চট্টগ্রামের ইতিহাসের উজ্জ্বল উদ্ধার : মুহিত হাসান

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-ইতিহাস

চট্টগ্রাম ভূখণ্ডের ইতিহাস নানা দিক থেকে তুমুল রোমাঞ্চকর ও প্রশ্নাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার বাণিজ্যিক ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে যেমন চট্টগ্রামের কথা উঠে আসবে, তেমনি বাঙালির বিদ্রোহী চেতনার প্রসঙ্গ উঠলেও এই সমুদ্রপাড়ের জনপদের উল্লেখ অনিবার্য―তা লেখক যে ভাষারই হোন না কেন। চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে লিখতে যাওয়াটা তাই যুগপৎ ‘চ্যালেঞ্জ’ এবং পরিশ্রমের। চট্টগ্রাম ভূখণ্ডের ইতিহাসের জটিলতা উপরোক্ত ‘চ্যালেঞ্জ’-এর নেপথ্যে অনেকটা দায়ী, এমনটি বলা যায়।

মাসখানেক আগে প্রকাশিত বৃহদাকার গবেষণাগ্রন্থ উপনিবেশ চট্টগ্রাম-এ লেখক হারুন রশীদ এই জটিলতা মোকাবেলা করেছেন দক্ষ হাতে এবং এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের মাত্রা আকাশচুম্বী। বাংলা মুলুকের বাকি অংশের তুলনায় যে চট্টগ্রামের ইতিহাস অনেকটা ‘আলাদা ও গোলমেলে’―সে সম্পর্কে তিনি পুরোদস্তুর ওয়াকিফহাল। বইটির বিস্তৃতি বোঝা যায় এর উপশিরোনাম দেখলে : ‘৫০০ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস’। কেউ কেউ অবশ্য বলতে পারেন, ৫০০ বছর আবার খুব বেশি সময় নাকি ? কিন্তু যে পাঁচ শতাব্দীর চট্টগ্রামের কথা এ বইতে বিবৃত হয়েছে, সেই সময়পর্ব ইতিহাসের নিরিখে এতটাই জটিল যে তার জট ছাড়ানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে অনেক সময়। হারুন রশীদ সেই জট ছাড়ানোর কঠিন কাজটি তাঁর অনুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে করেছেন। প্রায় অচেনা-অজানা দুর্লভ দলিল এবং নির্ভরযোগ্য বইপত্র ঘেঁটে ইতিহাসের বহু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা নিয়েছেন। ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানে বিরাজমান ‘লুপহোল’গুলোও পূরণ করতে চেয়েছেন প্রাপ্ত তথ্য ও পোক্ত যুক্তি দিয়ে। লেখকের এই সবিশেষ প্রচেষ্টা সম্পর্কে বইয়ের মুখবন্ধে বহুমাত্রিক লেখক-অনুবাদক আলম খোরশেদ যা লিখেছেন, তা যথার্থ: ‘গবেষণালব্ধ নতুন তথ্য, উপাত্ত, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তসমূহের একত্র সন্নিবেশ ঘটিয়ে তিনি রচনা করেছেন চট্টগ্রামের ইতিহাসবিষয়ক এই নতুনতম গ্রন্থখানি।’

বইয়ের শুরু ‘প্রাককথন’ দিয়ে। এখানে সরাসরি চট্টগ্রামের ইতিহাসের প্রসঙ্গ নেই, কিন্তু যা আছে তা বইটির তাত্ত্বিক কাঠামো ও লক্ষ্য বুঝে নেবার জন্য জরুরি। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ, বিশ^জুড়ে উপনিবেশের বেশে পরিচালিত তাদের শোষণযজ্ঞ ও ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে ইউরোপবাসীদের বাণিজ্যযাত্রার উদ্দেশ্য-বিধেয় লেখক এই অংশে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এরপর সরাসরি প্রবেশ চট্টগ্রামের ইতিহাসে। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম : ‘ইতিহাসের পেন্টাপলিস, গাঙ্গে, চাটিগাম কিংবা সিটি অব বেঙ্গালা’। এর শুরুতে একটি বিস্ময় জাগানিয়া অথচ যুক্তিপূর্ণ একটি অভিনব সিদ্ধান্তের দেখা মেলে। তা হলো, আনুমানিক ৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বিভিন্ন নৌ বন্দরের বিবরণ নিয়ে মিশরবাসী এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিকের লেখা ‘পেরিপ্লাস’ গ্রন্থে যে ‘গাঙ্গে’ শহর ও খ্রিস্টপূর্বকালে গ্রিক ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমির মানচিত্রে ‘পেন্টাপলিস’ নামের যে পাঁচ নগরের বাণিজ্যকেন্দ্রের কথা পাওয়া যায়, কখনও খুব সম্ভবত তা আজকের চট্টগ্রামেরই আদিপিতা। প্রাচীন সেই নগর সমুদ্রে বিলুপ্ত হয়েছে বা মাটিগর্ভে চাপা পড়েছে তা জানা না গেলেও এটা বোঝা যায় : আধুনিক পৃথিবীর চট্টগ্রাম তারই উত্তরাধিকার। এরপর তুলে ধরা হয়েছে ষোড়শ শতকের চারজন ইউরোপীয় অভিযাত্রীর চোখে দেখা চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বয়ান। এই বিবরণগুলো যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনি ইতিহাসের নানা আদিসূত্রের আকরও।

দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ষোড়শ শতকের অস্থিরতায় চট্টগ্রাম’ একটি বিশেষ যুগসন্ধিক্ষণের চালচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। ষোড়শ শতকের আগ পর্যন্ত বাংলার শাসকদের নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম থাকলেও ওই শতকের প্রথমার্ধ থেকে তাকে ঘিরে ভিনদেশের ও ভিন রাজ্যের শাসকগোষ্ঠীর নানামুখী তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে থাকে। এই তৎপরতার প্রথম বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ১৫১৩ সালে যুদ্ধ করে ত্রিপুরার রাজা ধনমাণিক্যের চট্টগ্রাম অধিকারে নেবার ঘটনায়। তখন বাংলার শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তাঁর বাহিনী অবশ্য পরে চট্টগ্রাম পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়। তাতে অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেননা, তারপর আসে পর্তুগীজ বণিকের দল। খোদ ভাস্কো দা গামাও নাকি কখনও চট্টগ্রামে না এলেও চট্টগ্রামের কথা জানতেন ও বন্দরটির বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল―এই কৌতুহলোদ্দীপক তথ্যটিও লেখক তুলে ধরেছেন। চট্টগ্রামকে ঘিরে পর্তুগিজদের তৎপরতা ও গিয়াসউদ্দিন হোসেন শাহর পতন পরবর্তী পরিস্থিতিতে সেখানে জলদুস্যতার বিস্তার ঘটার প্রসঙ্গে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি।

‘চট্টগ্রামের ইতিহাসের বিভ্রান্তিকর সময়’ অধ্যায়টি নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ১৫৪০ থেকে ১৫৮৬ সাল অবধি চট্টগ্রাম কোন শাসকগোষ্ঠীর দখলে ছিল তা নিয়ে নানারকম বিতর্ক ও বিভ্রান্তি রয়েছে। আরাকান, পাঠান ও ত্রিপুরার রাজশক্তির মধ্যে বারবার যুদ্ধ-সংঘাত হতে হতে ওই ৪৬ বছরে আক্ষরিক অর্থেই চট্টগ্রামের ক্ষমতাবলয় বারবার ‘হাতবদল’ করেছে। একাধিক মান্য নথি ও ইতিহাসগ্রন্থ ঘেঁটে ওই সময়ের চট্টগ্রামের ক্ষমতাবলয়ের মুর্হুমুর্হু পরিবর্তনের আখ্যান যতটা পারা যায় স্পষ্ট করে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন লেখক। এতে ইতিহাসের আবছা সময়টা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে বৈকি।

চট্টগ্রামে আরাকানি উপনিবেশের পর্ব চূড়ান্ত অস্থির এক সময়খণ্ডই যেন। ‘চট্টগ্রামে আরাকানি উপনিবেশের শেষ ৮০ বছর’ অধ্যায়ে পর্তুগীজ-আরাকানি জলদস্যুদের ঐক্য, আরাকানরাজের বিরুদ্ধে মোগলশাহির যুদ্ধ-তৎপরতা, তার মধ্যেও দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মৃদু প্রচেষ্টা ও স্থানীয়দের ওপর আরকানিদের দুর্বৃত্তপনা―এমন বহু প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আরাকানিদের শায়েস্তা করতে শায়েস্তা খানের যুদ্ধ অভিযান ‘মগ ধাওনী’-র ইতিবৃত্ত নিয়ে রচিত এর ঠিক পরের অধ্যায়, ‘চট্টগ্রামে মোগল অভিযান ১৬৬৬’। আরাকান-বিরোধী চট্টগ্রাম অভিযানে শায়েস্তা খানের যুদ্ধকৌশলের পাশাপাশি তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও কূটনীতিক সত্তার পরিচয়ও উঠে এসেছে এখানে। আরাকানিদের শায়েস্তা করতে তিনি যেভাবে চট্টগ্রাম জুড়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তৎপর থাকা পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ গোষ্ঠীকে নিজের দলে টেনে নিয়েছিলেন, সেই আখ্যান অনেকের কাছেই অশ্রুতপূর্ব বলে মনে হতে পারে। আরাকানি সাম্রাজ্যের পতন হবার পরও শান্তি মেলেনি। তার ঠিক পরেই মোগল অধিকারে আসা চট্টগ্রামের দিকে নজর পড়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চট্টগ্রাম অভিযান ১৬৮৬-১৬৮৮’ অধ্যায় তারই ইতিবৃত্ত। ১৭ শতকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দুটি নৌ অভিযান পরিচালনা করেছিল চট্টগ্রামকে লক্ষ্যে রেখে। প্রথম অভিযান হয়েছিল অ্যাডমিরাল নিকলসনের নেতৃত্বে ১২টি জাহাজ নিয়ে, ১৬৮৬ সালে। দ্বিতীয়টি ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হিথের অধীনে, ১৬৮৮ সালে। ক্যাপ্টেন হিথের অভিযান কীভাবে ব্যর্থ হলো, তার রসঘন বর্ণনা পাঠকদের মোহিত করবে।

সতের শতকে ব্যর্থ হলেও আঠারো শতকে পলাশির যুদ্ধের নির্মম ফলাফলহেতু ইংরেজ কোম্পানি এক সময় চট্টগ্রাম শেষমেশ দখলে নিতে সক্ষম হয়। মোগল শাসন থেকে কীভাবে কোম্পানির হস্তগত হলো চট্টগ্রাম, সেই বিবরণ লভ্য ‘মোগল শাসন থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৬৮-১৭৬০’ অংশভাগে। ১৭৬০ সালে হেনরি ভ্যানসিটার্ট কোম্পানির গভর্নর হয়ে বাংলায় আসার পর কোম্পানির কাছে ঋণগ্রস্ত ‘হঠাৎ নবাব’ মির জাফরকে পাওনা মেটানোর বদলে চট্টগ্রামের দেওয়ানিত্ব লাভের প্রস্তাব দিয়ে প্রথমে ব্যর্থ হলেও পরে মির কাশিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে চট্টগ্রাম-লাভের গোপন চুক্তি করেন―সেই কাহিনি কোনও গোয়েন্দা গল্পের চেয়ে কম উত্তেজনাকর নয়। বাংলা-বিহার- উড়িষ্যার পরবর্তী ‘পরাধীন’ নবাব মির কাশিম ও দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের দেওয়া ফরমানকে ভিত্তি ধরে কোম্পানির চট্টগ্রাম দখল ও শাসনের পূর্বাপর মেলে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে চট্টগ্রাম ১৭৬০-১৮৫৭’ অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ের সমাপ্তিতে সিপাহী বিদ্রোহের কালে চট্টগ্রামের এক হাবিলদারের প্রায় অজানা বিদ্রোহী তৎপরতার খবর পাওয়া যায়। রজব আলি নামের সেই হাবিলদারের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর একদল সেনা বিদ্রোহ করে। পরে তাঁদের পরিণতি অবশ্য খুব সুখকর হয়নি। তাঁরা ত্রিপুরা রাজার সহায়তা পাবার আশায় সেখানে গিয়ে বিফল হন। পরে রেঙ্গুনের এক জঙ্গলে অনাহারে তাঁদের মৃত্যু ঘটে।

সিপাহী বিদ্রোহের পর চট্টগ্রামের শাসনভার সরাসরি ইংরেজ ‘রাজ’ সরকারের ওপর এসে পড়ায় ঠিক কেমন পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল তা ‘সরাসরি ইংরেজি শাসন ১৮৫৮-১৯৪৭’ অধ্যায়ের উপজীব্য। ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির প্রতিষ্ঠা তরানি¦ত হবার নেপথ্যে যে এই শহরের জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার বাজে পরিস্থিতি বড় ভূমিকা পালন করেছিল,  এ তথ্য জেনে চমকে যেতে হয়। এমনকি এই পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে গিয়ে ১৮৭৫ সালে চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টি এম কির্কউড আন্দোলনের মুখে পড়ে কেমন নাজেহাল হয়েছিলেন, তা-ও বাদ থাকেনি। লেখকের মতে, ওই আন্দোলনটিই ‘চট্টগ্রামের প্রথম ইংরেজ বিরোধী গণ আন্দোলন’। আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ে ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে রাজ আমলে। আবার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সলতে পাকানোর শুরুতেও চট্টগ্রামের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্বদেশি আন্দোলন সংশ্লিষ্ট তৎপরতা, শহরে গান্ধী-রবীন্দ্রনাথের আগমন, বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের কারণে চট্টগ্রামের আসাম রাজ্যে চলে যাবার শঙ্কা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের প্রভাব―দীর্ঘ অধ্যায়টিতে কোনও জরুরি প্রসঙ্গই বাদ থাকেনি। ১৯৩০-১৯৩৪ কালপর্বে চট্টগ্রামের আগুনঝরা যুববিদ্রোহ নিয়ে রয়েছে আরেকটি আলাদা অধ্যায়, ‘চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ’।

‘দেশভাগ এবং পাকিস্তানি উপনিবেশের যাত্রারম্ভ’ অধ্যায়ের বিষয় পাকিস্তানি উপনিবেশ পর্ব। ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসানের মুহূর্তে বেদনামথিত দেশভাগ। দুই ভাগে বিভক্ত ‘অসম্ভব’ নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো চট্টগ্রাম। কিন্তু কিছুদিন পর দেশটির দুই খণ্ডের মধ্যেকার বৈষম্য বুঝিয়ে দিলো, কার্যত নতুন মোড়কে আরেক ঔপনিবেশিক শাসন ফের হাজির হয়েছে। বইয়ের অন্য অধ্যায়গুলোর তুলনায় সংক্ষিপ্ত এই অংশে মুখ্যত ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের ছয় দফা দাবির পক্ষে ১৯৬৬ সালে শহরের লালদিঘি ময়দানে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি জনসভার ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয়েছে। অধ্যায়টি আরেকটু বিস্তৃত হলে ভালো লাগত। তবে লেখককে অন্য একটি কারণে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। বাংলাদেশের তীব্র ডানপন্থী ও বামপন্থী একচক্ষু ইতিহাস লেখকগণ এবং এমনকি অধিকাংশ মধ্যপন্থী জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদও তো পাকিস্তানি জামানাকে ঔপনিবেশিক আমল বলে স্বীকারই করতে চান না! উল্টো তারা ১৯৪৭-কে উপনিবেশ থেকে ‘মুক্তির স্বাদ’ পাবার সময় বলে দেখাতেই অধিক তৎপর। এমন পরিস্থিতিতে হারুন রশীদ তীক্ষè যুক্তি দিয়ে পাকিস্তানি আমলকে শোষণকামী ইংরেজ উপনিবেশের জাতভাই (অথবা তার আরেক রূপ) বলে চিহ্নিত করতে পিছপা হননি। স্বাভাবিকভাবেই বইটির ইতি টানা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ দিয়ে। অন্তিম অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম ১৯৭১’ অধ্যায়ের আরম্ভ চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা প্রাথমিক প্রতিরোধের ঘটনাপ্রবাহে, আর সমাপ্তি একদিন বিলম্বে ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রামের মুক্ত হওয়ার দিনটির কথায়। বস্তুত, ওই দিনটিতেই ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে চট্টগ্রাম চূড়ান্তভাবে মুক্তি পেয়েছিল।

এই গ্রন্থের আরেক মূল্যবান সম্পদ এর সমৃদ্ধ ‘পরিশিষ্ট’। এই অংশে অন্তর্ভুক্ত ‘চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণশিল্প ও ফিগ্রেট ডয়েচল্যান্ড’ প্রবন্ধটি এক না-জানা ইতিহাসের উজ্জ্বল উদ্ধার। আরও রয়েছে চট্টগ্রাম শহরের প্রাচীন দুর্লভ মানচিত্র নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। বিশেষভাবে বলতে হয় লেখকের উদ্ধার করা ১৮১৮ সালে ইংরেজ প্রকৌশলী জন চিপের আঁকা একটি দুর্লভ মানচিত্রের কথা।

হারুন রশীদ পেশাদার ইতিহাসবিদ নন। ধারণা করি, প্রথাবদ্ধ ইতিহাস লেখকদের বাগাড়ম্বর ও রীতিসর্বস্বতা তাঁর মধ্যে নেই বলেই এমন একটি যুগপৎ নতুন তথ্যে ও বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ সুখপাঠ্য ইতিহাসগ্রন্থ আমরা হাতে পেলাম। বিশেষত, এই সময়ে বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধকে জোড়া দিয়ে একক ইতিহাসগ্রন্থ বলে চালিয়ে দেবার একটি আপত্তিকর প্রবণতা যখন ক্রমেই ডানা মেলছে―তখন উপনিবেশ চট্টগ্রাম নিপুণভাবে সুসম্বন্ধ সুলিখিত ধারাবাহিক ইতিহাস উপস্থাপন করেছে। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ইতিহাস বিষয়ক জরুরি গ্রন্থের তালিকা করতে বসলে একে বাদ দেওয়া অসম্ভব হবে বলেই মনে করি। হারুন রশীদের ভাষা গতিশীল, সরল-সহজ; তবে বিন্দুমাত্র তরল নয়। তাঁর গদ্যে মার্জিত রসবোধেরও দেখা পাই। তিনি স্বদেশে লভ্য পুরোনো গ্রন্থ কি নথির সহায় যেমন নিয়েছেন, তেমনি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদেশের গ্রন্থাগার বা মহাফেজখানায় থাকা চট্টগ্রাম সংক্রান্ত অজানা-অচেনা দলিল আর তথ্য সংগ্রহের বেলাতেও ছিলেন পারঙ্গম। তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির সমন্বয় করতে পারাটা বইটি লেখার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বাড়তি শক্তি জুগিয়েছে।

বইটি ছাপতে গিয়ে চট্টগ্রামের নতুন প্রকাশনা সংস্থা পূর্বস্বর বিরল পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রচুর প্রাসঙ্গিক ছবি নিপুণভাবে বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নান্দনিকতা বজায় রেখে স্থাপিত। এতে চোখের আরাম, মনেরও। বইয়ের বাঁধাই, বিন্যাস কি পৃষ্ঠাসজ্জা―সবই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও যত্নের সঙ্গে করা হয়েছে, একনজর দেখলেই তা বোঝা যায়।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares