মজিবর রহমান খোকার যুদ্ধকথা : সুজন বড়ুয়া

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-মুক্তিযুদ্ধ

পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন হয়েছে এমন দেশ বেশি নেই। মাত্র দুটি দেশ এই বিরল গৌরবের অধিকারী। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যটি আমাদের  প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পেন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ১৩ টি উপনিবেশ নিয়ে জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিল এই ভূখণ্ড। নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। শাসনের নামে দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানিরা শোষণ করেছে পূর্ব পাকিস্তানকে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাঙালি জাতির ২৩ বছরের সেই ইতিহাস ধূসর-মলিন-করুণ ও রক্তরাঙা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব দিক থেকে বাঙালির আত্মবিকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালি ধাপে ধাপে তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করার পথ খুঁজতে থাকে। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগকে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা দেয়নি পাকিস্তানিরা। বরং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, শুরু করে গণহত্যা, ইতিহাসে যা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে পরিচিত। গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুললে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ২৩ বছরের নিপীড়ন-নির্যাতন ও শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়েছিল বাঙালি জাতি। 

কিন্তু এই যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ অসম একটি যুদ্ধ। সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত পাকিস্তান বাহিনীর বিপরীতে যুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট সশস্ত্র প্রস্তুতি ছিল না বাঙালি জাতির। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। প্রিয় নেতার এই একটি বাণীই অবিশ্বাস্যভাবে সেদিন উদ্দীপিত করেছিল বাঙালিকে, করেছিল ঐক্যবদ্ধ। সম্বল বলতে তাদের ছিল শুধু অসীম মনোবল। আর ছিল মাতৃভূমিকে রক্ষা করার উচ্চ নৈতিক শক্তি। এই দুটোকে সম্বল করেই বাঙালি রুখে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে। শ্রেণি-পেশা ছেলে-জোয়ান-বুড়ো―বয়স নির্বিশেষে সবাই সেদিন জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। ১০ এপ্রিল গঠন করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। এই সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। আশ্রয় দিয়েছিল বাংলার এক কোটি শরণার্থীকে, যুদ্ধের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করেছিল বাঙালি গেরিলা যোদ্ধাদের। শেষ পর্যন্ত বীরবিক্রমে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। বর্বরতা ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে জয় হয়েছিল নৈতিকতা ও মানবতার। অনেক অশ্রু ও রক্তে লেখা এ জয়। যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন ত্রিশ লক্ষ লোক। অগণিত মা-বোন হারিয়েছেন তাদের সম্মান-সম্ভ্রম। সেসব বুকভাঙা দুঃখগাথার কতটুকু ধারণ করেছে ইতিহাস! কতটুকুই-বা প্রকাশ পেয়েছে ছাপার অক্ষরে। এখনও প্রকাশিত হচ্ছে কত অজানা জীবনকথা, সত্য ঘটনা-ভাষ্য। আবিষ্কৃত হচ্ছে কত বধ্যভূমি, কত বীরগাথা।  

এমনই একটি বই আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে সম্প্রতি। বইটির নাম : একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকথা। লেখক মজিবর রহমান খোকা। প্রকাশক বিদ্যাপ্রকাশ। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি, ২০০৭। হিসাব করে দেখি, তাও স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পর প্রকাশিত হয়েছে এ বই। আর আমি বইটি পড়ছি স্বাধীনতার পুরো পাঁচ দশক পর। পড়তে পড়তে আমার আবার নতুন করে মনে হলো মুক্তিযুদ্ধের এখনও কতকিছু অজানা রয়েছে।

একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকথা নাম থেকেই বোঝা যায় এটি যুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা। দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার পবিত্র তাড়না থেকে যুদ্ধে গিয়েছিলেন লেখক মজিবর রহমান খোকা। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, এমন অনেকেই যুদ্ধে গিয়েছেন। কিন্তু একটু থমকে গিয়ে চমকে ওঠার একটি ব্যাপার এখানে আছে। তা হলো, মজিবর রহমান খোকা যুদ্ধে গিয়েছেন বেশ অল্প বয়সে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ স্কুলের গণ্ডি তখনও পার হননি। বয়সের হিসাবে তাকে কিশোরই বলা যায়।

কৈশোর মানবজীবনের এমন এক স্তর, যখন অভিজ্ঞতা, অনুমান, উপলব্ধি, বোধ ইত্যাদি থাকে অপরিণত। কিন্তু কিশোর নিজে নিজের মধ্যে এসবের ঘাটতি মানতে নারাজ। তার প্রবল শক্তি আবেগ। আবেগ দিয়ে অন্য সবকিছুর ঘাটতি ঢেকে দিতে চায় সে। আবেগই তাড়িত করে তাকে। ১৯৭১ সালে কিশোর মজিবর রহমান খোকাকেও তাড়িত করেছিল আবেগ। তবে তিনি ছিলেন সচেতন কিশোর। বাবা মোহাম্মদ ইসমাইল তৎকালীন ওয়াপদা-র সেচ বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা (প্রকৌশলী) ছিলেন। সরকারি চাকরিজীবীর সন্তান হওয়ার সুবাদে মজিবর রহমান খোকা মোটামুটি তার বয়স উপযোগী সচেতন ছিলেন। বাসায় ৪ ব্যান্ডের একটি ফিলিপস রেডিও ছিল, রেডিও-তে লন্ডনের বিবিসি, আমেরিকার ভয়েস অব আমেরিকা ও ভারতের আকাশবাণীর খবর শোনা হতো নিয়মিত। আর বাসায় ঢাকার দৈনিক পত্রিকা রাখা হতো। সুতরাং দেশের হাল অবস্থা রাজনীতি, এসবের চলতি খবর পারিবারিকভাবে জানা হয়ে যেত তার। আবার স্কুল ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানে গানবাজনা চর্চার সঙ্গেও তার সম্পৃক্তি ছিল। তবে তার চালচলনে পাকামো ছিল না। ১১৮ পৃষ্ঠার এই যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথার সর্বত্র তার কিশোরসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সরল প্রকাশ লক্ষণীয়। সহজ সরল প্রকাশভঙ্গিই এই বইয়ের প্রাণ ও সৌন্দর্য।

কিশোর মজিবর রহমান খোকা―বাবার বদলির চাকরি। ১৯৭১ সালে তারা সপরিবারে ছিলেন বাবার কর্মস্থল তদানীন্তন নাটোর মহকুমায়। বাবার সরকারি বাসা ছিল ওয়াপদা কলোনিতে। মজিবর রহমান তখন জিন্নাহ সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পরও বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে দেশে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। দেশের এই উত্তপ্ত সময়ে এলাকার বয়স্ক ছেলেদের দেখাদেখি ছাত্রদের মিছিল সমাবেশে যোগ দিয়েছেন মজিবর রহমান। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, ৬ দফা, ১১ দফা, মানতে হবে মানতে হবে, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, জনে জনে জনতা গড়ে তোল একতা―এসব স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। নির্বাচনের আগে আলকাতরা দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা এঁকে ‘ভোট দিন’ কথা লিখে গেছেন। এজন্য বিহারি সহপাঠী ফিরোজ খানের রোষানলেও পড়েছেন। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারে এলাকায় এলে কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখার অপার উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন মজিবর রহমান খোকা। এসব দুরন্ত স্মৃতি তিনি সরস ভাষায় লিখেছেন বইয়ের সূচনা অংশে।

২৫, মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে নাটোরের ও আশেপাশের অবাঙালি আর বিহারিরাও বুনো উল্লাসে মেতে উঠল। বাঙালিদের খুন করে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে লাগল। পাকিস্তানের চাঁদ-তারা পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলনের সময় অনেক বাঙালি বিহারিদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারাল। এ অবস্থায় এলাকার বাঙালিরা প্রতিরোধে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। লেখকের ভাষায় জানা যাক :

‘ক’দিন পর নাটোর শহরে খবর রটে গেল, সারা দেশে বিহারি আবাসিক এলাকাগুলোতে পাকসেনারা ছদ্মবেশে অস্ত্রশস্ত্রসহ আস্তানা গাড়ছে। লেঙ্গুরিয়াতেও পাকসেনারা গোপনে রাতের অন্ধকারে এসে জড়ো হয়েছে। ব্যস, আর এক মুহূর্ত দেরী নয়―চলো সবাই দলে দলে/ যার যা কিছু সম্বল করে। প্রতিহত করার জন্য কারও হাতে তীর-ধনুক, কারও হাতে টেঁটা-কোঁচ, কারও হাতে রামদা, কারও হাতে বন্দুক। আব্বার একটি লাইসেন্স করা একনলা বন্দুক ছিল। তিনি এবং আরও দু’একজন সরকারী কর্মকর্তা বন্দুক নিয়ে রেল লাইনের পূর্ব প্রান্তের নিচু এলাকায় পজিশন নিয়ে গুলি ছুঁড়লেন। বেশ কিছুক্ষণ একতরফা গুলি চালানোর পর বিহারিদের উদ্দেশে মাইকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলো। বিহারিরা সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করল। প্রতিরোধ কমিটি নিশ্চিন্তে থাকার জন্য জেলখানা থেকে পুরনো কয়েদীদের ছেড়ে দিয়ে বিহারিদেরকে পরিবারসুদ্ধ সেখানে ঢুকিয়ে দিলেন।’

কিন্তু প্রতিরোধ কমিটির এই উদ্যোগেও শেষরক্ষা হলো না। লেখক এই পর্যায়ে জানাচ্ছেন :

‘এপ্রিলের ১৪/১৫ তারিখের দিকে সকল প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিয়ে পাক-বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চালাতে ঢাকা থেকে পাবনা হয়ে নাটোরের অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো। ওদের অগ্রসরের খবর জানতে পেরে মহকুমা প্রশাসক অফিস থেকে শহরে মাইকিং করে সবাইকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।’

মজিবর রহমান খোকাদের শুরু হলো উদ্বাস্তু জীবন। পরদিন সকালে পোষা-পালিত হাঁস-মুরগি, গাভি-বাছুর সবগুলোকে চিরমুক্ত করে দিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশে। রাস্তায় বেরিয়েই বুঝতে পারলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আরও কয়েকদিন আগে বের হলে ভালো হতো। শহর ছেড়ে পূর্বদিকে হরিশপুর পর্যন্ত এগোতেই পাক-বাহিনীর বাধা। পথের পাশে লতা-পাতা ঘেরা একটি বাড়িতে কোনোমতে আত্মগোপন করে সেখান থেকে ছুটে গেলেন আব্বার হালসা ¯লুইস গেটের অফিসে। এখানে একরাত কাটিয়ে নিরাপদ আশ্রয় সন্ধানের চেষ্টা করা হলো। কিন্তু আব্বার পূর্ব পরিচিতরা মুখ ফিরিয়ে নিল সবাই। অগত্যা ছইঅলা একটি বড় নৌকা ভাড়া করে জিনিসপত্রসহ সবাইকে নিয়ে সেদিন রাতেই রওনা হলেন পৈতৃকবাড়ি কুমিল্লা জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার তেজখালী গ্রামে। পথখোরাকির জন্য সঙ্গে নিলেন পর্যাপ্ত চাল-ডাল, আলু। নন্দকুঁজা নদী বেয়ে মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ হয়ে অনেক বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ ১০ দিন পর তারা পৌঁছেন কুমিল্লা জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার তেজখালী গ্রামে। এই ১০ দিন নদীতে নৌকা চলেছে বিরামহীন। সবার খাওয়া-দাওয়া ঘুম বিশ্রাম সবই হয়েছে নদীতে, নৌকায়। 

বাড়িতে ফেরার কদিন পর মজিবর রহমান খোকা থাকার জন্য নিজ বাড়ি থেকে তিন-চার মাইল দূরে ভেলানগর গ্রামে ফুপুর বাড়িতে চলে যান। সেখানে অগ্রজ ফুপাতো ভাই নজরুল ইসলাম জসুর সাথে আশপাশের গ্রাম ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটতে থাকে তার। নিচু জলাভূমি এলাকা হওয়ায় এদিকটায় পাকিস্তান বাহিনীর আনাগোনা নেই। দূর থেকে ভারী অস্ত্র গোলাবারুদ চালনা ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় বটে। এমনি এক দুপুরে চাচাতো ভাই এলহাম ফুপুর বাড়ির ঘাটে নৌকা রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে মজিবর রহমানকে জানাল, বাড়িতে মুক্তিবাহিনী এসে উঠেছে। ব্যস, ফুপুর বাড়িতে মজিবর রহমানকে আর আটকায় কে ? এলহামের সঙ্গেই তিনি ফিরে এলেন বাড়ি। বাড়ি ফিরে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশভুষা ও অস্ত্রশস্ত্র দেখে তার বিস্ময় আর ধরে না।

এবার গ্রামে রেডিও-তে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী এবং সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনে সময় কাটতে লাগল। এমন সময় এলহামের মাধ্যমে মজিবর রহমানের পরিচয় হলো মুর্শিদুল ইসলাম নামে এক ছেলের সাথে। ভদ্র-নম্র এই ছেলেটিও এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। দুজনের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠল বেশ। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিমর্মতা ও বর্বরতা দেখে দুজনই ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ। লেখকের ভাষায় তা জানা যাক :

‘আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। এভাবে কীট-পতঙ্গের মতো নিরস্ত্র হয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধ করে অন্তত একজন পাক-সেনাকে হত্যা করে মরতে পারাও যে অনেক ভালো। আমাকে আমার পরিবার, আত্মীয় স্বজন এবং দেশের অগণিত অসহায় মানুষকে বাঁচাতে হবে। এভাবে ঘরের কোণে বসে থেকে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।’

সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন দুই বন্ধু―মজিবর রহমান আর মুর্শিদুল ইসলাম। বিষ্ণুরামপুর বাজারের ডা. সামছুল হকের সূত্র ধরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবেন তারা। বাবা-মায়ের সম্মতি মিলল যথারীতি। ২৫ জুলাই রাত ৯টা নাগাদ একজন গাইডের নেতৃত্বে বিষ্ণুরামপুর বাজার থেকে কেরাই নৌকা (এক ধরনের ছইঅলা ছোট নৌকা) যোগে রওয়ানা হলো  আট-দশজনের একটি দল। সেই দলের দুই সদস্য হলেন মজিবর রহমান আর মুর্শিদুল ইসলাম।

অনেক বিপদ ও বাধা পেরিয়ে পরদিন রাত ৮টার দিকে তারা পৌঁছলেন আগরতলায়। পাহাড়-নদী, বন-জঙ্গলের মধ্যে শুরু হলো সে এক নতুন জীবন। কষ্ট হলেও রোমাঞ্চ জাগে প্রতি মুহূর্তে। মজিবর রহমান খোকা লিখেছেন :

‘দুপুরে খাওয়ার সময় হলে আমাদেরকে রাস্তায় লাইন ধরে দাঁড়াতে বলা হলো। এরপর দক্ষিণ দিকে হাওড়া নদীর পাড়ে প্রায় ১ মাইল দূরে হাঁটিয়ে এক স্কুল-ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে মিষ্টি কুমড়াসহ আর কিছু সবজী দিয়ে ঘুটনি জাতীয় তরকারী দেওয়া হলো। তাই দিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে ভাত খেলাম। এভাবে আরও কয়েকদিন দুপুরে  এবং রাতে হেঁটে হেঁটে সেখানে ভাত খেতে যেতাম।’

২৯শে জুলাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল বাগচী ক্যাম্পে অবস্থানরত তরুণ জোয়ানদের রিক্রুটের জন্য ডাকলেন। যারা হাত তুলে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে সম্মতি জানাল, কর্নেল সাহেব কেবল তাদের রিক্রুট করলেন। বাকিদের অবজ্ঞাভরে শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মজিবর রহমান, মুর্শিদুল ইসলামসহ তাদের সমবয়সী বিষ্ণুপুর নৌকার সহযাত্রী ফারুককে ট্রেনিংয়ের জন্য রিক্রুট করা হলো।

পরদিন, ৩০ জুলাই বিকাল ৪টার দিকে, ট্রাকে করে ট্রেনিং সেন্টারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো তাদের। একসঙ্গে ছাড়ল কয়েকটি ট্রাক। প্রতি ট্রাকে ৩০জন করে যাত্রী। অরণ্য-পর্বতময় আঁকাবাঁকা পথ। অনভ্যস্ত ভ্রমণের কারণে অনেকে বমি করতে শুরু করল। তাদের জন্য একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু মজিবর রহমান খোকা এগিয়ে যাওয়ার জন্য অস্থির। তিনি  লিখছেন :

‘কিন্তু আমি তো এখন বিশ্রামের জন্য মোটেও প্রস্তুত নই। আমি আমার ইস্পাতসম কঠিন মনোবল নিয়ে ট্রাকে দাঁড়িয়ে আছি। আমার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সাধিত না হওয়া পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নিব না। আমার এই অবিচল সিদ্ধান্তে আমাকে কেউ উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করেনি। আমার বিবেক, আমার আদর্শ, আমার অস্তিত্ব, আমার অদৃষ্ট আমাকে দুর্বার করে তুলেছে। আমি এখন যতদূর সম্ভব যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ট্রেনিংগুলো সম্পন্ন্ করে দেশের উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করবো।’

ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর প্রান্তের মহকুমা কৈলা শহরে রাত্রিযাপনের পর সকালে চোরাপুর বাজার অতিক্রম করে ট্রাক প্রবেশ করল আসাম রাজ্যে। কাছার জেলার করিমগঞ্জ হয়ে শিলচর শহর ছাড়িয়ে জনমানবহীন ঝোপ-জঙ্গল-টিলা বেয়ে ২৬ ঘণ্টা পর লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছলেন তারা। সেখানে তখন অপেক্ষমান আরও অসংখ্য প্রশিক্ষণার্থী। মজিবর রহমান খোকার ভাষায় প্রশিক্ষণ শুরুর বিষয়টা জেনে নেয়া যাক :

‘এখানে আমাদের মধ্য থেকে ৩টি কোম্পানী গঠন করা হলো। আমি কোম্পানী ‘ইকো’তে তালিকাভুক্ত হলাম। দুর্ভাগ্যবশত মুর্শিদ আমার কোম্পানীতে থেকেও আমার প্লাটুনে থাকলো না। সে আমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেল। একসাথে না থাকতে পারার কারণে ওর জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। বিষ্ণুরামপুর থেকে নৌকার সহযাত্রী আমার সম-বয়সী ফারুক থাকলো আমার সাথে। অতঃপর আমাদের প্রত্যেকের হাতে গামছা-হাফপ্যান্ট, থালা, মগ, সতরঞ্জি দিয়ে যার যার কোম্পানীর নির্ধারিত স্থানে একজন ভারতীয় হাবিলদারের সাথে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।’…

‘রাতের খাবারের আগে আমাদেরকে ফলইন করানো হলো। সেখানে প্রথমে গুণতি করানো হলো। আমাদের ১১০ জনের জন্য ঢাকার দুলাল নামে একজন শিক্ষিত ছাত্রকে গ্রুপ লিডার বানানো হলো। তারপর কে কোন তাঁবুতে থাকবে তার বরাদ্দ দেওয়া হলো। সব শেষে বলা হলো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি যে যে জানো তারা সামনে আসো। প্রথমে সাদি নামে একজন গেল, পরে আমি। বলা হলো আমরা গানটি গাওয়া শুরু করলে অন্যান্যরাও আমাদের সাথে কণ্ঠ মিলাবে। আমি বাংলাদেশের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব আবেগ নিয়ে গানটি গাওয়া শুরু করলাম। এরপর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফলইনের পর আমাদের দুজনকেই গানটি শুরু করতে হতো।’

প্রশিক্ষণ শুরুর প্রারম্ভে ব্রিগেডিয়ারের কথা থেকে জানা গেল, লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারের এটি দ্বিতীয় ব্যাচ। ১ম ব্যাচে প্রশিক্ষণার্থী বেশি ছিল না । এবার যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ১৪০০ জনকে।

এক মাসের কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে শেষ হলো গেরিলা যুদ্ধের বেসিক ট্রেনিং। দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য সবাই অধীর ও ব্যাকুল। প্রশিক্ষণ শেষের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অনেককে দেশের নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। মুর্শিদ, ফারুক, সাদি সবাই দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু পাঠানো হলো না মজিবর রহমান খোকাকে। এজন্য তার খুব মন খারাপ। কারণ জানার জন্য  তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসারের শরণাপন্ন হলেন। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে কয়েকজন অফিসার মজিবর রহমান খোকাকে বিশেষ প্রীতির চোখে দেখতেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণে ত্বরিত সাফল্য ছাড়াও এর পেছনে আরও কয়েকটি কারণ ছিল। কারণগুলো হলো মজিবর রহমান খোকা অবসরে অফিসারদের গজল, রবীন্দ্রসঙ্গীত ইত্যাদি গান শোনাতেন, ভাঙা ভাঙা উর্দুতে কথা বলতে পারতেন আর শেষ কারণ হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে তার নামের মিল। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, মজিবর রহমান খোকা আংশিকভাবে হলেও বঙ্গবন্ধুর দুটো নামই ধারণ করে আছেন। এখন কে না জানে বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম খোকা। সুতরাং এরকম একজন চটপটে তরুণ প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষক অফিসারদের প্রিয় হয়ে উঠবেন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

যা হোক, প্রশিক্ষক অফিসারদের একজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাবিলদার হনুমান সিং জানালেন, প্রশিক্ষণের পারফরমেন্সের ভিত্তিতে কিছু প্রশিক্ষণার্থীকে জুনিয়র লিডারশিপ উইংস (জেএলডাব্লু) ট্রেনিং দেওয়ার জন্য বাছাই করা হয়েছে, তার মধ্যে  মজিবর রহমান খোকা একজন। মজিবর রহমান খোকা আপত্তি জানালে মাদ্রাজি আরেক অফিসার বললেন, মনে রাখবে, এ যুদ্ধ ১০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। তোমাদের আরও ভালোভাবে ট্রেনিং নিতে হবে।

সুতরাং এ যাত্রায় মজিবর রহমান খোকার দেশে ফেরা হলো না। ঐ দিনই বিকেলে জুনিয়র লিডারশিপ উইংস ট্রেনিংয়ের জন্য বাছাই করা প্রশিক্ষণার্থীদেরকে সমতলভূমি থেকে উঁচু উঁচু গাছপালায় ঘেরা অরণ্যময় পাহাড়ের ওপরে একটি ছনের ব্যারাকে নিয়ে আসা হলো। কয়েকদিন পর শুরু হলো উচ্চতর প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ সম্পর্কে লেখক বলছেন :

‘লিডারশীপ ট্রেনিংটি স্বভাবতঃই গুণগত মানে বেসিক ট্রেনিং-এর চেয়ে উন্নত ছিল। প্রায় প্রতিদিন সকালে খালি পায়ে রাইফেল নিয়ে কয়েক মাইল ডাবল মার্চ করে আসতে হতো। এরপর থিওরী ক্লাস করতে হতো। থিওরী ক্লাসে যুদ্ধের পরিকল্পনা কিভাবে করতে হবে, কিভাবে সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে হবে , কিভাবে বিমান থেকে শত্রুপক্ষের ছত্রিসেনা মাটিতে নামার পূর্বেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, কিভাবে রেল এবং রাস্তার সেতু মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে ইত্যাতি বিষয়গুলো ব্ল্যাক বোর্ডের মাধ্যমে এঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো।’

১৫ দিন পর সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে জুনিয়র লিডারশিপ উইংস (জেএলডাব্লু) ট্রেনিং শেষ হলো। পরদিন সকালে ট্রাকে করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো আসামের কাছার জেলার সীমান্ত এলাকার যুদ্ধ ক্যাম্পে। জায়গাটি বাংলাদেশের সিলেট জেলার করিমগঞ্জের পাশে জালালাবাদ। এটি মেজর সি আর দত্তের ৪নং সেক্টরের অধীন একটি সাবসেক্টর। এখানে মজিবর রহমান খোকাকে একটি প্লাটুনে সেকশন কমন্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হলো। তার অধীনে দেওয়া হলো শাহনেওয়াজ, সুধীর, নারায়ণ দাস, রফিক, মোস্তফাসহ আরও পাঁচজনকে। সবার নামে অস্ত্র বরাদ্দ হলো। এখানকার দৈনন্দিন জীবনযাপনের চিত্রটা আমরা লেখকের বর্ণনা থেকে জেনে নিই :

‘এখানে আমরা সারাদিন টহলের মধ্যে থাকতাম। সুযোগ পেলেই হানাদারদের সাথে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতাম। মাঝে মাঝে আমরা বরাক নদীর ওপারে রঘুনাথপুরে চলে যেতাম। সেখানে পাক বাহিনীর সাথে গোলাগুলি করে ক্যাম্পে ফিরে আসতাম। যেদিন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতো সেদিন বিএসএফ আমাদের সার্পোটে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করত।’

কিন্তু কদিন পর এখানকার কুমিল্লা অঞ্চলের যোদ্ধারা কুমিল্লা এলাকায় তাদের যুদ্ধের সুযোগ দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করল। মজিবর রহমান খোকার পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা। সুতরাং তিনিও সেই আন্দোলনে যোগ দিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে যোদ্ধাদের এধরনের মনোভাবকে প্রশ্রয় দিতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত কুমিল্লাপন্থী আন্দোলনকারী যোদ্ধাদের অস্ত্র ফেরৎ নিয়ে তাদের আগরতলায় ফিরিয়ে নেওয়া হলো। সেখানে মেলাগড় ট্রেনিং সেন্টারে ঘটল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। যে তাবুতে মজিবর রহমান খোকার থাকার ব্যবস্থা হলো তার পাশের তাঁবুতে তিনি পেয়ে গেলেন অগ্রজ দুই ফুফাতো ভাই গোলাম মোস্তফা হোসেন ও নজরুল ইসলাম জসুকে। সে কি মিলন-আনন্দ!

দুদিন পর মজিবর রহমান খোকাসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১৯ জনকে ট্রাকে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো আগরতলার উপকণ্ঠে মনতলীর ৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর মধ্যে রমজান শুরু হয়েছে। মনতলীর ৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল কুমিল্লার আখাউড়া শহরের কাছে। এখানে অস্ত্রের অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত মজিবর রহমানদের অনশন করতে হলো। অস্ত্র পাওয়ার পর অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এক দুপুরে বাঞ্ছারামপুর থানার কাছে চর লহনীয়া প্রাথমিক স্কুল ঘাটে এসে তাদের নৌকা ভিড়ল। এখানে কোম্পানি কমান্ডারের কাছ থেকে তিন দিন ঈদের ছুটি পাওয়া গেল। ছুটি পেয়েই মজিবর রহমান প্রথমে গেলেন ভেলানগর ফুফুর বাড়ি। সেখান থেকে ফুফাতো ভাই নজরুল ইসলাম জসুকে সাথে নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে সকাল ৮টার দিকে পা রাখলেন তেজখালীর নিজ বাড়িতে। বাড়ির সবার চোখ বিস্ফারিত ও অশ্রুসজল। মাস-দুই আগে মজিবর রহমান তার বন্ধু মুর্শিদুল ও ফারুকের সঙ্গে গ্রামে ফিরে না আসায় বাড়ির সবাই ধরে নিয়ে ছিল, তিনি যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। সেই মুজিবর রহমানের অপ্রত্যাশিত আগমনে বাড়ির সবাই অভূতপূর্ব আনন্দে ভাসল।

পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে তিন দিন ঈদের ছুটি কাটিয়ে মজিবর রহমান আবার ফিরে এলেন উজানচরের যুদ্ধ-ক্যাম্পে। এখানে থেকে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে অংশ নিলেন কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে। ভূমিকা রাখলেন থানা ক্র্যাকডাউনে। এসব যুদ্ধাভিযান ছিল ভয়াবহ সাহসিকতাপূর্ণ ও গৌরবদীপ্ত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো। প্রতিদিনই নতুন অভিযান, নতুন উত্তেজনা। এর মধ্যেই ভেসে এলো পরম কাক্সিক্ষত বিজয় বার্তা―১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে পাকিস্তানি বাহিনী।

কিন্তু উজানচরে লড়াই অব্যাহত তখনও। ২০ ডিসেম্বরও মুখোমুখি অবস্থানে মজিবর রহমানদের কোম্পানি ও পাক-বাহিনী। তুমুল এই যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধাদের দাপুটে আক্রমণে পাকিস্তান বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

২৯ ডিসেম্বর মজিবর রহমান তার প্রিয় বিএইচ ৪৮১৮ নম্বরের এসএলআর অস্ত্রটি জমা দেন প্লাটুন কমান্ডার শামসুল হুদার হাতে। সেদিন বাঞ্ছারাম হাইস্কুল মাঠে মজিবর রহমান খোকাসহ সমবেত মুক্তিযোদ্ধারা গ্রহণ করেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষের উষ্ণ অভিনন্দন।

এবার মজিবর রহমানরা ছুটে গেলেন এপ্রিলের মাঝামাঝি ছেড়ে আসা বাবার সরকারি কোয়ার্টার নাটোরের ওয়াপদা কলোনীর বাসায়। কিন্তু না, বাসায় রেখে যাওয়া আসবাব, তৈজসপত্রসহ কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। জানা গেল তারা চলে যাওয়ার পর বাসায় আস্তানা গেড়েছিল পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা। যাক, বাসার প্রিয় জিনিসপত্র ফিরে না পেলেও মজিবর রহমান খোকা ফিরে পেলেন তার প্রিয় বন্ধুদের। কিন্তু মজিবর রহমান খোকা যুদ্ধে গিয়েছেন―এ কথা বিশ্বাস করল না কেউ।

একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকথা বইয়ের এই ছিল মোটামুটি বিষয়-পরিধি। যোদ্ধার জীবন কত ভয়াবহ বিপদসঙ্কুল আর কত অনিশ্চিত আশঙ্কায় ভরা তার জীবন্ত চিত্র বইটির পাতায় পাতায় ছড়ানো। কত প্রতিকূলতা মাড়িয়ে সামনে এগোতে হয় যোদ্ধাকে। সাহস ও বিচক্ষণতা কেবল যোদ্ধাকে বাঁচায় না, একইসঙ্গে ভাগ্যের সহায়তাও তার প্রয়োজন, কিশোরসুলভ চপলতায় পরিচালিত কয়েকটি অভিযান পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছে এই উপলব্ধি। সমগ্র যোদ্ধা-জীবনে যারা সামান্যতম হলেও সাহায্য সহযোগিতা, আনুকূল্য, নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন এবং যারা নানা সময়ে অভুক্ত থেকে নিজেদের সুস্বাদু খাবার খেতে দিয়েছেন, সেসব উদার মানুষের স্মৃতি লেখক প্রকাশ করেছেন গভীর কৃতজ্ঞতায়। এর নজির বিধৃত আছে বইটির উৎসর্গপত্রেও। উৎসর্গপত্রে লেখক লিখেছেন :

‘মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যে কোনোভাবে সহযোগিতা করলে পাক-বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হতে পারে জেনেও যে-সব নিঃস্ব-নিরন্ন পরিবার তাদের নিজেদের জন্য তৈরি খাবার হাসি মুখে আমাদেরকে খেতে দিতেন তাঁদের প্রতি আমি আমৃত্যু কৃতজ্ঞ থাকবো।’

এটি একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা-ঋদ্ধ প্রকাশনা। বইয়ের শুরুতে রয়েছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি মূল্যবান ভূমিকা। এরপর প্রাসঙ্গিকতা হিসেবে লেখক যোগ করেছেন ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ পর্যন্ত এই উপমহাদেশের একটি রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত। তারপর বইয়ের মূল অংশ―মজিবর রহমান খোকার যুদ্ধকথা। শুরু থেকে ধারাবাহিক এই যুদ্ধকথা পাঠে পাঠকের মনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষের অভাবনীয় আত্মত্যাগের আশ্চর্য সব চিত্র। 

একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকথা বইয়ের কথনভঙ্গি বেশ নৈর্ব্যক্তিক। ফলে একজনের স্মৃতিকথা হয়েও এটি সামষ্টিক। মজিবর রহমান খোকার মতো দেশকে ভালোবাসার আবেগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধে  গিয়েছেন, এমন অগণিত কিশোর, যারা স্মৃতিকথা লেখেননি, এটি তাদেরও স্মৃতিকথা হয়ে উঠেছে। ঘটনার পারম্পর্য বিন্যাসেও এখানে গল্পের স্বাদ পাওয়া যায়। এটিও এ বইয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক। একইসঙ্গে এর বাহুল্যবর্জিত সত্য তথ্য-ভাষ্য ইতিহাস গবেষকদের প্রয়োজন মেটাবে নিঃসন্দেহে। স্মৃতিকথাও যে সৃজনশীলতায় অসামান্য হয়ে উঠতে পারে, এ বই তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বইটি পড়তে পড়তে মনে হলো, সব কিশোর মুক্তিযোদ্ধা যদি এভাবে তাদের যুদ্ধকথা লিখতে পারতেন, আগামীদিনের মুক্তিযুদ্ধ-গবেষকদের জন্য নতুন নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হতো। কিন্তু আফসোস, সবাই তো আর লিখতে পারেন না। সেখানে মজিবর রহমান খোকা একজন বিরল কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। অবশ্যই তার বিশেষ অভিনন্দন প্রাপ্য। আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন―মজিবর রহমান খোকা।

 লেখক : শিশুসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares