সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে : সুব্রত বড়ুয়া

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-স্মৃতিকথা

আবুল হাসনাত যখন বইটি লিখছিলেন এবং এর কম্পিউটার কম্পোজের কাজটিও প্রায় সমান তালে এগিয়ে চলছিল, তখন হাসনাত মাঝে মাঝেই তার কোনও কোনও অংশ তুলে নিয়ে আমাকে দিতেন পড়ার জন্যে, হেসে বলতেন, ‘দেখুন তো কিছু হচ্ছে কি না।’ স্বভাববিনয়ী আবুল হাসনাত এর সঙ্গে আরও যোগ করতেন, লোকে মারতে আসবে না তো ?’ আমরা তখন ধানমন্ডি ’১৫-এর ‘সাহানা’য় কালি ও কলমের দপ্তরে বসতাম একই কক্ষে―মূলত দোতলার প্রশস্ত বারান্দাকে সাজগোজ করে যা তৈরি। এখান থেকেই ২০২০-এর মার্চের ২৫ তারিখে (সম্ভবত) একসঙ্গে বেরিয়েছিলাম আমরা  শেষবারের মতো। সিদ্ধান্ত হয়েছিল―কালি ও কলমের কর্মীরা বাসায় বসেই এখন থেকে কাজ করবেন। ভয়াবহ করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা হিসেবেই এ উদ্যোগ। সেদিন জানতাম না―বন্ধু আবুল হাসনাতের সঙ্গে এ আমার শেষ  দেখ। ভবিতব্যের কথা আমরা কেউ তো জানতে পারি না। হাসনাত আমাকে আমার সেন্ট্রাল রোডের (শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী সড়ক) বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে শাহবাগের আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকান ‘তক্ষশিলা’য় গিয়েছিলেন। বই কিনতে ও পড়তে ভালোবাসতেন আবুল হাসনাত। তাঁর শেলফের ও মনের সংগ্রহ যে আসলেই অনেক বড় সে-কথা জানতে আমারও বেশ সময় লেগেছিল।

এর আগেই অবশ্য হাসনাতের নতুন বই হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে বেরিয়ে গেছে এবং তিনি তার প্রথম চালানের একটি কপি আমার হাতে  তুলে দিয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছিল, হাসনাত বেশ প্রসন্ন এবং নিজের এ-কাজটি নিয়ে তৃপ্ত। শিল্পী রফিকুন নবীর শোভন ও আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ এবং মুদ্রণ-পারিপাট্য বইটির আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। বইটির সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় আবুল হাসনাত লিখেছেন; ‘ছেঁড়াখোঁড়া স্মৃতি ও প্রত্যক্ষণের বৃত্তান্ত লিখব এ কোনওদিন ভাবিনি। অনুজপ্রতিম কবি বন্ধু তারিক সুজাত দু’বছর ধরে প্রায়ই তাগিদ দিচ্ছিলেন। আমি এতটুকুও আমল দিইনি। অন্যের লেখা পড়া মননশীল লেখার ঘাতক এ আমি মান্য জ্ঞান করি। তবুও দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে আলস্য ঝেড়ে একদিন আকস্মিকই লেখা শুরু করেছি।’

আবুল হাসনাত যে শেষ পর্যন্ত নিজের আলস্য ঝেড়ে বইটি লিখতে শুরু করেন সেটি কম কথা নয় এবং তা থেকে আমাদের প্রাপ্তিও মোটেই অনুল্লেখ্য নয়। তবে সে কথায় পরে আসছি। আবুল হাসনাত লিখেছেন, ‘আমার জীবন  কোনও অর্থেই বর্ণময় নয়। সাধারণ ও আটপৌরে। তবে প্রত্যক্ষ করেছি এ দেশের মানুষের সংগ্রাম ও বিজয়। এই বিজয় আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাঙালি সমাজকে স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপিত করেছে। জাতীয় বিকাশ ও শিল্প ও সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রকে করে তুলেছে দীপিত। এ যে কত বড় অভিজ্ঞতা তা বলে শেষ করা যায় না।’ এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথাই আবুল হাসনাত শোনাতে চেয়েছিলেন আমাদের, তাঁর জীবনের রঙে রাঙিয়ে নিয়ে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি, পুরোনো ঢাকার সংগ্রামমুখর জীবনযাত্রার মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি, বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের রাজনীতির চালচিত্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন নিজের প্রাত্যহিকতার মধ্যেই, তারপর নিজেই তার অংশ হয়ে উঠেছিলেন―যা তাঁর চিন্তা ও কর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

বিগত শতকের (বিশ শতক) পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল আবুল হাসনাত তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। সে অভিজ্ঞতার কথাও তিনি শোনাতে চেয়েছেন আমাদের; সম্ভবত শুধু আমাদেরই নয়, অনাগত-কালের মানুষদেরও, যারা পরিবর্তনের সে সংগ্রামের উত্তাপ আজও অনুভব করতে চাইবে, জীবনচিত্রের বিন্যাসে তার রূপাবয়ব দেখার তাগিদ খুঁজবে। নিঃসন্দেহে মৌলিক রোমান্টিক চেতনার অধিকারী আবুল হাসনাত নিজে যা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তার কথাই নিঃসঙ্কোচে তুলে ধরেছেন এ বইটিতে। ‘ভূমিকা’য় নিজের স্বপ্ন ও বিশ্বাসের সেতুবন্ধের এই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পুরনো আর্টস বিল্ডিংয়ের [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়] আমতলা, নতুন আর্টস বিল্ডিংয়ের বটতলা আর মধুর ক্যান্টিন এক সময়ে প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছিল। এখানেই অনন্যসাধারণ কিছু ছাত্রনেতাকে দেখেছিলাম, প্রত্যয়ে দীপ্ত; ধমনিতে ধারণ করেছিলেন তাঁরা সমাজ বদলানোর অনিঃশেষ শক্তি, যে-কোনও ত্যাগের জন্য প্রস্তত ছিলেন তাঁরা। জীবন ছিল সরল ও নিরাভরণ। ভেবে দেখেছি, এঁদের অধিকাংশ এসেছিলেন গ্রামীণ কৌম সমাজ থেকে। গড়ে তুলেছিলেন প্রমত্ত ছাত্র আন্দোলন এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংযোগ রেখে দেশের রাজনৈতিক কর্মপ্রবাহে প্রবল ও তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করেছিলেন। পৃথিবীর যে-কোনো যুব ও ছাত্র আন্দোলনের মতো এর গুরুত্ব কম তাৎপর্যবাহী ছিল না। ষাটের দশক হয়ে উঠেছিল মুক্তির দশক।’

আবুল হাসনাত এই যে শেষ কথাটি বলেছেন―‘ষাটের দশক হয়ে উঠেছিল মুক্তির দশক’, সেটি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করলে, মনে হয়―প্রায় সর্ব অর্থেই সত্য ছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এ দশকের বিশেষ সৃজনশীলতা নবচেতনার রঙে যে রঙিন হয়ে উঠেছিল সে-কথা অস্বীকার করার উপায় আছে বলে মনে হয় না। আবুল হাসনাত নানাভাবে তার অংশী ও সাক্ষী ছিলেন, এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত সে দায়িত্ব বহন করেছেন। হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে, প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো, মূলত একটি স্মৃতিকথা। তবে এও বলতে হয় যে, স্মৃতিকথার কালিক অনুক্রমের যে প্রচলিত বৈশিষ্ট্য তার অনুসরণ এতে অনুপস্থিত। হাসনাত বরং লিখেছেন পুরোপুরি নিজের ঐকান্তিক ভাবনাকে অনুসরণ করে, যে ভাবনা কখনও আবর্তিত হয়েছে কোনও বিশেষ সময় বা পরিস্থিতিকে ঘিরে, কখনও তার শিকড় চলে গিয়েছে কোনও মানুষকে কেন্দ্র করে, কখনও বা তার অবলম্বন কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন। কিন্তু সবকিছুর আড়ালের যে প্রাণপ্রবাহ তা হচ্ছে সমাজ ও দেশ এবং অন্বিষ্ট উজ্জ্বল জীবনের অন্বেষণ। তাবে হাসনাত লিখেছেন মূলত ভাবনার মুক্তক ছন্দে, কোনওরকম প্রথাবদ্ধ শৈলীর বন্ধনে নিজেকে অবদ্ধ না রেখেই। মানুষই শেষ পর্যন্ত তাঁর মনোলোকের প্রধান বৃক্ষ। বাম ছাত্রসংগঠনের কর্মী হওয়ার সুবাদে শোষণহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার যেমন তাঁর বিশ্বাসের অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছিল, তেমনি মনন ও প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল অনেক মানুষের সান্নিধ্যে তিনি গভীরভাবে প্রাণিতও হয়েছিলেন এবং এভাবে জীবনযাপনের সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করার আনন্দকে নিজ জীবনের সঙ্গী করতে পেরেছিলেন। ভূমিকায় তিনি সেজন্যই লিখেছেন :

‘যৌবনকালে সুধীন দত্তের মত আমার মনে হয়েছিল, এ বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী। এ মত ও নিঃসঙ্গতা ঘুচিয়ে দিয়েছিল ছাত্র ও যুব বিদ্রোহ! বাম ছাত্রসংগঠনের কর্মী হয়ে ওঠা ও একই সঙ্গে রাতে সংবাদে চাকরি জীবনকে বহুভাবে অভিজ্ঞ ও সমৃদ্ধ করেছিল। মনন ও প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল কত মানুষের যে সান্নিধ্য পেয়েছি চাকুরি ক্ষেত্রে তার তালিকা দীর্ঘ। ধারাবাহিকভাবে সে বৃত্তান্ত বর্ণনা করিনি―পরের ঘটনাপ্রবাহ আগে বর্ণিত হয়েছে আর আগের কথা শেষে চলে গেছে। এ প্রচল ছেঁড়া বিন্যাস আমাদের জীবনের প্রবাহের মতোই আনন্দ ও বেদনার অনুষঙ্গী।’

মনে হয়, যে-কোনো অনুরাগী ও নিবিষ্ট পাঠক বইটি পড়তে পড়তে লেখকের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হতে পারেন অক্লেশে। আর, আবুল হাসনাত তাঁর স্মৃতির আড়াল থেকে যে সময়কাল ও মানুষজনকে তাঁর বইটির পাতায়  পাতায়  যত্ন করে তুলে এনেছেন সে সময়কাল ও মানুষজনকে যাঁরা নিজেদের জীবনেরও স্পর্শ করেছেন, তাঁরা সেসবের উত্তাপ এতে পুনরায় স্বচ্ছন্দে খুঁজে পাবেন, গভীরভাবে অনুভব করবেন তার আনন্দ ও দুঃখ।

বইটির প্রাণপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে; সূচনা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ এর মর্মমূলে গ্রথিত থেকেছে। ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানি দখলদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাই এ বইয়ের শুরুর বিষয়। কিভাবে লেখক তাঁর রাজনীতির সাথীদের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় পৌঁছলেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন প্রথমে। তাতে নিজের কথার চেয়ে অনেক বেশি করে আছে তখনকার পরিস্থিতি এবং প্রতিরোধ যুদ্ধশুরুর প্রস্তুতির কথা, এতে বামপন্থী ছাত্রযুবকদের তথা সিপিবি’র অংশগ্রহণের কথা। অধ্যায়-বিভাজনবর্জিত বইটির অবশ্য সেসব কথা বর্ণিত হয়েছে ছোট ছোট শিরোনামে। এই শিরোনামগুলির কয়েকটি হলো শহিদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি পালন, একাত্তরের মার্চ মাস, আবার ফিরে দেখা ২৫ মার্চ রাত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ফিরে ফিরে দেখা, পুরানা পল্টন, ওয়ারী, প্রন্তিক ও ৩১/১ হোসেনী দালান, আমার মা, নিজেদের বাড়ি, সেকালের ঢাকা, এই শহরেই জন্ম, ছোটবেলা, স্কুলজীবন, আমার যৌবন : ক্রিকেট খেলা, ছাত্র আন্দোলন ও সংস্কৃতি সংসদ ইত্যাদি। এসব শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট যে, হাসনাত ২৫শে মার্চের কালরাত্রি দিয়ে তাঁর স্মৃতিকথা শুরু করেছেন এবং ধীরে ধীরে ফিরে গেছেন তাঁর নিজের বেড়ে ওঠা ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার বর্ণনায়। সে বর্ণনা উপভোগ্য, কারণ নিজের বিশ্বাস ও চেতনার রঙে রাঙিয়েই তিনি এদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক জীবনধারাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। আর নিজেও যেহেতু নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে এই উত্তরণধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেহেতু তাঁর বিবরণ হয়ে উঠেছে প্রাণময়তায় সজীব ও একান্ত আন্তরিক। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, যে-কোনও পাঠকই এ বই পড়ে যেমন অনেক কিছু জানতে পারবেন, তেমনি অনেক জানা বিষয়ের গভীরেও যেতে পারবেন ধীরে ধীরে। বিশেষ সাহিত্য-সংস্কৃতির জগৎ নিয়ে যাঁরা আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু তাঁদের ক্ষেত্রে তো বটেই।

আবুল হাসনাত প্রায় তিন যুগের মতো জড়িত ছিলেন সাংবাদিকতায়, দীর্ঘকাল ‘ধরে সংবাদ সাহিত্য সাময়িকী’ ও একাধিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন দক্ষতার সাথে, তাঁর কাজকর্ম ও ভাবনাচিন্তার অনেক হদিশ পাওয়া যাবে এই স্মৃতিকথা থেকে। এর ভাষা প্রাঞ্জল, বর্ণনা স্বতঃস্ফূর্ত। নিজের জ্ঞানগম্যি প্রদর্শন ও কায়দাকানুন শেখানোর কোনও প্রয়াস এতে নেই। আমি যতবারই এ-বইটি নিয়ে বসি, ততবারই ঋদ্ধ হই―অনুভবের আন্তরিকতার কারণেও। পরিশেষে দুটি কথা―বইটিতে একটি নির্ঘণ্ট যোগ করা সম্ভব হলে ভালো হতো, পাঠক ও ব্যবহারকারীরা অনেক উপকৃত হতো। আর, বিষয় শিরোনামগুলি সূচিপত্র হিসেবে দেওয়া গেলে মন্দ হতো না।

 লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares