঃখ-বেদনা, বিরহকে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন। মানবিক গুণাবলির বিকাশে রবীন্দ্রনাথ সকলকে মাতৃভাষায় রচিত সাহিত্যপাঠের প্রতি অনুরাগী হওয়ার কথা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা তাঁর মানবপ্রেম ও বিশ্ববীক্ষারই এক সংবদ্ধ বহিঃপ্রকাশ।

‘রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে দুটি অনুচিন্তা’ নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রকাব্যে জীবনচেতনা ও রবীন্দ্র জীবনদর্শনে সংস্কৃতির প্রভাব নামক দুটি উপশিরোনাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রবীন্দ্রকাব্যে জীবনচেতনা খণ্ডে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবপ্রেম ও জীবনোপলব্ধির ভিন্নতা প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিকের বিশেষ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রাক ‘মানসী’ পর্বে কাব্যে রবীন্দ্রচেতনা―রোমান্টিক জীবনচেতনায় জীবনের আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘মানসী’ পর্বে এসে রবীন্দ্রচেতনার বাঁকপরিবর্তন ঘটেছে অর্থাৎ কবিগুরুর কবিসত্তায় জীবনচেতনার বহুমাত্রিক প্রবাহের সূচনাটি এ পর্বে আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘সোনারতরী-চিত্রা’ পর্বে রবীন্দ্রনাথ রোমান্টিকতার মোহন জগত ছেড়ে নেমে এলেন বাস্তবের বেলাভূমিতে। মানুষের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ যেন এ পর্বে মুখ্য হয়ে উঠল। ‘গীতাঞ্জলি- গীতালি-গীতিমাল্য’ পর্বে রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাবনার আবারও বাঁকপরিবর্তন ঘটেছে। বাস্তবজীবন ছেড়ে এ পর্বে রবীন্দ্রচেতনায় ঈশ্বর অনুভূতি প্রাধান্য পেয়েছে। ‘বলাকা’ পর্বে সে ঈশ্বরচেতনা ছেড়ে আবারও বাস্তবের বেলাভূমিতে অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুময় যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষতাক্ত পৃথিবীতে নেমে আসলেন। ‘পুনশ্চ-কাব্যে’ সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রগাঢ় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তার দার্শনিক-চেতনার পরিভ্রমণের সূচনা ‘পুনশ্চ’ পরবর্তী কাব্যে দৃষ্টিগোচর হয়। জীবন ও মৃত্যু চেতনার সঙ্গে দার্শনিক-চেতনার সংমিশ্রণকল্পে রবীন্দ্রানুভূতিতে নতুন চিন্তা প্রগাঢ় হয়ে উঠল। তিনি অনুভব করলেন মৃত্যু মূলত জীবনের আরেকটি স্তর, এক জীবন থেকে অন্য জীবনে উত্তরণের সোপান মাত্র। কবিতায় রবীন্দ্রচেতনার বাঁক-পরিবর্তন ও দার্শনিক মনোচেতনার আলোচ্য অংশে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ স্বল্পপরিসরে, সুগভীর জ্ঞানের সুশৃঙ্খল অথচ বাকবিহ্বল প্রাঞ্জল ভাষায় গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণটি উপস্থাপন করেছেন। ‘রবীন্দ্র জীবন-দর্শনে সংস্কৃতি’ অংশে মানব চিত্তের উৎকর্ষের প্রয়োজনে রবীন্দ্রভাবনার ক্রিয়াশীলতার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতিভাবনা তথা মানবের চিত্তোৎকর্ষের সঙ্গে শিক্ষাচিন্তা, ধর্মচিন্তা, লোকসংস্কৃতি চিন্তা সর্বোপরি তাঁর মানবতাবাদী সুগভীর চিন্তা সম্পর্কিত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য সাধনার মূলে রয়েছে মানবকল্যাণ ও মানবমুক্তি এবং মানবচিত্তের উৎকর্ষ ও উত্তরণে সচেষ্ট সনিষ্ঠ মনোসংযোগ।

‘রবীন্দ্রসৃজনে প্রেম ও বিরহ : কথাসাহিত্য ও সংগীত’―শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের দার্শনিক লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমাত্রিক সাহিত্য-সাধনায় তথা কথাসাহিত্য ও সঙ্গীতের মূর্ছনায় প্রকটায়িত প্রেম ও বিরহের স্বরূপ এবং দার্শনিক-চেতনার সুশৃঙ্খল পদসন্নিবেশ লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও বিরহবোধ মূলত তাঁর জীবনচেতনারই সমপ্রকাশ। রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের পূর্বোক্ত যুগ-বিভাজনে যেমন বিষয়ের পরিবর্তন বা বৈচিত্র্য ঘটেছে, তেমনই প্রেমচেতনাও নব নব রূপে স্থান পেয়েছে ঊনিশ শতকীয় রচনায়। এই সময়ের ছোটগল্পে মানুষের আবেগসর্বস্ব প্রেম প্রাধান্য পেয়েছে। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘সমাপ্তি’, ‘কাবুলিওয়ালা’ উল্লিখিত সময়ের রচনা। মানব-মানবীর মনস্তাত্ত্বিক উত্তাপ ও রহস্যের ঘোর যেন এসব গল্পের মুখ্য বিষয়। বিশ শতকের ছোটগল্পে প্রেমের প্রকাশে প্রধানত অ-প্রেমের যন্ত্রণাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই যন্ত্রণাই জন্ম দেয় বিরহবোধ, বিচ্ছিন্নতা। বিশ শতকে রবীন্দ্র ছোটগল্পে প্রেম-বিরহের স্বরূপ সম্পর্কে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন :

‘নর-নারীর জীবনে দেখা দেয় প্রেমহীনতার যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতার বেদনা, অসহনীয় এক বিরহযন্ত্রণা। মানুষের প্রেমে দেখা দেয় বিযুক্তি ও বিয়োগ, হারিয়ে যায় প্রেমের শাশ্বত উৎস। এ কারণেই শারীরিক পঙ্গুতায় আসে দূরতিক্রম্য ব্যবধান (দৃষ্টিদান), শারীরিক সান্নিধ্য সত্ত্বেও তৃতীয় মানুষ এসে যুগলের মাঝখানে নির্মাণ করে মেরুদূর মানসিক বিচ্ছিন্নতা (মধ্যবর্তিনী), ব্যক্তিত্বের সংঘাতে দাম্পত্যজীবনে নেমে আসে গভীর একাকিত্ব ও নৈরাশ্যময় নিঃসঙ্গতা (স্ত্রীর পত্র, হৈমন্তী), গতানুগতিক প্রেমধারণার বিরুদ্ধে আধুনিক নারীসত্তার জাগরণ (পয়লা নম্বর), একমুখী পতিভক্তি বা স্মৃতিলালিত বৈধব্যে প্রেমের মুক্তিবিষয়ক সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে আধুনিক নারীর ব্যক্তিমহিমার উদ্বোধন (ল্যাবরেটরি)―এইসব প্রবণতা ও অনুষঙ্গের অভিঘাতে বিশ শতকের রবীন্দ্রগল্পে প্রেম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।’ (পৃ: ২২৩)

 রবীন্দ্র উপন্যাসেও প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে। চোখের বালি (১৯০৩) উপন্যাসের পূর্ব পর্যন্ত রোমান্স আবহে প্রেমের সুসংহত প্রকাশ ঘটেছে। চোখের বালি থেকে বিনোদিনীর অস্তিত্বচেতনা তথা নারীসত্তায় ব্যক্তিত্বের উপলব্ধিতে যেন আধুনিক প্রেম প্রকাশিত হয়েছে। যোগাযোগ (১৯২৯) উপন্যাসেও ব্যক্তি-সংঘাতে নারীর প্রেমচেতনা প্রকাশিত হয়েছে। শেষের কবিতার প্রেম যেন অধিক স্বাতন্ত্র্য রূপে আত্মপ্রকাশ করল। দৈনন্দিন আটপৌরে খোলসে আবৃত না থেকে প্রেম যেন এ পর্যায়ে নতুন চেতনায় চিরনতুন, চিরসৌন্দর্যের পথে চিরায়ত আনন্দ উপস্থাপন করল। কথাসাহিত্যের অনুরূপ রবীন্দ্রসঙ্গীতেও আছে প্রেম ও বিরহের স্বতন্ত্র রূপ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘রবীন্দ্রনাথের গানে আমরা যে নারীর সন্ধান পাই, সে-কোনো ব্যক্তি-মানুষ নয়; রবীন্দ্রনাথের নারী মূলত শাশ্বত নারীর প্রতীকী রূপ। রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রেম তথা নারী কখনো হয়ে ওঠে তার কাব্যলক্ষ্মী, কখনো জীবনদেবতা, কখনো বা লীলাসঙ্গিনী, কখনও স্বপ্ন-সহচরী।’ (পৃ: ২২৪) রবীন্দ্রসঙ্গীতের আত্মনিবেদনে প্রেম-পূজা যেন একীভূত হয়েছে। অনুরূপভাবে প্রিয়া ও দেবী যেন একাকার হয়ে এক সত্তায় মিশে যায়। তখন প্রেম অধ্যাত্মরূপে এক অরূপের সাধনায় নিমগ্ন হয়। আবার একনিষ্ঠ চিত্তে অরূপের সাধনাতেই বাস্তব পৃথিবীর মানবী সে অরূপের প্রতীক রূপে রবীন্দ্রচেতনায় পরিস্ফুট হয়ে শাশ্বত নারী প্রেমের ব্যঞ্জনায় মুখরিত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে, সঙ্গীতে প্রেমের ও বিরহের যে বৈচিত্র্য, আলোচ্য প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নাটকে সমাজসংস্কার চেতনা’―প্রবন্ধের মূলকথা মানবকল্যাণ দর্শন। প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের মানবপ্রেমের কথাটি অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে বহুবার উল্লেখ করে বলেন রবীন্দ্রনাথের প্রায় সত্তর বছরের সাহিত্য-সাধনার মূলে ছিল মানবকল্যাণ দর্শন ও মানবমুক্তির প্রয়াস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও নাটকেও এই মানবকল্যাণ চেতনায় ধ্বনিত হয়েছে সমাজসংস্কার চেতনা। ‘বিসর্জন’ নাটকের কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের প্রতীক দেবীকে বিসর্জন; মুক্তধারা নাটকের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অত্যাচারিত শ্রেণিকে সংবদ্ধ করা; কৃষিভিত্তিক সভ্যতাকে মানববন্ধন করে তোলার বিষয়ে বলেছেন―রক্তকরবী নাটকের শ্রেণিসংগ্রাম এবং শ্রমজীবী শক্তির বিজয়ে সমাজসংস্কার চিন্তায় মানবকল্যাণ দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সামগ্রিক উন্নতি এবং কল্যাণেই রবীন্দ্ররচনার সমাজসংস্কার চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে নারী’ নামক প্রবন্ধে সঙ্গীতভুবনে নারীর প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলা হয়েছে। রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের অনুরূপ রবীন্দ্রসঙ্গীতেও নারীর ব্যক্তিরূপ নয় শাশ্বত রূপ ধ্বনিত হয়েছে। এ নারীও কখনও কাব্যলক্ষ্মী, কখনও জীবনদেবতা আবার কখনও লীলাসঙ্গিনী। প্রেম-পূজা, নারী-দেবী রবীন্দ্রচেতনায় একাকার হয়েছে। এ পর্যায়ের রচনায় প্রিয়কে দেবতা আর দেবতাকে প্রিয় বানানোর স্বর ধ্বনিত হয়েছে। রবীন্দ্র-দার্শনিকতায় নারীর স্বরূপ উন্মোচনে প্রাবন্ধিকের বক্তব্য―‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের নারী সবসময়ই স্মৃতি-জাগানিয়া, প্রীতি-জাগানিয়া, স্থিতি-জাগানিয়াও বটে।’ (পৃ: ২৩২) ছবির ফ্রেমে বাঁধাই করা নারীও রবীন্দ্রচেতনায় মর্মর ধ্বনি তোলে। স্মৃতিজাগানিয়া রূপে মানসপটে জেগে ওঠে। নারীর প্রতি স্নেহ, প্রেম, ঐশ্বরিক ভালোবাসার সুর রবীন্দ্রসঙ্গীতে ছন্দের পরতে পরতে ধ্বনিত হয়।

‘রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত বাংলা কাব্যপরিচয় পাঠের ভূমিকা’―শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত বাংলা কাব্যপরিচয় (১৯৩৮) সংকলনের প্রকাশ এবং সংকলনটি প্রকাশিত হবার পরে বোদ্ধামহলের বিরূপ প্রতিক্রিয়া, আলোচনা ও সমালোচনা এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথের মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী সম্পাদককেও সমালোচকের কঠোর সমালোচনার সম্মুখে বাংলা কাব্যপরিচয়’কে সপ্তাহ খানেক পরে বাজার থেকে তুলে নিতে হয়েছিল। এ বিষয়টি স্পষ্ট করার অভিপ্রায়ে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘বাংলা কাব্যপরিচয়-এ কবিতা বিন্যাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসৃত হয়নি―এটিই এ সংকলন সম্পর্কে এক ধরনের বিরূপ সমালোচনা সৃষ্টি করেছিল। এ ধরনের সংকলনে কবিদের কবিতার সংখ্যা শিল্পমান নির্দেশক হলেও রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কবিদের, যাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়, কবিতা বেশি করে গ্রহণ করেছেন।’ (পৃ: ২৩৬) জীবনানন্দ দাশের কবিতা খণ্ডিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় বুদ্ধদেব বসু তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সমালোচনা সত্ত্বেও বলা যায় ‘বাংলাকাব্য পরিচয়’ বাংলা কবিতার প্রথম সংকলন হিসেবে সাহিত্যে তার অবস্থানটি সুনির্দিষ্ট করেছে।

অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধগ্রন্থের ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাঙালির জাতিভেদ, সংকীর্ণচিত্ত মানসিকতা, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ঔপনিবেশিক শাসন ও বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রসাহিত্য সাধনার গুরুত্ব তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর রচনার শিল্পচর্চা ও জনপ্রিয়তার নানা বাঁক-পরিবর্তন তীব্রতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী উপস্থাপন করেছেন। জীবৎকালে এবং রবীন্দ্রোত্তর কালেও এ মহান দার্শনিক লেখক নিরবচ্ছিন্ন জনপ্রিয় অথবা একক মাত্রায় বিচারের ঊর্ধ্বে ছিলেন। রবীন্দ্রসাহিত্য চেতনা আলোচনায় গ্রহণ-বর্জন, নানামুখী সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনমনে কীভাবে রবীন্দ্রচর্চা স্থায়ী আসন অর্জন করেছে সে বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ গবেষণালব্ধ বিবরণী আলোচ্য প্রবন্ধে কেন্দ্রীভূত বিষয় হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্ররচনার বহুমুখী প্রতিভার পরিসংখ্যান অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঙালি আনন্দপ্রিয়তার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তৎকালে অন্য সকল রচনা অপেক্ষা রবীন্দ্রসঙ্গীত অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে রবীন্দ্রসাহিত্যকেন্দ্রিক যে খণ্ডিত বিচ্ছিন্নতাবোধ, সাম্প্রদায়িক চিন্তার ঊন্মেষ ঘটেছিল তা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালীন যুক্তিতর্ক সত্ত্বেও ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়েছিল। অর্থাৎ জনপ্রিয়তা, মৌলবাদ ও বহুমুখী যুক্তিতর্কের সূচনা ও অবসানে বাঙালির চিত্তে রবীন্দ্রসাহিত্যপ্রীতি ও গবেষণার স্বচ্ছন্দ কর্মপরিকল্পনা কার্যকর হয়ে উঠেছিল।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ’― বাংলাদেশে বা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পশ্চাৎপদ বাঙালির জাতীয় জীবনে আধুনিকতায় উত্তরণের এক অধ্যায়। মুখে মুখে কথিত রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। কথিত এ মিথ্যাচারকে মিথ্যা প্রমাণের সাপেক্ষে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ এ প্রবন্ধে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে যুক্তিতর্ক ও মতামত প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরূপ মানবকল্যাণ চেতনার ধ্বজাধারী সমুদ্রপ্রতিম প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের স্থান এহেন অপবাদের ঊর্ধ্বে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সম্যক ধারণার স্বল্পতা বা রবীন্দ্র-অধ্যয়নের স্বল্পতায় উপলব্ধিজাত জ্ঞানের অভাবে রবীন্দ্রচেতনার মানবপ্রেমে কতিপয় ব্যক্তি এহেন কালি লেপনের স্পর্ধা দেখায়। দার্শনিক লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুদীর্ঘ সাহিত্যসাধনার মূলমন্ত্র মানবপ্রেম, মানবকল্যাণ। ভাবযোগী ও কর্মযোগী গুণের সমন্বয় রবীন্দ্রচেতনাকে করেছে উদার মানবিক গুণসমৃদ্ধ। জমিদার হয়েও তিনি জমিদারি প্রথার নির্মমতাকে স্বীকার করেছেন। ভূমিহীন দরিদ্র রায়ত ও শ্রমজীবী, নিম্নজীবী মানুষের কষ্টকে আত্মিকভাবে উপলব্ধি করেছেন। বিশ্বজিৎ ঘোষ এ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ ও ১৯২৬ খ্রি. মাত্র দুইবার ঢাকায় আসেন। ১৯১৮ খ্রি. ঢাকায় আসার কথা থাকলেও বিশেষ কারণবশত তিনি আসতে পারেননি। ১৯৩৬ সালের আমন্ত্রণেও তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ১৯১২ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে যে জনসভা হয়েছিল, সে জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন না। উপরন্তু ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় এলে ঢাকার নবাবের আতিথ্যলাভ করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সংবর্ধিত হন। এ প্রসঙ্গে যুক্তি উপস্থাপনে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন―‘তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে থাকলে তা সম্ভবপর হতো না। আজ এক শতাব্দী পরে যে-বিষয় আমাদের আলোড়িত করেছে, মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে মানুষের স্মৃতি থেকে তা মুছে যেত না।’ (পৃ: ২৫৪) ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভার সমুদ্রবিস্তৃতি পৌনঃপুনিক নবমূল্যায়ন ও যৌক্তিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে প্রাবন্ধিকের প্রচলিত মিথ্যার মূলোৎপাটন করার প্রয়াস ফুটে উঠেছে।

‘শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ’-নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববঙ্গের শাহজাদপুরে (১৮৯০-১৯০০) জমিদারি পরিচালনার সময়কালকে নির্দেশ করেছেন। এই সময়টি রবীন্দ্র- সাহিত্যচর্চার তথা রবীন্দ্রপ্রতিভা বিকাশের এক স্বর্ণময় সময়। মর্তপ্রীতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার আকর মিশিয়ে শাহজাদপুরে অবস্থানরত অবস্থায় কবিগুরু সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য অকৃত্রিম সব রচনা। এ সময় সোনার তরী কাব্যের আকাশের চাঁদ, ভরা ভাদরে, পুরস্কার, দুই পাখি এসব কবিতা রচনা করেন। কবিতার পাশাপাশি শাহজাদপুরে অবস্থানকালে তিনি ছেলে ভোলানো ছড়াও রচনা করেছেন। ঊনিশ শতকীয় ছোটগল্পে অর্থাৎ সমগ্র সাহিত্যজীবনের পর্ব বিভাজনে আদিপর্বের সূচনাটি এখানেই শিল্পনির্মাণের প্রয়োজনীয় রসদ পেয়েছিল। ‘ছিন্নপত্র’, ‘বিসর্জন’ নাটকসহ অসংখ্য রচনা শাহজাদপুরের জনপদ ও ভূপ্রকৃতি থেকে রসদ নিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন। এখানকার বুড়িপোতাজিয়া ও রামকান্তপুর মৌজার ১২০০ একর জমি গোচারণের জন্য লাখেরাজ দান করেন। বর্তমানে এই বাথানভূমির ২২৫ একর জমিতে ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। রবীন্দ্র ভাবয়িত্রী ও কারয়িত্রী গুণের অপূর্ব সমন্বয় যেন শাহজাদপুরের আবাসকাল। রবীন্দ্রভূমিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যেন বর্তমান প্রজন্মের কাছেও রবীন্দ্রনাথের অবদানকে পুনরায় আলোকোজ্জ্বল করে। শাহজাদপুর জমিদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার বিচ্ছেদ-বিরহ যেন কবি-হৃদয়ে প্রিয়াবিচ্ছেদের রূপ নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর নামক প্রিয়ার বিচ্ছেদে আকুল হৃদয়ে লিখে ফেললেন অমর গান―

‘ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে

আমার নামটি লিখো তোমার

মনের মন্দিরে।

…’

গানটিকে কবিগুরুর ভালোবাসার স্মারক হিসেবে ‘শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধের শেষে প্রাবন্ধিক সংযোজিত করেছেন।

‘রবীন্দ্রনাথের উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধের সত্যতা অনস্বীকার্য। বাংলা সাহিত্য সাধনায় রবীন্দ্রপ্রতিভার ছায়াতলে অন্যসকল লেখক যেন সূর্যালোক নিয়ে দীপ্যমান হয়ে উঠেছে। প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে আবির্ভূত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মে যে বিশালতা দেখিয়েছেন, সে সমাজ, সভ্যতা ও আধুনিকতার চেতনা বিস্ময়কর। ভাষাস্রোতে, চিন্তাস্রোতে রবীন্দ্রচেতনার আধুনিকতা প্রায় দেড়শত বছর পরেও বাঙালি পাঠকের উত্তরাধুনিক চেতনাকেও স্পর্শ করতে সক্ষম। সঙ্গতকারণে রবীন্দ্ররচনা আধুনিক সময়েও পাঠকের আত্মার খোরাক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রবলয়ের সর্বগ্রাসী রূপকে উপেক্ষা করে সাহিত্যসাধনায় কল্লোল গোষ্ঠীর যে উদ্যোগ তা যেন সাময়িকভাবে নিজেকে রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত করার প্রাণান্ত চেষ্টা। রবীন্দ্রমানস ও মর্মস্পর্শী সাহিত্যচেতনা বর্তমানেও যেন লেখকের সৃষ্টিপ্রেরণার উৎসস্থল। উপনিবেশিকতা, আধুনিক দার্শনিক সুচিন্তক রবীন্দ্রনাথের উত্তরকালেও সে দর্শনচিন্তা সর্বগ্রাহ্য বিষয় হয়ে ওঠে। কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ সকল ক্ষেত্রেই তিনি যে কর্ষণ চালিয়েছেন তা আজও বাঙালির প্রাণের সম্পদ। বিশ্বসাহিত্যেও গীতাঞ্জলির আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। আলোচ্য প্রবন্ধের শেষ পৃষ্ঠা যেন রবীন্দ্র ভাবয়িত্রী ও কারয়িত্রী প্রভাবকে অধিক মূর্তমান করে তোলে। এ মহা প্রতিভাবান দার্শনিক-লেখকের জন্মের দেড়শত বছর পরেও সাধারণের চেতনায় যা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিত্য উপলব্ধিতে তা সেই সময়েই ধরা দিয়েছিল। বর্তমানে কেন্দ্র-প্রান্তের চেতনা, প্রান্তের প্রতি মানবের ঝোঁক অর্থাৎ জাতিক-আন্তর্জাতিক প্রশ্ন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন জাতিক না হলে আন্তর্জাতিক হওয়া যায় না। বর্তমানের প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য পরিবেশবাদীদের যে প্রচেষ্টা বৃক্ষরোপণ; শিক্ষাভাবনায় কর্মমুখিতার সংযোজন; সর্বোপরি সাহিত্যের আঙ্গিক বা ফর্ম ভেঙে নবতর সৃষ্টি প্রেরণা রবীন্দ্রনাথের চেতনায় মননে প্রায় শত বছর পূর্বেই উপলব্ধ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সেই বাঙালি প্রাণপুরুষ যিনি চিন্তা-চেতনায় সাধারণের চেয়ে শত বছর অগ্রগামী এক মহীরুহ দার্শনিক মানব।

‘আমার রবীন্দ্রনাথ অশেষ রবীন্দ্রনাথ’ নামক প্রবন্ধটি যেন অশেষ রবীন্দ্রনাথ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থের অন্তর্গত আঠাশটি প্রবন্ধের আলোকে রবীন্দ্র প্রতিভার পুনর্মূল্যায়ন। রবীন্দ্রসৃষ্টি প্রতিভার বহুবর্ণিল প্রতিফলন বাঙালির চেতনায় মননে এক বিস্ময়কর আলোকোজ্জ্বল জগতের সন্ধান দেয়। সে প্রতিভার উৎস সন্ধানে প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেন―‘সৃষ্টি-প্রয়াসে তিনি নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন―পৌনঃপুনিকভাবে বাঁকবদল করেছেন আপন চিন্তাধারা ও রূপকল্পের।’ (পৃ: ২৭৯)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মপ্রেরণা ও কর্মযোগ, সৃষ্টি-প্রেরণা ও ভাবযোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পোষণ করে গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক যুগ ও কালের গ্রহণযোগ্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়ে বলেন :

‘শিল্পস্রষ্টা এই রবীন্দ্রনাথের পাশেই আছেন আরেক রবীন্দ্রনাথ―সেই রবীন্দ্রনাথই এখন আমার কাছে বেশি জরুরি। এখানে তিনি সমাজ-সংস্কারক। এই রবীন্দ্রনাথ পল্লি-উন্নয়নে উদ্যমী, এই রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ-দারিদ্র্য বিমোচনে সদা সচেষ্ট। এখানে তাঁকে দেখি কৃষি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে, ক্ষুদ্রঋণ-ধারণার পথিকৃৎ রূপে, শ্রীনিকেতনে সমাজ-উন্নয়ন চিন্তক হিসেবে, তাঁকে দেখি গ্রামীণ নারীদের বৃত্তিমূলক জ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে, দেখি পরিবেশ-সচেতন একজন দার্শনিক রূপে। গ্রাম-উন্নয়নের জন্য কত কাজই না তিনি করেছেন। সে-সব কাজ এত বছর পরেও এতটুকু প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। শিক্ষা-চিন্তক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এখনো আমার কাছে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাছেই প্রথম শুনেছি, শিক্ষা হচ্ছে প্রযুক্তি। শিক্ষাকে প্রযুক্তি হিসেবে গ্রহণ করে তিনি মানব-উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছেন―যা আমাদের জন্য এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।’ (পৃ. ২৮০)

সঙ্গত কারণেই অশেষ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধগ্রন্থের শেষ লাইনে সমালোচকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথকে আপন করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, স্নেহ, প্রেম ও মুগ্ধতায় প্রাবন্ধিক লিখেছেন―‘তিনি অশেষ, তিনি অসীম―তিনি রবীন্দ্রনাথ।’ (পৃ. ২৮০)

রবীন্দ্রসত্তার উপলব্ধি, রবীন্দ্রচেতনার বিশালতা, রবীন্দ্রসৃষ্টির রসময়তা, ভাববাদিতা ও সমাজকল্যাণে উপযোগিতা, মানবপ্রেম, মানবকল্যাণ চেতনা সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির গর্ব―বাঙালির একান্ত আপন এক দার্শনিক-লেখক। অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের অন্তর্গত আঠাশটি প্রবন্ধ সমগ্র রবীন্দ্রমানসের গবেষণালব্ধ তথ্যসমৃদ্ধ এক জ্ঞানভাণ্ডার। প্রতিটি প্রবন্ধ প্রাঞ্জল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন্দ্রিক জ্ঞান অর্জনে সাধারণ পাঠক, গবেষক তথা প্রতিটি বাঙালির অশেষ রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থপাঠ আবশ্যক। গ্রন্থটি রবীন্দ্রচেতনার একটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশক এবং বাংলা সাহিত্যের গবেষণালব্ধ গ্রন্থতালিকায় এক অনন্য সংযোজন।

  লেখক : প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares