খোলা আকাশের দিন : রাশেদ রউফের কিশোর উপন্যাস : আনজীর লিটন

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর-নির্বাচিত সেরা বই ২০২১-কিশোর উপন্যাস

‘চারদিকে অনেক মানুষ। খুব ভিড়। এই ভিড়ের মধ্যে আরিফ তার সহপাঠী মৃদুলকে খোঁজার চেষ্টা করে। মৃদুল কই ? এদের বাড়ি নিশ্চিহ্ন। ধোঁয়া উঠছে কেবল ওখান থেকে। ওদের কারও দেখা নেই। জমা হওয়া একটা দীর্ঘশ^াস হঠাৎ পোড়া-বাড়ির ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে আসে আরিফের ছোট্ট বুক থেকে।’

কে এই আরিফ ? এই আরিফকে খুঁজে পেতে হলে যেতে হবে খোলা আকাশের দিন উপন্যাসের এক লবণের নদীর কাছে। নদীর নাম চানখালি। নদীর দুরন্ত ঢেউ আর নৌকার মাঝি দেখতে-দেখতে কিংবা ভোরের আলোর সঙ্গে মিশে যাওয়া পাখির সুমধুর সুর শুনতে-শুনতে এই আরিফ হয়ে উঠেছে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। এই আরিফ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা হাজারো কিশোরের প্রতিনিধি। যাকে নির্মাণ করেছেন রাশেদ রউফ।

এই উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে লেখক আমাদের নিয়ে গেছেন আরিফদের ছনহরা গ্রামে :

‘সেখানে রোদ নামে, বৃষ্টি নামে, জোছনা নামে। সরু পায়ে-চলা পথের পাশে বাঁশঝাড়, মোড়ে মোড়ে পুকুর, ঝোপঝাড়, খেত-খামার। পুকুরের স্বচ্ছ জলে হাঁস খেলা করে আনমনে, গাছে গাছে ডেকে ওঠে পাখি, নিকানো উঠোন, সবজি বাগান, রাতে বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদের উঁকিঝুঁকি। গ্রামের পাশে বয়ে গেছে প্রিয় চানখালি নদী। এত সুন্দর হয় নদী! এমন এক গ্রামে আরিফের জন্ম’।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে জেগে থাকা এই ছনহরা গ্রামের কথা লেখক গভীর মমতা দিয়ে পাঠকের জন্য নিবেদন করেছেন।

রাশেদ রউফ ছোটদের কবি। লেখালেখির ভুবনে তাঁর দীর্ঘযাত্রা। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা সর্বমহলে স্বীকৃত। সাংবাদিকতা, সম্পাদনা এবং মৌলিক সৃষ্টিতে তিনি সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী। লেখালেখিতে কৃতিত্ব স্বরূপ পেয়েছেন অন্যান্য পুরস্কারের সঙ্গে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ছড়া-কবিতার ছন্দাশ্রয়ী পঙ্ক্তিমালা তাঁকে কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পদ্যের গাড়িতে চড়ে কখনও-কখনও গদ্যের বাড়িতে ঢ়ুঁ মেরেছেন তিনি। আর তেমনিভাবে ঢুঁ মারতে গিয়ে রাশেদ রাউফ খুব যত্ন করে লিখেছেন কিশোরপাঠ্য উপন্যাস খোলা আকাশের দিন।

উপন্যাসের ভেতরে তুলে এনেছেন খণ্ড খণ্ড গল্প। আলাদা আলাদা শিরোনামে গল্পগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি অধ্যায়। ‘লবণের নদী চানখালী’, ছবির মতন গ্রাম’, ‘বীরের স্বপ্ন’, ‘ছন্দে-আনন্দে’, ‘বাবার চোখে বড় স্বপ্ন’, ‘হিমাংশু কাকু: জীবনের পাঠদান’, গ্রামে বিদ্যুতের প্রথম হাতছানি’, ‘ক্লাস ছেড়ে পুকুর পাড়ে’, ‘বন্ধু চিরকাল’, ‘মুজিব বাইয়া যাওরে’, ‘জয় বাংলা: ইসমে আজম’, ‘বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে কষ্ট’, ‘সচেতন হয়ে উঠছে গ্রামের মানুষ’, ‘পাকিস্তানি চানতারাতে আগুন জ¦লে ওঠে’, ‘সহপাঠী যখন অগ্রজ’, ‘নাগরদোলায় দোল খায় আনন্দ’, ‘বাংলার বুকের ওপর ভারী পাথর’, ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালী’, ‘রক্তের ভিতর বয়ে যায় বিদ্যুৎ’, ‘তোমাকে প্রণাম মা’, ‘বিল পেরিয়ে ডোবা মাড়িয়ে’, ‘আশায় জাগে বুক’, ‘চানতারায় থুতু’, ‘জেগে ওঠে পাড়া’, ‘জ¦লছে বাড়ি’, ‘ভয়ে আতঙ্কে’, ‘নির্ঘুম রাত অনাহারী দিন’, ‘দেয়াঙ পাহাড়ে যুদ্ধ’, ‘বিজয় নিশান উড়ছে অই’―এরকম উনত্রিশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে একটি মলাটে আরিফকে তুলে এনেছেন ‘খোলা আকাশের দিন’ উপন্যাসে। কিশোরদের মনে যেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত দৃশ্যপট গেঁথে থাকে, তাই খুব মর্যাদা দিয়ে বাক্যগুলো সাজিয়েছেন। ঘটনাকে তুলে এনেছেন এবং কাহিনি বিস্তৃত করেছেন।

বইটি প্রকাশ করেছে মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনী সংস্থা ‘বাতিঘর’। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৭। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন জাহেদ আলী চৌধুরী যুবরাজ। প্রকাশক বইটি বিপণনে পাঠকদের এই মর্মে আশ^স্ত করেছেন যে, ‘কাহিনি নির্মাণ, আঙ্গিক ও বৈচিত্র্যসহ নানা কারণে উপন্যাসটি শুধু ছোটরা নয়, বড়রাও পড়ে আনন্দ পাবেন নিঃসন্দেহে।’

বইপাঠ আনন্দেরও বিষয় বটে। আনন্দের উৎস ছড়িয়ে আছে যতসব ধ্রুপদী বইয়ে। শুধু বিদেশি সাহিত্য নয়, বাংলা ভাষার সাহিত্যেও বেশিরভাগ কিশোর রচনা ধ্রুপদ মর্যাদা পেয়েছে। রাশেদ রউফ খোলা আকাশের দিন উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে ধ্রুপদী ভাষা নির্মাণে এবং ঘটনাপ্রবাহের প্রতি সতর্ক থেকেছেন। আঙ্গিকের প্রতিও থেকেছেন যত্নশীল। আর তাই কিশোরদের জন্য উপন্যাসের এই কাহিনির পরতে পরতে শুধু পরিবেশকেই বর্ণনা করেননি, পাশাপাশি প্রতিবেশকেও তুলে এনেছেন। বেড়ে ওঠার কালে কিশোর-মনোজগতে যে প্রকৃতি এবং কল্পনাশক্তি বিরাজ করে তা তুলে ধরেছেন লেখনির নৈপুণ্য দিয়ে। চেনা গ্রাম এবং গ্রামের মানুষের সঙ্গে মায়াবী বন্ধন তৈরি করেছেন। যেখানে আরিফ এবং তার বন্ধুরা মিলেমিশে থাকে। যেখানে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বলতা ছড়ায়। যেখানে নানা পেশার নানান মানুষ শিশু-কিশোরদের এগিয়ে চলার পথ নির্মাণ করে দেয়। সৃষ্টি করে ভিন্ন করম উদ্দীপনা। উপন্যাসের চরিত্র আরিফের হৃদয়ে এসব স্পর্শ করেছিল। লেখক লিখছেন :

‘আরিফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্রোতের সঙ্গে মাঝির যুদ্ধ যেমন দেখছে, তেমনি দেখছে এগিয়ে চলার উচ্ছ্বাস। মাঝে মাঝে লঞ্চ এসে নদীর বুকে সাঁতার কেটে চলে যায়। তার এগিয়ে চলার শব্দ ও কোলাহলে নেমে আসে চঞ্চলতা। মাঝে মাঝে লঞ্চে করে মুরালি ঘাট চলে যেতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ইন্দ্রপুলে যেতে। কিন্তু কোথাও তার যাওয়া হয় না। ঢেউয়ের সাথে মিতালি পেতে সময় কাটায় সে। কখনও নদীর বুকে নেমে। আবার কখনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে। নৌকার মাঝিরা আরিফকে ডাকে, ইশারায়। হাত নাড়ে। আজ তার ইচ্ছে করছে নদীতে নেমে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলতে’।

আরিফের বন্ধু মৃদুল দে ছনহরা গ্রামের ছেলে। যাকে সঙ্গে নিয়ে আরিফ শৈশব-রাঙানো মুহূর্তগুলো উদযাপন করতে চায়। উদযাপনের সেইসব ছবি আঁকতে গিয়ে রাশেদ রউফ পাঠককে নিয়ে গেছেন মুক্তিযুদ্ধের কাছে। আর এর মধ্য দিয়ে তুলে এনেছেন দেশ-বিজয়ের গল্প। উপন্যাসের শেষ দিকে মৃদুল হারিয়ে যায়। কোথায় যায় ? সে কি বেঁচে আছে ? এমনি সব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আরিফ বাড়ি ফিরে আসে। স্বাধীন দেশে তখন আনন্দের গান, বিজয়ের গান, উৎসবের গান। রক্ত-নদীর জলটুঙি পেরিয়ে ধরা দেয় তখন বিজয়ের ছবি।

খোলা আকাশের দিন উপন্যাসে কয়েকটি চরিত্রের সমন্বয়ে রাশেদ রউফ মূলত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা এনেছেন, ২৬ শে মার্চের কথা এনেছেন, স্বাধীনতার কথা এনেছেন, জয় বাংলা ধ্বনির কথা এনেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে কিশোর মনে জাগিয়ে দিয়েছেন দেশপ্রেম। আর এই মহৎ বার্তাটি খোলা আকাশের দিন উপন্যাসের মূল শক্তি।

উপন্যাসটির বুনন খোলা আকাশের দিনকে সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কাহিনির চিরচেনা ‘প্যাটার্ন’ এর ভেতর লেখক সীমাবদ্ধ থাকেননি। ছনহরা গ্রামের মৃণালদের বাড়িসহ পুড়ে যাওয়া ভট্টাচার্যের বাড়ি, ঘোষের বাড়ি, সেনের বাড়ি ও দত্ত বাড়ির কথা বলতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে গ্রামের প্রকৃত চিত্রকেই তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রচলিত গল্পের ধারা থেকে বেরিয়ে তিনি নতুন দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। যা কিশোর পাঠকদের মনে তৈরি করবে সহমর্মিতার কোমল অনুভূতি।

 লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও

সাবেক পরিচালক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares