লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া : জর্জিয়ার এক বালকের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প : দেবাশীষ গুপ্ত

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-ভ্রমণ-সাহিত্য

কত অজানারে জানাইলে তুমি

কত ঘরে দিলে ঠাঁই―

দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,

পরকে করিলে ভাই।

লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া ও ককেশিয়ার দিন রাত্রি বই দুটি বিশাল ক্যানভাসে চিত্রিত এপিকধর্মী উপন্যাস। বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করতে যাওয়া একদল ছেলে-মেয়ের যাপিতজীবন ও সোভিয়েত তথা তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন মানুষের জীবনের দুঃখ-বেদনা, আশা-আকাক্সক্ষা, প্রেম-প্রতারণা, স্বপ্ন-মৃত্যুর কাহিনিকাব্য।

বাংলাদেশের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রায়হান এই উপাখানের প্রধান চরিত্র। সে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ, আবেগপ্রবণ ও রোমান্টিক বিপ্লবী হলেও একেবারে বাস্তবতা বিবর্জিত নয়। সে সোভিয়েত সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে রাশিয়া লেনিনগ্রাদ শহরের মেডিকেল স্কুলে পড়তে যায়। সেখানে পরিচয় হয় বিভিন্ন দেশ থেকে পড়তে আসা ছেলে মেয়ের সাথে। এই হোস্টেল জীবনের বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে প্রেম, ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, হিংসা সবই উঠে এসেছে উপন্যাসের শুরুতে। সে বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে সমাজতন্ত্রের পীঠস্থান রাশিয়া ছিল তার কাছে স্বপ্নের দেশ। তার কল্পনায় সেই দেশ ছিল রূপকথার রাজ্য, যেখানে নেই কোনও শ্রেণিবৈষম্য, নেই কোনও জাত-পাতের বিচার। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। পড়াশোনার পাশাপাশি তার অনুসন্ধিৎসু মন পর্যবেক্ষণ করেছে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থা, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার ধারা, তাদের সামাজিক রীতি-নীতি, আচার ব্যবহার ও তাদের সামাজিক মূল্যবোধ।

বিস্তৃত পটভূমির এই উপন্যাসের বিস্তৃতি দুই খণ্ডে। কারণ এর বিপুল কলেবর। প্রতিটি খণ্ডে ছোট ছোট পর্বে বিভক্ত এর ঘটনাক্রম। প্রতিটি পর্বেই বাস্তবজীবনঘনিষ্ঠ ঘটনার সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে সে দেশের ইতিহাস, মিথ, রাজনীতি ও বাস্তব জীবনের বর্ণনা।

লেখক নিজেও ৮০এর দশকে রুশ সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে লেনিনগ্রাদে যান চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেখানে তিনি থেকেছেন এক যুগেরও বেশি, প্রায় চৌদ্দ বছর। এই চৌদ্দ বছরে লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তৃত অঞ্চল। দেখেছেন লেনিনগ্রাদ (প্রাচীন নাম সেইন্ট পিটার্সবার্গ। রুশ সম্রাট জারের আমলের রাজধানী), তার আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল। সেই সাথে ককেশিয়ার (রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, উত্তর জর্জিয়া ও উত্তর আজারবাইজান নিয়ে উত্তর ককেশিয়া ও দক্ষিণ জর্জিয়া, দক্ষিণ আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া নিয়ে দক্ষিণ ককেশিয়া) বিস্তৃত অঞ্চল। সেখানে সে পরিচিত হয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠর সাথে। পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের ধর্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি-নীতি, রাজনীতি চর্চা প্রভৃতি।

বাংলা সাহিত্যকে এভারেস্টসম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী অন্যতম। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী একাধারে উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা। তাঁর প্রথম রচনা দেশে বিদেশে একটি ভ্রমণ কাহিনি। যা বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক। শিক্ষাজীবন শেষে আফগানিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে তিনি কাবুল কৃষি কলেজে ফরাসি ও ইংরেজি সাহিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। দেশে বিদেশে ভ্রমণ কাহিনিতে তিনি কলকাতা থেকে পেশোয়ার হয়ে কাবুল যাবার যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখানে উঠে এসেছে যাত্রা পথের বর্ণনা, সেখানকার ভূগোল, স্থানীয় অধিবাসীদের আচার-ব্যবহার, তাঁদের অতিথিপরায়ণতা, তাঁদের সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস। এটি শুধু নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়, এটি তৎকালীন আফগানিস্তানের একটি লিখিত ইতিহাসের অনবদ্য দলিল।

লেখক শাহাব আহমেদের লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া ও ককেশিয়ার দিন রাত্রি উপন্যাসের সিংহভাগ জুড়ে আছে সে দেশের বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর মানুষজন, যারা ধারণ করে আছে রুশ দেশের সংস্কার, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রথাসহ সে দেশের একটি পরিপূর্ণ চিত্ররূপ। প্রায় প্রতিটি পর্বেই প্রসঙ্গক্রমে এসেছে মিথ, উপকথার বর্ণনা।

লেনিনগ্রাদ থেকে ককেশিয়া ও ককেশিয়ার দিন রাত্রি বই দুটোতে পৃথিবীর বৃহত্তম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাশিয়ার রাজনৈতিক যে ইতিহাসের দর্শন মেলে তা শুধু রোমহর্ষকই নয় বিস্ময়করও বটে। প্রদীপের উজ্জ্বল আলোর নিচে যে অন্ধকার, অন্ধকারের বাস তা বোঝা যায় এই লেখা থেকে। লেনিনের নেতৃত্বে যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল তার ইতিহাস তাঁর মৃত্যুর পর অন্যভাবে লেখা হয়েছে। লেনিন ও তার ক্ষমতার উত্তরসুরি স্ট্যালিন যদিও আদর্শিকভাবে একই পথের পথিক; তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্ট্যালিন অতিক্রম করে গেছেন লেনিনকে। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন রাষ্ট্র-পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। দায়িত্ব নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলে তার মতাদর্শবিরোধী সবাইকে দেশ ও দলের শত্রু প্রমাণ করে হত্যা করতে সফল হন। লেখকের ভাষায় বলা যায় :

‘১৯১৭ সালে বিপ্লবের সময়ে বলশেভিক পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে ছিলেন ৭ জন লেনিন, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ট্রটস্কি, স্ট্যালিন, সকোলনিকভ ও বুবনভ। স্ট্যালিন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ছোট্ট জর্জিয়ার সন্তান হয়েও বিশাল রাশিয়ার ক্ষমতাসীন হন। মেধাহীন মানুষ তা পারে না।…’

‘স্ট্যালিন জেনারেল সেক্রেটারির পদ নিশ্চিত করার পরে প্রথমে ‘বিরোধী বাম’ (খবভঃ ড়ঢ়ঢ়ড়ংরঃরড়হ) শুদ্ধি অভিযান (১৯২৩-১৯২৭) শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি ট্রটস্কিকে ক্ষমতাচ্যুত ও পার্টি থেকে বহিষ্কার করে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে সক্ষম হন। স্ট্যালিন তাঁকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর পার্টির, তাঁরই পছন্দের ডেলিগেটরা তা মেনে নেয়। জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ এই কাজে সর্বতোভাবে তাঁকে সাহায্য করেন।

লেনিন থাকতেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো। ১৯২২ সালের মধ্য-জুলাইতে কামেনেভ অসুস্থ লেনিনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন :

‘ঃযব ঈবহঃৎধষ ঈড়সসরঃঃবব রং ঃযৎড়রিহম ড়ৎ রং ৎবধফু ঃড় ঃযৎড়ি ধ মড়ড়ফ পধহহড়হ ড়াবৎনড়ধৎফ’

খবহরহ ধিং ংযড়পশবফ ধহফ ৎবংঢ়ড়হফবফ:

‘ঞযৎড়রিহম ঞৎড়ঃংশু ড়াবৎনড়ধৎফ– ংঁৎবষু ুড়ঁ ধৎব যরহঃরহম ধঃ ঃযধঃ, রঃ রং রসঢ়ড়ংংরনষব ঃড় রহঃবৎঢ়ৎবঃ রঃ ড়ঃযবৎরিংব– রং ঃযব যবরমযঃ ড়ভ ংঃঁঢ়রফরঃু. ওভ ুড়ঁ ফড় হড়ঃ পড়হংরফবৎ সব ধষৎবধফু যড়ঢ়বষবংংষু ভড়ড়ষরংয, যড়ি পধহ ুড়ঁ ঃযরহশ ড়ভ ঃযধঃ ?’

না, ‘লেনিন বোকা ছিলেন না, কিন্তু স্ট্যালিন অতি বেশি বুদ্ধিমান ছিলেন। ভিন্নমাত্রার বুদ্ধিমান।…’

‘বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধের সময়ের ট্রটস্কির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোকগুলোর কাউকে নির্বাসনে, কাউকে আত্মহননে, কাউকে অপঘাত-মৃত্যুতে, কাউকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো হয়। ট্রটস্কি উৎখাতের এই পর্বে জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ভরশিলভ, ফ্রাঞ্জে, কালিনিন, বুখারিন, রিকভ, পিতাকভ, তমস্কিসহ প্রধান প্রধান নেতারা সবাই স্ট্যালিনের পক্ষে থাকেন।…’

‘১৯৩৪ সালে লেনিনের আমলের ৪ লক্ষ পার্টি সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়, যারা ত্যাগ তিতিক্ষা এবং নির্যাতন সহ্য করে অক্টোবর বিপ্লব সাধন এবং সংরক্ষণ করেছে। ১৯২৯-১৯৩৬ সালে পার্টি থেকে বহিষ্কৃতের সংখ্যা ১১ লক্ষ। তাদের মধ্যে অনেকেই নিহত হয় পরবর্তী দিনগুলোতে।…’

সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির সবচাইতে জনপ্রিয় ছিলেন কিরভ। ১৯৩৪ এর ডিসেম্বরে কিরভ আততায়ীর হাতে নিহত হন। কিরভ হত্যাকারীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয় দুইবার। হত্যাকারীকে দুইবারই ছেড়ে দেওয়া হয় অজ্ঞাত কারণে। কেজিবির সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষ্যানুযায়ী কিরভ হত্যার নির্দেশ সরাসরি স্ট্যালিনের কাছ থেকে এসেছিল।

বিশ শতকের রাশিয়ার সবচাইতে নিষ্ঠুর শাসক ছিল স্ট্যালিন। রুশ বিপ্লবের নেতৃত্ব দানকারী প্রথম সারির নেতা দুজন, প্রথমজন ভøাদিমির ইলিচ লেনিন ও দ্বিতীয়জন ট্রটস্কি। স্ট্যালিন ছিলেন দ্বিতীয় সারির নেতা। লেনিনের অনুপস্থিতিতে তারই নেতৃত্বে ও অনমনীয় দৃঢ়তায় সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হয়। লেনিনের ভাবশিষ্য হলেও লেনিনের মতাদর্শের সাথে স্ট্যালিনের আদর্শিক মিল ছিল খুবই সামান্য। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি পদে আসীন হন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি দলে শুদ্ধি অভিযান চালান তার মতাদর্শের বিরোধীদের খুঁজে বের করতে। রাশিয়ায় তার মতাদর্শের বিরোধিতা করেছেন এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েতই মন্দ ছিল না। এর মধ্যে ছিলেন লেখক, রাজনীতিবিদ, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্যসহ অনেকেই। স্ট্যালিন এদের কাউকেই ছাড় দেননি। অনেককে যেতে হয়েছে নির্বাসনে, অনেকে জীবন দিয়েছেন ফায়ারিং স্কোয়াডে। স্ট্যালিন ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শুধু রাশিয়াতেই নয় সারা পৃথিবীর অনেক বাম আদর্শে বিশ্বাসী বিপ্লবী জীবন-সংশয়ের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নেন। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি ও কমিনটার্নকে তারা তাদের নিজস্ব পার্টি ও প্লাটফর্ম মনে করতেন। লেনিন যে আদর্শের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন এবং চেয়েছিলেন পৃথিবীর সকল দেশের কমিউনিস্টদের এক পতাকা বা আদর্শের বলয়ে ধরে রাখতে, তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত পথ অনুসরণ করেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, দেশ বা বিদেশ যেখানকারই হোক না কেন; তার মতাদর্শে বিশ্বাসী না হলে সে-ই স্ট্যালিনের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। তার মনের সাথে মিল না হওয়ায় সোভিয়েত কমিন্টর্নের শীর্ষ নেতা ওসিপ পিয়াতনিৎস্কি, বেলা কুন এবং ভিলগেলম নরিনকে গ্রেফতার করে ফায়ারিং স্কোয়াডে মুত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। একই ভাবে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মিরভ-আব্রাম, স্মোলিয়ানস্কি, খিতারভ, মিফ এবং ক্রাজেভস্কি। শুধু রাশিয়ার কমিউনিস্ট স্ট্যালিন-মতাদর্শ বিরোধী নেতা-কর্মীরাই নয় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লেনিনপন্থী যাদেরকে স্ট্যালিন তার প্রতি অবিশ্বস্ত মনে করেছেন তারাই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ৯ জনসহ অনেকেই। নিহতদের মধ্যে ছিলেন, এফ. বাইয়াকি, ডি. বোকানিই, ই. কেলেন, ই . রাবিনোভিচ, শ. শাবাদোস।

পোলিশ কমিউনিস্ট পার্টির এ. ভারস্কি, এম. কসুৎস্কায়া, এম. খরভিৎস, ভি. শ্তেইন, পলিটব্যুরো-সদস্য, বি. বর্তোনভস্কি এফ. গ্ঝেলশাক, স্টি. মেরতেনেস, এ. প্রুখনিয়াক, সাধারণ সম্পাদক, ইউ. লেস্সিনস্কি―পোলিশ পার্টির স্পেন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ক. চেখোভস্কি ও গ. রাইখের প্রমুখ। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির দশোর্ধ নেতা-কর্মী। অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড কমিউনিস্ট পার্টির হাজারের অধিক নেতা ও কর্মীর জীবন দিতে হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন বুলগেরিয়ার প্রথম লেনিন পুরস্কারপ্রাপ্ত আর. আভরামভ এবং ভ. স্তোমোনিয়াকভ। ফিনল্যান্ডের পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ক. ম্যান্নের, ইউ. সিরোলা, শটম্যান, রোভিও প্রমুখ। যেমন মৃত্যু এড়াতে পারেননি গ্রিসের পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি―আ. কাইতাস।

এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুধু ইউরোপের পার্টিগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতবর্ষও এই হত্যাযজ্ঞের বাইরে ছিল না। ভারতের তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট নেতা এম এন রায় ও রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুস্পুত্র সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর বুখারিনের সাহায্য নিয়ে জার্মানিতে পালিয়ে গিয়ে জীবনরক্ষা করেন। কিন্তু বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অবনী মুখার্জি এবং গোলাম আম্বিয়া খান লোহানীর শেষ রক্ষা হয়নি। স্ট্যালিনের নির্দেশে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় রাশিয়াতেই। এদের মধ্যে বীরেন্দ্রনাথ চট্টপাধ্যায় ছিলেন বিক্রমপুরের কৃতিসন্তান ও হায়দারাবাদের ‘নিজাম’স কলেজের প্রতিষ্ঠাতা’ অধ্যক্ষ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র ও স্বনামধন্য ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিশিষ্ট বাগ্মী, কবি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি সরোজিনী নাইডুর ভাই। মেধাবী এই কমিউনিস্ট নেতা ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনার জন্য লেনিনপত্নী ক্রুপস্কায়ার সাথে দেখা করেন। কিন্তু ক্রুপস্কায়া ছিলেন স্ট্যালিনের চক্ষুশুল। এই অপরাধে অঘোরনাথ পুত্র বীরেন্দ্রনাথকে ফায়ারিং স্কোয়াডে জীবন দিতে হয়।

জর্জিয়ার সন্তান যোসেফ স্ট্যালিন রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে লেনিন ও ট্রটস্কির মতো মহীরুহের ছায়াতলে থাকার কারণে নেতা হিসেবে তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়লাভ ছিল তার অসম্ভব দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত রাশিয়া পুনর্গঠনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলোর মতই সে ছিল এক বিশাল চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। বিরোধী মত তখন বিষের মতই তিক্ত মনে হয়। যেটা যোসেফ স্ট্যালিনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় সমস্ত কার্যকলাপ থেকে জনগণকে অন্ধ করে রাখা হয়েছে সব সময় সমাজতন্ত্রের আফিম খাইয়ে। তারপরও রাশিয়ার জনগণ অনেকের কাছে স্ট্যালিন এখনও একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।

 লেখক : প্রাবন্ধিক    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares